শুভ্র গেছে বনে পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

শুভ্র গেছে বনে পর্ব – ৮

সে কি সন্ত্রাসীদের কেউ? জি-না। অতি ভালো ছেলে। তবে ছোট-মজিদ তার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা দুজন একই স্কুলে পড়ত। দুজন একই সঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট ফেল করে। র্যাব তাকে দেখিয়েছে ছোট-মজিদের সহযোগী হিসেবে।টুনুর পরিবারের কেউ বিষয়টা জানে না? না। টুনুর ব্যাপারে তারা উদ্বিগ্নও না। সে প্রায়ই বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে।তুমি তার ব্যাপারে আরও তথ্য সংগ্ৰহ করো।জি স্যার।আমার ধারণা ছেলেটি সন্ত্রাসীদের একজন। অতি ভালো কোনো ছেলে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী কারও সঙ্গে ঘুরবে না। ছেলেটি কি বিবাহিত?

জি।তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করো। তার স্ত্রীই স্বামী সম্পর্কে আসল কথাটি বলতে পারবে। একটি চীনা প্রবচন আছে, কোনো পুরুষমানুষের বিষয়ে যেসব তথ্য ঈশ্বর জানেন না, সেসব তথ্য তাদের স্ত্রীরা জানেন।আজ নীপার পেট্রেট করা শুরু হবে। সে রাজি হয়েছে। সফিক রঙ-তুলি-ক্যানভাস নিয়ে এসেছে। ছবিটি সে করবে তেলরঙে। এতে ভুল হলে ত্রুটি শোধরাবার সুযোগ থাকবে।সফিক বলল, বিষয়টা আমি যেভাবে দেখছি তা বলি। অলস দুপুর। ঠান্ডা মেঝেতে তুমি হাতের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছ। তোমার কাছে এক গ্লাস পানি টলটল করছে। পানির গ্লাসের কাছে একটা গল্পের বই। এই বইটা কিছুক্ষণ আগে তুমি পড়ছিলে।কী গল্পের বই?

ধরো শরৎচন্দ্রের দেবদাস।নীপা বলল, কোনো মেয়ে নেংটা হয়ে শরৎচন্দ্রের দেবদাস পড়ে না।তাহলে টনি মরিসনের একটা বই থাকুক।নীপা বলল, না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য বইটা থাকুক।আচ্ছা থাকুক।শেষ করতে কতদিন লাগবে? সাতদিন লাগবে। সাতদিন তোমার সামনে আমি নেংটো হয়ে শুয়ে থাকব? হুঁ।আমি একটা ভালো বুদ্ধি দেই? দাও।আমার ফিগারের সঙ্গে লাইলির ফিগারের মিল আছে। তুমি যখন মুখ আঁকবে তখন আমি থাকব। অন্যসময় লাইলি থাকবে।সে কি রাজি হবে?

নীপা বলল, কেন রাজি হবে না? প্রথম সেশন লাইলিকে নিয়ে করো।পোট্রেটের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। ক্যানভাসে ড্রয়িং করা হচ্ছে। সফিক বলল, লাইলি, তোমাকে অনেকবার দেখেছি। তুমি যে এতটা সুন্দর আগে বুঝি নি।লাইলি স্বাভাবিক গলায় বলল, খোসা ছাড়ানোর আগে দেখেন নি, তাই বুঝেন নি।সফিক বলল, অস্বস্তি লাগছে না তো? না। ঘুম পাচ্ছে।ঘুমিয়ে পড়ো। ঘুমিয়ে পড়লেই আমার জন্যে সুবিধা। লাইলি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। খোলা জানালায় কিছু আলো এসে পড়েছে তার গায়ে এবং পানির গ্লাসে। পানির গ্লাস ঝলমল করছে। সফিক বলল, আমার এই ছবির টাইটেল হলো তৃষ্ণা। নাম ঠিক আছে না?

নীপা হাই তুলতে তুলতে বলল, ঠিক আছে।সফিক বলল, লাইলির পায়ের পজিশন সামান্য চেঞ্জ করা দরকার।নীপা বলল, চেঞ্জ করে দাও। চেঞ্জ করলেই ঘুম ভেঙে যাবে। আমি চাই ঘুমিয়ে থাকুক। ঘুমন্ত অবস্থায় মূল ড্রয়িংটা শেষ করে ফেলি।সফিক বলল, রবীন্দ্রনাথের ওই গানটা কি তোমার কাছে আছে? চক্ষে আমার তৃষ্ণা। তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে। আমি বৃষ্টি বিহীন বৈশাখী দিন…নীপা বলল, খুঁজে দেখি।যুথীর গানের ক্লাস আজকের মতো শেষ। অশোক বাবু আগ্রহ নিয়ে নাশতা খাচ্ছেন। সুজির হালুয়া, পরোটা এবং সিদ্ধ ডিম। চা দেওয়া হয়েছে। পিরিচ দিয়ে চায়ের কাপ ঢাকা।অশোক বাবু ডিম মুখে দিতে দিতে বললেন, যতটুক উন্নতি আমি আশা করেছিলাম তারচেয়ে অনেক কম হয়েছে। হতাশাজনক পরিস্থিতি। সঙ্গীতে আপনার মন নাই।

যুথী বলল, কোনোকিছুতেই আমার মন নাই। খামাখা সপ্তাহে একদিন হারমোনিয়াম নিয়ে ভ্যা ভ্যা করি; আজই আমার শেষ ক্লাস। আর শিখব না।এটা কেমন কথা! যুথী বলল, আপনাকে বেতন টেতন কিছুই তো দিতে পারি নি। এক কাজ করুন, হারমোনিয়ামটা নিয়ে চলে যান।অশোক বাবুর চোখ চকচক করে উঠল। তিনি চাপা গলায় বললেন, সত্যি নিয়ে যাব? হ্যাঁ নিয়ে যাবেন। যে বস্তুর ব্যবহার নেই সেই বস্তু ঘরে রেখে লাভ কী? এটা অবশ্য একটা যুক্তিসঙ্গত কথা।যুথী বলল, হারমোনিয়াম থাকলে আপনার কাছে। আবার যদি কখনো শিখতে ইচ্ছা করে আপনাকে খবর দেব।অশোক বাবু নাশতা শেষ করে হারমোনিয়াম হাতে নিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, রিকশাভাড়া দিন চলে যাই।

যুথী রিকশাভাড়া দিয়ে ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে শুয়ে রইল। কিছু ভালো লাগছে না। ঘুমের ওষুধ খেয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে। তার কাছে ঘুমের ওষুধ নেই। সে তার বাবার ওষুধের বাক্স থেকে ঘুমের ওষুধ নিতে পারে। তাকে নানান ধরনের ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সময় পার করছেন। তাঁর শরীর কতটা সেরেছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অফিসে অনেক ছুটি পাওনা ছিল। দুমাসের বেতনসহ ছুটি নিয়েছেন। তাঁর তিরিক্ষি মেজাজ এখন ঠান্ডা। সবার সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করছেন। সালমার সঙ্গে খুবই ভালো ব্যবহার করছেন। তাকে নিয়ে নিয়মিত হিন্দি সিরিয়াল দেখছেন। ট্রাজিক অংশগুলিতে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলছেন।

তবে মাঝে মাঝে বড় সমস্যা হচ্ছে। যেমন, এক রাতে হিন্দি সিরিয়াল দেখতে দেখতে তিনি হঠাৎ জড়সড় হয়ে গেলেন। ক্ষীণস্বরে সালমাকে বললেন, আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না। আপনি কি টুনুর শাশুড়ি? কিছু মনে করবেন। না, কিছুদিন হলো শরীর ভালো যাচ্ছে না। কিছুই মনে থাকছে না। ইলিশ মাছের পাতুড়ি খেয়ে এই সমস্যা হয়েছে। আপনি সম্ভবত জানেন না, মহাবীর আলেকজান্ডার ইলিশ মাছ খেয়ে মারা গিয়েছিলেন। বিরাট আফসোসের ব্যাপার।যুথী ঘুমিয়ে পড়েছিল। সালমা এসে গা ঝাঁকিয়ে তাকে ডেকে তুলে বললেন, তাড়াতাড়ি বসার ঘরে যা। পুলিশ এসেছে।কেন?

জানি না কেন? তুই গিয়ে কথা বল।যুথী বসার ঘরে গৈল। ডিবি পুলিশের একজন ইন্সপেক্টর এসেছেন। বাসার বাইরে একদল পুলিশ। মোটর করে র্যাবের দুজন আছে। তারা মোটর সাইকেল থেকে নামেনি। দাঁড়িয়ে থাকা মোটর সাইকেলে অলস ভঙ্গিতে বসে আছে। দুজনের চোখেই ঘন কালো কাচের সানগ্লাস।ডিবি ইন্সপেক্টর বললেন, আমরা আপনাদের বাসাটা সার্চ করব।যুখী বলল, কেন? কারণ অবশ্যই আছে। পরে জানবেন। আগে সার্চ শেষ হোক।বাড়ি সার্চ শুরু হলো। মুহুর্তের মধ্যে সব লণ্ডভণ্ড। প্রতিটি বালিশ ছেড়া হলো। তোষক কাটা হলো। একটা ট্রাঙ্কের চাবি পাওয়া যাচ্ছিল না। তালা ভাঙা হলো। একজন টিভির পেছনের ডালা খুলে ফেলল। বাথরুমের ওপরের ফলস সিলিং-এ একজন উঠে গেল। ধমাধম শব্দে সেখান থেকে জিনিসপত্র ফেলতে লাগল।

আজহার ভীষণ হৈচৈ শুরু করলেন, আপনারা কী ভেবেছেন? নিরীহ পাবলিকের ওপর অত্যাচার করবে। আর পাবলিক আপনাদের ছেড়ে দেবে? আমি যদি আপনাদের চাকরি নট করার ব্যবস্থা না করেছি। তাহলে আমার নাম আজহার আলি না। আমার কানেকশন বিরাট বড়। প্রধানমন্ত্রীর এক ফুপুর সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। সেই ফুফু প্রধানমন্ত্রীর খুব ঘনিষ্ঠ। বিশ্বাস না করলে এখনই তার মাধ্যমে প্ৰধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করব।ডিবি ইন্সপেক্টর বললেন, যোগাযোগ করতে চাইলে করুন। আমাদের দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই।

বাড়ি সার্চের ব্যাপারে একজনই আনন্দিত হলেন, তিনি সালমা। তাঁর দুভরি ওজনের একটা গলার হার হারিয়ে গিয়েছিল, সেটা পাওয়া গেল। বিয়ের সময় তাঁর বড় মামা একটা মার্কার কলম দিয়েছিলেন। কলামটাও পাওয়া গেল।ডিবি ইন্সপেক্টর যুখীকে বললেন, আপনাকে একটু আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।যুথী বলল, কোথায় যাব? আমাদের অফিসে। আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।সমস্যাটা কী হয়েছে তা কি জানতে পারি? অফিসে গেলেই জানবেন।ডিবি ইন্সপেক্টরের সামনে যুথী বসে আছে। তাকে এক কাপ রং চা খেতে দেওয়া হয়েছে। ঘরে একটা মাত্র জানালা। জানালায় পর্দা টানা বলে বাইরের আলো আসছে না। টেবিলের ওপর একটা টেবিল-ল্যাম্প। টেবিল-ল্যাম্পের আলো যুথীর মুখের ওপর ফেলা হয়েছে। চোখেমুখে কড়া আলোর কারণে যুথী ডিবি ইন্সপেক্টরের মুখ দেখতে পারছে না।

আপনার নাম?

সায়মা হোসেন। ডাকনাম যুথী।

বাবার নাম।

আজহার আলি।

বাবার নামের শেষে আলি, আপনার নামের শেষে হোসেন কেন?

বাবার ধারণা মহাবীর আলির নাম মেয়েদের নামের শেষে ব্যবহার করলে মেয়েরা বেয়াড়া হয়ে যায়।

ফোটনকে চেনেন?

না।

ফ্রুট ফোটন নামের কাউকে চেনেন?

না।

আপনার নাম কী?

একটু আগে নাম বলেছি।

আমাদের প্রশ্নের ধারা এরকম; প্রথম কিছুক্ষণ এমনসব প্রশ্ন করা হয় যার সত্যি উত্তর দিতে আপনি বাধ্য। কিছুক্ষণ সত্যি বলার পর সত্যি বলাটা অভ্যাসের মতো হয়ে যায়। তখন মূল প্রশ্ন করি, যাতে সত্যি উত্তর বের হয়। এখন বলুন আপনার নাম কী?

সায়মা হোসেন। ডাকনাম যুথী।

বাবার নাম কী?

আজহার আলি।

মায়ের নাম কী?

সালমা। সালমা বেগম।

ফ্রুট ফোটন আপনার কে হয়?

আমার কেউ হয় না। এই নামে আমি কাউকে চিনি না।

আপনার বড়ভাই ফলের ব্যবসা করতেন না?

কিছুদিন করেছেন। তার নাম টুনু। ফ্রুট ফোটন না।

আপনার কি কোনো ব্যাংক একাউন্ট আছে?

না। তবে ভাইয়া একবার করিয়ে দিয়েছিলেন। ব্যাংকে একাউন্ট খুলে টাকা জমা করার মতো অবস্থা আমাদের না।

আপনার সেই ব্যাংক একাউন্টের কাগজপত্র কার কাছে?

আমার কাছে না। ভাইয়ার কাছে।

আপনার নাম কী?

সায়মা হোসেন।

ডাকনাম? যুথী।

বাবার নাম?

আজহার আলি।

বড়ভাইয়ের নাম?

টুনি।

আপনার ব্যাংক একাউন্টে কত টাকা আছে আপনি জানেন? কোনো টাকা থাকার কথা না। দুই হাজার টাকা দিয়ে একাউন্ট খোলা হয়েছিল, তারপর আর টাকা জমা দেওয়া হয় নি।আপনার ব্যাংক একাউন্টে এই মুহুর্তে আছে এক কোটি সতেরো লক্ষ তিনহাজার দুশ টাকা।যুথী চুপ করে রইল। তার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল।ডিবি ইন্সপেক্টর বললেন, এটা ছাড়াও বনানীতে তিন হাজার স্কয়ার ফিটের একটা অ্যাপার্টমেন্ট কেনা আছে আপনার নামে।আমি এইসব কিছুই জানি না। জানলে যে কষ্টের ভেতর দিয়ে সংসার চলছে তার থেকে মুক্তি চাইতাম। ব্যাংকের টাকা খরচ করতাম।এই টাকা আপনার ভাই কীভাবে সংগ্ৰহ করেছেন তা জানেন?

জানি না, তবে অনুমান করতে পারছি। এবং ভাইয়া কেন কিছুদিন পরপর উধাও হয়ে যেত তাও বুঝতে পারছি। ভাইয়া কি আপনাদের হাতে ধরা পড়েছে? সে ক্রসফায়ারে মারা গেছে।যুথী বলল, আমি কি কিছুক্ষণ কাঁদতে পারি? না-কি আপনাদের এখানে কাঁদাও নিষেধ? কাঁদতে পারেন।যুথী শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ চেপে ধরে ফোঁপতে ফোঁপাতে বলল, আমি এতদিন জেনে এসেছি ভাইয়া এই পৃথিবীর শ্ৰেষ্ঠ কিছু মানুষের একজন।ডিবি ইন্সপেক্টর যুথীর মুখের ওপরের লাইটটা সরিয়ে দিলেন।আপনি কি আপনার ভাই সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু তথ্য দেবেন? যুথী চোখ মুছতে মুছতে বলল, এখন তথ্য দিয়ে কী হবে?

ডিবি ইন্সপেক্টর বললেন, তথ্য সবসময় গুরুত্বপূর্ণ।যুথী বলল, আমি তার সম্পর্কে যেসব তথ্য দেব তার কোনোটাই আপনাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না।তারপরেও শুনি।ভাইয়া সুন্দর পেন্সিল স্কেচ করতে পারত। তাঁর আঁকা একটা পোর্ট্রেট আমাদের বসার ঘরে বাঁধানো আছে। এই তথ্য কি আপনাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ? না।ভাইয়া একবার একটা গল্প লিখেছিল। গল্পটার নাম মাহিনের মৃত্যু। গল্পটা একটা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতায় ছাপা হয়েছিল। আমার কাছে কপি আছে।আর কিছু?

গল্পে সে নিজের নাম দেয় নি। ছদ্মনাম দিয়েছিল। ছদ্মনাম ছিল ভৃগু সেন। এই তথ্য নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সে নিজেকে আড়ালে রাখত। আমি এক কাপ আগুনগরম চা খেতে চাই। চা কি পাওয়া যাবে? পাওয়া যাবে।প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। মাথাব্যথার দুটা ট্যাবলেট কি পেতে পারি? অবশ্যই। মাথা ধরার ট্যাবলেট আনিয়ে দিচ্ছি। আপনি ওষুধ এবং চা খেয়ে বাসায় চলে যান। পুলিশের গাড়ি আপনাকে পৌঁছে দেবে।আজহার মেয়েকে দেখে বললেন, ঘটনা কী বল। পুলিশ তোকে ধরে নিয়ে গেল কেন? বাড়ি সার্চ করল কেন?

যুথী বলল, কে যেন পুলিশকে খবর দিয়েছে আমি বিভিন্ন জায়গায় ড্রাগ সাপ্লাই করি। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসি। এইজন্যেই ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছে।আজহার বললেন, কে দিয়েছে এরকম একটা মিথ্যা খবর? আমি কী করে জানব? পুলিশকে জিজ্ঞেস করিস নাই? না।গাধি মেয়ে। তোর এটা জানা দরকার না? যা এক্ষুনি থানায় যা। জেনে আয়। তারপর দেখ আমি কী করি।কী করবে? মানহানির মামলা। দশ লাখ টাকার মানহানির মামলা। ঘাড়ে গামছা দিয়ে টাকা আদায় করব। মগের মুলুক পেয়েছে? This is not মগ’স মুল্লুক।যুথী বলল, বাবা, চিৎকার করো না।আজহার বললেন, এত বড় একটা ঘটনা ঘটেছে, তারপরেও আমি চিৎকার করব না? মুখে চুষনি দিয়ে বসে থাকব? You dont know your father.

যুথী অনেক সময় নিয়ে অবেলায় গোসল করল। নতুন একটা শাড়ি পরল। এই শাড়ি টুনু তাকে দিয়ে বলেছিল, বিরাট কোনো আনন্দের ঘটনা ঘটলে এই শাড়িটা পরবি। আজ কি যুথির জীবনের খুব আনন্দের কোনো দিন? অবশ্যই না। তারপরেও এই শাড়িটা সে কেন পরল। নিজেও জানে না। মানুষের অনেক কর্মকাণ্ডই যুক্তিছাড়া।পুলিশ যুথীর ঘরও লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে। ঘর গোছাতে হবে। ইচ্ছা করছে না। এই মুহুর্তে মন চাইছে ভাইয়ের লেখা মাহিনের মৃত্যু গল্পটা পড়তে। গল্পটা খুঁজে বের করতে ইচ্ছা করছে না।দৈনিক ভোরের কাগজের সাহিত্যপাতায় প্রকাশিত টুনুর লেখা গল্প।মূল উপন্যাসের সঙ্গে এই গল্পের কোনো সম্পর্ক নেই। যারা মূল উপন্যাসে থাকতে চান, তারা এই অধ্যায়টা বাদ দিতে পারেন।

মাহিনের মৃত্যু

তৃপ্ত সেন

রাত দশটা থেকে দশটা পীচ এই সময়ের মধ্যে মাহিনের মৃত্যু হবে। এই তথ্য সে জানত। তাকে সন্ধ্যা ছাঁটায় মোবাইল ফোনে জানানো হয়েছে। টেলিফোন পাওয়ার পর তার সামান্য শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। সে হাঁ করে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে শুরু করল। মাহিনের স্ত্রী শেফালী বলল, তোমার কি শরীর খারাপ করেছে? মাহিন মুখে কিছু বলল না, হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।শেফালী বলল, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে? হুঁ।বেশি? না বেশি না।কতবার বলেছি। একজন ডাক্তার দেখাও। আমার কোনো কথা তুমি শোনো না। বুকে তেল মালিশ করে দিব? না। ঠান্ডা এক গ্লাস পানি খাব। খুব ঠান্ডা।শেফালী বলল, ফ্রিজের মনে হয় গ্যাস চলে গেছে। ঠান্ডা হয় না। পাশের ফ্ল্যাট থেকে এনে দেই?লাগবে না।কেন লাগবে না! ঠান্ড পানি নিয়ে আসছি।

শেফালী পানির বোতল নিয়ে এসেছে। মাহিনের হাতে পানির গ্ৰাস। এমনিতেই পানি ঠান্ডা, তারপরেও গ্লাসে দুটা বরফের টুকরা ভাসছে। মাহিন বরফের টুকরা দুটার দিকে তাকিয়ে আছে।শেফালী বলল, গ্লাস হাতে নিয়ে বসে আছ, চুমুক দিচ্ছ না কেন? মাহিন পানির গ্লাসে চুমুক দিল। পানি তিতা লাগছে। মৃত্যুর আগে পানি তিতা লাগে–এই কথা সে শুনেছে। বাস্তবেও যে লাগে তা জানা ছিল না। পানি শুধু যে তিতা লাগছে তা-না, রসুন রসুন গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে।শেফালী বলল, শ্বাসকষ্টটা কি কমেছে? মাহিন বলল, হুঁ। শেফালী বলল, ভিডিওর দোকান থেকে একটা ছবি এনেছি। দেখবো? অনেকদিন আমরা একসঙ্গে ছবি দেখি না।মাহিন বলল, ছবি দেখব। কী ছবি? গজনি। খুব না-কি ভালো ছবি।হিন্দি? হুঁ হিন্দি।

আমি তো হিন্দি বুঝি না।শেফালী বলল, আমি বুঝিয়ে দেব।মাহিন বলল, আচ্ছা। বাবু কখন আসবে? শেফালী বলল, এগারোটার দিকে বড় ভাইজান বাবুকে নামিয়ে দিবেন। সে খুব মজা করছে। সবাইকে ছড়া শোনাচ্ছে।বাবুছড়া জানে না-কি? শেফালী বলল, তুমি তো ঘরেই থাকো না। বাইরে বাইরে ঘোরো। বাবু কত কী যে শিখেছে! বানিয়ে বানিয়ে গানও গায়।কী গান? শেফালী তার আড়াই বছরের ছেলের গান ছেলের মতো করে গেয়ে শোনাল–

মামণি ভালো

বেশি ভালো

অনেক ভালো

বনেক ভালো।

মাহিন বলল, বনেক ভালোটা কী? শেফালী বলল, বানিয়ে বানিয়ে বলছে। তোমার ছেলে যে বানিয়ে বানিয়ে কত কথা বলে। মনে হয় বড় হয়ে কবি হবে।মাহিন হঠাৎ বলল, তোমাকে সুন্দর লাগছে।শেফালী লজ্জা পেয়ে গেল। মাহিন এই ধরনের কথা কখনো বলে না; বাসাতেই থাকে না, কথা কখন বলবে!মাহিন ঘড়ি দেখল। সাতটা বাজে। এখনো হাতে তিনঘণ্টা সময় আছে। এর মধ্যে ছবি দেখে ফেলা যায়। তার মাথায় পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা আসছে না। তার বস এমন জিনিস যে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বসে থাকলে সেখান থেকেও ধরে নিয়ে আসবে। বসের সঙ্গে যে দুনম্বরিটা সে করেছে তা কারোরই ধরতে পারার কথা না। বস ঠিকই ধরেছে এবং শাস্তির ব্যবস্থা করেছে।

শেফালী বলল, সব রেডি করেছি। এসো ছবি দেখি।মাহিন বলল, কাছে আসো, তোমার সঙ্গে জরুরি। আলাপ আছে।শেফালী চিন্তিত মুখে এগিয়ে এল। মাহিন সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, তোমার নামে একটা ব্যাংক একাউন্ট আছে। ব্র্যাক ব্যাংক। মিরপুর শাখা। একাউন্ট নাম্বার টেলিফোন বুকে লেখা আছে।শেফালী অবাক হয়ে বলল, আমার নামে ব্যাংক একাউন্ট? হ্যাঁ। সেখানে অনেক টাকা জমা আছে। আমার ভালোমন্দ কিছু হলে সেই টাকা ব্যবহার করবে।তোমার ভালোমন্দ কিছু হবে কেন?

মানুষের ভালোমন্দ যে-কোনো সময় হয়। বিছানায় শুয়ে হার্টফেল করে মানুষ মরে যায় না? চলো ছবি দেখি।ছবি চলছে। মুগ্ধ হয়ে দেখছে শেফালী। স্বামীকে হিন্দি ডায়ালগ তার বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। সে এতটাই মুগ্ধ যে স্বামীর দিকে তাকাচ্ছেও না। মাহিন তাকিয়ে আছে স্ত্রীর দিকে। তার স্ত্রী এত সুন্দর তা সে আগে কখনো লক্ষ করে নি। শেফালী হাসলে গালে টোল পড়ে তাও লক্ষ করে নি। তার ইচ্ছা করছে। স্ত্রীর গা ঘেঁসে বসতে। কিন্তু কেন জানি লজ্জা লাগছে।ছবি শেষ হবার পরপরই গেট থেকে দারোয়ান ইন্টারকমে জানাল–ইসকান্দর নামে একজন তার বন্ধু নিয়ে এসেছে। এদের ঢুকতে দিবে কি না?

মাহিন বলল, ঢুকতে দাও।

শেফালী বলল, কে এসেছে?

মাহিন বলল, তুমি শোবার ঘরে যাও।

শেফালী আবার বলল, কে এসেছে?

মাহিন বলল, কে এসেছে তোমার জানার দরকার নাই। তুমি তোমার ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে।ইসকান্দর এবং তার সঙ্গী হামিদ বসার ঘরে ঢুকেছে। হামিদ সদর দরজা ভেজিয়ে দিয়ে মাহিনের পাশে এসে দাঁড়াল। ইসকান্দর বলল, খবর কিছু পেয়েছেন? মাহিন বলল, কী খবর? বস-কে তো শেষ করে দিয়েছে। কখন?

ইসকান্দর গলা নামিয়ে বলল, কখন সেটা জানি না। বস আমাকে বিকাল পাঁচটায় টেলিফোন করে বলল, অস্ত্র নিয়ে রাত নটায় তার কাছে যেতে। তিনি অপারেশনে পাঠাবেন। একজনকে শেষ করতে হবে। নটার সময় বসের কাছে গিয়ে দেখি–তিনি মরে পড়ে আছেন। কপালে গুলি, পেটে গুলি, বুকে গুলি।মাহিন সিগারেট ধরাল। হামিদ বলল, ওস্তাদ এখন আপনিই আমাদের বস। কী করব বলেন।মাহিন সিগারেটে টান দিতে দিতে বলল, আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাও। সাতদিন ঝিম ধরে থাকো।ইসকান্দর বলল, বস তাহলে চলে যাই?

মাহিন বলল, যাও।তারা চলে গেল। মাহিন শোবার ঘরে ঢুকে শেফালীকে বলল, ছবিটা আমি বুঝতে পারি নাই। তোমার বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। তুমি বুঝাও নাই। ছবিটা আবার ছাড়ো।ছবি শুরু থেকে চলছে। মাহিন স্ত্রীর হাত ধরে বসে আছে। মাথার ওপর ফুল স্পিডে ফ্যান ঘুরছে। শেফালীর চুল এসে মহিনের চোখে-মুখে লাগছে। কী মিষ্টি গন্ধ সেই চুলে!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *