সম্রাট পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

সম্রাট পর্ব – ৮

মাউদের কোনো অস্ত্ৰবল নেই। বর্শা এবং তীর-ধনুকের কাল অনেক আগেই শেষ হয়েছে। সাহসের এ-যুগে আর দাম নেই। পরিদর্শনপর্ব ভালোভাবেই শেষ হল। জেনারেল ডোফা সৈন্যদের আনুগত্য ও দেশপ্রেমের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের রেজিমেন্ট যে পৃথিবীর যে-কোনোে সৈন্যবাহিনীর আদর্শস্থানীয় হতে পারে, সে-কথাও বললেন।

পরিদর্শনশেষে জেনারেল র্যাবির সঙ্গে তাঁর একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক বসল।সেখানেও তিনি গম্ভীর হয়ে রইলেন। সাধারণত এ-জাতীয় বৈঠকগুলিতে তিনি মজার মজার কথা বলে আবহাওয়া হালকা করে রাখেন। আজ সেরকম হচ্ছে না। র্যাবি বললেন, স্যার, আপনার শরীর কি ভালো আছে? শরীর ভালই।আপনাকে চিন্তিত মনে হচ্ছে।না, চিন্তিত নই। তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।

সেজন্যেই আমার আসা।স্যার, বলুন। ফোর্টনকে এক শ জন কমান্ডার একটি দল পাঠাতে হবে।কখন? আজই।জেনারেল রাবি কিছু বলতে গিয়েও বললেন না।ডোফা বললেন, তুমি কি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাও? না স্যার, কিছু জিজ্ঞেস করতে চাই না। এক ঘন্টার মধ্যে হেলিকপ্টারে করে কমান্ডো পাঠানো হবে।

ওদের ওপর কি কোন নির্দেশ থাকবে? না, কোনো নির্দেশ নয়।আপনি যদি চান আমি ওদের সঙ্গে থাকতে পারি।না, তুমি রাজধানীতেই থাক।জেনারেল র্যাবি ইতস্তত করে বললেন, ঠিক কি কারণে আপনি এটা চাচ্ছেন তা জানতে পারলে আমি সেভাবে ওদের নির্দেশ দিয়ে দিতাম।

ডোফা দীর্ঘ সময় চুপচাপ থেকে বললেন, তোমাকে বলতে সঙ্কোচ হচ্ছে। আমি খারাপ ধরনের স্বপ্ন দেখেছি।কি দেখেছেন স্বপ্নে? আমার মধ্যে কিছু কুসংস্কার আছে।সে তো আমাদের সবার মধ্যেই আছে। আইনস্টাইনের মধ্যেও ছিল বলে শুনেছি।ডোফা থেমে-থেমে বললেন, স্বপ্নটা দেখলাম ভোেররাত্রে।

যেন ফোর্টনক থেকে জুলিয়াস নিশো বের হয়ে আসছেন। তাঁর সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মাউ উপজাতীয়। তারা ছুটে আসছে রাজধানীর দিকে। ডোফা কপালের ঘাম মুছলেন।জুলিয়াস নিশোকে নিয়ে আপনি চিন্তিত, সেকারণেই এ-রকম স্বপ্ন দেখেছেন। অন্য কোনো কারণ নেই। আমি কি স্যার আপনাকে একটি পরামর্শ দিতে পারি? হ্যাঁ, পার।

নিশোর ব্যাপারটা ঝুলিয়ে রাখবেন না, চুকিয়ে দিন। স্বপ্নের ব্যাপারটাও ভুলে যান।এ-রকম বাস্তব স্বপ্ন আমি খুব কম দেখেছি। ভোররাত্রের স্বপ্ন, তা ছাড়া এটা আমার জন্মমাস।আমি স্যার ঠিক এই মুহূর্তে ফোর্টনকে কমান্ডো পাঠানো সমর্থন করি না। কমান্ডো পাঠানো মানেই দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

আমাদের যা করতে হবে, তা হচ্ছে। কারো দৃষ্টি আকর্ষণ না-করে কাজ সারা। তবে আপনি চাইলে এক ঘন্টার ভেতর আমি এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য পাঠাতে পারি। স্যার, পাঠাব? ডোফা উঠে দাঁড়ালেন। ক্লান্ত স্বরে বললেন, দরকার নেই।সন্ধ্যায় তিনি একটি চমৎকার ভাষণ দিলেন জাতির উদ্দেশ্যে।

সেই ভাষণে জুলিয়াস নিশোর কথা এল আজ আমি গভীর দুঃখের সাথে স্মরণ করছি প্রয়াত নেতা জুলিয়াস নিশোকে, যাঁর চিন্তায় ও কর্মে জাতির আশা-আকাঙ্খ প্রতিফলিত হয়েছে। যাঁর রচনাবলী আমাকে দিয়েছে নতুন জীবনের সন্ধান। যে-জীবন সুখ ও সমৃদ্ধির, যেজীবন আশা ও আনন্দের।আমি তাঁর স্মৃতিকে চির জাগরুক রাখার জন্যে জুলিয়াস নিশো সংগ্রহশালা স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছি।

তাঁর রচনাবলী যাতে সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছতে পারে, সেজন্যে সরকারী পর্যায়ে রচনাবলী প্রকাশের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তরের হাতে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং আমার বিশ্বাস তারা সুষ্ঠুভাবে সেদায়িত্ব পালন করবে।রাতে গোয়েন্দা দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ব্রিগেডিয়ার সালকের সঙ্গে তিনি দীর্ঘ। সময় কাটালেন। তাদের মধ্যে নিম্নলিখিত কথাবার্তা হল—

ডোফা : মাউরা কি জুলিয়াস নিশোর মৃত্যুসংবাদ বিশ্বাস করেছে?…….নুসালকে : করেছে স্যার। এরা সরল প্রকৃতির মানুষ, সবকিছুই বিশ্বাস করে।……..ডোফা : বিশ্বাস যদি করে থাকে, তা হলে এরকম ভয়াবহ একটি গুজব ছড়াল কিভাবে? কেন তাদের ধারণা হল জুলিয়াস নিশো আবার ফিরে আসবেন?

নুসালকে: স্যার, মাউ হচ্ছে একটি কুসংস্কার-আচ্ছন্ন অন্ধকার উপজাতি।……….ডোফা : অন্ধকার উপজাতি থোক আর যাই হোক, এরকম একটি গুজবের পেছনে কোনো একটা ভিত্তি তো থাকবে?

নুসালকে : আমি এ নিয়ে প্রচুর খোঁজখবর করেছি এবং এখনো করছি। গুজবের কোন ভিত্তি পাই নি। এটা মুখে-মুখে ছড়িয়েছে। প্রচারটা হয়েছে এভাবে-মাউ জাতির চরম দুর্দিনে জুলিয়াস নিশো ফিরে আসবেন এবং জাতিকে পথ দেখাবেন। সে দিনটি হবে মাউদের চরম সৌভাগ্যের দিন। অনেকটা পথপ্রদর্শকের মতো।

ডোফা : তাই দেখছি। এরা তা গভীরভাবে বিশ্বাস করে?………..নুসালকে : জ্বি স্যার, করে।………..ডোফা : এই বিশ্বাস ভাঙানোর জন্যে আমাদের কি করা উচিত?……………নুসালকে : এই বিশ্বাস ভাঙানোর কোনো রকম চেষ্টা না-করাই উচিত।…………………………..ডোফা : কেন?……….নুসালকে : যত দিন এই বিশ্বাস থাকবে তত দিন তারা চুপ করে থাকবে। তারা অপেক্ষা করবে জুলিয়াস নিশোর জন্যে।

ডোফা : ভালোই বলেছ। তোমার আইডিয়া আমার পছন্দ হয়েছে।………রাত এগারটার দিকে তিনি ফোর্টনকের কারাধ্যক্ষ মাওয়ার সঙ্গে ওয়্যারলেসে কথা বললেন।কেমন আছ, মাওয়া? জ্বি স্যার, ভালো। আপনার শরীর কেমন? আমি ভালেই আছি।আপনার বক্তৃতা শুনলাম স্যার। চমৎকার।ধন্যবাদ। তোমাদের ওখানকার সব ঠিক তো? সব ঠিক আছে।আমাদের বন্দির খবর কি? খবর ভালো স্যার।

একটু অসুস্থ, তবে তেমন কিছু না।ডোফা ওয়্যারলেস সেট রেখে দিলেন। সেই রাতেও তাঁর ভালো ঘুম হল না।ট্রেনিং ক্যাম্প।লরেনকো মারকুইস।মোজাম্বিক, আফ্রিকা।২৪শে ডিসেম্বর। বুধবার। সন্ধ্যা ৭টা।মেসঘরে ঢুকে সবাই অবাক হল। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। টি বোন স্টেক, বেকড পটেটো, লাসানিয়া এবং পর্তুগিজ রেড ওয়াইন। অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

শেফ এসে বললটি বোন স্টেক প্রচুর আছে, কারো দরকার হলে তাকে জানালেই হবে। তবে রেড ওয়াইনের সাপ্লাই কম। নিম্নমানের কিছু হোয়াইট ওয়াইন আছে। প্রয়োজনে দেওয়া যেতে পারে।মেসঘরে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেল। সাধারণত সাড়ে সাতটার মধ্যে খাবার পর্ব শেষ হয়। আজ আটটা বেজে গেল। তবু কয়েক জনকে ব্যস্ত দেখা গেল।

শেফ এসে বলল, ডিনার শেষ হবার পর হার্ভি ফকনার কিছু বলবেন। সবাইকে থাকতে বলা হয়েছে।আগামীকাল ক্রিসমাস। সেই উপলক্ষে ছুটি এবং বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হবে হয়তে। শহরে নিয়ে যাওয়া হবে। আফ্রিকান মেয়েদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর একটা সুযোগ হবে। মন্দ কী? হার্ভি ফকনার মেসঘরে ঢুকল হাসিমুখে। তার স্বভাবসুলভ অন্তরঙ্গ স্বরে বলল, খাবার পছন্দ হয়েছে? হয়েছে, হয়েছে।

রেড ওয়াইন কেমন ছিল? অপূর্বতবে স্যার, পরিমাণ খুবই কম।আলো জিনিস কমই খেতে হয়। তোমাদের জন্যে একটা জরুরি খবর নিয়ে এসেছি। আমাদের ওড়বার সময় হয়েছে।মেসঘরে একটি নিস্তব্ধতা নেমে এল। কেউ শ্বাস ফেললেও শোনা যাবে এমন অবস্থা।আমরা রাত বারটায় এখান থেকে রওনা হব। এয়ারপোর্টের দিকে। পৌঁছতে লাগবে এক ঘন্টা।

সেখানে আমাদের জন্যে একটা ট্রান্সপোর্ট বিমান অপেক্ষা করছে। ভোর সাড়ে তিনটায় আমরা পৌঁছে যাব।কোথায়? কোথায় যাব এটা বলার সময় এসেছে। আমরা যাচ্ছি মোরান্ডায়।মেসঘরে একটি মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। হার্ভি কথা বলা শুরু করার সঙ্গে-সঙ্গে গুঞ্জন থেমে গেল।অনেক বার বলা হয়েছে, তবু আরেক বার বলছি, বিমান থেকে প্যারাশুট দিয়ে জ্যাম্প করবার পর আমাদের হাতে সময় থাকবে এক ঘন্টা পঁচিশ মিনিট।

এই সময়ের ভেতর কাজ শেষ করতে না-পারলে মোরান্ডা থেকে জীবিত অবস্থায় কেউ বের হয়ে আসতে পারব না।মেসঘরে কোনো শব্দ হল না।একটি কথা আমি সবাইকে মনে রাখতে বলছি। সেটা হচ্ছে, আমাদের বিপক্ষে যেসেনাবাহিনী আছে তা যথেষ্টই শক্তিশালী। জেনারেল ডোফা হচ্ছেন মোরান্ডার প্রধান সামরিক প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট। তিনি একজন প্রথম শ্রেণীর জেনারেল। কারো কিছু বলার আছে? কেউ কিছু বলল না।

তা হলে যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া যাক। বন্ধরা, শুভ যাত্ৰা। তৈরি হতে শুরু কর।রবিনসন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একটি চিঠি লিখল পিটারকে। চিঠিটি তার পছন্দ হল না, সে আবার একটি লিখল। সেটিও পছন্দ হল না। মানসিক উত্তেজনায় এটা হচ্ছে। যা লিখতে ইচ্ছা হচ্ছে তা লেখা হচ্ছে না। সে তৃতীয় চিঠিটি লিখতে শুরু করল।

প্রিয় পিটার, তুমি কেমন আছ? আগামী কাল ক্রিসমাস। নিশ্চয়ই তোমার মা এসে গেছেন এবং তোমার দুই বোনটিও এসেছে। আমি কল্পনায় দেখছি তোমরা ক্রিসমাস টি সাজাতে শুরু করছ। আহু, যদি থাকতে পারতাম। খুব ইচ্ছা হচ্ছে ক্রিসমান টি সাজানোর ব্যাপারে তোমাদের সাহায্য করি। কিন্তু মানুষের সব ইচ্ছা কখনো পূর্ণ হয় না।

এই সত্যটি তুমি যত বড় হবে, ততই বুঝবে। তোমাকে একসময় কথা দিয়েছিলাম কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না। কিন্তু একসময় চলে গেলাম। এবং হয়তো আর ফিরব না।যদি এরকম কিছু হয়, দুঃখ করবে না। মানুষের জীবনটাই এরকম। যখন বড় হবে, তখন তোমার মা তোমাকে সব বুঝিয়ে দেবেন কিংবা তুমি নিজেই সব বুঝতে পারবে।

আজ আমাকে যতটা হৃদয়হীন মনে হচ্ছে, সে-দিন হয়তো ততটা মনে হবে না। হয়তো খানিকটা ভালো বাসবে। এই জিনিসটির অভাব আমি সারা জীবন অনুভব করেছি। আজকের এই ক্রিসমাস ডের চমৎকার রাতে প্রার্থনা করছি যেন ভালবাসার অভাবে তোমাকে কখনো কষ্ট পেতে না হয়। চুমু নাও।

রবিনসন….. রবিনসন চিঠি খামে ভরে ঠিকানা লিখল। এই চিঠি নিজের হাতে পোস্ট করে যেতে হবে। সবচেয়ে কাছের পোস্ট বক্স এখান থেকে প্রায় ছ মাইল। জিপ নিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু রবিনসন ঠিক করল হেঁটেই যাবে। হাতে এখনো প্রচুর সময়। বারটা বাজতে দেরি আছে।ক্যাম্পের গেটে ফকনার দাঁড়িয়ে চুরুট টানছিল। সে ভুরু কুঁচকে বলল, কোথায় যাচ্ছ? চিঠি পোস্ট করতে। পিটারকে একটা চিঠি লিখেছি।

পোস্ট করার জন্য তোমাকে যেতে হবে কেন? এখানে রেখে দাও। যথাসময়ে পোস্ট হবে।এটা আমি নিজেই পোস্ট করতে চাই। আমার ধারণা পিটারের কাছে এটাই হবে আমার শেষ চিঠি।এরকম মনে হবার কারণ কি? মৃত্যুর ব্যাপারটি মানুষ আগেই টের পায়।তুমি শুধু-শুধু ভয় পাম্। তুমি ফিরে আসবে।রবিনসন কোন কথা বলল না। ফকনার বলল, কাউকে সঙ্গে করে নিয়ে যাও। একা যে না।কেন? তোমার কি ধারণা আমি পালিয়ে যাব?

ফকনার তার জবাব দিল না। গম্ভীর মুখে দ্বিতীয় সিগারেটটি ধরাল এবং হাত ইশারা করে বলল, ঐ ওকে সঙ্গে নিয়ে যাও।বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। রাস্তা গিয়েছে বনের ভেতর দিয়ে। নিৰ্জন রাস্তা শীতল হাওয়া বইছে। রবিনসন মৃদু গলায় বলল, তোমার কি ঠাণ্ডা লাগছে? তাঁর সঙ্গী বলল, জ্বিনা স্যার।আমাকে স্যার বলার দরকার নেই। নাম ধরে ডাকবে। তোমার কি নাম? জলিল।

হাঁটতে ভালোই লাগছে, কি বল জলিল? জ্বি স্যার।রবিনসন হঠাৎ করেই তার নাতি প্রসঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। সে কেমন একা-একা কথা বলে। একদিন দেখা গেল সে একটা কসমস ফুল তুলে এদিক-সেদিক তাকিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে। তাকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করাতে সে বলেছে, খুব সুন্দর তো, তাই খেতে ইচ্ছা করে। রবিনসন রাস্তা কাঁপিয়ে হাসতে লাগল। তার সঙ্গীও হাসল।

একটিই নাতি আপনার? হ্যাঁ। বড় চমৎকার ছেলে।২৫শে ডিসেম্বর। রাত ৩টা প্লেন উড়ে চলছে।ইঞ্জিনের হুম-হুম গর্জন ছাড়া অন্য কোন শব্দ নেই। কেবিন-লাইট জ্বলছে। কমান্ডোদের দেখা যাচ্ছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকতে। প্রথম দিকে তারা নিজেদের মধ্যে মৃদুস্বরে কথাবার্তা বলছিল। এখন আর বলছে না।সময় যতই ঘনিয়ে আসেছ উত্তেজনা ততই বাড়ছে। সবার চেহারায় তার ছাপ পড়েছে।

একমাত্র নির্বিঘ্নে ঘুমুচ্ছে বেন ওয়াটসন। এই একটি লোকের মধ্যেই কোনো রকম বিকার নেই।কেবিন-লাইটের পাশেই একটি লাল বাতি জ্বলে উঠল, যার মানে, প্লেনের ক্যাপ্টেন কথা বলতে চান। ফকনার হেডফোন কানে পরে নিল।হ্যালো, ফকনার বলছি।আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি স্যার।তাই নাকি? কুড়ি মিনিটের মাথায় ড্রপিং জোনে চলে আসব। আপনি সবাইকে তৈরি হতে বলুন।

বাইরের আবহাওয়া কেমন? খুব ভালো বলা চলে না। শক্ত বাতাস বইছে।ফকনার ভ্রূ কোঁচকাল। ক্যাপ্টেন বলল, আমি কেবিনের বাতি কমিয়ে দিচ্ছি, যাতে চোখে অন্ধকার সয়ে যায়।ঠিক আছে।প্লেনের গতি কমে আসছে। নিচে নেমে এসেছে বেশ খানিকটা। দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। বাইরের প্রচণ্ড বাতাসের ঝাপটায় প্লেন এখন কেঁপেকেঁপে উঠছে।

কেবিনের ভেতরটা প্রায় অন্ধকার।ফকনার গম্ভীর গলায় বলল, অস্ত্ৰ, যন্ত্রপাতি, রসদ এবং প্যারাশুট সবাই পরীক্ষা করে নাও। তোমাদের নিজেদের পরীক্ষা শেষ হলে জনাথন পরীক্ষা করে দেখবে।বেন ওয়াটসন উঠে বসেছে। সে তাকিয়ে আছে। কেবিনে ঠিক এই মুহূর্তে প্রচণ্ড কৰ্মব্যস্ততা। ফকনার বলল, বাইরে দমকা হাওয়া আছে কাজেই প্যারাশুট খোলার ব্যাপারে খুব সাবধান।

মাটির কাছাকাছি না পৌঁছা পর্যন্ত কেউ ফিতা টানবে না, তার আগে ফিতা টানলে বাতাস ভাসিয়ে অনেক দূর নিয়ে যাবে।…. সবার আগে নামবে বেন ওয়াটসন এবং তার দল। তারা নেমে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে না, দ্রুত চলে যাবে এয়ারপোর্টে।

সবার প্রথমে ঝাঁপ দিল ওয়াটসন। ঠাণ্ডা বাতাস বাইরে। নিচের মাটি দ্রুত কাছে এগিয়ে আসছে। আকাশভর্তি তারা। বেন ওয়াটসনের এক বার মনে হল, প্যারাশুট খোলার ফিতা না টানলে কেমন হয়? এটি একটি পুরোন অনুভূতি। প্যারাশুট নিয়ে লাফিয়ে পড়বার পর প্রায় সবারই এটা হয়।

অনেকেই শেষ পর্যন্ত ফিতা খুলতে পারে না।বেন ওয়াটসন মাটিতে নেমেই ঘড়ি দেখল। তিনটা পঞ্চান—পনের মিনিট লেট। তিনটা চল্লিশের ভেতর সবার মাটিতে পা রাখার কথা।সে তাকাল আকাশের দিকে। একে-একে নামছে সবাই। সে গুনতে চেষ্টা করল—এক, দুই, তিন, চার পাঁচ…..

২৫শে ডিসেম্বর। ভোর ৪টা।চারদিকে অন্ধকার। সূর্য ওঠার এখন এক ঘন্টা দশ মিনিট দেরি। এয়ারপোর্টে পৌঁছতে লাগবে কুড়ি থেকে পঁচিশ মিনিট। বেন ওয়াটসন তার দল নিয়ে ছুটতে শুরু করল। তিরিশ কিলোমিটার—এমন কোনো দূরের পথ নয়। তারা ছোটার গতি আরো বাড়িয়ে দিল। কারো মুখেই ক্লান্তির কোন ছাপ নেই। কোন শব্দও উঠছে না।

বেন ওয়াটসনের মনে হল, জনাথন এদের ভালোই ট্রেনিং দিয়েছে। এয়ারপোর্টে পৌঁছে বেন ওয়াটসনের বিস্ময়ের সীমা রইল না। একটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত জায়গা। একতলা একটি দালানে মজুরশ্রেণীর পাঁচ-ছ জন জড়াজড়ি হয়ে ঘুমুচ্ছে। এছাড়া ত্ৰিসীমানায় কেউ নেই। ঘরের দরজা-জানালা ভাঙা ভাঙা জানালায় হু-হু করে হাওয়া খেলছে।লোকগুলি ঘুম ভেঙে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বেন ওয়াটসন জিজ্ঞেস করল, কেউ ইংরেজি জান? কোনো উত্তর নেই।

ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।কেউ ইংরেজি জান না? ওরা নিজেদের মধ্যে বিড়বিড় করল। এদের দেখে মনে হয় না কেউ ইংরেজি জানে।কেউ জানে না? স্যার, আমি জানি।তুমি কে? আমি স্যার একজন কন্ট্রাক্টর। এই এয়ারপোর্ট ঠিক করার কন্ট্রাক্ট নিয়েছি।ভালো করেছ। এখানে কোনো পাহারা থাকে না? জ্বিনা স্যার, পাহারা থাকবে কেন? তাও তো কথা। রানওয়ে ঠিক আছে? আছে স্যার। মোটামুটি আছে।

আপনারা কারা? আমরা কারা তা দিয়ে তোমাদের দরকার নেই। তোমরা গরম পানির ব্যবস্থা করতে পারবে? পারব স্যার। পানির ব্যবস্থা কর। আর শোন, তোমাদের কেউ এখান থেকে পালাবার চেষ্টা করবে না। যদি আমরা বুঝতে পারি তোমাদের কোনো মতলব আছে, তা হলে সঙ্গে-সঙ্গে গুলি করা হবে। আমরা মানুষ ভাল নই।

কতটুকু গরম পানি করব স্যার? আমার কাছে কফি বিস আছে। সবাই মিলে কফি খাব, কাজেই বুঝতে পারছ কতটুকু পানি লাগবে।জ্বি স্যার।পানি গরম হবার পরপর তুমি তোমার লোকজন নিয়ে রানওয়ে পরীক্ষা করতে যাবে। একটা ডেকোটা প্লেন নামবে। ঠিকমতোনামতে পারে যাতে, সে-ব্যবস্থা করবে। তোমাদের কাছে কিছু মালমশলা নিশ্চয়ই আছে।আছে স্যার। গুড, ভেরি গুড।

 

Read more

সম্রাট পর্ব – ৯ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.