হলুদ হিমু কালো র‍্যাব পর্ব:০২ হুমায়ূন আহমেদ

হলুদ হিমু কালো র‍্যাব পর্ব:০২

এই ভদ্রলোকের বাঁ পাশে যিনি আছেন তাঁর মুখ ঘামে চটচট করছে। মনে হচ্ছে এইমাত্র তিনি ক্রসফায়ারিং সেরে এলেন। ভদ্রলোকের নাম দেয়া গোল ঘািমবাবু। তৃতীয় ব্যক্তির নাম ঘািমবাবুর সঙ্গে মিল রেখে দিলাম হামবাবু। তাঁর মুখভর্তি হামের মতো দানা। মাঝখানের জনের নাম এই মুহুর্তে দিতে পারছি না। তাকে মধ্যমণি নামেই চালাবো।

হামবাবুর হাতে একটা টেলিফোন সেট। টেলিফোন সেটে হয়তো কিছু কারিগরি আছে। কারণ হামবাবু বেশ কিছু বোতাম টেপাটেপি করছেন। হামবাবু আমাকে আমার তিন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নাম এবং টেলিফোন নাম্বার দিতে বলেছেন। আমি শুধু বড় খালার নাম দিয়েছি। কারণ উনার টেলিফোন নাম্বারই আমার মনে আছে। অন্য কারোরটা নাই। মিতুর নাম্বারটা অবশ্যি দেয়া যেত। ওকে, জন্মদিনে মোবাইল সেট দেয়া হয়েছে। নাম্বার আমার মনে আছে। ইচ্ছা! করেই ওর নাম্বার দিলাম না। বাচ্চামেয়ে র‍্যাবের টেলিফোন পেয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যেতে পারে।

হামবাবু মনে হয় আমার দেয়া নাম্বার নিয়েই গুতাগুতি করছেন। এতক্ষণ কানেকশান পাওয়া যাচ্ছিল না। এখন মনে হয় পাওয়া গেল। হামবাবুর মুখ উজ্জ্বল। তিনি ঘামবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, পাওয়া গেছে।মধ্যমণি বাবু (এখনো বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছেন) বললেন, স্পিকার অন করে দাও, কথাবার্তা সবাই শুনুক।স্পিকার অন করা হতেই আমি বড় খালার অতি বিরক্ত গলা শুনলাম–হ্যালো, হ্যালো কে?

আমি র‍্যাব অফিস থেকে বলছি। র‍্যাব। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান।ও আচ্ছা! কী চান? (খালা খানিকটা দমে গেছেন। চাপা গলা।) কিছু ইনফরমেশন চাই। আমার কাছে আবার কী ইনফরমেশন? (খালার স্বর আরো ডাউন হয়ে গেছে। প্রায় কাঁদো কাঁদো।) হিমু নামে কাউকে চেনেন? সে কি র‍্যাবের হাতে ধরা পড়েছে?

সে কারো হাতেই ধরা পড়ে নি। তাকে চেনেন কি-না বলেন।চিনিব না কেন, আমি তার খালা। বড়খালা।তার সঙ্গে আপনার শেষ দেখা কবে হয়েছে? এক দেড় মাস আগে। তাকে আমি বাড়িতে ঢুকতে নিষেধ করেছি। নিষেধের পরে আর আসে নাই।নিষেধ করেছেন কেন? তার কাজকর্মের কোনো ঠিক নাই। তার বেতালা কাজকর্ম আমার পছন্দ না।

কী বেতালা কাজকর্ম?

তার সব কাজকর্মই বেতালা।

সে কি বোমাবাজি সন্ত্রাসী এইসব কাজকর্মে যুক্ত?

যুক্ত যদি হয় আমি মোটেই আশ্চর্য হবো না। তাকে বিশ্বাস নাই। সে যেকোনো কিছু করতে পারে।তার পেশা কী? সে শুধু হাঁটে। তার কোনো পেশাফেশা নাই।ইদানীং কি সে ফেরিওয়ালার পেশা ধরেছে? চা-কফি বিক্রি করছে? অসম্ভব। এইসব সে করবে না। সে কোনো কাজে থাকবে না। অকাজে থাকবে।আমরা যতদূর জানি সে ইদানীং চা-কফি ফেরি করে।যদি করে তাহলে বুঝতে হবে তার পিছনে তার কোনো না কোনো উদ্দেশ্য আছে। উদ্দেশ্য ছাড়া সে কিছু করবে না।

খারাপ উদ্দেশ্য?

হতে পারে।

আপনাকে ধন্যবাদ।

হিমু, গাধাটা আছে কোথায়?

হামবাবু এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। বিজয়ীর ভঙ্গিতে তিনি মধ্যমণি বাবুর দিকে তাকালেন। যেন এইমাত্র ট্রাফালগার স্কয়ার যুদ্ধে তিনি নেপোলিয়ানকে পরাজিত করেছেন।মধ্যমণি বাবু বই থেকে মুখ না তুলে বললেন, থানাগুলির কাছ থেকে ইনফর্মেশন নাও। ওদের কাছে কোনো রেকর্ড আছে কি-না দেখা।

রেকর্ড থাকার কথা।স্পিকার কি অন থাকবে, না অফ করে দেব? অন থাকুক, অসুবিধা নেই।রমনা থানার ওসি সাহেবকে সবার আগে পাওয়া গেল। তিনি বললেন, হিমু। আপনাদের হাতে ধরা পড়েছে। হিমালয়? হিমালয় কি-না জানি না, নাম বলছে হিমু।গায়ে হলুদ পাঞ্জাবি?

হুঁ।

খালি পা?

হ্যাঁ খালি পা।

ওকে ধরে রেখে কোনো লাভ নাই স্যার। ছেড়ে দেন। ফালতু জিনিস।

ফালতু জিনিস মানে কী?

উল্টাপাল্টা কথা বলে মাথা ইয়ে করে দেবে।

মাথা ইয়ে করে দেবে মানে কী?

মাথা আউলা করে দেবে।

র‍্যাবের মাথা আউলা করতে পারে এমন জিনিস বাংলাদেশে নাই।অবশ্যই স্যার। অবশ্যই।তার নামে থানায় কি কোনো রেকর্ড আছে? তাকে অনেকবার থানায় ধরে আনা হয়েছে। কিন্তু তার নামে কোনো কেইস নাই। ডিজি এন্ট্রিও নাই।তার এগেইনষ্টে কিছুই না থাকলে থানায় তাকে ধরে আনা হয়েছে কেন?

আপনারা যে কারণে ধরেছেন আমরাও সেই কারণে ধরেছি।আমরা কী কারণে ধরেছি আপনি জানেন কীভাবে? স্টুপিডের মতো কথা বলবেন না।সরি স্যার। মুখ ফসকে বলে ফেলেছি।ধানমণ্ডি থানার ওসিকে অনেক চেষ্টা করেও পাওয়া গেল না। তবে মোহাম্মদপুর থানার ওসিকে পাওয়া গেল। ওসি সাহেব বললেন–স্যার, ওকে ধমক ধামক দিয়ে ছেড়ে দেন।মধ্যমণি বললেন, why? ছেড়ে দিতে হবে কেন? ওসি সাহেব বললেন, পাগল আটকিয়ে লাভ কী?

ঘামবাবু বললেন, সে পাগল?

ওসি সাহেব বললেন, ঠিক তাও না। একটু ইয়ে।

হামবাবু বললেন, ইয়েটা কী?

কিছু না স্যার, এমনি বললাম। তবে…

তবে কী?

একটু চিন্তা করে বলি স্যার?

চিন্তা করতে কতক্ষণ লাগবে?

এই ধরেন আধঘণ্টা।

মধ্যমণি বললেন, আমি আপনাকে একঘণ্টা সময় দিলাম। একঘণ্টার মধ্যে তার সম্পর্কে ফুল রিপোর্ট চাই।

ইয়েস স্যার।

ঘড়ি ধরে একঘণ্টা।

টেলিফোন পর্ব শেষ হলো। মধ্যমণি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি টেলিফোন কনভারসেশন সবই শুনলেন। এখন আপনার বলার কিছু থাকলে বলুন।আমি খানিকটা আহাদ বোধ করলাম। এতক্ষণ তুমি তুমি করা হচ্ছিল, এখন আপনিতে প্রমোশন। ভাবভঙ্গি আশা উদ্রেক টাইপ। হয়তো হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হবে। রক্ত চলাচল বন্ধ হবার জোগাড়।চুপ করে আছেন কেন? আপনার নিজের বিষয়ে কিছু বলার থাকলে বলুন।নিজের বিষয়ে আমার কিছু বলার নাই স্যার। তবে আপনারা চাইলে আমি একটা ছড়া বলতে পারি।

ছড়া বলবেন? (হামবাবু হুঙ্কার দিলেন)

বলতে দাও! (মধ্যমণির ঠাণ্ডা মোলায়েম গলা)

আমি বেশ কায়দা করে ছড়া বললাম— আমার নাম হিমু। এখন আমি একটা ছড়া বলব। ছড়ার নাম র‍্যাব।

ছেলে ঘুমানো পাড়া জুড়ানো

র‍্যাব এলো দেশে

সন্ত্রাসীরা ধান খেয়েছে

খাজনা দেব কিসে?

ছড়াটার মানে কী?

এটা হলো স্যার ননসেন্স রাইম। ননসেন্স রাইমের মানে হয় না। হামটি ডামটি সেট অন এ ওয়ালের কি কোনো মানে হয়? ঘামবাবু বললেন, ফাজলামি ধরনের কথা বলে র‍্যাবের হাত থেকে পাৱ পাওয়া যায় না। এটা জানো?

আমি বললাম, জানি স্যার। উপরে আছেন রব আর নিচে আছেন র‍্যাব। এতক্ষণে হামবাবুর ধৈর্য্যুতি ঘটল। তিনি প্রায় বিদ্যুৎচমকের মতো উঠে। এসে প্রচণ্ড এক চড় দিয়ে আমাকে ধরাশায়ী করতে গেলেন। সফল হলেন না, মেঝেতে পা পিছলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। পতনের শব্দে ঘরবাড়ি দুলে উঠার মতো হলো। প্ৰচণ্ড ব্যথায় উনার চিৎকার চেচামেচি করার কথা। তিনি কিছুই করলেন না। ঘরে সুনসান নীরবতা। নীরবতা ভঙ্গ করে মধ্যমণি উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, কী ব্যাপার?

আমি বললাম, উনার স্ট্রোক হয়েছে। অতিরিক্ত উত্তেজনায় এই কাজটা হয়েছে। উনাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। উনি কোমায় চলে গেছেন।মধ্যমণি বললেন, তোমাকে অ্যাডভাইস দিতে হবে না। তোমাকে শায়েস্তা করা হবে। অপেক্ষা করো।হামবাবুকে নিয়ে ছোটাছুটি শুরু হয়েছে। তার এক ফাঁকে মধ্যমণি কাকে যেন বললেন (আমাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে), এই বদমাশটাকে আটকে রাখ।আমি বললাম, স্যার, রাতে কি ডিনার দেয়া হবে? রব দিনারের ব্যবস্থা করেন। র‍্যাব করবে না?

মধ্যমণি এমন ভঙ্গিতে তাকালেন যার অর্থ— Wait and seel অ্যাম্বুলেন্স চলে এসেছে। হামবাবুকে স্ট্রেচারে তোলা হচ্ছে। অফিসে বিরাট উত্তেজনা। অন্যের উত্তেজনা দেখতে ভালো লাগে। আমার ভালোই লাগছে।কোথায় আছি কী ব্যাপার একটু বলে নেই। সমুদ্রে যখন জাহাজ চলে তখন সেই জাহাজের অবস্থান ক্ষণে ক্ষণে চারদিকে জানিয়ে দিতে হয়। আমি এখন অনিশ্চয়তা নামক সমুদ্রে ভাসমান ডিঙ্গি। তবে নিরানন্দের মধ্যেই যেমন থাকে আনন্দ, অনিশ্চয়তার মধ্যেও থাকে নিশ্চয়তা।

আমাকে জানালাবিহীন একটি ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে গুদামঘর। এক কোনায় গাদা গাদা খালি কার্টুনের স্তুপ। কার্টুনের গায়ে লেখা— Expo Euro. তার পাশে মগের ছবি। অন্যপাশে টিনের বড় বড় কৌটা। রঙের কোটা হতে পারে। একটা পুরনো আমলের খাটি দেখতে পাচ্ছি। খুলে রাখা হয়েছে।

কার্টুনের স্তুপে হেলান দেয়ার মতো ভঙ্গি করে একজন হাঁটু মুড়ে বসে আছে। তার অবস্থা গুরুচরণ। হাত-পা সবই বাঁধা। কপাল ফেটেছে। রক্ত চুইয়ে পড়ছিল। এখন রক্ত জমাট বেঁধে আছে। লোকটার মুখের কাছে একগাদা মশা ভিনভন্ন করছে। মশাদের কাণ্ডকারখানা বুঝতে পারছি না। লোকটার কপাল, থুতনি এবং গায়ে চাপ চাপ রক্ত। মশারা ইচ্ছা করলেই সেখান থেকে রক্ত খেতে পারে। তা না করে মশারা তাকে কামড়াচ্ছে।

লোকটা যেখানে বসে আছে সে জায়গাটা ভেজা। সেখান থেকে উৎকট গন্ধ আসছে। আমি বললাম, ভাইসাব কি এখানে পেসাব করেছেন? লোকটি অবাক হয়ে তাকাল। যেন এমন অদ্ভুত প্রশ্ন সে তার জীবনে শোনে নি। আমি বললাম, আমরা একসঙ্গে আছি, আসুন আলাপ পরিচয় হোক। আমার নাম হিমু। আপনার নাম কী?

লোকটা খড়খড়ে গলায় বলল, এরা আমাকে মেরে ফেলবে। আজ রাতেই মারবে।আপনি তো এখনো আপনার নাম বললেন না? ছাদেক।কোন ছাদেক? মুরগি ছাদেক? হুঁ।আরে ভাই আপনি তো বিখ্যাত মানুষ! শীর্ষ দশে আছেন। আপনার নামে তো পুরস্কারও আছে। আপনাকে ধরল কীভাবে?

লাক খারাপ এইজন্যে ধরা খেয়েছি।শুধু যে ধরা খেয়েছেন তা না। পেসাব পায়খানা করে ঘরের অবস্থা কাহিল করে ফেলেছেন।মুরগি ছাদেক ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার কথাবার্তা মনে হয় তার একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কোনো মানুষই রসিকতা নিতে পারে না। মুরগি ছাদেকও পারছে না। সে চাপা গলায় বলল, আপনার পরিচয়টা বলেন।আমি বললাম, একবার আপনাকে বলেছি। আমার নাম হিমু। শুধু হিমু?

কফি হিমু বলতে পারেন। কফি বিক্রি করি।আপনাকে ধরেছে কেন? কফি বিক্রির জন্য ধরেছে। অপরাধ তেমন গুরুতর না, তবে অতি সামান্য অপরাধেও ক্রসফায়ারের বিধান আছে।আপনাকে মারবে না।আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, কীভাবে বুঝলেন মারবে না?

মুরগি ছাদেক বলল, আপনার চেহারায় মৃত্যুর ছায়া নাই। যারা মারা যায় তাদের মুখে মৃত্যুর ছায়া পড়ে। আমি জানি।আমি বললাম, আপনার জানার কথা। আপনি অনেক মানুষ মেরেছেন।মুরগি ছাদেক চুপ করে রইল। আমি বললাম, সর্বমোট কয়জন মানুষ মেরেছেন? বলতে চাইলে বলেন। না বলতে চাইলে নাই। অপরাধের কথা বললে পাপ কাটা যায়।কে বলেছে?

যেই বলুক ঘটনা সত্য। কয়টা মানুষ মেরেছেন বলুন তো? মুরগি ছাদেক বিড়বিড় করে বলল, নিজের হাতে বেশি মারি নাই। চাইর পাঁচজন হবে।অন্যের হাতে আরো বেশি? হুঁ।ভাই, আপনি তো ওস্তাদ লোক। কোনো পুলাপান মেরেছেন?

মুরগি ছাদেক অস্ফুট গলায় কী যেন বিড়বিড় করল। শুনতে পেলাম না। আমি বললাম, ভাই সাহেব, কী বলছেন আওয়াজ দিয়ে বলেন, শুনতে পাচ্ছি না।মুরগি ছাদেক বলল, আমি আজরাইল দেখেছি।আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম, আজরাইল দেখেছেন?

হুঁ।চেহারা কেমন? মুরগি ছাদেক বিড়বিড় করে বলল, মুখ দেখি নাই। মুখ পর্দা দিয়ে ঢাকা।বিরাট লম্বা? না। ছোট সাইজ। হাতও ছোট ছোট। আঙুল বড়।আজরাইল কি একবারই দেখেছেন? দুইবার দেখেছি।আজও মনে হয় দেখবেন। দানে দানে তিন দান। আপনাকে কি আজি রাতেই মারবে?

মনে হয়।ভয় লাগছে? না।মরবার আগে কিছু খেতে ইচ্ছা করে? ইচ্ছা করলেই পাব কই? আপনে আইনা দিবেন? চেষ্টা করে দেখতে পারি। বলুন কী খেতে চান?মুরগি ছাদেক হেসে ফেলল। আমার শরীর কোপে গেল। আমি আমার জীবনে এত কুৎসিত হাসি দেখি নি।হিমু শুনেন। আমার সাথে আপনে অনেক বাইচলামি করেছেন। আমি মুরগি ইদেক। আমার সাথে বাইচলামি চলে না। এখন অফ যান।ঠিক আছে অফ গেলাম। আপনি অন হয়ে থাকেন।

Leave a comment

Your email address will not be published.