সে ও নর্তকী পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

সে ও নর্তকী পর্ব – ৬

স্বাতী বসার ঘরে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে তাকে কেমন ক্লান্ত এবং হতাশ লাগছে। লিলির মনে হলো এখন সে যদি একবার বলে–মন থেকে এসব ঝামেলা দূর করে চল তো আমার সঙ্গে। মানুষটা খারাপ না। বিয়ে করে তুই সুখী হবি। তাহলে স্বাতী বলবে–আচ্ছা একটু দাঁড়া আমি কাপড় বদলে আসি।

লিলি দেখল স্বাতীর চোখে পানি এসে গেছে। স্বাতীর বড় বড় চোখ। চোখভর্তি পানি। কী সুন্দর যে লাগছে! মগবাজার কাজী অফিসের সামনে হাসনাত দাঁড়িয়ে আছে। সে একা না। তার সঙ্গে তিন/চারজন বন্ধুবান্ধব আছে। তাদের মুখ হাসি হাসি হলেও একধরনের চাপা টেনশন টের পাওয়া যায়। প্রত্যেকের হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। প্যাকেট খুলে সবাই নিশ্চয়ই একসঙ্গে ধরিয়েছে।

হাসনাতের চুল সাধারণত এলোমেলো থাকে। আজ সুন্দর করে আঁচড়ানো। তাড়াহুড়া করে শেভ করায় থুতনির কাছে গাল কেটেছে। রক্ত জমাট বেঁধে আছে। তার পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবি স্বাতীর দেয়া উপহার। পাঞ্জাবি মাপমতো হয় নি, বড় হয়েছে। মৌলানাদের পাঞ্জাবির মতো লাগছে। হাসনাতকে কেমন যেন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।

লিলি রিকশা থেকে নামতেই সবাই আগ্রহ নিয়ে তাকাল। হাসনাত একটু এগিয়ে এসে বলল, আমার কাছে ভাংতি আছে ভাড়া দিচ্ছি–তুমি ভেতরে চলে যাও লিলি। ভেতরে আমার বড় খালা আছেন। তুমি দেরি করলে কেন?” লিলি কি বলবে চট করে বুঝে উঠতে পারল না। হাসনাত রিকশা ভাড়া দিতে দিতে বলল, তোমার বান্ধবী অবশ্যি এখনও আসে নি। দেরি করছে কেন বুঝলাম না।লিলি বলল, হাসনাত ভাই, আপনার সঙ্গে আমার একটু কথা আছে।বলো কী ব্যাপার?

লিলি ইতস্তত করছে। কথাটা বলার জন্য একটু ফাঁকা জায়গা দরকার। রাস্তার উপরে ফাঁকা জায়গা কোথায়? হাসনাত বিস্মিত হয়ে বলল, জরুরি কোনো কথা? জি।এসো রাস্তা ক্রস করে ঐ মাথায় যাই। তোমার বলতে কি সময় লাগবে? জি না।তারা রাস্তা পার হলো। লিলির খুব খারাপ লাগছে। কথাটা শুনে উনি কি করবেন সে অনুমান করতে পারছে না। রেগে যাবেন না তো?

লিলি বলো।লিলি ক্ষীণস্বরে বলল, আমি এখানে আসার আগে স্বাতীর বাসা হয়ে এসেছি। আমার কথা ছিল আমি স্বাতীকে নিয়ে আসব। স্বাতী আমাকে বলেছে আপনাকে যেন বলি, সে আসতে পারবে না।হাসনাত তাকিয়ে আছে। লিলি চোখ নামিয়ে নিল। তার যা বলার সে বলে ফেলেছে। আর কি বলবে বুঝতে পারছে না।

স্বাতী আসবে না?

জি না।

ও, আচ্ছা।

তোমার কাছে কি চিঠিপত্র কিছু দিয়েছে?

জি-না। লিলি বলল, আমি চলে যাই।

এসো রিকশা করে দি। এখানে রিকশা পাওয়া মুশকিল।লিলি ভেবেছিল তার কথা উনি বিশ্বাস করবেন না। নানান প্রশ্ন-ট্রশ্ন করবেন। সে-রকম কিছু হলো না। হাসনাত লিলির সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে। লিলির বলতে ইচ্ছে করছে, আপনি চলে যান আপনাকে রিকশা ঠিক করে দিতে হবে না। আমি ঠিক করে নেব।

এতগুলো কথা বলার মতো শক্তি এখন তার নেই। মানুষটা যে রিকশার জন্য তার সঙ্গে সঙ্গে আসছে এটা একদিক দিয়ে ভালোই। তিনিও চিন্তা করার সময় পাচ্ছেন। তাকে ফিরে গিয়ে বন্ধুদের ব্যাপারটা বলতে হবে। কি বলবে এটা ভাবার জন্যও সময় দরকার।রিকশা না, বেবিট্যাক্সি পাওয়া গেল। হাসনাত দরদাম করে ভাড়া ঠিক করল। মগবাজার থেকে রাজিয়া সুলতানা রোড। কুড়ি টাকা।

লিলির একটু আশ্চর্য লাগছে এ-রকম অবস্থায় কেউ বেবি ট্যাক্সিওয়ালার সঙ্গে দরদাম করতে পারে। বেবিট্যাক্সি ভাড়াও হাসনাত ট্যাক্সিওয়ালার হাতে দিয়ে দিলো দুটো চকচকে দশ টাকার নোট। মনে হয় বিয়ে উপলক্ষে কিছু চকচকে নতুন নোট ভদ্রলোক যোগাড় করেছেন।বিদায় নেবার আগেই বেবিট্যাক্সিওয়ালা হুস করে বের হয়ে গেল।হাসনাতের হাতের সিগারেট নিভে গেছে। সে পান-সিগারেটের দোকান থেকে দেশলাই কিনে সিগারেট ধরাল। সে কাজী অফিসের দিকে যাচ্ছে।

লিলির নিজেদের বাসায় ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। নতুন কোনো জায়গায় যেতে ইচ্ছে করছে। শান্ত নিরিবিলি ধরনের কোনো জায়গা। হইচই চেঁচামেচি নেই, ছায়া ছায়া ধরনের কোনো জায়গা। যেখানে প্রচুর গাছপালা। গাছপালার ভিতর ছোট্ট একটা বাড়ি। বাড়ির খুব কাছেই নদী। নদীতে নৌকা-টৌকা কিছু নেই। শুধুই নদী। কিংবা পুকুরও থাকতে পারে।

বড় পুকুর, যার পানি কাচের মতো এত সুন্দর সেই পানি যে, দেখলেই গায়ে-মাথায় মাখতে ইচ্ছা করে। নদীর ঘাটটা থাকবে মারবেল পাথরে বাঁধানো।সে তার স্বপ্নের বাড়ি নিয়ে আরও কিছুক্ষণ ভাবত কিন্তু তার আগেই বাসার কাছে চলে এল। তার মনটা গেল খারাপ হয়ে। কী বিশ্রী একটা বাড়ি! সদর দরজাটা খোলা। যার ইচ্ছা ভেতরে ঢুকছে। যার ইচ্ছা বেরুচ্ছে।

একবার এক ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইতে একেবারে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। আজও দুজন ফকিরণীকে দেখা গেল বারান্দায় বসে জমিয়ে গল্প করছে। দুজন দুজনের মাথার উকুন বাছছে। লিলিকে দেখে তারা এমনভাবে তাকাল যেন লিলি বাইরের একটা মেয়ে বিনা অনুমতিতে তাদের ঘরে ঢুকে যাচ্ছে।

একতলার বারান্দায় লিলি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বাড়ির পরিস্থিতি বোঝার জন্য এটা দরকার। কাজের বুয়া এক গাদা কাচের বাসন নিয়ে কলঘরের দিকে যাচ্ছে। এক্ষুনি সে একটা-কিছু ঝনঝন করে ভাঙবে। বাসন ভাঙা তার হবি। রোজই ভাঙে। লিলি বলল, বুয়া, মা কোথায়?

উপরে।

কী করছে?

বুয়া নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ছোট দুই আফারে দরজা বন্ধ কইরা মারতাছে।আশ্চর্য কাণ্ড! বড় বড় দুটো মেয়েকে দরজা বন্ধ করে মারা হচ্ছে–এটা যেন খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা।

আফনেরে আইজ সুন্দর-মুন্দর লাগতাছে।

তুমি তোমার কাজে যাও বুয়া।

লিলি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। মার হাত থেকে রুমু ঝুমুকে উদ্ধার করবে কি বুঝতে পারছে না। আর ভালো লাগে না। দরকার কি উদ্ধার করার। যা ইচ্ছা হোক। লিলি নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছে–ফরিদা তখন বের হয়ে এলেন। মেয়েদের শাস্তি দিয়ে তিনি খানিকটা ক্লান্ত। হাঁপাচ্ছেন। লিলিকে স্বাভাবিক গলায় বললেন, ঐ মেয়েটা বার-বার টেলিফোন করছে।

কোন মেয়েটা?

ঐ যে শ্যামলা মতো–কি যেন নাম। তোর কাছে প্রায়ই আসে।

স্বাতী?

হুঁ। বলেছে খুব জরুরি।

তুমি কি আবার রুমু ঝুমুকে মারছিলে?

না মেরে করব কী?

ফরিদা নিচে নেমে গেলন। কাউকে ফার্মেসিতে পাঠিয়ে তুলা স্যাভলন আনাতে হবে। মার খেয়ে ঝুমুর ঠোঁট কেটে গেছে। রক্ত পড়ছে।টেলিফোন বাবার ঘরে। তিনি ঘরে নেই কাজেই ঘরে ঢুকে টেলিফোন করা যায়। বাবা থাকলে টেলিফোনের দশ গজের ভেতর যাওয়া যায় না। লিলি টেলিফোন করবে কি করবে না বুঝতে পারছে না।

স্বাতীর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। কথা না বলেও উপায় নেই। স্বাতী কিছুক্ষণ পর-পর টেলিফোন করে যাবে। তারচেয়ে কথা বলে ঝামেলা চুকিয়ে দেয়াই ভালো।স্বাতী মনে হয় টেলিফোন সেট কোলে নিয়েই বসে ছিল রিং হওয়া মাত্র স্বাতী বলল, কেমন আছিসরে লিলি? সে ধরেই নিয়েছে লিলির টেলিফোন। লিলি শুকনো গলায় বলল, ভালো।

গিয়েছিলি?

কোথায় যাব?

কাজী অফিসে।

কাজী অফিসে আমার তো যাবার কথা না।

তারপরেও তো গিয়েছিলি। তাই না?

হ্যাঁ।

আমার ব্যাপারটা গুছিয়ে বলেছিস তো?”

গুছিয়ে বলার কি আছে? তুই আসবি না–সেটা বললাম।

কীভাবে বললি?

সাধারণভাবে বলেছি। আমি তো আর তোর মতো নাটক করতে পারি না।

সাধারণভাবে মানে কী? এ্যাকজাক্ট ডায়ালগ কী?

আমার মনে নেই।

আমি যাব না এটা শোনার পর সে কী করল?

কিছু করে নি।

আচ্ছা, তুই ভালোমতো ব্যাপারটা বল না–এ-রকম করছিস কেন?

ভালোমতো বলার কিছু নেই। আমি যা বলার বললাম, বেবিট্যাক্সি নিয়ে চলে এলাম।

তার রিএ্যাকশান কী ছিল?

কোনো রিএ্যাকশান ছিল না।

তুই ঠিকমতো বলতে পারছিস না। ওর গায়ে কী ছিল?

এত খেয়াল করি নি।

শার্ট ছিল, না–পায়জামা-পাঞ্জাবি ছিল?

পায়জামা-পাঞ্জাবি।

ক্রিম কালারের পাঞ্জাবি।

ক্রিম কালারের পাঞ্জাবি? গলার কাছে হাতের কাজ?

বললাম তো, আমি এত খেয়াল করি নি।

এ পাঞ্জাবিটা আমি প্রেজেন্ট করেছিলাম। আড়ং থেকে কিনেছি–নয় শ টাকা দাম নিয়েছে।

টেলিফোন রাখি স্বাতী?

আরে না, টেলিফোন রাখবি কি? আমি তো কথাই শুরু করি নি। আর কে কে এসেছিল।

জানি না আর কে কে এসেছিল।

ওর খালা এসেছিল?

হুঁ।

সুস্মিতা এসেছিল?

সুস্মিতা কে আমি জানি না।

সুস্মিতা ওর দূর সম্পর্কের মামি। আমার কি ধারণা জানি? আমার ধারণা সুস্মিতার সঙ্গে ওর এক ধরনের সম্পর্ক আছে। তেমন কিছু সা, প্লেটোনিক টাইপ। ও সবকিছুতে কেউ থাকুক বা না থাকুক সুস্মিতা থুকবেই। কী কুৎসিত একটা মেয়ে চিন্তা কর–হাজব্যান্ড আছে, ছেলেমেয়ে তুমছে তার বড় মেয়ে হলিক্রস কলেজে এবার ইন্টারমিডিয়েট দিচ্ছে।

তোর বকবকানি শুনতে ভালো লাগছে না স্বাতী।

তুই কি বাসায় থাকবি?

বাসায় থাকব না তো যাব কোথায়?

আমি তাহলে চলে আসি।

না।

না কেন?

আমার বাসায় কেউ এলে আমার ভালো লাগে না।

ভালো না লাগলেও আসছি। অনেক কথা আছে।

প্লিজ, আসিস না। কাল তো ইউনিভার্সিটিতে দেখা হবেই।

কাল ইউনিভার্সিটিতে দেখা হবে না। কারণ, কাল আমি ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছি। না। কাজেই আজই দেখা হবে। আমি সন্ধ্যার পর আসব। বাবার কাছ থেকে গাড়ি ম্যানেজ করেছি। ছটা থেকে নটা–এই তিন ঘণ্টার জন্য গাড়ি পাওয়া গেছে। আমি কিন্তু আসছি সন্ধ্যার পর।

না এলে হয় না?

হবে না কেন হয় তবে এলেই ভালো হয়।

টেলিফোন রেখে লিলি দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়াল। তখনই কলঘর থেকে ঝনঝন শব্দ। বুয়া কিছু ভেঙেছে। মার চিৎকারে এখন কান ঝালাপালা হয়ে যাবার কথা–চিৎকার শোনা যাচ্ছে না। কেন শোনা যাচ্ছে না। এই রহস্য লিলির কাছে। পরিষ্কার হচ্ছে না। সে দেখল ফরিদা ব্যস্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসছেন। তার হাতে তুলা-স্যাভলনের শিশি। তিনি উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, লিলি তুই ঝুমুকে একটু ডাক্তারখানায় নিয়ে যা তো।

কেন?”

ঠোঁট কেটে গিয়েছে। রক্ত বন্ধ হচ্ছে না।

খুব বেশি কেটেছে?

খুব বেশি না। অল্প, কিন্তু রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। কামিজ রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে।

বলো কি?

আমি কামিজ বদলে দেই, তুই ওকে নিয়ে যা।

ঝুমু কোথায়?

নিচে।

ঝুমুকে দেখে লিলি হতভম্ব। আসলেই রক্তে সব ভেসে যাচ্ছে। তুলা ঠোঁটে চেপে ব্রিত ভঙ্গিতে সে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশেই রুমু। তাকেও বিব্রত মনে হচ্ছে। লিলি বলল, তোরা কি করেছিস যে মা এমন করে মারল?

দুজনই একসঙ্গে হাসল। লজ্জার চাপা হাসি।কলতলায় আবার ঝনঝন শব্দ। বুয়া আরেকটা কিছু ভেঙেছে। প্রথমবার ভাঙার কোনো রিএ্যাকশান হয় নি বলে বোধহয় দ্বিতীয়বার ভাঙা। এবার রিএ্যাকশান হচ্ছে–ফরিদা চেঁচাতে চেঁচাতে নামছেন।

ঝুমুর কামিজ বদলানো হয়েছে। কামিজ কাঁধের কাছে অনেকখানি ছেঁড়া। ফরিদা বললেন, ওড়না দিয়ে ঢেকে চলে যা। ঝুমু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল, কোনো কিছুতেই তার আপত্তি নেই। রুমু বলল, আমিও ঝুমুর সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যাব। ফরিদা তীব্র গলায় বললেন, জ্যান্ত কবর দিয়ে ফেলব। আর যেন কখনও দুজনকে একত্রে না দেখি।

লিলি বলল, মা ওরা করেছে কী?

ফরিদা বিরক্ত গলায় বলল, সব সময় যা করে তাই করেছে।

কী করে সব সময়?

এত কথা বলতে পারব না। ডাক্তারের কাছে নিতে বলছি নিয়ে যা।

গাড়ি ছিল না। দরকারের সময় গাড়ি কখনও থাকে না। লিলি রিকশা নিল। রিকশায় উঠে লিলি বলল, ব্যথা করছে নাকি রে?

ঝুমু না সূচক মাথা নাড়ল।

লিলি বলল, তোরা দুজন কী করিস যে মা এ-রকম করে মারে?

ঝুমু লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসল। লিলি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। ঝুমুর কাছ থেকে প্রশ্নের উত্তরে এর বেশি কিছু পাওয়া যাবে না।

সন্ধ্যাবেলা স্বাতীর আসার কথা। লিলি অস্বস্তি নিয়ে অপেক্ষা করছে। সন্ধ্যার পর থেকে বাবা বাসায় থাকবেন। তিনি ব্যাপারটা কিভাবে দেখবেন কে জানে। মেয়েদের বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে বেড়াতে আসা তিনি অত্যন্ত অপছন্দ করেন। সন্ধ্যার পর কেউ আসবে এটা বোধহয় তার স্বপ্নেও নেই। সম্ভাবনা খুব বেশি যে, স্বাতীকে দেখে তিনি রেগে যাবেন। সভ্য মানুষ মনের রাগ চেপে রেখে হাসিমুখে কথা বলে। নেয়ামত সাহেব তা পারেন না। পারার প্রয়োজনও বোধ করেন না।

লিলি কলেজে পড়ার সময় তার এক বান্ধবী বিকেলে বেড়াতে এসেছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত সে থেকে গেল। হাসিমুখে খুব গল্প করছে, তখন বিনা নোটিসে নেয়ামত সাহেব তাদের ঘরে ঢুকে পড়লেন থমথমে গলায় বললেন, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে বাসায় যাচ্ছ না কেন খুকি? সন্ধ্যাবেলা পাখির মতো সামান্য প্রাণীও ঘরে ফেরে। তুমি এখানে বসে আছ কেন? লিলির বান্ধবী আর কোনোদিন তাদের বাড়িতে আসে নি। এই ঘটনার পর সে লিলিকে পর্যন্ত অপছন্দ করত।

স্বাতী এলে সহজে যাবে না। রাত নটা দশটা পর্যন্ত থাকবে। সম্ভাবনা খুব বেশি যে রাত দশটার সময় সে বলবে, লিলি রাতটা তোর সঙ্গে থেকে যাই। সারা রাত জমিয়ে গল্প করব। লিলির আলাদা ঘর আছে ঠিকই কিন্তু রাতে সে একা ঘুমায় না। নেয়ামত সাহেব কোনো মেয়েকে একা রাখতে রাজি না। ফরিদা রাতে লিলির সঙ্গে ঘুমুতে আসেন। লিলির সেটা খারাপ লাগে না। ভালোই লাগে। সে অনেক রাত পর্যন্ত মার সঙ্গে গল্প করে। ভয়াবহ অস্বস্তির ব্যাপার হয় তখন–যখন মাঝরাতে বাবা এসে দরজায় টোকা দিয়ে গম্ভীর গলায় ডাকেন–ফরিদা, এই এই।

ফরিদা সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় উঠে বসেন–লিলি ঘুমাচ্ছে কি-না তা দেখেন। লিলি গভীর ঘুমের ভান করে। ফরিদা লজ্জিত ভঙ্গিতে উঠে যান। আধ ঘণ্টার মতো সময় পার করে আবার ঘুমুতে আসেন। ফিরে এসেও লিলি ঘুমুচ্ছে কি-না পরীক্ষা করার জন্য দুএক বার নরম গলায় ডাকেন লিলি, লিলি। লিলি ঘুমুচ্ছে নিশ্চিত হবার পর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।

মাঝরাতে মার উঠে যাবার এই ভয়াবই অস্বস্তিকর সমস্যা থেকে লিলি অবশ্যি এখন মুক্ত হয়েছে। রুমু ঝুমুকে আলাদা রাখার ব্যবস্থার নতুন নিয়মে রুমু এখন লিলির সঙ্গে ঘুমায়। ফরিদা ঘুমান ঝুমুর সঙ্গে। লিলির অস্বস্তিকর মুহূর্ত এখন নিশ্চয়ই ঝুমু ভোগ করে কিভাবে সে কে জানে। লিলি ভেবে পায় না, মানুষ এত অবিবেচক হয় কী করে?

স্বাতী এলো রাত আটটার দিকে। সেজেগুজে একেবারে পরী হয়ে এসেছে। ঘরে ঢুকেই সে বলল, তোরা ভাত খাস কখন? আমি আজ রাতে তোদের সঙ্গে খাব।লিলির হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। যেসব নাটক হয় তাদের খাবার টেবিলে, বাইরের কাউকে নিয়ে খেতে বসার প্রশ্নই আসে না।নেয়ামত সাহেব দোতলার বারান্দায় রাখা জলচৌকিতে বসে তসবি পড়ছিলেন। তিনি সেখান থেকেই গম্ভীর গলায় বললেন, ফরিদা কে আসল? এত রাতে আসল কে?

লিলির মুখ শুকিয়ে গেল। লিলি করুণ চোখে মার দিকে তাকাল। সে তাকানোর অর্থ–মা আমাকে বাঁচাও। ফরিদা তৎক্ষণাৎ দোতলায় উঠে গেলেন। লিলি মার ওপর তেমন ভরসা করতে পারছে না। স্ত্রীর কথায় প্রভাবিত হবার মানুষ নেয়ামত সাহেব না।

স্বাতী বলল, চল তোর বাবার সঙ্গে আগে দেখা করে আসি।লিলি ক্ষীণস্বরে বলল, বাবার সঙ্গে দেখা করার দরকার নেই। বাবা তসবি পড়ছেন–এখন গেলে বিরক্ত হবেন।বিরক্ত হবেন না, আয় তো।

স্বাতী তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। লিলিকে বাধ্য হয়ে তার পেছনে পেছনে। যেতে হচ্ছে। বারান্দায় বাতি জ্বলছে। নেয়ামত সাহেব জলচৌকির উপর বসে আছেন। হাতে তসবি। লুঙ্গি পরা খালি গায়ের একটা মানুষ, মাথায় আবার টুপি।স্বাতী নিচু হয়ে কদমবুসি করল, নরম গলায় বলল, চাচা ভালো আছেন?

নেয়ামত সাহেব হকচকিয়ে গেলেন। কদমবুসির জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।আমাকে বোধহয় চিনতে পারছেন না। আমি লিলির বন্ধু। আমার নাম স্বাতী। আগেও কয়েক বার এসেছি। আপনি বোধহয় মনে করতে পারছেন না।ও আচ্ছা।আমিও অবশ্যি ইচ্ছে করে আপনার কাছ থেকে দূরে দূরে থেকেছি। আপনাকে যা ভয় লাগে। লিলি আপনাকে যতটা ভয় পায় আমিও ততটা পাই।

নেয়ামত সাহেব খুশি হলেন। তবে খুশি প্রকাশ করলেন না। খুশি যে হয়েছেন তা বোঝা গেল তার পা নাড়া দেখে। খুশির কোনো ব্যাপার হলে তিন পা নাচান। স্বাতী বলল, চাচা, আপনার কাছে আমি একটা নালিশ করতে এসেছি। লিলির বিরুদ্ধে কঠিন একটা নালিশ। আপনি আজ বিচার করে দেবেন।নেয়ামত সাহেব পা নাচানো বন্ধ করে শীতল গলায় বললেন, কী ব্যাপার?

 

Read more

সে ও নর্তকী পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.