সম্রাট পর্ব – ৯ হুমায়ূন আহমেদ

সম্রাট পর্ব – ৯

বেন ওয়াটসন কফির পেয়ালা হাতে বাইরে অপেক্ষা করতে লাগল। তার মুখ ভাবলেশহীন। এয়ারপোর্ট দখল করতে তাকে একটি গুলিও খরচ করতে হয় নি, এটা তাকে মোটও প্রভাবিত করে নি। তাকে দেখে মনে হয়, এরকম হবে তা সে জানত।শীতের ভোরবেলায় গরম কফি চমৎকার লাগছে। বেন ঘড়ি দেখল। ফোর্টনকে।

যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ২৫শে ডিসেম্বর। ভোর ৫-১০।মাওয়া জেগে উঠল প্রচণ্ড একটা বিস্ফোরণের শব্দে। শব্দ কমে আসতেই সে শুনল একসঙ্গে অনেকগুলি সাব-মেশিনগান থেকে কানে তালা ধরানোর মতো আওয়াজ আসছে। সে-শব্দও থেমে গেল। আলাদা-আলাদাভাবে গুলির শব্দ হতে থাকল।

কী হচ্ছে এসব? আবার একটি বিস্ফোরণ। প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। মনে হল ফোর্টনকের সবটাই উড়ে গেছে। দরজা-জানালা সব ভেঙে গেছে নাকি? মাওয়া হতভম্ব হয়ে উঠে বসল বিছানায়, ঠিক তখনি বন্ধ দরজা কে যেন লাথি মেরে ভাঙল।তুমি মাওয়া? মূর্তির মতো মাথা নাড়ল মাওয়া।আমরা নিশোকে নিতে এসেছি। তুমি চাবি নিয়ে আমার সঙ্গে এস।কিসের চাবি? কোনো বাজে কথা বলবে না।

একটি বাজে কথা বলবে গুলি করে এখানেই শেষ করে দেব।সাব-মেশিনগান থেকে আবার শব্দ আসছে। একটিমাত্র সাব-মেশিনগান। অনবরত ক্যাটক্যাট শব্দ। ভয়াবহ কিছু-একটা হয়ে গেছে।মাওয়া অনুগত ছেলের মতো চাবির গোছা হাতে নিচে নেমে এল। সিঁড়ির মাথায় দেখা গেল আরেক জনকে দাঁড়িয়ে থাকতে। সেই লোকটি ভারি গলায় বলল, এই কি মাওয়া? জ্বি স্যার।ভালো।

মাওয়া, আমি ফকনার। তোমাদের সৈন্যবাহিনীর এমন খারাপ অবস্থা, আমার ধারণা ছিল না। একদল গার্লস-গাইডও তো এর চেয়ে ভালো ডিফেন্স দিত। এইসব অপদার্থদের তো লাথি দিয়ে নদীতে ফেলে দেওয়া উচিত।সূর্য এখনো ওঠে নি। তবু আবছাভাবে সবকিছু দেখা যাচ্ছে। মাওয়া ভালো-মতো চারদিকে তাকানোরও সাহস পাচ্ছে না। কোথাও কোনো শব্দ হচ্ছে না।

শুধু ফ্যামিলি কোয়ার্টারগুলি থেকে মেয়েদের চেচিয়ে কান্নার আওয়াজ আসছে। সৈন্যবাহিনীর ব্যারাক মোটামুটিভাবে একটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। মাওয়া সেলের তালা খুলল। সেলে ঢুকল হার্ভি ফকনার।সুপ্রভাত জুলিয়াস নিশো।নিশো কিছু বললেন না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।আপনি কেমন আছেন? আমি ভালেই আছি। কিন্তু হচ্ছে কি? তেমন কিছু না।

আমরা আপনাকে নিতে এসেছি।তোমরা কারা? আমরা হচ্ছি বুনো হাঁস। আমার মনে হয় না আপনি হাঁটতে পারবেন।ফকনার ইশারা করতেই এক জন এসে তাঁকে পিঠে তুলে নিল। নিশো মৃদুস্বরে বললেন, অনেক কিছুর পিঠেই চড়েছি, মানুষের পিঠে কখনো চড়ি নি।ফকনার বলল, আপনাকে অল্প কিছু সময় কষ্ট করতে হবে মিঃ নিশো।

ভোর ছটা পঁচিশে আমাদের উদ্ধারকারী প্লেন আসবে। এখানে এমন কিছু কি আছে, যা আপনি সঙ্গে নিতে চান? না। কয়েকটি প্রেমের কবিতা লিখেছিলাম, সেগুলি আমি মাওয়াকে দিয়ে যেতে চাই।মাওয়াকে দেওয়া অর্থহীন, ওকে আমি এক্ষুনি মেরে ফেলব।অসম্ভব। আমার চোখের সামনে কাউকে হত্যা করতে পারবে না।চোখের আড়ালেই করা হবে। না না। দয়া কর।

ফকনার হেসে ফেলল।নিশো চোখ বন্ধ করে উচ্চৈস্বরে বললেন, ঈশ্বর, দয়া কর। বলেই খেয়াল হল—তিনি একজন নাস্তিক। তবু তিনি আবারও ঈশ্বরের নাম নিলেন। ২৫শে ডিসেম্বর। ভোর ৬-২০। এয়ারপোর্টে সবাই অপেক্ষা করছে। ফকনারের হাতে সিগারেট। তার মুখ হাসি-হাসি। পঞ্চাশ জন মাভোর সবাই আছে।

একটা অস্বাভাবিক ঘটনা। বিশ্বাস হয়েও হতে চায় না। কিন্তু এটা স্বপ্ন নয়-সত্যি। ঐ তো জুলিয়াস নিশো চোখ বড়-বড় করে তাকিয়ে আছেন।ইঞ্জিনের আওয়াজ আসছে। প্ৰেন এসে পডল বোধহয়। রানওয়ে ভালো নয়, তব প্লেনের নামতে বা উঠতে অসুবিধা হবে না। ডাকোটা প্লেনগুলি ধানখেতেও নেমে পড়তে পারে। ফকনার চেচিয়ে উঠল, স্কোয়াড, অ্যাটেনশন।

গেট রেডি।কমান্ডোদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য জাগল। হ্যাঁ, প্লেন দেখা যাচ্ছে। ডাকোটা প্লেন। ফকনারের নির্দেশে ওয়্যারলেসে প্লেনের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে।হ্যালো ডাকোটা। বুনো হাঁস কলিং। হ্যালো ডাকোটা, বুনো হাঁস কলিং-ওভার। হ্যালো ডাকোটা।প্লেনের পাইলটকে শেষ পর্যন্ত ধরা গেল। ফকনার কথা বলবার জন্যে এগিয়ে এল।

গুড মনিং ডাকোটা অ্যান্ড হাপি ক্রিসমাস।হ্যাপি ক্রিসমাস। কর্নেল ফকনার? হ্যাঁ।তোমার জন্যে একটি বড় রকমের দুঃসংবাদ আছে।বলে ফেল।আমি তোমাদের নেবার জন্যে নামছি না। কিছুক্ষণ আগেই আমাকে জানানো হয়েছে যে, নিশোকে উদ্ধারের যে-মিশন পাঠানো হয়েছে, তা বাতিল করা হয়েছে।কেন? জেনারেল ডোফার সঙ্গে আমেরিকান সরকারের চুক্তি হয়েছে, তারা এখন ডোফাকেই রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে চায়।

ভালো কথা। আমাদের কি হবে? পাইলট সে-কথার কোনো জবাব দিল না। বিমানটি এয়ারপোর্টের ওপর দুবার চক্কর দিয়ে দক্ষিণ দিকে উড়ে গেল।সবাই তাকাচ্ছে, কিছু-একটা শুনতে চায় ফকনারের কাছ থেকে। কি বলা যায়? ফকনার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, বন্ধুরা, চমৎকার একটি সকাল।রবিনসন ভ্রূ কুঁচকে বলল, ব্যাপারটা কি? ফকনার জবাব দিল না।

এক দল থুথু ফেলল। পকেট থেকে সিগারেট বের করল। প্যাকেট বাড়িয়ে দিল রবিনসনের দিকে। রবিনসন বিরক্ত মুখে বলল, আমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি।ক্যানসারের ভয়ে? রবিনসন ঠান্ডা গলায় বলল, কেন আজেবাজে কথা বলছ? যা জানতে চাচ্ছি তা বল।কি জানতে চাচ্ছ? ফকনার সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল, ব্যাপারটা তুমি যতটুকু জান, আমিও ঠিক ততটুকুই জানি।

ওয়্যারলেসে কথাবার্তা যা হয়েছে, তুমি শুনেছ।তার পরেও আমাকে জিজ্ঞেস করবার অর্থ কি? এসব হচ্ছে মেয়েলি স্বভাব।মেয়েলি স্বভাব থোক বা না-হোক, আমি পরিষ্কারভাবে জানতে চাই-তুমি কি ভাবছ? এই মুহূর্তে আমি কি ভাবছি, জানতে চাচ্ছ? হ্যাঁ।এই মুহূর্তে আমি ভাবছি, এক কাপ গরম কফি পেলে মন্দ হয় না।

রসিকতা করছ? না, রসিকতা করব কেন? সত্যি-সত্যি কফির পিপাসা বোধ হচ্ছে। সবার জন্য গরম কফির ব্যবস্থা কর। সেই সঙ্গে খাবারদাবার। শীতকালের নেকড়ের মতো ক্ষুধার্ত বোধ করছি।এর বেশি তোমার কিছু বলার নেই।আপাতত না।কফি কি আমরা এই এয়ারপোর্টেই খাব? মন্দ কি? এরকম একটা খোলামেলা জায়গায়? অসুবিধা কি? দেখ ফকনার, তোমার বুদ্ধির ওপর আমি চিরকাল আস্থা রেখেছি।

তবুও বলছি, তোমার কি মনে হয় না জেনারেল ডোফা বিমান থেকে একটা আক্রমণ চালাতে পারে? মনে হয় না। ডোফার কথাবার্তা বোকার মতো, কিন্তু সে তোমার মতই বুদ্ধিমান। কাঁচা কাজ করবে না। আলাপ-আলোচনায় বসবে।কিসের আলোচনা? ডোফা আমাদের সঙ্গে একটা চুক্তিতে আসতে চাইবে বলে আমার ধারণা।

সে আমাদের অক্ষত অবস্থায় এ-দেশ থেকে চলে যেতে দেবে, তার বদলে নিশোকে ওদের হাতে তুলে দিতে হবে। হরতনের টো আমাদের হাতে।তাসের কিছু-কিছু খেলায় হরতনের টেক্কা মূল্যহীন।নিশো মূল্যহীন নয়। সেটা তুমি জান, আমি জানি, জেনারেল ডোফাও জানে। নিশা যতক্ষণ আমাদের হাতে আছে ততক্ষণ ভয় নেই।

ব্যাটা বেঁচে আছে তো? হুঁ।বাঁচিয়ে রাখ। নিশো হচ্ছে আমাদের বেঁচে থাকার পাসপোর্ট। ওকে ঠিকমত রাখ।দ্রুত কফির ব্যবস্থা হল। ফকনার কফির মগ হাতে শান্ত গলায় ছোট্ট একটা বক্তৃতা দিল।বন্ধুগণ, বুঝতেই পারছ, ক্ষুদ্র একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। যারা আমাদের এই কাজে লাগিয়েছে, তাদের কাছে আমাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমরা ফাঁদে আটকা পড়ে গেছি।

পশুদের জন্য ফাঁদ একটা ভয়াবহ ব্যাপার। এক বার ফাঁদে আটকা পড়লে তারা বেরুতে পারে না।……সৌভাগ্যক্রমে আমরা পশু নই, মানুষ, এবং বুদ্ধিমান মানুষ। ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আসব। আপাতত আমরা যা করব, তা হচ্ছে কভার নেব। যাতে অনুসন্ধানী বিমান আমাদের দেখতে না পায়। কারো কি এই প্রসঙ্গে বলার আছে? এক জন হাত তুলল।

ফকনার বলল, কী বলার আছে? আমাদের মধ্যে যাদের যাদের বাথরুম পেয়েছে, তারা কি বাথরুমের কাজটা এয়ারপোর্টে সারতে পারি? এদের এখানে ভালো বাথরুম আছে।সবাই হা-হা করে হেসে উঠল। হাসি আর থামতেই চায় না। ফকনার আরেকটি সিগারেট বের করতে-করতে মনে-মনে বলল, দলটা ভালো। এদের বিশ্বাস করা যায়।

এদের উপর ভরসা করা যায়।বাথরুম সারবার জন্যে দশ মিনিট সময় দেওয়া হল। ডিসমিস।কভার নেবার জন্য আফ্রিকার মতো দেশ হয় না। ঘন বনের দেশ। পুরো এক ডিভিশন সৈন্য ছোট্ট বনের মধ্যে লুকিয়ে পড়তে পারে। বিমান থেকে তাদের খোঁজা অসম্ভব। জায়গায়-জায়গায় খানাখন্দ গিরিখাত। আদর্শ কভার।

ফকনারের দল এয়ারপোর্টের উত্তরের বনে ঢুকে পড়ল। দলের কাউকেই তেমন চিন্তিত মনে হল না। অনেকেই পছন্দসই জায়গা বেছে ঘুমুবার আয়োজন করছে। দুজনের একটা দল তাস নিয়ে বসেছে। আলো ভালো মতো ফোটে নি। তাস দেখা যাচ্ছে না। তাতে খেলায় অসুবিধা হচ্ছে না। তাই স্টেকের খেলা। দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে টাকার হিসাব রাখা হচ্ছে।

সকলের ইন্দ্ৰিয় তাসে কেন্দ্ৰীভূত।এরকম পরিস্থিতিতে যে-জাতীয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাধারণত থাকে, তার কিছুই নেই। সবই কেমন যেন আলগা ধরনের। সবার মধ্যে কেমন টিলালা ভাব। যেন আফ্রিকার বনে তারা সাপ্তাহিক বনভোজনে এসেছে। কারোর চেহারায় উদ্বেগের বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। শুধু বেন ওয়াটসনকে খানিকটা ক্লান্ত মনে হচ্ছে।সে বিশাল এক পিপুল গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসেছে।

নিশো আছে তার পাশে। নিশোর হতভম্ব ভাব এখনো কাটে নি। এখন পর্যন্ত তিনি একটি কথাও বলেন নি। কফি দেওয়া হয়েছিল। খান নি, ফিরিয়ে দিয়েছেন।তাঁর শরীর খুবই খারাপ লাগছে। কিছুক্ষণ আগে বমি করেছেন। যেভাবে চোখ বন্ধ করে পড়ে আছেন, তাতে মনে হচ্ছে মৃত্যু আসন্ন। এখনি হয়তো হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসবে, কয়েক বার হেঁচকি তুলে সবরকম সমস্যার সমাধান করে দেবেন।

এ নিয়েও বেন ওয়াটসনের মাথাব্যথা নেই। সে একটা লম্বা ঘাস দাঁত দিয়ে কাটছে এবং কিছুক্ষণ পরপর কাটা ঘাসের টুকরো থু করে দূরে-দূরে ফেলছে। তার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, তার মূল প্রচেষ্টা ঘাসের টুকরোটা কত দূরে ফেলা যায়।নিশো একটা কাতর শব্দ করলেন।বেন বিরক্ত মুখে বলল, কোঁ-কে করবে না। কোঁ-কে শব্দটা আমার খুবই অপছন্দ।

নিশো বললেন, আনন্দের কোনো শব্দ করতে পারলে খুশি হতাম। তা পারছি না।যখন পারছ না, তখন চুপ করে থাক।নিশো হেসে ফেললেন।বেন কড়া গলায় বলল, হাসছ কেন? মানুষের হাসি শুনে কেউ বিরক্ত হয় না, তুমি হচ্ছ কেন? বেন উঠে চলে গেল। নিশো কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে রইলেন। অসম্ভব সাহসী একদল মানুষের সঙ্গে তিনি আছেন। সাহস একটি দুর্লভ জিনিস।

সেই দুর্লভ জিনিস এদের আছে। কিন্তু সাহসের সঙ্গে আদর্শের চমৎকার মিলটি এদের হয় নি। যে-কারণে তাদের এই সাহস অর্থহীন। থাকাও যা, না থাকাও।তিনি জানেন, এরা ভাড়াটে সৈন্য। টাকা যার এরা তার। টাকার বিনিময়ে তাকে উদ্ধার করেছে। টাকার বিনিময়ে বিনা দ্বিধায় ডোফার হাতে তুলে দেবে। অবশ্যি তার জন্যে তিনি যে খুব দুঃখিত তা নয়।

যার যা চরিত্র, সে তাই করবে।জীবনের শেষ সময়টা তিনি বিনা ঝামেলায় কাটাতে চেয়েছিলেন, তা সম্ভব হচ্ছে না। কষ্ট এই কারণেই। তিনি চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলেন, ডোফার সঙ্গে যদি দেখা হয়, তা হলে তিনি কী বলবেন। বলার মতো তেমন কোনো কথা কি সে-সময় খুঁজে পাওয়া যাবে? তার একটি প্রিয় লাইন হচ্ছে—ম্মাঝে-মাঝে জীবিত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষের ক্ষমতা অনেক বেশি হয়।

এই লাইনটি বলা যায়। তবে না-বলাই ভালো। এই কথাগুলিতে একধরনের অহঙ্কার প্রকাশ পায়।জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অহঙ্কারী সাজতে চান না। কারণ তিনি অহঙ্কারী নন। এটাও বোধহয় ঠিক হল না। তিনি অহঙ্কারী। মানুষ হিসেবে তিনি শ্রেষ্ঠ, এই অহঙ্কার তাঁর আছে।কয়েকটা মাছি তাঁকে বিরক্ত করছে। এটাও বেশ মজার ব্যাপার। মাছিগুলি অন্য কাউকে বিরক্ত করছে না।

বারবার উড়ে এসে তাঁর মুখে বসছে। কীটপতঙ্গরা মানুষের মৃত্যুর খবর আগে টের পায়। এরাও হয়তো পেয়ে গেছে। নয়ত বেছে-বেছে তাঁর মুখের ওপরই ভভ করবে কেন? নিশো দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। পানির পিপাসা হচ্ছে। আশেপাশে কেউ নেই, যাকে পানির কথা বলা যায়। চেচিয়ে কাউকে ডাকার মত জোর তাঁর ফুসফুসে নেই।তিনি মড়ার মতো পড়ে রইলেন।

তাঁর মুখের ওপর মাছি ভভ করছে। কী কুৎসিত দৃশ্য। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে কুৎসিত দৃশ্যের পাশাপাশি একটি চমৎকার দৃশ্যও তাঁর চোখে পড়ল পিপুল গাছের মোটা শিকড়ে একটি পাহাড়ী পাখি। ঝকঝকে সোনালি পাখা। চন্দনের দানার মতো লাল টকটকে ঠোঁট। কী নাম এই পাখির, কে জানে। পাখিটা তাঁকে কৌতূহলী চোখে দেখছে। আহ্, বেঁচে থাকার মধ্যে কত রকম আনন্দ। কত অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত।

সম্রাট নিশো।………..তিনি পাখির ওপর থেকে দৃষ্টি না-ফিরিয়েই বললেন, আমি শুনছি।……………আপনি কেমন বোধ করছেন?…………………………..এই মুহূর্তে, চমৎকার বোধ করছি।…….শুনলাম কিছুই খান নি।

ইচ্ছা করছে না।…………..দয়া করে আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলুন।………..নিশো তাকালেন।………..আমার নাম ফকনার।………………………….তুমি এই দলের প্রধান?

হ্যাঁ। আমি জানতে এসেছি আপনার কিছু লাগবে কি না।কাগজ এবং কলম দিতে পার? পাখিটা দেখার পর চমৎকার একটা ভাব এসেছে। চেষ্টা করব ভাবটা ধরে রাখতে পারি কি না।কবিতা লিখবেন? আবেগ ধরে রাখবার জন্যে কবিতা হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম মাধ্যম।আপনার কি মনে হচ্ছে না, কাব্যচর্চার জন্যে সময়টা উপযোগী নয়? না, তা মনে হচ্ছে না।কাগজ-কলমের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না বলে দুঃখিত।

আমি অন্য একটি ব্যাপার জানতে এসেছি।কি ব্যাপার? এ-দেশের লোকজন কি আপনাকে ভালবাসে? মনে হয় বাসে।কি করে বললেন? আমি ওদের ভালবাসি। ভালবাসা এমন একটি ব্যাপার যে, যাকে ভালবাসা হয় তাকে তা ফেরত দিতে হয়। এখানে বাকি রাখা চলে না। তুমি যখনি কাউকে ভালবাসবে তখনি তা ফেরত দিতে হবে। এবং মজার ব্যাপার কি, জান? অনেক বেশি পরিমাণে ফেরত আসে। তা-ই নিয়ম।কার নিয়ম? প্রকৃতির নিয়ম।

নিশো দেখলেন, ফকনার চলে যাচ্ছে। তিনি তাকালেন পাখিটির দিকে। আশ্চর্য, পাখিটা এখনো আছে, উড়ে যায় নি। তিনি মৃদুস্বরে বললেন, এই আয়, কাছে আয়। পাখিটা তখন উড়ে গেল। এই ব্যাপারটাও তাঁর বেশ মজা লাগল। যতক্ষণ পাখিটাকে কাছে আসতে বলেন নি, ততক্ষণ সে কাছেই ছিল। যেই কাছে ডেকেছেন অমনি উড়ে গেছে।সম্রাট নিশো।

কে? আমার নাম জনাথন—মিঃ ফকনার আপনার জন্যে কাগজ এবং কলম পাঠিয়েছেন।ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ।ফকনার দাঁড়িয়ে আছে ওয়্যারলেস সেটের পাশে। ওয়্যারলেস অপারেটর হচ্ছে বেঁটে এ। যার আসল নাম অ্যালবার্ট জিরান। সে মোটই বেঁটে নয়—প্রায় ছ ফুটের মতো লম্বা। তার বেঁটে খেতাবের উৎস রহস্যমণ্ডিত।

 

Read more

সম্রাট পর্ব – ১০ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.