সুভাষিণী (শেষ পর্ব) – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সুভাষিণী – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বদমাশ, জুয়াড়ি, জোচ্চোর, মিথ্যেবাদী বলে পল্লকে সবাই চিনত। তবু রুচিরা যে কী করে ওর প্রেমে পড়ল কে জানে! শান্ত, শিষ্ট, ভারি ভালো মেয়ে। ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল। তবু পল্লুর প্রেমে পাগল হয়ে প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ল। কেলেঙ্কারির একশেষ। পল্ল দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছিল। রুচিরার বাবা পল্লর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে গিয়ে গুণ্ডাদের হাতে মার খেয়ে এলেন।

পুলিশ অবধি পল্লুকে আড়াল করেছিল, কারণ ওর মামা ছিল ডি এস পি। রুচিরাকে আত্মহত্যা করতে হত আপনি না থাকলে।পল্লু! রুচিরা! এসব শব্দ শুনছি আর আমার মাথার ভেতর গভীর কালো জল টুপটাপ করে পড়ে তলিয়ে যাচ্ছে। কোনো ঝংকারও নেই, টংকারও নেই। পল্লুকে কি আমি মেরেছিলাম? না। বরং তাকে প্রবল মারের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন।

রুচিরা যখন বিষ খেয়ে হাসপাতালে, তখন ওদের পাড়ার লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে এসে পলুকে পাকড়াও করে। সেদিন আপনি গিয়ে আড়াল না করলে ও মরেই যেত।শুনেছিলাম, কিছুদিন আপনি ওকে বন-বাংলোয় নিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আত্মহত্যার। প্ররোচনা দেওয়ার জন্য পুলিশ ওকে খুঁজছিল। খুব গন্ডগোল চলেছিল কিছুদিন। আপনাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।

কিছুদিন পরে অবশ্য রুচিরা আর পড়ুর বেশ মিলমিশ হয়ে যায়। পল্লু কিন্তু আর আগের মতো ছিল না, পালটে গিয়েছিল। কী করে সেটা হয়েছিল তা আজও জানি না।আচ্ছা এই ঘটনাটা শুনে আমাকে তো বেশ ভালো লোক বলেই মনে হচ্ছে, তাই-না? খারাপ তো বলতে চাইছি না।

কিন্তু একটু আগে আপনিই না বলেছিলেন যে, আমি ছিলাম লাফাঙ্গা, বদমাশ, মেয়েবাজ! একইসঙ্গে একটা লোক ভালো আর খারাপ কী করে হতে পারে? সেইজন্যই তো আপনাকে একদম বুঝতে পারতাম না। কখনো মনে হত ভীষণ ভালো, ডাকাবুকো, সাদা মনের মানুষ। আবার কখনো মনে হত, ভীষণ পাজি, ভীষণ দুষ্টু, ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ।

খুব মুশকিলে ফেলেছেন আমাকে।মুশকিল শুধু আপনার নয়, আমারও। মনে মনে আপনার যে-পোট্রেটটা আঁকার চেষ্টা করেছি, সেটা বার বার বদলে গেছে। কখনো আপনাকে মনে হয় ইভান দি টেরিবল, কখনো বা সন্ত জন। আপনি এমন অদ্ভুত ছিলেন। বলেই আমার কিশোরী বয়সে আপনাকে নিয়ে আমি মনে মনে ভারি জ্বালাতন হতাম।

আমাকে নিয়ে আপনার প্রবলেমটা কী ছিল বলবেন? অনেক সময়ে কেউ কেউ নিজের অজান্তেই অন্য কারো প্রবলেম হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া আমার একটা ধারণা হয়েছিল যে, আপনি আমার দিদিকে বিয়ে করবেন এবং একদিন আপনাকে জামাইবাবু বলে ডাকতে হবে।ও হ্যাঁ, এ-কথাটা বলেছিলেন বটে। আপনার দিদির সঙ্গে আমার— ঠিক তাই।

গানের কথায় একটা মেঘলা দিনের কথা মনে পড়ল। বলব? কী জানি কেন, আজ এই শীতের সকালে আপনার কথা শুনতে আমার বেশ ভালো লাগছে। আপনি আমার সেই ছোট্ট শহরের মেয়ে। কত ছোটো ছোটো কথা মনে আছে আপনার। শুনে ফের সেই ছেলেবেলায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে? হ্যাঁ। ভীষণ।আপনার ইচ্ছের আরও জোর হোক।সেই যে মেঘলা দিনের কথা বলবেন বলছিলেন। বলুন।

হ্যাঁ, সেটা এক আশ্চর্য দিন। আমাদের শহরের এক পলিটিক্যাল লিডার তার আগের দিন কদমতলার মোড়ে খুন হয়েছিলেন। বিমলাংশু সেন। পরদিন সকাল থেকেই দোকানপাট বাজার সব বন্ধ। গাড়িঘোড়া কিছু চলছে না। অথচ সেদিন জেলা শহরে আমার গানের কম্পিটিশনের ফাইনাল পরীক্ষা। না গেলেই নয়।

শহর প্রায় পঁচিশ মাইল দূর। সকালে এসব খবর পেয়ে মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। রাগ-অভিমান-হতাশায় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে বিছানায় পড়ে পড়ে কেবল কাঁদছি, তখন দিদি এসে বলল, কাঁদিস না। ঠিক একটা উপায় হবে, দেখিস। কিন্তু ওসব যে ছেলেভোলানো কথা তা জানা ছিল বলে একটুও বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু উপায় সত্যিই হয়েছিল। দিদি আপনাকে খবর দিয়েছিল।

আমাকে! কেন? সেটাই তো গল্প। আপনি আমাকে জেলা শহরে নিয়ে যেতে রাজি হয়েছিলেন। ছ-টায় পরীক্ষা, আপনি ঠিক সাড়ে চারটেয় একটা বিরাট মোটরবাইক নিয়ে এসে হাজির। একমুখ হাসি নিয়ে বললেন, চলো খুকি, তোমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।

দাঁড়ান, দাঁড়ান! কী নাম যেন, বললেন। বিমলাংশু সেন? হ্যাঁ তো।লম্বা, ফর্সা, কোঁকড়া চুল, চোখে ভারী চশমা?হ্যাঁ।বিমলাংশু সেনকে পেটে আর বুকে ছুরি মারা হয়েছিল, তাই-না? হ্যাঁ।তাকে আমার বেশ মনে পড়ে যাচ্ছে।সত্যি? তারপর বলুন।

আমি তৈরি হয়েই ছিলাম।আপনি আমাকে কীভাবে মোটরবাইকের ক্যারিয়ারে বসতে হবে তা শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আপনার কাঁধ বা কোমর জড়িয়ে ধরে শক্ত হয়ে বসে থাকতে হবে। জীবনে সেই প্রথম মোটরবাইকে চড়া আমার। যা-ভয় করছিল! আর সেইসঙ্গে লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম।লজ্জা কীসের?ওমা! লজ্জা নয়! তখন যে মনে মনে আপনাকে নিয়ে সারাক্ষণ গবেষণা করি! তখন, বালিকা বয়সে আপনার চেয়ে রহস্যময় পুরুষ আর কেউ ছিল না আমার।

রহস্যময়! রহস্যময় ছিলাম বুঝি আমি? ভীষণ। আপনার কাঁধে হাত রেখে পেছনের সিটে আমি কাঁটা হয়ে বসেছিলাম। সারাশরীর বার বার শিউরে শিউরে উঠেছিল। আপনি অবশ্য পাত্তা দেননি আমাকে আর তেরো বছরের কালো, রোগা একটা পেতনি মেয়েকে কেনই বা পাত্তা দেবেন আপনি?সেটা ছিল বুলেট।তার মানে? মোটরবাইকটার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল।আপনার মোটরবাইকটা ছিল ভীষণ বিচ্ছিরি।

একে তো দৈত্যের মতো চেহারা, তার ওপর যা জোরে ছুটত। শব্দে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়।আপনার অভিজ্ঞতা নেই বলে বলছেন। নইলে বুলেট একটি চমৎকার বাইক। যেকোনো রাস্তায় চলতে পারে, এমনকী পাহাড়ি রাস্তায়ও।আপনি এমন উদাসীনভাবে চালাচ্ছিলেন যে, আপনার পেছনে যে একটা তেরো বছরের ভীতু মেয়ে বসে আছে, সেটা আপনার খেয়ালই ছিল না।

না, না, ভুল ভেবেছেন। নিশ্চয়ই খেয়াল ছিল, কাউকে ক্যারি করার সময় আমি তো সাবধানেই চালাতাম।সেটা বুঝি মনে আছে আপনার? অ্যাঁ! তাই তো, মনে আছে দেখছি! ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার!সেদিন কিন্তু মোটেই সাবধানে চালাননি। ভয়ে আমি বার বার দু-হাতে আপনাকে আঁকড়ে ধরেছি আর লজ্জায় মরে গেছি।

আপনি খুব লাজুক ছিলেন তো? হ্যাঁ। এখনও তাই। খুব আনস্মার্ট, ঘরকুনো। ভীতুও।হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক মেয়েদের যেমন হওয়া উচিত।তার মানে? মেয়েদের আনস্মার্ট, ঘরকুনো আর ভীতু হওয়া ভালো বুঝি? ভালো নয়? তাহলে কি অন্যরকম হওয়া উচিত? যদি তাই হবে, তাহলে আপনি আমাকে পাত্তা দেননি কেন?তেরো বছর বয়সের মেয়েরা তো ইজের পরে!

আমি সেদিন সালোয়ার-কামিজ পরেছিলাম। অ্যাণ্ড ফর ইয়োর ইনফরমেশন, যথেষ্ট সেজেছিলাম।হাঃ হাঃ! তাই বুঝি! তাহলে তো আপনাকে আমার সমীহ করাই উচিত ছিল। কিন্তু ঠিক কীরকম ব্যবহার করেছিলাম আপনার সঙ্গে, একটু বলবেন? একটু নাক সিঁটকানোর ভাব তো ছিলই। আর ছিল অ্যান অ্যাটিটিউড অফ রিজেকশন। ভাবটা যেন, তুমি যতই সাজো, কিচ্ছু যায় আসে না আমার।

আজ আমি সেদিনের ব্যবহারের জন্য যদি ক্ষমা চাই? যাঃ, ঠাট্টা করছিলাম। আমার ওই বয়েসে কি কারো কাছে পাত্তা পাওয়ার কথা? দাঁড়ান, দাঁড়ান, একটা গন্ধ পাচ্ছেন? পাচ্ছি তো। পাতাপোড়ার গন্ধ। কেউ কাছেপিঠে শুকনো শালপাতা জড়ো করে আগুন দিয়েছে বোধহয়।না, না, সে গন্ধ নয়।তবে? ক্যা-ক্যালিফোর্নিয়ান পপি! ক্যালিফোর্নিয়ান পপি? ক্যালিফোর্নিয়ান পপির গন্ধ!

আমি তো পাচ্ছি না, তবে আমরা একসময়ে ওই নামের একটা তেল চুলে মাখতাম। কিন্তু সে তো ছেলেবেলায়!কিন্তু আমি গন্ধটা পাচ্ছি যে! আর একটা বাসন্তী রঙের ওড়না–হ্যাঁ, বাসন্তী রঙের ওড়না ঝোড়ো বাতাসে খুব উড়ছে, রিয়ার ভিউ মিররে আমি যেন এখনও দেখতে পাই। ভয় করছিল আমার।উঃ!

কী হল? সেটা তো বাসন্তী রঙেরই ওড়না ছিল! আমিই ভুলে গিয়েছিলাম! আপনি বাইক থামিয়ে আমাকে বললেন ওড়নাটা কোমরে জড়িয়ে নিতে। নইলে নাকি চাকায় ওড়না জড়িয়ে অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে। এটা কী করে মনে পড়ল আপনার? না, মনে পড়েনি। একটা নিরেট নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে একটা-দুটো বিচ্ছিন্ন তারা ফুটে উঠছে মাত্র। পূর্বাপর সম্পর্ক নেই। ওই বাসন্তী রঙের ওড়না আর ক্যালিফোর্নিয়ান পপির গন্ধ।

কিন্তু দুটোকে মেলাতে পারি না যে? কোথা থেকে এক একটা স্মৃতি, পাখি, প্রজাপতি বা মৌমাছির মতো উড়ে আসে, তারপর আবার উড়ে কোথায় হারিয়ে যায়। সারাদিন আমার মাথায় এইসব দৃশ্য, গন্ধ, শব্দের পারম্পর্যহীন যাতায়াত। আপনি কী বলছিলেন যেন? ভাবছি, বলে লাভ আছে কি না।কিন্তু শুনতে আমার ভালোই লাগছে। আপনার কথাগুলো যেন আমার বন্ধ দরজায় মৃদু টোকার শব্দ।

দরজাটা আমি খুলে দিতে চাই, কিন্তু ইচ্ছে করলেও যেন পারি না। তবু শব্দটাও তো একটা সংকেত! কে জানে দরজাটা ওই সংকেতে আপনা থেকেই খুলে যাবে কি না। প্লিজ, থামবেন না, বলুন।শুনতে আপনার ভালো লাগছে কি? বোর হচ্ছেন না তো? না, বরং আমার ভেতরে যেন শুকনো মাটিতে বৃষ্টির ফোঁটার মতো কিছু পড়ছে।

বলুন, প্লিজ! বলছি। সেই পঁচিশ মাইলের ভয়, লজ্জা, শিহরন সব এখনও পুরোনো বইয়ের মতো সাজিয়ে রেখেছি মনের মধ্যে। কিন্তু পথ তো একসময়ে শেষ হয়। আপনি আমাকে ঠিক জায়গায় নামিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার ফাংশন হয়ে গেলে আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাব। চিন্তা কোরো না। সেদিন আমি কোকিলকে হার মানিয়ে গান গেয়েছিলাম।

ফেরার সময় আমার হাতে একগাদা প্রাইজ দেখে আপনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, ও বাবা, তুমি তো সাংঘাতিক মেয়ে! সব প্রাইজ লুট করে এনেছ দেখছি! বাইকে সেইসব প্রাইজ নিয়ে আসা কত শক্ত ছিল বলুন! আপনিই গিয়ে একটা বিগ শপার ব্যাগ কিনে আনলেন, তারপর সেটা যত্ন করে ক্যারিয়ারে বাঁধা হয়েছিল।কত মনে আছে আপনার! আপনি ভাগ্যবতী। আমার যে কেন কিছুই মনে পড়ে না।

কী জানি কেন, এখন হঠাৎ আমার একটা ভাঙা কাঁচের বোল-এর কথা মনে পড়ছে। সবুজ রং ছিল বোলটার, ভারি সুন্দর দেখতে।আপনি একটা বিচ্ছ। কেন ও-কথা বলছেন? আপনার সব মনে আছে, কিছুই ভোলেননি। আমার চেয়েও বেশি মনে আছে আপনার। কারণ প্রাইজে আমি এক সেট বোলও পেয়েছিলাম। মোটরবাইকের ঝাঁকুনিতেই বোধহয় একটা বোল ভেঙে গিয়েছিল। বোলগুলো ছিল সবুজ রঙের। আমিই ভুলে গিয়েছিলাম, আপনার কী করে মনে আছে?

না, না, কিছু মনে নেই। কিছুই মনে নেই। কীসের একটা আড়াল বলুন তো? কে আমার অতীতকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছে?কেউ নয়। ওটা আপনার অটো সাজেশন।আপনিই-না একটু আগে বলেছিলেন, আমি কিছু একটা ভুলতে চাইছি বলে ভুলে যাচ্ছি। কিন্তু কী ভুলতে চাইছি সেটাই তো আর মনে নেই আমার।মনে পড়লে হয়তো আপনার ভালো লাগবে না।

তা হোক, তবু তো এই আধখানা হয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে রেহাই পাব। আপনি জানেন? না তো? কিন্তু আপনার মুখ দেখে আমার কেন মনে হচ্ছে যে, আপনি জানেন? অনুমানটা ভুল।তাই হবে হয়তো।আজ আমি আসি! যাবেন! তাই তো, আপনার তো চলে যাওয়ারই কথা! আবার আসবেন।বলতে পারি না।

দাঁড়ান, দাঁড়ান। না, নড়বেন না, ওই রোদ আর ছায়ার ঠিক মাঝখানে যেমনটি দাঁড়িয়ে আছেন, তেমনই থাকুন তো! আপনার ডানদিকে রোদ, বাঁ-দিকে ছায়া… দাঁড়ালাম তো! সুভাষিণী…সুভাষিণী…আশ্চর্য! কেন এ নামটা মনে পড়ল।মনে পড়ল তাহলে! পড়ল, কিন্তু আপনি কে বলুন তো? আমাকে ভুলতে গিয়ে কত কী ভুলতে হল আপনাকে! একটু দাঁড়ান।

আশ্চর্য, আমার আদিগন্ত সব মনে পড়ে যাচ্ছে যে! উঃ, ভীষণ মনে পড়ে যাচ্ছে সব!…রেপ চার্জ, পাবলিকের মার, মামলা, কয়েদখানা, নাবালিকা ধর্ষণের জন্য…ওঃ!সব ঠিক। কিন্তু আপনি বোকা, ভীষণ বোকা। যদি সব উপেক্ষা করে জোর করে এসে আমার হাত ধরতেন, তাহলে আমিও ভয় ঝেড়ে ফেলে, সবাইকে মুখের ওপর বলতে পারতাম, উনি আমাকে রেপ করেননি, আমিই ওঁকে বাধ্য করেছিলাম।

কিন্তু কেন করেছিলে? কেন বাধ্য করেছিলেন আমায়? তখন আমার পনেরো বছর বয়স। গুটিপোকার খোলস ছেড়ে একটি প্রজাপতি বেরিয়ে এসেছে। কেউ ফিরেও দেখত না যাকে তার দিকে সকলেরই অবাক চোখের চাউনি। অহংকারে মক মক করে বুকের। ভেতরটা। তখন আমার ট্রফি চাই, মুগ্ধতা চাই, স্তাবকতা চাই, পুরুষদের হাঁটু গেড়ে বসা দেখতে চাই। কিন্তু একচোখখা, অন্ধ আবেগ একটা পুরুষকেই শুধু খুঁজে বেড়ায় তখনও।

ওই একটা পুরুষের সিলমোহর না হলে, তার জীবন-যৌবন বৃথা। বুঝেছেন? ওই পঁচিশ মাইলের উজান-ভাঁটায় মাথাটা চিবিয়ে খেয়ে রেখেছিলেন। আপনি। কিন্তু সবাই যখন আমাকে লক্ষ করে, আপনি ফিরেও তাকান না। নাবালিকা বলেই হয়তো, সুন্দরী প্রেমিকার একফোঁটা একটা রোগা প্যাংলা বোন বলেই হয়তো। কী দিয়ে আপনাকে আমার দিকে ফেরাই? আমার পাগলিনি-মন তখন ওই একটা পথই খুঁজে পেয়েছিল।

এক নিরালা দুপুরে সেজেগুঁজে আপনার নির্জন। একটেরে ঘরটায় হানা দিয়েছিলাম। মাথার ঠিক ছিল না। বশে ছিলাম না। নিজের শ্বাসেই আগুনের হলকা টের পেয়েছিলাম। আপনি অবাক হয়েছিলেন, ঠেকাতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মানুষ কি পারে নিজের শরীর মনকে রাশ টেনে রাখতে।ভেসে গিয়েছিলেন, ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম আমি।

দুই মাতাল আর পাগলের খেয়ালই ছিল না কিছু। বীরু নামে সেই মিস্তিরি ছেলেটা আপনাদের বাইরের দেওয়ালে রং করছিল, যে লোক ডেকে এনেছিল…উঃ, তারপর পৃথিবীটা উলটেপালটে গেল একেবারে। কোন অন্ধকারে ঠেলে দিলাম আপনাকে, আর। এক অন্ধকারে ডুবে গেলাম আমিও। সত্যি কথাটা যতবার বলতে গেছি, আমার মুখ চেপে ধরা হয়েছিল। অঝোরে চোখের জল ঝরে গিয়েছিল শুধু। কত কষ্ট পেতে হল আপনাকে!

কী চাই সুভাষিণী? আজ আমার কাছে আর কী চাও? আপনি কি ভেবেছিলেন সেইদিনের সেই কিশোরী সুভাষিণী ওইদিনের গন্ডগোলে ভয় পেয়ে বোবা হয়ে থাকবে চিরকাল? দুই বাড়ির মধ্যে সম্পর্ক তেতো হয়ে গেল, যাতায়াত বন্ধ, আপনাকে নিয়ে কী বিচ্ছিরি টানাহ্যাঁচড়া–মামলা-মোকদ্দমা! ভয় হয়েছিল ঠিকই, তবু মন স্থির ছিল।

কত কষ্ট করে, কত কাঠখড় পুড়িয়ে এখানে এসে ঘাঁটি গেড়েছি জানেন? সুভাষিণী, আমাকে বরং আবার সব ভুলিয়ে দাও।বিস্মৃতিই তো ভালো ছিল এর চেয়ে। এত যন্ত্রণা ছিল না! আধখানা হয়েই থেকে যাই না কেন সুভাষিণী! বাকি আধখানা খুঁজে দিতেই তো এত কষ্ট করে এতদূর আসা।বাকি আধখানা! ও! এখন আসুন তো, আমার হাতখানা ধরুন। চলুন, ওই শালবনের ছায়ায় ছায়ায় দুজন একটু হাঁটি।চলো সুভাষিণী।

 

Read more

অশ্বডিম্ব রহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Leave a comment

Your email address will not be published.