Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

শ্রাবণমেঘের দিন পর্ব – ১১ হুমায়ূন আহমেদ

আবদুল করিম ভুরু কুঁচকে পান চিবাচ্ছিল। বেহালা তার কোলের উপর রাখা। থু করে মুখের পান ফেলে দিয়ে বেহালা কাঁধে তুলে নিল। বেহালার ছড় কপালে ছুঁইয়ে দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপরই হঠাৎ যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। পরাণ ঢোলীর অস্বস্তি দূর হল। খঞ্জনীবাদক শীরদাঁড়া সোজা বসল, বাঁশিওয়ালা তার বাঁশি বদলে নতুন বাঁশি নিল।নীতু বলল, আপা, এরা কি অদ্ভুত বাজনা বাজাচ্ছে দেখেছ?

শাহানা চুপ করে রইল–বাজনা না, একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। যে ঝড়ের উদ্দেশ্য মনের উপর চাপা পড়ে থাকা ধুলা-ময়লা-আর্বজনা উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া। সব ঝড়ের সঙ্গেই বৃষ্টি থাকে, বৃষ্টি মানেই কান্না। বাজনার এই ঝড়েও কান্না আছে। গভীর, গোপন কিন্তু তীব্র কান্না। সেই কান্নার দায়িত্ব নিয়েছে–বেহালা ও বাঁশি। ঢোল হচ্ছে ঝড়, বেহালা হচ্ছে বৃষ্টি।

পরাণ ঢোলী বসে ঢোল বাজাচ্ছিল। হ্যাচকা টানে সে ঢোল কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার সঙ্গে উঠে দাঁড়াল বেহালাবাদক আবদুল করিম।নীতু উত্তেজনায় অস্থির হয়ে বলল–আপা, দেখ কি অদ্ভুত করে ওরা নাচছে। শাহানা আশ্চর্য বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। নৃত্যের উত্তেজনা, ঢোলের তাল, বেহালার তীব্র সুরের ছোঁয়া লেগেছে দর্শকের মনে। চারদিকে বাজনার শব্দ ছাড়া সুনসান নীরবতা। কেউ মনে হয় নিঃশ্বাস ফেলছে না।

নীতু ফিস ফিস করে বলল, আমারো নাচতে ইচ্ছা করছে আপা।শাহানা ভাবছে, এই বাজনা তার কাছে যত সুন্দর লাগছে আসলেই কি তা তত সুন্দর, নাকি বিশেষ এই পরিবেশ তাকে অভিভূত করছে? নিস্তব্ধ গ্রাম, মেঘে ভরা আকাশ–দূরের হাওড় সবকিছুই বাজনায় অংশগ্রহণ করছে বলেই কি এমন লাগছে?

যতই সময় যাচ্ছে বাজনা ততই উদ্দাম হচ্ছে–ঢোলবাদক তার ঢোলকে বিশেষ একদিকে মোড় নেওয়ানোর চেষ্টা করছেন। বেহালাবাদক এবং বংশিবাদকের বিস্মিত দৃষ্টি বলে দিচ্ছে ঢোলে কিছু একটা হচ্ছে যা ধরাবাধা নিয়মের বাইরে…। তারা বিপুল উৎসাহে নতুন করে শুরু করল–। শাহানা তার শরীরে এক ধরনের কাঁপন অনুভব করল। শরীরের ভেতরে যে শরীর আছে সেই শরীরে কিছু একটা হচ্ছে।

গান শুরু হল মাঝরাতে। ততক্ষণে নীতু ঘুমিয়ে পড়েছে। সে ঘুমুচ্ছে শাহানার কোলে মাথা রেখে। আকাশে মেঘ আরো বাড়ছে। গুড় গুড় শব্দ হচ্ছে। যেকোন মুহূর্তে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। মতি আকাশের দিকে উদ্বিগ্ন চোখে একবার তাকিয়েই গান ধরল–

মরিলে কান্দিও না আমার দায়

ও যাদুধন।

মরিলে কান্দিও না আমার দায়…

ও আমার প্রিয়জন আমার মৃত্যুতে তুমি কেঁদো না। তুমি বরং কাফন পরাবার আগে আগে সুন্দর করে সাজিয়ে দিও। গান শুরু হল খালি গলায়। তার সঙ্গে যুক্ত হলো হারমোনিয়াম, বেহালা ও বাঁশি। অপূর্ব গলা–ভরাট, মিষ্টি, বিষাদ মাখা। কিছুক্ষণ আগের উদ্দাম বাজনার স্মৃতি গাতক মতি মিয়া উড়িয়ে নিয়ে গেল। তীব এক বিষাদ মতি মিয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই বিষাদ পৃথিবীর বিষাদ নয়। এই বিষাদ অন্য কোন ভুবনের।শাহানা স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পেল মানুষটি মরে পড়ে আছে–তার অতি প্রিয়জন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সেই কান্না ছাপিয়ে গান হচ্ছে–

মরিলে কান্দিও না আমার দায়

ও যাদুধন।

মরিলে কান্দিও না আমার দায়…

সাধারণ একজন গ্রাম্য গায়ক–সাধারণ সুর অথচ কি অসাধারণ ভঙ্গিতেই না সে জীবনের নশ্বরতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। মনের গভীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে নগ্ন হাহাকার। শাহানার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল। কেউ কি তাকে দেখছে? দেখুক। তার নিজেরও গায়কের সঙ্গে কেঁদে কেঁদে গাইতে ইচ্ছা করছে– মরিলে কান্দিও না আমার দায় ও যাদুধন।মরিলে কান্দিও না আমার দায়…।। গান ভোররাত পর্যন্ত হবার কথা–বৃষ্টির জন্যে সব এলোমেলো হয়ে গেল। অল্পসল্প বৃষ্টি হলে একটা কথা ছিল–আষাঢ় মাসের মুষল ধারার বৃষ্টি। আসর ভেঙে দেয়া ছাড়া গতি কি?

মতি খুব মন খারাপ করে ভিজতে ভিজতে ঘরে ফিরেছে। ঘরে পৌঁছার পর মনে হয়েছে কেরোসিন নেই, হারিকেন জ্বালানো যাবে না। আজ বিকেলেই বোতলের সবটুক কেরোসিন হ্যাজাক লাইটে ভরতে হয়েছে। ঘরের জন্যে আর কেনা হয়নি।ভেজা কাপড় বদলানোর জন্যে শুকনো কাপড় খুঁজে বের করতে হবে। অন্ধকারে এই কাজটা করা সম্ভব না। পাঞ্জাবির পকেটে রাখা দেয়াশলাই ভিজে চুপ চুপ করছে। ঘরে আর কোন দেয়াশলাই আছে বলেও মনে হয় না।

আলোর চেয়েও বড় সমস্যা–অসম্ভব খিদে লেগেছে। ভরপেটে গান গাইতে ওস্তাদের নিষেধ আছে। মতি ভরপেটে গানের আসর করে না। সে দুপুরে খেয়েছিল তারপর আর কিছু খায়নি। খিদেয় শরীর ভেঙে আসছে। প্রচণ্ড ঝাল কোন তরকারি দিয়ে গরম গরম ভাত খেতে ইচ্ছা করছে। তরকারি না হলেও ক্ষতি নেই–গরম ভাত হলেও হবে।

শুকনো মরিচ ভেজে, পেঁয়াজ তেল মাখিয়ে একটা ভর্তা বানাতে পারলে সেই ভর্তামাখা ভাত খেতে হবে অমৃতের মত। ভাত রাঁধার উপায় নে, আগুন নেই। থাকলেও রাঁধতে ইচ্ছা করবে না। শরীর ঝিম ঝিম করছে–জ্বর আসবে হয়ত। শরীর অশক্ত হয়ে পড়েছে, অল্পতেই জ্বরজারি হয়। গান-বাজনা পরিশ্রমের কাজ। শরীর ঠিক না থাকলে গান-বাজনা হয় না। মতি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল–শরীর ঠিক রাখবে কি ভাবে–দুবেলা খাওয়াই জুটে না।

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে শুকনো লুঙ্গি বের করল, গেঞ্জি বর করল। কাঁথা বের করে গায়ে দিল–শীত লাগছে। গায়ে কাঁপন ধরেছে।খিদের জন্যে শরীর ঝিম ঝিম করছে। চিড়া বোধ হয় আছে। কয়েক মুঠো শুকনো চিড়া চিবিয়ে পানি খেয়ে শুয়ে থাকা যায়। শরীর যদিও ভাত ভাত করছে। করলে তো লাভ হবে না। সবই আল্লাহপাকের নির্ধারণ করা। তিনি যদি ঠিক করে রাখেন দু মুঠো শুকনো চিড়া তাহলে শুকনো চিড়াই খেতে হবে। উপায় কি!

অন্ধকারে মতি যে হাড়িতে চিড়া রাখা ছিল সেই হাড়ি খুঁজে পেল না। ভালই হল। খিদে পেটে ঘুম আসে না–কিন্তু খিদে প্রচণ্ড হলে ভাল ঘুম হয়। রাতটা পড়েছে ঘুমের।গান গেয়ে মতি আজ খুশি। সে জানে সে ভাল গেয়েছে। এইসব জিনিশ কাউকে বলে দিতে হয় না। বোঝা যায়। নিজের মনই নিজেকে বলে দেয়। রাজবাড়ির মেয়ে দুটির গান ভাল লেগেছে কি না কে জানে। মনে হয় লাগেনি। গানের মাঝখানে দুজন উঠে গেল। মতি সবচে ভাল যে গানটি গেয়েছে সেটা শুনে যেতে পারল না।

তুই যদি আমার হইতি

আমি হইতাম তোর–

কোলেতে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর…

এই গান তারা না শোনায় ভালই হয়েছে। এই গানের মর্ম শহরের মানুষের বোঝার কথা না। সবার জন্য সব জিনিশ না… মতি জাগনা আছ? কে? আমি। আমি জয়নাল।মতি দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল। ছাতি মাথায় জয়নাল উঠোনে দাঁড়িয়ে। তার হাতে হারিকেন। অন্য হাতে গামছা বাঁধা এলুমিনিয়ামের গামলা।বিষয় কি জয়নাল? ভাত আনছি।মতি বিস্মিত হয়ে বলল, ভাত?

হ ভাত। কুসুম পাঠাইছে। গান শেষ হইতেই কুসুম কইল–জয়নাল ভাই, আমারে এট্টু আগাইয়া দেন। আগাইয়া দিলাম। শেষে কইল, মতি ভাইয়ের জন্যে ভাত লইয়া যান।মতির প্রাথমিক বিস্ময় কেটে গেল। এর আগেও কুসুম গানের শেষে ভাত পাঠিয়েছে। সে জানে, মতি খালি পেটে গান গাইতে আসরে উঠে।

গান শেষে অভুক্ত অবস্থায় ঘুমুতে যায়।জয়নাল দাওয়ায় ভাতের গামলা নামিয়ে রাখল। মতি বলল, হারিকেন থুইয়া যাও জয়নাল–আমার ঘরে বাত্তি নাই। আইজ গান কেন হইছে? জয়নাল উৎসাহের সঙ্গে বলল, দুর্দান্ত গান ইইছে মতিভাই। গলা একখান আল্লাহপাক আপনেরে দিছিল। সোনাদিয়া,এই গলা বান্ধাইয়া রাখন দরকার। কুসুমেরও গান খুব মনে ধরছে।বলছে কিছু?

বলছে–মতিভাই আইজ গান গাইয়া মাইনষের চউকে পানি আনছে। মতিভাইয়ের কপালে অনেক দুঃখ।এই কথা বলল ক্যান? কুসুমের কি মাথার ঠিক আছে–যা মনে অয় কয়–তয় মতিভাই, জব্বর গান হইছে–পিথিমীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। খাইতে বসেন–ভাত গরম আছে।তুমিও চাইরডা খাও আমার সাথে জয়নাল।না না–আফনে খান। আমি যাইগা–বিষ্টি কি নামছে দেখছেন মতিভাই…?

পিথিমী না ডুইব্যা যায়! উঠোনে পানি জমে গেছে। পানিতে থপ থপ শব্দ তুলে জয়নাল চলে গেল। মতি খেতে বসল। গরম ভাত, ডিমের তরকারি, বেগুন ভর্তা, ডাল–এক্কেবারে রাজা বাদশার খানা।খেতে খেতে মতির মনে হল–আজ সে আসলেই ভাল গেয়েছে। ভাল গেয়েছে বলেই আল্লাহপাক তার কপালে লিখেছেন–গরম ভাত, ডিমের ঝোল–তাকে তিনি অনাহারে ঘুমুতে দেননি। কুসুম কেউ না–সে শুধুই উপলক্ষ, উছিলা। আল্লাহপাক সরাসরি কিছু করেন না–যা করার উছিলার মাধ্যমে করেন।মিতু, তুই কেমন আছিস বল তো?

আমি জানি তুই আমার উপর খুব রাগ করে আছিস। তোর কত শখ আমরা তিন বোন মিলে গ্রামে এসে গিয়ে হৈ-চৈ করব। আমার জন্যে তোর শখ মিটল না। মিতু, খুব ছোটবেলা থেকেই আমি ঠিক করে রেখেছিলাম–এ জীবনে কাউকেই কখনো কষ্ট দেব না। দেইও না, শুধু তোর বেলাতেই ব্যতিক্রম হয়। কেন হয় আমি নিজেও জানি না। কেন তোকে আমি বারবার কষ্ট দেই? তুই আমার অতিপ্রিয় এই কারণেই কি? অতি প্রিয়জনদেরই কষ্ট দিতে ইচ্ছে করে।

আজ আমার মনটা খুব খারাপ। এখানে একটা গানের আসর হল। হেলাফেলা ভাব নিয়ে গান শুনতে গিয়ে রীতিমত চমকে গেছি। প্রথমে কিছুক্ষণ বাজনা হল–গ্রাম্য কনসার্ট। একজন নেচে নেচে ঢোল বাজালেন, বাকিরা তাকে সঙ্গত করলেন। আমি বাজনা শুনে অভিভূত হয়েছি এটা বললে কম বলা হবে–আমার চিন্তাচেতনায় একটা ধাক্কা পড়েছে।

কনসার্টের পর শুরু হল গান। এই গ্রামেরই এক গায়ক মতি মিয়া গান শুরু করলেন। বেচারার চোখে কাজল, গায়ে হাস্যকর এক পাঞ্জাবি, যার হাতা ছেঁড়া। রিফু করে সে ছেঁড়া ঢাকা যায়নি। সে হাসিমুখে দর্শকদের মাথা নুইয়ে কয়েকবার সালাম করে গান শুরু করল–মরিলে কান্দিও না আমার দায়–সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখে পানি এসে গেল।

মিতু গানের এই প্রচণ্ড শক্তির কথা আমার জানা ছিল না। বাসায় রাতদিনই গান শুনি। ঘরভর্তি এল. পি.–সিডি ডিস্ক। গান শুনে কতবার অভিভূত হয়েছি–চোখে পানি এসেছে কিন্তু গ্রামের আসরের গ্রাম্য সেই গায়কের গান শুনে চোখে যে পানি এসেছে তার জাত আলাদা। এই গায়ক তার গান দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন–মানব জীবন ক্ষণিকের। ডাক্তার হিসেবে এই তথ্য আমার অজানা নয় তারপরেও মনে হল জীবনে এই তথ্যটির মর্ম প্রথম উপলব্ধি করলাম।

গান শুনতে শুনতে আমার কি ইচ্ছা হচ্ছিল জানিস? আমার ইচ্ছা হচ্ছিল চেয়ার ছেড়ে মঞ্চে উঠে যাই। গায়কের পাশে গিয়ে বসি। গায়ককে বলি–শুনুন, আপনি কোন দিন আমাকে ছেড়ে যেতে পারবেন না। আপনাকে আমৃত্যু আমার পাশে পাশে থাকতে হবে। আপনি কোনদিনও আর আসর করে গান গাইতে পারবেন না—বাকি জীবন আপনাকে গান গাইতে হবে শুধুই আমার জন্যে।তুই কি ভাবছিস আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

ঘোরের মত তৈরি হয়েছে তো বটেই। এই ঘোর সামাল দেবার ক্ষমতাও আমার আছে। যে মেয়ে দুদিন পর জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটিতে পিএইচ. ডি করতে যাবে সে এক অশিক্ষিত মূর্খ গ্রাম্য গায়ককে কখনো বলতে পারবে না–আপনি আমাকে ছেড়ে যেতে পারবেন না। বলতে পারা উচিতও বোধহয় না। ঐ গ্রাম্য গায়ক একটা বিদ্যা আয়ত্ত করেছেন। ঐ বিদ্যার ক্ষমতা সম্পর্কেও তার ধারণা নেই। ঐ বিশেষ বিদ্যাটির প্রতি ভালবাসা তার দিকে নিয়ে যাওয়া কোন কাজের কথা না।

কিন্তু মিতু, আমি এতই অভিভূত হয়েছি যে আমার মন শুধুই কাঁদছে–। বার বার মনে হচ্ছে, আমি যদি এই গ্রামের অশিক্ষিত দরিদ্র এক তরুণী হতাম–তাহলে কি চমৎকার হত! ছুটে যেতাম তার কাছে। হায় রে! আমার জন্ম হয়েছে অন্য জগতে–আমি রাজবাড়ির মেয়ে–ভীরু ধরনের মেয়ে, যার সাহস ঢাকা থেকে একা একা সুখানপুকুরে উপস্থিত হবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

এর বাইরে যাবার ক্ষমতা যার নেই। প্রতিভার প্রাথমিক পর্যায় চারাগাছের মত। সতেজ ছোট্ট একটা চারাগাছ যে লক লক করে বেড়ে ওঠার জন্যে অপেক্ষা করছে। প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে সযত্নে রক্ষা করতে হয়। তারপর এক সময় সে মহীরুহে পরিণত হয়, তখন আর তার কোন কিছুরই প্রয়োজন নেই। আচ্ছা মিতু, আমি কি… না থাক।মিতু, তুই চলে আয়। আমার খুব একা একা লাগছে।

শরীরটাও ভাল নেই–গানের আসর থেকেই জ্বর জ্বর ভাব নিয়ে ফিরেছি। দেখতে দেখতে জ্বর বেড়েছে। শারীরিক অবস্থাও ঘোর তৈরির একটি কারণ হতে পারে…। তুই চলে আয় মিতু–তোকে নিয়ে দু-একদিন খুব বেড়াব, তারপর ঢাকায় চলে আসব। নিজের ভুবনে–নিজের জগতে। বাইরের কোন কিছুই তখন আর আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। আমরা আধুনিক মানুষ–কচ্ছপের মত শক্ত খোলে ভেতর থাকাই আমাদের জন্যে নিরাপদ।

কান্নার শব্দ আসছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কে যেন কাঁদছে। চিঠি লেখা বন্ধ করে শাহানা উঠে দাঁড়াল। মনে হচ্ছে নীতু কাঁদছে। এরকম করে সে কাঁদছে কেন? আশ্চর্য তো! শাহানা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নীতু না, কাঁদছে পুষ্প। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নীতু পুষ্পের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নীতুর মুখ বিষণ্ণ।শাহানা বলল, কি হয়েছে নিতু? নীতু জবাব দিল না। শাহানা পুষ্পের দিকে তাকিয়ে বলল, পুষ্প, কি হয়েছে? পুষ্প বলল, কিছু হয় নাই।অকারণে কেউ তো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে না। কিছু একটা নিশ্চয়ই হয়েছে। কি হয়েছে তুমি কি বলতে চাও না?

পুষ্প নাসূচক মাথা নাড়ল। শাহানা লক্ষ্য করল, পুষ্পের ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।নীতু বলল, দাদাজান ওকে মেরেছেন। চড় মেরেছেন।ও আচ্ছা।নীতু বলল, ওকে চলে যেতে বলেছেন। ও চলে যাচ্ছে।শাহানা নিজের ঘরে চলে এল। সমস্যা কিছু হয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে। নীতুর মুখ কঠিন হয়ে আছে। এই মুখ বিদ্রোহিনীর মুখ। সে নিজেকে সামলে রাখতে চেষ্টা করছে।এমন মানসিক পরিস্থিতিতে চিঠিতে মন বসানো যায় না। শাহানা নিজের ঘরের বিছানায় বসল। সে ভেবেছিল, কিছুক্ষণের মধ্যে নীতু ঘরে ঢুকে পুরো ব্যাপারটা বলবে।

নীতু ঘরে ঢুকল না। কি হয়েছে কিছু জানা যাচ্ছে না। দাদাজান মেরেছেন, অকারণে নিশ্চয়ই মারেননি। একজন বৃদ্ধ সুস্থ মাথার মানুষ অকারণে শিশুর গায়ে হাত তুলবেন না। ব্যাপারটা কি? ব্যাপারটা সামান্যই। ইরতাজুদ্দিন সাহেব বাংলোঘরের জানালা থেকে দেখেছেন পুষ্প নীতুর হাত ধরে হাঁটছে। কি সব বলছে, নীতু হেসে ভেঙে পড়ছে। তিনি পুষ্পকে ডেকে পাঠালেন।

নীতুও সঙ্গে সঙ্গে এল। নীতুকে তিনি চলে যেতে বললেন। নীতু গেল না, দাঁড়িয়ে রইল। তিনি পুষ্পের চোখের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সহজ গলায় বললেন–কি রে, তুই নীতুর হাত ধরে হাঁটছিস কেন? এক ফোঁটা শরীরে এত সাহস! বলেই কারো কিছু বুঝবার আগে প্রচণ্ড চড় কষালেন। পুষ্প এর জন্যে, প্রস্তুত ছিল না বলে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। ইরতাজুদ্দিন আরো সহজ গলায় বললেন–কাঁথা বালিশ নিয়ে বাড়ি চলে যা। আর যেন তোকে ঐ বাড়িতে না দেখি।

এখন বিকেল। রোদ মরে এসেছে। নীতুর খুব একা একা লাগছে। পুষ্প নেই। সে তার মাদুর ও বালিশ না নিয়েই চলে গেছে। আপন মনে খানিকক্ষণ বারান্দায় হাঁটল, তারপর গল্পের বই নিয়ে বাড়ির পেছনের বাগানে চলে গেল। সেখানে। কাঁঠালগাছে বড় দোলনা টানানো হয়েছে। দোলনায় দোল খেতে খেতে গল্পের বই পড়া যায়। সঙ্গে আনা বই সব পড়া হয়ে গেছে। নীতু পুরানো একটা বই—জল দস্যু নিয়ে দোলনায় উঠে বসল। সন্ধ্যা পর্যন্ত গল্পের বই পড়ল।

সন্ধ্যা মেলাবার পর শাহানার ঘরে ঢুকে বলল, আপা, পুষ্প তো চলে গেছে, আজ রাতে আমি তোমার সঙ্গে ঘুমুব।শাহানা বলল, আচ্ছা।আমরা আর কদিন আছি আপা? চারদিন। তোর কি চলে যেতে ইচ্ছা করছে? না, চারদিন পরই যাব।তোর কি মন বেশি খারাপ? হুঁ।ছাদে যাবি? চল ছাদে বসে গল্প করি। যাবি? হুঁ যাব। দাঁড়াও, এক মিনিট। দাদাজানকে একটা কথা বলে আসি।রাগারাগি করবি না তো? না।খবরদার! রাগারাগি করবি না। আমি কি আসব তোর সাথে? উহুঁ।

ইরতাজুদ্দিন নামাজঘরে বসেছিলেন। মাগরিবের নামাজ শেষ করে তসবি টানছেন। নামাজঘরে মোমবাতি জ্বলছে। মশা তাড়াবার জন্যে ধূপ জ্বালানো হয়ছে। ধূপের গন্ধে গা কেমন কেমন করে। নীতু নামাজঘরে ঢুকল না। দরজা ধরে দাঁড়াল। ইরতাজুদ্দিন তসবি নামিয়ে রেখে বললেন, কিছু বলবি? নীতু বলল, হ্যাঁ। বল শুনি।নীতু খুব স্পষ্ট করে বলল, দাদাজান, আপনি অকারণে পুষ্প মেয়েটাকে মেরেছেন। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। খুব অন্যায় করেছেন।

ইরতাজুদ্দিন শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, মানুষ হয়ে জন্মালে এইসব ছোটখাটো অন্যায় করতে হয়। পশুরাই শুধু কোন অন্যায় করে না। আমি তো আর পশু না। আমি মানুষ।দাদাজান, অন্যায় করেছেন। আমি প্রচণ্ড রকম রাগ করেছি আপনার উপর। আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ মেয়েটিকে ডেকে ক্ষমা চাইবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এ বাড়ির কোন খাবার খাব না।তাই নাকি?

হ্যাঁ তাই।নীতু দরজার পাশ থেকে সরে এল। ইরতাজুদ্দিন ব্যাপারটার কোন গুরুত্ব দিলেন না। বাচ্চা একটা মেয়ের কথায় গুরুত্ব দেবার কিছু নেই। এক বেলা না খেলে কিছু। হয় না। তিনি আবারো তসবি টানতে লাগলেন।নীতু ছাদে বসে শাহানার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করল। মজার মজার গল্প। একবার তাদের স্কুলে এক বানরওয়ালা বানরের খেলা দেখাতে এসেছিল–বানরটা হঠাৎ ছুটে এসে নাইন বি সেকশানে ঢুকে কি কাণ্ডকারখানা শুরু করল।

তিথি নামে একটা মেয়ের গলা জড়িয়ে ধরল। মেয়ে চিঙ্কার দিয়েই অজ্ঞান। গল্প শেষ করে রান্নাঘরে ঢুকে রমিজের মা কি করে কুমড়ো ফুলের বড়া তৈরি করে সেটা আগ্রহ করে দেখল।রাতে ঘুমুতে গেল না খেয়ে।মনোয়ারার মনে সকাল থেকে কু ডাকছিল। মনে হচ্ছিল আজ ভয়ংকর কিছু ঘটবে। কেউ খুব খারাপ কোন খবর নিয়ে আসবে। বিব্রত গলায় সেই খারাপ খবর দিয়ে বলবে–সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা। আল্লাহপাক যা করেন মানুষের মঙ্গলের কথা চিন্তা কইরা করেন। উনি পরম দয়ালু রাহমানুর রহিম।

যদিও মনোয়ারা তার জীবনে আল্লাহর পরম দয়ার তেমন কোন পরিচয় পাননি। তার কাছে প্রায়ই মনে হয়–আল্লাহ খুব কঠিন হৃদয়ের কেউ–মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাকে বিচলিত করে না। তার বিশাল সৃষ্টিজগৎ। মানুষের মঙ্গল নিয়ে চিন্তা-ভাবনার তাঁর সময় কোথায়? যার সামান্য ইশারায় জগৎ সৃষ্টি হয়, তার ইচ্ছা হলেই সমগ্র মানবজাতির দুঃখ-কষ্ট দূর হবার কথা। তা তো হয় না–মানুষের দুঃখ কষ্ট শুধুই বাড়ে–শুধুই বাড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *