সম্রাট পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

সম্রাট পর্ব – ২

তোমাকে কফির ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে, সেটা কর। আমি কোনো কথাই দ্বিতীয় বার বলা পছন্দ করি না।ফোর্টনকের যে-সেলটিতে জুলিয়াস নিশোকে রাখা হয়েছে, তার একটি বিশেষ নাম আছে-না-ফেরা ঘর। এ-ঘর থেকে কেউ কখনো ফেরে না। মোরান্ডার খ্যাত। অখ্যাত বহু মানুষ এ-ঘরে ঢুকেছেন, কেউ বেরুতে পারেন নি।

জুলিয়াস নিশোর ব্যাপারে একটি ব্যতিক্রম আছে, তিনি দশ বছর আগে এক বার ঢুকেছিলেন। পঞ্চম দিনে গৃহযুদ্ধ বেধে গেল, সপ্তম দিনে জুলিয়াস নিশোকে ঘর থেকে বের করে আনতে হল গৃহযুদ্ধ থামাবার জন্যে।এর মধ্যেই মাউ উপজাতির এক-পঞ্চমাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এরা অত্যন্ত সাহসী মানুষ। মোরান্ডা সেনাবাহিনীর ওপর তারা বড় রকমের আঘাত করেই মারা গেল।

সেসময় মাউ উপজাতীয়দের মধ্যে বিদ্যুতের মতো যেকথাটি ছড়িয়েছিল, তা হচ্ছে -নিশোর জন্যে একটি প্রাণ দিন। তিনি আবার তা ফিরিয়ে দেবেন। দশ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। এই সময়ে অনেক কিছুই বদলে যায়। নিশোও বদলেছেন। সেসময় তাঁর মাথাভর্তি চুল, চোখের দৃষ্টি ছিল তীক্ষ।

এখন মাথায় একগাছিও চুল নেই। ভারি চশমা ছাড়া দশ হাত দূরের মানুষটিকে চিনতে পারেন না। তবু কিছু কিছু জিনিস আছে, যা সময়ের সঙ্গে বদলায় না। যেমন স্বভাব। নিশো ঠিক আগের বারের মতোই হাসিমুখে বললেন, সুপ্রভাত, সুপ্ৰভাত।কারাধ্যক্ষ মাওয়া শুকনো মুখে তাকাল।তোমার নাম খুব সম্ভব মাওয়া। ঠিক না?

মাওয়া মাথা নাড়ল।এত বিমর্ষ হয়ে আছ কেন? দশ বছর আগে তোমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। পুরোনো পরিচয়ের সূত্রেও একটু হাস।মাওয়া হাসির মতো ভঙ্গি করল। নিশো বললেন, তোমারও দেখি বয়স হয়েছে। নিচের পাটির দাঁত পড়ে গেছে। আমার ধারণা, শুধু আমার একারই বয়স হচ্ছে।

হা হা হা।মাওয়া শান্ত স্বরে বলল, আমার দুর্ভাগ্য স্যার, আবার আপনাকে এই অবস্থায় দেখলাম।নিশো মাওয়ার কথার কোনোরকম গুরুত্ব দিলেন না। সহজভাবেই নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চাইলেন। শুধুমুখে চাওয়া নয়, লিখিতভাবে চাওয়া। গোটাগোটা অক্ষরে লিখলেন

০ খবরের কাগজ……. ০ ট্রানজিস্টার রেডিও (মাল্টি ব্যান্ড)…… ০ লেখার কাগজ…….০ চুরুট (ভালো চুরুট)……০ কফি (ইন্সট্যান্ট কফি নয়)…….০ জন স্টেইনবেকের সুইট থার্ড ডে উপন্যাস।……..০ এ্যারেন পাউলের কালো মানুষদের কবিতা।

মাওয়া বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, লেখার কাগজ, চুরুট এবং কফি ছাড়া অন্য কিছুই দেওয়া যাবে না। আপনি স্যার কিছু মনে করবেন না।আমি কখনো কিছু মনে করি না। বই দুটি কি দেওয়া যাবে? এই জঙ্গলে বই কোথায় পাব? ঠিক আছে।আপনার সেবার জন্যেও কাউকে দেওয়া যাচ্ছে না। একমাত্র আমিই আসব আপনার কাছে। দিনে এক বার আসব।

ভালো, তবে এমন গোমড়া মুখে আসবে না। হাসিমুখে আসবে। আমাদের এমনিতেই অনেক দুঃখ-কষ্ট আছে। এর মধ্যে গোমড়া মুখ দেখতে ইচ্ছা করে না। যদিও মাওয়া বলেছিল, খবরের কাগজ ট্রানজিস্টার রেডিও এসব কিছুই দেওয়া হবে না, তবুও মাওয়া মধ্যাহ্নকালীন খবরের কিছু আগে একটি ছোট ট্রানজিস্টার নিয়ে নিশোর কাছে গেল—ভয়ার্ত স্বরে বলল, আপনার প্রসঙ্গে একটি খবর প্রচারিত হয়েছে। সকাল এগারটায়।

এখনো বোধহয় আবার বলবে। নিশো মুচকি হেসে বললেন, মজার খবর নাকি? মাওয়া কোনো জবাব দিল না।নিশো মোরান্ডা বেতারের খবর শুনলেন শান্ত ভঙ্গিতে। মাঝেমাঝে চুরুটে টান দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উত্তেজনা তাঁর আচার-আচরণে প্রকাশ পেল না।আমরা গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি—মোরান্ডার প্রিয় মানুষ জুলিয়াস লিম্বানি। নিশো আজ ভোর চার ঘটিকায় আলজেরিয়াতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

জেনারেল ডোফাপরলোকগত জননেতার শোকসন্তপ্ত পরিবারের কাছে এক শোকবাণীতে জানান-জুলিয়াস লিম্বানি নিশোর মৃত্যু শুধু মোরান্ডার নয়, সমগ্র পৃথিবীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। জুলিয়াস লিম্বানি নিশোর বিদেহী আত্মার প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশে আগামী তিন দিন রাষ্ট্ৰীয় শোকদিবস হিসেবে পালন করা হবে। বিদেশে অবস্থিত মোরান্ডার দূতাবাসগুলিতে এই উপলক্ষে শোক-বই খোলা হয়েছে। রাজধানীর প্রতিটি ভবনে পতাকা অৰ্ধনমিত রাখা হয়েছে।

জুলিয়াস নিশো হালকা স্বরে বললেন, ফোটনকেও কি পতাকা অৰ্ধনমিত? মাওয়া হা-সূচক মাথা নাড়ল। নিশো মাথা নিচু করে হাসলেন।অনেকক্ষণ ধরে ফোন বাজছে।ফকনার বসে আছে পাশেই, কিন্তু রিসিভার তুলছে না। কানের পাশে ফোন বাজা একটি বিরক্তিকর ব্যাপার। কিন্তু লোকটি বিরক্ত হচ্ছে না। নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগারেট ফুকছে। মাঝেমাঝে ভুরু কোঁচকাচ্ছে, যা থেকে মনে হতে পারে কোনো–একটি বিষয় নিয়ে সে চিন্তিত।

হার্ভি ফকনার হচ্ছে সেই জাতীয় লোক, যাদের বয়স বোঝা যায় না। এর জুলফির সমস্ত চুল পাকা। বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চান্নর মধ্যে হতে পারে। মাঝারি আকৃতির মানুষ। রোদে পোড়া তামাটে গায়ের রঙ। চোখ দুটি অস্বাভাবিক ছোট। বিড়ালের চোখের মতো জ্বলজ্বলে। সমস্ত মুখাবয়বে একটি ছেলেমানুষি ভাব আছে, তীক্ষ চোখের কারণে যা ্কখনো স্পষ্ট হয় না।

টেলিফোন বেজেই যাচ্ছে। ফকনার রিসিভার এক বার তুলেই নামিয়ে রাখল। যদি ওপক্ষের প্রয়োজন খুব বেশি হয় আবার করবে।প্রয়োজন বেশ আছে মনে হচ্ছে। আবার টেলিফোন বাজছে। ফকনার সিগারেটে শেষ টান দিয়ে রিসিভার তুলল।হ্যালো।হার্ভি ফকনার? কথা বলছি।আমি কি আপনার সঙ্গে একটি জরুরি বিষয় নিয়ে আলাপ করতে পারি? তার আগে আপনার নাম বলুন।নাম বললে আপনি আমাকে চিনতে পারবেন না।আমি অপরিচিত কারো সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলি না।

ফকনার নির্বিকার ভঙ্গিতে টেলিফোন নামিয়ে রাখল। এটা প্রায় নিশ্চিত, লোকটি আবার টেলিফোন করবে। প্লাগ খুলে রাখলে কেমন হয়? ফকনার দ্বিতীয় বার সিগারেট ধরিয়ে বাথরুমে ঢুকল। দু দিন শেভ করা হয় নি। গালভর্তি নীলচে দাড়ি। হেমিংওয়ের মতো দাড়ি রাখার একটা পরিকল্পনা ছিল। এখন মনে হচ্ছে সেটা সম্ভব নয়, গাল চুলকাচ্ছে। কিন্তু দাড়িগুলির ওপর একটি মায়া পড়ে গেছে। থাকুক না-হয় কিছুদিন, তারপর দেখা যাবে। ফকনার আয়নায় নিজের ছবির দিকে তাকাল। লোকটিকে চেনা যাচ্ছে না, যেন অপরিচিত কেউ।

টেলিফোন আবার বাজতে শুরু করেছে। বাজুক। তার এমন কোনো ঘনিষ্ঠ মানুষ নেই, যারা এরকম সাত-সকালে ব্যাকুল হয়ে টেলিফোন করবে। ফকনার মনেমনে বলল, আই হ্যাপেন্ড টু বি এ লোনলি ম্যান। কার কবিতা যেন এটা? এ্যান্থনি স্কীলম্যান? মনে পড়ছে না। স্মৃতিশক্তি আগের মতো নেই। বাথরুমের বেসিনে গত রাতের অভুক্ত খাবারসুদ্ধ প্লেট পড়ে আছে। দূষিত একটা গন্ধ চারদিকে। মেঝেতে তিনটি বিয়ারের খালি ক্যান। লোনলি ম্যান হবার অনেক রকম ঝামেলা।

হেল্পিং হ্যান্ডজাতীয় কাউকে পাওয়া গেলে মন্দ হত না। ঘর পরিষ্কার করে রাখত। বললেই পারকুলেটর চালু করে কফি বানিয়ে আনত। কফির কথা মনে হতেই তার কফির তৃষ্ণা হল। ক্ৰীম, সুগারবিহীন র-কফি। ব্রাজিলিয়ান বিস্ থেকে টাটকা তৈরি, যার গন্ধেই স্নায়ু সতেজ হয়ে ওঠে।টেলিফোন এখনও বাজছে। ফকনার বিরক্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল— হ্যালো।আমি লিজা, লিজা ব্রাউন।

ফকনার চিনতে পারল না। মেয়েদের নাম তার মনে থাকে না।তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ না? চিনতে পারব না কেন? কেমন আছ লিজা? তাহলে এমন রাগীরাগী গলায় কথা বলছ কেন? সকালবেলা ঘুম ভাঙলে আমার খুব মেজাজ খারাপ থাকে তো, তাই।রাতে খুব ড্রিংক করেছ, তাই না? খুব না, তিন ক্যান বিয়ার। তিন ক্যান বিয়ার খেলে একটা মৌমাছির নেশা হয়, কিন্তু আমি মৌমাছি না।তুমি সবসময় এমন মজার-মজার কথা বল কেন?

মেয়েটি খিলখিল করে হাসতে লাগল। হাসির শব্দটা চেনা। সি থেকে মেয়েটিকে চেনা যাচ্ছে। নর্থ অ্যাভিন্যুর পিজা পার্লারের মেয়ে। হাসি-রোগ আছে। মেয়েটির। অকারণে আসবে এবং বকবক করবে।গত সপ্তাহে পিজা এনে দিয়ে গিয়েছিল। অন্যদের মতো প্যাকেট নামিয়ে রেখেই চলে যায় নি। হাসিমুখে বলেছে, পিজা ছাড়া তুমি কিছু খাও না? প্রায়ই তোমাকে পিজা পালারে দেখি। তুমি নিশ্চয়ই ইটালিয়ান নও? না, ইটালিয়ান নই। পিজাও খুব পছন্দ করি না। সস্তা বলে খাই। আমি একজন দরিদ্র ব্যক্তি।তোমার ঘর এত নোরা কেন?

ফকনার হেসে ফেলল।হাসছ কেন? নোংরা ঘর আমার ভালো লাগে না। গা জ্বলে।আমি মানুষটি খুব পরিষ্কার, কাজেই আমার ঘর নোংরা। যে-সব মানুষের ঘরদুয়ার খুব পরিস্কার, তারা মানুষ হিসেবে নোংরা।কই, আমি তো মানুষ হিসেবে ভালোই। কিন্তু আমার ঘর তো খুব পরিষ্কার, ঝকঝকে।আমার থিওরি শুধু ছেলেদের জন্যেই। মেয়েদের জন্যে নয়। মেয়েদের বেলায় উল্টোটা।তুমি তো খুব চালাক মানুষ।

ফকনার মেয়েটির চেহারা মনে করতে চেষ্টা করল। চেহারা মনে পড়ছে না। তার মানে মনে রাখার মতো চেহারা নয়। সুন্দরী মেয়েদের চেহারা মনে থাকে। এই মেয়েটিকে নিয়ে সে কি কখনো বাইরে খেতে গিয়েছে? মনে হয় গিয়েছে। কারণ সে। কথা বলছে অত্যন্ত পরিচিত ভঙ্গিতে। ফকনার মনে করতে চেষ্টা করল লিজা ব্রাউন নামের কাউকে নিয়ে সে ডেটিং-এ গিয়েছে কি না।হ্যালো, তুমি কথা বলছ না কেন? কী বলব? পিজার অর্ডার দিলে দুপুরবেলা নিয়ে আসতে পারি। আনব?

আনতে পার। তার মানে, তোমার খুব-একটা ইচ্ছা নেই।ইচ্ছা থাকবে না কেন, ইচ্ছা আছে। সুন্দরী মেয়েদের সামনে বসিয়ে পিজা খেতে আমার ভালোই লাগে।আমি সুন্দরী, তোমাকে কে বলল? আমার কাছে পৃথিবীর সব মেয়েকেই সুন্দরী মনে হয়। সবাইকে মনে হয় হেলেন অব ট্রয়।তুমি এত মজার কথা বল কেন? আমি মানুষটি মোটেই মজার নই, সেজন্যেই বোধহয়। আচ্ছা শোন, আমি কি কখনো তোমাকে নিয়ে বাইরে খেতেটেতে গিয়েছি? লিজা ব্রাউন অবাক হয়ে বলল, তোমার মনে নেই? না।তার মানে, তুমি অসংখ্য মেয়েকে নিয়ে ডেটিং-এ গেছ?

ফকনার কিছু বলল না। লিজা ব্রাউন বলল, আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি আসব দুপুরে।ফকনার টেলিফোন নামিয়ে বাথরুমে ঢোকামাত্র কলিংবেল বাজল। কলিংবেলের শব্দ থেকে যে এসেছে তার সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। যেমন, অল্পবয়েসী মেয়েরা খুব ঘন-ঘন বেল বাজাবে। বৃদ্ধরা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বেশ টিপে ধরে থাকবে, সেই সঙ্গে কড়া নাড়বে।

কিন্তু এখন যে বাজাচ্ছে, তার সম্পর্কে কোনো ধারণা করা যাচ্ছে না। ফকনার দরজা খুলল। নীল স্যুট-পরা লম্বা একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বীমা কোম্পানির এজেন্টদের মতো ছিমছাম একটা ব্রীফকেস। লোকটি মেয়েলি গলায় বলল, ভেতরে আসতে পারি? আসুন।আমিই কিছুক্ষণ আগে আপনাকে টেলিফোন করেছিলাম। আমার নাম জন হপার।বসুন। কি ব্যাপার, বলুন।আমার কিছুক্ষণ সময় লাগবে।আপনাকে দশ মিনিট সময় দেওয়া হল।আধ ঘন্টা দিন।ঠিক আছে, আধ ঘন্টা। কফি?

হ্যাঁ, কফি খেতে পারি।জন হপার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারদিক দেখতে লাগল, যেন ঘরের অবস্থা থেকে এর বাসিন্দা সম্পর্কে একটা ধারণা করতে চায়।ফকনার কফির পেয়ালা হাতে করে তার সামনে এসে বসল। ভারি গলায় বলল, হ্যাঁ, এবার বলুন।আপনি নিশ্চয়ই জেনারেল ডোফাকে চেনেন? হ্যাঁ, ভালো পরিচয় আছে। আমি তার একটি কমান্ডো গ্রুপকে ট্রেনিং দিয়েছিলাম। গ্রুপের নাম ছিল প্যান্থার।জুলিয়াস নিশোর সঙ্গে কি আপনার কখনো দেখা হয়েছিল?

না। রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে আমার কোনো উৎসাহ নেই।জেনারেল ডোফার সঙ্গে কি আপনার কোনোযোগাযোগ আছে? না। আমি হচ্ছি ভাড়াটে সৈন্য। যে টাকা দেবে তার হয়ে আমি কাজ করব। কাজ শেষ হলে চলে আসব। ডোফার কমান্ডো ইউনিট তৈরি হবার পর চলে এসেছি। আর কোনোযোগাযোগ হয় নি।আপনি কি গতকালের খবরের কাগজ পড়েছেন? না, খবরের কাগজ আমি পড়ি না। পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে, সে সম্পর্কে আমার কোন উৎসাহ নেই।তাহলে জুলিয়াস নিশোর মৃত্যুসংবাদ আপনি জানেন না?

তা জানি। টিভি নিউজ দেখেছি। সিবিএস ভালো কভারেজ দিয়েছে।জুলিয়াস নিশোর মৃত্যু কি আপনার কাছে খুব রহস্যময় মনে হয় না? দেখুন মিঃ হপার, মৃত্যুর মধ্যে কোনো রহস্য নেই। আপনি কী বলতে চান খোলাখুলি বলুন। আমি স্পষ্ট কথা ভালবাসি।আপনি কি সাউথ আফ্রিকায় একটি মিশন পরিচালনা করতে পারবেন?

সেটা নির্ভর করে কী পরিমাণ টাকা পাওয়া যাবে তার ওপর এবং মিশনটি কী ধরনের তার ওপর।জুলিয়াস নিশোকে ফোর্টনক থেকে বের করে আনা।মৃত একজন মানুষকে বের করে আনার প্রয়োজনটি ধরতে পারলাম না।জুলিয়াস নিশো বেঁচে আছেন।ফকনার সিগারেট ধরিয়ে দীর্ঘ টান দিয়ে শুকনো গলায় বলল, মিঃ হপার, আপনি কে? আমি সিআইএ-র সঙ্গে আছি।আমার সঙ্গে কী ধরনের কথা বলার দায়িত আপনাকে দেওয়া হয়েছে?

মিশন সম্পর্কে যদি আপনি উৎসাহী হন, তাহলে আপনাকে শিকাগোতে নিয়ে যাবার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।কখন যেতে চান? আমরা এখনি রওনা হতে পারি।যাবেন কিসে? আমি সেনাবাহিনীর একটি বিমান নিয়ে এসেছি। একটা টু-সীটার।আপনি নিজেই চালাবেন? হ্যাঁ। আমি একজন বৈমানিক। এক সময় বিমানবাহিনীতে ছিলাম।বিষয়টি খুব জরুরি মনে হচ্ছে?

খুবই জরুরি।টাকার ব্যাপারে সিআইএ কৃপণতা করবে না বলে আশা করতে পারি।টাকা কোনো সমস্যা হবে না বলেই মনে করি। মিঃ ফকনার, আপনি তৈরি হয়ে নিন।আমি তৈরিই আছি। শুধু একটা নোট লিখে দরজায় রেখে যাব।লিজা ব্রাউন পিজার প্যাকেট নিয়ে এসে দরজায় আটকানো নোটটি পড়ল।লিজা, তুমি খাবারের প্যাকেটটি দরজার বাইরে রেখে যাও। দেখা হল না বলে দুঃখিত। তারপর বল, তুমি কেমন আছ? ফকনার।

পুনশ্চঃ খাবারের বিল আমি এসে মিটিয়ে দেব।লিজা ব্রাউন বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটির বয়স খুবই অল্প। সাদামাঠা চেহারা। মাথার চুল ছেলেদের মত কাটা বলেই হয়তো সমস্ত চেহারায় একধরনের মায়াকাড়া ভাব এসেছে। সে কি কিছুটা হতাশ হয়েছে? হয়তো-বা। অল্পবয়সী মেয়েরা সহজেই হতাশ হয়।

ফকনার ক্রমেই বিরক্ত হচ্ছিল।তাকে এক ঘন্টার ওপর এন্ট্রি-রুমে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এন্ট্রি-রুমটি ছোট। আলো-বাতাস নেই। বসার জন্যে চামড়ার গদিওয়ালা চেয়ারগুলি নোংরা। সমস্ত মেঝেতে সিগারেটের ছাই। এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের এন্ট্রি রুমের এই অবস্থা কেন? নাকি ইচ্ছা করেই এ-রকম রাখা হয়েছে মনের ওপর চাপ ফেলবার জন্যে।

দেড় ঘন্টার মাথায় তাকে জানানো হল, জেনারেল সিমসন ব্যস্ত, তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ডাক পড়বে। তাকে একজন কে এসে এক কাপ কফি দিয়ে গেল। ইন্সট্যান্ট কফি—এমন একটা গন্ধ, নাকে গেলেই বমি-বমি ভাব হয়।জেনারেল সিমসনের অফিসের দরজা খুলল। অল্পবয়সী একটি তরুণ (সম্ভবত জেনারেলের পিএ) এসে বলল, মিঃ ফকনার, আপনি আসুন। সে ফকনারকে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল।

প্ৰকাণ্ড সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপাশে যে-ছোটখাটো মানুষটি বসে আছেন, তাঁকে ফকনারের মোটেই পছন্দ হল না। জেনারেল সিমসনের বয়স ষাটের কোঠায়। শরীর অশক্ত। মাথায় একগাছিও চুল নেই। মাথা নিচু করে বসে-থাকা মানুষটিকে দেখেই মনে হয় অনেক ধরনের রোগ-ব্যাধি এঁকে ধরে আছে। পিঙ্গল বর্ণের চোখ। তাকানোর ভঙ্গিতে একধরনের অবহেলা আছে, যা অন্যদের মনে হীনমন্য দেয়। জেনারেল সিমসন ভারি স্বরে বললেন, আপনিই ফকনার। কর্নেল ফকনার?

হ্যাঁ।বসুন।ফকনার বসল। সে আশা করেছিল জেনারেল সিমসন উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করবেন। তিনি তা করলেন না, যেন ফকনার একজন ছোট পদের অধস্তন কর্মচারী। তার সঙ্গে বাড়তি সৌজন্য দেখানোর প্রয়োজন নেই।

জেনারেল সিমস কিছুক্ষণের জন্যে একটা ফাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। টেলিফোনে কাকে যেন কী-সব বললেন। এও একধরনের চাল। চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো—তুমি অত্যন্ত নগণ্য ব্যক্তি। বসে থাক চুপচাপ। আমার কাজ শেষ হোক, তারপর দেখা যাবে।সেনাবাহিনী থেকে আপনাকে ডিসচার্জ করা হয়েছিল? হ্যাঁ।কেন?

 

Read more

সম্রাট পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.