হলুদ হিমু কালো র‍্যাব পর্ব:০৩ হুমায়ূন আহমেদ

হলুদ হিমু কালো র‍্যাব পর্ব:০৩

কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। কিছু মশা আমার দিকেও উড়ে এসেছে। আমি মুরগি ছাদেকের মতো মাথা ঝাকিয়ে মশা তাড়িয়ে দিচ্ছি না। বরং পাথরের মূর্তির মতো বসে আছি। রক্ত নামক প্রোটিন স্ত্রী মশাদের জন্যে অতি প্রয়োজনীয়। এই প্রোটিন ছাড়া তারা তাদের গর্ভের ডিম বড় করতে পারে না।

আমি চুপ করে আছি। মশারা মহানন্দে রক্ত খেয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে উৎসবের উত্তেজনা। আমি একপর‍্যায়ে হা করে জিভ বের করে দিলাম। ছোট্ট একটা পরীক্ষা— মশারা জিভ থেকে রক্ত নেয় কি-না দেখা। মানুষের জিহ্বা, তাদের জন্যে অপরিচিত ভুবন। মশারা কি অপরিচিত ভুবনে পা রাখবে? নামি মানুষই শুধু অপরিচিত ভুবনে পা রাখার সাহস দেখায়।

এবং কৌতূহল। মানুষ বড়ই অদ্ভুত প্রাণী। মৃত্যুর মুখোমুখি বসেও তার চেতনায় বিস্ময় এবং কৌতূহল থাকে। পুরোপুরি কৌতূহলশূন্য সে বোধহয় কখনোই হয় না।হিমু! জি ভাইজান? জিহ্বা বাইর কইরা আছেন কী জন্যে?

আমি কারণ ব্যাখ্যা করলাম। মুরগি ছাদেকের চোখ থেকে কৌতূহল দূর হয়ে গেল, তবে বিস্ময় দূর হলো না। সে চাপা গলায় বলল, আপনি আজিব লোক।আমি বললাম, আমরা সবাই যার যার মতো আজিব। যে মশারা রক্ত খাচ্ছে তারাও আজিব।মুরগি ছাদেক বলল, কথা সত্য। আজিবের উপরে আজিব হইল ক্ষিধা। এমন ক্ষিধা লাগছে! কিছুক্ষণ পরে যাব। মইরা, লাগছে ক্ষিধা। চিন্তা করেন অবস্থা! কী খেতে ইচ্ছা করছে?

ডিমের ভর্তা দিয়া গরম ভার। পিঁয়াজ, কাঁচামরিচ আর সরিষার তেল দিয়া ঝাঁঝ কইরা ডিমের ভর্তা।ডিমের ভর্তা আপনার মা করতেন? হুঁ। ভাত খাওয়ার পরে একটা সিগারেট যদি ধরাইতে পারতাম।সিগারেটের সাথে পান? পানের দরকার নাই। পান খাই না।ডিম ভর্তা, গরম ভাত, সিগারেট? হুঁ।আর কিছু না?

না। আর কিছু না।খাওয়ার সাথে মিষ্টিজাতীয় কিছু লাগবে না? বিদেশে যাকে বলে ডেজার্ট।আপনে অফ যান।আমি তো অফ হয়েই ছিলাম। আপনি অন করেছেন। অন যখন করেছেন। আসুন কিছু গল্পগুজব করি।কী গল্প শুনতে চান? বিয়ে করেছেন? ছেলেমেয়ে কী? কাইল সকালে পত্রিকা খুললে সব সংবাদ পাইবেন। পত্রিকা পইড়া জাইনা নিয়েন।খারাপ বলেন নাই। ভালো বলেছেন। আজরাইল যে দেখেছেন সেই বিষয়ে বলেন। এদের গায়ে কি গন্ধ আছে?

ভালো কথা মনে করাইছেন। গন্ধ আছে। কড়া গন্ধ।কী রকম গন্ধ।ওষুধের গন্ধের মতো গন্ধ। মিষ্টি মিষ্টি কিন্তু কড়া। বড়ই কড়া। আর কথা না। চুপ।আমি চুপ হলাম।দরজার তালা খোলার শব্দ হচ্ছে। মুরগি ছাদেক গুটিয়ে গেল। তার চোখে এখন তীব্র ভয়। পেট দ্রুত উঠানামা করছে। দরজার বাইরে ঘামবাবুকে দেখা যাচ্ছে। তিনি আঙুল ইশারায় আমাকে ডাকলেন। আমি জিভ বের করে বসে ছিলাম। অ্যাক্সপেরিমেন্টের শেষ দেখার আগেই আমাকে উঠে যেতে হলো।

আবারো সেই ইন্টারোগেশন ঘর; সেই মধ্যমণি। তবে মধ্যমণি এখন অনেক স্বাভাবিক। তিনি স্যান্ডউইচ খাচ্ছেন। পাশে এক ক্যান কোক। স্যান্ডউইচে এক কামড় দেন। কোকের ক্যানে একটা চুমুক দেন। বাচ্চাদের মতো খাওয়া।ঘামবাবু আমাকে দেখিয়ে বললেন, ভেরি স্ট্রেঞ্জ ক্যারেক্টার স্যার। দরজা খুলে দেখি সে হা করে জিহ্বা বের করে বসে আছে।এমন একটা বিস্ময়কর ঘটনা শুনেও মধ্যমণির কোনো ভাবান্তর হলো না। তিনি স্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি চলে যান। Released. আমি বললাম, এত রাতে যাব। কীভাবে?

মধ্যমণি বললেন, রাত বেশি না। একটা দশ।একটা দশ অনেক রাত। এত রাতে বের হলে আপনাদের অন্য কোনো দল আমাকে ধরবে। একরাতে পার পর দুবার ধরা পড়া ঠিক হবে না। আমাকে গাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসেন।মধ্যমণি অবাক হয়ে বললেন, গাড়িতে করে নামিয়ে দিয়ে আসতে হবে?

জি। আর আপনারা আমার ছয় কাপের মতো কফি নষ্ট করেছেন। রাস্তায় ফেলে দিতে হয়েছে। দশ টাকা করে ছয় কাপ কফির দাম হলো ষাট টাকা।সেই ষাট টাকা দিতে হবে?

জি।

আর কিছু?

আপনারা মুরগি ছাদেককে ধরেছেন। তাকে রাতে ভাত খাওয়াতে হবে। গরম ভাত। সঙ্গে ডিমের ভর্তা। বেশি করে পিয়াজ মরিচ, সঙ্গে খাটি সরিষার তেল। এক আইটেমের খাওয়া। খাওয়া শেষ হলে একটা সিগারেট।মধ্যমণির ঠোঁটের কোনায় হাসির আভাস। ঘামবাবুর চোখেমুখে বিরক্তি।

উনি আমার বেয়াদবিতে বিরক্ত হয়ে চড় থাপ্পড় দিয়ে বসতেন। তাঁর সিনিয়ত অফিসার আগ্রহ নিয়ে আমার কথা শুনছেন বলে চড় থাপ্পড় দিতে পারছেন না। তবে তার হাত যে নিশপিশ করছে এটা বোঝা যাচ্ছে।মধ্যমণি বললেন, ছাদেককে ডিমের ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়াতে হবে কেন?

আমি বললাম, সে খেতে চেয়েছে। এবং আল্লাহপাক সেটা মঞ্জর করেছেন।আল্লাহপাক যদি মঞ্জর করে থাকেন তাহলে উনি পাঠান না কেন? বেহেশত থেকে ফেরেশতা দিয়ে সোনার খাঞ্জায় পাঠিয়ে দিলেই হয়।আল্লাহপাক সরাসরি কিছু করেন না। উসিলার মাধ্যমে করেন।তুমি সেই উসিলা?

আমি একা না। আপনিও উসিলা। আমি আপনাকে বলব, আপনি ব্যবস্থা করবেন। এই হলো ঘটনা। আচ্ছা ভালো কথা, হামবাবুর ছেলেকে কি খবর দেয়া হয়েছে? বিদেশে যে ছেলে থাকে তাকে? হামবাবুটা কে?

অজ্ঞান হয়ে যিনি পড়ে গেলেন তিনি। তাকে আমি হামবাবু ডাকি।মধ্যমণির দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। তিনি স্যান্ডউইচে কামড় দিতে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত দিলেন না। আমার দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললেন, উনার ছেলে যে বিদেশে থাকে এটা তুমি জানো কীভাবে?

অনুমান করেছি। আমার অনুমান শক্তি ভালো।

মধ্যমণি বললেন, ছেলের নাম কী বলে।

নাম বলতে পারব না।

অনুমান করে বলো।

অনুমান করেও বলতে পারব না। আমার অনুমান শক্তি এত ভালো না।মধ্যমণি আমাকে ষাটটা টাকা দিলেন। গাড়িতে করে আমাকে মেসে নামিয়ে দেবার হুকুম দিলেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার, মুরগি ছাদেকের জন্য ডিম ভর্তার ব্যবস্থা কি হবে?

তিনি জবাব দিলেন না। আমি বললাম, যদি তাকে খাবার না দেয়া হয় তাহলে আমার কোনো কথা নাই। যদি দেয়া হয় তাহলে আমার একটা আবদার আছে।মধ্যমণি কঠিন গলায় বললেন, তোমার আবার কী আবদার? তার খাওয়াটা আমি দেখতে চাই। দূর থেকে দেখব। কাছে যাব না।মধ্যমণি বললেন, Enough is enough. একে বিদেয় কর।আমাকে বিদায় করা হলো।

আজকের খবরের কাগজের প্রধান খবর–

শীর্ষসন্ত্রাসী মুরগি ছাদেক

ক্রসফায়ারে নিহত

গোপন খবরের ভিত্তিতে কাওরানবাজার এলাকা থেকে র‍্যাব সদস্যরা মুরগি ছাদেককে গত পরশু ভোর পাঁচটায় গ্রেফতার করে। তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হবার পর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। তার দেয়া তথ্যমতো গোপন অস্ত্ৰভাণ্ডারের খোঁজে র‍্যাব সদস্যরা তাকে নিয়ে গাজীপুরের দিকে রওনা হয়। পথে মুরগি ছাদেকের সহযোগীরা তাকে মুক্ত করতে র‍্যাবের প্রতি গুলিবর্ষণ শুরু করে। র‍্যাব সদস্যরা পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে।

এই সুযোগে গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে পালিয়ে যাওয়ার সময় ক্রসফায়ারে মুরগি ছাদেক নিহত হয়। তার মৃতদেহের সঙ্গে পীচ রাউন্ড গুলিসহ একটি পিস্তল পাওয়া যায়।মুরগি ছাদেকের বিরুদ্ধে এগারোটি হত্যা মামলাসহ একাধিক ছিনতাই, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের মামলা আছে।তার মৃত্যু সংবাদে এলাকায় আনন্দ মিছিল বের হয়।

এলাকাবাসীরা নিজেদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেন।আমি খবরটা মন দিয়ে পড়লাম। সবই ঠিক আছে, একটা শুধু সমস্যা। মুরগি ছাদেক পাঁচ রাউন্ড গুলি এবং পিস্তল নিয়ে র‍্যাবের সঙ্গে গাড়িতে বসেছিল? এত জিজ্ঞাসাবাদের পরেও কেউ বুঝতে পারে নি মুরগি ছাদেকের সঙ্গে গুলিভরা পিস্তল আছে? ইন্টারেস্টিং খবর আর কী আছে?

মহিলা সমিতিতে কারা যেন নতুন নাটক নামিয়েছে— পাবনবাবুর শেষ খায়েশ।মন্দ কী? সব মানুষের শেষ খায়েশ বলে একটা ব্যাপার থাকে। পবনবাবুর শেষ খায়েশ থাকতে পারে।অশ্লীলতার দায়ে মাইরা ফালামু ছবির প্রিন্ট জব্দ করা হয়েছে।অনেকের জন্যে দুঃসংবাদ। নিরিবিলিতে ঘরে বসে ভিসিআর-এ বিদেশী অশ্লীলতা দেখার চেয়ে দল বেঁধে হলে বসে দেশী অশ্লীলতা দেখার মজা অন্য।দেশরত্ন শেখ হাসিনার পুত্র জয়ের আগমণ।

ইন্টারেস্টিং খবর তো বটেই। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান রাজনীতি করবেন, আর শেখ হাসিনা চুপ করে বসে থাকবেন, তা হবে না। এবার হবে পুত্রে পুত্রে লড়াই। আমরা নিরীহ দেশবাসী মজা করে দেখব।পত্রিকা ভর্তি ইন্টারেস্টিং খবর। কোনটা রেখে কোনটা পড়ব? আজ ছুটির দিন বলে পত্রিকার সঙ্গে আছে সাহিত্য সাময়িকী। সাম্প্রতিক গদ্য-পদ্যের মধু মিলন পাঠ করা যাবে। একটা গল্প ছাপা হয়েছে আজাদ রহমান নামের এক লেখকের। গল্পের নাম–কোথায় গেল সিম কার্ড?

মনে হচ্ছে খুবই আধুনিক গল্প। গল্পকার নিশ্চয়ই হারিয়ে যাওয়া সিম কার্ডের রূপকে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদির কথা বলেছেন।বেশ কয়েকটা কবিতা ছাপা হয়েছে, এর মধ্যে একটা কবিতার নাম—–আড়াই বিঘা জমি।এই কবি অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের চেয়ে আধ বিঘা বড়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন দুই বিঘার কবিতা। ইনি লিখেছেন আড়াই বিঘার।

প্রতিটি সাহিত্যকর্ম মন দিয়ে পড়া উচিত। পড়া সম্ভব হবে না, কারণ পত্রিকা আমার না। পত্রিকা মেস ম্যানেজার জয়নালের। তার কাছ থেকে পাঁচ মিনিটের জন্যে ধার এনেছিলাম মুরগি ছাদেকের খবর পড়ার জন্যে।সাধারণত ছুটির দিনগুলিতে আমার কাজকর্ম থাকে সবচে বেশি। এই দিনটি আমি সামাজিক দেখা-সাক্ষাতের জন্যে রেখে দেই। আমার যে সব আত্মীয়স্বজন আমাকে দেখে মহাবিরক্ত হন। তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে যাই।

আজ কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না। হাত-পা এলিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে। ঘুম ঘুম চোখে শুয়ে থাকব। মাথার উপর ফ্যান ঘুরবে। একটা শীত শীত ভাব। গায়ে চাদর টেনে দিতে ইচ্ছা করছে, আবার করছে না, এমন অবস্থা। হাতের কাছে মজাদার কোনো বই থাকবে। ইচ্ছা হলো বই থেকে একটা দুটা পাতা পড়লাম। বইয়ের যে-কোনো জায়গা থেকে যে-কোনো দুটা পাতা।বইয়ের কথা থেকে মনে পড়ল চেঙ্গিস খান বইটা আনা হয় নি। চা এবং কফির ফ্লাঙ্ক নিয়ে এসেছি, কিন্তু চেঙ্গিস খান সাহেবকে রেখে এসেছি। খান সাহেবকে আনার জন্য র‍্যাবের হেড অফিসে যাওয়াটা কি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে?

চা-কফির ফ্লাঙ্কের মালিক বজলুকে খুঁজে বের করার একটা চেষ্টা চালাতে হবে। তাকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত তার ব্যবসা যেন চালু থাকে সেটা দেখতে হবে। চা-কফি বিক্রি বন্ধ হবে না। ফ্লাস্কভর্তি চা কফি নিয়ে বের হতে হবে। ছুটির দিনে ভালো বিক্রি হবার কথা।চা এবং কফি দুটাই সবচে ভালো বানান আমার বড় খালা মাজেদা বেগম। তার কাছ থেকে ফ্লাস্ক ভর্তি করে আনা যেতে পারে। আজ অনেক কাজ।ম্যানেজার জয়নালকে খবরের কাগজ ফেরত দিলাম। সে বলল, আজি দুপুরে কিন্তু মেসে খাবেন হিমু ভাই। ইমপ্রুভড ডায়েট।

আমি বললাম, মেন্যু কী? প্লেইন পোলাও, খাসির রেজালা আর দই।শুধু দাই? দই-মিষ্টি না? শুধু দই। দই-মিষ্টি দিলে পুষে না।গেস্ট অ্যালাউড? জি অ্যালাউড। পার গেস্ট একশ টাকা। আপনার গেস্ট আছে? দুইজন গেস্ট।অ্যাডভান্স টাকা দিতে হবে হিমু ভাই।অ্যাডভান্স টাকা আমি পাব কোথায়? আচ্ছা থাক আপনাকে দিতে হবে না। আমি জিম্মাদার। হিমু ভাই, কাগজে পড়েছেন মুরগি ছাদেককে র‍্যাব শেষ করে দিয়েছে? পড়েছি।

আমি তো প্ৰথমে বিশ্বাসই করি নাই। তারপর দেখলাম সত্যি। খুবই আনন্দ পেয়েছি। আমার হাতে টাকা থাকলে র‍্যাব ভাইদের একদিন ইমপ্রভড ডয়েট খাওয়ায়ে দিতাম। ডাণ্ড মেরে সব ঠাণ্ড করে দিচ্ছে। এই দেশে ডাণ্ডা ছাড়া কিছু হবে না। ঠিক বলেছি না? অবশ্যই ঠিক বলেছেন। আমাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে ডাণ্ডা। কারো বড় ডাণ্ডা কারো ছোট ডাণ্ডা। জয়নাল ভাই, বিদায়।দুপুরে কিন্তু চলে আসবেন। আপনি এবং দুইজন গেস্ট।

আমি মোটামুটি দুঃশ্চিন্তা নিয়েই বের হলাম। গেস্ট পাব কোথায়? ঝোঁকের মাথায় দুজন গেস্টের কথা বলেছি। একজনের নাম হালকাভাবে মাথায় আছে। বজলু। মনে হচ্ছে দুপুরের মধ্যে তাকে পেয়ে যাব। দ্বিতীয়জন পাব কোথায়? খুলাফায়ে রাশেদিনের সময় আমিরুল মুমেনিনরা খাবার সময় পথে বের হতেন। দুঃস্থজনদের নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসতেন।

আমিও সেরকম কিছু কি করব? দুঃস্থ কেউ এসে একবেলা প্লেইন পোলাও রেজালা খেয়ে যাক।মেসের মুখেই একজন ভিখিরি পাওয়া গেল। মুখভর্তি দাড়িগোঁফের জঙ্গল। মাথায় বেতের টুপি। তবে বলশালী চেহারা। উনার গানের গলা ভালো। চোখ বন্ধ করে মাথা বাকিয়ে বেশ আয়োজন করে গাইছেন–

দিনের নবি মোস্তফায়

রাস্তা দিয়া হাঁইটা যায়

ছাগল একটা বান্দা ছিল

গাছেরাও তলায়।

আমি গায়ক ফকিরের সামনে কিছুক্ষণের জন্যে থমকে দাঁড়ালাম। একবার মনে হলো যেহেতু প্ৰথম উনার সঙ্গে দেখা উনাকেই দাওয়াত দিয়ে দেই।ফকির চোখ মেলে গান থামিয়ে বলল, স্যার, আসসালামু আলায়কুম।ফকিররা সালাম দেয় না। তারা প্রথম সুযোগেই ভিক্ষা চায়। এর ঘটনা কী? ইমপ্রুভড ডায়েটের মতো ইমপ্রুভড ফকির?

ওয়ালাইকুম সালাম। ভালো আছেন? আপনার গানের গলা তো সুন্দর।গায়ক ফকির বিনয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।আপনার গানের কথায় সামান্য সমস্যা আছে, এটা জানেন? কী সমস্যা? আপনি বলছেন–ছাগল একটা বান্দা ছিল গাছেরাও তলায়। নবিজীর দেশে ছাগল পাওয়া যায় না। গানের কথা সামান্য চেঞ্জ করে দেন। ছাগলের জায়গায় বলেন দুম্বা। দুম্বা একটা বান্দা ছিল গাছেরাও তলায়।

গায়ক ফকির ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ফকিররা এমন দৃষ্টিতে কখনো তাকায় না। সমস্যাটা কী? ফকির সাহেব! জি স্যার।আপনি কি দুপুর পর্যন্ত এখানেই থাকবেন, না জায়গা বদলাবেন? ফকির চুপ করে আছে। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ।আপনি যদি দুপুর পর্যন্ত এখানে থাকে, তাহলে আমার সঙ্গে খানা খাবেন। ঠিক আছে? কী জন্যে? আপনি ভিক্ষুক মানুষ, আপনাকে খেতে বলেছি আপনি খাবেন। প্রশ্ন কিসের? দাওয়াত কি কবুল করেছেন?

ভিখিরি জবাব দিল না। তার ভাবভঙ্গি বলছে সে দাওয়াত কবুল করে নি। আমি হাঁটা দিলাম। একবার পেছনে তোকালাম। গায়ক ফকির গান বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এত দূর থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না, তারপরেও মনে হলো তার ভুরু এখনো কুঁচকানো।

মাজেদা খালা বললেন, অ্যাই, তোকে র‍্যাবে ধরেছিল নাকি? গভীর রাতে টেলিফোন। আমার তো কলিজা নড়ে গিয়েছিল। র‍্যাব তোকে কী করল? ছেড়ে দিল।মারধোর করে নাই? না।মারধোর করল না এটা কেমন কথা! পুলিশে ধরলেও তো মেরে তক্তা বানিয়ে দেয়। তোকে মারল না কেন?

আমি তো জানি না খালা। জিজ্ঞেস করি নি। তোমার কাছে জরুরি কাজে এসেছি। কাজটা আগে সারি। এই যে দুটা ফ্লাস্ক দেখছ, একটা ফ্লাস্ক ভর্তি করে চা বানিয়ে দেবে, আরেকটা ফ্লাস্ক ভর্তি কফি।খালা বললেন, র‍্যাব তাহলে ঠিকই বলেছিল, তুই ফেরিওয়ালা হয়েছিস। চা-কফি ফেরি করিস। প্রথমে আমি র‍্যাবের কথা বিশ্বাস করি নি। তুই সত্যি ফেরি করিস?

হুঁ।

কোথায় কোথায় যাস?

যেখানে মানুষের আনাগোনা সেখানেই যাই।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাস?

যাই।

গুড। তাহলে তুই আমাকে একটা কাজ করে দিতে পারবি। ইউ আর দি পারসন। ঘন ঘন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাবি। চোখ-কান খোলা রাখবি।কেন?

Leave a comment

Your email address will not be published.