হরতন ইশকাপন পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

হরতন ইশকাপন পর্ব – ২

মিসির আলির চোেখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। আধ্যাত্মিক ক্ষমতাধর যুবক কি যাবার আগে তাঁকে হিপনোটাইজি করে গেছে? সন্ধ্যাকেলায় তার কখনো ঘুম আসে না। আজ কেন আসছে? মিসির আলি কয়েকবারই চেষ্টা করলেন ঘুমের ঘোর থেকে উঠে আসতে। পারলেন না। তার চোখের পাতায় কেউ যেন অম্বাইক গাম লাগিয়ে দিয়েছে।ঘুমাচ্ছেন?

মিসির আলি চোখ মেললেন। বাড়িওয়ালার ভাগ্নি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা আজ শাড়ি পরেছে। শাড়িতে তাকে শুধু যে বড় লাগছে। তাই না, সুন্দরও লাগছে। কিছুটা সাজগোছও করেছে। গোসল করে চুল বেঁধেছে। চোখে কাজল দিয়েছে। গলায় সোনার চেইন চিকচিক করছে। দুই হাতে সোনার চুড়ি। পায়ের লাল স্যান্ডেল জোড়াও মনে হয় নতুন। চোখে কাজল দেয়ার জন্য হয়তো-চোখের দিকে তাকালে মায়া-মায়া ভাব হচ্ছে। চোখে কাজল পরলে মায়া ভাব আসে কেন? কালো রঙের সঙ্গে কি মায়া সম্পর্কিত?

তোমার কী খবর রেবু? জি ভালো। আপনি অসময়ে চেয়ারে বসে ঘুমুচ্ছিলেন কেন? শরীর খারাপ? ঘুমাচ্ছিলাম না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম।আমি কি বসবা আপনার সামনের চেয়ারটায়? বস।আমি যে প্রায়ই এসে আপনাকে বিরক্ত করি আপনি বিরক্ত হন না তো?

না, আমি বিরক্ত হই না। তা ছাড়া তুমি প্রায়ই আস না তো। হঠাৎ হঠাৎ আস।মেয়েটা মাথা দুলিয়ে বলল, আমি রোজই আসি। সব দিন আপনার সঙ্গে কথা বুলি না। ধারাহ্মা থেকে অ্যাবাউট টার্ন করে চলে যাই। আপনার কাছে আসি না। মামার কারণে আসি না। বারবার আপনার এখানে আসতে দেখলে মামা হয়তো অন্য কিছু ভেবে বসবে।মিসির আলি অবাক হয়ে বললেন, কী ভাববে?

হরতন ইশকাপন পর্ব – ২

রেবু শান্ত গলায় বলল, ভাববে আপনার সঙ্গে আমার প্রেম হয়ে গেছে।রেবু চেয়ারে বসল। মিসির আলি মেয়েটির কথায় হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলালেন। চেয়ারে বসার ভঙ্গি খুব ভালো করে লক্ষ করলেন। সব মানুষ একভাবে চেয়ারে বসে না। একেকজন একেকভাবে বসে। কেউ ধাপ করে বসে পড়ে। কেউ বসে নরম ভঙ্গিতে। যেন চেয়ারে বসছে না, কারো কোলে বসছে।রেবু বলল, আজ আমাকে খুব সুন্দর লাগছে না?

হুঁ, লাগছে।আপনার ঘরে আলো কম তো, এই জন্য ঠিকমতো দেখতে পারছেন না। আজ আমাকে ফরাসাও লাগছে।ও, আচ্ছা! আজ আমি এত সাজগোছ করেছি। কেন, বলুন তো? বুলতে পারছি না।কী আশ্চৰ্য, বলতে পারছেন না কেন? আমার মামার ধারণা আপনার অসম্ভব বুদ্ধি এবং আপনি সবকিছু বলতে পাবেন! মামা কী বলে জানেন? মামা বলে, আপনি যে কোনো মানুষকে পাঁচ মিনিট চোখের দেখা দেখে বলে দিতে পারেন দুদিন আগে দুপুরবেলা সে কোন তরকারি দিয়ে ভাত খেয়েছিল।

মিসির আলি হেসে ফেললেন। প্লেবুর মামা আজমল সাহেবের তার প্রসঙ্গে উচ্চ ধারণার কথা মিসির আলি জানেন। সেই ধারণা এতটা উঁচুতে তা জানতেন না। মানুষ বাড়িয়ে কথা বলতে ভালবাসে। এই ভদ্রলোক অনেক বেশি ভালবাসেন।রেবু পা দোলাতে দোলাতে বলল, বলুন তো, আজ দুপুরবেলা আমি কী দিয়ে ভাত খেয়েছি? মিসির আলি শান্ত গলায় বললেন, ইলিশ মাছ দিয়ে কচুর লতিও রান্না হয়েছিল। তুমি কচুর লতি খাও নি? রেবু হতভম্ব গলায় বলল, আশ্চর্য কী করে বললেন?

কী করে বললাম সেটা তো আমি বলব না।প্লিজ বলুন! আমি আপনার পায়ে পড়ি। কথার কথা না। আমি কিন্তু সত্যি আপনার পায়ে ধরব। প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত ছাড়ব না। আমি পাগল টাইপ মেয়ে। যা বলি তা করে ফেলি।মিসির আলি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, আজ সকালে তোমার মামা যখন বাজার করে ফিরছিলেন তখন আমি বারান্দায় বসা! তোমার মামা বললেন, বাজারে কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।মাছের মধ্যে শুধু ইলিশ। আমি দেখলাম বাজারের ব্যাগে দুটা ইলিশ মাছ! আর কচুর লতি।

হরতন ইশকাপন পর্ব – ২

তুমি একবার বলেছিলে তুমি কচুর লতি খাও না। তোমার গলা কুটকুট করে। কাজেই সব মিলিয়ে-ঝিলিয়ে বলেছি। আমার কোনো আধ্যাত্মিক ক্ষমতা নেই।আমি প্ৰায় বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম।—আপনার অনেক ক্ষমতা।মিসির আলি হাসলেন। রেবু বলল, আজ আমি সাজগোছ করেছি। কারণ হলআজ বিকেলে আমাকে দেখতে আসার কথা ছিল। আমাকে বিয়ে দেবার খুব চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রায়ই লোকজন আমাকে দেখতে আসছে।আজ যাদের দেখতে আসার কথা ছিল তারা দেখতে আসে নি?

উঁহু! খবর পাঠিয়েছে। একটা জরুরি কাজে আটকা পড়েছে বলে আসতে পারছে না, পরে এক সময় আসবে। আমার ধারণা এরা আর কোনোদিনই আসবে না।এরকম ধারণা কেন? বিয়ের কথাবার্তা হলে সবাই মেয়ে সম্পর্কে গোপনে খোঁজখবর করে। এরাও আমার সম্পর্কে খোঁজ করে ভয়ঙ্কর খবরটা জেনে ফেলেছে। আমার জীবনে একটা ভয়ঙ্কর খবর আছে।ভয়ঙ্কর খবরটা কী?

রেবু খুব সহজভাবে বলল, আমার যখন ষোল বছর বয়স তখন আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। এক বছরের মতো পাগল ছিলাম। জেনেশুনে কেউ কি আর পাগল বউ ঘরে আনবে? এখন তো তুমি আর পাগল না? এখনো পাগল, তবে খুব সামান্য। আচ্ছা আমি উঠি, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে তো, সন্ধ্যাবেলা আপনার ঘরে বসে থাকলে মামা খুব রাগ করবে। খারাপ কিছু ভাববে। খুব খারাপ কিছু। খুব খারাপ বলতে আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি বুঝতে পারছেন তো? অবশ্যই বুঝতে পারছেন। আপনার যা বুদ্ধি! আবার এস।

আপনাকে বলতে হবে না। আমি আসব। আপনি তো আর জানেন না। আপনি আমাকে যা করতে বলবেন আমি তাই করব। আপনি যদি আমাকে রান্ত তিনটার সময় আসতে বলেন আমি আসব। যদিও স্থানি আপনি সেটা কখনো করবেন না।মিসির আলি হতাশ ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন। রেবু ঠিকই বলেছে তার পাগলামি পুরোপুরি সারে নি। এখনো বেশ খানিকটা আছে।রেবু বলল, আচ্ছা কিছুক্ষণ আগে একটা লোক এসেছিল। আপনার কাছে। সে কে?

হরতন ইশকাপন পর্ব – ২

তার নাম মনসুর।লোকটা অনেকক্ষণ আপনার কাছে ছিল।হুঁ।কে আপনার কাছে আসে, কখন আসে, কতক্ষণ থাকে।—সব আমি খেয়াল রাখি।ও আচ্ছা! লোকটা কিন্তু ভালো না। আপনি ওকে আপনার কাছে আসতে নিষেধ করে দেবেন।লোকটা ভালো না বুঝলে কী করে?

সে যখন চলে যাচ্ছিল তখন আমি দোতলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। লোকটা আমার দিকে তাকাল। খুব খারাপভাবে তাকিয়েছিল। আপনি অবশ্যই তাকে এখানে আসতে নিষেধ করে দেবেন।আচ্ছা।যদি দেখি সে আবারো আপনার কাছে এসেছে তাহলে আমি কিন্তু খুব রাগ করব। আজ যাই? আচ্ছা।আপনার জন্য কি চা বানিয়ে ফ্লাঙ্কে করে পাঠিয়ে দেব?

না, দরকার নেই।অবশ্যই দরকার আছে। সন্ধ্যাবেলা মানুষের চা খেতে ইচ্ছা করে না! আমি চা পাঠিয়ে দেব। ঘরে যদি কোনো খাবার থাকে তাও পাঠাব। মনে হয় নেই। মামাদের বাসায় বিকেলে নাশতা খাবার চল নেই। সন্ধ্যা মিলাতে না মিলান্ত্ৰে সবাই চা খেয়ে ফেলে। যাই হোক, আমি আপনার জন্য চা পাঠাচ্ছি।

আচ্ছা ঠিক আছে।সুগার পটে আলাদা করে চিনি দিয়ে দেব। কষ্ট করে নিজে মিশিয়ে নেবেন। পারবেন না? পারব।রেবু চলে গেল। মিসির আলি মনে মনে হাসলেন। চা পাঠানের কথা, নাশতা পাঠানোর কথা এই মেয়ে আগে অনেকবার বলেছে। চা-নাশতা কখনো আসে নি। আজো আসবে না।

মেয়েটি সম্পর্কে মিসির আলি তেমন কিছু জানেন না। সে চাঁদপুরে থাকে। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে মামার কাছে বেড়াতে এসেছে। মামা মেয়েটির বিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন। রেবু সম্পর্কে এইটুকু তথ্য তাঁর কাছে আছে। আজ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি তথ্য। ষোল বছর বয়সে মেয়েটি পাগল হয়ে গিয়েছিল। খুবই ভয়াবহ তথ্য। ভয়াবহ কারণ পাগলামিকে এক ধরনের অসুখ বলা হলেও এই অসুখের জাত আলাদা।

হরতন ইশকাপন পর্ব – ২

এই অসুখ মানুষের কনসেন্সকে আক্রমণ করে। কনসেন্স হচ্ছে মানুষের অস্তিত্ব। যে অসুখ অস্তিত্বের শিকড় ধরে টান দেয়। সেই অসুখ অসুখ না, অন্য কিছু।সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মিসির আলি চেয়ারে বসে আছেন। তার মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা। যেন কোনো একটা জটিল হিসেব মিলছে না।জটিল হিসেবের ব্যাপারটা আসছে। কেন তাও বুঝতে পারছেন না। আজ সারা দিন তিনজন মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে-রেবুর মামা, মনসুর এবং বেবু।

এরা এমন কিছু কি করেছে যা তিনি সারা দিন ধরতে পারেন নি।–তার অবচেতন মন ধরে ফেলেছে। এবং অবচেতন মন চেতন মনের কাছে একটু পরপর খবর পাঠাচ্ছে। অবচেতন মন খবর পাঠায় নানা ধরনের প্রতীকের মাধ্যমে, ধাঁধার মাধ্যমে। সেই সব প্রতীক এবং রিডলস ডিকোড করার দায়িত্ব চেতন মনের। চেতন মন তা করতে পারছে না।আচ্ছা, এক এক করে। ধরা যাক। প্রথমে রেবুর মামা-আজমল সাহেব।

আজমল হোসেন বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ। রোগী! সামান্য ইস্পানির মতো আছে। জর্দা দিয়ে প্রচুর পান খান! ব্যবসায়ী মানুষ বাড়ি ভাড়া দেন। কর্ম টাইপ! সারা দিন কাজ করেন। রাত দশটার মধ্যে শুয়ে পড়েন। ব্যবসায়ীদের কখনো সুনিদ্রা হয় না। তার হয়। মোটামুটি রুটিনে বাধা জীবন। সপ্তাহে তিন দিন বাজার করেন। বুধ, শুক্র, রবি। রবিবারে আমিন বাজার থেকে গরুর মাংস কেনেন। বৃহস্পতিবার রাতটা ধর্ম-কর্মের জন্য আলাদা করা। সেদিন সন্ধ্যায় কাকরাইল মসজিদে যান মাগরেবের নামাজ পড়তে। নামাজ শেষ করে বাসায় ফিরে এসে স্ট্রর স্বাড়ির ছাদের ঘরে জিকির করেন। মিসির আলি এক বছর হল এ বাড়িতে সাবলেট থাকেন। এক বছর রুটিনের ব্যতিক্রম হতে দেখেন নি।

হরতন ইশকাপন পর্ব – ২

মনসুর নামে যুবকটির কথা ভাবা যাক। মনসুর কি তার আসল নাম? কেন জানি মনে হয় মনসুর তার আসল নাম না। কেন জানি মনে হচ্ছে আবার কী? অকারণে মানুষের কিছু মনে হয় না। প্রতিটি মনে হবার পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকতে হবে। মনসুর যুবকটির আসল নাম না এটা মনে হবার কারণ কী? মনসুর শব্দটা সে অদ্ভুত ভালো উচ্চারণ করছে এইটা কি কারণ?

সেই দুই সিলেবলেই বলে মন সুর। মনসুর যদি যুবকটির নাম হতো তা হলে সে এক সিলেবলেই উচ্চারণ করত। শব্দটির সঙ্গে সে খুব পরিচিত নয় বলেই… যুক্তিটা মিসির আলির পছন্দ হচ্ছে না। ভাসা ভাসা যুক্তি। মনে হচ্ছে তিনি জলের উপর ওড়াউড়ি করছেন। জল স্পর্শ করতে পারছেন না।

 

Read more

হরতন ইশকাপন পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.