• Saturday , 28 November 2020

স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধি বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু উপায়

মানুষ হলো সৃষ্টির সেরা জীব।কারন তার স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধি। আর এগুলোর বিকাশ কিভাবে করা যায় জানি কি? 

 

সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য শরীরিক ও মানসিক সুস্থতার কোন বিকল্প নেই। মানুষ হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট সেই জীব যে কিনা সমস্ত জীবের মধ্য শ্রেষ্ঠ। আর এই শ্রেষ্ঠত্বের কারন হলো মানুষের বেধা, বুদ্ধি, জ্ঞান ও স্মৃতিশক্তি  । মানুষের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে বিধার সৃষ্টিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে পৃথিবীতে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে  । প্রতি মূহুর্তে এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী আর উন্নত হচ্ছে সভ্যতা ।স্মৃতিশক্তি

একজন স্বাভাবিক মানুষের শরীরের শক্তি বা সৌন্দর্য একটা বয়সের পর কমে যেতে থাকে, এবং এক সময়ে তা একেবারেই কমে যায়। কিন্তু মস্তিষ্কের ক্ষমতা শারীরিক ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী, এবং এই শক্তি ব্যবহার করে অনেক বেশি কিছু অর্জন করা যায়। 

 

স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধি বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু উপায় রয়েছে । এগুলো চর্চার মাধ্যমে আমাদের চিন্তা শক্তি ও মেধার বিকাশ ঘটানো সম্ভব। এই উপায়গুলো হলো –

 

 

১/ শারীরিক অনুশীলন :

মস্তিষ্ক দীর্ঘদিন সচল রাখার জন্য এবং বুদ্ধি ও মেধার বৃদ্ধির জন্য প্রতিদিন শারীরিক অনুশীলনের কোন বিকল্প নেই।   শারীরিক অনুশীলনের ফলে মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায় এবং নার্ভ সেল উৎপাদন বজায় রাখে। এমনকি ছয় মিনিটের শারীরিক অনুশীলনও মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। শারীরিক কসরত, যোগব্যায়াম সব রকম ব্যায়ামই  স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য ভালো। শারীরিক অনুশীলন

২/ যথাপোযুক্ত খাবার :

স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে খাবার অন্যতম । মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে খাদ্য খুবই প্রয়োজনীয়। মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে সঠিক খাবার খাওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ, আমরা সারা দিনে যা খাই তার মাত্র ২০ শতাংশ শর্করা ও শক্তি আমাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। কাজেই মস্তিষ্কের সঠিক সঞ্চালন নির্ভর করে গ্লুকোজের মাত্রার উপর। এই মাত্রার ঘাটতি হলেই দেখা দেয় নানান সমস্যা। তাই মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে নিয়মমাফিক এবং স্বাস্থ্যকর খাবার অত্যন্ত প্রয়োজন। যেমন – 

★ কলা ও নানা রকমের দেশীয় ফল কেতে হবে। কারন এতে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি, যা নার্ভ ইমপালস্ ট্রান্সমিশনে সাহায্য করে এবং ব্রেনকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে ও স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। 

★মাছ মাথা ও মাছের তেল। কারন মাছের তেল ব্রেন সেল গঠন করে এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ কমায় ও মস্তিষ্ককে রক্ষা করে। এছাড়া, মাছের তেলে ওমেগা-৩ পাওয়া যায়, যা ব্রেনের জন্য উপকারী।

★ মাংসের কলিজা স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে।  মাংসের কলিজায় থাকে আয়রন ও ভিটামিন বি, যা মস্তিষ্কের জন্য উপকারী। ★বিভিন্ন  রকম সবুজ শাকসবজি, পালং শাক, বিভিন্ন ফল, সামুদ্রিক মাছ, বাদাম, তেলের বীজ, বিনস ইত্যাদি মস্তিষ্কের জন্য উপকারী।

★দুধ ও ডিম তে একটি আদর্শ খাবার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য।এতে ব্রেনের কার্যকারীতা বাড়ে এবং স্মৃতিশক্তি বাড়ে।    

★মানুষের দেহের পরিপাকতন্ত্রে একশো ট্রিলিয়নেরও বেশি অণুজীব বসবাস করে। এরা আপনার মস্তিষ্কের সঙ্গেও সংযোগ রক্ষা করে।

মগজের সুস্থতার জন্য এই অণুজীবগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা খুব জরুরি।

আসলে, পাকস্থলীকে অনেক সময় ‘দ্বিতীয় মগজ’ বলে ডাকা হয়।

 

৩/ পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন  :

শারীরিক সুস্থতার সাথে সাথে মানসিক সুস্থতার জন্যও প্রতিদিন ৭/৮ ঘন্টা ঘুম খুব দরকার।এতে ব্রেন বিশ্রাম পায় এবং পরবর্তী দিনের জন্য নিজেকে রেডি করে। তাই প্রর্যাপ্ত ঘুম আবশ্যক। তবে ঘুমাতে যাবার আগে নতুন কিছু করার চেষ্টা করা যেতে পারে এবং সারাদিন যা যা করেছেন তা মনে করেও স্মৃতিশক্তি বাড়ানো যেতে পারে।

পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন 

 

৪/ ভিন্নপথ অনুসরণ : 

 

একই কাজ একই উপায়ে বার বার করা হলে তাতে এক রকম একঘেয়েমি চলে আসে। আর এই এক ঘেয়েমি দূর করতে একই কাজ যা রোজ করা হয় তার বাঝে কিছু বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমেও মেধার বিকাশ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ানো যায়। যেমন – রোজ আমরা যে পথ দিয়ে স্কুল, কলেজ বা অফিসে যাওয়া আশা করি তা না করে ভিন্ন পথ অবলম্বন করার মাধ্যমেও স্মৃতিশক্তি বাড়ানো সম্ভব। স্মৃতিশক্তি বারানোর জনয় এই পদ্ধতিটি পরীক্ষিত ও কার্যকর।      

 

৫/ নতুন কিছু শেখার চেষ্টা :

 

নতুন কিছু শেখার চেষ্টা একটি মানুষের স্মৃতি বাড়াতে অনেকাংশেই সহায়তা করে। নতুন যে কোন শিখা মানুষকে একদিকে যেমন সৃজনশীল করে অন্য দিকে বুদ্ধির যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে মস্তিষ্কের প্রসারতা বাড়ায়। এতে করে স্মৃতিশক্তিও বাড়ে।

এছাড়া যে কোন রকম মানসিক চাপ এড়িয়ে চলা। মানসিক চাপ বাড়লে স্মৃতিশক্তি কমতে শুরু করে। বন্ধু ও পরিচিতজনের সংখ্যা বাড়ানো এবং তাদের সঙ্গে  গঠনমূলক সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলার মাধ্যমেও স্মৃতিশক্তির বিকাশ সম্ভব।

 

৬/ এক সঙ্গে অনেক কাজ না করা :

 

এক সঙ্গে অনেক  কাজ করার প্লেন করলে ব্রেনের উপর অতিরিক্ত চাপ পরে। এতে করে স্মৃতিশক্তিও বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়।

    

  বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাল্টিটাস্ক বাস্তবে মানুষকে ধীর করে দেয়। এতে মনোযোগ বিক্ষিপ্ততা তৈরি হয়, যা সৃষ্টিশীলতার তুলনায় সমস্যাই বেশি তৈরি করে।

 

কম্পিউটারে অপ্রয়োজনীয় তথ্য ডিলিট দেবার মত  মানুষেরও অপ্রয়োজনীয় তথ্য ও কথা মাথা থেকে বাদ দেয়া উচিত। নতুন কিছু শেখা ও আবিষ্কার করা বা নতুন কিছু চিন্তা করা বুদ্ধিভিত্তিক খেলায় অংশ নেয়াও মস্তিষ্ককে কর্মক্ষম রাখার আরেকটি ভালো উপায়।  যেমন নতুন ভাষা শিখা, নতুন কিছু রান্না শেখা, নতুন কোন ক্রিয়েটিভ কাজে অংশ নেয়া ইত্যাদি।  

ঔ গায়না এমন মানুষ দেখাই যাবে না। গান মস্তিষ্কের উপর দারুন ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং তার সাথে বাড়ে স্মৃতিশক্তিও। গান যে মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করতে পারে তার প্রমাণ রয়েছে। 

গানের সুরের প্রভাবে পুরো মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়ে উঠে। এর ফলে মস্তিষ্ক গানের স্মৃতি ধরে রাখে দীর্ঘদিন। গান মানুষের মানসিক অবসাদ ও ঠোকাতে পারে।তাই আমাদের মস্তিষ্কের প্রশান্তির জন্য সুরের মূর্চ্ছনার প্রয়োজন।    

 

৮/ মস্তিষ্ককে রিলাক্স করা :

 

দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ মস্তিষ্কের জন্য খুবই খারাপ। এতে করে ব্রেণের উপর এক ধরনের চাপ পরে। তাই কাজের ফাঁকে অবসর সময় বেড় করা খুবই প্রয়োজন। অবসর নেয়ার মাধ্যমে মস্তিস্ককে  রিলাক্স দেয়া যেমন হয় অন্য দিকে এটি আমাদের স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও সহায়তা করে। যোগব্যায়াম বা মাইন্ডফুলনেস চর্চার মাধ্যমেও মস্তিষ্ককে রিলাক্স করা যায়।  

 

৯/ বেশি বেশি হাঁটা চলা করা : 

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে বেশি হাঁটা চলা করলে স্মৃতি শক্তি বাড়ে। যেমন ধরুন কোন শব্দ বা বাক্য মনে থাকে না বা কোন পড়া মনেই থাকছে না, সেক্ষেত্রে হেঁটে হেঁটে পড়লে সেটা মনে থাকে।আবার অনেক সময় পড়তে পড়তে একঘেয়েমি চলে আসে। কোন কিছুই মনে থাকে না।সেক্ষেত্রে একটু বািরে থেকে ঘুরে এসে আবার শুরু করলে ঔ পড়া তারাতাড়ি মুখস্ত হয় এবং অনেকদিন মনেও থাকে।হাঁটা চলা করা     

 

১০/ মেডিটেশন করা : 

মিডিটেশন একদিকে যেমন আমাদের স্মৃতিশক্তি বাড়ায় তেমনি আমারদের লক্ষ্য নির্ধারনেও সহায়তা করে। প্রতিদিন আমাদের ব্রেনে ৬০,০০০ হাজারের উপরে চিন্তা আসে আর কোনটাতেই আমরা কিছু সময়ের জন্য ফোকাস করি না।কারন আমাদের ব্রেন বিক্ষিপ্ত থাকে এবং কোনটাতে ফোকাস করবে তা বুঝে উঠতে পারে না।

মেডিটেশন করা

সেক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর আর এক উপায় হল মেডিটেশন। এর ফলে আমাদের মনের চিন্তার চাপ অনেকটাই কমে যায়। মেডিটেশন করলে যেকোনো কাজেই মনোযোগ বাড়ে এবং ব্রেনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে কোনো কিছু মনে রাখার বা মনে করার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয় না। প্রতিদিন নিয়মমাফিক সকালে ঘুম থেকে উঠে ও রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে কমপক্ষে ১৫ /২০ মিনিট মেডিটেশন করলেই যথেষ্ট । চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিয়ে মনকে শান্ত করার চেষ্টা করুন। এক সপ্তাহের মধ্যে  এর সুফল পাওয়া যায় এবং এটা একটা অভ্যাসে পরিনত হয়।

 

আসলে মানুষের জীবনের সাফল্যের জন্য মস্তিষ্ককে ঠিকভাবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে জরুরী। মনে রাখতে পারা এবং প্রয়োজনের সময়ে মাথা খাটাতে পারা হতে পারে আপনার সাফল্যের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। স্মৃতিশক্তি মানুষের একটও বড় সম্বল এবং এটি ব্যাতিত মানুষ জড় পদার্থের সমান। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের স্মৃতিশক্তি কমে আবার অল্প বয়সেও কমতে পারে। তাই উপরে উল্লেখিত নিয়মগুলো যথাযথ পালনের মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি ও মেধার সঠিক বিকাশ সম্ভব। 

 

লিখেছেন –

ত্রোপা চক্রবর্তী

 

Related Posts

Leave A Comment