সে ও নর্তকী পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

সে ও নর্তকী পর্ব – ৫

স্বাতীর ঘরের দরজা জানালা বন্ধ। পর্দা টানানো। ঘর অন্ধকার, যে সন্ধ্যার পর বাতি জ্বালায় নি। নাজমুল সাহেব ব্যাপারটা লক্ষ করলেন। তিনি স্বাতীর ঘরের বান্দারার সামনে দিয়ে কয়েকবার হাঁটাহাঁটি করলেন। একবার ডাকলেন, স্বাতী কী করছিস মা?

স্বাতী জবাব দিল না। নাজমুল সাহেব জবাবে জবাবের জন্য কান পেতে ছিলেন। তিনি শুনলেন ভেতরে মিউজিক হচ্ছে। ট্রাম্পেট। স্বাতীর প্রিয় বাজনা। ট্রাম্পেট আনন্দময় সঙ্গীত। মার্শাল মিউজিক, যে মিউজিক উৎসবের কথা মনে করিয়ে দেয়। দরজা জানালা বন্ধ করে, বাতি নিভিয়ে আনন্দময় বাজনা শুনতে হবে কেন? নাজমুল সাহেব চিন্তিত মুখে একতলায় নামলেন।

রওশন আরা রান্নাঘরে। তিনি বই দেখে একটা চাইনিজ স্যুপ তৈরি করছেন। তী বিকেলে বলেছে তার শরীর ভালো লাগছে না, রাতে কিছু খাবে না। দুপুরেও ভালোমতো খায় নি। ভাত নাড়াচাড়া করে উঠে পড়েছে। নাজমুল সাহেবকে রান্নাঘরে দেখে তিনি চোখ তুলে তাকালেন। ব্লেন্ডারে হাড় ছড়ানো মুরগির মাংস দেয়া হয়েছে। ব্লেন্ড করতে হবে। কড়াইয়ে সয়া সস মেশানো সবজি ফুটছে। ব্লেড করা মাংস কড়াইয়ে ছেড়ে দিতে হবে। তাঁর হাতে সময় নেই। তিনি বিরক্ত চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন।নাজমুল সাহেব বললেন, স্বাতীর কী হয়েছে বলো তো?

কেন?

সন্ধ্যা থেকে দেখছি ঘরের দরজা জানালা বন্ধ। ঘরে বাতি জ্বলে নি।

রওশন আরা বললেন, মাথা-টাথা ধরেছে। শুয়ে আছে।

কিছুদিন থেকেই তার মধ্যে অস্থির ভাবটা লক্ষ করছি।

এই বয়সে অস্থির ভাব আসে। আবার চলে যায়। এটা কিছু না।

নাজমুল সাহেব চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। রওশন আরা বললেন, তুমি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থেক না। আমি কাজ করছি।কাজ করো। তোমার কাজ তো আমি নষ্ট করছি না।করছ। কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে আমি রান্নাবান্না করতে পারি না।নাজমুল সাহেব বের হয়ে এলেন। আবার দোতলায় গেলেন। সন্ধ্যা থেকে তার নিজেরও খুব একা একা লাগছে। স্বাতীর সঙ্গে গল্প করতে পারলে ভালো লাগত।

সবচেয়ে ভালো হতো স্বাতীকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে গেলে। বেড়ানোর জায়গা তেমন নেই। তাঁর বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা সীমিত। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। তিনি কোথাও যান না। কেউ এলে আনন্দিত হন না। বিরক্তবোধ করেন। সারাজীবন কোর্টে বিচারকের চেয়ারে বসার এই হলো কুফল। এই চেয়ার মানুষের ভেতর থেকে মানবিক গুণ আস্তেআস্তে শুষে নিয়ে যায়। মানুষটা আর পুরোপুরি মানুষ থাকে না। মানুষের ছায়া হয়ে যায়।

তিনি স্বাতীর ঘরের দরজায় হাত রেখে ডাকলেন, স্বাতী মা, কী করছিস?

কিছু করছি না বাবা। ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছি।

কেন?

এম্নি।

তোর সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করা যাবে?

হ্যাঁ যাবে।

স্বাতী দরজা খুলে দিল। মিউজিক সেন্টারের নব ঘুরিয়ে শব্দ কমিয়ে দিয়ে হাল্কা গলায় বলল, তোমাকে গল্প করতে হবে অন্ধকারে বসে। অসুবিধা হবে না তো বাবা?

না। ঘর অন্ধকার কেন?

কেন জানি আলো চোখে লাগছে। বাবা তুমি খাটে এসে পা তুলে বসো। কী নিয়ে গল্প করতে চাও?

তোর পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?

মোটামুটি। ভালো না।

ভালো না কেন?

স্যাররা ইন্টারেস্টিং করে পড়াতে পারেন না। একঘেয়ে বক্তৃতা দেন। শুনতে ভালো লাগে না। ক্লাসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতেই আমার বেশি ভালো লাগে। স্যার বক্তৃতা করেন, আমরা মজার মজার নোট নিজেদের মধ্যে চালাচালি করি।

তোর কি অনেক বন্ধু-বান্ধব?

আমার একজনই বন্ধু?

লিলি?

হ্যাঁ লিলি।

ওকে তোর এত পছন্দ কেন?”

বাবা ও খুব বিশ্রী পরিবেশে বড় হচ্ছে–তারপরেও সে বড় হচ্ছে নিজের মতো করে। ও হচ্ছে এমন একটা মেয়ে যে জীবনে কোনো দিন মিথ্যা কথা বলে নি।

তাই নাকি?

হ্যাঁ তাই। ও কেমন মেয়ে তোমাকে বুঝিয়ে বলি বাবা ধরো, আমি ভয়ঙ্কর কোনো অন্যায় করলাম, তোমরা সবাই আমাকে ত্যাগ করলে। ও তা করবে না। ও আমার পাশে থাকবে।

তুই কি কোনো অন্যায় করেছিস?

না।

তোর কি কোনো সমস্যা হয়েছে? তুই কি কোনো সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিস?

হুঁ।

সমস্যাটা কী?

আমার সমস্যা আমি নিজেই মিটাতে চাচ্ছি। এইজন্য তোমাদের বলতে চাচ্ছি। তেমন বড় কিছু সমস্যা না। সমস্যা যদি খুব বড় হয়ে দেখা দেয় তখন তোমাদের বলব।নাজমুল সাহেব অত্যন্ত চিন্তিতবোধ করছেন। স্বাতীর ব্যাপারটা তিনি ধরতে পারছেন না। তিনি অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে মেয়েকে টেনে নিয়ে কোমল গলায় বললেন, মা শোন! আমি তো পুরনো দিনের মানুষ।

তোদের এ-কালের সমস্যার ধরন-ধারণ আমি জানি না। তারপরেও বলছি, তোর সমস্যা মেটানোর চেষ্টার ত্রুটি আমার দিক থেকে কখনও হবে না। মনে করা যাক তুই একটি ছেলেকে পছন্দ করেছিস, যাকে আমাদের পছন্দ না। যাকে কিছুতেই আমরা গ্রহণ করতে পারছি না–তারপরেও আমরা তোর মুখের দিকেই তাকাব।

সেটা আমি জানি।তাহলে তুই এমন ঘর-দুয়ার অন্ধকার করে বসে আছিস কেন?বাতি জ্বালাব? হুঁ।স্বাতী বাতি জ্বালাল। বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল। নাজমুল সাহেব হাসিমুখে বললেন, তোর কালেকশনে কোনো নাচের মিউজিক আছে? আছে।তাহলে সুন্দর একটা নাচের মিউজিক দে তো মা। ছোটবেলার ঐ নাচটা দেখাবি? মাই লিটল ড্যান্সার–ছোট্ট নর্তকী। স্বাতী হাসছে। নাজমুল সাহেব হাসছেন।

আজ স্বাতীর বিয়ে। গোপন বিয়ে। অল্প কয়েকজন শুধু জানে। লিলি সেই অল্প কয়েকজনের একজন। সে স্বাতীদের বাসার সামনে ভয়ে ভয়ে রিকশা থেকে নামল। তার হাত-পা কাঁপছে। সে রিকশা থেকে নেমে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আজ স্বাতীদের বাসা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।লিলির স্বপ্নের বাড়ির সঙ্গে স্বাতীদের বাড়িটার খুব মিল আছে। শুধু একটাই অমিল, লিলির স্বপ্নের বাড়ি একতলা, স্বাতীদেরটা দোতলা।

স্বাতীদের বাড়ির ছাদে ওঠার ব্যবস্থা নেই–সিঁড়িঘর করা হয় নি। আর লিলির স্বপ্নের বাড়িতে ছাদটাই প্রধান। সেই ছাদে একটা সিঁড়িঘর আছে। এই দুটি অমিল ছাড়া আর কোনো অমিল নেই।স্বাতীর বাবা লিলির কল্পনার বাবার চেয়েও ভালো। তিনি রিটায়ার করে ঘরে আছেন। সারাক্ষণই কাজ নিয়ে থাকেন। লিলি কখনও তাঁকে কাজ ছাড়া বসে থাকতে দেখে নি।

হয় বাগানে কাজ করছেন, নয় কাঠের কাজ করছেন। মুখে কোনো বিরক্তি নেই। স্বাতীর কোনো বন্ধু-বান্ধবকে দেখলে এত আগ্রহ করে কথা বলেন। হেন-তেন কত রসিকতা। আর লিলির বাবা লিলির বন্ধুদের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকান। ভাবটা এ-রকম–এরা কেন এসেছে? কী চায়? লিলির বন্ধুরা যদি বলে স্নামালিকুম চাচা। তাহলে তিনি বিরক্ত মুখে বলেন–হুঁ। বলেই ওদের সামনেই নাক ঝাড়েন।

নাক ঝাড়ার ব্যাপারটা দুমিনিট পরেও করতে পারেন, তা করবেন না। মাঝে মাঝে লিলির মনে হয় ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত।লিলি আজ স্বাতীদের বাড়িতে ঢুকল ভয়ে ভয়ে। স্বাতীর বাবা নাজমুল সাহেবের সঙ্গে যদি দেখা হয়ে যায়। যদি তিনি বলেন এত সেজেগুজে বের হয়েছ কী ব্যাপার? তাহলে লিলি কী বলবে? তাঁকে নিশ্চয়ই বলা যাবে না–আজ আপনার মেয়ে গোপনে বিয়ে করবে। আমি তাকে নিতে এসেছি।

লিলি কিছু না বললেও একদিন তো সব জানাজানি হবে। তখন যদি লিলির সঙ্গে তার দেখা হয় এবং তিনি বলেন–মা, তোমাকে এত স্নেহ করি আর এত বড় একটা ঘটনা সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছুই বললে না? এটা তো মা তোমার কাছ থেকে আশা করি নি।নাজমুল সাহেব বসার ঘরের বারান্দায় মাদুর পেতে বসেছেন। কেরোসিন কাঠ দিয়ে বক্সজাতীয় কি যেন বানাচ্ছেন। কাঠমিস্ত্রীদের মতো তাঁর কানে পেনসিল গোঁজা। হাতে ছোট্ট একটা করাত। লিলিকে দেখে তিনি হাসিমুখে বললেন, কেমন আছ গো লিলি মামণি?

লিলি বলল, ভালো। কী বানাচ্ছেন চাচা?

আগে বলব না। বানানো হোক তারপর সবাইকে চমকে দেব।

স্বাতী কি বাসায় আছে?

হ্যাঁ আছে। মেয়েটির কোনো সমস্যা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। খুব অস্থির। অকারণে একবার দোতলায় যাচ্ছে–একবার নামছে। সকালে নাশতা খায় নি–শরীর নাকি ভালো না। তোমাদের কি কোথাও যাবার কথা?

স্বাতী জবাব দিল না। তার বুক ঢিপ ঢিপ করছে। বেশিক্ষণ জেরা করলে সত্যি কথা বলে ফেলবে। নাজমুল সাহেব বললেন, সোজা দোতলায় উঠে যাও মা। ও ঘণ্টাখানেক ধরে দোতলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। যাবার আগে আরেকটা কাজ করতে পারবে মা?” অবশ্যই পারব।

রান্নাঘরে গিয়ে তোমার চাচিকে বলো আমাকে এক কাপ চা দিতে। কড়া করে যেন বানায়।” লিলি রান্নাঘরের দিকে রওনা হলো। স্বাতীর মা রওশন আরা লিলির দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলেন যেন লিলি তারই একটা মেয়ে। অন্যের মেয়েদের দিকে এমন আপন করে তাকানো যে কত বড় গুণ তা-কি এই মহিলা জানেন?

লিলি বলল, চাচি খুব কড়া করে এক কাপ চা চাচাকে দিন।রওশন আরা বললেন, আচ্ছা দিচ্ছি। তোমাকে দূত হিসেবে পাঠিয়েছে বলেই দিচ্ছি। তোমার চাচার চা নিষেধ হয়ে গেছে। ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। চিনি একেবারেই বন্ধ। আর এদিকে তার ঘনঘন চা খাবার অভ্যাস। শুধু লিকার হলে কথা ছিল–একগাদা চিনি দিয়ে চা বানাতে হয়।বাজারে স্যাকারিন জাতীয় কি নাকি পাওয়া যায় চাচি?

পাগল হয়েছ, তোমার চাচা খাবে স্যাকারিনের চা? মুখে দিয়েই থু করে ফেলে .বে না? দিয়ে দেখেছিলাম। লিলি তুমি কী খাবে বলো? আমি কিছু খাব না চাচি।বললেই হবে? তুমি আজ সারাদিন থাকো। দুপুরে খেয়েদেয়ে তারপর যাবে। স্বাতীর কি হয়েছে তুমি কিছু জানো লিলি? লিলি শঙ্কিত গলায় বলল, কেন চাচি।ও কাল রাত থেকে কেমন ছটফট করছে। সকালেও কিছু খায় নি। আমাকে কিছু বলল না। তুমি জিজ্ঞেস করো তো ব্যাপার কী?

আচ্ছা চাচি, আমি জিজ্ঞেস করব।লিলি দোতলায় উঠে গেল। দোতলার টানা বারান্দার শেষ মাথায় স্বাতী দাঁড়িয়ে আছে। লিলিকে তার দিকে আসতে দেখেও সে সিউল না। যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সেভাবে দাঁড়িয়ে রইল। লিলি যখন ডাকল, এই স্বাতী! তখনই সে নড়েচড়ে উঠল। তীক্ষ্ণ গলায় বলল, তুই এত সুন্দর শাড়ি কবে কিনলি? আগে দেখি নি তো? তোকে অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে কুইন অব সেবা।

লিলি হকচকিয়ে গেল। স্বাতীর ব্যাপারটা সে বুঝতে পারছে না। কেমন পাগলি-পাগলি চেহারা। মনে হচ্ছে দুদিন চুলে চিরুনি দেয় নি, চুল জট ধরে আছে। চোখের নিচে কালি। কিছুক্ষণ আগে মনে হয় পান খেয়েছে। দাঁত লাল হয়ে আছে। পরে আছে সাধারণ একটা শাড়ি। লিলি বলল, তুই এখনও রেডি হোস নি? সাড়ে এগারোটা বাজে। আমাদের না বারোটার মধ্যে যাবার কথা?

স্বাতী এমনভাবে তাকাল যেন লিলির কথা বুঝতে পারছে না। সে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, মিষ্টি পান খাবি লিলি? আমার ছোট মামা কলকাতা থেকে এক গাদা মিষ্টি পান প্যাকেট করে নিয়ে এসেছে। আচ্ছা বল দেখি মিষ্টি পান কোনো আনার জিনিস? আমি অবশ্যি একটার পর একটা পান খেয়ে যাচ্ছি। দেখ, পান খেয়ে দাঁতের কী অবস্থা করেছি।লিলি বলল, তোর ব্যাপারটা কী? আজ না তোর বিয়ে। ভুলে গেছিস? স্বাতী হাসল। লিলি বলল, এ রকম অদ্ভুত করে হাসছিস কেন?

একটা ব্যাপার হয়েছে। আয় ঘরে আয়, বলছি।স্বাতী হাত ধরে লিলিকে তার ঘরে নিয়ে গেল। চাপা গলায় বলল, চুপ করে বোস। আমি আসছি। এক্ষুনি আসছি। তোকে এই শাড়িটাতে দারুণ লাগছে। দাম কত নিল? এক হাজারের উপরে নিশ্চয়ই।

পনেরো শ।

দাম বেশি নিয়েছে। তবু সুন্দর। আমায় গায়ের রঙ তোর মতো ফর্সা হলে আমিও কিনতাম।

তোর ব্যাপারটা কি আগে শুনি।

স্বাতী প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমি ঠিক করেছি যাব না।

কখন ঠিক করলি?

কাল রাতে। ঠিক এগারোটার সময়। সারারাত আর ঘুম হয় নি। তাকিয়ে দেখ এক রাতে চোখে কালি পড়ে গেছে। সকালে এমন মাথা ঘুরছিল, মনে হচ্ছিল পড়ে যাব।

হঠাৎ এ-রকম ডিসিশান নিলি কেন?

স্বাতী আঙুল দিয়ে শাড়ি পেঁচাচ্ছে। খুব যেন অস্বস্তিতে পড়ে গেছে।

কথা বলছিস না কেন?

মন স্থির করতে পরছি না।

বিয়ে পিছিয়ে দিচ্ছিস?

স্বাতী জবাব দিল না। আঙুলে চুলের জট সারাবার চেষ্টা করতে লাগল। লিলি বলল, উনাকে জানিয়েছিস?

কাকে? হাসনাতকে?

হুঁ।

না।

উনি তো বসে অপেক্ষা করতে থাকবেন।

স্বাতী বলল, দাঁড়া তোর জন্য মিষ্টি পান নিয়ে আসি।

মিষ্টি পান আনতে হবে না। তুই বোস।

স্বাতী বলল, আমার মনে হয় জ্বর এসেছে, দেখ তো গায়ে হাত দিয়ে।লিলি স্বাতীর কপালে হাত দিল। কপাল ঠাণ্ডা, জ্বর নেই। স্বাতী বলল, লিলি, তুই আসায় খুব ভালো হয়েছে। আমি একটা চিঠি লিখে রেখেছি, ওর হাতে দিনি। চিঠিতে গুছিয়ে সবকিছু লেখা আছে।আমি কোনো চিঠি দিতে পারব না। তোদর এই হাইড্রামার মধ্যে আমি নেই। আমি এক্ষুনি বিদেয় হচ্ছি।

আচ্ছা থাক, চিঠি দিতে হবে না। মুখে বলবি। বলবি আমার ভয়ঙ্কর জ্বর। উঠে বসার উপায় নেই। বিছানায় এলিয়ে পড়ে আছি। মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে। জ্বরটা কমলেই আমি এসে সব গুছিয়ে বলব।লিলি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আমি এসব কিছুই বলতে পারব না। আমি বাসায় যাচ্ছি।

স্বাতী হাত ধরে লিলিকে বসিয়ে দিল। কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, তোর পায়ে ধরছি লিলি তুই গিয়ে বল। তুই তো আবার সত্যি ছাড়া মিথ্যা বলতে পারিস না। আচ্ছা সত্যি কথাটাই বল।সত্যি কথাটা কী? স্বাতী নিচু গলায় বলল, সত্যি কথাটা হচ্ছে আমি ওকে বিয়ে করব না। দ্য গেম ইজ ওভার।লিলি হতভম্ব গলায় বলল, উনার অপরাধটা কী?

কোনো অপরাধ নেই। আমি অনেক চিন্তাটিন্তা করে বের করেছি–ওকে আমার পছন্দ হয় নি। ওর সংসার পছন্দ হয়েছে, ওর মেয়েটা পছন্দ হয়েছে, ওর ছবি পছন্দ হয়েছে। আমি চেয়েছিলাম মানুষটাকে ভালোবাসতে।

চা খাব না।আহ খা-না কতক্ষণ লাগবে চা খেতে। আমি যাব আর আসব। চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবি? মা বড়া ভাজছে স্বাতী চা আনত গেল। গেল যে গেল আর আসার নাম নেই। অস্বস্তি নিয়ে লিলি অপেক্ষা করছে। সে বুঝতে পারছে না এখান থেকে বাসায় চলে যাবে, না কাজী অফিস হয়ে যাবে। উনার সঙ্গে তার পরিচয় এমন না যে নানান সান্ত্বনার কথাটথা বলে বিয়ে ভাঙার খবর দেবে। একদিনই সামান্য কথা হয়েছে। মানুষটাকে গম্ভীর ধরনের মনে হয়েছে।

তবে অপছন্দ হয় নি। ভালো মানুষ বলে মনে হয়েছে। লিলি তাকে কি করে বলকে স্বাতী ঠিক করেছে আপনাকে বিয়ে করবে না। দ্য গেম ইওভার।স্বাতী প্লেটভর্তি বড়া আর চা নিয়ে এল। হাসিমুখে বলল, একেবারে আগুন গরম। কড়াই থেকে নামিয়ে এনেছি। ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে আরেকটু ঝাল হলে ভালো হতো। ভাজাভুজি ঝাল না হলে ভালো লাগে না।

স্বাতী এখন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলছে। শব্দ করে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। পা নাচাচ্ছে। তার পা নাচানোর বিশ্রী অভ্যাস আছে।লিলি বলল, আমি উঠি? স্বাতী বলল, চল আমি তোকে রিকশায় তুলে দিয়ে আসি।রিকশায় তুলে দিতে হবে না।আহা চল না।রিকশায় তুলে দেবার কথা বলেও বসার ঘরের দরজা পর্যন্ত এসে স্বাতী থমকে দাঁড়িয়ে বলল, আমার এখন আর তোকে এগিয়ে দিতেও ইচ্ছা করছে না–তুই একাই যা।

 

Read more

সে ও নর্তকী পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.