হলুদ হিমু কালো র‍্যাব শেষ:পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

হলুদ হিমু কালো র‍্যাব শেষ:পর্ব

আমার মাজেদা খালার মতো মানুষের জন্যেই হয়তোবা কোরান শরীফে আল্লাহপাক বলেছেন– হে মানব সম্প্রদায়, তোমাদের বড়ই তাড়াহুড়া।জায়গাটা খালি। তারিখ ঠিক হবার পর হাতে লিখে দেয়া হবে। কনের নামের জায়গায় লেখা— মুসলমান নাম লায়লা। চৈনিক নাম হু-সি। কার্ডও বেশ বাহারি। বিশাল এক গোলাপ ফুটে আছে। গোলাপের উপর প্রজাপতি বসে আছে। প্রজাপতির পাখায় লেখা— শুভ বিবাহ।আমি হতভম্ব গলায় বললাম, কার্ড ছাপিয়ে ফেলেছ?

মাজেদা খালা বললেন, হঁ। অসুবিধা কী? কাজ এগিয়ে থাকল। তোর কয়টা কার্ড দরকার? আচ্ছা ঠিক আছে, আমি আপাতত একশ কার্ড রেখে যাচ্ছি। আরো লাগলে বলবি।তুমি যে কার্ড ছাপিয়েছ হু-সি জানে? অবশ্যই জানে। তাকে দেখিয়েছি। অ্যাই, তুই ঐ মেয়েটার সঙ্গে কৰে। রেস্টুরেন্টে খেতে যাবি? বিয়ের আগে তোদের মধ্যে ভালো আন্ডারাষ্ট্যান্ডিং হওয়া দরকার না? ভালো আন্ডারাষ্ট্যান্ডিং-এর জন্যে হু-সিকে নিয়ে একদিন রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। নতুন এক রেস্টুরেন্ট হয়েছে, নাম ভূত। সেখানে নাকি বয় বাবুর্চি র‍্যাবের পোশাক পরে থাকে। খাওয়া-দাওয়ার মাঝখানে ভূতের নৃত্য হয়। রেস্টুরেন্টের খরচ হিসেবে খালা দুই হাজার টাকা দিয়ে দিয়েছেন। বিল যেন হু-সি না দেয়। আমি দেই।

দুজনে এক কোনায় বসেছি। টেবিলে মোমবাতি জ্বলিয়ে দিয়ে গেছে। ক্যান্ডেল লাইট ডিনার। হু-সিকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুবই লজ্জা পাচ্ছে। সে বলল, আমার কাছে সবই স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে। কোনো কিছুই রিয়েল মনে হচ্ছে না। আমার কাছে মনে হচ্ছে সত্যিই আমাদের বিয়ে হচ্ছে।আমি বললাম, আসলে হচ্ছে না? জানি না। স্বপ্ন তো আর বাস্তবের মতো না। স্বপ্নে অনেক কিছু হয়ে যায়। এটা তো স্বপ্নই। স্বপ্ন? হ্যাঁ, স্বপ্ন এবং আমার জীবনে দেখা সবচে সুন্দর স্বপ্ন।হু-সি টেবিল থেকে ন্যাপকিন নিয়ে দুই চোখ ঢেকে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল।আমি কার্ড বিলি শুরু করলাম। প্রথম কার্ড দিলাম মেস ম্যানেজার জয়নালকে।জয়নাল চোখ কপালে তুলে বলল, আপনি বিয়ে করছেন? আপনি? মেয়ের দেশ কোথায়?

মেয়ে চাইনিজ।

কী বলেন এইসব? সে করে কী?

পা টিপা টিপি করে।

আপনার কথা তো কিছুই বুঝতেছি না। বিয়ে কবে?

এখনো ডেট হয় নাই।

আরে ঠিকই তো। কার্ডে তারিখ নাই। কিছুই নাই। ঘটনা তো কিছু বুঝতেছি না। হিমু ভাই।

আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।

আপনের সব কাজকাম এমন আউলাবাউলা। বিয়ে করতেছেন সেইটাও আউল। বিয়ের উকিল কে? উকিল মোক্তার সবই আমার বড়খালা।মেয়ে কি সত্যিই চাইনিজ? একশ পারসেন্ট খাঁটি চাইনিজ। সাপ খাওয়া চাইনিজ। বিয়েতে খাসির রেজালার পাশাপাশি সাপেরও একটা আইটেম থাকবে। সাপের ঝালফ্রাই। বেশ কিছু চাইনিজ গেস্ট থাকবে তো, তাদের জন্যে।

জয়নালকে স্তম্ভিত অবস্থায় রেখে আমি কার্ডের প্যাকেট নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। কার্ড যখন ছাপা হয়েই গেছে, বিলি করে দেই।খুঁজে খুঁজে ফ্লাওয়ারের বাড়ি বের করলাম। মাছের আড়তের পেছনের বস্তি। সামনে কাঠগোলাপের গাছ। টিনের ছাপড়া। দরজায় কটকটে লাল রঙ।কড়া নাড়তেই সে বের হয়ে এলো। হাসি হাসি মুখ। পান খাওয়া লাল ঠোট। হাত ভর্তি লাল-নীল কাচের চুড়ি। আমি কার্ডটা তার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললাম, বিয়ের দাওয়াত দিতে এসেছি।হতভম্ব ফ্লাওয়ার বলল, কার বিয়া?

আমার।

আপনে আবার কে?

আমার নাম হিমু।

আমি তো আফনেরে চিনি না।

আমাকে না চিনলেও আমার খালুকে তুমি চেন। ঐ যে দৈ মিষ্টি নিয়ে এক বুড়ো ভদ্রলোক এসেছিলেন! তুমি দুই গুণ্ডা দিয়ে মেরে তাকে তক্তা বানিয়েছ। মনে পড়েছে? তোমার দুই গুণ্ডা বন্ধুর জন্যেও দুটা কার্ড রাখ।ফ্লাওয়ার হাত বাড়িয়ে বাকি দুটা কার্ডও নিল।

আমি মধুর ভঙ্গিতে বললাম, এসো কিন্তু! ফ্লাওয়ার হাঁ করে তাকিয়ে আছে। সুন্দর বাঙালি মেয়ের মুখ। যামিনী রায় এই মেয়েকে দেখলে পান খেয়ে ঠোঁট লাল করা বঙ্গ ললনার ছবি এঁকে ফেলতেন।কার্ড দেয়ার লোক পাচ্ছি না। রাজমণি ঈশা খাঁ হোটেলের দারোয়ান ভাইকে একটা দিলাম। সে আনন্দের সঙ্গেই কার্ড নিল। বিড়বিড় করে বলল, ভাইসাহেব, আপনেরে কিন্তু চিনি নাই।আমি বললাম, ঐ যে এক ছেলে চা-কফি বিক্রি করতে এসেছিল। আপনি তাকে এক চড় লাগালেন। সে ফ্রাঙ্ক ফেলে দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেল।জি জি মনে পড়েছে।আসবেন কিন্তু বিয়েতে। আপনি আমার বন্ধু মানুষ।অবশ্যই যাব।

পুরনো বন্ধুত্বের স্মরণে আমরা দুজন কফিওয়ালার কাছ থেকে কফি খেলাম। দারোয়ান ভাই দাম দিলেন। আমি কফিওয়ালাকেও একটা কার্ড দিলাম।এক ভিক্ষুক এই সময় ভিক্ষা চাইতে এসেছিল। তাকে কফি খাইয়ে দিলাম। দাওয়াতের একটা কার্ড দিলাম।সে বলল, জিনিসটা কী? আমি বললাম, দাওয়াতের কার্ড। আমি বিয়ে করছি। আমার বিয়েতে আপনার দাওয়াত।ফকির বিস্মিত হলো না। এমনভাবে কার্ডটা বুলিতে রাখল যেন বিয়ের দাওয়াতের কার্ড পাওয়া তার জন্যে নতুন কিছু না। প্রায়ই পায়।

এখন আমি র‍্যাবের অফিসে। সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপাশে শুভ্রর বাবা হামবাবুকে দেখা যাচ্ছে। উনি তাহলে ফিরেছেন। চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। আমার দিকে চোখ পড়তেই উনি চোখ নামিয়ে নিলেন। আমি তিনজনকে তিনটা বিয়ের কার্ড দিলাম। অতি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, স্যার বিয়ে করতে যাচ্ছি। মেয়ে চাইনিজ। মেইনল্যান্ড চায়নার হুনান প্রদেশের মেয়ে। পরে হংকং-এ চলে যায়।তিনজনই গভীর মনোযোগে কার্ড পড়লেন। তিনজনই চুপচাপ। ইন্টারেস্টিং একটা বিয়ের কার্ড হাতে পেয়েও কেউ কিছু বলছে না–এটা বিস্ময়কর।

মধ্যমণি নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, তোমার চেঙ্গিস খান সাহেবকে পাওয়া গেছে। যাবার সময় নিয়ে যেও।আমি বললাম, স্যার ধন্যবাদ।আবারো নীরবতা। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে–Silence is golden. নীরবতা হীরন্ময়। প্রবাদটা সত্য বলে মনে হচ্ছে না। নীরবতা মাথার উপর চেপে বসেছে।মধ্যমণি আবারো নীরবতা ভঙ্গ করলেন। গলা খাকারি দিয়ে বললেন, তোমার মধ্যে আমাদেরকে নিয়ে রিডিকিউল করার একটা প্রবণতা লক্ষ করছি। Why?

আমি বললাম, আপনারা মানুষের জীবন নিয়ে রিডিকিউল করেন, সেই জন্যেই হয়তো।শুভ্রর বাবা বললেন, (তিনি আপনি আপনি করা কথা বলছেন) আপনি কেন আমাদের কর্মকাণ্ড সমর্থন করেন না বলুন তো? আপনার যুক্তিটা শুনি। আপনি কি চান না ভয়ঙ্কর অপরাধীরা শেষ হয়ে যাক? ক্যান্সার সেলকে ধ্বংস করতেই হয়। ধ্বংস না করলে এই সেল সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।আমি বললাম, স্যার, মানুষ ক্যান্সার সেল না। প্রকৃতি মানুষকে অনেক যত্নে তৈরি করে। একটা ভ্রূণ মায়ের পেটে বড় হয়। তার জন্যে প্রকৃতি কী বিপুল আয়োজনই না করে! তাকে রক্ত পাঠায়। অতি যত্নে তার শরীরের একেকটা জিনিস তৈরি হয়। দুই মাস বয়সে হাড়, তিন মাসে চামড়া, পাঁচ মাস বয়সে ফুসফুস। এত যত্নে তৈরি একটা জিনিস বিনা বিচারে ক্রসফায়ারে মরে যাবে–এটা কি ঠিক? পিশাচের আবার বিচার কী?

পিশাচেরও বিচার আছে। পিশাচের কথাও আমরা শুনব। সে কেন পিশাচ হয়েছে এটাও দেখব।শুভ্ৰর বাবা ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বললেন, আপনার জন্যে একটা দুঃসংবাদ আছে। আমার ধারণা, সুসংবাদ-দুঃসংবাদ আপনার কাছে কোনো ব্যাপার না। যে মেয়েটার নাম এই কার্ডে লেখা তাকে গতকাল রাত তিনটার সময় আমরা গ্রেফতার করেছি। মেয়েটির সঙ্গে আপনার খালা এবং আপনার ঘনিষ্ঠতার কথাও আমরা জানি। এই কার্ডের বিষয়ও আমাদের জানা। মেয়েটির পেছনে এবং আপনার পেছনে সবসময় লোক লাগানো ছিল।

আপনি অতি উদ্ভট একজন মানুষ। এর বাইরে আপনার বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। আপনার বান্ধবী হু-সি অবশ্যি বলেছে আপনি একজন মুঘুমি অর্থাৎ জাদুকর। হয়তোবা আপনি জাদুকর। কিন্তু আপনার বান্ধবী ভয়ঙ্কর অপরাধী।হু-সি কী করেছে? আন্তর্জাতিক হিরোইন চক্রের সে কেউকেটা টাইপ একজন। তার সঙ্গে প্রচুর হিরোইন পাওয়া গেছে। হিমু, আপনি কিছু বলবেন? আপনার কিছু বলার থাকলে বলুন। আমরা আপনার কথা শুনব।

জি বলব।

বলুন।

আপনার ছেলে শুভ্ৰকে আমি আমার বিয়ের একটা কার্ড পাঠাতে চাচ্ছিলাম। আপনি কি আমার হয়ে কার্ডটা পাঠাবেন?

অবশ্যই। দিন, কার্ড দিন।

আর কিছু বলতে চান?

না।

মধ্যমণি বললেন, তোমাকে একটা খবর দেই। মুরগি ছাদেককে গরম ভাত এবং ডিমের ভর্তা খাওয়ানো হয়েছিল। সে খুব আরাম করেই খেয়েছে।আমি বললাম, স্যার, আপনাকে ধন্যবাদ। অনেক ধন্যবাদ। তাকে একটা সিগারেট খাওয়ানোর কথাও ছিল।ঘামবাবু বললেন, আমি তাকে একটা সিগারেট নিজের হাতে দিয়েছি। আমি বললাম, পরকালে আপনি সত্তরটা সিগারেট পাবেন। সাড়ে তিন প্যাকেট। আরাম করে খেতে পারবেন। পরকালে কাৰ্ডিওভাসকুলার ডিজিজের সমস্যা নেই।

দ্রুত বিচার আইনে হু-সির তিন সহযোগীর প্রত্যেকের ফাঁসির হুকুম হলো। অল্প বয়স এবং মেয়ে হবার কারণে হু-সির হলো যাবজীবন।জেল হাজতে একদিন তাকে দেখতে গেলাম। আশ্চৰ্য, তার চেহারা কীভাবে জানি বাঙালি মেয়েদের মতো হয়ে গেছে। দেখে মনেই হয় না মেয়েটা বিদেশীনি। গায়ের রঙ সামান্য ময়লা হয়েছে, কিন্তু চোখ আগের মতোই উজ্বল।

আমি বললাম, কেমন আছ হু-সি?

সে মাথা নিচু করে বলল, ভালো আছি।

নিজের দেশের জন্যে মন কাঁদে।

না।

প্রিয়জনদের দেখতে ইচ্ছা করে? বাবা-মা, ভাই-বোন?

না।

কোনো কিছু খেতে ইচ্ছা করে?

না।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকো না। কিছু বলো।হু-সি মাথা নিচু করে বলল, আপনি প্রতিবছর জানুয়ারি মাসের ৯ তারিখ জেলখানায় আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন।জানুয়ারির ৯ তারিখ কেন? হু-সি চাপা গলায় বলল, ঐ দিনটা আমার জন্যে বিশেষ একটা দিন। ঐ দিন আপনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। আপনি আসবেন তো?

অবশ্যই।আপনার বড়খালাকে বলবেন যে, আমি তাঁকে মু কিন ডেকেছি। মু কিন হলো মা। আমরা চাইনিজরা কখনো নিজের মা ছাড়া কাউকে মু কিন ডাকি না।বলব।হু-সির চোখে এক বিন্দু অশ্রু টলমল করছে।আমি বুঝতে পারছি, সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে যেন এই চোখের পানি গড়িয়ে না পড়ে। সে চাইনিজ ভাষায় আমাকে কী যেন বলল। আমি বললাম, কী বললে বুঝতে পারি নি।সে বলল, আপনার বোঝার দরকার নেই।হু-সি চোখের পানি আটকে রাখতে পারে নি। অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়েছে গালে। সূর্যের আলো পড়ে ঝলমল করে উঠেছে হীরের দানার মতো। প্রকৃতি কত বিচিত্ৰভাবেই না তার সৌন্দর্য ছড়িয়ে রেখেছে!

Leave a comment

Your email address will not be published.