সৌরভ পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

সৌরভ পর্ব – ৮

লুনাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরছি।রাস্তায় নেমেই প্রচণ্ড ভয় লাগল। মনে হল রাস্তাঘাটগুলি যেন বড়ো নির্জন। যেন আজকেই ভয়ংকর একটা কিছু ঘটবে। শাহবাগের পাশে প্রকাণ্ড একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল। তার পাশ দিয়ে যাবার সময় আমার বুক কাঁপতে লাগল। মনে হল ওরা আজ অবশ্যই আমাদের গাড়ি থামাবে। ঠাণ্ডা স্বরে বলবে, তোমার সঙ্গের ঐ মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করবার জন্যে আমরা নিয়ে যাব। আমি বলব, জনাব, ও একটি নিতান্ত বাচ্চা মেয়ে। ক্লাস নাইনে পড়ে। ওরা দাঁত বের করে হাসবে। এবং হাসতে হাসতে বলবে, জিজ্ঞাসাবাদ করবার জন্যে বাচ্চা মেয়েরাই ভালো।আমি নিজেকে সাহস দেবার জন্যেই বললাম, লুনা, ভয়ের কিছু নেই। তুমি শান্তভাবে চুপচাপ বসে থাক।চুপচাপই তো বসে আছি।জানালা দিয়ে বারবার। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছ কেন?

মাথাটা নিচু করে বস না।আহ, আপনি কেন এত ভয় পাচ্ছেন? মাথা নিচু করে বসব কেন শুধু শুধু? ড্রাইভার গাড়ি ছোটাচ্ছে ঝড়ের মতো। এত জোরে গাড়ি চালোনর দরকারটা কী? শুধু শুধু মানুষের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করা। আমি বললাম, ড্রাইভার সাহেব, একটু আস্তে চালান।ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ফার্স্ট গিয়ারে নিয়ে এল, যা আরো সন্দেহজনক। যেই দেখবে, তারই মনে হবে বদ মতলব নিয়ে গাড়ির ভেতর কেউ বসে আছে, সম্ভবত একটি লুকান স্টেনগান আছে, সুবিধামতো টার্গেট পেলেই বের হয়ে আসবে।বাড়ির সামনে এসেও আমার বুকের ধকধকানি কমে না। এত খাঁ-খাঁ করছে কেন চারদিক?

আগে তো কখনো এ-রকম লাগে নি। আমি গলা উঁচিয়ে ডাকলাম, এই কাদের–কাদের।কাদেরের সাড়া পাওয়া গেল না। মতিনউদ্দিন সাহেব জানালা দিয়ে মাথা বের করে আবার কচ্ছপের মতো মাথা টেনে নিলেন। তার পরই বিপাং করে জানালা বন্ধ করে ফেললেন। ভদ্রলোকের মাথা কি পুরোপুরিই খারাপ হয়ে গেছে? মতিন সাহেব, আপনি নিচে এসে সুটকেসটা নিয়ে যান দয়া করে।মতিন সাহেব নিচে নামলেন না। শব্দ শুনে বুঝলাম ভদ্রলোক অন্য জানালাগুলি বন্ধ করছেন।লুনা বলল, আমি নিতে পারব।তোমার নিতে হবে না। রাখ তুমি। মতিন সাহেব, ও মতিন সাহেব।কোনোই সাড়া নেই।লুনা বলল, ঐ লোকটিরই কি মাথা খারাপ? কে বলল তোমাকে? শীলা। শীলা বলেছে।

শীলা দেখলাম অনেক কিছুই বলেছে। এই বাড়িতে যে একটা তক্ষক আছে, তাও তার জানা; দোতলায় উঠেই বলল, এ বাড়িতে নাকি কুমিরের মতো বড়ো একটা তক্ষক আছে? তা আছে।কোথায়, দেখান তো।এই মেয়ে যে-অবস্থায় আছে সেই অবস্থায় কেউ যে তক্ষকের খোঁজ করতে পারে, তা আমার জানা ছিল না। আমি গম্ভীর মুখে লুনাকে বসিয়ে রেখে মতিন সাহেবের খোঁজ করতে গেলাম। তিনি ক্যান্দেরের ঘরে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।

দরজা খোলেন মতিন সাহেব।ঐ মেয়েটা কে? আমার ভাগ্নি। আপনি দরজা বন্ধ করে বসে আছেন কেন? মতিন সাহেব দরজা খুলে ফিসফিস করে বললেন, আপন ভাগ্নি? তা দিয়ে দরকার কী আপনার? মতিন সাহেব দীর্ঘ সময় চুপচাপ থেকে বললেন, মেয়েটাকে আমি চিনি, শফিক সাহেব। আপনাকে আমি আগে বলি নি, এক দিন সন্ধ্যাবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ঘরের মধ্যে কেমন যেন একটা মিষ্টি গন্ধ। তাকিয়ে দেখি, মাথার কাছে একটি মেয়ে বসে আছে। মেয়েটার নাকের কাছে একটা তিল। এইটি সেই মেয়ে। দেখেই চিনেছি।

আমি ভদ্রলোকের কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এই লোক তো বদ্ধ উন্মাদ।মতিন সাহেব ফিসফিস করে বললেন, আপনার বিশ্বাস হয় না? না। অন্ধকারের মধ্যে আপনি একটা মেয়ের নাকের তিল দেখবেন কী করে? তাও তো ঠিক।মেয়েটার নাকে কোনো তিল-টিল নেই, বিপদে পড়ে এসেছে, কাল সকালে চলে যাবে।কী সর্বনাশ। রাত্রে থাকবে, আগে বলেন নি কেন? আগে বললে কী করতেন? না, মানে করার তো কিছু নেই।যান, নিচে থেকে সুটকেসটা নিয়ে আসেন। কাদের গেছে কোথায়? জানি না। আমাকে কিছু বলে যায় নি।কখন আসবে, তাও বলে নি? নাহ্‌।

লুনা অল্পক্ষণের মধ্যেই বেশ সহজ হয়ে গেল। কথাবার্তা বলতে শুরু করল। ভাবখানা। এ-রকম, যেন এ-জাতীয় ব্যাপার প্রতিদিন ঘটছে। অপরিচিত জায়গায় অপরিচিত পুরুষদের মধ্যে রাত কাটানটা তেমন কিছু বড়ো ব্যাপার নয়। নিজের বাবা-মার কথা এক বারই শুধু বলল। তক্ষকরা কী খায়, সেই গল্প বলতে বলতে হঠাৎ বলে ফেলল, আপনার কি মনে হয়, আরা-আম্মা ছাড়া পেয়ে আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে? আমার ঠিকানা তো তারা জানে না।

প্রশ্নটি এত আচমকা এসেছে যে, আমার জবাব দিতে দেরি হল। আমি থেমে থেমে বললাম, খুবই সম্ভব। তবে তারা নিশ্চয়ই তোমার চাচার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, আর তোমার চাচা তো আমার ঠিকানা জানেন।তা ঠিক, এটি আমার মনেই হয় নি।তার মুখ দেখে মনে হল বড়ো একটি সমস্যার খুব সহজ সমাধান পাওয়া গেছে। এ নিয়ে আর চিন্তার কিছু নেই। আমি বললাম, তুমি হাত-মুখ ধুয়ে বিশ্রাম কর। কাদের এসে এই ঘর তোমার জন্যে ঠিকঠাক করবে। চা খাবে? খিদে লেগেছে? ঘরে অবশ্যি কিছু নেই। শুধু শুধু চা এক কাপ খাও।কে বানাবে চা, আপনি? হ্যাঁ, কেন?

শীলা বলেছে আপনি কিছুই করতে পারেন না। চা পর্যন্ত বানাতে জানেন না! এই জন্যেই চাকরিটাকরি কিছুই করেন না। শুধু ঘরে বসে থাকেন।আর কী বলেছে? আর বলেছে আপনি কাক পোষেন। আপনি যে দিকেই যান, দশ-বারোটা কাক কা-কা করতে করতে আপনার পেছনে পেছনে যায়।লুনা খিলখিল করে হেসে উঠল। বহুদিন আমার এই অগোছোল নোংরা ঘরে এমন মন খুলে কেউ হেসে ওঠে নি। আমার মনে হল, সব যেন আগের মতো হয়ে গেছে। আর ভয়ে ভয়ে রাস্তায় বের হতে হবে না। রাতের বেলা জীপের শব্দ শুনে কাঠ হয়ে বিছানায় বসে থাকতে হবে না। লুনা বলল, আপনি আবার রাগ করলেন নাকি?

কাদের এসে নিমেষের মধ্যে ঘরদের গুছিয়ে ফেলল। চাল-ডালের টিন দুটি কোথায় যেন সরিয়ে ফেলল। নতুন টেবিলক্লথ বের হল। বিছানার চাদর নিয়ে রমিজের দোকান থেকে ইন্ত্রি করিয়ে আনল। বইয়ের শেলফ গুছিয়ে, মতিন সাহেবকে নিয়ে ধরাধরি করে বড়ো ট্রাঙ্কটা সরান হল। এতে নাকি হাঁটা-চলার জায়গা বেশি হবে। এক ফাঁকে আমাকে এসে ফিসফিস করে বলে গেল, মেয়েছেলে না থাকলে ঘরের কোনো সুন্দর্য নাই। এই কথাটা ছোড ভাই খুব খাঁটি। লাখ কথার এক কথা।

লুনার থাকার ব্যবস্থা হল আমার ঘরে। আমি গেলাম কাঁদেরের ঘরে। মতিন সাহেব বললেন, তিনি বারান্দায় বসে থাকবেন। ঘরে একটি মহিলা আছে, সবাই ঘুমিয়ে পড়াটা ঠিক হবে না। তাঁর যখন এমনিতেই ঘুম হয় না, কাজেই অসুবিধা কিছু নেই। আমি লুনাকে বেশ কয়েক বার বললাম, ভয়ের কিছু নেই, একটা রাত দেখতে-দেখতে কেটে যাবে। আর যদি ভয়টয় লাগে, ডাকবে। আমার খুব সজাগ ঘুম।না, আমার ভয় লাগছে না।কাদের বলল, চিন্তার কিছু নাই আফা। কোনো বেচাল দেখলেই আমার কাছে খবর আসব। লোক আছে আমার আফা, আগের দিন। আর নাই!কাদের যে এক জন বিশিষ্ট ব্যক্তি হয়ে উঠেছে, বেচাল দেখলেই তার কাছে খবর চলে আসবে।–তা জানা ছিল না। সে কয়েক দিন আগে ঘোষণা করেছে–এইভাবে থাকা ঠিক না। কিছু করা বিশেষ প্রয়োজন।

মতিন সাহেবের কাছে শুনলাম কাদের নাকি কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তারা তাকে নিয়ে যাবে। কখন নেবে, কি, তা গোপন। হঠাৎ এক দিন হয়তো চলে যেতে হবে। এই ব্যাপারে আমার সঙ্গে তার কোনো কথা হয় নি। সরাসরি আমার সঙ্গে কথা বলার বোধহয় তার ইচ্ছাও নেই।লুনা রাত দশটা বাজতেই ঘরের বাতি নিভিয়ে দিল। আমি শুতে গেলাম রাত বারটার দিকে। শোয়ামাত্রই আমার ঘুম আসে না। দীর্ঘ সময় জেগে থাকতে হয়। এপাশ-ওপাশ করতে হয়। দু-তিন বার বাথরুমে গিয়ে ঘাড়ে পানি দিতে হয়। বিচিত্র কারণে আজ শোওয়ামাত্রই ঘুম এল! গাঢ় ঘুম।

ঘুম ভাঙল অনেক রাতে। দেখি অন্ধকারে উবু হয়ে বসে কাদের বিড়ি টানছে। আমাকে দেখে হাতের আড়ালে বিড়ি লুকিয়ে ফেলে নিচু গলায় বলল, মেয়েডা খুব কানতেছে ছোড ভাই। মনটার মইদ্যে বড় কষ্ট লাগতাছে।প্রথম কিছুক্ষণ কিছুই শুনতে পেলাম না। তারপর অস্পষ্ট ফোঁপানির আওয়াজ শুনলাম। মেয়েটি নিশ্চয়ই বালিশে মুখ গুঁজে কান্নার শব্দ ঢাকার চেষ্টা করছে। আমি উঠে দরজার কাছে যেতেই কান্না অনেক স্পষ্ট হল। মাঝে-মাঝে আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলছে–আম্মি আম্মি।

আমি কিছুই বললাম না! কিছু কিছু ব্যক্তিগত দুঃখ আছে, যা স্পর্শ করার অধিকার কারোরই নেই। মতিন সাহেব অনেকটা দূরে ইজিচেয়ারে মূর্তির মতো বসে ছিলেন, আমাকে বেরিয়ে আসতে দেখে ধরা গলায় বললেন, মেয়েটা খুব কাঁদছে। কী করা যায় বলেন তো? কিছুই করার নেই।তা ঠিক, কিছুই করার নেই। বড়ো কষ্ট লাগছে, আমিও কাঁদছিলাম।বলতে—বলতে মতিন সাহেব চোখ মুছলেন। দু জন চুপচাপ বারান্দায় বসে রইলাম। একসময় কাদেরও এসে যোগ দিল। শেষ রাতের দিকে বৃষ্টি পড়তে লাগল। জামগাছের পাতায় সড়সড় শব্দ উঠল। লুনা ফোঁপাতে ফোঁপাতে ডাকল, আম্মি আমি। পরদিন লুনার চাচা লুনাকে নিতে এলেন না।

সন্ধ্যার পর মডার্ন ফার্মেসী থেকে টেলিফোন করতে চেষ্টা করলাম। অপারেটর বলল, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ নষ্ট। কখন ঠিক হবে তা জানে না। আমি বাসায় ফিরে দেখি লুনা মুখ কালো করে বসে আছে।আমি বললাম, নিশ্চয়ই কোনো কাজে আটকা পড়েছেন। কাল নিশ্চয়ই আসবেন।লুনা কোনো কথাটথা বলল না।কালকে আমি তোমার খালার বাসা খুঁজে বের করব। চা খেয়েই চলে যাব। তোমার কাছে ঠিকানা আছে না? জ্বি-আছে।আমি খুব ভোরেই যাব। যদি এর মধ্যে তোমার চাচা চলে আসেন, তাহলে তুমি তাঁর সঙ্গে চলে যাবে। অবশ্যই যাবে। আমার জন্যে অপেক্ষা করবে না।লুনা শান্ত স্বরে বলল, না। আমি আপনার জন্যে অপেক্ষা করব।

আমার ফিরতে কত দেরি হবে, কে জানে। হয়তো আটকা পড়ে যাব রাস্তায়। তুমি অপেক্ষা করবে না। যত তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যায় ততই ভালো।রাত্ৰে ভাত খাওয়ার জন্যে ডাকতে গিয়ে দেখি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।আমি ভাত খাব না।তোমার কি শরীর খারাপ লুনা? জ্বি-না।জ্বর না তো? চোখ-মুখ কেমন যেন ফোলা-ফোলা লাগছে।জ্বরটর না। কিছু খেতে ইচ্ছা হচ্ছে না।দুধ খাবে? ঘরে কলা আছে।জ্বি-না। আমি কিছুই খাব না।আমি ফিরে আসছি, হঠাৎ লুনা খুব শান্ত স্বরে বলল, আমার মনে হয় কেউ আমাকে নিতে আসবেন না।শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই একটি টিকটিকি ডাকল। লুনা বলল, দেখলেন তো, টিকটিকি বলছে ঠিক ঠিক। তার মানে কেউ আসবে না।

ঠিকানা নিয়ে যে-বাড়িতে উপস্থিত হলাম সেটি তালাবন্ধ। গেটে টু লেট ঝুলছে। বাড়িওয়ালা আশেপাশেই ছিলেন, আমাকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন, বাড়ি ভাড়া করবেন? খুব সস্তায় পাবেন। সারভেন্টের জন্য আলাদা বাথরুম আছে। এখানে। গত বছর দেওয়াল ডিসটেম্পার করলাম।বাড়িভাড়ার জন্যে আসি নি, খোরশেদ আলি সাহেবের খোঁজ করছি।

–শুনে ভদ্রলোক খুব হতাশ হলেন।এরা থাকে না। এখানে–জুন মাসে বাড়ি ছেড়ে গেছে। অঞ্চলটা নাকি নিরপাদ না। বলেন দেখি কোন অঞ্চলটা নিরাপদ? আমি তো এখানেই আছি, আমার কিছু হয়েছে? বলেন দেখি? খোরশেদ আলি সাহেবরা এখন থাকেন কোথায় জানেন?

ঠিকানা আছে। গিয়ে দেখবেন, সেইখানেও নেই। নিরাপদ জায়গা যারা খোঁজে তারা এক জায়গায় থাকে না। ঘোরাঘুরি করে।ভদ্রলোক ঠিকানা বের করতে এক ঘণ্টা লাগালেন। শেষ পর্যন্ত ঠিকানা যেটা পাওয়া গেল, সেটায় বাড়ির নম্বর দেওয়া নেই। লেখা আছে মসজিদের সামনের হলুদ রঙের দোতলা বাড়ি। বাড়িওয়ালা ভদ্রলোক গম্ভীর হয়ে বললেন, মসজিদের সামনেই বাড়ি, তাই মনে করেছে খুব নিরাপদ। বুদ্ধি নেই, লোক তো গাছে হয় না, মায়ের পেটেই হয়।

 

Read more

সৌরভ শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *