সাজঘর (পর্ব-১২): হুমায়ূন আহমেদ

আজ শুক্রবারডাঃ জামান শুক্রবারে রুগী দেখেন না, তবু দুতিন জন রুগী বাইরের বারান্দায় বসে আছেডাক্তার সাহেবের সঙ্গে দেখা না করে তারা কিছুতেই যাবে নালীনাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে তাকেই ধরল, আপা ডাক্তার সাহেবকে একটু বলে দেনখুব বিপদে পড়েছিসাজঘর

লীনা মার শােবার ঘরে ঢুকতেই একসঙ্গে সবাই হৈচৈ করে উঠললীনার বড় 

বােন দীনা বলল, ঝড় বৃষ্টির মধ্যে রিকশা নিয়ে চলে এলি? তােকে আনতে গাড়ি গেছেসবচে ছােট বােন নীনা বলল, একটা লেটেস্ট মডেল গাড়িতে চড়া মিস করলে আপাদুলাভাই নতুন গাড়ি কিনেছেবড় আপাদের এখন দুটো গাড়িসুলতানা বললেন, জামাইকে আনলি না কেন? আমরা নাটক করি না বলে বুঝি আমাদের বাড়িতে আসা যাবে না| নাটকের একটা খোঁচা না দিয়ে সুলতানা মেজো জামাই সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন নাআজও পারলেন নালীনার মনটা খারাপ হয়ে গেলেও সহজ স্বরে বলল, ওর কাজ আছে মা, রাত দশটার আগে ছাড়া পাবে না। 

সুলতানা তিক্ত গলায় বললেন, আমার তিন জামাইয়ের মধ্যে মেজোটাই সবচে কাজের হয়েছে। রাত দশটাএগারটার আগে কোনােদিন ছাড়া পায় না। 

সাজঘর (পর্ব-১২): হুমায়ূন আহমেদ

লীনা বলল, জামাই প্রসঙ্গ থাক মাসবাই তাে আর একরকম হয় নাকেউ কাজের হয়, কেউ হয় অকাজেরকি আর করাকী জন্যে ডেকেছু বল? কারাে জনাদিনটিন নাকি? আমি তাে কিছু মনে করতে পারলাম নাফুল নিয়ে এসেছিযার জন্মদিন সে নিয়ে নিক| মীনা ছুটে এসে ফুল নিয়ে নিলনীনার কাছ থেকে ফুল নেবার জন্যে বড় জামাই ঝাপিয়ে পড়লনীনা তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল, প্লিজ আমার ফুলগুলাে সেভ করবলেই সে ফুলের তােড়া ক্রিকেট বলের মতাে ছুঁড়ে মারল স্বামীর দিকেসুলতানা কপট বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বললেন, ‘এরা সব সময় কি যে যন্ত্রণা করেএই তােরা চা খাবি না কফি খাবি? যেটাই খাবি একটাদুতিন পদের জিনিস বানাতে পারব না‘ 

দীনা দীনার স্বামী জামান সাহেব বললেন, কফিনীনা বলল, চানীনার স্বামী লুণ্ডুল হক চেচিয়ে বলল, সরবত‘ 

চারদিকে তুমুহাসি শুরু হললীনা মনেমনে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললএই সব চমৎকার হাসিখুশির মুহূর্তগুলােতে আসিফ কখনাে অংশ নিতে পারে না! মাঝেমাঝে সে যে উপস্থিত থাকে না তা নয়থাকে, কিন্তু বড়ই বিব্রত বােধ করেদেখে মনে হয় তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। 

সবাইকে একত্র করার উদ্দেশ্য ঠিক বােঝা যাচ্ছে নাজামান সাহেব বললেন, রাতে খাওয়াদাওয়ার পর অফিসিয়ালী সেটা বলা হবেটপ সিক্রেটএখন আমি আমার নতুন গাড়িতে সবাইকে নিয়ে একটা চক্কর দেবএখান থেকে সাভার যাবসাভার থেকে ফিরে আসবটাটকা হাওয়ায় খিদেটা চাগবেআমাকে বিশ মিনিটের জন্যে ক্ষমা করতে হবেআমার কয়েকটা রুগী বসে আছেবিদেয় করে আসি

সাজঘর (পর্ব-১২): হুমায়ূন আহমেদ

লুৎফুল বলল, ছুটির দিনেও রুগী দেখেনএত টাকা দিয়ে করবেন কী দুলাভাই? লােজন ব্লাড প্রেসারে মারা যায়আপনি দেখি টাকার প্রেসারে মারা যাবেন। 

| জামান সাহেব ঘর কাঁপিয়ে হাসতে লাগলেনসুখী মানুষের হাসিসুখী মানুষ অতি তুচ্ছ রসিকতায় হেসে ভেঙে পড়তে পারে। 

| নিমন্ত্রণের রহস্য জানা গেল রাতের খাবারের পরজামান সাহেব ছােটখাট একটা বক্তৃতা দিলেনতিনি সবাইকে নিয়ে কাশ্মীর যেতে চানশুধু কাশ্মীর নাআগ্রা, জয়পুর এবং কাশীরথাকা খাওয়ার যাবতীয় খরচ তাঁরদুই শ্যালিকা এবং শাশুড়ির টিকিটও উনি কাটবেনঅন্য কেউ যেতে চাইলে তাদের টিকিট তাদের কাটতে হবে। 

এই ভ্রমণে বাচ্চারা কেউ যাবে না। 

লুৎফুল বলল, আমার টিকিট কাটবেন না, এর মানেটা কি দুলাভাই? আমার কর্তব্য হচ্ছে শ্যালিকা পর্যন্ত, এর বাইরে নানীনা বলল, আপনি কি সত্যি মিন করছেন দুলাভাই? তােমার সন্দেহ আছে নাকি

হ্যা আছেআপনার মধ্যে যে এক জন হাতেম তাই লুকিয়ে আছে সেটা জানা ছিল না। 

এখন জানলে?তা জানলামযাচ্ছি কবে আমরা

সামনের মাসের এগার তারিখে, ফিরব বাইশ তারিখদীনা, তুমি ওদের টিকিট ওদের দিয়ে দাও

সাজঘর (পর্ব-১২): হুমায়ূন আহমেদ

নীনা বিস্মিত হয়ে বলল, টিকিটও কেটে ফেলেছেন? ‘অফকোর্সআমি কাঁচা কাজ করি নাঢাকাদিল্লীঢাকা রিটার্ন টিকিট। 

লীনা কিছুই বলল নাচুপচাপ বসে রইলজামান সাহেব বললেন, আমার মেজো শালীকে দেখে মনে হচ্ছে তার ফাঁসির হুকুম হয়েছেলীনা তুমি এমন মুখ কালাে করে বসে আছ কেন

আমার শরীরটা ভালাে না দুলাভাই‘ 

তুমি যাচ্ছ তােনা দুলাভাই‘ 

না কেন? তােমার বরকে ছেড়ে এই দশটা দিন তুমি থাকতে পারবে না?“তা নাতাহলে অসুবিধাটা কোথায়অসুবিধা কিছু নেই‘ 

জামান সাহেব নিজেই লীনাকে গাড়ি করে পৌছে দিলেনকোমল গলায় বললেন, তােমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুমি যেতে চাচ্ছ না

Leave a comment

Your email address will not be published.