সম্রাট পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

সম্রাট পর্ব – ৩

ফকনার ঠাণ্ডা স্বরে বলল, কেন করা হয়েছিল তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। যেপ্রশ্নের উত্তর জানেন, তার উত্তর আবার শোনাবার কারণ দেখি না।ফকনার সিগারেট ধরাল। সে তার বিরক্তি চেপে রাখতে পারছিল না। জেনারেল সিমসন বললেন, আমি নন-স্মকার, তামাকের গন্ধ আমার সহ্য হয় না। দয়া করে। সিগারেটটি ফেলে দিন।আমি বরং পাশের ঘরে গিয়ে সিগারেট শেষ করে আসি।

ইতোমধ্যে আপনার যা বলবার ঠিকঠাক করে রাখুন। লম্বা ধরনের আলাপ-পরিচয় আমার পছন্দ নয়।মিঃ ফকনার, লম্বা আলাপ আমারও পছন্দ নয়। আপনি সিগারেট নিয়েই বসুন। আপনাকে কী জন্যে ডাকা হয়েছে আপনি তা জানেন, আশা করতে পারি।কিছু জানি।জুলিয়াস নিশোকে ফোর্টনকে আটকে রাখা হয়েছে। তাঁকে এ-মাসের ২৬ কিংবা ২৭ তারিখে হত্যা করা হবে।তার আগে নয় কেন? এ-মাস হচ্ছে জেনারেল ডোফার জন্মমাস।

জন্মমাসে আফ্রিকানরা হত্যার মতো বড় অপরাধ করে না, ওদের অনেক রকম কুসংস্কার আছে।মাস তো শেষ হবে ত্রিশ তারিখে। ২৬/২৭ বলছেন কেন? চান্দ্রমাসের কথা বলছি। আফ্রিকানরা চান্দ্রমাস মেনে চলে।আপনি নিশ্চিত যে, ২৬/২৭ তারিখের আগে নিশোকে হত্যা করা হবে না?

নব্বই ভাগ নিশ্চিত। দশ ভাগ আনসারটিনিটি সবসময়ই থাকে। এখন আপনিই বলুন, জুলিয়াস নিশোকে এই সময়ের ভেতর কি উদ্ধার করা সম্ভব? জগতে অসম্ভব বলে কিছু নেই।এটা একটা ছেলেমানুষি কথা, পৃথিবীতে অনেক কিছুই অসম্ভব। আমার সঙ্গে ভাবাবেগে তাড়িত হয়ে কোনো কথা বলবেন না। আপনি আমাকে বলুন, এই মিশন গ্রহণ করতে আপনি রাজি আছেন? ফকনার লোকটিকে পছন্দ করতে শুরু করল।

এ কাজের লোক। কথাবার্তার ধরন দেখেই টের পাওয়া যাচ্ছে। এবং এর সঙ্গে কথাবার্তা হওয়া উচিত সরাসরি। কথার মারপ্যাচ না-দেখালেও চলবে।বলুন, রাজি আছেন? হ্যাঁ বলবার আগে সব ভালোমতো জানতে চাই।আপনি সবকিছুই জানবেন। আপনার জন্যে কয়েকটি ফাইল তৈরি করা হয়েছে। এগুলি ভালো করে পড়ন। কাল সকাল নটায় আপনি হা কিংবা না বলবেন।

ঠিক আছে, তা বলব।অবশ্যি আপনি যা বললেই যে আমরা মিশনটি আপনার হাতে দেব, তেমন। কোনো কথা নেই। আমরা অন্য লোকজনদের সঙ্গেও কথাবার্তা বলছি।ভালো। বাজার যাচাই করে নেওয়াই ভালো।কর্নেল ফকনার, আপনাকে একটা কথা বলা…… আমাকে কর্নেল বলবেন না। সেনাবাহিনী আমি অনেক আগে ছেড়ে এসেছি।

মিঃ ফকনার, আমি যে-জিনিসটি বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে…… ফাইলগুলো পড়ার আগে আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না।ঠিক আছে।আমি এখন তাহলে উঠি।বেশ। দেখা হবে কাল নটায়।ফকনার ঘর থেকে বেরুবার আগ মুহূর্তে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল। শান্ত স্বরে বলল, সিআইএ জুলিয়াস নিশোকে উদ্ধার করতে চাচ্ছে কেন? উনি একজন বিখ্যাত ব্যক্তি।

বিখ্যাত ব্যক্তিদের উদ্ধার করার মতো কোনো মহৎ আদর্শ তাদের আছে বলে আমার জানা নেই।আমরা জেনারেল ডোফার পতন দেখতে চাই। মোরাভার সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্কের প্রয়োজন আছে।কী প্রয়োজন? মোরান্ডায় কপারের এবং মলিবডিনামের খনি আছে। পৃথিবীর বেশির ভাগ মলিবডিনাম আসে মোরান্ডা থেকে।

আমরা চাই না সেই মলিবডিনাম আমাদের হাতছাড়া হয়ে অন্য ব্লকে চলে যাক।আপনার ধারণা, জুলিয়াস নিশো ক্ষমতায় থাকলে মলিবডিনাম বা কপার ভিন্ন ব্লকে যাবে না? সম্ভবত না। যদি যায়, তাহলে তাঁকেও সরানো হবে। কাউকে সরানো তেমন কঠিন কিছু নয়।ফকনার তাকিয়ে রইল। তার বেশ মজা লাগছে। আরেকটি সিগারেট ধরাবার ইচ্ছা। হচ্ছে, কিন্তু ঠিক ভরসাও হচ্ছে না।

এবার হয়তো সে চেচিয়ে উঠবে।সাধারণত আমরা কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলি। এক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না—কারণ, জেনারেল ডোফার সৈন্যবাহিনী তার খুবই অনুরক্ত যে-কারণে নিতান্ত অনিচ্ছায় আমাদের বাইরের সাহায্য নিতে হচ্ছে। ভালো কি মন্দ, সেটা আপনার দেখার কথা নয়। আপনি দেখবেন আপনাকে যথেষ্ট টাকা দেওয়া হয়েছে কি না।তাও ঠিক। আমি কি এখন যেতে পারি?

পারেন। এন্ট্রি-রুমে অপেক্ষা করুন, আপনাকে ফাইলপত্র দেওয়া হবে। গুড ডে মিঃ ফকনার।গুড ডে।জেনারেল সিমসন নন-স্মোকার, সিগারেটের গন্ধ তাঁর সহ্য হয় না-কথাটা ঠিক নয়। ফকনার চলে যাবার পরপরই তিনি একটি চুরুট ধরালেন।তাঁর হাতে লাল মলাটের একটি ফাইল। ফকনারের ওপর সিক্রেট সার্ভিসের তৈরি একটি গোপন রিপোর্ট।

লাল মলাটের ফাইলের অর্থ হচ্ছে, এ একজন অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যক্তি এবং সিক্রেট সার্ভিস তার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। জেনারেল সিমসন চশমার কাঁচ পরিষ্কার করলেন এবং গভীর মনোযোগর সঙ্গে পড়তে শুরু করলেন– এস ফকনার জুনিয়র জন্ম : ১৩ই নভেম্বর, ১৯৩০। সেইন্ট জোসেফ হসপিটাল। ফার্গো নর্থ ডেকোটা।

[বাবা-মার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। এস ফকনার আত্মীয়স্বজন সম্পর্কিত খবরাখবর ফাইল নং কগ ৩০২। ৩১১ লপ ৩৩-এ আছে। মাইক্রো ফিল্ম কোড : BCL 3443026-A2]….. ০ ব্লাড গ্রুপ : O পজিটিভ RH পজিটিভ।…..০ সেনাবাহিনী থেকে ডিসচার্জ করা হয় ১৪ই অক্টোবর, ১৯৬৪। ডিসচার্জের কারণ সম্পর্কিত খবরাখবরের মাইক্রো ফিল্ম কোড : BCL 3443025-A2]

০ সাউথ আফ্রিকায় সিআইএর পক্ষে দুটি মিশন পরিচালনা করেন। মিশন দুটির ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট ফাইল নাম্বার কগ ৩০২/৩১১ বস ৩২-এ আছে। মাইক্রো ফিল্ম কোড : BCL3443027-A2] কোনো রকম রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই, তবে কিছু উগ্র বামপন্থী বন্ধুবান্ধব আছে। তাঁর বন্ধুবান্ধবদের ওপর একটি রিপোর্ট ফাইল নাম্বার কগ ৩০২/৩১১ বস ৩৪-এ আছে। মাইক্রো ফিল্ম কোড : BCL3443029A2]

০ মোরান্ডায় জেনারেল ডোফার সৈন্যবাহিনীর একজন টেনার হিসেবে কিছুদিন ছিলেন। এই প্রসঙ্গে কোন পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি হয় নি। সংগৃহীত তথ্যাবলী মাইক্রো ফিল্ম কোড: BCL3443029-A2-তে সংরক্ষিত আছে। তথ্যাবলী খুব নির্ভরযোগ্য নয়।)

০ জুয়া খেলতে পছন্দ করেন। মদ্যপান করেন। মেয়েমানুষ ও অর্থের প্রতি অস্বাভাবিক দুর্বলতা আছে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপন পদ্ধতির ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট মাইক্রো ফিল্ম কোড : BCL3443030-A2-তে সংরক্ষিত আছে।

জেনারেল সিমসনের চুরুট নিভে গিয়েছিল। তিনি অনেকটা সময় নিয়ে চুরুট ধরালেন এবং ফকনার প্রসঙ্গে যে-কটি রিপোর্ট তৈরি আছে তার সব কটি আনতে বললেন। তাঁর পিএ বলল, কফি বা অন্য কিছু কি খাবেন? তিনি তার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ফকনারকে কেমন লাগল তোমার?তাঁর সম্পর্কে আমি জানি।

উনি একজন ভয়ানক মানুষ।জেনারেল সিমসন মৃদু হাসলেন, তার অর্থ ঠিক বোঝা গেল না।ফকনারকে দুটি ফাইল দেওয়া হয়েছে। ফাইল দুটি যে নিয়ে এসেছে তার বয়স খুবই অল্প। লাজুক স্বভাবের একজন। সে বলল, আপনি যদি চান আমি আপনার সঙ্গে থাকতে পারি।কেন? ফাইলের অনেক রেফারেন্স হয়তো আপনি বুঝতে পারবেন না।

সেগুলি বুঝিয়ে দিতে পারি। আমার সমস্তই ভালো করে পড়া আছে।আমি চেষ্টা করব নিজে নিজে বুঝতে।ফকনার উঠে দাঁড়াল। তরুণ অফিসারটি অবাক হয়ে বলল, আপনি এখন কোথায় যাচ্ছেন? কোনো-একটি হোটেলে। সস্তায় হোটেল কোথায় পাওয়া যাবে, আছে আশেপাশে?আছে। কিন্তু আপনি তো কোনো হোটেলে যেতে পারবেন না।

কেন? আপনার সঙ্গে যে-দুটি ফাইল আছে, সে-দুটি এই ভবনের বাইরে নেওয়া যাবে না।তার মানে, আজ রাতে আমাকে এখানে থাকতে হবে? হ্যাঁ। আপনার কোনো রকম অসুবিধা হবে না। আমাদের গেরুমটি চমৎকার।আর আমি যদি ফাইল পড়তে না চাই। যদি এই মিশন সম্পর্কে উৎসাহী না হই, তাহলে? তাহলে আপনি চলে যেতে পারেন। তবে আমার মনে হয় আপনি যাবেন না। কারণ আপনি ইদানীং খুব অর্থকষ্টে আছেন।

ফকনার ক্লান্ত স্বরে বলল, নিয়ে চলুন আপনার গেস্টরুমে। প্রচুর হুইস্কির ব্যবস্থা রাখবেন। মাঝেমাঝে মাতাল হতে আমার ভালো লাগে।আপনার জন্যে হার্ড ডিংক-এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আপনার যদি বিশেষ ধরনের কোনো হুইস্কির প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকে তবে তা বলতে পারেন, ব্যবস্থা করব।কারোর প্রতি আমার কোন পক্ষপাতিত্ব নেই। পৃথিবীর সমস্ত মদ এবং সমস্ত নারী আমার কাছে একধরনের মনে হয়।

জুলিয়াস নিশোর ঘুম ভাঙল ভোর পাঁচটায়। তিনি অবশ্যি তা বুঝতে পারলেন না। তাঁর ঘড়িটি নষ্ট হয়ে গেছে। ঘড়ি ছাড়া এখানে সময় বোঝার অন্য কোনো উপায় নেই। মাথার অনেক ওপরে ছোট্ট একটি ভেন্টিলেটার আছে। সেখান থেকে তেমন কোনো আলো আসে না। এলেও তা ধরা যায় না, কারণ ঘরে দিন-রাত্রি দু শ পাওয়ারের একটি বাতি জ্বলে। তিনি বাতিটি রাতের বেলা নিভিয়ে দেবার জন্যে মাওয়াকে বলেছিলেন।

মাওয়াবিনীত ভঙ্গিতে বলেছে, কাল থেকে বাতি রাতের বেলা জ্বলবেনা। কিন্তু ঠিকই জ্বলেছে। একই অনুরোধ দ্বিতীয় বার করতে তাঁর ইচ্ছা হয় নি।মাওয়াকে তিনি ঠিক বুঝতে পারছেন না। তিনি যা বলেন, সে তাতেই সঙ্গে-সঙ্গেই রাজি হয় কিন্তু রাজি হওয়া পর্যন্তই। একটা ঘড়ির কথা বলেছিলেন, মাওয়া সঙ্গে-সঙ্গে বলেছে, কাল আসার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসব। তিনি বলেছিলেন, আজ দেওয়া যায় না?

ঠিক আছে স্যার, নিয়ে আসছি। এক ঘন্টার মধ্যে আসব।তিনি অপেক্ষা করেছেন। সে আসে নি। মানুষ পশু না। তার চরিত্র এমন হবে কেন? ঘড়ি সে দেবে না, এটা স্পষ্ট করে প্রথম বারেই কি বলে দেওয়া যেত না? জুলিয়াস নিশো ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেললেন। এখন ঠাণ্ডা লাগছে। সূর্য ওপরে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে তাপ বাড়তে থাকবে। বাতাস থাকবে না।

অসহনীয় উত্তাপ। তারপর রাতের বেলা আবার শীত নামতে শুরু করবে। সেই শীতও অসহনীয়। আসলে বয়স হয়েছে, এই বয়সে শরীর অশক্ত হয়ে পড়ে। সামান্য শীতও শরীরের হাড়ে গিয়ে বেঁধে।নিশো বিছানা থেকে নামলেন। মাওয়াকে ধন্যবাদ দিলেন মনে-মনে, কারণ সে একটি কাজ করেছে।

লেখার জন্যে টেবিল-চেয়ার দিয়েছে। সময় কাটানোর জন্যে তিনি একটি লেখায় হাত দিয়েছেন। নাম দিয়েছেন কালো মানুষ: সাদা মানুষ। নামটি প্রথম দিন ভালো লেগেছিল, দ্বিতীয় দিনে লাগে নি। দ্বিতীয় দিনে নাম দিলেন—এক কালো মানুষ। সেই নামও এখন পছন্দ হচ্ছে না। তিনি আজ সেই নাম কেটে লিখলেন কালো মানুষ। ঘোট নামই ভালো।

কিন্তু লেখা এগুচ্ছে না। তিনি ভেবে রেখেছেন খুব হালকা ধরনের একটি লেখা লিখবেন। নানান রকম রসিকতার মধ্য দিয়ে কালো মানুষের দুঃখ তুলে আনবেন। কিন্তু লেখা ভারিকি ধরনের হয়ে যাচ্ছে।নিশো কলম হাতে দীর্ঘ সময় বসে রইলেন। তাঁর ক্ষুধাবোধ হচ্ছে। মাওয়া কখন আসবে কে জানে। গরম এক কাপ কফি খেলে হত।মাথায় সূক্ষ্ম যন্ত্ৰণাও হচ্ছে।

চোখের সামনে দু শ পাওয়ারের বাল্ব নিয়ে ঘুমানো মুশকিল। আজ আরেক বার অনুরোধ করে দেখলে কেমন হয়? ফোর্টনকের মাঠে সম্ভবত পিটি হচ্ছে। তালে-তালে হাত-পা ফেলার শব্দ হচ্ছে। এই শব্দগুলি শুনতে ভালো লাগে। তিনি দীর্ঘ সময় মন দিয়ে শব্দগুলি শুনলেন।মনেমনে সৈন্যদের তালে-তালে হাত-পা ফেলার দৃশ্যটি দেখতে চেষ্টা করলেন।

সারি বেঁধে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পরনে খাকি হাফপ্যান্ট। গায়ে ধবধবে সাদা গেঞ্জি।সূর্যের আলো এসে পড়েছে তাদের ঘামে-ভেজা চকচকে কালো মুখে। কালো রঙের মতো সুন্দর কি কিছু আছে? তাঁর মাথার যন্ত্রণা ক্রমেই বাড়ছে। তিনি আবার এসে বিছানায় শুলেন। হাত বাড়িয়ে একটি মোটা বই নিলেন। পড়বার জন্যে মাওয়া দিয়ে গিয়েছে। নিতান্তই বাজে বই।

একটি কালো ছেলের প্রেমে পড়েছে সাদা মেয়ে। মেয়েটি ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেছে জঙ্গলে। মেয়ের বাবা তাকে ধরবার জন্যে বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে বন ঘিরে ফেলেছে। অসম্ভব সব ব্যাপার। পাতায়পাতায় রগরগে সমস্ত বর্ণনা। মেয়েটি ছেলেটিকে চুমু না-খেয়ে সেকেন্ডও থাকতে পারছে না। এবং চুমু খাবার সময় ছেলেটির হাত চলে যাচ্ছে বিশেষ-বিশেষ জায়গায়।

নিশো দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। এ-জাতীয় বই পড়বার বয়স তাঁর নেই। শারীরিক বর্ণনায় তিনি এখন আর উত্তেজনা বোধ করেন না।মাওয়া যখন ঘরে ঢুকল, তখন নিশো ঘুমুচ্ছেন। তাঁর গা ঈষৎ উষ্ণ। রাতে ঠাণ্ডা লেগেছে। জ্বরজারি হতে পারে। তালা খোলার শব্দে তিনি জেগে উঠে স্বভাবসুলভ সতেজ গলায় বললেন, মাওয়া, সুপ্ৰভাত।

সুপ্রভাত মিঃ নিশো। রাতে ভালো ঘুম হয়েছে? এই অবস্থাতে ভালোই বলা চলে। অবিশ্যি শেষরাতের দিকে ঠাণ্ডায় কষ্ট পেয়েছি। আরেকটি গরম কম্বলের ব্যবস্থা করা যাবে?নিশ্চয়ই যাবে। আমি আজ বিকেলেই নিয়ে আসব।জুলিয়াস নিশো সামান্য হেসে বললেন, তুমি পলিটিশিয়ানদের মতো কথা বল।

অনেক কিছুই নিয়ে আসার কথা বল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই আসে না।মাওয়া গম্ভীর গলায় বলল, কম্বল বিকেলের মধ্যেই পাবেন।মাথার ওপরে এই বাতি—এটা কি নিভিয়ে রাখা যায়? এই বাতি রাত নটার পর থেকে জ্বলবে না।মাওয়া খাবারের প্যাকেট টেবিলে সাজিয়ে রাখল। ফ্রাঙ্কে কফিও আছে। ভালো কফি।

খাবারগুলি যত্ন করে তৈরি করা। সৈন্য বা কয়েদিদের সাধারণ খাবার নয়।মাওয়া, এই খাবারগুলি কে রান্না করে? আমার স্ত্রী ও বড় মেয়ে।চমৎকার রান্না। তাদের আমার ধন্যবাদ দিও।ধন্যবাদ দেওয়া যাবে না। কারণ, আপনি যে এখানে আছেন, এটা তাদের জানানো যাবে না।যখন আমি এখানে থাকব না, কিংবা এই পৃথিবীতেই থাকব না, তখন দিও।

তাদের বলবে, আমি সারা জীবন খাওয়াদাওয়া নিয়ে কষ্ট করেছি, কিন্তু জীবনের শেষ দিনগুলিতে খুব ভালো খানাপিনা করেছি।আমি বলব।কিছুক্ষণের মধ্যেই মাওয়া ওঠার উপক্রম করল। নিশো বললেন, বাইরের কী খবর? আমার মৃত্যুসংবাদ দেশবাসী কীভাবে নিয়েছে? আমি জানি না কীভাবে নিয়েছে, বাইরের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই।

ফোর্টনক শহর থেকে অনেক দূরে।তা অবশ্যি দূরে। তোমার স্ত্রী, কন্যা? ওরা খবরটা কীভাবে নিয়েছে? জানি না, মিঃ নিশো। আমি আমার স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলাপ করি না। রাজনীতি মেয়েদের বিষয় নয়।রাজনীতি কোথায়, তুমি কথা বলবে একটি মানুষের মৃত্যু নিয়ে!আমি কথা কম বলি।

আমরা এমন একটি দেশে বাস করি, যেখানে কথা কম বলাটাই বড় মানবিক গুণ বলে ধরা হয়। অথচ আমি সারা জীবন স্বপ্ন দেখেছি একটি দেশের, যেখানে আমরা সবাই ইচ্ছেমতো বকবক করতে পারব।মাওয়া আর দাঁড়াল না। নিশো গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। মাওয়া কম্বল নিয়ে এল না। দু শ পাওয়ারের বাতি জ্বলতেই থাকল।

জেনারেল সিমসন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ফকনারের কাছ থেকে পাওয়া এ জবাব তিনি যেন আশা করেন নি। তিনি চশমা খুলে চশমার কাচ পরিষ্কার করলেন। টেবিলে রাখা পানির গ্লাসে ছোট্ট একটি চুমুক দিয় মৃদুস্বরে বললেন, আপনি সত্যিসত্যি মিশনটির ব্যাপারে আগ্রহী নন? না।আপনি কি সমস্ত কাগজপত্র ভালোমতো দেখেছেন?

দেখেছি বলেই বলছি, এটা অসম্ভব। ফোর্টনকে আক্রমণ করা মাত্রই জেনারেল ডোফার প্রেসিডেন্ট ব্যাটালিয়ানে খবর পৌঁছবে। এরা হেলিকপ্টার নিয়ে দশ মিনিটের ভেতরে চলে আসতে পারবে। স্থলপথে আসতে ওদের লাগবে খুব বেশি হলে দেড় ঘণ্টা। ওদের রুখতে আমার দরকার পুরোপুরি একটা সৈন্যবাহিনী। আর্টিলারি সাপোর্ট।

জেনারেল সিমসন মৃদুস্বরে বললেন, দেড় ঘণ্টার মধ্যেই যাদি কাজ সেরে আপনারা আকাশে উড়তে পারেন, তাহলে কেমন হয়? কীভাবে উড়ব? দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তৈরি একটা পুরোনো ধরনের রানওয়ে আছে। সেখানে দেড় ঘন্টার ভেতর একটা বিমান পাঠাতে পারি।রানওয়ে ফোর্টনক থেকে কত দূরে? পঞ্চাশ মাইলের কম। সত্তর কিলোমিটার।সম্ভব নয়।

ডোফা নির্বোধ নয়। প্রথমেই সে রানওয়ে দখল করবার জন্যে সৈন্য পাঠাবে।জেনারেল সিমসন মৃদুস্বরে বললেন, আপনাকে আমি যথেষ্ট সাহসী ভেবেছিলাম।আমি সাহসী। সাহসী মানেই কিন্তু নির্বোধ নয়। আচ্ছা, আমি উঠি।একটু বসুন। এক মিনিট।ফকনার বসল। বিরক্ত ভঙ্গিতে সিগারেট ধরাল।সিমসন কিছুই বলছেন না। শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। এক মিনিট অপেক্ষা করতে বলার কারণ ধরা যাচ্ছে না।

 

Read more

সম্রাট পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.