সে ও নর্তকী পর্ব – ১০ হুমায়ূন আহমেদ

সে ও নর্তকী পর্ব – ১০

স্বাতী ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। ব্যস্ত ভঙ্গিতে ছবির ওপর ভাজ করে রাখা কাগজ সরাতে লাগল। খুশি খুশি গলায় বলল, তুই একটু দূরে গিয়ে দাঁড়া লিলি। দূর থেকে দেখ কত সুন্দর ছবি। একটু দূরে না দাঁড়ালে বুঝতে পারবি না। ঘরে আলো কম। আরেকটু আলো থাকলে ভালো হতো। তুই দরজার কাছে যা লিলি। দরজার কাছ থেকে দেখ।লিলি দেখছে।

সে নড়তে পারছে না। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। নগ্ন মেয়েটিকে দেখতে মোটেই অস্বাভাবিক লাগছে না। মনে হচ্ছে এটাই স্বাভাবিক। খোলা জানালার আলো এসে মেয়েটির পিঠে পড়ছে। বই পড়তে পড়তে একটু আগে মনে হয় মেয়েটি একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেছে। মধ্যাহ্নের সেই দীর্ঘনিশ্বাস আটকে আছে ছবির ভেতর।স্বাতী মুগ্ধ গলায় বলল, ছবি দেখে বুঝতে পারছিস আমি কত সুন্দর?

লিলি জবাব দিল না। সে এখনও চোখ ফেরাতে পারছে না।কি রে, ছবিটা কেমন তাতো বলছিস না।সুন্দর!শুধু সুন্দর? আর কোনো বিশেষণ ব্যবহার করবি না?” লিলি মুগ্ধ গলায় বলল, ছবিটা উনার কাছ থেকে আনা ঠিক হয় নি। উনি ছবিটা খুব মমতা দিয়ে একেঁছেন।স্বাতী বলল, তুই কি চাস তোর এ-রকম একটা ছবি আঁকা হোক?

চুপ কর।

আচ্ছা যা চুপ করলাম। যদিও তোর চোখে তার ছায়া দেখতে পাচ্ছি। তোর মন বলছে, আহারে আমার যদি এ-রকম একটা ছবি থাকত। বুঝলি লিলি, মানুষের পুরো জীবনটাই হলো এক গাদা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অপূর্ণ তৃষ্ণার সমষ্টি। A collection of unfulfilled desires. অধিকাংশ তৃষ্ণা মেটানো কিন্তু কঠিন না। মেটানো যায়। সাহসের অভাবে আমরা মিটাতে পারি না।

বেশি বেশি সাহস কি ভালো?

সাহস হলো মানুষের প্রধান কিছু গুণের একটি।

স্বাতী আমি বাসায় যাব। আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আয়। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমি একা একা বাসায় যেতে পারব না।দেব, বাসায় পৌঁছে দেব। এত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? তুই আরাম করে একটু বোস। গুছিয়ে বলত শুনি ছবির ব্যাপারটা ওকে কিভাবে বলেছিস।সাধারণভাবে বলেছি। তোরা দুজনে মিলে কি অনেকক্ষণ গল্প করেছিস?

হ্যাঁ।

মানুষটাকে ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে না?”

হ্যাঁ।

ইন্টারেস্টিং কেন মনে হয়েছে বলত?

জানি না। আমি তোর মতো এত বিচার বিশ্লেষণ করি না।

স্বাতী গম্ভীর গলায় বলল, লোকটাকে ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে কারণ তার মধ্যে একটা গৃহী ভাব আছে। অধিকাংশ পুরুষমানুষের মুখের দিকে তাকালে মনে হয় এদের মন পড়ে আছে বাইরে। হাসনাতের বেলায় উল্টোটা মনে হয়। ওকে বিয়ে করলে জীবনটা ইন্টারেস্টিং হতো।তা হলে বিয়ে করলি না কেন?

স্বাতী জবাব দিল না। হাসতে লাগল। হাসি থামিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, বুধবার বিয়ে হবার কথা মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ মনে হলো আসলে আমাকে ও ভালোবাসে না। ও আমার মধ্যে অন্য কাউকে খুঁজছে প্রবলভাবেই খুঁজছে। ওকে বিয়ে করলে সুখী একটা পরিবার তৈরি হতো। এর বেশি কিছু না।লিলি বলল, সুখী পরিবার তুই চাস না? স্বাতী লিলির দিকে ঝুঁকে এসে বলল, আমাদের পরিবারটা দেখে তোর মনে হয় না, কি সুখী একটা পরিবার? মনে হয় কি-না বল? হয়।

বাবাকে দেখে মনে হয়, বাবা মার জন্য কত ব্যস্ত। মাকে দেখে মনে হয় স্বামী অন্তঃপ্রাণ। স্বামী কী খেয়ে খুশি হবে এই ভেবে এটা রাধছে, ওটা রাঁধছে। তার ডায়াবেটিস বেড়ে যাবে এইজন্য চা খেতে দিচ্ছে না। আসলে পুরোটাই ভান।ভান? অবশ্যই ভান। এক ধরনের প্রতারণা। ভালোবাসা ভালোবাসা খেলা।বুঝলি কী করে খেলা?

বোঝা যায়। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। যে জন্য বাবা দিনরাত নিজের কাজ নিয়ে থাকে। এই ফার্নিচারের বার্নিশ ঘষছে, ঐ করাত নিয়ে কাঠ কাটছে। মা আছে রান্নাঘরে। অথচ কথা বলার সময় একজনের জন্য অন্যজনের কী গভীর মিথ্যা মমতা! মিথ্যা মনে করছিস কেন? মমতা তো সত্যিও হতে পারে।আমি জানি সত্যি না। তারা খেলছে পাতানো খেলা। পৃথিবীটাই পাতানো খেলার জায়গা। এই খেলা তুই হয়ত খেলবি। আমি খেলব না।

লিলি বলল, তোর দার্শনিক কথাবার্তা শুনতে আমার এখন ভালো লাগছে না। আমি বাসায় যাব।চল তোকে দিয়ে আসি। ও আচ্ছা, তোকে বলতে ভুলে গেছি। এর মধ্যে কতবার যে তোর খোঁজে তোর বাবা টেলিফোন করেছেন। তুই নেই বলার পরেও বিশ্বাস করেন নি। একবার নিজে এসে দেখে গেছেন। তুই কি বাসায় কাউকে না। বলে এসেছিস?

হুঁ।তাহলে তো বাসায় গেলে আজ সর্বনাশ হয়ে যাবে।হুঁ।তোর বাবা তোকে কিমা বানিয়ে ফেলবে।লিলি ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেলল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তার হাত কাঁপতে শুরু করেছে।লিলি বাসায় পৌঁছল রাত দশটার একটু আগে। স্বাতী তাকে গাড়ি করে পৌঁছে দিয়েছে। সে বাড়ির সামনে নামে নি, লন্ড্রির সামনে নেমে হেঁটে হেঁটে বাসায় গিয়েছে। বাড়ির সদর দরজা খোলা, প্রতিটি বাতি জ্বলছে। বাড়িতে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে তা আলো দেখলে বোঝা যায়।

ভয়ঙ্কর কিছু ঘটলে মানুষ যেখামে যত বাতি আছে জ্বেলে দেয়।লিলি ভয়ে ভয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। তাকে প্রথমে দেখল মতির মা। সে একগোছা বাসন-কোসন নিয়ে কলঘরের দিকে যাচ্ছিল। লিবিকে দেখেই–ও আফাগো বলে বিকট চিৎকার দিল। হাত থেকে সম্ভবত ইচ্ছে করেই সব বাসন কোসন ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দ হলো। দোতলা থেকে রুমু ঝুমু একসঙ্গে নিচে নামছে।

বড় চাচা তার ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় এসেছেন।

তিনি বললেন, কোথায় লিলি, আয় দেখি আমার ঘরে আয়।

লিলি ঝুমুর দিকে তাকিয়ে বলল, মা কোথায় রে?

ঝুমু বলল, মার বিকেল থেকে বুকে ব্যথা হচ্ছে। মা শুয়ে আছে। মার ধারণা তুমি আর ফিরে আসবে না।

বাবা! বাবা কোথায়?

বাবা তোমাকে খুঁজতে গেছে।

কোথায় খুঁজতে গেছে?

কোথায় আর খুঁজবে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। আর ছোট চাচা গো, হাসপাতালে।ঝুমু বলল, আমার এতক্ষণ ভয় লাগে নি। এখন ভয় লাগছে। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে আপা।কেন?

মনে হচ্ছ বাবা ফিরে এসে তোমাকে খুনটুন করে ফেলবে।বড় চাচা বারান্দা থেকে আবারও ডাকলেন, লিলি কোথায়? লিলি বলল, চাচা আপনি ঘরে যান। আমি আসছি।তাড়াতাড়ি আয়।লিলি মার ঘরে গেল। সব ঘরের বাতি জ্বলছে। শুধু এই ঘরের বাতি নেভানো। লিলি দরজা থেকে ডাকল–মা।ফরিদা বুকে তীব্র ব্যথা নিয়ে অনেক কষ্টে পাশ ফিরলেন। চাপা গলায় বললেন, বাতি জ্বালা।

লিলি বাতি জ্বালাল। মায়ের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল। একদিন মানুষটা কেমন হয়ে গেছে। যেন একজন মরা মানুষ। তিনি বললেন, তুই ভা.. খেয়েছিস?লিলির খুবই অবাক লাগছে। তাকে দেখে তার মার প্রথম যে কথাটা মনে হলো। তা হচ্ছে, সে ভাত খেয়েছে কিনা। সব মা কি এ-রকম? না শুধু তার মা? ফরিদ। বললেন, তুই আলুভাজি পছন্দ করিস, তোর জন্য আলুভাজি করেছি।

তোমার কি বুকে ব্যথা খুব বেশি মা?

হ্যাঁ।

হাত বুলিয়ে দেব?

দে।

নেয়ামত সাহেব বাড়ি ফিরলেন রাত এগারোটার দিকে। লিলি তার ঘরে শুয়ে ছিল। ঝুমু দৌড়ে এসে খবর দিল। ভয়ে কাঠ হয়ে লিলি অপেক্ষা করছে কখন তা ডাক পড়ে। তার ডাক পড়ছে না।

ঝুমু কিছুক্ষণ পর আবার এসে জানালো, বাবা বারান্দায় বসে কাঁদছে।হ্যাঁ, কান্নার শব্দ লিলি শুনছে। কী বিশ্রী শব্দ করে কান্না! কান্না থামার পরেও নিয়ামত সাহেব তার মেয়েকে কাছে ডাকলেন না। তিনি এক বৈঠকে এক শ রাকাত নামাজ মানত করেছিলেন। তিনি মানত আদায় করতে জলচৌকিতে উঠে বসলেন।

শুধু নামাজ না, দুটি খাসিও মানত করা হয়েছিল। জাহেদুর রহমান রাতেই আমিনবাজার থেকে খাসি কিনে এনেছে। খাসি দুটি ব্যা ব্যা করেই যাচ্ছে।লিলিদের যেখানে যত আত্মীয়স্বজন ছিল সবাই আসতে শুরু করেছে। সবার কাছেই খবর গিয়েছে লিলিকে পাওয়া যাচ্ছে না। এমদাদিয়া মাদ্রাসার এক হাফেজ সাহেবকে সন্ধ্যাবেলায় খবর দিয়ে আনা হয়েছিল কোরান খতম করার জন্য।

তিনি সাত পারা পর্যন্ত পড়ে ফেলেছেন। এখন অষ্টম পারা শুরু করেছেন। বাড়িতে হইচই! কোনো কিছুই তাঁকে বিচলিত করছে না। তিনি একমনে কোরান পাঠ করে যাচ্ছে।রাতে লিলি মরার মতো ঘুমিয়েছে একবার শুধু ঘুম ভেঙেছে, তখন দেখে মা তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছেন।

সে ঘুমঘুম গলায় ডাকল, মা! ফরিদা তৎক্ষণাৎ বললেন, কি গো মা।কিছু না ঘুমাও। বলেই লিলি ঘুমিয়ে পড়ল। সেই ঘুম ভাঙল সকাল দশটায়। ঘরের ভেতর আলো, বিছানায় চনমনে রোদ। ঘুম ভাঙার পরেও অনেকক্ষণ সে বিছানায় শুয়ে রইল। এক ফাঁকে ঝুমু এসে উঁকি দিল। ঝুমুর ঠোঁটের ফোলা কমেনি–আরও মন হয় বেড়েছে। তার মুখ লালচে হয়ে আছে। কাল রাতে লিলি এটা লক্ষ করে নি।

তোর ঠোঁটের অবস্থা তো খুব খারাপ।

হুঁ।

ব্যথা করছে না?

করছে।

ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার তো।

ঝুমু সহজ গলায় বলল, বড় চাচা হোমিওপ্যাথি করতে বলেছেন। সামছুদ্দিন চাচা ওষুধ দিয়েছেন।

ইনজেকশন দেয়ার কথা যে ছিল দেয়া হচ্ছে না?

না। হোমিওপ্যাথি কাজ না করলে তখন দেয়া হবে।

এর মধ্যেই তো মনে হয় গ্যাংগ্রিন ফ্যাংগ্রিন হয়ে তুই মরে যাবি।

হুঁ।লিলি বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রচণ্ড যন্ত্রণা শরীরে নিয়ে সে কত স্বাভাবিকই না আছে। ঝুমু বলল, আপা তুমি চা খাবে? তোমার জন্য চা নিয়ে আসি?”

হাত-মুখ ধুইনি তো এখনও।তুমি হাত-মুখ ধোও আমি চা নিয়ে আসছি।হাত-মুখ ধুতে যাবার কোনো ইচ্ছা করছে না। বিছানায় শুয়ে আরও খানিকক্ষণ গড়াগড়ি করতে ইচ্ছা করছে। বারান্দা থেকে বাধার গলা শোনা যাচ্ছে খবরের কাগজ কোথায়? এখনও দেয় নাই? হারামজাদা হকারকে আমি খুন করে ফেলব।

বাবা আজ তাহলে অফিসে যান নি। লিলির সঙ্গে তাঁর এখনও দেখা হয় নি। লিলি জানে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ডাক পড়বে। কাল সারাদিন কোথায় ছিল, এত রাতে কোত্থেকে এসেছে, কে তাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে, অন্য একটা শাড়ি পরে সে বাসায় ফিরেছে, শাড়িটা কার? প্রশ্নের পর প্রশ্ন করা হবে।লিলি ঠিক করেছে সব প্রশ্নের জবাব সে দেবে। শান্ত ভঙ্গিতেই দেবে। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে সে কথা বলতে পারে না। আজ বলবে।

বাবার সঙ্গে কথা বলার পর সে যাবে বড় চাচার ঘরে। বড় চাচাকে বলবে, ঝুমুর ঠোঁটের এই অবস্থা আর আপনি তাকে হোমিওপ্যাথি করাচ্ছেন। তাকে এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। ভালো কোনো ডাক্তার। বড় চাচা যদি বলেন, ডান দিকের জানালার পাল্লাটা একটু টেনে দে। তখন সে বলবে, চাচা পাল্লাটা তো আপনার হাতের কাছেই। আপনি নিজেই একটু টেনে নিন।

তারপর সে নিচে নামবে। রুমু ঝুমুর স্যার যদি ইতিমধ্যেই এসে থাকেন তাহলে তাকে বলবে, এই যে ভদ্রলোক শুনুন, সবার সামনে বিশ্রী ভঙ্গিতে নাকের লোম ছিঁড়বেন না। আবার কখনও যদি আপনাকে এই কাজ করতে দেখি তাহলে আপনার নাক আমি কেটে ফেলব।ঝুমু চা নিয়ে এসেছে। লিলি বাসি মুখেই চায়ে চুমুক দিচ্ছে। চা-টা খেতে ভালো লাগছে। ঝুমু পাশে দাঁড়িয়ে আগ্রহ নিয়ে চা খাওয়া দেখছে। লিলি বলল, কিছু বলবি ঝুমু?

না।

কাল ফিরতে দেরি করায় তোরা খুব চিন্তা করছিলি?

আমি আর রুমু বাদে সবাই চিন্তা করছিল।

তোরা চিন্তা করিস নি?

না। তুমি যদি রাতে না ফিরতে তাহলে আজ সকালে আমি আর রুমু পালিয়ে যেতাম।কোথায়? ঝুমু কিছু বলল না, হাসতে লাগল। লিলি শঙ্কিত গলায় আবার বলল, কোথায় পালাতি? ঝুমু হাসছে। মাটির দিকে তাকিয়ে হাসছে। সে অনেক কথা বলে ফেলেছে। আর বোধহয় কিছু বলবে না। লিলিকে অবাক করে দিয়ে ঝুমু আবারও কথা বলল, তবে সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গ।

মা কাল তোমার জন্য খুব মার খেয়েছে।

মা মার খেয়েছে?”

মা তোমাকে বাঁচাবার জন্য বলেছিল সেই তোমাকে ইউনিভার্সিটিতে যেতে বলেছে বলে তুমি গেছ। আর তাতেই বাবার মাথায় আগুন ধরে গেল। কিল চড় ঘুসি–ভয়ঙ্কর ব্যাপার! তুমি না দেখলে বিশ্বাস করবে না।

তোরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলি?

হুঁ।

মাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলি না?

না।

আশ্চর্য, তোরা চুপ করে দেখলি?

ঝুমু আবার হাসল।

লিলি তীব্র গলায় বলল, তুই হাসছিস?”

ঝুমু বলল, তখন একটা মজার কাণ্ড হলো, আমাদের মতির মা বুয়া মাছ কাটার বঁটি হাতে নিয়ে ছুটে গেল। চিৎকার করে বলল, আম্মারে ছাড়েন। না ছাড়লে বঁটি দিয়া কল্লা নামাইয়া ফেলমু। তখন বাবা মাকে ছেড়ে দিল।অনেক কাণ্ড তাহলে হয়েছে? হুঁ। আরও অনেক কাণ্ড হবে।কী হবে? তোমার বিয়ে হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে হবে। বাবা আর বড় চাচা মিলে ঠিক করেছে।কার সঙ্গে হবে?

সেটা পুরোপুরি ঠিক হয় নি। বাবার এক বন্ধুর ছেলে আছে। পুরনো ঢাকায় মোটর পার্টসের দোকান। আজ সন্ধ্যাবেলা সে আসবে। বড় চাচা তার ইন্টারভ্যু নেবেন।লিলি বিস্ময় নিয়ে ঝুমুর কথা শুনছে। কথার বিষয়বস্তুর চেয়েও ঝুমুর কথা বলার উৎসাহ দেখেই সে বেশি অবাক হচ্ছে। লিলি বলল, তুই হঠাৎ এত কথা বলা শুরু করলি ব্যাপারটা কী? তুই একাই কথা বলা শুরু করেছিস না রুমুও শুরু করেছে?

ঝুমু আবারও হাসল।

লিলি বলল, রুমু কোথায়?

স্যারের কাছে পড়ছে। আপা তোমার চা খাওয়া হয়েছে? হ্যাঁ।তাহলে চলো, বাবা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। তোমার সঙ্গে কথা বলার। জন্য বাবা আজ অফিসে যান নি।আচ্ছা তুই যা আমি আসছি।লিলি দাঁত মাজল, হাত-মুখ ধুল, চুল আঁচড়াল। কি মনে করে শাড়িও পাল্টাল।

তার ঘর থেকে বাবার ঘরে যেতে হলে বড় চাচার ঘরের সামনে দিয়ে যেতে হয়। এই প্রথম বড় চাচার ঘরের সামনে দিয়ে যাবার সময় তিনি বললেন না–কে যায়, লিলি না? একটু শুনে যা তো।নেয়ামত সাহেব খবরের কাগজ নামিয়ে রাখলেন, চশমা ভঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে বললেন, বোস। লিলি বসল এবং বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, চোখ নামিয়ে নিল না! নেয়ামত সাহেব সিগারেট ধরালেন।

তুই কাল কোথায় গিয়েছিলি?

ইউনিভার্সিটিতে।

তারপর কোথায় গিয়েছিলি?

একটা বাসায় গিয়েছিলাম। কলাবাগানে।

তোর কোন বান্ধবীর বাড়িতে?

না।

তাহলে কার বাড়িতে?

হাসনাত সাহেব নামে একজন ভদ্রলোকের বাড়িতে।

উনি কী করেন?

উনি একজন পেইন্টার। ছবি আঁকেন।

ঐ বাড়িতে আর কে কে থাকে?

উনি একাই থাকেন। মাঝে মাঝে তার মেয়ে এসে থাকে।

তাঁর স্ত্রী কোথায়?

বোধহয় মারা গেছেন।

বোধহয় বলছিস কেন?

উনার মেয়েটা বলছিল মারা গেছেন। আমার তা মনে হয় নি। আমার মনে হয়েছে ভদ্রলোক ডিভোর্সড়!

তুই কি প্রায়ই ঐ বাড়িতে যাস?

আগে একবার গিয়েছিলাম।

তোর মা বলছিল অন্য কার একটা শাড়ি পরে তুই ফিরেছিস।

বৃষ্টিতে শাড়ি ভিজে গিয়েছিল সে জন্য বদলেছি।

নেয়ামত সাহেব চুপ করে আছেন। লিলি অবাক হয়ে লক্ষ করল বাবা এখন আর তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছেন না। চোখ নামিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর হাতের সিগারেট অনেক আগেই নিভে গেছে। তিনি নেভা সিগারেটেই টান দিচ্ছেন। লিলি বলল, বাবা সিগারেট নিভে গেছে।নেয়ামত সাহেব লিলির এই কথাতেও চমকালেন। সিগারেট ধরালেন না। নেভা সিগারেটে আবার টান দিলেন। লিলি বলল, বাবা আমি যাই।

নেয়ামত সাহেব হ্যাঁ না কিছুই বললেন না। লিলি বাবার সামনে থেকে উঠে এলো। তিনি অদ্ভুত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।লিলির খিদে পেয়েছে। নাশতার জন্য নিচে নামতে তার ইচ্ছা করছে না। সে ছাদে উঠে গেল। ছোট চাচার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে। সহজভাবে কিছুক্ষণ কথা বলবে। হাসি-তামাশা করবে।

Leave a comment

Your email address will not be published.