হিমুর নীল জোছনা পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

হিমুর নীল জোছনা পর্ব – ২

আমি বললাম, তিন মিনিটের মধ্যে তো খালু সাহেব বিদায় হতে পারব না। শুরুদেব নাশতা করবেন। দুকাপ চা খাবেন। চা খাবার পর তার পাইখানা ক্লিয়ার হবে। তারপর তিনি যাবেন। উনি আপনার ফ্ল্যাটে এসেছেন পাইখানা ক্লিয়ার করার জন্যে।

খালু সাহেবের হাত থেকে পত্রিকা পড়ে গেল। তিনি তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। তার চোখে আগুন দাউদাউ করছে। খালু সাহেব সাধু-সন্ন্যাসী পর‍্যায়ের কেউ হলে তার চোখের আগুনে আমি ভষ্ম হয়ে যেতাম। ভাগ্যিস তিনি সাধু সন্নাসী না। ইংরেজি খবর পড়া বাঙালি সন্তান, যার মাসে দুবার সিরিয়াস ডায়েরিয়া হয়।You get lost.

আমি মধুর ভঙ্গিতে হেসে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম।টেবিলে নাশতা দেওয়া হয়েছে। মাজেদা খালা এবং তাঁর নতুন কাজের মেয়ে হামিদ পাশেই দাঁড়িয়ে। মাজেদা খালার চোখে কৌতূহল। হামিদার চোখে ভয়। কাজের মেয়েরা কী কারণে জানি ভয় পেতে পছন্দ করে।

গুরুদেব টেবিলে বসে খাবারের উপর ঝাপিয়ে পড়লেন। মাজেদা খালা বললেন, চায়ের কাপে করলার রস। আগে করলার রস খান। গুরুদেব বললেন, করলার রুসের আমি কেঁথা পুড়ি।মাজেদা খালা এবং হামিদা মুখ চাওয়া-চাওয়ি পর্কের ভেতর দিয়ে গেল। কেঁথা পুড়ি রাবীন্দ্রিক ভাষার মধ্যে পড়ে না।

ছামাদ কাজের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বুয়া?

বুয়া এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, জে স্যার।

চুরি করুবা না খবরদার। কার্বুরেটর ঠিক রাখবা।

বুয়া চিন্তিত গলায় বলল, জে আচ্ছা রাখুম নে।

ঘরে পান আছে না?

জে আছে।

জর্দা দিয়ে পান রেডি রাখো।

মাজেদা খালা ফিসফিস করে বললেন, উনি কি দুপুরে খাবেন? দুপুরে খেলে উনার পছন্দোর খাবার তৈরি করতাম।আমি বললাম, অন্য কোনো দুপুরে এসে খেয়ে যাব। আজ উনি অনেক জায়গায় যাবেন। খালু সাহেবের গাড়িটা পাওয়া গেলে ভালো হতো। উনার মতো মানুষকে নিয়ে তো রিকশায় করে যাওয়া যায় না। দেখি কী করা যায়।

খালু সাহেব নতুন গাড়ি কিনেছেন—টয়োটা আলাফার্ডে না কী যেন নাম। নিশ্চয়ই দামি গাড়ি। কারণ এই গাড়ি বের করা হয় না। গ্যারেজে জামা গায়ে দিয়ে রাখা হয়। ড্রাইভার মজিদ সপ্তাহে দুইদিন গাড়ির গায়ে কী সব ক্রিম ঘষাঘষি করে।গুরুদেবকে নিয়ে আমি নিচে নামতেই খালু সাহেবের ড্রাইভার মজিদের সঙ্গে দেখা। আমি বললাম, মজিদ! উনাকে চিনেছ? মজিদ বলল, উনারে চিনব না!! কী বলেন হিমু ভাই। উনার গানের সিডিতে আমার গাড়ি ভর্তি।

মজিদ এগিয়ে এসে পা ছুয়ে কদমবুসি করল। আমি বললাম, নতুন গাড়িটা বের করো। আজ উনাকে নিয়ে ঘুরব। পত্রিকার অফিসে যেতে হবে। ইন্টারভিউএর কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না দেখা দরকার। টিভি চ্যানেলগুলির সঙ্গে কথা বলতে হবে। একটা টকশোর ব্যবস্থা যদি হয়ে যায়। চ্যানেলগুলিতে রান্নারও নানান অনুষ্ঠান হয়; সেখানে উনাকে সেলিব্রেটি হিসাবে উপস্থিত করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

রান্নার একটা অনুষ্ঠান বাংলার ভর্তা। সেখানে উনি একটা রেসিপি দিতে পারেন—কাঁচকলার খোসার ভর্তা } রান্নার ফাঁকে ফাঁকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে কথা বললেন।খালু সাহেবের দামি গাড়ি চলছে! আমি বসেছি। ড্রাইভারের পাশে। ছামাদ পেছনের সিটে আয়েসি ভঙ্গিতে বসা। গাড়িতে গান বাজছে। গুরুদেবের গান—

আহা আজি এ বসন্তে

ছামাদ বলল, ভাইজান, বিমানি গান না। হিন্দি ছাড়েন। শামসাদ বেগমের সিডি আছে? উনার একটা গান সঁইয়া দিলমে আনা রে নোবেল প্ৰাইজের যোগ্য। আজেবাজে জিনিস নোবেল পায়। ভালোটা পায় না; আফসোস।হিন্দি গানের ক্যাসেট খুঁজে পাওয়া গেল না। ইংরেজি খবরের কাগজ পড়ুয়া বঙ্গসন্তানরা হিন্দি গান শোনেন না। তাঁরা রবীন্দ্ৰ, অতুলপ্ৰসাদ, দ্বিজেন্দ্ৰ গীতিতে নিজেদের আটকে রাখেন।ভাইজান, আমরা কই রওনা দিলাম?

বুঝতে পারছি না। প্রথম যাচ্ছি কোনো একটা টিভি চ্যানেলের অফিসে। দেখি কিছু করা যায় কি না।আপনার মতলব তো বুঝতেছি না। মতলব খোলাসা করেন।আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, মতলব আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। দেখি কী হয়; প্রথম চেষ্টা টকশো।

ছামাদ বলল, জিনিসটা কী?

কথা বলার অনুষ্ঠান। কথা বলতে পারো তো?

এক বছর বয়স থাইকা কথা বলা ধরেছি। প্রথম কথা কী বলি শুনতে চান? চাই।বাপজানের কাছে শুনেছি। আমার প্রথম কথা—ঘাউ।ঘাউ কী? ছামাদ দুঃখিত গলায় বলল, জানি না কী। শিশুবয়সে কী ভাইব্যা বলেছি কে জানে। এখনো মাঝে মধ্যে চিন্তা করি–ঘাউ কেন বলতাম। ঘেউ বললেও বুঝতাম। কুকুরের ভাষা। ঘাউটা কী?

ছামাদ চোখ বন্ধ করল। মনে হয় ঘাউ কেন বলত তা-ই ভাবছে। আমি নিজেও চোখ বন্ধ করলাম। আমারও শৈশবে ফেরার চেষ্টা ।শৈশবে আমার প্রিয় বই ছিল মোহন সিরিজ। দস্যু মোহনের রোমাঞ্চকর কাণ্ডকারখানা। তার মানবসেবা। একটা বইতে পড়লাম দস্যু মোহনকে পদ্মার বুকে লঞ্চের ডেকে ধরা হলো। তাকে বস্তায় ভরে, বস্তার মুখ সেলাই করে পদ্মায় ফেলে লঞ্চ চলে গেল।

এর পরপরই লেখক লিখলেন, তাহার পরে কীভাবে কী ঘটিল কে জানে, দস্যু মোহনকে দেখা গেল পদ্মার পাড়ে বসিয়া হাসিমুখে চুরুট টানিতেছে।লেখক সম্ভবত দস্যু মোহনকে বস্তার ভেতর থেকে উদ্ধারের কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে কীভাবে কী ঘটিল কে জানের আশ্রয় নিয়েছেন।ছামাদের বিষয়েও আমি লিখতে পারি–কীভাবে কী ঘটিল কে জানে, ছামাদকে দেখা গেল পরিবেশ ও বনমন্ত্রীর সঙ্গে একটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতেছে।

এখনকার পাঠকরা অনেক সচেতন। কাজেই কীভাবে কী ঘটিল কে জানে-তে যাওয়া যাচ্ছে না। কীভাবে ঘটেছে তার ব্যাখ্যায় যেতেই হবে।ছামাদকে নিয়ে আমি একটি টিভি চ্যানেলের অফিসে ঢুকলাম। চ্যানেলের নাম দিচ্ছি না। তারা মামলা-মোকদ্দমা করে দিতে পারে। ধরা যাক টিভি চ্যানেলের নাম চ্যানেল আঁখি ।

রিসিপশনে এক ট্যারা সুন্দরী বসে আছে। চ্যানেলের মালিকরা তাদের সব আত্মীয়স্বজনকে চ্যানেলে চাকরি দেন। এই রূপসী ট্যারার অন্য কোথাও কিছু হচ্ছিল না বলেই মনে হয় এখানে কাজ পেয়েছে।ট্যারার কার দিকে তাকিয়ে কথা বলছে বােঝা কঠিন। তাদের সঙ্গে কথাবার্তার সময় জটিল অস্বস্তিতে থাকতে হয়। তরুণী আমাকে কিংবা ছামাদকে বিরক্ত মুখে বলল,আলাপচারিতা অনুষ্ঠানে এসেছেন?

আমি বললাম, জি ম্যাডাম। উনি এসেছেন, আমি স্যারের পিএ।এত লেট করেছেন! অনুষ্ঠান। মন্ত্রী মহােদয় বসে আছেন। অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। দর্শকরা সরাসরি টেলিফোন করছেন। এক্ষুনি চলে যান চার নম্বর স্টুডিওতে।আমি বললাম, চার নম্বর স্টুডিও তো চিনি না।রিসিপশনিস্ট বলল, আসুন আমার সঙ্গে।মহিলা ছুটতে ছুটতে যাচ্ছে, আমরাও তার পেছনে ছুটছি।এর মধ্যে মহিলা মোবাইল টেলিফোনে কাকে যেন বলল, সমুদ্র স্যার। উনি চলে এসেছেন। আমি নিয়ে যাচ্ছি। সিচুয়েশন আন্ডায় কনট্রোল।

স্টুডিওতে আমি ঢুকতে পারলাম না। বাইরে বসে রইলাম। যেখানে বসে আছি সেখানে এক বিশাল ফ্ল্যাটস্ক্রিন টিভি। টিভিতে দেখছি রূপবতী হাস্যমুখী এক উপস্থাপিকা। শুধু তার ঠোঁট কুচকুচে কালো। আজকাল কালো লিপষ্টিকের চল হয়েছে। দেখেই মনে হয় বিড়ি খাওয়া মহিলা। উপস্থাপিকার পাশে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়। উনি বেঁটে এবং স্থূলকায়। পায়জামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে মুজিবকোট পরেছেন। মুজিবকোট বঙ্গবন্ধুকেই মানায়। এই কোট বেঁটে এবং মোটারা পরলে তাদের লাগে পেঙ্গুইন পাখির মতো। মন্ত্রী মহোদয়ের পাশে হাস্যমুখী ছামাদ। বাকি ঘটনা নিম্নরূপ।

উপস্থাপিকা : যানজটের কারণে আমাদের একজন অতিথির অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে সামান্য বিলম্ব হয়েছে। তার জন্যে দর্শকমণ্ডলির কাছে আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অতিথির পরিচয় দিচ্ছি, তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশ বিজ্ঞানী ডা. সালাত হোসেন খান। কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত পরিবেশ।..

ছামাদ : ম্যাডাম, সামান্য মিসটেক হয়েছে। আমার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আপনি ইচ্ছা করলে আমাকে রবিদা বলতে পারেন।

[মন্ত্রী মহোদয় এবং উপস্থাপিকার মুখ চাওয়াচাওয়ি। উপস্থাপিকার মুখের হাসি নিভে গিয়েছিল, তিনি অতিন্দ্রকৃত সেই হাসি নিয়ে এলেন।]

উপস্থাপিকা : আপনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানে! কোন রবীন্দ্রনাথ?

ছামাদ : তালগাছ রবীন্দ্ৰনাথ। তালগাছ উঁকি মারে আকাশে। যদিও ইহা সম্ভব নহে। তালগাছের চক্ষু নাই। আপু, ঐ গানটা কি শুনেছেন—ও আমার চক্ষু নাই রে?

মন্ত্রী মহোদয় : What is happening? Who is this person?

ছামাদ : (মুখভর্তি হাসি। পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করতে করতে) আপু, এখানে কি বিড়ি খাওয়া যাবে? (মন্ত্রী মহোদয়ের দিকে বিড়ির প্যাকেট বাড়িয়ে) স্যার, একটা টান দিয়া দেখেন মাথায় কেমুন চক্কর দেয়।

(রিং বাজছে)

উপস্থাপিকা : (এখনো মুখভর্তি হাসি) দর্শকদের একজন টেলিফোন করেছেন। ভাই, আপনি আপনার বাসার টিভি সেটের সাউন্ড কমিয়ে দিন। এখন বলুন আপনার নাম কী?

দর্শক : নূরে আলম।

উপস্থাপিকা : আপনি কোত্থেকে টেলিফোন করেছেন?

দর্শক : মগবাজার।

উপস্থাপিকা : মগবাজার থেকে জনাব নূরে আলম টেলিফোন করেছেন। আপনি কার সঙ্গে কথা বলতে চান?

দর্শক : গুরুদেবের সঙ্গে।

রবিদা, ভালো আছেন?

ছামাদ : ভালো আছি।

দর্শক : আপনি রিয়েল না ফলস?

ছামাদ : (বিড়ি ধরানোর চেষ্টা করছেন বলে জবাব দিতে পারছেন না।)

মন্ত্রী মহোদয় : প্রচার বন্ধ হচ্ছে না কেন?

দর্শক : রবিদা, আপনার পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল কেন?

ছামাদ : ভাই, চটিজুতা খরিদ করতে পারি নাই। এখান থেকে বের হয়ে খরিদ করব ইনশাল্লাহ।

মন্ত্রী মহোদয় : অনুষ্ঠান এক্ষুনি বন্ধ করা প্রয়োজন। সমুদ্র কোথায়? সমুদ্র।

ছামাদ : স্যার সমুদ্র কক্সবাজারে। এখানে সমুদ্র কই পাবেন!

উপস্থাপিকা : (মুখের হাসি আরো বিস্তৃত) কারিগরি ত্রুটির কারণে আলাপচারিতা অনুষ্ঠানটি এখন প্রচার করা যাচ্ছে না বলে আমরা দুঃখিত। দর্শকদের জানাচ্ছি শুভেচ্ছা।

অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ হয়ে গেল। শুরু হলো ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠানের ফিলার। কাকতালীয়ভাবে সেই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে নাচ হচ্ছে। বর্ষার গান—আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে। নাচছেন অভিনেত্রী তানিয়া। ছবির নাম নয় নম্বর বিপদ সংকেত।

আমি মুগ্ধ হয়ে নাচ দেখছি। ঘরে পাঞ্জাবি পরা এক লোক ঢুকেছেন। তিনি ক্ষুব্ধ গলায় বলছেন, রবীন্দ্রনাথকে কে নিয়ে এসেছে খুঁজে বের করো। স্যাবোটাজ হয়েছে। বিরাট স্যাবোটাজ। পুলিশে কি খবর দেওয়া হয়েছে? চারদিকে ছোটাছুটি হচ্ছে। এখন আর চ্যানেলের অফিসে থাকা সমীচীন নয় বলে কেটে পড়ার প্রস্তুতি নিলাম। য পলায়তি স জিবতী।কেটে পড়া সম্ভব হলো না। রিসিপশনের মেয়েটি বলল, আপনি রবীন্দ্ৰনাথ ঠাকুরের পিএ না? জি।আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

ম্যাডাম চলে যাচ্ছি। গুরুদেবকে রেখে গেলাম। টকশোতে সামান্য ঝামেলা হয়েছে। তাতে সমস্যা নেই, অন্য যে-কোনো অনুষ্ঠানে তাকে ঢুকিয়ে দিতে পারেন। আপনাদের একটা অনুষ্ঠান আছে না— জাপানি রান্না? শুরুদেব জাপানি রান্নায় আগ্ৰহী। তাঁর একটা বই আছে জাপান যাত্রীর পত্র, সেখানে…

কথা বলবেন না। এবং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে। পুলিশ আসছে। আপনারা দুজনই থানায় যাবেন।আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, ম্যাডাম কাজটা কি ভালো হবে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রেফতার—শুনতেও খারাপ। আপনাদের চ্যানেলে গ্রেফতার হয়েছেন এটা আপনাদের জন্যে ব্যাড় পাবলিসিটি।

কথা শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ চলে এল। আমাদের তিনজনের স্থান হলো ধানমণ্ডি থানার হাজতে। আমি, ছামাদ এবং খালু সাহেবের ড্রাইভার মজিদ। মজিদ হতভম্ব। এটাই নাকি তার প্রথম হাজত খাটা।মজিদ বারবার বলছে, আমারে কেন পুলিশ ধরল! আমি করেছি। কী? আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমার বাবা ভুরুঙ্গামারীতে যুদ্ধ করেছেন।ছামাদ বলল, ভুরুঙ্গামারী জায়গাটা কোথায়? মজিদ বিরক্ত গলায় বলল, আমি জানব কীভাবে?

যুদ্ধ তো আমি করি নাই। আমার বাবা করেছেন।আপনার বাবা যেখানে যুদ্ধ করেছেন সেখানে আপনি যাবেন না? দেখে আসবেন না? আপনার তো কার্বুরেটর ঠিক নাই।আমার আবার কার্বুরেটর কী? আমি গাড়ি নাকি? আপনি রবীন্দ্রনাথ হয়েছেন বলে যা মন চায় বলবেন? আমি যে-কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি। এই গুণটি আমি ছামাদের মধ্যেও দেখলাম। দেয়ালে হেলান দিয়ে সে নির্বিকার ভঙ্গিতে বিড়ি টানছে। মজিদ অস্থির। সে হাঁটাহাঁটি করছে। একটু পরপর বলছে, কী করি কন তো?

পুলিশ কনস্টেবলদের একজন পুরোপুরি বিভ্রান্ত। লোহার গরাদের ফাঁক দিয়ে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। চলে যায় আবার আসে। এক পর‍্যায়ে সে নিজের কৌতূহল সামলাতে না পেরে আমাকে বলল, দাড়িওয়ালা উনার পরিচয় কী? আমি বললাম, উনার নাম রবীন্দ্ৰনাথ।বিশ্বকবি?

হুঁ।উনার মতো মানুষ হাজতে। কী অবস্থা! তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একবার দেখলাম সব বিশিষ্টজন গ্রেফতার। হাসিনা আপা, খালেদা ম্যাডাম। এখন বিশ্বকবি হাজতে। উনি করেছেন কী? অভিযোগ এখনো তৈরি হয় নাই। টিভি চ্যানেলে হামলা জাতীয় কিছু হবে।উনি বিড়ি টানতেছেন দেখে মনটা দেওয়ানা হয়েছে। সাধারণ কেউ তো না। বিশ্বকবি। জিজ্ঞেস করেন তো উনি চা খাবেন কি না।

আপনি নিজেই জিজ্ঞেস করুন।

পুলিশ কনস্টেবল বিনীত গলায় বলল, কবি সাব, চা খাবেন? চা এনে দেই?

ছামাদ তার দিকে তাকিয়ে বলল, ঘাউ।

পুলিশ কনস্টেবল লাফ দিয়ে সরে গেল।

শুরু হল আমাদের হাজত বাস।

Leave a comment

Your email address will not be published.