অবশ্যই রাজি হব! যে কোনো ছেলে এই ধরনের কথা বললে আমি রাজি হব।না, তা হবে না। রিকশাওয়ালা ছামছু বললে রাজি হবে না।রানু কঁদো কঁদো গলায় বলল, রিকশাওয়ালাকে আপনি টেনে আনলেন কেন? আপনিতো অদ্ভুত মানুষ।আমি বললাম, তুমি যখন রাজি হলে তখন ছেলেটা কি করল? রানু বলল, আপনাকে আর কিছুই বলব না। এতক্ষণ বক বক করেছি বলে নিজের উপর রাগ লাগছে। আমি আপনার সঙ্গে ফেরত যাব না। আলাদা রিকশা নিয়ে যাব! তাহলে বিদায়।রানু বলল, বিদায়। আপনি আমাকে যত্ন করে খাইয়েছেন, কোন একদিন সেটা আমি শোধ করব। যত তাড়াতাড়ি পারি করব। প্রমিজ।
রানু চলে গেল। আমিও রওনা হলাম। হাতে অনেক সময়। মাজেদা খালার সঙ্গে দেখা করা দরকার। মাজেদা খালার সঙ্গে দেখা করার পর হাসপাতালে চলে যাব। দেখে আসব পল্টু স্যারকে। হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি, কারণ হাত খালি। টাকা যা ছিল রানুকে দিয়ে দিয়েছি। তিন হাজার টাকা দেবার কথা। তারচে বেশিই দিয়েছি। কত বেশি বুঝতে পারছি না।ভারপেট খাওয়ার পর কড়া রোদে হাঁটার অন্য রকম মজা আছে। মনে হয় নেশা করে হাঁটছি। ছাতিম গাছের ফুলের গন্ধ শুকলে যে রকম নেশা হয় সে রকম নেশা।
মাজেদা খালা দরজা খুলে বললেন, তোর একি অবস্থা? মনে হচ্ছে ঘাম দিয়ে গোসল করেছিস। এক্ষুণি বাথরুমে ঢুকে পর। সাবান ডলে গোসল দে। তার আগে লেবুর সরবত করে দিচ্ছি। সরবত খা। ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে থাক, শরীর ঠাণ্ডা হোক।আমি ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে শরীর ঠাণ্ডা করতে লাগলাম। মাজেদা খালা ঘরের এসিও ছেড়ে দিয়েছেন। ঘর দ্রুত শীতল হচ্ছে; রোদে হাঁটার নেশা ভাবটা কেটে যাচ্ছে।
মাজেদ খালা সরবত নিয়ে এলেন। চিনির সরবত না, লবণের সরবত। প্রচুর ঘাম হলে এই সরবতই না-কি খাবার বিধান।তুই কি আমার কাছে কোনো কাজে এসেছিস? হুঁ।আমারো তাই ধারণা। ভর দুপুরে বিনা কাজে আসার মানুষ তুই না। কাজটা কি?বিশেষ একটা ধর্ম নিয়ে আমি গবেষণা করছি। তুমি এই বিষয়ে কি জান। তাই জানতে এসেছি।ধর্ম বিষয়ে আমি কি জানব। তোর খালু সাহেব জানতে পারেন। সে দেশে নেই। জাপান গিয়েছে।তুমি যা জান তাই শুনি।কি ধর্ম সম্পর্কে জানতে চাস? কক কক ধর্ম।
কক কক ধৰ্ম আবার কি? এই প্রথম এমন এক ধর্মের নাম শুনলাম।পল্টু স্যার যে কক কক শব্দ করে এই বিষয়ে জানতে চাচ্ছি।মাজেদা খালা বিরক্ত হয়ে বললেন, সহজ কথা সহজে বলতে পারিস না? আমি ভাবলাম কি-না কি ধর্ম।
আমি যতদূর জানি কক কক করার কারণে স্যারের বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল। এটা কি সত্যি? মাজেদা খালা বললেন, তোকে কে বলেছে? পল্টু ভাইজান বলেছেন? হুঁ। স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার বিয়ে করেন নি কেন? তখন বললেন।মাজেদা খালা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, কার সঙ্গে বিয়ের কথা হচ্ছিল, সেটা কি বলেছে? না।যাক, এইটুকু সেন্স তাহলে আছে। তোমার সঙ্গেই বিয়ে হতে যাচ্ছিল?
হুঁ। বিরাট বড়লোকের ছেলে, গাড়ি-বাড়ি এই সব দেখে বাবা রাজি হয়ে গেলেন। আর আমি নিজেও তাকে পছন্দ করতাম। পছন্দ করার মতোই মানুষ। বিয়ে করতে এসেছে। বরযাত্রীর সঙ্গে বসেছে। টেনশনের কারণে মনে হয় কিছু একটা হয়েছে— শুরু করল। কক কক।আমার বড় চাচা মিলিটারি কর্নেল। তিনি বললেন, জামাই কক কক শব্দ করছে কেন? সমস্যা কি?
পল্টু ভাইজান বড় চাচার হুংকারে আরো বেশি ভয় পেয়ে গেলেন। জোড়ে জোড়ে কক কক করতে লাগলেন। এত জোড়ে যে, ভেতর বাড়ি থেকে শুনা যায়। বিয়ে ভেঙে গেল।আমি বললাম, পল্টু স্যারের সঙ্গে তোমার বিয়ে হলে খারাপ হতো না। মানুষটা শুধু যে ভাল তা-না। অন্য রকম ভাল।মাজেদা খালা চাপা গলায় বললেন, জানি।আমি বললাম, উনার শোবার ঘরে তোমার যে একটা বঁধানো ছবি আছে এটা কি জান? নাতো।বয়সকালে তুমি যে কি রূপবতী ছিলে ছবিটা না দেখলে বিশ্বাস করাই মুশকিল। প্রথম কিছুদিন আমি চিনতেই পারিনি যে এটা তোমার ছবি।
মাজেদা খালা বললেন, তোর দায়িত্ব হচ্ছে আজই ছবিটা সরিয়ে ফেলা। অন্য লোকের স্ত্রীর ছবি তিনি কেন নিজের ঘরে রাখবেন। ছিঃ! আজ দিনের মধ্যে তুই ছবি সরাবি।আমি বললাম, এই কাজটা আমি করব না, খালা। বেচারার কিছুইতো নেই। থাকুক না একটা ছবি।মাজেদা খালা চট করে আমার সামনে থেকে সরে গেলেন। বুঝতে পারছি হঠাৎ তার চোখে পানি চলে এসেছে। প্রকৃতি মাঝে মাঝে মানুষকে এমন বিপদে ফেলে। চোখে পানি আসার সিস্টেম না থাকলে জীবন যাপন হয়তো সহজ হতো।
হাসপাতালের ৩১ নম্বর কেবিনে পল্টু স্যার হতাশ ভঙ্গিতে শুয়ে আছেন। তার গায়ে হাসপাতালের হাস্যকর সবুজ জামা। এই জামায় রোগীর সুবিধার জন্যে বোতাম থাকে না। পেছন দিকে ফিতা থাকে। হাতড়ে হাতড়ে সেই ফিতা বাঁধতে হয় বলে বেশির ভাগ সময় আন্ধাগিন্টু লেগে যায়। প্রয়োজনের সময় এই জামা খোলা যায় না। রোগীতো পারেই না, নার্সরাও পারে না।
পল্টু স্যারের হাতে টিভির রিমোট কনট্রল। তিনি তাকিয়ে আছেন টিভির দিকে। টিভি কিন্তু বন্ধ। ফিনাইল গন্ধমুক্ত হোটেলধর্মী হাসপাতাল। ইদানীং এই ধরনের হাসপাতাল বাংলাদেশে প্রচুর হচ্ছে। এই হাসপাতালগুলোর লক্ষ্য রোগীকে ফাইভ স্টার হোটেলের আনন্দে রাখা। চিকিৎসা অনেক পরের ব্যাপার। সমস্যা হচ্ছে রোগীরা চাচ্ছে চিকিৎসা। ফাইভ স্টার হোটেলে আরামে থাকতে চাইলে তারা ফাইভ স্টার হোটেলেই যেত। হাসপাতালে ভর্তি হতো না।
স্যার! টিভিতে কি দেখছেন? হিমালয়, সৰ্ব্বনাশ হয়ে গেছে। আমি চোখে অন্ধকার দেখছি। মহাসর্বনাশ।কি সৰ্ব্বনাশ হয়েছে? হাসপাতালে পড়ার জন্যে একটা প্যাকেটে বই আলাদা করে রেখেছিলাম। প্যাকেটটা ফেলে এসেছি। বই ছাড়া রাত কাটাবো কিভাবে? আমার ঝুলির ভেতর একটা গল্পের বই আছে। এতে কাজ চলবে?
পল্টু স্যার আনন্দিত গলায় বললেন, অবশ্যই কাজ চলবে। আমার বই হলেই চলে। কি বই সেটা কোনো ব্যাপার না।স্যার, আমি যে বইটা এনেছি তার নাম বিড়াল আমার সিমকার্ড দুধে ভিজিয়ে খেয়ে ফেলেছিল। অতি আধুনিক লেখা।পল্টু স্যার বললেন, সিমকার্ড বিড়াল দুধে ভিজিয়ে কিভাবে খাবে? কার্ডটা ধরবে কিভাবে? থাবা দিয়েতো কিছু ধরা যায় না।বিড়াল দাঁতে কামড় দিয়ে কার্ড ধরেছিল। সেই ভাবেই দুধের বাটিতে ড়ুবিয়েছে।
পল্টু স্যার বিস্মিত হয়ে বললেন, বিড়াল সিমকার্ড খায় এটাই জানতাম না। ছাগল সব কিছু খায় এটা জানি— আচ্ছা শোন, এটা কি হাসির বই? হাসির বই না, স্যার। খুব সিরিয়াস বই। পরাবাস্তবতা।পল্টু স্যার বললেন, অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আমার সমস্যা নাই। শুধু হাসির ব্যাপারগুলো নিয়ে সমস্যা। একটা জোকস-এর বই অনেক দিন আগে পড়েছিলাম।— কিছুই বুঝতে পারি নাই। তোমাকে একটা বলব? তুমি কিছু বুঝতে পার কি-না।
বলুন।এক প্রেমিক তার প্রেমিকাকে গাড়ি চালানো শেখাচ্ছে। প্রেমিকা ব্যাক ভিউ মিরর দেখিয়ে বলল, আয়নাটা এমনভাবে ফিট করেছে যে, মুখ দেখা যায় না। চুল ঠিক করতে পারছি না। প্রেমিক বলল, ঐ আয়নাটা পেছন দেখার জন্যে। তখন প্রেমিকা বলল, ছিঃ ছিঃ কমল ভাই। আপনি এত অসভ্য কেন? এই হল গল্প বুঝলে। এখন তুমি বল, ছেলেটা অসভ্যতা কি করেছে? সত্যি কথা বলার মধ্যে কোনো অসভ্যতা আছে?
জ্বি না।আমি গল্পটা নিয়ে অনেক চিন্তা করেছি। কিছুই বের করতে পারি নাই। আচ্ছা শোন, এমন কি হতে পারে যে প্রেমিক গাড়ি চালানো শেখাচ্ছে এটাই হাসির ব্যাপার? হতে পারে।আমিও তাই ভেবেছি। মেয়েটা গাড়ি চালানো শিখবে ড্রাইভিং স্কুলে ভর্তি হয়ে। কিংবা তাদের বাসার ড্রাইভারের কাছে। প্রেমিকের কাছে কেন?
যুক্তিযুক্ত কথা বলেছেন, স্যার।তারপরেও মেয়েটার আচরণ ঠিক না। সে ছিঃ ছিঃ করে উঠবে কেন? অবশ্যি মেয়েটার মেজাজ খারাপ। সে মুখ দেখতে পারছে না; মাথার চুল ঠিক করতে পারছে না। মেজাজ খারাপের কারণে সে ছিঃ ছিঃ বলেছে।স্যার, হতে পারে। আপনি বরং বই পড়ুন। কিংবা ঘুমিয়ে পড়ুন। আপনাকে দেখেই মনে হচ্ছে আজ। আপনার শরীর খারাপ।ঠিকই বলেছ। চোখ জ্বালা করছে। তুমি বইটা পড়ে শুনাও।আমি বই হাতে নিলাম। পল্টু স্যার আধশোয়া হয়ে আছেন। গভীর আগ্রহ নিয়ে পরাবাস্তব গল্প শুনছেন। তাঁর চোখে শিশুর মুগ্ধতা।
বিড়ালটা নাদুস নুদুস কিন্তু অন্ধ। আর জগৎ ধূসর। তার চোখ পিটপিট করে, কিন্তু সে দেখে না। তার সামনে দুধের কাটি। বাটিতে দুধ নেই। কিংবা ছিল, দুষ্ট বিড়াল দেখতে পায় নি। কারণ সে অন্ধ। প্রথম তার যখন চোখ ফুটিল, তখন তার মা বলল, ডার্লিং, দেখা কি সুন্দর পৃথিবী! সে পৃথিবী দেখে বিরক্ত হল, কি কুৎসিত তখন সে নিজে নিজে অন্ধ হয়ে গোল যে চোখে দেখে না, সে কথা বেশি বলে বিড়ালের মা তাকে একটা গ্রামীণ মোবাইল সেট উপহার দিল। সেখানে কোনো সিমকার্ড ছিল না।সে সিমকার্ড কিনতে গ্রামীণের সেলস সেন্টারে গেল।
সেলস সেন্টারের পরিচালক একজন তরুণী। তাঁর বয়স উনিশ। তিনি বৃশ্চিক রাশির জাতক। আজ তাড়াহুড়া করে এসেছেন বলে শাড়ি পরে আসতে পারেন নি। তার সুগঠিত স্তন ভোরের আলোয় ঝলমল করছে। তার স্তনযুগল দেখেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, অনাঘ্রাতা পুজার কুসুম দুটি। …সৌভাগ্যক্রমে রবীন্দ্রনাথও তখন একটা সিমকার্ড কিনতে এসেছিলেন। তার ইচ্ছা বিভিন্ন তরুণীদের তিনি টেলিফোন করে জানতে চাইবেন–সখী, ভালবাসা করে কয়?পল্টু স্যার বিস্মিত হয়ে বললেন, এখানে রবীন্দ্রনাথ কোত্থেকে এলেন?
আমি বললাম, পরাবাস্তব গল্পে সব কিছুই সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ হাফপ্যান্ট পরে বিড়ি ফুকতে ফুকতে চলে আসতে পারেন। নিউমার্কেট কাঁচা বাজার থেকে রাতা মুরগি এবং হিদল শুটকি কিনে তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে বলতে পারেন, ওগো মৃ মুরগির সালুন কর। হিদলের ভর্তা কর। আর আমাকে কাদের সিদ্দিকী সাহেবের গামছাটা দাও। পুকুরে একটা ড়ুব দিয়ে আসি।কাদের সিদ্দিকীর গামছা মানে?
পলিটিক্যাল গামছা, স্যার। টেকসই, সহজে রঙ যায় না।পল্টু স্যার বললেন, এসব কি বলছ? তোমাকে বই পড়ে শুনাতে হবে। না। তুমি বাসায় চলে যাও ঘুমাও।আমি রাতে হাসপাতালেই থাকব।ঘুমাবে কোথায়? ঘুমাব না। জেগে থাকব। কাল সারা রাত জেগেছিলাম, তার আগের রাতেও জেগেছিলাম।কেন? বাবার উপদেশ। বাবা বলে গেছেন— মাসে তিন দিন তিন রাত ঘুমাবি না। এক পলকের জন্যেও চোখের পাতা এক করবি না।পল্টু স্যার বললেন, কেন?
আমি বললাম, স্লিপ ডিপ্রাইভেশন হলে কিংবা মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব হলে— অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। আমার বাবা চাচ্ছিলেন যেন আমি এই সব ঘটনা দেখি।প্লটু স্যার বললেন, তাহলে আমিও তোমার মতো জেগে থাকব।সেটা খারাপ না। জাগরণে যায় বিভাবরী।পল্টু স্যার জেগে থাকার চেষ্টা প্রাণপণ করলেন বলেই মুহূর্তেই ঘুমিয়ে গেলেন। আমি জেগে রইলাম। মাঝে মাঝে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে; আমি বলি– এই চোখবাবারা জেগে থাকো; তোমরা দুজনই ভাল; দুজনই লক্ষ্মী সোনা চাঁদের কণা।
স্লীপ ডিপ্রাইভেশন এক ধরনের ঘোর তৈরি করে। বাস্তব জগৎ বিড়ালের সীমকার্ড খাওয়ার জগৎ হয়ে যায়। রিয়েলিটির সংশয় তৈরি হয়। যেমন শেষ রাতে আমার কাছে মনে হল কেবিনে একটা অন্ধ বিড়াল ঢুকেছে। সে ছোটাছুটি করতে গিয়ে খাটের পায়ার সঙ্গে বাড়ি খাচ্ছে এবং মিউমিউ করছে। কয়েকবার ঘনঘন চোখের পলক ফেলার পর বিড়াল অদৃশ্য হয়ে গেল। তবে সমস্যার সমাধান হল না। তখন দেখলাম খাটে মাজেদা খালা শুয়ে আছেন। পল্টু স্যার না।আমি বললাম, খালা, তুমি এখানে কেন?
খালা বললেন, তাতে তোর কোনো সমস্যা? আমি কি করব না করব তা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার।তুমিই তাহলে তোমার প্রভু? হেঁয়ালি কথা বন্ধ করবি? অন্ধ বিড়ালটা দেখেছ, খালা? নাতো।তোমার মোবাইলটা সাবধানে রাখ। বিড়াল অন্ধ হলেও দুষ্ট আছে। মোবাইল খুলে তোমার সিমকার্ড খেয়ে ফেলবে। কি সর্বনাশ! আগে বলবি না! দুনিয়ার নাম্বার আমার এই সিমকার্ডে। এটা খেয়ে ফেললে আমার গতি কি হবে?
স্লীপ ডিপ্রাইভেশনে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। ভোরবেলা ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের মধ্যে বাবাকে স্বপ্নে দেখলাম। বাটি ভর্তি গরম দুধ নিয়ে বসেছেন। পাউরুটি দুধে চুবিয়ে চুবিয়ে খাচ্ছেন।আমি বললাম, কি খাচ্ছ বাবা? বাবা বললেন, পাউরুটি খাচ্ছি। শরীরটা গেছে। সহজপাচ্য খাবার ছাড়া কিছু খেতে পারি না। অম্বল হয়। চোখ এ রকম পিটপিট করছ, কেন? চোখে কি কোনো সমস্যা? চোখে দেখি না।কবে থেকে দেখি না? দিন তারিখ ডায়েরিতে নোট করে রাখি নাই।খুব সমস্যা হচ্ছে?
না, খুব আরাম হচ্ছে। গাধা ছেলে! পরকালে মানুষ অন্ধ হয় এটা জানতাম না। আমার ধারণা ছিল পরকালে সবার চির যৌবন এবং… চুপ কর। কট কট করে কথা বলবি না। শান্তিমতো নাস্তা খেতে দে। খাটের উপর শুয়ে আছে। এই বুড়া কে? তুমিতো চোখে দেখ না। বুঝলে কি করে খাটে এক বুড়ো শুয়ে আছে? অনুমানে বুঝেছি। এই বুড়োর সমস্যা কি? উনার সমস্যা কিডনী। দুটা কিডনী। দুটাই অচল। আচ্ছা বাবা ভাল কথা এইসব ক্ষেত্রে মহাপুরুষদের ভূমিকা কি হবে? মহাপুরুষ কি তৎক্ষণাৎ নিজেরটা দিয়ে দেবেন? না।না কেন?
মহাপুরুষদের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাদেরকে বেঁচে থাকতে হবে। ভাল খাওয়া-দাওয়া, শান্তির নিদ্রা তাদের প্রয়োজন।বাবা, তুমিতো একেক সময় একেক কথা বল।বাবা চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, ঠিকই ধরেছিস। অন্ধ হবার পর থেকে কথা খানিকটা এলোমেলো হয়ে গেছে। যাই হোক, তুই শাত্তিতে ঘুমে। তিনবার বল ঘুম শান্তি, ঘুম শান্তি, ঘুম শান্তি আরামের ঘুম হবে।
আমি তিনবার ঘুম শান্তি বললাম। সারাজীবন শুনেছি। ওম শান্তি এখন শুনছি, ঘুম শান্তি। সমস্যা নেই, আমার ঘুম দিয়ে কথা। লাশকাটা ঘরের শান্তিময় জীবনানন্দ স্টাইলের নিদ্ৰা।আমার ঘুম ভাঙল এক বুড়োর কথাবার্তায়। পল্টু স্যারের সঙ্গে এই বুড়ো হষিতম্বির ভঙ্গিতে কথা বলছে। গলা মিষ্টি। বিশেষ ভঙ্গিতে কৰ্কশা করার চেষ্টা চলছে। কৰ্কশ হচ্ছে না। যে কথা বলছে সে সংগীতশিল্পী হলে নাম করত।মেঝেতে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। এ কে? তোমার সার্ভেন্ট? কোয়ার টেকার। নাম হিমু।যে সর্ভেন্ট তাকে সার্ভেন্ট বলধে। কেয়ার টেকার আবার কি?
সার্ভেন্ট শুনতে খারাপ লাগে।খারাপ লাগার কিছু নাই! যে যা তাকে তাই বলতে হবে। নিয়ত এরা মাথায় উঠবে। এর নাম কি? হিমালয়।বা-বা নামের তো বিরাট বাহার। নয়টা বাজে, এখনো শুয়ে ঘুমাচ্ছে— এই শোন, এই।আমি চোখ মেললাম। ঘুম আগেই ভেঙেছিল। এখন চোখ পিটপিট করছি। বুড়োকে দেখছি। সৌম্য চেহারা। দাড়ি আছে।
পরেছেন নীল রঙের আছকন। হাতে বাহারী ছড়ি থাকার কারণে— নাটকের সমাট শাহজাহানের মত লাগছে।ভদ্রলোক বললেন, তোকে রাখা হয়েছে রুগীর সেবা করার জন্য। আর তুই হা করে ঘুমাচ্ছিস।আমি বললাম, সরি।খবরদার, আর কোনোদিন সরি বলবি না। চাকর-বাকরের মুখে সরি থ্যাংকযু্য এইসব মানায় না। আর শোন, তোকে হিমালয়, কাঞ্চনজঙ্ঘা। এসব ডাকতে পারব না। এখন থেকে তোর নাম আবদুল। বুঝেছিস?
বুঝেছি স্যার আমি পল্টুর আপনি চাচা।চাচা স্লামালিকুম।আমাকে চাচা ডাকবি না। তোর সঙ্গে আমার আত্মীয়তা নাই। আমাকে ডাকবি স্যার।ইয়েস স্যায়।চিৎকার করে ইয়েস স্যার বলবি না, তুই মিলিটারিতে ঢুকস নাই। বন্দপুলা।চাকরদের স্টাইলে অর্থহীন হাসি দিলাম। বাড়ির দামি কোনো কাচের জিনিস ভাঙলে চাকর এবং বুয়ারা যে রকম হাসি দেয়। সেই হাসিতে লজ্জা থাকে, অপ্রস্তুত ভাব থাকে। কঠিন হাসি।
বৃদ্ধ বললেন, আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি। রোগীকে তার বাসায় নামিয়ে দিব। তুই হাসপাতালের অফিসে যা। রিলিজের বিষয়ে কি করতে হবে খোঁজ নে।আমি ঘর থেকে বের হতে হতে শুনলাম পল্টু স্যার বললেন, চাচা, তুই তুই করে বলছেন কেন? বুড়ো খেঁকিয়ে উঠে বলল, তুই করব নাতো কি আপনি আপনি করে কোলে বসাব? পাটু শোন, ছোট জাতকে ছোট জাতের মতো রাখতে হয়। আদর দিলে। লাফ দিয়ে মাথায় উঠে। মাথায় উঠেই ক্ষ্যান্ত হয় না। মাথায় হেগে দেয়? মাথায় হেগে দিবে কেন?
তাদের স্বভাব হাগা। এই জন্যে হাগবে।জটিল এই বৃদ্ধ সম্পর্কে পরের কয়েক দিন যা জানলাম তা হচ্ছে— এই বৃদ্ধের নাম আবদুস সাত্তার। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। টিকাটুলিতে তার চেম্বারা। চেম্বারের নাম শেফা ক্লিনিক। নিচে লেখা ধনন্তরি হোমিও চিকিৎসক, এ সাত্তর MC. MR. PL (ডাবল স্বর্ণপদক প্রাপ্ত)।
ধনন্তরি বানান ভুল। MC. MR. PL এ কি হয় তা জানা যায় নি। আমি উনার ক্লিনিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি চশমার ফাফ দিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, তুই চাকর, তুই থাকবি চাকরের মতো তুই MC র বুঝবি কি? আর তুই এখানে এসেছিস কেন? আমার চেম্বারে তোর দরকার কি? স্যারের জন্যে ওষুধ নিতে এসেছি। উনার ঘুম কম হচ্ছে। হোমিওপ্যাথিতে ঘুমের ওষুধ আছে?
গাধার মতো কথা বলবি না। এমন ওষুধ আছে, এক ফোটা খাওয়ায় দিলে হাতি সাত দিন ঘুমাবে।আমি মুখ শুকনা করে বললাম, হাতিরা কি আপনার কাছ থেকে অযুদ্ধ নেয়?আব্দুস সাত্তার বেশ কিছুক্ষণ। হতভম্ব ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে তাঁর এসিসটেন্টকে বললেন, এই গান্ধটাকে কানে ধরে চেম্বার থেকে বের করে দাও। আর কোনো দিন যদি দেখি এই বন্দটা আমার চেম্বারে ঘুরঘুর করছে, তাহলে সবার চাকরি যাবে।
আব্দুস সাত্তার সাহেবের সম্পর্কে আর যা জানলাম তা হল–তার একটাই ছেলে। ছেলের নাম সোহাগ। বয়স আঠারো-উনিশ, এলাকার ক্যারাম চ্যাম্পিয়ন; প্রতি বোর্ড বিশ টাকা বাজিতে সারাদিন ক্যারাম খেলে। সন্ধ্যার পর বাজি জেতা টীকায় ফেনসিড়িল খেয়ে বিম ধরে থাকে। তার ফেনসি বন্ধুদের নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ছোটখাট ছিনতাই করে। ভদ্র ছিনতাই।
যেমন— কোনো বৃদ্ধ সন্ধ্যার পর রিকশা করে বাড়ি ফিরছে। তখন সোহাগ চেঁচিয়ে বলবে, এই যে মুরুব্বী! আপনার কি যেন পড়ে গেছে। তখন রিকশা থামে। বৃদ্ধ কি পড়ে গেছে দেখার জন্যে পেছনে তাকান। সোহাগ তখন একটা মানিব্যাগ হাতে এগিয়ে আসে। এবং অতি বিনয়ের সঙ্গে বলে, মুরুত্ববী। এই মানিব্যাগটা পড়েছে। এটা কি আপনার? ব্যাগ ভর্তি টাকা।
বেশির ভাগ বৃদ্ধরাই বলে, হ্যাঁ বাবা, আমার। আল্লাহ তোমার ভাল করুক।মানিব্যাগে কত টাকা আছে বলতে পারেন? বাবা, গনা নাই। বুড়ামিয়া! দুই দিন পরে কবরে যাবেন— লোভ আছে। ষোল আনা। অন্যের ব্যাগ বলতেছেন নিজের! বাবা, ভুল হয়েছে। অন্ধকারে বুঝি নাই। আমার মানিব্যাগ পকেটেই আছে।দেখি। পকেটের মানিধ্যাগ দেখি।
