এর মধ্যে দলের বাকিরা এসে রিকশা ঘিরে দাঁড়ায়। একজনের হাতে সুন্দর কাজ করা রাজস্থানী ছুরি। এই ছুরির বিশেষত্ব হচ্ছে এমিতে দেখলে মনে হবে লতা ফুল আঁকা ছয় ইঞ্চি ধাতুর স্কেল। বোতাম টিপলেই খটাস শব্দে ছুরি বের হয়ে আসে। ছুরির মাথা বকের ঠোঁটের মতো সামান্য বাঁকা। বৃদ্ধ খটাস শব্দে ছুরি বের হওয়া দেখে। ততক্ষণে তার আক্কেল গুরুম হয়ে গেছে।
মুরুব্বী মানিব্যাগটা দিয়ে কানে ধরে বসে থাকেন। মিথ্যা বলার শাস্তি। আমরা দূর থেকে লক্ষ্য রাখব। কান থেকে হাত সরালেই এই ছুরি পেটে হান্দায়া দেব।বিশেষ একটা জায়গা (জিয়ার মাজারের দক্ষিণ পাশে অনেককেই কানে ধরে যেতে দেখা যায়। মিউনিসিপ্যালিটির লোকজনের সঙ্গে বন্দোবস্ত করা আছে— এই জায়গায় স্ট্রিট লাইট সব সময় নষ্ট থাকে।)
এত কিছু জানলাম কিভাবে? একটু পরে বলি? আগে তরুণী মেয়েদের কাছ থেকে গয়না এবং ব্যাগ কিভাবে নেয়া হয় এটা বলি। মনে করা যাক কোনো এক তরুণী রিকশা করে যাচ্ছে। জায়গাটা অন্ধকার দেখে তরুণী খানিকটা ভীত। হঠাৎ সে দেখবে এক যুবক (সোহাগ) এগিয়ে আসছে এবং ব্যাকুল গলায় বলছে, আপু, এক সেকেন্ড দাঁড়ান। প্লীজ আপু! প্লীজ?
মেয়ে কিছু বলার আগেই রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে দেয়। সোহাগ এগিয়ে আসে। হাত কচলাতে কচলাতে বলে, বন্ধুর সঙ্গে একটা বাজি ধরেছি। বাজি জিতলে এক হাজার টাকা পাই। আপা, আপনার পায়ে ধরি—-help me. তরুণী তখন বলে, কি বাজি? আপনাকে চুমু খাব, আপনি কিছুই বলবেন না। এই বাজি। আপু, আমি দাঁত ক্লোজ-আপ টুথপেষ্ট দিয়ে মেজে এসেছি–কোনো সমস্যা নেই।
রিকশাওয়ালা ভাই, তুমি অন্য দিকে তাকাও। তুমি থাকায় আপু লজ্জা পাচ্ছে। আপু ঐ যে দেখুন আমার বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আছে বাজির ফলাফল দেখার জন্য। ওদেরকে বলে দিয়েছি যেন মোবাইল দিয়ে ছবি না তুলে। কেউ যদি ছবি তুলে তাহলে ভুড়ির মধ্যে ছুরি ঢুকায়ে দিব। এই দেখেন ছুরি। খটশ শব্দ হয়। ফলার ভেতর থেকে রাজস্থানী ছুরি বের হয়ে আসে। চুমুর হাত থেকে বাঁচার জন্যে তরুণী সঙ্গে যা আছে সবই দিয়ে দেয়। হাত ব্যাগ, ঘড়ি, গলায় চেইন, ইমিটেশন গয়না। কিছুই নিজের কাছে রাখে। না।
ছিনতাই দলের প্রধান তখন অতি ভদ্র ভঙ্গিতে বলে— সব কেন দিয়ে দেবেন। আপা! রিকশা ভাড়া দিতে হবে না? বিশটা টাকা রাখুন, আপু। এই রিকশাওয়ালা! আপুকে সাবধানে নিয়ে যাও। অন্ধকার জায়গা এভয়েড করবে। দিনকাল খারাপ।ঘটনা যা বললাম সবই পত্রিকায় প্রকাশিত। ছিনতাইকারি দলের প্রধান ক্যারাম চ্যাম্পিয়ান সোহাগ যে পল্টু স্যারের আপনি চাচাতো ভাই সেটা কি ভাবে জানলাম বলি–
হাসপাতাল থেকে ফেরার দ্বিতীয় দিনে সন্ধ্যায় পল্টু স্যার অস্থির হয়ে পড়লেন, নতুন বই কিনবেন। ড্রাইভারকে ডেকে বললেন, গাড়ি বের কর।ড্রাইভার বলল, স্যার, গাড়িতো বসে গেছে। পল্টু স্যার বললেন, গাড়ি বসে গেছে মানে কি? গাড়িতো বসেই থাকে। দাঁড়িয়ে থাকে না।ব্যাটারি বসে গেছে, স্যার। নতুন ব্যাটারি কিনতে হবে।দুই মাস আগে না ব্যাটারি কিনলে?
ব্যাটারী হল লাকের ব্যাপার। কোনো ব্যাটারি দুই দিনেই শেষ হয়। আবার কোনোটা দুই বছর চলে। ঠিক না হিমু ভাই? বলেই ড্রাইভার আমাকে চোখ টিপ দিল। বাধ্য হয়ে আমাকেও চোখ টিপ দিয়ে টিপ ফেরত দিতে হল।সে আমার সঙ্গে আন্ডারাষ্ট্যান্ডিং-এ যেতে চাচ্ছে। কাজের লোক, বুয়া, মালী, ড্রাইভার, দারোয়ান এদের রসুনের বোঁটা হয়ে থাকাই নিয়ম। একজনের অপরাধ সবার অপরাধ।
ড্রাইভার বলল, পাঁচ হাজার টাকা দেন স্যার, নতুন ব্যাটারি নিয়ে আসি। তবে আজ গাড়ি বের করতে পারবেন না।পল্টু স্যার ড্রাইভারকে ব্যাটারির টাকা দিয়ে আমাকে নিয়ে বই কিনতে বের হলেন। আমরা রিকশা করে যাচ্ছি–যথাসময়ে এবং যথা জায়গায় একজন টাকা ভর্তি মানিব্যাগ নিয়ে ছুটে এল এবং চোঁচাতে লাগলো মুরুব্বী, এই মানিব্যাগ কি আপনার? পল্ট স্যার বললেন, কে সোহাগ না? কেমন আছ?
যুবক চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে বলল, ভাল আছি পল্টু ভাইজান।পল্টু স্যার বলল, এই মানিব্যাগ আমার না। আমারটা পকেটেই আছে। মনে হয় অন্য কারোর।আমি বললাম, ভাই, মানিব্যাগটা আমার। পকেট থেকে পড়ে গেছে খেয়াল করি নাই।সোহাগের বন্ধুরা এগিয়ে আসছিল। সোহাগের ইশারায় তারা পিছনে সরে গেল।সোহাগ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার যে মানিব্যাগ তার প্রমাণ কি? এখানে কত টাকা আছে বলতে পারবেন?
আমি বললাম, এখানে আছে উনিশশ দশ টাকা। ভাই, আপনি গুনে দেখেন।পল্টু স্যার বললেন, দেখি, আমি গুনে দেই। টাকা গুনতে আমার ভাল লাগে। বইয়ের পাতা উল্টাতে যেমন ভাল লাগে, টাকা গুনতেও ভাল লাগে। টাকা গুনার সময় মনে হয় বই-এর পাতা উল্টাচ্ছি।টাকা গুনে দেখা গেল উনিশ শ দশ টাকাই আছে। কাকতালীয় ব্যাপার ছাড়া কিছুই না। সবার জীবনেই কাকতালীয় ব্যাপার ঘটে। আমার বেলায় একটু বেশি বেশি ঘটে।
সোহাগকে হতভম্ব অবস্থায় রেখে আমরা চলে এলাম। পল্টু স্যার বললেন, আমার সমস্ত বিষয় সম্পত্তি এই ছেলের পাওয়ার কথা। আমার কোনো ওয়ারিশ নাই।আমি বললাম, স্যার, আপনার কি অনেক টাকা-পয়সা? পল্টু স্যার বললেন, হুঁ।আমি বললাম, এত টাকা কিভাবে করেছেন? পল্টু স্যার বললেন, আমি করব কিভাবে? আমার বাবা করেছেন। ব্যবসা করতেন।
কিসের ব্যবসা কিছুই জানি না। তাঁর কথা ছিল যেদিন বিশ কোটি টাকার সম্পদ হবে সেদিন তিনি তওবা করে টাকা রোঙ্গার বন্ধ করবেন।তওবা করার সুযোগ কি পেয়েছিলেন স্যার? না। যেদিন তওবা করার কথা ছিল সেদিন সকাল বেলায় নাস্তা খাবার সময় মাংসের টুকরা গলায় আটকে গেল। আমি তখন তাঁর সামনে বসে নাস্তা খাচ্ছিলাম। আমি বুঝতেই পারি নাই বাবা মারা যাচ্ছেন। আমি ভাবছি বাবা চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? তারপরেই— ধুম! ধুম কি?
ধুম করে উনার মাথাটা টেবিলে পড়ে গেল। তুমি আবার ভেবো না মাথা খুলে টেবিলে পড়ে গেছে। উনাকে সহ-ই পড়েছে। মাথা টেবিলে লেগে ধুম শব্দ হয়েছে।ও আচ্ছা।পল্টু স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন– ধুম বলা ঠিক হয় নাই। বলা উচিত ধুম ঝনঝন। ধুম করে মাথাটা টেবিলে লাগল। টেবিলে পানির যে গ্লাস ছিল সেটা মেঝেতে পরে ভেঙে শব্দ হল ঝনঝন। কাজেই ধুম ঝনঝন।
আমি স্যারের দিকে তাকিয়ে আছি। বাবার মৃত্যু যে কারো কাছে ধুম ঝনঝন হতে পারে তা আমার ধারণাতে নেই। একজন সর্ববিষয়ে নির্বিকার মানুষ এ ধরনের কথা বলতে পারে। উনি কি মহাপুরুষদের মতো চরম নিরাসক্তদের একজন। মহাপুরুষ সম্পর্কে আমার বাবার ধ্যান-ধারণা এ রকমই। মহাপুরুষদের নানান লক্ষণ বলতে গিয়ে তিনি বলছেন আসক্তি চরম আসক্তির অন্য নাম নিরাসক্তি।
মহাপুরুষরা সৰ্ববিষয়ে যে নিরাসক্তি দেখাইয়া থাকেন তাহা চরম আসক্তিরই অন্য পরিচয়। তোমাকে উদাহরণ দিয়া বুঝাই–মনে কর এক লোকের মদ্যপানের কিছু নেশা আছে। সেই ব্যক্তি মাঝে মধ্যে কিছু মদ্যপান করিবে। তাহার জন্যে নানান আয়োজন করিবে। মদ্যপানের সময় চাটের ব্যবস্থা, সংগীত শ্রবণের ব্যবস্থা ইত্যাদি। এই লোকই যখন মদ্যপানে চরম আসক্তি দেখাইবে তখন সে শুড়িখানায় উপস্থিত হইবে— তখন তাহার চাটের প্রয়োজন নাই, সংগীতেরও প্রয়োজন নাই।
মদ্য হইলেই হইল। এই আসক্তি আরো বাড়িলে মদ্য পানেরও প্রয়োজন ফুরাইবে। নেশার বস্তু থাকিবে কিন্তু নেশা থাকিবে না।একগাদা বই কিনে বাসায় ফিরে দেখি ড্রাইভারের ঘরের সামনের বেঞ্চিতে সোহাগ বসে আছে। হাতে সিগারেট।পল্টু স্যারকে দেখে সে সিগারেট লুকানোর চেষ্টা করল। স্যার তার দিকে ফিরেও তাকালেন না। হাত ভর্তি বই নিয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উঠলেন। এক্ষুণি তাকে বই পড়া শুরু করতে হবে। খেজুরে আলাপের সময় নেই।
ড্রাইভার চাপা গলায় ডাকল, হিমু ভাই, শুনে যান। আপনার সঙ্গে কথা আছে। সোহাগ ভাইজান কি জানি বলবে। আপনি উনারে চিনেনতো? আমি বললাম, দেখা হয়েছে। ওস্তাদ মানুষ।সোহাগ সিগারেট ছুড়ে ফেলে বলল, যে দেখা হয়েছে, সেই দেখা কোনো দেখাই না। তোমার সঙ্গে আসল দেখা বাকি আছে।আমি বললাম, আসল দেখা কখন হবে? রোজ হাশরের ময়দানে?
রোজ হোশর আমি তোমারে দেখায়ে দিব। মানিব্যাগ আন।মানিব্যাগতো জমা দিয়ে দিয়েছি।কোথায় জমা দিয়েছ।ধানমন্ডি থানার ওসি সাহেবের কাছে জমা দিয়ে দিয়েছি। উনি যেন আসল মালিককে ফিরত দেন।আমাকে ধানমন্ডি থানা চিনাও? চল আমার সঙ্গে থানায়। ব্যাগ রিলিজ করে নিয়ে আস।ড্রাইভার আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, মানিব্যাগ দিয়ে দেন হিমু ভাই। এই লোক কিন্তু ডেনজার।আমি সোহাগের দিকে তাকিয়ে বললাম, ভাইজান, আপনি না-কি ডেনজার?
সোহাগ বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, প্ৰমাণ চাস? তুই প্রমাণ চাস (সে যে ডেনজার এটা প্রমাণ করার জন্যেই বোধ হয় তুই তুই করে বলছে। তবে একটা হাত পকেটে ঢুকেছে। মনে হচ্ছে রাজস্থানী বস্তু বের হবে।) কি, কথা বলস না কেন, প্রমাণ চাস? আমি বললাম, প্রমাণ সবাই চায়। পাকিস্তানী মিলিটারী প্রমাণ চেয়েছে। হিন্দু না মুসলমান এই প্ৰমাণ। অনেককেই লুঙ্গি খুলে যন্ত্রপাতি দেখাতে হয়েছে।
ড্রাইভার ভীত গলায় বলল, ভাইজান, এইখানে কিছু করবেন না; যা করায় বাইরে নিয়া করেন।সোহাগ রাজস্থানী ছুড়ির বোতাম টিপে যাচ্ছে— জিনিস বের হচ্ছে না। আমি বললাম, নষ্ট হয়ে গেছে না-কি? সোহাগ আগুন চোখে তাকাল। আমি বললাম, নষ্ট জিনিস পকেটে রাখা ঠিক না। তারপর আবার করেছেন টিপা টিপি।
এই জিনিস পকেটে রাখবেন, হঠাৎ আপনা আপনি খুলে যাবে— পুট করে আপনার বিচি একটা খুলে পড়ে যাবে। তখন সবাই আপনাকে ডাকবে এক বিচির সোহাগ।ড্রাইভার মহাচিন্তিত গলায় বলল, হিমু ভাই, এইসব কি বলেন? আপনি কারে কি বলতেছেন নিজেও জানেন না।সোহাগ বলল, জানবে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জানবে। যদি না জানে আমি পিতা-মাতার সন্তান না; আমি জারজ সন্তান।
ড্রাইভার সোহাগের হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সে ঝামেলা চায় না। গাড়ির তেল, ব্যাটারি, টায়ার এসব মাঝে মাঝে চুরি করে সে জীবনটা পার করে দিতে চায়।ঘরে ঢুকে দেখি পল্টু স্যার বই নিয়ে বসে গেছেন। তাঁর মুখ প্রশান্ত। যে লেখক এই বইটি লিখেছেন তিনি দেখলে আরাম পেতেন। অবশ্যই তার কাছে মনে হতো তার লেখক স্বার্থক।স্যার, চা বাঁ কফি কিছু লাগবে? লেবুর সরবত করে দেব? ক্লান্তি দূর হবে।তাহলে করে দাও।
রান্নাঘরে ঢুকে দেখি লেবু নেই। আমি স্যারকে বললাম, স্যার, ঘরে লেবু নেই; লেবু ছাড়া লেবুর সরবত করে দেব? দাও। লেবুর সরবত দিয়ে চেষ্টা করতে থাক লকারটা খুলতে পার কিনা। রিং ঘুরাতে থাক। এক সময় না এক সময় খুলবেই। সাতটা মাত্র সংখ্যা। আমার ধারণা অতি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু লকারে আছে। কী আছে মনে করতে পারছি না।আমি লকারের রিং ঘুরাচ্ছি। শুরু করেছি ০ দিয়ে—
০০০০০০০
০০০০০০১
০০০০০১১
০০০০১১১
এতো দেখি ভয়াবহ ব্যাপার। মোট কতবার ঘুরালে একবার না একবার বিশেষ সংখ্যাটা চলে আসবে। তাই বা কে জানে। বাদলকে জিজ্ঞেস করলে পাওয়া যাবে। অঙ্ক তার কাছে ছেলেখেলা।আমি রিং ঘুরিয়েই যাচ্ছি।
রানু টাকা নিয়ে এসেছে। সবটা আনতে পারেনি, এক হাজার তিনশ টাকা এনেছে। টাকার সঙ্গে প্লাষ্টিকের দুটা আইসক্রিমের বাটি। একটা বাটিতে মোরগা-পোলাও, অন্য বাটিতে ফিরনী। দুটাই সে নিজে রান্না করেছে। আমার ধারণা ঐ দিনের খাবারটা ফেরত দিতে চাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই মেয়ে ঋণ রেখে মরে যাওয়া টাইপ না।
রানু বলল, আপনি এই বাড়ির কে বলুনতো। আমি দারোয়ানকে বললাম, হিমু সাহেবের ফ্ল্যাটে যাব। দারোয়ান চেনে না।আমি এই বাড়ির চাকরী। ভদ্র ভাষায় গৃহভৃত্য। বাবু কহিলেন, বুঝেছি উপেন টাইপ। আমাকে চেনার কথা না। চাকরের পরিচয়ে ফ্ল্যাটের পরিচয় না।রানু বলল, আপনি কেন সব সময় আমার সঙ্গে এই ভাবে কথা বলেন? ঐ যে বুড়ো মানুষটা ইজিচেয়ারে বসে বই পড়ছেন, তিনি আপনার কে হন?
মুনিব হন। উনি মুনিব, আমি ভৃত্য।অসম্ভব। উনি আপনার বাবা। আমি চেহারা দেখেই বুঝেছি।কথাবার্তার এই পর্যায়ে পল্টু স্যার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। এবং চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, হিমু, বাবুই পাখি তালগাছ ছাড়া অন্য কোথাও বাসা বাঁধে না? জ্বি না, স্যার।যদি সব তালগাছ কেটে ফেলা হয়, তখন ওরা কোথায় বাসা বাঁধবে? ওরা একটা সমস্যায় তো পড়বেই। অন্য কোনো গাছে ট্রাই করবে।কোন গাছ?
আমার ধারণা, সুপারি গাছে প্ৰথম চেষ্টা করবে।পল্টু স্যার চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, জিনিসটা অদ্ভুত না? বাবুই পাখিদের তালগাছেই বাসা বাঁধতে হবে? গভীর কোনো চিন্তার বিষয় এর মধ্যে আছে।চিন্তার বিষয়তো আছেই।ঐ মেয়ে কে? স্যার, আমাদের বাবুর্চি।পল্টু স্যার খুবই অবাক হয়ে বললেন, আমাদের বাবুর্চি আছে, জানতাম নাতো! নিজেদের বাবুর্চি আছে, অথচ আমরা হোটেল থেকে খাবার এনে খাচ্ছি কেন?
আমি বললাম, আজই এপিয়েন্টমেন্ট দেয়া হয়েছে। সে তার রান্নার স্যাম্পলও নিয়ে এসেছে। দুপুরে আপনাকে খেতে দেব। মোরগা-পোলাও আর ফিরনী। খেয়ে যদি আপনার পছন্দ হয়, সঙ্গে সঙ্গে চাকরি পারমানেন্ট।পল্টু স্যার বললেন, এক বেলার রান্না খেয়ে তার রন্ধনশৈলী বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।আমি বললাম, তাহলে এক সপ্তাহ রাঁধুক এক সপ্তাহ পরে বিবেচনা করা হবে।মেয়েটার নাম কি? স্যার, আপনিই জিজ্ঞেস করুন।
আমি রানুর দিকে তাকালাম। সে আমাদের কথাবার্তায় পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। বিভ্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক। অতি বুদ্ধিমতীরাও বিভ্ৰান্ত হবে। প্লটু স্যার হাতের বই বন্ধ করে চোখের চশমা ঠিক করলেন। চশমা ঠিক করা মানে চশমার ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা। পল্টু স্যার গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় এই কাজটা করেন।
নাম কি বল!
রানু।
রান্না কোথায় শিখেছ?
মার কাছে শিখেছি।
মনে কর তুমি কৈ মাছের ঝোল রান্না করছ। সাধারণ লবণ দিয়ে রান্না করলে যে স্বাদ হবে, বিট লবণ দিয়ে রান্না করলেও কি একই স্বাদ হবে? বিট লবণ দিয়ে যে মাছের ঝোল রান্না করা যায় এটাই আমি জানি না।
কোন রান্নাটা তুমি ভাল পার।
ইলিশ মাছের ডিমের ঝোল।
পল্টু স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হিমু, চট করে একটা ইলিশ মাছ নিয়ে এসো। আমারো হঠাৎ করে কেন জানি ইলিশ মাছের ডিমের ঝোল খেতে ইচ্ছা করছে। বাবুর্চির চাকরি পার্মানেন্ট হবে কি-না তা ইলিশ মাছের ডিম রান্নার উপর নির্ভর করবে।
রানুর হতভম্ব ভাব ক্রমেই বাড়ছে। এক সময় সে গা বাড়া দিয়ে উঠল। কঠিন গলায় বলল, একটা ভুল হচ্ছে। আমি বাবুর্চির কাজের জন্যে এ বাড়িতে আসি নি। আমাকে এসব কেন বলছেন? আমাকে দেখে কি বাবুর্চির মতো লাগছে? পল্টু স্যার আমার দিকে সাহায্যের জন্যে তাকালেন। রানুর কথায় তিনিও খানিকটা হকচকিয়ে গেলেন। আমি বললাম, রানু শোন, আয়া বা বাবুর্চি এরা দেখতে আলাদা হয় না। এদের কোনো আলাদা পোশাকও নেই। এবং সত্যি কথা বলতে কি তোমার ভাবভঙ্গির মধ্যে কিছু বাবুর্চি ভাব অবশ্যই আছে।
পল্টু স্যার ভরসা পেয়ে বললেন, অবশ্যই অবশ্যই। খুবই সত্যি কথা। কথাবার্তা বুয়া টাইপ। ঝগড়া ঝগড়া ভাব।তোমার যদি সম্মান হানি হয়ে থাকে, তাহলে আমি এবং স্যার আমরা দুজনই দুঃখিত।পল্টু স্যার বললেন, হ্যাঁ দুঃখিত। তবে বাবুর্চির কাজের মধ্যে কোনো অসম্মান নেই। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি বাবুর্চি ছিলেন যেমন এরিস্টটল, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি।রানু বলল, উনারা বাবুর্চি ছিলেন?
পল্টু স্যার বললেন, অবশ্যই। নিজেরা নিজেদের খাবার রান্না করে খেতেন। এখন তুমি বল, বেতন কত চাও? রানু বলল, বেতন কত চাই মানে কি? তুমি নিশ্চয়ই বেতন ছাড়া কাজ করবে না। আর আমার পক্ষেও আকাশ-পাতাল বেতন দিয়ে বাবুর্চি রাখা সম্ভব না। লকার খোলা যাচ্ছে না।রানু বলল, আমরা একই কথাবার্তায় ঘুরাফিরি করছি। হয় আপনি কনফিউজড নয়ত আমি কনফিউজড। আমি এখন চলে যাচ্ছি, কিছু মনে করবেন না। স্নামালিকুম।
পল্টু স্যার সালামের জবাব না দিয়ে বইয়ে মন দিলেন। পাতা উল্টে বইয়ের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার চোখ চকচক করতে লাগল। রানু আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কি আপনার সঙ্গে আলাদা এক মিনিট কথা বলতে পারি? আড়ালে? আমি বললাম, আড়ালে যাবার দরকার নেই। এখানেই কথা বলতে পার। স্যার বই পড়া শুরু করেছেন, এখন কোনো কিছুই তাঁর মাথায় ঢুকবে না।
তাঁকে এই ছাগল, বই পাগলা বলে গালিও দিতে পার। তিনি কিছুই বুঝবেন না।রানু কঠিন গলায় বলল, আপনি দয়া করে অন্য ঘরে আসুন! প্লিজ! আমি রানুকে নিয়ে রান্নাঘরে গেলাম। এই বাড়িতে শুধুমাত্র রান্নাঘরেই দুটা প্লাষ্টিকের টুল আছে। পিঁড়ির আধুনিক সংস্করণ। রানুকে বসতে বললাম, সে বসল না। থমথমে গলায় বলল, আপনি কি সত্যিই উনার সারভেন্ট? চাকর বলতে লজ্জা লাগছে বলে সারভেন্ট বলছি।
আমি বললাম, সরাসরি চাকর বলতে পার। লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। ভৃত্যকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ উঁচু মর্যাদা দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত লাইন আছে— আমি তব মালঞ্চের হব মালাকার। মালাকার ব্যাটা চাকর ছাড়া কিছু না। হাই লেভেলের কথা বন্ধ করে সরল করে বলুন ঘটনা কি? আপনি চাকর হবেন কেন?
আমি একটা জরুরি মিশন নিয়ে এখানে কাজ করছি।কি মিশন? পল্টু স্যার বহু টাকার মালিক। বিশ কোটি টাকার বেশিতো বটেই। উনি মারা গেলেই সোহাগ নামের একজন পুরো সম্পত্তির মালিক হবে। আমার মিশন হচ্ছে উনি যাতে দ্রুত মারা যান, সেই ব্যবস্থা করা।তার মানে?
ভদ্রলোকের সময় ঘনিয়েছে। দুটা কিডনীই নষ্ট। আমাকে দেখতে হবে তিনি যেন কিডনী ট্রান্সপ্ল্যান্টে রাজি না হন। বুঝতে পারছ? না।আমি গলা নামিয়ে বললাম, আমি এ বাড়িতে ঢুকেছি তাঁকে কিডনী দেব এই অজুহাতে। এখন তার ধারে-কাছে যাচ্ছি না। স্যারের শরীর দ্রুত খারাপ হচ্ছে। পরিকল্পনা মতো সব এগুচ্ছে।
