রূপা পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

রূপা পর্ব – ৭

রূপা বলল, আমি ভাল আছি। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনিও ভাল আছেন। আমাকে বলা হয়েছিল আপনি মৃত্যুপথযাত্রী।রাশেদ বলল, আমরা সবাই মৃত্যুপথযাত্রী। আপনি আসবেন আমি কল্পনাও করি নি। আপনাকে ডালিয়া ফুলের মতো লাগছে। হলুদ ডালিয়া। তবে এই ডালিয়ায় গন্ধ আছে। আপনি হলুদ শাড়ি পরেছেন এবং আপনার গায়ে হলুদ রোদ পড়েছে। মনে হয় এই কারণে ডালিয়া। আর একটা কথা, আপনি হয়ত রাগ করবেন।

তাতে কিছু যায় আসে না। আমার মাথায় যে কথাটা এসেছে সেটা বলে ফেলব। কারণটা আগে স্পষ্ট করি, মরতে বসেছিলাম, সেখান থেকে ফিরেছি। পরের বার হয়ত ফিরতে পারব না। যে কথা বলতে চেয়েছি সেটা বলা হবে না।রূপা বলল, হড়বড় করে এত কথা বলার কোনো প্রয়োজন নাই। যা বলতে চাচ্ছেন বলে ফেলুন।ভুলে গেছি।এত আগ্রহ করে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলেন সেটা ভুলে গেছেন?

রাশেদ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কথাটা স্বপ্নের মতো মাথায় এসেছে। স্বপ্ন শর্টটাইম মেমোরি বলেই ভুলে গেছি। মানুষ জেগে থেকেও স্বপ্ন দেখে। খুব কম দেখে কিন্তু দেখে। আপনি দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবেন, না ভেতরে আসবেন? রূপা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, টেলিভিশন বন্ধ করুন।রাশেদ বলল, অল্প কিছু সময় আপনি এই চেয়ারে বসে থাকুন। আমি নাটকটা দেখে শেষ করি। ঐ যে মেয়েটা দেখছেন সে অন্ধ। নায়ক এখনো বুঝতে পারছে না। যখন বুঝবে তখন টিভি বন্ধ করব।

রূপা বলল, আপনাকে পুরো নাটকটা দেখতে হবে। আমার ধারণা শেষ দৃশ্যে বুঝতে পারবে, তার আগে না। তখন নয়িক তার একটা চোখ দান করবে। দুই কানী সুখের সংসার করবে।–

কানি বলবে কানা

কানা বলবে কানি

এই বলে দুইজনে

করবে কানাকানি॥

রাশেদ বলল, প্লিজ কথা বলবেন না।

রূপার মোবাইল ফোন বাজছে। সে ফোন নিয়ে বারান্দায় চলে গেল। শায়লা টেলিফোন করেছেন।তুই কোথায়? মা আমি হাসপাতালে। বলেছিলাম না এক মৃত্যুপথযাত্রীকে দেখতে এসেছি।তার অবস্থা কি? সে এখন জীবন পথযাত্রী। মহা উৎসাহে কানাকানির নাটক দেখছে।তুই কি স্পষ্ট করে আমার কথার জবাব দিবি? লোকটা কে?

একবার তোমাকে বলেছি, আবারও বলছি। লোকটা কে আমি জানি না। তবে এখন জানব। নাড়ি নক্ষত্র বের করে ফেলব। তার সম্পর্কে একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ তথ্য অবশ্য জানি। বলব? বল।তার ব্লাড গ্রুপ ০ পজেটিভ। বেডের সঙ্গে লাগানো মেডিকেল রিপোর্টে লেখা।ব্লাড গ্রুপ ও পজেটিভ এটা গুরুত্বপূর্ণ হবে কেন?

মা! এরা ইউনিভার্সেল ডোনার। তোমার রক্তের প্রয়োজন হলে তার কাছ থেকে নিতে পারবে।রূপা আমার সঙ্গে সিরিয়াসলি কথা বল। ঠাট্টা তামাশা কিছুক্ষণ বাদ রাখ। প্লিজ। লোকটা কে, কি ব্যাপার, ঘটনা কি আমাকে বল।মা! রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি–যদি জানতেম কি ঘটনা, তোমায় জানাতাম। ইউ স্টুপিড গার্ল।

শায়লা টেলিফোন রেখে দিলেন। রূপা ঘরে ঢুকল না। নাটক শেষ হোক তারপর ঘরে ঢুকবে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে তার খারাপ লাগছে না। পৃথিবীর সবচে বড় বড় নাটকগুলি হাসপাতালের বারান্দায় ঘটে। রূপার বা দিকে বারান্দায় হেলান দিয়ে এক মধ্য বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে। তার হাতে অনেকগুলি কলা। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা কলা হাতে নিচ্ছে এবং অতি দ্রুত খাচ্ছে। মাথা বাইরের দিকে তাকিয়ে কলার খোসা নিচে ফেলে দ্রুত মাথা টেনে নিচ্ছে। আবার আরেকটা কলা খাচ্ছে। লোকটা সবদিকে তাকাচ্ছে শুধু রূপার দিকে তাকাচ্ছে না।

রাশেদ ভেতর থেকে ডাকল, নাটক শেষ। আসুন।রূপা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, শেষটা কি? আমি যা বলেছিলাম তাই? না। মেয়েটা অন্ধ না। অন্ধের অভিনয় করছিল। নায়ক যখন জানবে মেয়েটা অন্ধ তখন কি করবে তাই জানতে চেয়েছিল।জেনেছে? হুঁ। নায়ক অন্ধ শুনে বলেছে, তুমি অন্ধ তাতে কিছু যায় আসে না। আজ থেকে আমার চোখই তোমার চোখ। এখন থেকে তুমি দেখবে আমার চোখে। তখন নায়িকা হাসতে হাসতে বলল, আমি অন্ধ না। ঠাট্টা করছিলাম।নাটক দেখে আনন্দ পেয়েছেন?

আমি সবকিছুতেই আনন্দ পাই। আমার ধারণা আমার জন্মই হয়েছে আনন্দ পাবার জন্যে। সকালে শেভ করে আনন্দ পেয়েছি, গোসল করে আনন্দ পেয়েছি, ব্রেকফাস্ট করে আনন্দ পেয়েছি, আপনাকে দেখে আনন্দ পেয়েছি, নাটক দেখে আনন্দ পেয়েছি, এখন কথা বলে আনন্দ পাচ্ছি।আপনাকে কি আজ ছেড়ে দেবে? জানি না, তবে ছেড়ে দেয়া উচিত। আমি পুরোপুরি সুস্থ।ছেড়ে দিলে কোথায় উঠবেন? হোটেলে?

হোটেলে আমার সেকেন্ড অপশন। ফাস্ট অপশন আপনাদের বাড়ি। যে কয়দিন থাকব পেইং গেস্ট হিসেবে থাকব।পার ডে, কত করে দেবেন? আপনি ঠিক করে দিন। পনেরো বিশ দিনের বেশি থাকব না।ঐ বাড়িটা খুঁজে বের করবেন না? কোন বাড়িটা? যে বাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন, ভুলে আমাদের বাড়িতে চলে এলেন। যে বাড়ির মেয়ের নাম রুনা। ভাল কথা রুনা কে? আরেক দিন বলি?

কোনো অসুবিধা নেই, আরেকদিন বলবেন, আর বলতেই যে হবে তাও। শুধু একটা জিনিস এই মুহূর্তে জানতে চাচ্ছি। ঐ রাতে আপনার জন্যে খাবার সাজানো হচ্ছিল, আপনি কাউকে কিছু না বলে চলে গেলেন কেন? রাগ করে চলে গেছি।কার উপর রাগ? আমার উপর? হ্যাঁ। আমাকে তুমি বলতে নিষেধ করেছিলাম এই জন্যে রাগ? হ্যাঁ।অন্যায় রাগ করেছিলেন।হ্যাঁ, অন্যায় রাগ করেছিলাম, তার জন্যে শাস্তিও পেয়েছি।কি শাস্তি পেয়েছিলেন?

বৃষ্টিতে ভিজে অসুখ বাধিয়েছি।ডাক্তার রুবিনার কাছে শুনলাম আপনি মরতে বসেছিলেন।হ্যাঁ। মানুষের হার্টে সমস্যা থাকে, আমার লাংসে সমস্যা।ডাক্তার রুবিনাকে স্পেশাল থ্যাংকস দিতে ভুলবেন না। উনি আপনার জন্যে অনেক করেছেন।সবার আগে আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি ঘরে ঢুকেছেন হঠাৎ মনে হল ঘাতঘাত ঘরে এক খ রোদ ঢুকেছে। আপনাকে খুশি করার জন্যে বলছি না। সত্যি বলছি।

রাশেদকে বিকেলে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দিল। রাশেদ আনন্দিত গলায় রূপাকে বলল, কি মনে হচ্ছে জানেন? মনে হচ্ছে প্রকৃতি আপনাকে পাঠিয়েছে আমাকে নিয়ে যাবার জন্যে। মনে হচ্ছে অনেকদিন পর বাড়ি যাচ্ছি।রূপা একবার ভাবল বলে, আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি ঠিকই কিন্তু আমাদের বাড়িতে না। আমাদের বাড়ি ভুল বাড়ি। আপনি ভুল করে এসেছিলেন বলেই ভুল বাড়ি। আমি আপনাকে শুদ্ধ বাড়িতে নিয়ে যাব।রাশেদ বলল, আচ্ছা আপনি কি গান জানেন?

রূপা বলল, না।রাশেদ বলল, আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। কিছু কিছু মানুষকে দেখে আমার মনে হয় এই মানুষটা গান জানে। তাদের সবাইকেই আমি জিজ্ঞেস করেছি, আপনি কি গান জানেন? সবাই বলেছে, না। শুধু একজনকে দেখে আমার মনে হয়েছে সে আর যাই জানুক গীন জানে না। অথচ সে এত সুন্দর গান করে।রূপা ব্যানার্জির কথা বলছেন?

রাশেদ জবাব দিল না। কিছুক্ষণের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। রূপা তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এল। রূপা জানে কাজটা ভুল হচ্ছে। মাঝে মাঝে ভুল কাজ করতে ইচ্ছা করে।বাড়িতে ঢুকেই রাশেদ বলল, যে কথাটা আপনাকে বলতে গিয়ে ভুলে গেছি সেটা মনে পড়েছে। বলব?

বলুন।আবার ভুলে গেছি।রূপা বলল, এবার আপনি ভুলেন নি, আপনার মনে আছে। কিন্তু আপনি বলতে চাচ্ছেন না।রাশেদ বলল, আপনার এত বুদ্ধি কেন? আমি একটা ব্যাপারে খুব অবাক হচ্ছি। আমি দেখেছি রূপা নামের মেয়েদের খুব বুদ্ধি হয়।সন্ধ্যাবেলা হারুন বাসায় ফিরে দেখেন গেস্টরুমের দরজা খোলা। সেখানে কে যেন শুয়ে আছে। বাইরে থেকে জুতা দেখা যাচ্ছে। জুতা পায়ে বিছানায় শোয়া। আশ্চর্য তো।হারুন বললেন, গেস্টরুমে কে ঘুমাচ্ছে?

মলিনা বলল, ভাইজান ঘুমাইতাছে। আমারে বলল, মলি কফি খাব। ভাইজান আমারে পুরা নামে ডাকে না, মলি ডাকে। ঘরে ছিল না কফি। দারোয়ান দোকানে পাঠায়া কফি আনাইলাম। মগভর্তি কফি নিয়া গেলাম, ও আল্লা ভাইজান ঘুমে।হারুন বললেন, ভ্যারভ্যার করবে না। ভাইজানটা কে? ঝেড়ে কাশ।মলিনা বলল, কাশ থাকলে না কাশবো। ভাইজানের নাম রাশেদ।যে জিনিসপত্র ফেলে চলে গিয়েছিল? জ্বে।আবার উদয় হয়েছে কেন?

আফা গিয়া নিয়া আসছেন। ভাইজান ছিলেন হাসপাতালে। খুবই খারাপ অবস্থায় ছিলেন। অবস্থা এমন যে ভাইজান বিছানায় শোয়া, আজরাইল খাটের নিচে ঘাপটি মাইরা বসা।আর কথা বলবে না। রূপা কোথায়? আফা বাজার সদাই করতে গেছে। ভাইজান গরুর মাংস দিয়া পরোটা খাইতে চাইছে। ঘরে মাংস নাই।অচেনা এক লোক ঘরে ঢুকেই গরুর মাংস পরোটা খেতে চাইল আর তোমার আপা মাংস কেনার জন্যে ছুটল কসাইয়ের দোকানে?

মলিনা বলল, কসাইয়ের দোকানে যাবেন কেন? আগুরায় গেছে। সহজ কথা বললে বুঝেন না। আপনে এমন মসিবতের মানুষ।ডেকে তোল তোমার ভাইজানকে।একটা রোগী মানুষ। ঘুমাইছে। আমি তারে ডাইকা তুলব, এমুন পাষাণী আমি না। প্রয়োজনে বাসার কাম ছাইড়া গারমেন্টে চাকরি নিব। গারমেন্টে ছুটি আছে, ওভাবটাইম আছে, মেডিকেল আছে। বাসাবাড়ির কামে বকা ছাড়া কিছুই নাই।

হারুন গেস্টরুমে ঢুকলেন। সব রহস্যের এখনই মীমাংসা হওয়া দরকার।রাশেদ মনে হয় জেগেই ছিল হারুনকে ঢুকতে দেখে সে বিছানা থেকে নামলো। হাসিমুখে বলল, আপনি নিশ্চয়ই রূপার বাবা।হারুন বললেন, হ্যাঁ। আপনার পরিচয় প্রথম শুনি। আপনি কে? আপনার ব্যাপারটা কি?

রাশেদ বলল, আপনি কি আমার উপর কোনো কারণে রেগে আছেন? আমার সঙ্গে রাগ করার মতো বড় কোনো অপরাধ আমি করিনি। আপনি কি জানতে চান বলুন। আমি বলছি। আমার নাম নিয়েই এর মধ্যে জেনেছেন। আবারও বলি–আমার নাম রাশেদ রহমান।থাকেন কোথায়? আমেরিকায়। মোরহেড স্টেটে।করেন কি?

মোরহেড স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গত বছর অঙ্কের লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছি।হারুন চেষ্টা করছেন রাগটা ধরে রাখতে পারছেন না। রাগ দ্রুত কমা শুরু হয়েছে। তাঁর সামনে দাঁড়ানো রাজপুত্রের মতো ছেলের উচিত সিনেমায় নায়কের রোল করা। সে শেখাচ্ছে অঙ্ক। পুরনো দিনের এক নায়কের সঙ্গে। ছেলেটার চেহারার মিল আছে। সে কে? উত্তম কুমার না তো? না উত্তম কুমার না। উত্তম কুমার এত সুন্দর না।ম্যাথমেটিক্সের কোন ব্রাঞ্চে আপনার পড়াশোনা? টপলজি।Ph.D ডিগ্রী নিশ্চয়ই আছে?

জী আছে।মলিনাকে কফির কথা বলে ঘুমিয়ে পড়লেন। কফি কি এখন খাবেন? খাব।আপনি অঙ্কের লোক ইতিহাসের বিষয়ে আপনার আগ্রহ থাকার কথা না। আগ্রহ কি আছে? আমার সব বিষয়েই প্রবল আগ্রহ।হারুন ইতস্তত করে বললেন, আমি ইতিহাসের মানুষ। একটা এক্সপেরিমেন্টাল ইতিহাসের বই লিখছি।এক্সপেরিমেন্টাল মানে কি?

বইটা লিখছি কবিতায়।রাশেদ আগ্রহের সঙ্গে বলল, প্রফেসর গ্যামো একটা অঙ্কের বই কবিতায় লিখেছিলেন। বইটার নাম Math in Rhymes. বলেন কি?অসম্ভব সুন্দর বই। আপনি পড়তে চাইলে আমি ব্যবস্থা করব।অবশ্যই পড়তে চাই।ইন্টারনেটে বইটা আছে। আমি ডাউন লোডের ব্যবস্থা করছি। আমাকে দয়া করে আধঘণ্টা সময় দিন।হারুন বললেন, আগে কফি খাও। তারপর ডাউন লোড, আপ লোড যা করার করবে। তুমি বয়সে ছোট এই জন্য তুমি করে বলেছি।

রাশেদ বলল, আপনি আমাকে অবশ্যই তুমি করে বলবেন। আমি, বয়সে ছোট বলে আপনার মেয়ে রূপাকে তুমি বলেছিলাম। সে রাগ করেছিল।হারুন দুঃখিত গলায় বললেন, আমার এই মেয়ে নিজেকে মনে করে মহাজ্ঞানী। মায়ের স্বভাব পেয়েছে। তার মা নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবে। রূপার মায়ের সঙ্গে যে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে এটা কি রূপা তোমাকে বলেছে?

জী না।ওইসব কথা বলতে সে লজ্জা পায়। তার সম্মানের হানি হয়। তোমার কাছে বলতে কি সমস্যা কিছুই বুঝলাম না। সে তো আর ঢাক পিটিয়ে বলছে না, নিজের লোকের কাছে বলছে। মান সম্মান নিয়ে বসে থাকার কোনো অর্থ আছে, তুমি বল।রাশেদ বলল, কোনো অর্থ নেই।আমি যে ছাদে মাছ চাষ করি, রূপা তোমাকে বলেছে? বলে নি। কি মাছ চাষ করেন?

দেশি মাছ, কৈ, শিং, মাগুর, তেলাপিয়া। কৈ মাছগুলি কেন জানি মরে যায়। সাত দিনের মাথায় মরে ভেসে ওঠে।রাশেদ বলল, মৎস্য বিশেষজ্ঞ কারোর সঙ্গে আলাপ করা দরকার।মৎস্য বিশেষজ্ঞ পাব কোথায়? মৎস্য বিশেষজ্ঞ তো আপনার ঘরেই আছে।কে? তুমি না-কি?

ইন্টারনেট। গুগল সার্চ দিলেই বের হয়ে পড়বে। আমি বের করে দেব। তার আগে চলুন আপনার মাছের খামার দেখে আসি।হারুন আনন্দের সঙ্গে বললেন, চল যাই। কফি ছাদে বসে খাওয়া যাবে। ছাদে বাগান করেছি। বাগান তোমার পছন্দ হবে। রূপার অবশ্য পছন্দ না। তার ধারণা ছাদে আমি জঙ্গল বানিয়েছি। যে কোনো সময় জঙ্গলে বাঘ দেখা যাবে। সস্তা মেয়েলি রসিকতা। বাগান সম্পর্কে তোমার যদি কোনো সাজেশান থাকে দিতে পার।

দুজন ছাদে উঠে গেল।রূপা বাজার নিয়ে ফিরেছে। গেস্টরুমে কেউ নেই। বসার ঘরেও কেউ নেই। রূপা বলল, মলিনা! উনি কি চলে গেছেন? মলিনা হাসিমুখে বলল, ভাইজান ছাদে। বিরাট গফ চলতাছে। খালুজান এমন গফ দিতাছে, আমি অবাক মানছি। যান দেইখা আসেন। দেখলে মজা পাইবেন।মদিনা কোথায়?

দরজা বন কইরা বসা। খালুজান কফি চাইছে, আমি মদিনারে বললাম, যা কফি দিয়া আয়। সে বলল, যামু না। আমি বললাম, যাবি না কেন? তুই ভূতের সাথে পীরিত করতে পারবি আর মেহমানের সামনে যাইতে পারবি না।রূপা নিজের ঘরে ঢুকল। ঘরের কোনায় মদিনা চুপচাপ বসে আছে। তার মাথা নীচু। রূপা বলল, কোনো সমস্যা মদিনা? মদিনা না সূচক মাথা নাড়ল।রাশেদ সাহেবকে দেখেছ? হুঁ।উনি মানুষ কেমন?

মানুষ কেমন আমি তো আফা বলতে পারি না।মদিনা তোমার সঙ্গে আজ রাতে আমি আলাদা করে বসব। তোমাকে দেখে কেন জানি মনে হচ্ছে তুমি কিছু বলতে চাচ্ছ। বলতে পারছ না। আফা চা খাবেন? চা আইন্যা দেই? চা খাব না। বাবাকে ডেকে নিয়ে আস।মদিনা বলল, আমি ছাদে যাব না আফা।যাবে না কেন? মদিনা চুপ করে রইল।তুমি কি কোন কারণে রাশেদ সাহেবের সামনে যেতে চাচ্ছ না?

মদিনা এই প্রশ্নেরও জবাব দিল না। অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।হারুন তাঁর রহস্য খাতা খুলেছেন। রহস্যময় যেসব খবর পত্রিকায় ওঠে তিনি তার পেপার কাটিং জমা করেন।হারুন রহস্য খাতা রাশেদের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, রাশেদ! এই ছেলেটাকে দেখ–বালক পীর। সপ্তাহে একদিন সন্ধ্যা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত সে যাকে যা বলে তাই হয়। নাম ওসমান। বাবা দিনমজুর। আমি গিয়েছিলাম দেখতে। হাজার হাজার মানুষ। ভিড় ঠেলে এগুতে পারলাম না।ব্যাপারটা কি আপনার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়? আমার উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ এবং না। জগৎ রহস্যময় এটা তুমি মান, না-কি মান না?

রাশেদ বলল, আমার উত্তরও হ্যাঁ এবং না। একইসঙ্গে রহস্যময় আবার রহস্যময় না।হারুন বললেন, আমার এখানে মদিনা নামের একটা মেয়ে আছে। তার নাম আমি দিয়েছি ঘড়ি-কন্যা। সে হল জীবন্ত ঘড়ি।আপনার কথা বুঝতে পারছি না।ধীরে ধীরে বুঝবে। একদিনে সব জেনে ফেললে হবে না। মেয়েটা সম্পর্কে রাজশাহীর দৈনিক প্রভাতে কি লিখেছে পড়ে দেখ, আমি আরেক দফা কফির কথা বলে আসি। না-কি চা খাবে?

আপনি যা খাবেন। তাই খাব।টক দৈয়ের শরবত খাবে? টক দৈ, গোল মরিচ আর লবণ ব্লেন্ডারে দিয়ে বানানো হয়। সঙ্গে থাকে এক ফালি কাঁচামরিচ আর এক চিমটি ধনেপাতা। গ্রাসের উপর দুই ইঞ্চি পরিমাণ কুচি বরফ। এক চামচ চিনি।শুনেই তো খেতে ইচ্ছা করছে।সমস্যা একটাই, রূপা ছাড়া কেউ বানাতে পারে না। সে ফিরেছে কি-না কে জানে। দেখি ব্যবস্থা করি। হারুন ব্যস্ত ভঙ্গিতে নেমে গেলেন। তার এই ব্যস্ততা দেখার মতো।

বসার ঘরেই রূপাকে পাওয়া গেল। হারুন বললেন, দুটা টক দৈয়ের শরবত। কুইক।রূপা বলল, বাবা বসো তো।এখন বসতে পারব না। রাশেদের সঙ্গে অত্যন্ত জরুরি একটা আলাপ করছি। তুই শরবতটা বানিয়ে ছাদে পাঠানোর ব্যবস্থা কর।শরবত বানানো যাবে না। ঘরে টক দৈ নেই।ড্রাইভারকে পাঠা। নিয়ে আসবে।রূপা বলল, বাবা! তুমি বসো। তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে। রাশেদ সাহেবের সঙ্গে আলাপের চেয়েও আমারটা জরুরি।বল।

তুমি বস তারপর বলব।তুই এত ঝামেলা করিস কেন? জরুরি কথা বসে শুনতে হবে? অতি জরুরি কথা শুয়ে শুনতে হবে? আচ্ছা যা বসলাম।রূপা বলল, বাবা শোন। রাশেদ নামের মানুষটাকে আমরা কেউ চিনি। তার বিষয়ে কিছুই জানি না। তুমি প্রথম দেখাতেই তাকে কোলে নিয়ে বসে আছ এটা কি ঠিক হচ্ছে? হারুন বললেন, কোনো একজন মানুষকে আমার পছন্দ হাতে পারবে না?

পাঁচ মিনিটের পরিচয়ে হতে পারবে না।পঞ্চাশ বছরের পরিচয় লাগবে? তোর মার সঙ্গে এগারো বছরের পরিচয় ছিল। তাকে চিনতে পেরেছি? বাবা! তুমি লজিক গোলমাল করে ফেলছ।আমাকে লজিক শিখাবি না। স্টুপিড মেয়ে।রেগে না গিয়ে আমার কথা মন দিয়ে শোন। তুমি উঁচু তারে বাধা একজন মানুষ। কাউকে অতি দ্রুত পছন্দ হওয়া এবং অতি দ্রুত অপছন্দ হওয়া তোমার চরিত্রের অংশ। এটা ঠিক না।

কাকে অতি দ্রুত অপছন্দ করলাম? সুলতান চাচাকে।যে ছাগলা একটা কথা চারবার করে বলে তাকে অপছন্দ করতে পারব না? তাঁর এই স্বভাবের পরেও তাঁর সঙ্গে তোমার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। পরপর দুদিন না দেখলে তুমি অস্থির হয়ে যেতে।মূল কথাটা বল। রাশেদের সঙ্গে আমি কথা বলতে পারব না। এইটাই তো মূল কথা?

 

Read more

রূপা পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *