সে ও নর্তকী পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

সে ও নর্তকী পর্ব – ৭

আমি তো দেশের বাইরে চলে যাব। আর ফিরর না। যাবার আগে আমি আমার সব বান্ধবীর বাসায় এক রাত করে থাকব বলে ঠিক করেছি। অনেকের সঙ্গে থেকেছি, সারা রাত গল্প করেছি। লিলি শুধু বাদ। ও কিছুতেই রাতে আমাকে থাকতে দেবে না।সারারাত জেগে গল্প করার দরকার কি? শরীর নষ্ট। দিনে গল্প করলেই হয়।

না চাচা, রাতের গল্পের আলাদা আনন্দ–আপনি লিলিকে একটু বলে দিন। আজ আমি থাকব। মন ঠিক করে এসেছি।তোমার বাবা-মা চিন্তা করবে।তাদের বলে এসেছি। কিন্তু আপনি লিলিকে কড়া করে ধমক না দিলে ও রাখবে না।নেয়ামত সাহেব বিরক্ত-চোখে ফরিদার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি সংসারে কাজকর্ম ফেলে শুধু শুধু এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

ফরিদা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে চলে যাচ্ছেন। লজ্জায় লিলির মরে যেতে ইচ্ছা করছে। সে এখন নিশ্চিত যে বাবা স্বাতীকে বলবেন, নিজের বাড়িঘর ফেলে অন্যের বাড়িতে থাকা তিনি অত্যন্ত অপছন্দ করেন।নেয়ামত সাহেব হাত থেকে তসবি নামিয়ে রাখতে রাখতে স্বাতীর দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় বললেন, তোমাদের বাসায় টেলিফোন আছে?

জি চাচা, আছে।

লিলি টেলিফোনটা আন। আমি টেলিফোনে তোমার বাবার অনুমতি নিয়ে নিই।

আমি অনুমতি নিয়েই এসেছি চাচা।

নেয়ামত সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, তুমি নিয়েছ সেটা তোমার ব্যাপার। আমি তো নেই নাই। টেলিফোন নাম্বার কত?

৮৬৫৬০০, এখন টেলিফোন করলে পাবেন না চাচা। বাবা-মা এক বিয়েতে গেছেন। ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বাজবে।

যে বাড়িতে গেছেন তাদের টেলিফোন নাই?

জি আছে।

দাও, ঐ নাম্বারটা দাও।

স্বাতী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।

নেয়ামত সাহেব টেলিফোন করলেন। বিয়ে বাড়ির ভয়াবহ হাঙ্গামার ভেতরও স্বাতীর বাবা নাজমুল সাহেবকে টেলিফোনে ধরলেন। কথা বললেন। তারপর টেলিফোন নামিয়ে শুকনো মুখে বললেন, তোমার বাবা থাকার অনুমতি দিয়েছেন। থাকো।

লিলি স্বাতীকে নিয়ে দ্রুত তার বাবার সামনে থেকে সরে এলো। বড় চাচার ঘরের সামনে দিয়ে যাবার সময় তিনি ডাকলেন–কে যাচ্ছে লিলি না-কি, শুনে যা

তো! লিলি দাঁড়াল না, চট করে সরে গেল।

স্বাতী বলল, তুই তো কঠিন এক বাড়িতে বাস করছিস।

লিলি বলল, হুঁ।

আমার এত ঠাণ্ডা মাথা। সেই মাথাও তোর বাবা প্রায় এলোমেলো করে ফেলেছিলেন। তবে আমিও বাঘা তেঁতুল। থাকার অনুমতি আদায় করে ছাড়লাম।

হুঁ।

হুঁ হুঁ করিস না। প্রাণখুলে গল্প কর। তোরা ভাত কখন খাস?

একেকজন একক সময়। ধরাবাধা কিছু নেই।

তাহলে তো সুবিধাই হলো। আমরা দুজন রাত বারোটার দিকে চুপি চুপি এসে খেয়ে চলে যাব। সারা রাত গল্প চলবে। ফ্লাক্স ভর্তি চা বানিয়ে রাখব। ঘুম পেলে চা খাব, সিগারেট খাব।সিগারেট খাবি মানে?

আকাশ থেকে পড়ার মতো ভঙ্গি করবি না। সিগারেট এক প্যাকেট নিয়ে এসেছি। মেয়েদের জন্য বানানো স্পেশাল আমেরিকান সিগারেট। নাম হচ্ছে কাট সিল্ক। তামাক নেই বললেই হয়। আচ্ছা শোন, তোদের বাসার ছাদটা কেমন, ভালো?

হুঁ।তাহলে ছাদে বসে গল্প করব। চাদর থাকবে, বালিশ থাকবে, মশার কয়েল জ্বালানো থাকবে। আমরা আকাশের তারা দেখতে দেখতে গল্প করব। তুই কি কখনও আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে গল্প করেছিস?

না।দারুণ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হয়। ধর দুজনে মিলে ছাদে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে গল্প করছিস। তারা ঝিলমিল করছে। হঠাৎ দেখছি তারাগুলো আকাশ থেকে নেমে চোখের সামনে চলে এসেছে। এত কাছে যে ইচ্ছা করলে হাত দিয়ে তারাদের ছোঁয়া যায়।

লিলি অস্পষ্ট স্বরে বলল, তুই কার সঙ্গে শুয়ে তারা দেখেছিস?”

স্বাতী হাসল। হাসতে হাসতেই বলল, তুই যা ভাবছিস তাই।

কতক্ষণ তারা দেখেছিস?

এত ইন্টারেস্টিং লাগছিল যে সারারাতই দেখলাম। খালার বাসায় যাবার কথা বলে ওর ওখানে চলে গিয়েছিলাম। তারপর কাণ্ড কি হয়েছে শোন, ভোররাতে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ জেগে উঠে দেখি ধুম বৃষ্টি হচ্ছে–আমরা দুজনে বৃষ্টি মাখামাখি। হি হি হি।

লিলির গা কাঁটা দিয়ে উঠল–কী সর্বনাশের কথা! স্বাতী বলল, আমাকে তোর ঘরে নিয়ে চল। বাতি নিভিয়ে দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকব। রাত জাগার জন্য ব্যাটারি চার্জ করে নিতে হবে। গত দুরাতেও ঘুমুই নি। আমাকে দেখে কি সেটা বোঝা যাচ্ছে? তোকে দেখে কিছুই বোঝা যায় না।ঠিক বলেছিস। আমি হলাম বরফের মতো–বারো ভাগের এগারো অংশই পানির নিচে, এক অংশ উপরে।

লিলি স্বাতীকে তার ঘরে নিয়ে গেল। স্বাতী আসবে এই ভেবে ঘর কিছুটা গোছানো ছিল তারপরেও কি বিশ্রী দেখাচ্ছে। কতদিন দেয়ালে চুনকাম হয় না। উত্তর দিকের দেয়ালে নোনা ধরেছে। প্রাস্টার খসে খসে পড়ছে। খাটের নিচে রাজ্যের ট্রাঙ্ক, অ্যালুমিনিয়ামের বড় বড় ডেকচি–যেগুলো বছরে একবার কোরবানির ঈদে বের হয়।

খাটের পাশে ড্রেসিং টেবিল একটা আছে–যার আয়না নষ্ট হয়ে গেছে। চেহারা খানিকটা দেখা যায়, খানিকটা দেখা যায় না। ড্রেসিং টেবিলের সঙ্গেই লিলির পড়ার টেবিল। পড়ার টেবিলে বইপত্রের সঙ্গে এক কোনায় শ্যাম্পুর বোতল, ক্রিমের কৌটা, চিরুনি। স্বাতী এই ঘরে রাত কাটাবে ভাবতেই কেমন লাগে। স্বাতীর নিজের ঘর ছবির মতো গোছানো। কে জানে হয়তো ছবির চেয়েও সুন্দর।

স্বাতীর ঘরের তিন দিকের দেয়াল দুধের মতো শাদা, একদিকের দেয়ালে নীল রঙ। সেই দেয়ালে পেইন্টিং ঝুলছে। নিচু একটা খাট। খাটটার পায়ের কাছে ছোট্ট বারো ইঞ্চি রঙিন টিভি। পুরো দেয়াল ঘেঁষে মিউজিক সেন্টার সাজানো। সেখানে মনে হয় দিনরাতই গান বাজে। লিলি যতবারই ঘরে ঢুকেছে ততবারই শুনেছে গান হচ্ছে। ঘরের মেঝে দেয়ালের মতোই ধবধবে শাদা। সেই শাদার উপর ছোট্ট নীল রঙের সাইড কার্পেট। ঘরের এক কোনায় একটা পড়ার টেবিল আছে। ফাইবার পলিশ করা কাঠের চেয়ার টেবিল দেয়ালের রঙের সাথে মেলানো।

সবচেয়ে সুন্দর স্বাতীর বাথরুম। যেন আলাদা একটা জগত। গোল বাথটাব লিলি স্বাতীর বাথরুমেই প্রথম দেখে যেন ঘরের ভেতর ছোট দিঘি। বাথটাবের ভেতরটা নীল রঙ করা বলেই পানি দিয়ে ভর্তি করলে পানিটাকে নীল দেখায়।যে স্বাতী এ-রকম জায়গায় থেকে অভ্যস্ত, সে লিলির ঘরে ঘুমুবে কি করে। তারচেয়ে ছাদে সারারাত জেগে থাকাই ভালো।

স্বাতী অবশ্যি লিলির ঘরে ঢুকে তপ্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, তোর খাটটা তো বিরাট, হাত ছড়িয়ে শোয়া যায়। আমি শুয়ে পড়লাম। শুয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ব। তুই বাতি নিভিয়ে চলে যাবি। আমাকে ডেকে তুলবি ঠিক বারোটায়। তখন ভাত খেয়ে গল্প শুরু করব।স্বাতী জুতা খুলে বিছানায় উঠে পড়ল। সহজ গলায় বলল, পাতলা একটা চাদর আমার গায়ে দিয়ে দে, ঘুমে চোখের পাতা মেলে রাখতে পারছি না।

লিলি তার ঘরের বাতি নিভিয়ে দরজা বন্ধ করে বের হয়েছে। তার কাছে মনে হচ্ছে এখন তার আর কিছু করার নেই। রাত বারোটা না বাজা পর্যন্ত তাকে অস্বস্তি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে। ছাদে গিয়ে একবার ছাদটা দেখে আসা দরকার। তার মনে হচ্ছে ছাদে রাজ্যের ময়লা। বুয়াকে নিয়ে একটু বোধহয় পরিষ্কার করে রাখা দরকার। লিলি ছাদে উঠল।

ছাদের চিলেকোঠার ঘরে বাতি জ্বলছে। লিলির ছোট চাচা জাহেদুর রহমান এই সময় ঘরে ফেরে না। আজ ফিরেছে। ছোট চাচার ঘরটা আজ রাতের মতো নিয়ে নিতে পারলে খুব ভালো হতো, এই ঘরটা সুন্দর। স্বাতী এই ঘরে অস্বস্তিবোধ করবে না। তা ছাড়া এই ঘরে থাকলে যখন ইচ্ছা করবে তখন ছাদে আসা যাবে। লিলি খোলা দরজা ধরে দাঁড়াল। জাহেদ লিলির দিকে না তাকিয়েই বলল, কি খবর মাই ডিয়ার লিলি বেগম। হার এক্সেলেন্সি!

খবর ভালো ছোট চাচা! তুমি আজ সকাল সকাল ফিরলে যে। এগারোটা বারোটার আগে তো কখনও ফেরো না।একদিন ফিরে দেখলাম কেমন লাগে। আয়, ভেতরে আয়। তোকে তো কখনও সন্ধ্যার পর ছাদে দেখা যায় না। আজ কি মনে করে?

তোমার কাছে একটা আবেদন নিয়ে এসেছি, ছোট চাচা।

আবেদন গ্রান্টেড।

না শুনেই গ্রান্ট করে দিলে?

হুঁ। আজ আমার মনটা ভালো। এইজন্যই পেয়ে গেলি।

মন ভালো কেন?

এখন বলব না। যথাসময়ে বলব। আবেদনটা কি?

আমার এক বান্ধবী এসেছে–রাতে আমার সঙ্গে থাকবে। তুমি কি আজ রাতে তোমার ঘরটা আমাদের ছেড়ে দেবে।একি! তুই দেখি রাজত্ব চেয়ে ফেললি। ঘরটাই আমার রাজত্ব।

শুধু এক রাতের জন্য চেয়েছি।

নিজের ঘর ছাড়া অন্য কোনো ঘরে আমার এক ফোঁটা ঘুম হয় না। যাই হোক বেকুবের মতো আগেই যখন গ্রান্টেড বলে দিয়েছি তখন গ্রান্টেড। এক্ষুনি ঘর ছেড়ে দিচ্ছি।রাত বারোটার সময় ছাড়লেই হবে। ছোট চাচা, থ্যাংক য়্যু। তুমি এবারে অবশ্যই আমেরিকার ভিসা পাবে। আমি সত্যি সত্যি তোমার জন্য দোয়া করব।

জাহেদুর রহমান বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল, ড্রয়ারে হাত দিবি না। টেবিলের উপর কাগজপত্র আছে, ঘাটাঘাটি করবি না।কোনো কিছুতেই আমরা হাত দেব না।গুড।রাত একটার দিকে লিলি স্বাতীকে নিয়ে ছাদে এলো। চিলেকোঠার কাছে এসে স্বাতী। থমকে দাঁড়াল। অবাক হয়ে বলল, তোদের ছাদের এই ঘরটা তো সুন্দররে। কে। থাকে এখানে? আমার ছোট চাচা?

বাহ্, ঘরটাও তো খুব গোছানো। শুধু একটাই সমস্যা ব্যাচেলার ব্যাচেলার গন্ধ।লিলি বলল, রাতে আমরা এই ঘরে ঘুমুব।স্বাতী বলল, ঘুমুবার জন্য তোর এখানে এসেছি না-কি? ঘুমুব না। আমার যা ঘুমানোর ঘুমিয়ে ফেলেছি। ছাদে বিছানা করতে বলেছিলাম, করিস নি?

করেছি। ঐ কোনায়।

বাহ সুন্দর তো! অসাধারণ।

একটা শীতল পাটি বিছিয়েছি শুধু–অসাধারণের কি! এইটাই অসাধারণ। ছাদের উপর শীতল পাটি মানায়, গদির বিছানা মানায় না। বালিশ কোথায়? ছোট চাচার ঘর থেকে নিয়ে আসছি।উহু-ব্যাচেলার গন্ধওয়ালা বালিশে আমি ঘুমুব না। তুই তোর ঘর থেকে বালিশ নিয়ে আয়। ফ্লাস্কভর্তি করে চা আনতে বলেছিলাম, এনেছিস?

আমাদের ফ্লাক্স নেই।

বলিস কি, তোদের ফ্লাক্স নেই?

লিলি হাল্কা গলায় বলল, আমাদের কিছুই নেই।

চা ছাড়া সারারাত জাগব কীভাবে?

তোর যখন চা খেতে ইচ্ছা করবে বলবি, ছোট চাচার ঘরে ওয়াটার হিটার আছে, টি ব্যাগ আছে। চা বানিয়ে দেব।দেয়াশলাই আনবি। সিগারেট খেতে হবে। তুই আবার না না করে ঢং করতে পারবি না। তুইও খাবি।লিলি এবং স্বাতী পাটিতে শুয়ে আছে। মাথার উপর তারা ভরা আকাশ। স্বাতী বলল, তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকবি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে না, সাধারণভাবে। তারার দিকে তাকিয়ে গল্প করতে থাকবি।

কী গল্প?

যা মনে আসে।

লিলি বলল, তুই আমার গল্প শোনার জন্য এত যন্ত্রণা করে আমার সঙ্গে শেয়ার ব্যবস্থা করেছিস তা কি ঠিক? তুই এসেছিস তোর গল্প বলার জন্য। কী বলতে চাস বল, আমি শুনছি।স্বাতী নিচু গলায় বলল, হাসনাতকে যখন বললি–আমি আসব না তখন সে কী বলল?

টেলিফোনে তো একবার বলেছি।

আবার বল। টেলিফোনে কি বলেছিস আমার মনে নেই। উনি কিছুই বলেন নি।

কিছুই না?

না।

ভালো করে ভেবে বল। হয়তো কিছু বলেছে।

বলেছেন–ও আচ্ছা।

সেই ও আচ্ছাটা কিভাবে বলল?

ও আচ্ছা বাক্যটা অনেকভাবে বলা যায়। হাই ড্রামা করে বলা যায়, গভীর বিষাদের সঙ্গে বলা যায়, রাগের সঙ্গে বলা যায়। ও কীভাবে বলল? খুব সাধারণভাবে বলেছেন।স্বাতী নিশ্বাস ফেলে বলল, আমার ধারণা ওর মধ্যে ড্রামা কম। আবেগ আছে–তবে তা আইসবার্গের মতো। চোখে পড়ে না।লিলি শান্ত গলায় বলল, একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে মিশলি, সারারাত জেগে তারা দেখলি, বিয়ে ঠিকঠাক করলি, তারপর হুট করে সব ভেঙে দিলি?

স্বাতী বলল, আমার চায়ের পিপাসা হচ্ছে।

তুই আমার প্রশ্নের জবাব দিস নি।

প্রশ্ন কোথায়? প্রশ্ন না করলে জবাব দেব কী? বল, তোর প্রশ্ন বল।

বিয়ে সত্যি সত্যি পুরোপুরি ভেঙে গেছে?

হুঁ।

কেন?

আমি ঠিক যে রকম মানুষ চাচ্ছি সে রকম মানুষ ও না।

তুই কী রকম মানুষ চাচ্ছিস?”

ব্যাখ্যা করতে পারব না।

উনি যে সে রকম মানুষ না সেটা বুঝলি কী করে? মানুষ বুঝতেও তো সময় লাগে।তাকে সময় দিয়েছি। এত ঘনিষ্ঠভাবে তার সঙ্গে যে মিশলাম, কেন মিশলাম? তাকে ভালোমতো জানার জন্যই মিশলাম। লিলি চা খাব।লিলি চা বানানোর জন্য উঠে গেল। স্বাতী শুয়ে শুয়ে তারা দেখছে। ঐ রাতের মতো হচ্ছে না, তারাগুলো ঝট করে চোখের উপর নেমে আসছে না। কে জানে আকাশের তারা নামানোর জন্য একজন প্রেমিক পুরুষ হয়তো দরকার হয়।লিলি চা নিয়ে এসেছে। স্বাতী উঠে বসতে বসতে বলল, দেয়াশলাই এনেছিস?

লিলি দেয়াশলাই সামনে রাখল।স্বাতী বলল, তুই দেয়াশলাইটা এমনভাবে ছুঁড়ে ফেললি যেন আমি দেয়াশলাই দিয়ে ভয়ঙ্কর কোনো পাপ করতে যাচ্ছি। তা কিন্তু করছি না। আমি অতি নিরীহ একটা সিল্ককাট সিগারেট আগুন দিয়ে পুড়াব। তুইও পুড়াবি।আমি না।

আচ্ছা লিলি, তোর মধ্যে কি কৌতূহল বলে কিছু নেই? এই যে হাজার হাজার ছেলে, বুড়ো, জোয়ান ধুমসে সিগারেট খাচ্ছে, কায়দা করে ধোঁয়া ছাড়ছে–ব্যাপারটা কি একবার জানারও ইচ্ছা হয় না? না।এই যে আমি সিগারেট টানছি, আমাকে দেখেও ইচ্ছা হচ্ছে না?

না।

থাক তাহলে, জোর করব না। খুব মানসিক চাপের মধ্যে আছি। ভেবেছিলাম তোর সঙ্গে রাত জেগে, হইচই করে, সিগারেট টেনে চাপটা কমাব। তোর কাছে আসায় লাভের মধ্যে লাভ এই হয়েছে মনের চাপটা বেড়েছে। তুই তোর সুন্দর মুখ শ্বেতপাথরের মূর্তির মুখের মতো করে রেখেছিস। আমার সঙ্গে এ-রকম আচরণ করছিস যেন আমি সিন্দাবাদের ভূত হয়ে তোর ঘাড়ে চেপে আছি। শুনুন ইয়াং লেডি, আমি কোনো সিন্দাবাদের ভূত না। আমি কারোর ঘাড়ে চাপি না।

তোর চাপটা কী জন্য? বিয়ে ভেঙে দেয়ার জন্য?

না। ওর কাছে আমার একটা পেইন্টিং আছে। পেইন্টিংটা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে।

লিলি ভীত গলায় বলল, কী রকম পেইন্টিং?

বুঝতেই তো পারছিস কি রকম।

বুঝতে পারছি না।

স্বাতী সিগারেটটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, নুড স্টাডি।

সেটা আবার কী?

ন্যাকামি করিস না তো লিলি। ন্যাকামি আমার অসহ্য লাগে। নুডু স্টাডি কি তুই সত্যি জানিস না? না।ছবিটার নাম মধ্যাহ্ন। ছবিটা হচ্ছে এ-রকম–আমি উপুড় হয়ে শুয়ে একটা বই পড়ছি, খুব মন দিয়ে পড়ছি। আমার মাথার চুলে বইটারএকটা পাতা ঢাকা। আর আমার গায়ে কোনো কাপড় নেই।লিলি আতঙ্কিত গলায় বলল, গায়ে কাপড় নেই মানে কী?

কাপড় নেই মানে কাপড় নেই।

এ রকম ছবি আঁকার মানে কী?

স্বাতী দ্বিতীয় সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল–খালি বাড়ি, ঝাঝা দুপুর। একটি তরুণী মেয়ের নগ্ন হয়ে বই পড়তে ইচ্ছা হয়েছে, সে বই পড়ছে। আর্টিস্ট সেই ছবি এঁকেছেন।কোনো মেয়ের এ-রকম নগ্ন হয়ে বই পড়ার অদ্ভুত ইচ্ছা হবে কেন? স্বাতী বিরক্ত হয়ে বলল, তোর সঙ্গে ছবি নিয়ে আমার কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। চুপ করে থাক।লিলি বলল, ঐ ছবির জন্য তোর দুশ্চিন্তা হচ্ছে?

হ্যাঁ। ছবিটা এত সুন্দর হয়েছে আমার ধারণা শিল্পকলা একাডেমীতে ওর যে সলো এক্সিবিশন হবার কথা সেখানে ছবিটা থাকবে। হাজার হাজার মানুষ আমাকে নগ্ন দেখবে।তোর অসম্মান হবে এ-রকম কাজ উনি কখনও করবেন না।

ও করবে। লেখক, কবি, শিল্পী এদের কাছে সৃষ্টিটাই প্রধান। সৃষ্টির পেছনের মানুষটা প্রধান না। আমার সম্মান হবে, না অসম্মান হবে তা সে দেখবে না। সে দেখবে তার ছবি সুন্দর হয়েছে। ছবিটা অন্যদের দেখানো দরকার।এখন তাহলে কী করবি? আমি কিছু করব না। যা করার তুই করবি। তুই তার সঙ্গে কথা বলে ছবিটা নিয়ে আসবি।

আমি?

হ্যাঁ তুই। তুই ছাড়া এসব কথা আমি কি আর কাউকে বলতে পারি? দুজনের মধ্যে যখন সমস্যা হয় তখন সমস্যা সমাধানের জন্য একজন মিডলম্যান লাগে। তুই সেই মিডলম্যান। নে, ফাঁসির আসামীর মতো চেহারা করবি না।

আমি একা একা ঐ বাড়িতে যাব?

হ্যাঁ–ও বাঘ-ভালুক না। তোকে খেয়ে ফেলবে না।

আমাকে খুন করে ফেললেও আমি যাব না।

আচ্ছা বেশ। না গেলে না যাবি। নে সিগারেট খা। এখনও যদি না বলিস–আমি কিন্তু তোকে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেব।লিলি কিছু বলল না। স্বাতী বলল, আয় আকাশের তারা দেখতে-দেখতে গল্প করি। বিপদ হয়েছে আমার আর তুই ভয়ে এত অস্থির হয়ে পড়েছিস কেন?

লিলি তার বান্ধবীকে নিয়ে ছাদে কি করছে এটা দেখার জন্য নেয়ামত সাহেব রাত তিনটার দিকে ছাদে এলেন। তিনি দেখলের দুজন পাটি পেতে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। দুজনের হাতেই জ্বলন্ত সিগারেট।

Leave a comment

Your email address will not be published.