শুভ্র গেছে বনে পর্ব – ১০ হুমায়ূন আহমেদ

শুভ্র গেছে বনে পর্ব – ১০

মনে করো প্ৰচণ্ড গরম পড়েছে। লু হওয়ার মতো বইছে। ধুলি উড়ছে। গা দিয়ে স্রোতের মতো ঘাম বের হচ্ছে। শরীর জ্বলে যাচ্ছে। তারপর হঠাৎ একসময় আকাশের এককোণে কালো মেঘ দেখা গেল। সবার মধ্যে সে কী উত্তেজনা! আসছে, বৃষ্টি আসছে। যখন বৃষ্টি নামে কী যে শান্তি! প্রথমদিনের বৃষ্টির আনন্দে আমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। চরের ছেলেমেয়েরা (বলতে ভুলে গেছি, আমি চরে বাস করি) একসময় কাদায় গড়াগড়ি করা শুরু করল। আমিও তাই করলাম। গাভর্তি কাদা নিয়ে নদীতে মহিষের মতো শরীর ড়ুবিয়ে বসে রইলাম। কী শান্তি! কী শান্তি! মা! তুমি কি উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের Lord of the Fies উপন্যাসটা পড়েছ? মনে হয় পড় নি। বাবা পড়েছেন। একদল শিশু নির্জন দ্বীপে উপস্থিত হয়। একে একে তাদের চরিত্র প্রকাশিত হতে থাকে।

আমি খুব কাছ থেকে গোল্ডিং সাহেবের উপন্যাস দেখছি। ফিজিক্সে ল্যাবরেটরি আছে। সাহিত্যে কোনো ল্যাবরেটরি নেই। এই প্রথম আমি সাহিত্যের ল্যাবরেটরি দেখছি এবং মজা পাচ্ছি।মানুষের চরিত্রের অন্ধকার সবসময় প্রকাশিত হয় না। হঠাৎ হঠাৎ প্রকাশিত হয়। তার জন্যে বিশেষ পরিস্থিতির প্রয়োজন হয়। চর হচ্ছে সেই পরিস্থিতি। আমার কাছে হচ্ছে, আমি একটা virtual জগতে ঢুকে গেছি। কিছুই না জেনে আমি এই জগতের একজন observer. কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় observer অতি গুরুত্বপূর্ণ। রিয়েলিটি অবজার্ভারনির্ভর। আমি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।

অনেক জটিল জটিল কথা লিখে ফেললাম। এখন হালকা কথা। আমাদের দ্বীপের মানুষের খুব মন খারাপ। কেন জানো? কারণ দ্বীপে কোনো পাগল নেই। একজন উন্মাদ না-কি তার হতভাগ্যের কারণে অন্যের ভাগ্য নিয়ে আসে। আমরা সবাই একজন পাগলের জন্যে অপেক্ষা করছি। বাইরে থেকে পাগল আনলেও চলে, তবে নিজেদের পাগল থাকলে সবচেয়ে ভালো হয়।মা! এখন গানবাজনার আসর বসেছে। যে গান করছে তার নাম কল্লাকাটা। এই অদ্ভুত নামের কারণ হচ্ছে সে কথায় কথায় মানুষের কল্লা কেটে ফেলতে চায়। কল্লাকাটার গলা সুন্দর। শুনেছি আগে অনেক সুন্দর ছিল। প্রচুর গাজা খাবার কারণে গলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কল্লাকাটা শুধু যে গান করে তা না, সে আবার গীতিকারও। নিজেই গান লিখে, নিজেই সুর দেয়। আমাকে নিয়ে সে বেশ কয়েকটা গান লিখেছে। তার একটার কথা এরকম—

ধলা মিয়া করবে বিয়া

নয়া পাড়ায় গিয়া

ঘাট থাইকা কইন্যা তুললাম

মুন্সিগঞ্জে গিয়া।

মুন্সিগঞ্জের কইন্যা সুন্দর

সুন্দর তাহার আঁখি

তারে দেখলে মন উদাস

যেন কোকিল পাখি।

ধলা মিয়া বড়ই ধলা

কন্যা হইলেন কালো

ধলা-কালা মিলনেতে

জগৎ হইবে আলো…

বিশাল গান। পুরোটা মনে নেই; ধলা মিয়া আমার নাম। সবাই আমাকে ধলা মিয়া ডাকে। কেউ কেউ ডাকে মাথা ছিলা ধলা মিয়া। মাথা কামিয়েছি তো-এইজন্যে।মা, তোমাকে চিঠিটা পাঠানোর বুদ্ধি বের করেছি। তোমার বাড়ির ঠিকানা ভুলে গেলেও যুথীর ঠিকানা মনে আছে; এবং খাতায় লেখাও আছে।মা, আমার জন্যে ব্যস্ত হয়ে না। আমি একটা experiment শুরু করেছি। তার ফলাফল দেখতে চাই।কয়েকদিন আগে স্বপ্নে দেখলাম। M.Sc. পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। আমি থার্ড ক্লাস পেয়েছি।খারাপ হলো কেন? চেয়ারম্যান স্যার বললেন, শেকসপিয়ার থেকে চারটা প্রশ্ন এসেছিল। তুমি সবকটা ভুল আনসার করেছি।

আমি বললাম, স্যার, আমি তো ফিজিক্সের ছাত্র।চেয়ারম্যান স্যার বললেন, তুমি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্ৰ। তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, যাও পাগলাগারদে ভর্তি হয়ে যাও।স্যারের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্ন বদলে গেল। আমি দেখলাম, আমি একটা পাগলাগারদে বসে আছি। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন পাগল আছে। এবং এদের সঙ্গে আমার অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আমি এই পাগলদের একজনকে ভুলিয়ে ভালিয়ে চরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছি। ভয়ঙ্করটাইপ একজন মোটামুটি রাজি হয়েছে।মা, ঘুম পাচ্ছে। আবার ক্ষিধেও লেগেছে। আমি এখন খিচুড়ি রান্না করব। কারণ মর্জিনা তার বাবাকে নিয়ে ব্যস্ত। তার বাবার শরীর খুবই খারাপ করেছে। যেভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে আজ রাতেই মারা যায় কি না কে জানে।

ইতি

তোমার শুভ্র

পুনশ্চ-১ : মর্জিনার কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। চিৎকার করে কাঁদছে। মনে হয় তার বাবা মারা গেছেন; আমি খোঁজ নিয়ে আসছি।

পুনশ্চ-২ : না, এখনো বেঁচে আছেন। মাঝখানে অজ্ঞানের মতো হয়ে গিয়েছিলেন বলে ভয় পেয়ে মর্জিনা কাঁদছিল।

চিঠি শেষ করে শুভ্র খিচুড়ি বসাল। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হালকা বাতাস দিচ্ছে। বাতাস আরেকটু বাড়লে উঠানের চুলা ঘরে চলে যেতে হবে।মর্জিনা এসে পাশে বসল। শুভ্র বলল, তোমার বাবার অবস্থা কী? মর্জিনা হাই তুলতে তুলতে বলল, বাঁচব না।শুভ্র বলল, সামান্য জ্বরে মানুষ মারা যায়? মর্জিনা বলল, জ্বরে কেউ মরে না, মৃত্যুরোগে মরণ হয়। ঘরের ভিতরে আজরাইল ঢুইক্যা পড়ছে।শুভ্র বলল, কী বল এইসব? হামাগুড়ি দিয়া ঢুকছে। পরিষ্কার দেখছি। বাপজানের দিকে চাইয়া হাসছে। তারপরে চৌকির নিচে চইলা গেছে। এখন সে অপেক্ষায় আছে।শুভ্র বলল, তোমার মাথা সামান্য খারাপ আছে মর্জিনা।মর্জিনা বলল, আপনের সঙ্গে যে ভাইবোন পাতাইছি, বাপজানের মৃত্যুর পর সব শেষ। তখন আপনে আমার আর ভাই না।আমি কে? আপনি পুরুষমানুষ। আর কিছু না।এর মানে কী?

এর মানে আপনে জানলে জানেন, না জানলে নাই। খিচুড়ি নামান, খিদা লাগছে।মাত্ৰ বসিয়েছি, এখনো চাল ফুটে নাই।ভাইজান, একটা গল্প করেন। গল্প শুনি।কী গল্প শুনতে চাও? পীরিতের গল্প। ভাব-ভালোবাসার গল্প।ভাব-ভালোবাসার গল্প তো সেইভাবে আমি জানি না।আপনে কোনোদিন ভাব-ভালোবাসা করেন নাই? না।মর্জিনা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, যে-কোনো একটা গল্প বলেন।ভারচুয়াল রিয়েলিটির গল্প শুনবে? সেইটা আবার কী? শুভ্র বলল, বিষয়টা যথেষ্টই জটিল, আমি চেষ্টা করব সহজভাবে বোঝাতে। আমার ধারণা তুমি মন দিয়ে শুনলেই বুঝবে। কারণ তুমি অতি বুদ্ধিমতী একজন মেয়ে।

শুভ্র গল্প শুরু করেছে। মর্জিনা মন দিয়েই শুনছে, তবে তার দৃষ্টি শুভ্রর দিকে না। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বিজলি চমকাচ্ছে, সে তাই দেখছে। বিদ্যুৎচমকের সময় আকাশে নানান নকশা তৈরি হয়। এইসব নকশায় অনেক ইশারা থাকে। ইশারায় আল্লাহপাক অনেক কিছু বলেন। আক্কেলমন্দ মানুষরা সেটা ধরতে পারে।শুভ্র বলছে, প্রথমেই একটা বিষয় বুঝতে হবে–তা হলো বাস্তবতা, ইংরেজিতে যাকে বলে Reality। আমি উঠানে বসে খিচুড়ি রান্না করছি। তুমি সামনে বসে আছ। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তোমার এবং আমার কাছে এটা রিয়েলিটি। তুমি যদি আগুনে হাত দাও, হাত পুড়ে যাবে। এটাও রিয়েলিটির অংশ। আবার তুমি যখন স্বপ্ন দেখ, সেটাও রিয়েলিটি। স্বপ্নে আগুনে হাত দিলে ব্যথার অনুভূতি হবে।

এখন কথা হচ্ছে, দুটি রিয়েলিটির কোনটি সত্য? না-কি এই দুই রিয়েলিটির বাইরে কিছু আছে? আমরা বড় কোনো রিয়েলিটির অংশ? এমন কি হতে পারে যে, আমরা কম্পিউটার প্রোগ্রাম ছাড়া কিছুই না? একজন মাস্টার প্রোগ্রামার আমাদের তৈরি করেছেন। আমাদের জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দুঃখ দিচ্ছেন। আমরা বিষয়টি বাস্তব ভেবে আনন্দ পাচ্ছি। আসলে পুরোটাই একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম। প্রোগ্রামার আমাদের জন্যে ভারচুয়াল রিয়েলিটি তৈরি করেছেন।

মর্জিনা বলল, বকবকানি বন্ধ করেন তো ভাইজান। ভাত সিদ্ধ হইছে কি না দেখেন। হওয়ার কথা।মর্জিনা উঠে গেল। দুটা প্লেট নিয়ে এল। ঘিয়ের কৌটা আনল। চায়ের চামচে দুচামচ ঘি খিচুড়িতে ছেড়ে দিয়ে প্লেট ধুতে বসল।তারা খাওয়া শুরু করামাত্র বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। মর্জিনা বলল, যেখানে বইসা আছেন বইসা থাকেন। খাওয়ার মাঝখানে জায়গা বদল করতে নাই। জায়গা বদল করলে রিজিক কমে।বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে খাব?

হুঁ।তোমার সব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা।মর্জিনা বলল, আপনার নিজের কথাও অদ্ভুত। অদ্ভুতে অদ্ভুতে কাটাকাটি।ভালো বৃষ্টি শুরু হয়েছে। থালার ওপর বৃষ্টির পানি পড়ছে। মর্জিনা নির্বিকার। সে মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে হা করে বৃষ্টির পানিও খাচ্ছে। শুভ্র খাওয়া বন্ধ করে মর্জিনার কাণ্ড দেখছে।ঘরের ভেতর থেকে ইয়াকুবের গলা শোনা গেল। ভীত গলা।ও মার্জিনা! মজিনা কই? মর্জিনা!মর্জিনা বলল, আমি উঠানে ভাত খাই।

ইয়াকুব বলল, তুফানে তো বাড়িঘর উড়ায় নিয়া যাইতেছে।মর্জিনা বলল, তুফানের বংশও নাই। বৃষ্টি পড়তাছে। চুপ কইরা শুইয়া থাকেন, আসতেছি।এক্ষণ অায়।খাওয়া শেষ কইরা আসব।বাড়িঘর সব তো উড়ায় নিয়া যাইতেছে। শেষে ঘরচাপা পইড়া মরব। তাড়াতাড়ি আয়, চৌকির নিচে বইসা থাকি।মর্জিনা বলল, আপনের ইচ্ছা করলে আপনে চৌকির নিচে বসেন।মর্জিনার কথা শেষ হবার আগেই খুব কাছে কোথাও বজ্ৰপাত হলো। কঠিন নীল আলোয় মর্জিনার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। মর্জিনা বলল, কী ভয়ঙ্কর!শুভ্র বলল, বিজলির এক ঝলকানিতে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ থাকে তুমি জানতে চাও?

মর্জিনা বলল, না।সে খাওয়া শেষ করে ঘরে ঢুকে দেখে, ইয়াকুব চৌকির নিচে। তার বসার ভঙ্গি হিজ মাস্টার্স ভয়েসের কুকুরের মতো। শুধু মুখ হা হয়ে আছে। তার শরীরে প্ৰাণ নেই।মর্জিনা বলল, বাবা, চৌকির নিচ, থাইকা বাইর হন।কোনো উত্তর এল না। মৃত মানুষরা জীবিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না। তাদের আলাদা সমাজ।অনেকদিন পর যুথী এসেছে নীপাদের বাড়িতে। নীপা তাকে সরাসরি শোবার ঘরে ডাকল। নীপার ঘুম পুরোপুরি কাটে নি। সে বাসিমুখে এককাপ ব্ল্যাক কফি খেয়েছে। এখন খাচ্ছে গ্ৰীন টি। এতেও ঘুম যাচ্ছে না। নীপার গায়ে পাতলা চাঁদর; চাঁদরের ভেতর দিয়ে তার নগ্ন শরীর দেখা যাচ্ছে।নীপা বলল, কাল রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। ভূতের ছবি দেখেছি। বাতি জ্বালিয়ে আমি ঘুমুতে পারি না। ভয়ে নিভাতেও পারি না। ঘুম এসেছে ভোর পাঁচটায়। এই কারণে এখন পর্যন্ত ঘুমাচ্ছি। যুথী, কয়টা বাজে?

এগারোটা দশ।

চা খাবি?

না।

নীপা বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল, অনেকদিন একা ঘুমাই না। কাল একা ঘুমিয়েছি বলে ঘুমাও ভালো হয় নি।নীপার গা থেকে চাঁদর সরে গেছে। তাতে সে মোটেই বিব্রত বোধ করছে না। এতদিন পর যুথীর সঙ্গে দেখা–এই নিয়েও তার কোনো মাথাব্যথা নেই।যুথী বলল, একা ঘুমাচ্ছিস না মানে কী? কে তোর সঙ্গে ঘুমুচ্ছে?

নীপা হাই তুলতে তুলতে বলল, লাইলি। তোর ভাইয়ের বৌ। অসাধারণ একটা মেয়ে। অসাধারণ টু দা পাওয়ার ফাইভ।যুথী বলল, সে কোথায়? নেপালে। কাঠমুণ্ডুতে। করিম আঙ্কেলের সঙ্গে গেছে। করিম আঙ্কেলের ছবির স্ক্রিপ্ট পড়া হবে। সেই উপলক্ষে যাওয়া। আমারও যাওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে যেতে ইচ্ছা করল না। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা কর, আমি হাতমুখ ধুয়ে আসি। বাথরুমের দরজা খোলা। কথাবার্তা চালাতে সমস্যা নেই।যুথী বলল, তুই কি বস্ত্ৰ পুরোপুরি বিসর্জন দিয়েছিস?

নীপা বাথরুম থেকে বলল, মোটামুটি সেরকমই। মনে হয় কাপড়ে এলাৰ্জি হচ্ছে। কাপড় গায়ে লাগলেই হালকা র্যাশের মতো হয়।লাইলিরও কি এই অবস্থা? নীপা হাসতে হাসতে বলল, হুঁ। আমার ভাইয়ের স্ত্রীর তাহলে অনেক উন্নতি হয়েছে!নীপা বলল, পুরো বিষয়টা দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করছে। প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার সাহেবের দৃষ্টিতে চরম অবনতি। আবার করিম আঙ্কেলের দৃষ্টিতে উন্নতি।যুথী বলল, সে কি মদটদও খাচ্ছে? শুধু টাকিলা খাচ্ছে। অন্যকিছু না। দুপুরে নিয়ম করে বিয়ার খাচ্ছে। বিয়ারকে মদ বলা ঠিক না।ড্রাগস?

ড্রাগসের মধ্যে ইয়াবা। সবসময় না। যখন পার্টি থাকে তখন।যুথী বলল, আমি এখন উঠব। লাইলিকে একটা বিশেষ খবর দিতে এসেছিলাম। সে যখন নেই, তোকে দিয়ে যাচ্ছি। আমার ভাই মারা গেছে।Oh God! কবে? জানি না। লাইলি এখন যা ইচ্ছা করতে পারে। আমাদের দিক থেকে কোনো বাধা নেই।নীপা বাথরুম থেকে বের হলো। এখন তার গায়ে টাওয়েল জড়ানো। সে যুথীর সামনে বসতে বসতে বলল, Every cloud has a silver lining. আমার ধারণা, লাইলি তার হাসবেন্ডের মৃত্যুর খবর শুনে তেমন দুঃখিত হবে না। তবে সামাজিক নৰ্ম বজায় রাখার জন্যে দুঃখিত হবার ভান করবে।যুথী বলল, উঠি?

নীপা বলল, উঠি মানে! দুপুরে আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবি, তারপর যাবি। আরেকটা কাজ করবি—নেপাল যাবি? সন্ধ্যায় ড্রক এয়ারের একটা ফ্লাইট আছে। চল কাঠমুণ্ডু চলে যাই। ভিসার ঝামেলা নাই। নেপালের ভিসা অন এরাইভেল। তোর পাসপোর্ট আছে না? না।নীপা বলল, কোনো বিষয়ই না। তিন ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট করিয়ে দিচ্ছি। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হবে। আমি ভিডিও ক্যামেরা সেট করে রাখব, তুই লাইলিকে তার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ দিবি। তার রিঅ্যাকশান অন রেকর্ড থেকে যাবে। রাজি? যুথী বলল, না। আমি এখন উঠব।লাঞ্চও করবি না? না।আমার সঙ্গে লাঞ্চ করলে মজার একটা গল্প বলতাম। গল্পটা আগে মজার ছিল না। তোর ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর গল্পটা মজার হয়েছে।যুথী বলল, মজার গল্প শুনব না।

নীপা বলল, শুনতেই হবে। লাঞ্চ খেতে রাজি না হলেও শুনতে হবে। এই গল্প না শুনে তুই যেতে পারবি না। করিম আঙ্কেল লাইলিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। পুরোটাই ফান। তবে এখন তো আর ফান হবে না। করিম আঙ্কেল বলেছেন, লাইলি, তুমি যে দিন যে সময়ে আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে, আমি বিয়ে করব। পুরুষ হিসেবে এটা আমার Promise. এই বলে তিনি একটা নোংরা। কাজ করলেন। তখন আমরা নেশার ঘোরে ছিলাম বলে নোংরামি ধরা পড়ে নি। নোংরা কাজটা কী শুনবি? না।তারপরেও শুনতে হবে। নোংরা কাজটা হচ্ছে তিনি বললেন, প্রাচীন গ্ৰীসে পুরুষরা কঠিন প্ৰতিজ্ঞা করত তাদের Testicles চেপে ধরে। সেখান থেকে ইংরেজি শব্দ Testimony এসেছে। এখন আমিও নিজের Testicles চেপে ধরে করব।

যুথী উঠে পড়ল। নগ্ন নীপার দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে না। গায়ে জড়ানো টওয়েল নীপা বিছানায় ছুড়ে ফেলেছে। এর মধ্যে কাজের মেয়ে এসে চায়ের কাপ নিয়ে গেছে। নীপার মধ্যে কোনো অস্বস্তি নেই। নীপা আগে এরকম ছিল না। মানুষ যখন বদলাতে শুরু করে তখন দ্রুত বদলায়।করিম আঙ্কেল ছয়জনের একটা দল নিয়ে নেপালের এভারেস্ট হোটেলে আছেন। এই দলে ক্যামেরাম্যান আছে, মিউজিক ডাইরেক্টর আছে, শিল্পনির্দেশক আছে। তিনজন মেয়ের টিকিট কাটা হয়েছিল, শেষ মুহূর্তে নীপা না আসায় এখন আছে লাইলি এবং যমুনা।

স্ক্রিপ্ট পড়া এখনো শুরু হয় নি। করিম আঙ্কেল নীপকে sms করে জানিয়েছেন, সে না আসা পর্যন্ত স্ক্রিপ্ট পড়া হবে না। নীপা জানিয়েছে সে আসছে। এখন দল বেঁধে কাঠমুণ্ডু দর্শন চলছে। নগরকেটে সূর্যস্ত দেখা, হনুমানজির মন্দির দেখা—এইসব। সন্ধ্যার পর ক্যাসিনোতে জুয়া খেলা। করিম আঙ্কেল লাইলিকে পাঁচ হাজার ইন্ডিয়ান টাকা দিয়েছেন জুয়া খেলার জন্যে। তিনি মিনি-ফ্ল্যাস নামের একটা খেলা লাইলিকে শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রথম যারা জুয়া খেলে তাদের বিগিনার্স লাক বলে একধরনের লাক থাকে। আজ তুমি অবশ্যই জিতবে। গুড লাক। আমি যাচ্ছি ফ্ল্যাস খেলতে। আসল জুয়া হচ্ছে ফ্ল্যাস। রবীন্দ্ৰনাথ ছাড়া এই গ্রহে যত ক্রিয়েটিভ লোক জন্মেছেন, সবাই ছিলেন ফ্ল্যাস জুয়ায় আসক্ত। উদাহরণ—

দস্তয়োভসকি

দা ভিঞ্চি

আর্নেষ্ট হেমিংওয়ে

পাবলো পিকাসো

রবীন্দ্রনাথ ফ্ল্যাস খেলতেন না বলে তার সাহিত্যে খানিকটা কবুতরের বাকবাকুম ঢুকে গেছে। কেউ তাঁকে ফ্ল্যাস ধরিয়ে দিলে বাংলা সাহিত্য আরো অনেকদূর যেত। আফসোস!করিম অঙ্কেল রাত বারোটায় লাইলি কী করছে খোঁজ নিতে এসে দেখেন, সে কুড়ি হাজার টাকা জিতে জম্বি অবস্থায় চলে গেছে। তার হাত-পা শক্ত হয়ে গেছে। অদ্ভুত চোখ করে তাকাচ্ছে।করিম আঙ্কেল বললেন, যথেষ্ট জিতেছ। আর খেলতে হবে না। চলো আমার সঙ্গে।লাইলি বলল, আরও কিছুক্ষণ খেলি। প্লিজ।করিম আঙ্কেল বললেন, না। আজকের মতো যথেষ্ট। এখন তুমি হারতে শুরু করবে। তাই নিয়ম। তুমি হুইস্কি খেয়েছ না-কি? মুখ থেকে গন্ধ বের হচ্ছে।যখন জিতেছিলাম তখন ওরা ফ্রি হুইঙ্কি খাওয়াচ্ছিল। তাই খেয়েছি।কয় পেগ খেয়েছ মনে আছে? না।

করিম আঙ্কেল লাইলির কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে ক্যাসিনো থেকে বের করলেন। বিষয়টা কারও কাছেই অস্বাভাবিক মনে হলো না। লাইলির কাছেও না। ক্যাসিনো থেকে বের হয়েই লাইলি হঠাৎ হড়বড় করে করিম আঙ্কেলের গায়ে বমি করে নেতিয়ে পড়ল। করিম আঙ্কেল বললেন, নো প্রবলেম। করিম আঙ্কেল মানুষটা এত ভালো কেন—এই ভেবে লাইলির চোখ ভিজে উঠল।করিম আঙ্কেল লাইলিকে নিজের হাতে গোসল করিয়ে দিলেন। টাওয়েল দিয়ে শরীর মুছে বিছানায় শুইয়া দিতে দিতে বললেন, আরাম করে একটা ঘুম দাও। সকালে দেখবে শরীয়-মন দুই-ই ফ্রেশ। তখন জেতার টাকা নিয়ে বের হয়ে একসেট গয়না কিনে ফেলো। তা না করলে জেতা টাকা জুয়াতেই চলে যাবে।লাইলি বিড়বিড় করে বলল, আপনি কি চলে যাচ্ছেন?

করিম আঙ্কেল বললেন, হ্যাঁ। আমার দায়িত্ব শেষ।লাইলি বলল, আপনি যাবেন না। আপনি চলে গেলে আমার ভয় লাগবে। আমি একা ঘুমাতে পারি না।তাহলে অবশ্যই থাকব। তোমাকে পাহারা দেব। ভালো কথা, তোমাকে একটা খবর দেওয়া হয় নি। নীপা জানিয়েছে তোমার হাসবেন্ড টুনু মারা গেছে।লাইলি কী যেন বলল, পরিষ্কার বোঝা গেল না।করিম আঙ্কেল লাইলির পিঠে হাত রেখে বললেন, তুমি ঘোরের মধ্যে আছ বলেই খবরটা এখন দিলাম। মৃত্যুকে সহজভাবে নিতে হবে লাইলি। মৃত্যু হলো জীবনেরই অংশ। বুঝতে পারছ?

হুঁ।মৃত্যু আছে বলেই জীবনকে আমরা তিলেতিলে অনুভব করব। জীবন কী? জীবন হলো একগ্লাস শ্যাস্পেন। আমরা বেঁচে আছি মানে আমরা শ্যাম্পেন খাচ্ছি। যখন তলানিতে এসে যাব তখনই মৃত্যু। মৃত্যু থাকার কারণেই শ্যাম্পেন পানের প্রতিটি মুহুর্তকে আনন্দময় করে রাখতে হবে। হবে না? মনে রাখতে হবে, এ জগতে আনন্দই সত্য, আর সব মিথ্যা। আমার সঙ্গে বলো, আনন্দই সত্য আর সব মিথ্যা।লায়লী বিড়বিড় করে বলল, আনন্দই সত্য, আর সব মিথ্যা।করিম আঙ্কেল বললেন, তোমার মন ঠিক করার জন্যে এখন অন্য প্রসঙ্গে আলাপ করি। করব?

হুঁ।কারও গায়ে থাকে পদ্মের গন্ধ। তাদেরকে বলে পদ্ম নারী। কারও গায়ে থাকে বাসি বকুল ফুলের গন্ধ। এরা হলো বকুলগন্ধা। একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল, তার গায়ে ধুতরা ফুলের গন্ধ। ভয়ঙ্কর অবস্থা! এখন তুমি কি জানতে চাও তোমার গায়ে কিসের গন্ধ? জানতে চাই। আমার গাঁ শুকে বলে দিন।করিম আঙ্কেল বললেন, ব্যাপারটা এত সহজ না। আগামী সাতদিন তুমি গোসল করবে। সাবান ছাড়া। চুলে শ্যাম্পু দেবে না। গায়ে কোনো সেন্ট বা লোশন। ব্যবহার করবে না। তখনই তোমার গায়ের আসল গন্ধ ফুটে বের হবে। এবং আমি বলে দেব। আমার নাক কুকুরের নাকের চেয়েও শার্প। এখন ঘুমিয়ে পড়।লাইলি ঘুমিয়ে পড়ল।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *