রূপা পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

রূপা পর্ব – ৮

মূল কথা হচ্ছে তোমার ভোলাটাইল নেচার চট করে অপরিচিত একজনকে দেখিও না। সে তোমার নেচার বুঝতে পারবে না। তোমাকে নিয়ে মনে মনে হাসবে। আমোদ পাবে। তোমার কর্মকাণ্ডে কেউ আমোদ পাবে এটা আমার পছন্দ না।হারুন উঠে দাঁড়ালেন। কঠিন গলায় বললেন, তুই কি মনে করে অচেনা অজানা একজনকে বাড়িতে এনে তুলেছিস এটা বল। তুই নিজেই তো তাকে এ বাড়িতে কোলে করে এনেছিস। আমি আনি নি।

রূপা বলল, বাবা। উনি আমার উপর রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে ঝড়বৃষ্টিতে পড়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন। আমি অপরাধ বোধ থেকে তাঁকে এ বাড়িতে এনেছি। তিনি সে রাতে ডিনার না করে চলে গিয়েছিলেন। আমি তাঁকে ডিনার করাব। তিনি যে ঠিকানায় যেতে গিয়ে ভুল করে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন আমি নিজে তাকে সেই ঠিকানায় পৌঁছে দেব। রাতে ডিনারের পরপর এই কাজটা করা হবে।

এত দেরি করে লাভ কি? এখনি লাথি দিয়ে বের করে দে। যেখানের জিনিস সেখানে চলে যাবে।বাবা। তুমি আবার ছেলেমানুষি শুরু করেছ।হারুন বললেন, আমি ছেলেমানুষ তাই ছেলেমানুষি করছি। তুই বুড়ি, তুই করবি বুড়ি মানুষী। যা আমি তার সঙ্গে বাস করব না।কোথায় যাবে?

বনে জঙ্গলে চলে যাব। গাছের ডালে ঝুলে থাকব। ক্ষুধা লাগলে গাছের পাতা খাব।হারুন হন হন করে সদর দরজা খুলে রাস্তায় নেমে গেলেন।রূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাতের ডিনারের আয়োজন করতে গেল। রাশেদ নামের মানুষটার পরোটা মাংস খেতে মন চাইছে। ঝাল মাংস সঙ্গে বিসকিটের মতো পরোটা।

ছাদে আলো নেই। বাড়ির চারপাশের গাছপালার কারণে অন্ধকার গাঢ় হয়েছে। রাশেদ চৌবাচ্চার পাশে বসে ছিল। টক দৈয়ের শরবতের অপেক্ষা। হারুন ফিরছেন না। মনে হয় শরবত বানানোর প্রক্রিয়া জটিল। সময় লাগবে। রূপার বাবাকে রাশেদের ভাল লেগেছে। তার নিজের বাবা খানিকটা এ রকমই ছিলেন। রাশেদের মা বলতেন, মানুষ ক্যামনে চিনবি বলব?

ঘোড়া চিনি কানে

রাজা চিনি দানে

মেয়ে চিনি হাসে

পুরুষ চিনি কাশে।

ভাল জাতের ঘোড়া কান দেইখা চিনতে হয়। রাজা কত বড় তার পরিচয় হয় তাঁর দানে। মেয়েদের চেনা যায় তাদের হাসি দিয়ে। আর পুরুষ চিনতে হয় তার কাশিতে।রাশেদ বলেছিল একজন পুরুষ মানুষ কাশবে সেই কাশির শব্দে বোঝা যাবে সে কেমন পুরুষ! হুঁ। কাশ হইল তার গলার আওয়াজ। মানুষের গলার আওয়াজই তার পরিচয়।

হারুন নামের মানুষটার গলার আওয়াজ মোটেই ভাল না, কিন্তু মানুষটা ভাল এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাশেদ ছাদের গাছপালা দেখছে। ছাদে বাগানের সুযোগ আমেরিকার নেই। আমেরিকার আকাশ থেকে বরফ পড়ে। বাংলাদেশের আকাশ থেকে পড়ে বৃষ্টি। গাছপালার প্রাণদায়িনী বৃষ্টি।ড্রাম কেটে একটা কাগজি লেবুর গাছ লাগানো হয়েছে। গাছভর্তি লেবু। কি সুন্দর দৃশ্য। গাছটার একটা ছবি তুলে রাখা দরকার। গাছ নিয়ে রাশেদের মার ছড়া আছে–

আমড়া গাছে আম হয় না

কাঠাল গাছে কলা

তেঁতুল গাছে জাম হয় না

হয় না ত্রিফলা।

রাশেদ গাছ থেকে একটা লেবু ছিঁড়ল। Fresh Lemon Smell Purifies Thc Heart. লেবুর ঘ্রাণ নিয়ে হৃদয় শুদ্ধ করা যাক। রাশেদ ঘ্রাণ নিল।অন্ধকারে ছাদে ঘুরছেন। এই যে রুফ গার্ডেন সুইচ। বাতি জ্বেলে দেই? রূপার কথায় রাশেদ হঠাৎ চমকে উঠল। কেন চমকালো সে নিজেও বুঝতে পারল না।

মানুষের প্রতিটি কার্যের পেছনে কারণ থাকে। চমকানোর পেছনের কারণটা কি? এমন কি হতে পারে অন্ধকারে রূপার গলার স্বর অন্য রকম শুনাচ্ছে। দিন রাত্রির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের গলার স্বর বদলায়।রাশেদ বলল, বাতি জ্বালাতে হবে না। অন্ধকারে হাঁটতে আমার ভাল লাগছে। আপনার বাবা কোথায়?

আমার উপর রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন।কি সর্বনাশ! রূপা বলল, সর্বনাশের কিছু না। মাসে একবার আমার উপর রাগ করে বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে যান। ঘণ্টাখানিক পর ফিরে আসেন। বাবার সঙ্গে অনেকক্ষণ আলাপ করলেন। বাবাকে কেমন লাগল?

রাশেদ বলল, ছড়া দিয়ে বলি–

কলমে কায়স্থ চিনি

গোঁপে রাজপুত

ভাল মানুষ সেই হয়

যার কলিজা মজবুত।

আপনার বাবার কলিজা মজবুত।

রূপা বলল, অদ্ভুত ছড়া কোত্থেকে শিখেছেন?

রাশেদ বলল, আমার মার কাছ থেকে। সবকিছু নিয়ে তাঁর ছড়া আছে।

রূপা বলল, আরেকটা ছড়া বলুন তো?

রাশেদ বলল, গলা নাই গান গায়। বৌ নাই শ্বশুর বাড়ি যায়।

বাহ্ সুন্দর তো। আপনার মা কি আপনার সঙ্গে থাকেন?

না। তিনি নেত্রকোনা জেলার বাইরে কোনদিন যাননি।

বেঁচে আছেন?

না।

আপনার বাবা বেঁচে আছেন?

জানি না।

জানেন না মানে কি?

রাশেদ বলল, আমার বাবা খানিকটা আপনার বাবার মতো। তিনি মার সঙ্গে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতেন। তাঁর রাগ সহজে পড়ত না। এমনও হয়েছে দুমাস ফিরেন নি। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন একবার রাগ করে বাড়ি ছাড়লেন আর ফিরেন নি। মনে হয় এখনো রাগ কমেনি। বাবাকে নিয়ে অনেক গল্প আছে যদি কোনদিন গুনতে চান শুনাব।

অবশ্যই শুনব। রান্না হয়ে গেছে। আপনি যখন খেতে চান বলবেন টেবিলে খাবার দিতে বলব। বাবা গাড়ি নিয়ে যান নি। গ্যারাজে গাড়ি আছে। ডিনার শেষ করে গাড়ি নিয়ে রুনাদের বাড়ি খুঁজে বের করবেন।তাড়িয়ে দিচ্ছেন না-কি?

রূপা বলল, না। যেটা শোভন সেটা করছি। আমাদের এখানে কেন থাকবেন।পেইং গেস্ট হিসেবে থাকব।আমরা পেইং গেস্ট রাখি না। এই কথায় আবার রাগ করে ঐ রাতের মতো না খেয়ে চলে যাবেন না। আপনি গোশত পরোটা খেতে চেয়েছিলেন। মাংস আমি নিজে রান্না করেছি। পরোটা তৈরি আছে। খেতে বসলেই মলিনা ভেজে দেবে।

রাশেদ বলল, আপনি আপনার বাবার মতো না। আপনি আমার খুব পরিচিত একজনের মতো। আপনার স্বরও তার মতো। প্রথম দিন ধরতে পারিনি। আজ ধরতে পেরে চমকে উঠেছি।রূপা বলল, তার নাম কি রূপা ব্যানার্জি? রাশেদ অবাক হয়ে বলল, কীভাবে বললেন?

রূপা বলল, আমি থট রিডিং জানি না। প্রথম দিনই তার কথা আপনি বলেছিলেন। মনে হয় ভুলে গেছেন।হ্যাঁ, মনে পড়েছে আমি বলেছিলাম।রূপা বলল, যার বাসায় যাচ্ছেন রুনা যার নাম, তিনি কে?

রাশেদ বলল, আমার স্ত্রী।ছাদ অন্ধকার। আলো থাকলে দেখা যেত রূপা চমকে উঠেছে। তার মুখ হঠাৎ রক্তশূন্য হয়েছে। যদিও তার কোনো কারণ নেই। রূপা এই মানুষটার প্রেমে পড়ে নি। তার তিনটা স্ত্রী থাকলেও রূপার কিছু যায় আসে না। রূপা বলল, খাবার কি দিতে বলব? বলুন।

আমি কিন্তু আপনার সঙ্গে খেতে বসব না। বাবার জন্য অপেক্ষা করব। অতিথি একা খাবে এটা অভদ্রতা, আগেই ক্ষমা চাচ্ছি।রাশেদ বলল, আমার কোনো অসুবিধা নেই। আমি মলিনার সঙ্গে গল্প করতে করতে খাব।রাশেদ বলল, আপনার কাছে পরোটা খেতে চেয়েছিলাম। এখন ত খেতে ইচ্ছা করছে, ভাত কি আছে? অবশ্যই আছে। ভাত খেতে ইচ্ছা করলে ভাত খাবেন।আমার বাবার প্রিয় খাবার ছিল ধোঁয়া ওঠা ভাতের উপর দুই চামচ ঘি। তার সঙ্গে ভাজা শুকনা মরিচ। আপনাদের রান্নাঘরে কি ঘি আছে?

আছে। খুব ভাল পাবনার ঘি আছে। আসুন খেতে বসুন। যেভাবে খাবার গল্প করছেন মনে হয় আপনার খুব ক্ষিধা পেয়েছে। কোক আনিয়ে রেখেছি। আপনারা যারা আমেরিকায় বাস করেন তারা খাওয়া শেষ করেই সোড় খেতে চান। ভাল কথা, আপনারা কোককে সোডা কেন বলেন?

রূপা! আমি জানি না।রূপা আবারও চমকালো। মানুষটা এত সহজে তাকে রূপা ডাকল কেন? রূপা ব্যানার্জির কারণে? ডেকে ডেকে অভ্যাস? বাড়ির নাম মঞ্জুরী।চারতলা বাড়ি। গেটে বাগান বিলাসের ঝাড়। গেটের দারোয়ান রাশেদকে ঢুকতে দিচ্ছে না। দারোয়ান রাশেদের কথা জানিয়ে ইন্টারকম করেছিল। বাড়ির মালিক দেওয়ান সাহেব বলেছেন, গেস্টকে বল সকালে আসতে। আমার শরীর ভাল না, জ্বর।

রাশেদ বলল, উনার সঙ্গে কথা না বললেও চলবে। তার মেয়ে রুনার সঙ্গে কথা বলব।দারোয়ান বলল, আপনি অপেক্ষা করেন আপার সাথে কথা বলে দেখি।রাশেদ অপেক্ষা করছে। রাতের আকাশে মেঘ। ঘন ঘন বিজলি চমকাচ্ছে। আজ বৃষ্টি নামলে ভেজা যাবে না। আবার হাসপাতাল। আবার দুঃস্বপ্ন।গেট খুলছে। দারোয়ান বলল, গাড়ি ভেতরে ঢুকবে না।রাশেদ বলল, আমি যে ঢুকতে পারছি এতেই খুশি।

রাশেদ বসার ঘরে অপেক্ষা করছে। ঘরের সাজসজ্জা খানিকটা উগ্র। একটার সঙ্গে আরেকটার মিল নেই। পাথরের অর্ধ নগ্ন নারীমূর্তির পাশে থালাভর্তি প্রাস্টিকের ফলমূল। দেয়ালে কামরুল হাসানের পেইনটিং আছে। অতি কুৎসিত ফ্রেমে চমৎকার একটা ছবি। সমুদ্রে পানি হাঁটু পর্যন্ত ড়ুবানো একটা মেয়ের ছবি আছে। এই মেয়েটা রুনা। রুনার অনেকগুলি ছবি রাশেদের কাছে। মেয়েটার মুখ শান্ত। চোখে স্বপ্ন আছে।রুনার বাবা দেওয়ান সাহেব ঢুকলেন। রাশেদ উঠে দাঁড়াল।তুমি রাশেদ? জী।

ছবিতে দেখেছি। হকির চেহারা এবং সামনা-সামনি চেহারা এক না। বসো।রাশেদ বসলো। তার কাছে দৈওয়ান সাহেবকে মোটেই অসুস্থ মনে হচ্ছে। তবে ভয়ংকর বিরক্ত মনে হচ্ছে। দেওয়ান সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, আমরা একটা ভুল করে ফেলেছি কাটা আর বাড়াতে চাচ্ছি না। তোমাকে আগেই জানানো হয়েছে। তারপরেও কেন এসেছ বুঝলাম না। দ্য গেম ইজ ওভার।

রাশেদ বলল, আমি রুনার সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলে চলে যেতাম।তার সঙ্গে কি কথা বলবে। সে ভয়ংকর আপসেট। টেলিফোনে বিয়েতে সে শুরু থেকে রাজি ছিল না। আমিও ছিলাম না। কু-পরামর্শে কাজটা করেছি। ছেলে রাজপুত্র, PhD, ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। What a shame.

রাশেদ চুপ করে আছে। ভদ্রলোক প্রচণ্ড রেগেছেন। হাতের সিগারেটে দুটা টান দিয়ে ফেলে দিয়ে নতুন সিগারেট ধরিয়েছেন। ভদ্রলোকের রাগ কমার আগে কথা বলা অর্থহীন।রাশেদ শোন, তুমি রসগোল্লা পান্তুয়া যাই হও না কেন, তুমি মূলত স্ট্রিট বয়। ভুল বললাম, তার চেয়েও খারাপ। তোমাকে ডাস্টবিনে পাওয়া গেছে। সারারাত ডাস্টবিনে পড়েছিলে। তোমার ফুসফুস এই কারণেই নষ্ট।

রাশেদ বলল, কথাগুলি আপনাকে যে জানিয়েছে সে ভুল জানিয়েছে। এটা আপনাকে আগেও বলেছি, এখনো বলছি।তুমি কি অস্বীকার কর যে তোমার লাংস নষ্ট না? লাংস ক্ষতিগ্রস্ত এটা ঠিক আছে। পরের কথাগুলি ঠিক না।রূপা ব্যানার্জি নামে যে মেয়েটার সঙ্গে তুমি লিভ টুগেদার করতে এটাও ভুল? জী ভুল।বাঙালি মেয়ে না? হ্যাঁ, কোলকাতার মেয়ে।

একটা বাঙালি মেয়ে জেনেশুনে এত বড় অপবাদ মাথায় নিয়ে বলবে সে তোমার সঙ্গে লিভ টুগেদার করত এবং তোমাদের একটা মেয়ে আছে তিন বছর বয়স। তার নাম নিহি।রাশেদ বলল, আপনি অত্যন্ত উত্তেজিত অবস্থায় আছেন। তিন মিনিটে চারটা সিগারেট ধরিয়েছেন। একজন উত্তেজিত মানুষকে কিছু বোঝানো যায় না। আপনাকে বোঝাতেও চাচ্ছি না।

দেওয়ান সাহেব বললেন, আমার কথা শেষ হয় নি। কথা শেষ হোক তারপর ফড়ফড় করবে।অবশ্যই। কথা শেষ করুন।টেলিফোনের বিয়ে কোনো বিয়ে না। এর আইনগত কোনো ভেলিডিটি নেই। আমরা এই বিয়ে স্বীকার করছি না।রাশেদ বলল, কোনো সমস্যা নেই। আমি বিয়ে বজায় রাখার চেষ্টা করতে আসি নি।তাহলে কি জন্যে এসেছ?

রুনা আমাকে জঘন্য একজন মানুষ ভাবছে এটাই খারাপ লাগছে। আমি নিশ্চিত সে চমৎকার কোনো ছেলেকে বিয়ে করে সুখে জীবন কাটাবে। তবে কখনো কখনো তার মনে হবে টেলিফোনে বিয়ে করে কি ভুলই না করেছিলাম। প্রথম স্বামী ছিল ভয়ংকর। এটা তাকে কষ্ট দিবে। আমি তাকে কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম। সে যদি জানে তার প্রথম স্বামী খারাপ মানুষ ছিলেন তাহলে তার কষ্ট কম হবে।

প্রথম স্বামী, প্রথম স্বামী করছ কেন? তোমার সঙ্গে কি রুনার বিয়ে হয়েছে? টেলিফোনে বকর বকর করা মানে বিয়ে না। তোমরা এখনো চাক্ষুষ কেউ কাউকে দেখনি। যাই হোক আমার কথা শেষ। এখন বিদেয় হও। ফর ইওর ইনফরমেশন, এই মাসের আঠারো তারিখ আমার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। জামাই লেফটেনেন্ট কর্নেল।রাশেদ বলল, আমি কি তাকে বিয়ে উপলক্ষে একটা গিফট দিতে পারি।তুমি গিফট দেবে কেন? তুমি কে?

রুনার কাছে আমি একবার জানতে চেয়েছিলাম দেশে যখন আসব তখন তোমার জন্যে কি আনব? সে বলেছিল একটা লাই ডিটেক্টর আনতে। তার এক বান্ধবীর আছে। সবাই এটা নিয়ে মজা করে। আমি একটা লাই ডিটেক্টর তার জন্যে এনেছি। খেলনা ভার্সান। গাড়িতে আছে। নামিয়ে দিয়ে যাই?

তুমি লাই ডিটেক্টর নিয়ে বিদায় হও। এই ডিটেক্টরে নিজের মিথ্যাগুলি ধরার চেষ্টা কর। ভুল ইনফরমেশন দিয়ে বিয়ে করার জন্যে আমি যে তোমাকে পুলিশে দিতে পারি এটা জান? পুলিশের এডিশনাল আইজি রুনার বড় মামা।রাশেদ উঠে দাঁড়াল। বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। সে হোটেলের সন্ধানে বের হবে, না চায়ের দোকানে রাতের জন্যে আশ্রয় নেবে তা বুঝতে পারছে না। আচ্ছা গাড়ি চলতে শুরু করুক তারপর চিন্তা করা যাবে। কমলাপুর রেল স্টেশনে গেলে কেমন হয়?

রাতে যদি কোনো ট্রেন পাওয়া যায় সেই ট্রেনে করে নেত্রকোনা চলে যাওয়া। স্টেশনের নাম আঠারোবাড়ি। সে গ্রামের বাড়িতে উপস্থিত হল, আর একটা মিরাকল ঘটল। জগতে মিরাকল যে একেবারেই ঘটে না, তাও না। মাঝে মাঝে ঘটে। প্লেন ক্রাশ হয়েছে। প্লেনের দুশ আশিজন যাত্রীর সবাই মারা গেছে। একজন বেঁচে আছে, সতুর বছরের বৃদ্ধ। ব্যাংকের ক্যাশিয়ার। সংসারে কেউ নেই। বৃদ্ধ নিবাসে থাকে। মেয়েকে দেখতে গিয়েছিল। ফেরার পথে দুর্ঘটনা।

বৃদ্ধ ব্যাংকারের জীবনে যদি মিরাকল ঘটতে পারে তার জীবনেও ঘটতে পারে। সে বাড়িতে ঢুকে দেখল কুয়াতলায় এক বৃদ্ধ বসে আছেন। বৃদ্ধকে দেখে রাশেদ এগিয়ে গেল। স্বাভাবিক গলায় বলল, বাবা কেমন আছ? বৃদ্ধ বলল, তুই রাশেদ? কেমন আছিস? তোর মা গেল কই? মরে গেছে না-কি? রূপাদের ড্রাইভার বলল, স্যার এখন কোথায় যাবেন?

রাশেদ বলল, প্রথম একটা পরিচিত চায়ের দোকানে যাব। এক কাপ চা খাব। তারপর রাস্তায় খানিকক্ষণ ঘুরব। ঘুরতে ঘুরতে চিন্তা করব কোথায় যাওয়া যায়। তোমাদের বাড়িতে ফিরে যেতে পারি আবার দেশের বাড়িতেও চলে যেতে পারি।হারুন বাড়িতে ফিরলেন রাত এগারোটায়। রূপা দরজা খুলে দিল। হারুন বললেন, টক দৈ এনেছি। শরবত বানিয়ে দে।

রাশেদ সাহেব চলে গেছেন বাবা। তুমি খেতে চাইলে তোমার জন্যে বানিয়ে দেই।আমাকে কিছু না বলে চলে গেল। রূপা বলল, তুমি ছিলে না। তুমি কখন ফিরবে তাও বলে যাও নি। টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। খেতে এসো।আমি খাব না।বাবা! আমি তোমার জনো না খেয়ে অপেক্ষা করছি।হারুন বললেন, you go to hell. বলেই হাতের টক দৈয়ের হাঁড়ি ছুড়ে ফেললেন।

বোম ফাটার মতো হাঁড়ি ভাঙার আওয়াজ হল। মলিনা রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে হারুনের রুদ্রমূর্তি দেখে ছুটে রান্নাঘরে ঢুকে গেল।রূপা রাতে ঘুমুতে গেল না খেয়ে। অভুক্ত অবস্থায় ঘুম আসে না। বিছানায় শোয়ামাত্র রূপার চোখ বন্ধ হয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গেই টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভাঙল। শায়লা টেলিফোন করেছেন।তোর বাবা কি কাণ্ড করেছে জানিস।বাবা অনেক কাণ্ডই করে। কোনটার কথা বলছ? আজ রাতে আমার এখানে এসেছিল তুই জানিস? না।

আমার আর টগরের বাবার আজ একটা বিশেষ দিন। ম্যারেজ ডে। আমরা ঠিক করেছি দুজনে ঘরোয়াভাবে দিনটা পালন করব। রাতে ঘরেই ক্যান্ডেল লাইট ডিনার। এ উপলক্ষে টগরের বাবা সাত হাজার পাঁচশ টাকা দিয়ে একটা শ্যাম্পেনের বোতল এনেছে ঢাকা ক্লাব থেকে। সব জলে গেছে।শ্যাম্পেন খেতে পার নি? কীভাবে খাব। তোর বাবা উপস্থিত। তাকে ভদ্রতা করে টগরের বাবা বলেছে, আসুন আমাদের সঙ্গে ডিনার করুন। সে সঙ্গে সঙ্গে বসে গেছে। তার সামনে তো আর আমরা ম্যারেজ ডে সেলিব্রেট করতে পারি না।

করলে অসুবিধা কি? বাবা তোমার আনন্দ শেয়ার করত। অন্যের আনন্দ বাবার মতো কেউ শেয়ার করতে পারে না। তোমাদের ডিনারের মেনু কি ছিল? খাবার এসেছে ঢাকা ক্লাব থেকে। চিকেন স্টেক। দেশি কায়দায় প্রণ। বিফ আইটেম ছিল। ঘটনা শোন, চিকেন স্টেক এসেছে দুটা। মানুষ তিনজন। এখন আমি যদি আমারটা দিয়ে দেই টগরের বাবা অন্যকিছু ভেবে বসতে পারে। সমস্যাটা বুঝতে পেরেছিস? সমস্যার সমাধান কীভাবে হল?

টগরের বাবা সমাধান করল। সে বলল, আমাকে চিকেন স্টেক কেন দিয়েছ? আমি ব্রয়লার চিকেন খাই না। সঙ্গে সঙ্গে বেকুবটা বলল, আমাকে দিয়ে দিন। ব্রয়লার চিকেনে আমার সমস্যা নেই।রূপা বলল, মা শোন আমি জানি বাবা বোকা। কিন্তু তোমার মুখ থেকে বেকুব শব্দটা শুনে খারাপ লাগছে। আমি বাবাকে সামলাব, সে যেন আর কখনো তোমাকে বিরক্ত না করে। মা আমি টেলিফোন রাখছি। আমার মনটা ভাল না।মন ভাল না কেন?

রূপা জবাব না দিয়ে টেলিফোন রাখল। বাবা খেয়ে এসেছে কাজেই তার না খেয়ে রাত পার করায় সমস্যা কিছু নেই। সে গলা উঁচিয়ে ডাকল, মদিনা? জেগে আছ? জী আফা।খাবার গরম কর। আমি খাব। মলিনাকে ডেকে তুলবে না। সে বকবক করে মাথা ধরিয়ে দিবে। পরোটা ভেজে দিতে পারবে না? পারব।আমি শুয়ে থাকব। সবকিছু রেডি করে আমাকে খবর দিবে।

যদি দেখ আমি ঘুমিয়ে পড়েছি তাহলে আর আমাকে ডাকবে না।রূপা খেতে বসেছে। পাশেই মদিনা দাঁড়িয়ে আছে।আগ্রহ নিয়ে রূপার খাওয়া দেখছে। সে হঠাৎ রূপাকে চমকে দিয়ে হাসি মুখে বলল, ভূতটা চইলা গেছে।রূপা বলল, ভাল খবর। চলে গেল কেন? উনারে দেইখা খুবই রাগ হইছে, তারপর চইল্যা গেছে।রাশেদ সাহেবকে দেখে? রূপা বলল, ভয় পেয়ে চলে গেল কেন? উনি কি ভূতের ওঝা?

মদিনা জবাব দিল না। রূপা নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করল। হাত ধুতে ধুতে বলল, তুমি বলেছিলে উনি হাসপাতালে। কাকতালীয়ভাবে তাকে হাসপাতালে পাওয়া গেল। এ থেকে প্রমাণিত হয় না যে তুমি ভবিষ্যৎ বলতে পারি। আমার কাছে অনেকবার মনে হয়েছে আজ সুলতান চাচা আসবেন। তিনি এসেছেন তাতে প্রমাণিত হয় না যে আমি ভবিষ্যৎ বলতে পারি। বুঝেছ? তুমি কি বলতে পারবে রাশেদ সাহেব এখন কোথায় আছেন? জী।আমি হঠাৎ হঠাৎ বলতে পারি, সব সময় পারি না। একটা মেয়ে আইসা আমারে যখন বলে তখন বলতে পারি। মেয়েটা পানিতে থাকে।জলকন্যা?

জানি না আফা।শোন মদিনা। যারা মৃগী রোগী তাদের যখন এটাক হয় অর্থাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে, ফিটের মতো হয় তখন তারা অনেক কিছু দেখে। আমার নিজের ধারণা তোমার এই রোগ আছে। আমাকে মনে করিয়ে দিবে কাল তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।জী আচ্ছা।কাল তোমাকে স্কুলেও ভর্তি করিয়ে দেব।আফা মেয়েটার শইল নাই। খালি মাথা। মাথা ভর্তি চুল। চোখের মণি অনেক বড়। শাদা অংশ নাই বললেই চলে।কোন মেয়ে?

যে আমারে ঘটনা বলে।রূপা বলল, কাল তোমাকে যখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব তখন তাকে এইসব বলবে। আমাকে এইসব বলার দরকার নাই। টিভিটা ছাড়। আমার ঘুম কেটে গেছে। কিছুক্ষণ টিভি দেখব।ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে মঙ্গলগ্রহের পানির সম্ভাবনা নিয়ে ছবি দেখাচ্ছে। রূপা আগ্রহ নিয়ে দেখছে। কম্পিউটার গ্রাফিক্সের তৈরি করা মঙ্গলের কিছু কাল্পনিক ছবিও দেখালো। লাল পাহাড়ের দেশে দুটি চাঁদ উঠেছে। জোছনার কি অপূর্ব খেলা। রূপা ঠিক করে ফেলেছে তার পরবর্তী ছবির নাম মঙ্গলগ্রহে জোছনা।

ডাক্তার কথা বলছেন। শ্রোতা রূপা। মদিনাকে পাশের কামরায় রাখা হয়েছে। ডাক্তার মধ্যবয়স্ক। সাইকিয়াট্রিস্টরা পেশাগত কারণে প্রচুর কথা বলেন। ইনি তার ব্যতিক্রম না। এক নাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছেন। রূপা মন দিয়ে শুনছে। ডাক্তার ভদ্রলোক কথা বলে আরাম পাচ্ছেন তা বুঝা যাচ্ছে।

মদিনা মেয়েটির সমস্যা স্নায়ুবিক। নিউরো ট্রান্সমিটার বিকার বলা যেতে পারে। তার রক্তে হিমোগ্লোবিন আশঙ্কাজনকভাবে কম। হিমোগ্লোবিনের প্রধান কাজ শরীরের অক্সিজেন সরবরাহ করা। সেই অক্সিজেনের ৭০ ভাগের বেশি প্রয়োজন হয় মস্তিষ্কের। মস্তিষ্ক যখন অক্সিজেন কম পায় তখন সে অদ্ভুত সব জিনিস দেখে। অদ্ভুত শব্দ শুনে।

যারা এভারেস্টের চূড়ায় উঠেন তারা অক্সিজেনের বোতল নিয়ে উঠেন। যখন বোতলের অক্সিজেন শেষ হয়ে যায় তখন শুরু হয় অক্সিজেন ডিপ্রাইভেশনজনিত হেলুসিনেশন। প্রায় সবাই বলেছেন ২৮ হাজার ফুট উচ্চতায় তারা উড়ন্ত মানুষ দেখেছেন। আশেপাশে অদ্ভুত জন্তু-জানোয়ার দেখেছেন যারা মানুষের ভাষায় কথা বলে। আপনি কি এভারেস্ট অভিযান নিয়ে লেখা–Into thin air বইটা পড়েছেন? লেখকের নাম, Jon Krakauer.

রূপা বলল, না।বইটিতে হেলুসিনেশনের কথা বলা আছে। এভারেস্ট অভিযাত্রীদের ২৮ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠার পর যা হয় মদিনা মেয়েটিরও তাই হচ্ছে। সে একবার পানিতে ড়ুবে গেল। মস্তিষ্কে অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হল। হেলুসিনেশনের শুরু। সে দেখল একটা মেয়ের মুখ।তারপর যতবার অক্সিজেন ঘাটতি হল ততবারই সে এই মেয়েটিকে দেখল।মাসের কিছুদিন মেয়েদের শরীরে রক্ত কমে যায়। আমি নিশ্চিত মদিনা ঐ সময়েই ভবিষ্যৎ দেখার কথা বলে।ডাক্তার দম নেবার জন্যে থামলেন। রূপা বলল, আমাদের করণীয় কি?

ডাক্তার বললেন, আপনাদের কিছুই করণীয় নেই। আমি ওষুধ দিচ্ছি। ভিটামিন দিচ্ছি। আয়রণ ট্যাবলেট দিচ্ছি। আপনারা মদিনার কথার কোনো রকম গুরুত্ব দেবেন না। তার কথায় গুরুত্ব দেবার অর্থ তাকে উৎসাহিত করা। যত বেশি সে উৎসাহিত হবে এই ধরনের আজগুবি কথা সে তত বেশি বলবে। তাকে কড়া ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি। মেয়েটার ভাল ঘুম দরকার। সে বলেছে রাতে তার ঘুম হয় না। মেয়েটার ব্রেইনের একটা সিটি স্ক্যান কি করাবেন? ব্রেইনে কোনো অস্বাভাবিকতা থাকলে এতে ধরা পড়বে। ব্রেইন টিউমারেও এমন সমস্যা হয়। টিউমার থাকলে সিটি স্ক্যানে ধরা পড়বে।আপনি সিটি স্ক্যান করাতে বললে করাব।বেশ খরচ পড়বে। একটা কাজের মেয়ের পেছনে এত টাকা খরচ করবেন?

হ্যাঁ করব।তাহলে সিটি স্ক্যান করান। এর রিপোর্ট আমাকে দেখাবেন না। দেখাবেন একজন নিউরোলজিস্টকে। আমি তার নাম লিখে দিচ্ছি। ওষুধগুলি আগেই শুরু না করে সিটিস্ক্যানের রিপোর্ট দেখার পর শুরু করুন।রূপা উঠতে যাচ্ছিল, ডাক্তার বলল, চা খান। চা খেয়ে তারপর যাবেন। আপনার সঙ্গে কথা বলে আরাম পেয়েছি। বেশির ভাগ সময় আমি কথা বলে আরাম পাই না। আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞেস করুন।

রোগ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার ভাল লাগে।রূপা বলল, কিছু কিছু মানুষ আছে যারা দাবি করে যে ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। তাদের সবারই কি হেলুসিনেশন সমস্যা? অবশ্যই।তাদের বলা ভবিষ্যৎ যদি মিলে যায় তার ব্যাখ্যা কি? দুএকটা হয়ত মিলে। কাকতালীয়ভাবে মিলে। যেটা মিলে যায় সেটাই আমরা মনে রাখি। যেগুলি মিলে না সেগুলি মনে রাখি না। মৃগী রোগ কি নিশ্চয়ই জানেন? রূপা বলল, জানি।

 

Read more

রূপা পর্ব – ৯ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *