হিমুর নীল জোছনা পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

হিমুর নীল জোছনা পর্ব – ৫

যেসব দর্শক কিছুক্ষণের জন্যে হলেও প্রোগ্রামটি দেখেছেন তারাও মন্ত্রী মহোদয়ের মতোই বিভ্ৰান্ত।মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন। এটি বিরোধীদলের স্থূল ষড়যন্ত্র। জনতার কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমাতেই এই সাজানো নাটকের আয়োজন করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, কথিত রবীন্দ্রনাথকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে রিমান্ডে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। রবীন্দ্ৰনাথ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। অনেক রাঘববোয়াল ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে।

এই প্রতিবেদক কথিত রবীন্দ্ৰনাথের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে জানেন পুলিশের কাস্টডিতে এমন কেউ নেই। ওসিকে সাময়িকভাবে ক্লোজ করা হয়েছে। পুলিশের আইজি জানিয়েছেন, পুলিশের দিক থেকে কোনো অবহেলা হয়ে থাকলে দায়ী ব্যক্তি কঠোর শাস্তি পাবে।

চ্যানেল আঁখি কর্তৃপক্ষের কেউ টেলিফোন ধরছেন না। চ্যানেল আঁখির মুখপাত্র হিসেবে ভাসান খান বলেছেন, ব্যাপারটা ক্ষুদ্র ভুল বুঝাবুঝি। জনৈক অভিনেতা রবীন্দ্রনাথ চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে ভুলক্রমে টকশোর প্রোগ্রামে চলে যান। ভুল ধরা পড়া মাত্র অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। ভাসান খানের কাছে নাটকের নাম এবং পরিচালকের নাম জানতে চাইলে ভাসান খান আমতা আমতা করতে থাকেন।প্রতিবেদক ব্যাপক অনুসন্ধান করেও এমন কোনো নাটকের সন্ধান পান নি।

বাংলাদেশ রবীন্দ্র গবেষণা পরিষদের প্রধান ড. হাকিমুল কবির বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ একজন বিশ্বকবি। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত তাঁর রচনা, এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। ভুল সুর এবং ভুল উচ্চারণে রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া বর্তমানে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চ্যানেল আঁখি এই ফ্যাশনের আগুনে বাতাস অতীতে দিয়েছে। এখনও দিচ্ছে। রবীন্দ্রনাথকে কেন টকশোতে আনা হলো এর পেছনের উদ্দেশ্য জাতি জানতে চায়। রবীন্দ্র গবেষণা পরিষদ পুরো ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছে।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে দেশের বুদ্ধিজীবীরা আগামীকাল মানব বন্ধনের কর্মসূচি দিয়েছেন। কাগজে মন্ত্রীমহোদয়ের সঙ্গে কথিত রবীন্দ্রনাথের একটি ছবি ছাপা হয়েছে। ছবিটা প্রচারিত অনুষ্ঠান থেকে নেওয়া। ছবিতে দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্ত্রী মহোদয়কে এক পুরিয়া গাঁজা নিতে সাধাসাধি করছেন। এরকম খবর ছাপা হওয়ার পর হৈচৈ পড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক; আমি হাত থেকে কাগজ নামাতে নামাতে বললাম, লাগ ভেলকি লাগ।কেয়া বলল, মামা! আমাদের কি জেল হয়ে গেছে?

আমি বললাম, সেরকমই মনে হচ্ছে।খেয়া বলল, আমরা পাপ করেছি। এইজন্যে আমাদের জেল হয়েছে। পাপ করলে জেল হয়।কেয়া বলল, পাপ করলে ফাঁসিও হয়। মামা, আমাদের ফাঁসি হবে না তো? সম্ভাবনা কম।খেয়া বলল, ফাঁসি হলে জিভ এরকম বের হয়ে থাকে। তাই না মামা?

খেয়া মুখ থেকে জিভ বের করে দেখাল। কেয়া বলল, হয় নাই। এরকম।খেয়া বলল, না এরকম। আমি দেখেছি তো।কেয়া বলল, আমিও তো দেখেছি।আমি বললাম, কোথায় দেখেছ? খেয়া বলল, বলব না। বললে আল্লা পাপ দিবে।আমি বললাম, থাক তাহলে বলার দরকার নাই।

কেয়া-খেয়া চুপ করে আছে। চুপ না থেকে অবশ্যি উপায়ও নেই। কারণ দুজনের জিভ মুখ থেকে বের করা। ফাঁসির পর জিভের অবস্থার প্রদর্শনী। আমি বড় ধরনের রহস্যের সন্ধান পাচ্ছি। রহস্যের জট খোলার হলে খুলবে। তাড়াহুড়া করলে আন্ধা গিট্টু লেগে যাবে। আল্লাপাক এইজন্যেই বলেন, হে মানব সন্তান তোমাদের বড়ই তাড়াহুড়া।আমি কাগজ পাঠে মন দিলাম। বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রলীগ তাদের বিজয় কেতন উড়িয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষক লীগ এখনো পথে নামে নি, তবে নেমে যাবে। একটা খবরে যথেষ্ট পুলকিত বোধ করলাম। আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগ মিলিয়ে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে পাঁচটা রাস্তা পাকা করে ফেলেছে। জনগণের দুঃখে কাতর হয়েই তারা কাজটা করেছে। কাজের টেন্ডার বাজারে ছাড়ার আগেই কাজ শেষ। টেন্ডারে যেহেতু কাজ তারাই পাবে, আগে করে ফেলতে কোনো সমস্যা নাই। বরং সুবিধা আছে। কাজ খারাপ হচ্ছে এই নিয়ে তদারকি করার কেউ নেই। তাদের পয়সাও খাওয়াতে হবে না।

নাজমুল হুদ এসেছেন। হাজাতের দরজা খুলে আমাকে তার কাছে নেওয়া হলো। আমার সঙ্গে কেয়া-খেয়া।ওসি সাহেব বললেন, এই বাচ্চা দুটা জিভ বের করে রেখেছে কেন? আমি বললাম, জানি না স্যার।ওরা কি সবসময় জিভ বের করে রাখে? মিনিট দশেক আগে জিভ বের করেছে, তারপর থেকে আর ঢোকাচ্ছে না।ষ্ট্রেঞ্জ! এই তোমরা জিভ মুখে ঢোকাও।দুজন সঙ্গে সঙ্গে জিভ ঢুকিয়ে আবার বের করে ফেলল।

ওসি সাহেব চমৎকৃত হয়ে বললেন, চাইল্ড সাইকোলজি বোঝা কঠিন। আমার সাইকোলজি পড়ার শখ ছিল, কী মনে করে ইংরেজি পড়লাম। এই বাচ্চারা জিভ মুখে ঢোকাও। দুজনের জিভ চুকল এবং সঙ্গে সঙ্গেই বের হয়ে এল।ওসি সাহেব। আবারও বললেন, ষ্ট্রেঞ্জ। এখন তার চোখে রীতিমতো মুগ্ধতা। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, পুরো ব্যাপারটার একটা ভিডিও করে রাখলে কেমন হয়?

আমি বললাম, ভালো হয় স্যার। ওসি সাহেব খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, মোবাইল ফোনের ফালতু ভিডিও না। প্রফেশনাল ভিডিও; আমার শালাকে খবর দেই। সে প্যাকেজ নাটক বানায়। নাম হিরন্ময় কারিগর। ছদ্মনাম। ভালো নাম ছানাউল্লাহ। তার কোনো নাটক দেখেছেন?

আমি বললাম, জি-না স্যার।আমিও দেখি নাই। নাটক দেখার সময় কোথায়! চোর-ডাকাত আর সন্ত্রাসী দেখে সময় পাই না। আমার শালা বলেছে তার একটা নাটক ভালোবাসা দিবসে প্রচার হবে। নাটকের নাম ভালোবাসার তিন কাহন। তিনটা মেয়ে একটা ছেলেকে ভালোবাসে। শেষে ঠিক হয় লটারি হবে। লটারিতে যে মেয়ের নাম উঠবে সে-ই ছেলেটিকে বিয়ে করতে পারবে। বাকিরা দূরে সরে যাবে। লটারিতে তিনজনের নামই একসঙ্গে উঠে। নাটক এখানেই শেষ।আমি বললাম, তিনজনের নাম একই সঙ্গে কীভাবে উঠবে?

ওসি সাহেব বললেন, আমিও একই প্রশ্ন আমার শালাকে করেছিলাম। সে বলল, নাটকের এইটাই ক্লিক। পর্দায় দেখতে হবে। আচ্ছ, এই কন্যারা, জিভ ভেতরে।জিভ ভেতরে চলে গেল। তবে এবার আর বের হলো না। ওসি সাহেব বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। হতাশ গলায় বললেন, এদের সমস্যাটা কী? জিভ বের করছে না। কেন? এই জিভ বের করো। বের না করলে কঠিন শাস্তি।শাস্তির কথায় দুই কন্যার ভাবান্তর হলো না। তারা কঠিন মুখ করে বসে রইল। নাজমুল হুদ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কাগজ পড়েছেন?

আমি বললাম, জি স্যার।

কোনো বক্তব্য আছে?

আপনার জন্যে খারাপ লাগছে স্যার।

আমার জন্যে খারাপ লাগছে কেন?

আপনি সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। এইজন্যে খারাপ লাগছে।নাজমুল হুদের মুখে আনন্দের হাসি দেখা গেল। তিনি হঠাৎ এত আনন্দিত কেন বুঝতে পারছি না। ভদ্রলোকের হাবভাব যথেষ্টই বিস্ময়কর।তিনি আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে বললেন, আমরা পুলিশরা হচ্ছি কাকের মতো। কাকের মাংস কাক খায় না। পুলিশের মাংস পুলিশ খায় না। সাংবাদিকদের ঠান্ডা রাখার জন্যে বলা হয়-সাময়িক বরখাস্ত। এক থানার ওসি ক্লোজ হলে অন্য থানায় তাকে ওপেন করা হয়। এখন কি পরিষ্কার?

জি স্যার।দেশে নিউজের আকাল বলে নিউজ তৈরি করা হচ্ছে। এক ছাত্রলীগের নিউজ কত ছাপবে। কয়েকদিন রবীন্দ্ৰনাথের নিউজ ছাপা হবে। তারপর শেষ। আপনি খামাখা থানায় এসে ধরা খেয়েছেন কেন—এটাই তো বুঝলাম না।বাচ্চা দুটিার জন্য এসেছি স্যার। ওরা মিসিং চাইল্ড। ওরা জানে না। ওদের বাবা কোথায়। ওরা যে আমার কাস্টডিতে আছে। এটা রিপোর্ট করতে থানায় এসে ধরা খেলাম।ওসি সাহেব বললেন, ধরা খাওয়াখাওয়ির কিছু নাই। থানায় রিপোর্ট করে বাচ্চা নিয়ে চলে যান।রবি ঠাকুরুকে খুঁজে বের করবেন না?

না। অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অনেক মাতামাতি হয়েছে। আর না। বাচ্চা দুটা কোন ঠিকানায় আছে ভালোমতো লিখে রেখে চলে যান। আমি আমার শালাকে ক্যামেরা দিয়ে পাঠাব। সে জিভের ব্যাপারটা রেকর্ড করে ফেলবে। নাম মনে আছে তো? হিরন্ময় কারিগর।আমাকে ছেড়ে দিয়ে আপনি বিপদে পড়বেন না তো?

বিপদের মধ্যেই আছি। নতুন আর কী পড়ব।আপনি বললে আমি ছামাদ মিয়াকে খুঁজে বের করতে পারব।কোনো প্রয়োজন নাই। ইউ গোট লস্ট। ম্যাচের কাঠির আগুনকে দাবানল বানানোর কিছু নাই। সকাল আটটার সময় ডিরেকটিভ বাংলাদেশের সব থানায় থানায় চলে গেছে।

Catch poet Tagore

Dont misbehave

Handle With honour.

আমি চিন্তাই করতে পারছি না। কার মাথায় এরকম একটা ডিরেকটিভ দেওয়ার চিন্তা এসেছে। যান যান। আপনি ভাগেন। আরো কী আশ্চৰ্য, বাচ্চা দুটা আবার জিভ বের করে ফেলেছে। ভেরি ইন্টারেস্টিং ভেরি ইন্টারেস্টিং। এই তোমরা দুটা মিনিট বসো! কেক খেয়ে যাও।ওসি সাহেবের ওয়াকিটকি বেজে উঠেছে। তিনি রিভলভিং চেয়ারে ঘুরতে ঘুরতে কথা বলছেন।

না না। স্যাক্স। কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে আমি কথা বলব না। আপনি যদি প্রয়োজন মনে করেন, আমাকে ক্লোজ করে অন্য কোনো থানায় ওপেন করে দেন। তবে স্যার আমার ধারণা রবীন্দ্ৰ হাঙ্গামা থেমে যাবে। সাংবাদিকরা নতুন একটা নিউজ আইটেম পেয়েছে। এটা নিয়েই এখন তাদের মাতামাতি করার কথা। পড়েন নাই? এক পরিবারের সাতজনের অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু। আমরা সেফ সাইডে আছি। কয়েকদিন এইটা নিয়েই চলবে ইনশাল্লাহ।

কীভাবে আগুন ধরল, মৃত্যুর আগে কে কী বলল, এইসব ছাপা হতে থাকবে। খবরের কাগজের দোষ দিয়েও তো লাভ নাই স্যার। পাবলিক খবর চায়। এত খবর সাপ্লাই দিবে কীভাবে? ডিমান্ড বেশি সাপ্লাই কম। আমি স্যার সাবসিডিয়ারিতে ইকনমিক্স নিয়েছিলাম, সেখানে পড়েছিল অব ডিমিনিশিং রিটার্ন। আমি বেশি কথা বলছি? সরি স্যার। আর কথা বলব না। মুখ বন্ধ।

কেয়া-খেয়ার জন্যে পেস্ট্রি এসেছে। খেয়া চামচ দিয়ে ঠিকমতো খেতে পারছে না। ওসি সাহেব বললেন, চামচ, আমার কাছে দাও আমি খাইয়ে দিচ্ছি।কেয়া বলল, পুলিশ মামা! আমাকেও খাইয়ে দিতে হবে।ওসি সাহেব বললেন, নো প্রবলেম।দুজনেই হা করে আছে। ওসি সাহেব পালা করে ওদের মুখে পেন্ত্রি দিচ্ছেন।বসন্ত দাগওয়ালা এক ফাঁকে ঘরে ঢুকলেন, বিরক্তমুখে বললেন, কী হচ্ছে?

ওসি সাহেব বললেন, পেষ্ট্রি খাওয়া হচ্ছে।ধামড়ি দুই মেয়ে। এদের মুখে তুলে খাওয়াতে হবে কেন? স্যার আপনি মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ি করেন।ওসি সাহেব যথেষ্ট বাড়াবাড়ি করলেন। পেস্ট্রি পৰ্ব্ব শেষ হওয়ার পর কোক আনালেন। সেটাও গ্লাসে করে মুখে তুলে খাওয়ানো হলো।খেয়া বলল, পুলিশ মামা গল্প বলো।

ওসি সাহেব গল্প শুরু করলেন। ঠাকুরমার ঝুলির ডালিম কুমারের গল্প। কনস্টেবলরা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। একজন দুজন করে ঘরে ঢুকছে। বাংলাদেশের থানাগুলিতে অনেক কিছুই হয়, রূপকথার আসর কখনো বসে না।ওসি সাহেব হাত-পা নেড়ে গল্প বলছেন। শ্রোতার সংখ্যা বাড়ছে।ডালিম কুমার যাচ্ছে, যাচ্ছে, যাচ্ছে। তার হাতে তলোয়ার। সে চেপেছে ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়ার ক্ষুরে টগবগ শব্দ হচ্ছে…

Leave a comment

Your email address will not be published.