শুভ্র গেছে বনে পর্ব – ১১ হুমায়ূন আহমেদ

শুভ্র গেছে বনে পর্ব – ১১

যুথী মেরাজউদ্দিন সাহেবের অফিসে এসেছে। বিশাল অফিস। অনেক লোকজন কাজ করছে। সেই তুলনায় মেরাজউদ্দিন সাহেবের অফিসঘর ছোট। তাঁর সামনে একটি মাত্র চেয়ার। একজন ছাড়া দ্বিতীয় দর্শনার্থীকে তিনি সম্ভবত সাক্ষাৎ দেন না। ঘরে দেখার মতো জিনিস একটাই। প্ৰকাণ্ড একটা ঘড়ি; ঘড়ির সেকেন্ডের শব্দটাও শোনা যাচ্ছে। ঘড়ির নিচে লেখা–

You can stop time

If you really want to stop.

যুথীর কাছে লেখার অর্থটা পরিষ্কার হচ্ছে না। —তুমি চাইলেই সময় আটকাতে পার, যদি তা সত্যিকার অর্থেই চাও।মেরাজউদ্দিন বললেন, তোমার নাম যুথী? যুথী বলল, জি।তোমাকে তো আমি আসতে বলি নি। তুমি কি কোনো বিশেষ কারণে এসেছ? যুথী বলল, আপনারা কি শুভ্রর খোঁজ পেয়েছেন? সে তার মাকে একটা চিঠি লিখেছে। চিঠিটা পাঠিয়েছে আমার ঠিকানায়। আমি চিঠিটা নিয়ে এসেছি।চিঠিতে সে কোথায় থাকে তা কি লেখা আছে? কোনো ঠিকানা কি দিয়েছে? না। তবে আমি ঠিকানা বের করে ফেলেছি।কীভাবে বের করলে?

খামে মুন্সিগঞ্জ পোষ্টাপিসের ছাপ আছে। শুভ্ৰ লিখেছে সে থাকে এক বিশাল চরে। আমার ধারণা মুন্সিগঞ্জের আশেপাশে পদ্মায় যেসব নতুন চর জেগেছে, সেখানে খোঁজ করলেই তাকে পাওয়া যাবে।মেরাজউদ্দিন বললেন, তুমি স্মার্ট মেয়ে, তবে শুভ্ৰ যে চিঠি তার মাকে লিখেছে সেই চিঠি তুমি পড়লে কেন? যুথী বলল, চিঠির সঙ্গে আমাকে লেখা একটা চিরকুট ছিল। সেখানে লেখা আমি যেন তার মার চিঠিটা পড়ি। স্যার, আমি কি চিঠিটা আপনাকে দেব?

দাও।মেরাজউদ্দিন সাহেবের সামনে চিঠি রেখে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে যুথী বলল, স্যার আমি উঠি? না। তুমি বসবে এবং আমরা একসঙ্গে লাঞ্চ করব। এটা আমার অর্ডার।যুথী বলল, আপনার অর্ডার মানতে বাধ্য এমন কেউ তো আমি না।মেরাজউদ্দিন বললেন, অবশ্যই তুমি আমার অর্ডার মানতে বাধ্য। পুলিশ যখন তোমাকে অ্যারেক্ট করে নিয়ে গেল, তখন আমি তোমাকে উদ্ধার করি। নয়তো রিমান্ডের ঝামেলায় পড়তে। তোমার সবকিছু আমি জানি। আমি স্পাই লাগিয়ে রেখেছিলাম।কেন?

আমার ছেলের জন্যে। ভালো কথা, শুনলাম তোমার ভাই তোমার অ্যাকাউন্টে যে টাকা রেখেছে তুমি তা নিতে অস্বীকার করেছ। তার কেনা ফ্ল্যাটেও উঠছ না।যুথী বলল, আপনি কীভাবে জানেন? মেরাজউদ্দিন বললেন, ইনফরমেশন গেদার করার আমার অনেক মেকানিজম আছে। দুপুরে কী খাবে বলো। এমন কিছু বলো যা জোগাড় করতে আমার কষ্ট হবে এবং হয়তো জোগাড় করতে পারব না। আমি কতটুক পারি তারও একটা পরীক্ষা হয়ে যাবে।যুথী বলল, মানুষকে আপনি আপনার ক্ষমতা দেখিয়ে চমকে দিতে ভালোবাসেন, তাই না? হয়তোবা।আপনার ছেলে কিন্তু আপনার মতো হয় নি। সে গিনি সোনা হয়েছে।গিনি সোনাটা কী?

বাইশ ভাগ শোনা দুই ভাগ তামা।তার তামার অংশ কোনটা? যুথী বলল, তার বোকামিটা।এখনো তো বললে না তুমি কী খাবে? কী খেতে ইচ্ছা করছে? যুথী বলল, আপনার এখানে আমার কোনো কিছুই খেতে ইচ্ছা করছে না।কারণ কী? যুথী বলল, আমি দীর্ঘ সময় আপনার সঙ্গে আছি। আমি আপনার জন্যে একটি আনন্দসংবাদ নিয়ে এসেছি। আমি আপনার মেয়ের বয়েসী, অথচ একবারও আপনার মুখ থেকে মা শব্দটি বের হলো না। এই বিস্ময়ের কারণেই খেতে ইচ্ছা করছে না। যুথী উঠে দাঁড়াল।মেরাজউদ্দিন বললেন, বোস। বোস বললাম।যুথী বলল, কী আশ্চর্য, আমাকে ধমকাচ্ছেন কেন? মেরাজউদ্দিন বললেন, মেয়েকে ধমকানো যায়। তোমাকে মেয়ে হিসাবে গ্রহণ করলাম। You are my daughter that I never had. মা, বলো কী খাবে?

যুথী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর গলায় বলল, পোলাওয়ের চালের ভাত, টাটকা পুঁটি মাছ ভাজা, সরিষা দিয়ে সজিনা, কৈ মাছের ঝোল, মুগ ডাল।মেরাজউদ্দিন কিছুটা বিস্ময় এবং কিছুটা আনন্দ নিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছেন। সহজ স্বাভাবিক একটা মেয়ে। প্রায় বিশেষত্বহীন। তবে এই মেয়ে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। পরিবেশের সঙ্গে রঙ বদলানোর ক্ষমতা এর অবশ্যই আছে।যুথী বলল, আপনার ঘড়ির নিচের লেখাটার অর্থ বুঝতে পারছি না।মেরাজউদ্দিন বললেন, লেখাটার অর্থ একেকজন একেকভাবে করে। তুমি নিজে একটা অর্থ বের করো।যুথী বলল, মানুষ আত্মহত্যা করতে পারে। আত্মহত্যার অর্থ তার কাছে সময় আটকে যাওয়া।

মেরাজউদ্দিন বললেন, মানুষকে আত্মহত্যায় উৎসাহ দেয় এমন একটা লেখা আমি কেন ঘরে সাজিয়ে রাখাব? চিন্তা করে আসল অর্থটা বের করো। যেদিন বের করবে সেদিন তোমাকে একটা পুরস্কার দেওয়া হবে।মেরাজউদ্দিন সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে বাড়ি ফিরেন। বারান্দায় বসে স্ত্রীর সঙ্গে এককাপ চা খান। এই অভ্যাস তাঁর অনেকদিনের। চায়ের এই আসরে শুভ্ৰকে কখনো ডাকা হয় না। মেরাজউদ্দিন মনে করেন চা পানের এই উৎসব শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রী দুজনের।আজ তিনি ঠিক সময়ে ফিরেছেন, কিন্তু চায়ের আসরে বসতে পারেন নি। রেহানার কাছে একজন পীর সাহেব এসেছেন। তিনি নখে তিল তেল দিয়ে কী সব মন্ত্র (বা দোয়াদুরুদ) পাঠ করেন। তখন নখে হারানো ব্যক্তির ছবি ফুটে ওঠে। সে কোথায় আছে কী করছে সবই জানা যায়।

পীর সাহেবের নাম কাশেম কুতুবি। বয়স পঞ্চাশের মতো। মাথার চুল এবং দাড়ি মেন্দি দিয়ে লাল করা। মেন্দি মনে হয় বেশ ভালো জাতের। চুল-দাড়ির লাল রঙ চকচক করছে। তার চোখে ভারী চশমা। গায়ের লেবাস গেরুয়া। পায়ে জুতা বা স্যান্ডেল নেই। মোটা কাঁঠাল কাঠের লাল খড়ম।কাশেম কুতুবি মেরাজউদ্দিনকে দেখে বললেন, স্যার আমার হলো টেলিভিশন সিস্টেম। পর্দা ছোট, মাত্র আধা ইঞ্চি। কালার নাই। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট।মেরাজউদ্দিন স্ত্রীর পাশে বসলেন। শুভ্ৰ বিষয়ে তাঁর সব দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে। এখন আদিভৌতিক কর্মকাণ্ড দেখা যেতে পারে।

কাশেম কুতুবি তাঁর বুড়ো আঙুলের নখের দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছেন। যদিও ঘরে এসি চলছে, তারপরেও উনার এক অ্যাসিসটেন্ট হুজুরের মাথায় তালপাখা দিয়ে বাতাস করছে।কাশেম কুতুবি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আপনার ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি। সে ঘন জঙ্গলের মধ্যে আছে।রেহানা আগ্রহ নিয়ে বললেন, সুন্দরবন নাকি পাৰ্বত্য চট্টগ্রাম? বলা মুশকিল। পর্দা ছোট তো। সব পরিষ্কার দেখা যায় না। তাছাড়া আমার নিজের চোখেও কিছু সমস্যা হয়েছে। ভালো দেখি না। এইজন্যে চশমা খরিদ করতে হয়েছে।রেহানা বললেন, ছেলে কি দেশের ভেতরে আছে? কাশেম কুতুবি বললেন, বর্ডার এলাকায় আছে।মেরাজউদ্দিন বললেন, বর্ডার এলাকায় আছে। এটা বুঝলেন কীভাবে?

কুতুবি বললেন, আমি নখে যেমন দেখি কিছু আবার ইশারাতেও পাই। বর্ডারের বিষয়টা ইশারাতে পেয়েছি।মেরাজউদ্দিন বললেন, ইশারায় আর কী পাচ্ছেন? ছেলে ঘরে ফিরতে চায় না। একটা মেয়ের সঙ্গে তার ভাব-ভালোবাসা হয়েছে। তার সঙ্গে সে সংসার করতে চায়।মেরাজউদ্দিন বললেন, ঘন জঙ্গলের মধ্যে সে মেয়ে পেল কোথায়? কুতুবি হাসিমুখে বললেন, মেয়েছেলে সব জায়গায় পাওয়া যায় জনাব। ঘন জঙ্গলে পাওয়া যায়, আবার মরুভূমিতেও পাওয়া যায়।রেহানা বললেন, তুমি সামনে থেকে যাও তো। তোমার কারণে উনি ঠিকমতো দেখতে পারছেন না।

মেরাজউদ্দিন উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, কুতুবি সাহেব। ভালোমতো দেখুন। আমার ছেলের সন্ধানদাতার জন্যে পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। পুরস্কারটা নিতে পারেন কি না দেখুন।মেরাজউদ্দিন বারান্দায় চা খেতে খেতে শুভ্রর চিঠি আরেকবার পড়লেন। বিশেষ কোনো চিঠির পুরো অর্থ ধরতে হলে চিঠিটা তিনবার পড়তে হয়। তিনি দুবার পড়েছেন। আরও একবার পড়তে হবে।যুথীর বাবা আজহারের মাথা পুরোপুরিই গেছে। এখন তাঁকে আনন্দিত এবং সুখী মানুষ বলে মনে হয়। নিজের বাড়ির কাউকেই তিনি এখন চেনেন না। চিনলেও অল্প সময়ের জন্যে চেনেন। বাড়ির মানুষদের অতিথি হিসেবে দেখেন এবং যথেষ্ট আদরষত্ব করেন। গতকাল যুথী দুপুরে বাইরে থেকে ফিরেছে, তিনি মেয়েকে দেখে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

মা, যুথী তো এখনো ফিরে নি। একটু অপেক্ষা করতে হবে। তবে সে চলে আসবে। দুপুরে তার বাসায় খাবার অভ্যাস। মা, তোমাকে চা দিতে বলি। চা খেতে খেতে আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করো। যুথী চলে এলে তার সঙ্গে ভাত খাবে। দুপুরে কেউ আমার বাড়িতে এসে না খেয়ে যাবে তা হবে না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এলেও একই অবস্থা। তাকেও পার্টিতে বসে আমাদের সঙ্গে খেতে হবে। একেক বাড়ির একেক সিষ্টেম। এটা হলো আমার বাড়ির সিষ্টেম। আমাদের বাড়ির আরেকটা সিষ্টেম হলো-ইলিশ মাছ নিষিদ্ধ। মহাবীর আলেকজান্ডার ইলিশ মাছ খেয়ে মারা গিয়েছিলেন, জানো নিশ্চয়ই? উনার মতো মহাবীরের এই অবস্থা হলে আমাদের অবস্থাটা চিন্তা করো। তবে তোমার যদি ইলিশ মাছ খেতে খুব ইচ্ছা করে তাহলে তার ব্যবস্থাও হবে।

আজহার কাউকে চিনতে না পারলেও ডাক্তার আমিরুল ইসলামকে চিনতে পারেন। তাঁর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করছেন এমন ভঙ্গিতে গলা নামিয়ে কথা বলেন। কথাগুলি আমিরুল ইসলাম এবং যুথী দুজনের জন্যেই অস্বস্তিকর। তাঁর মাথায় কী করে যেন ঢুকে গেছে ডাক্তার গোপনে যুথীকে কাজি অফিসে বিয়ে করেছে। ডাক্তারের সঙ্গে তার কথাবাতাঁর নমুনা–

ডাক্তার, তুমি গৰ্হিত অন্যায় করেছ। বিবাহ একটা সামাজিক ব্যাপার। দশজন আসবে, আমোদ ফূর্তি হবে। বাচ্চারা গেট ধরবে; তোমার জুতা লুকিয়ে ফেলবে। তুমি কী করলে? চলে গেলে কাজি অফিসে। ছিঃ ডাক্তার ছিঃ। তোমার কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে আমার তো আপত্তি ছিল না। হীরার টুকরা ছেলে বলতে যা বুঝায় তুমি তা-ই। যাই হোক, যা হবার হয়েছে। এখন মেয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাও। স্ত্রী থাকবে স্বামীর সঙ্গে। বাবা-মার সঙ্গে না। আমি যুথীকে ডেকে বলে দিচ্ছি। সে যেন ব্যাগ গুছিয়ে রাখে। আজ তুমি যখন যাবে সেও তোমার সঙ্গে চলে যাবে। আমার সেবাযত্ন নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। টুনুর স্ত্রী যা পারে করবে। বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়ের সেবা নেওয়া যায় না। তবে ছেলের বৌয়ের সেবা নেওয়া যায়। একটা শাস্ত্ৰকথা শোনো—

মেয়ে হচ্ছে গলার কাঁটা

জামাই বুকের শেল

পুত্র হলো মাথার ছাতা…

বাকিটা মনে আসছে না। মনে আসলে বলব। এখন তোমরা দুজন আমার সামনে দাঁড়াও। দুজনকে একসঙ্গে একটু দেখি। যুথী মা কই? আয় দেখি।যুথীর ধারণা তার বাবার এই পাগলামিটা অভিনয়। তিনি পুরোপুরি সুস্থ একজন মানুষ। বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে তিনি পাগলামির ভান করে যাচ্ছেন। যুথী এই বিষয়ে তার মার সঙ্গে কথা বলেছে। সালমা দুঃখে কেঁদে ফেলেছেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, জন্মদাতা পিতাকে নিয়ে এই ধরনের কথা! ছিঃ ছিঃ! পাগল সেজে তার লাভ কী? যুথী বলল, তাঁর সবচেয়ে বড় লাভ তিনি তাঁর মনের কথাগুলি বলে ফেলতে পারছেন। কেউ কিছু মনে করছে না।তার মনের কথা কী? তার মনের কথা হচ্ছে ডাক্তারটার সঙ্গে আমার বিয়ে দেওয়া। পাগল সোজে বাবা ওইদিকেই এগুচ্ছেন।সালমা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললেন, জন্মদাতা পিতার সঙ্গে যে মেয়ে এই ধরনের কথা বলে তার সঙ্গে আমি থাকব না। তোর বাবাকে নিয়ে আলাদা বাসা করব।

যুথী বলল, আলাদা বাসা করার তো দরকার নেই। ভাইয়া তোমাদের জন্যে ফ্ল্যাট কিনে রেখেছে। সেখানে গিয়ে ওঠ। বাবা পাগল সেজেছে, তুমি পাগলি সাজো। পাগল-পাগলির সংসার।সালমা বললেন, যুথী, তুই আর আমার সঙ্গে কথা বলবি না।যুথী বলল, আচ্ছা যাও বলব না। শেষ কথাটা শুধু বলি। বাবা পাগল সাজার আইডিয়া কোথেকে পেয়েছে সেটা শোনো। বাবা আইডিয়া পেয়েছে একটা হিন্দি ছবি থেকে। ছবিটা বাবার সঙ্গে তুমিও দেখেছ। আমি নাম মনে করতে পারছি না। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে।সালমা বললেন, ওই ছবিতে লোকটা একটা খুন করেছিল। খুনের দায় থেকে বাঁচার জন্যে পাগল সেজেছিল। তোর বাবা কি খুন করেছে?

বাবা খুন না করলেও তার পুত্র শীর্ষ সন্ত্রাসী টুনু সাহেব করেছেন। ওই বিষয়টা ভুলে থাকার জন্যে পাগল সাজা একটা উত্তম পন্থা।সালমা গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে যুথীর গালে চড় বসালেন। তিনি কখনোই তাঁর ছেলেমেয়ের গায়ে হাত উঠান নি। এই প্রথম।নীপা সফিককে নিয়ে করিম আঙ্কেলের স্ক্রিপ্ট শুনতে উপস্থিত হয়েছে।আজ সন্ধ্যায় স্ক্রিপ্ট পড়া হবে। হোটেলের একটা হলঘর সেই উপলক্ষে ভাড়া করা হয়েছে। করিম আঙ্কেল কয়েকবার বলেছেন, স্ক্রিপ্ট পড়ার আগে বিশেষ ঘোষণা আছে। সবার জন্যে চমক আছে। চমকটা কী বোঝা যাচ্ছে না।নীপা লাইলিকে আড়ালে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছে, করিম আঙ্কেল কি তোমাকে বিয়ে করে ফেলেছে? লাইলি বলল, না তো! তাহলে কিসের চমক? লাইলি বলল, আমি জানি না কিসের চমক। উনার কাজকর্ম তো আগে থেকে কিছু বুঝা মুশকিল।

শ্যাস্পেনের বোতল খুলে অনুষ্ঠান শুরু হলো। করিম আঙ্কেল ঘোষণা করলেন, আজ তার জীবনের একটা বিশেষ দিন। আজ স্ক্রিপ্ট পড়া হবে এবং এই ঘটনা চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্যে তিনি বিয়ে করবেন। কনের নাম লাইলি। এই মেয়ে জুইগন্ধা মেয়ে। তার গায়ে জুই ফুলের সৌরভ। বিয়েটা হবে অত্যন্ত দায়সারাভাবে। একজন মাওলানা জোগাড় করা হয়েছে। তার সামনে আমরা কবুল কবুল বলব।তুমুল হাততালি শুরু হলো। লাইলি লজ্জা লজ্জা মুখ করে বসে রইল। আজ সে সাদা একটা লং ফ্রক পরেছে। তাকে দেখাচ্ছে ইন্দ্ৰাণীর মতো। সে বসেছে করিম আঙ্কেলের পাশে। যমুনাকে আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

স্ক্রিপ্ট পড়া শুরু করার ঠিক আগমুহূর্তে করিম আঙ্কেল একটা টেলিফোন পেলেন; হোটেল লিবীতে তাকে দুই মিনিটের জন্যে যেতে হবে। অতি জরুরি। তার জন্যে ঢাকা থেকে গিফট প্যাকেট নিয়ে একজন এসেছে। প্যাকেটটা দিয়েই চলে যাবে।হোটেল লবীতে অচেনা এক যুবক দাঁড়ানো। যুবকের মুখ হাসি হাসি। বিনয়ী চেহারা। যুবক বলল, স্যার কেমন আছেন? করিম আঙ্কেল বললেন, আমি সবসময়ই ভালো থাকি। আমি কি তোমাকে চিনি? যুবক বলল, আমাকে আপনি চেনেন না। তবে আমার স্ত্রীকে চেনেন। আমার স্ত্রীর নাম লাইলি। আমার নাম টুনু।করিম আঙ্কেল সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, কোয়াইট ইন্টারেস্টিং। যুবক বলল, পুলিশের ধারণা আমি ক্রসফায়ারে মৃত। ওদের সেই ধারণা দেওয়া হয়েছে। মৃত মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা খুবই ইন্টারেস্টিং। তাই না স্যার?

বুঝতে পারছি না। মৃত মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা আমার নেই। দুই মিনিট সময় নিয়ে এসেছিলাম, এখন আমাকে যেতে হবে; সবাই অপেক্ষা করছে।যুবক বলল, আপনাকে তো যেতে দেওয়া যাবে না। আপনি আমার ভয়ঙ্কর গোপন তথ্য জানেন।তুমি কী করতে যাচ্ছ? আপনার যাতে সহজ মৃত্যু হয় সেই ব্যবস্থা করব। আমি পিস্তল নিয়ে এসেছি। আমার লোকজন আপনাকে ঘিরে আছে। তবে আমি আপনার সঙ্গে একটা নোগোসিয়েশনে যেতে পারি।কী রকম নেগোসিয়েশন? যুবক বলল, নেগোসিয়েশনের ব্যাপারটা এখানে বলা যাবে না। সুইমিংপুলের কাছে চলুন। লোকজন সেখানে কম আছে। দেরি না করে আসুন। আপনার যে কোনো চয়েস নেই। এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া আপনার উচিত। আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষ।করিম আঙ্কেল ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন, সুইমিংপুলটা কোন দিকে?

আসুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি।করিম আঙ্কেল বললেন, আমি একটা বিষয় পরিষ্কার করতে চাচ্ছি। মেয়েমানুষ ঘটিত কোনো সমস্যা আমার নেই। কোনো মেয়ে যদি আমার কাছে ছুটে আসে তখন না বলি না। কিন্তু আমি কাউকে ডাকি না।যুবক বলল, লাইলি কেমন আছে স্যার? করিম আঙ্কেল বললেন, লাইলি ভালো আছে। আমি তার অভিনয় প্রতিভায় মুগ্ধ। গুহামানব নামে আমি যে ছবিটি বানাচ্ছি। সেখানে লাইলিকে প্রায় সেন্ট্রাল একটা ক্যারেক্টর দেওয়া হয়েছে। একটা পপুলার হিন্দি গানের চারটা লাইনও সে গাইবে— বাচপানকে দিন ভুলানা দেনা।

যুবক বলল, স্যার চলুন গল্প করতে করতে এগিয়ে যাই। গল্প লম্বা করে আপনার কোনো লাভ হবে না। আপনাকে উদ্ধার করতে কেউ আসবে না। আপনি কি একা একা হাঁটতে পারবেন? নাকি আমি আপনার হাত ধরব? করিম আস্কেলের ডেডবডি সুইমিংপুলে ভাসছে—এই খবর দলের বাকিদের কাছে পৌঁছল রাত দশটায়। যে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছে সেই পিস্তলটিা ছিল তার হাতে। পাথরচাপা দেওয়া একটা সুইসাইড নোটও পাওয়া গেল। সেখানে লেখা— জীবন সম্পর্কে চূড়ান্ত হতাশায় এই কাজ করতে আমি বাধ্য হচ্ছি। আমার মৃত্যুর জন্যে আমিই দায়ী।

মর্জিনা তার বাবার কবর চালাঘরের উত্তরদিকে দিয়েছে। পাকুরগাছের নিচে। বড় গাছপালার নিচে কবর হওয়া ভালো। গাছ আল্লাহপাকের নাম নেয়। এতে কবরবাসীর গোরআজাবি কমে। এখন তার মনে হচ্ছে, এত কাছে কবর দেওয়া ঠিক হয় নি। সন্ধ্যার পর থেকে মর্জিনার ভয় ভয় লাগে। এক রাতে সে স্পষ্ট দেখেছে, বুড়োমতো এক লোক কবরের ওপর বসে জিকিরের ভঙ্গিতে মাথা দোলাচ্ছে। বুড়োটা যে তার বাবা এই বিষয়ে সে নিঃসন্দেহ। শুভ্রকে সে ঘটনাটা বলেছে। শুভ্ৰ শব্দ করে হেসেছে।মর্জিনা বলল, হাসেন কী জন্যে? শুভ্র বলল, তোমার কথা শুনে হাসি। মর্জিনা বলল, হাসির কথা কী বললাম? শুভ্ৰ বলল, যে কবরের ওপর বসে ছিল তার গায়ে কাপড় ছিল? মর্জিনা বলল, অবশ্যই। লুঙ্গি ছিল। গেঞ্জি ছিল। মাথায় টুপি ছিল।

শুভ্র বলল, ধরে নিলাম তোমার বাবার ভূত কবরে বসা ছিল। সে জামাকাপড় পাবে কোথায়? জামাকাপড়ের তো ভূত হবার সুযোগ নেই।মর্জিনা বলল, তাইলে আমি দেখলাম কী? শুভ্র বলল, আকাশে চাঁদ ছিল। চাঁদের আলোয় পাকুরগাছের ছায়া পড়েছে কবরের ওপর। বাতাসে গাছ দুলছে। তোমার কাছে মনে হয়েছে ছায়া দুলছে। তোমার মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে কল্পনা করে নিয়েছে এই ছায়া তোমার বাবা।মর্জিনা বলল, আপনের মাথা! যদিও সে বলল আপনের মাথা, কিন্তু শুভ্রর যুক্তি ফেলে দিতে পারল না। যতই দিন যাচ্ছে ততই সে মানুষটার কাজকর্ম এবং কথাবার্তায় মুগ্ধ হচ্ছে। প্রতি শনিবার রাতে স্কুলঘরের উঠানে বসে শুভ্ৰ নানান কথা বলে।

চরের সবাই মন দিয়ে শোনে। কথাগুলির একটা নামও আছে-ছাইনছের (science) কথা। মেয়েরা এইসব কথা শুনতে যায় না। তবে মর্জিনা যায়। তার ভালো লাগে এবং অস্থির লাগে। অস্থির লাগার কারণ, এই মানুষ সারা জীবন চরে পড়ে থাকবে না। একসময় যেখানকার মানুষ সেখানে ফিরে যাবে। তখন তার কী হবে? চর থেকে তাকে উচ্ছেদ করলে সে যাবে কোথায়? নটি মেয়ে হয়ে যাবে? পাড়ায় বাস করা শুরু করবে? মর্জিনা!বলেন, কী বলবেন।শুভ্র বলল, একটা কাজ করো, এখন থেকে একটা হারিকেন জ্বলিয়ে কবরের মাঝখানে রেখে দিও। তাহলে আর কোনো ছায়াও দেখবে না, ভয়ও পাবে না।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *