হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী পর্ব:০৩ হুমায়ূন আহমেদ

হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী পর্ব:০৩

ওসি সাহেব পালকহীন চোখে তাকিয়ে রইলেন। আমি বললাম, আপনাদের ঘুস গ্রহণ কর্মকাণ্ড আরো আধুনিক করা উচিত। থানার দরজাতেই লেখা থাকবে, ভিসা কার্ড, আমেরিকান কার্ডে ঘুস লেনদেন করা যাবে। ভাল কথা ঘুসের উপর কি ভ্যাট আছে?

ওসি সাহেব তিক্ত গলায় বললেন, এতক্ষণ আপনাকে চিনতে পারি নি। এখন চিনেছি। আপনি হিমু। সুটি টাই এর ঢংটা কি জন্যে? আপনি কি জানেন পুলিশকে ঘুস সাধার অপরাধে আপনাকে হাজতে ঢুকাতে পারি?

আমি বললাম, জানি। আবার এও জানি চালে সামান্য ভুল করলে আপনি চলে যাবেন খাগড়াছড়িতে। স্ট্যান্ড রিলিজ। সেখানে নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে বুনো হাতি। থানাওয়ালারা সব রাতে থানা ফেলে হাতির ভয়ে গাছে উঠে বসে থাকে। ঘুসখের অফিসাররা মানসিকভাবে দুর্বল থাকে। হাতি দেখলেই তারা হাত পা ছেড়ে দেয়। ধুথুস করে পাকা ফলের মত গাছ থেকে মাটিতে পড়ে যায়। ওসি সাহেব। আপনি অতি দুর্বল মনের একজন মানুষ।

আমাকে হাজতে ঢোকানোর সাহস আপনি সঞ্চয় করতে পারছেন না। আমার সঙ্গে আপনি আপনি করে কথা বলছেন। বিশিষ্ট কেউ আমার পেছনে আছে। এই ধারণা আপনার মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। চা খাব। ওসি সাহেব চা খাওয়ানতো।ওসি সাহেবের হাতে কাঠ পেনসিল। তিনি পেনসিল দিয়ে টেবিলে ঠক ঠক করছেন। মনের অস্থিরতার পেনসিল প্ৰকাশ বলা যেতে পারে।

তিনি আমার বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নেবেন এখনো বুঝা যাচ্ছে না। দুর্বল মনের মানুষের প্রধান ত্রুটি সিদ্ধান্তহীনতা, তবে তিনি যেভাবে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াচ্ছেন তাতে মনে হয় চব্বিশ ঘণ্টা হাজতে থাকতে হতে পারে।তিনি হাতের পেনসিল টেবিলে নামাতে নামাতে বললেন, দুধ চা খাবেন না দুধ চা?

দুধ চা।

উইথ সুগার?

জি। প্রচুর হাঁটাহঁটি করিতো টাইপ টু ডায়াবেটিস এখানো আমাকে ধরতে পারে নি।ওসি সাহেব পেনসিল দিয়ে ইশারা করলেন। চায়ের কাপে চামুচ নাড়ার মত করলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, চা খেয়ে সুবোধ বালকের মত হাজতে ঢুকে পড়বেন। আপনাকে অস্ত্ৰ আইনে গ্রেফতার করা হল।আমি বললাম, অস্ত্ৰ কোথায়?

হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী পর্ব:০৩

ওসি সাহেব বললেন, আমাদের কাছে কিছু অস্ত্ৰ, গুলি, জর্দার কোটা মজুদ থাকে। যাদের চোখ খারাপ, চোখে শুধু ঘুঘু দেখে ফাঁদ দেখতে পায় না। তাদের জন্যে এই ব্যবস্থা। অন্ত্র আইনে গ্রেফতার করে উদ্ধার করা অস্ত্র আলামত হিসাবে জমা দেয়া হয়।পত্রিকায় ছবিও তো ছেপে দেন।না, আমরা সব সময় ছবি ছাপি না। কাগজওয়ালাদের ইনভলব করলে সমস্যা বেশি হয়।

ছবিটা ছাপা হলে ভাল লাগতো। আমার স্যুট টাই পরা কোনো ছবি নাই।ওসি সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভাব ভঙ্গিতে মনে হচ্ছে কঠিন কোনো কথা বলতে চান। কথা মাথায় আসছে না।চা চলে এসেছে। পেনসিলের ইশারা ভাল হয় নি। দুধ চা চেয়েছিলাম এসেছে রং চা। আমি চায়ে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির ভান করে বললাম, ওসি সাহেব একটা ধাঁধার জবাব দিতে পারবেন। জবাব দিতে পারলে পুরস্কার আছে। ধাঁধাটা হল, মুরগির দাঁত কয়টা?

ওসি সাহেব ঘোৎ টাইপ শব্দ করলেন। হঠাৎ করেই তাঁর মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল। নিশ্চয়ই ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা আছে। কোন এক সময় পরিষ্কার হবে।আমি হাজতে আলমের পাশে গিয়ে বসলাম। হতভম্ব আলমকে বললাম, আলামত জমা দিতে গিয়ে ধরা খেয়েছি। অস্ত্ৰ আইনে মামলা হবে। সাত আট বছর জেলের লাপসি খেতে হতে পারে। জেলের বাবুর্চি কেমন কে জানে।আলম বিড়বিড় করে বলল, কি সর্বনাশ।

আমি বললাম, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা অর্থহীন। পদার্থবিদরা বলা শুরু করেছেন। আজ কাল এবং পরশু আসলে একই সময়। নাস্তা কি খাবেন বলুন। আপনার নাস্তার ব্যবস্থা করি। গরম পরোটা কলিজা ভুনা খাবেন? থানার আশে পাশে ভাল রেস্টুরেন্ট থাকে, হাজতিরা ভাল খেতে পছন্দ করে।আলম বলল, আপনার সঙ্গে টাকা আছে?

আছে।

এক প্যাকেট সিগারেট আনায়ে দেন। সিগারেটই খাব ৷

ব্যবস্থা করছি। হাজতে এই প্রথম?

জি।

হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী পর্ব:০৩

আনন্দে সময় কাটানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। সামনে যে দেয়ালটা দেখছেন মনে করুন। এটা একটা ২৯ ইঞ্চি কালার টিভি। টিভিতে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট খেলা দেখাচ্ছে। আরাম করে খেলা দেখুন।ভাই সাহেব এই সব কি বলেন। আপনার তো মাথায় সমস্যা আছে।সমস্যা আমাদের সবার মাথায় আছে। যাই হোক দেয়ালে টিভি দেখার চেষ্টা চালিয়ে যান। মনোসংযোগ করুন। আপনি পারবেন। আমি এর মধ্যে নাস্তা আর সিগারেটের ব্যবস্থা করছি।

আলম মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, আজ কাল এবং পরশু আসলে একই সময় ব্যাপারটা বুঝলাম না। যদি বুঝিয়ে বলেন।আমি বললাম, যারা এই কথা বলছেন তারা নিজেরাও বুঝতে পারছেন না। আমি কি বুঝাব। এই সব উচ্চ চিন্তা বাদ দিয়ে টিভি দেখুন।হাজতি সব মিলিয়ে আমরা তিন জন। একজন বালক হাজতি, বয়স বার তোেরর বেশি হবে না। নাম কাদের।

আমরা তিনজই গভীর আগ্ৰহে কালিবুলি মাখা শূন্য দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছি। বালক হাজতির উৎসাহ সবচে বেশি। সে চোখের পলকও ফেলছে না, হা করে তাকিয়ে মাঝে মাঝে গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে। সেন্ট্রিদের একজন অবাক হয়ে বলল, আপনারা কি দেখেন? বালক হাজতি বলল, টিভিতে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ড খেলা দেখি।টিভি কৈ?

ঐ তো টিভি। ‘ডিসটাব’ দিয়েন না তো। ইচ্ছা হইলে খেলা দেখেন।হাজতিরা টিভিতে খেলা দেখছে এই খবর নিশ্চয় ওসি সাহেবের কাছে পৌঁছেছে তাকেও একবার দেখলাম পেনসিল হাতে উঁকি দিয়ে যেতে। এই ভদ্রলোক পেনসিল ছাড়া চলতেই পারেন না বলে মনে হচ্ছে। দুর্ধর্ষ আসামী ধরার সময় পিস্তলের মত পেনসিল তাক করেন কি-না কে জানে।কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ডাক পড়ল। ওসি সাহেব খবর দিয়েছেন। আমি বলে পাঠালাম, খেলার মাঝখানে উঠে আসতে পারব না। লাঞ্চব্রেকে আসব। হাই টেনশনের খেলা।

হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী পর্ব:০৩

ওসি সাহেব এবং আমি মুখোমুখি বসে আছি।তিনি যথারীতি হাতের পেনসিল নাচাচ্ছেন। আড়াচোখে আমাকে মাঝে মধ্যে দেখছেন। বুঝতে পারছি আমাকে নিয়ে কোনো হিসাব নিকাশ হচ্ছে। কি বলে কথা শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না বলে সময় নিচ্ছেন। আমিই আলোচনা শুরু করলাম। আন্তরিক ভঙ্গিতে বললাম, স্যার আপনি কি লক্ষ্য করেছেন পেনসিল সব সময় আটতল বিশিষ্ট হয়। গোল হয় না। কারণটা জানেন?

না।

বলব?

ওসি সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি উপেক্ষা করে বললাম, আটতলের কারণে পেনসিল সহজে টেবিল থেকে গড়িয়ে পড়ে না।আপনার কাছ থেকে বিরাট জ্ঞান লাভ করলাম। আপাতত মুখ বন্ধ করুন। প্রশ্ন করলে জবাব দিবেন।অবশ্যই জবাব দেব। একটাই অনুরোধ কঠিন প্রশ্ন করবেন না।

সায়েন্স বাদ। আমি বিজ্ঞানে দুর্বল। পৃথিবীর ওজন কত জিজ্ঞেস করলে বলতে পারব না। এটম বোমা কে আবিষ্কার করেছেন তাও বলতে পারব না।শুনলাম হাজতিদের নিয়ে টিভি দেখছিলেন।ঠিকই শুনেছেন। বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডের খেলা। না দেখে পারছি না।আর যাই করেন পুলিশের সঙ্গে ফাজলামী করবেন না।পুলিশের সঙ্গে কোনো ফাজলামিতো করছি না। দেয়ালের সঙ্গে করছি।

আমি আপনার বিষয়ে খবর নিয়েছি আপনি অতি ধুরন্ধর একজন মানুষ। ধুরন্ধর কিভাবে টাইট করতে হয় আমি জানি।জানলে টাইট করে দিন। তবে একটা কথা আপনাকে না বলে পারছি না। যে টাইট করে সে একই সময় নিজে লুজ হয়। আপনি আমাকে যতটা টাইট করবেন নিজে ঠিক ততটাই লুজ হবেন। এটা বিজ্ঞানের সূত্র।বিজ্ঞানের সূত্র? আমাকে বিজ্ঞান সেখান?

আপনাকে কিভাবে বিজ্ঞান শেখাব? আমি আগেই স্বীকার করেছি। আমি সায়েন্সে দুর্বল। তবে নিউটনের সূত্রে আছে–To every action there is an equal and opposite reaction. আপনি আমাকে টাইট দিলে নিউটনের সূত্র অনুসারে আপনাকে লুজ হতে হবে। অর্থাৎ আপনার ব্রেইনের নাট বন্টু লুজ হতে থাকবে। দু’একটা খুলেও পড়ে যাবে। একদিন দেখা যাবে পেনসিল হাতে পথে পথে ঘুরছেন।

হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী পর্ব:০৩

যাকেই দেখছেন তার সঙ্গেই পেনসিলের ইশারায় কথা বলছেন। সবাইকে জিজ্ঞেস করছেন, মুরগির কি দাঁত আছে। কেউ আপনার প্রশ্ন বুঝতে পারছে না বলে জবাব দিতে পারছে না।ওসি সাহেব থমথমে গলায় বললেন, বার বীর মুরগির দাঁতের প্রশ্ন আসছে কেন?এই ধাঁধাটা আপনাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। জবাব দিতে পারেন নি বলে আবার মুরগির দাঁত চলে এসেছে।চা খাবেন?

খাব। দুধ চা, চিনিসহ। দয়া করে পেনসিলে অর্ডার দেবেন না। আপনার পেনসিলের অর্ডার কেউ বুঝতে পারে না।চা চলে এসেছে। এবার কোনো ভুল হয় নি। চা ঠিক আছে। আলাদা পিরিচে চার পাঁচটা বামুন সিঙ্গাড়া। এক সঙ্গে পাঁচ ছয়টা মুখে দেয়া যায়।আমি চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, আপনাকে কি আমি ছোট্ট একটা গল্প বলতে পারি?

না। চা খান, সিঙ্গাড়া খান। গল্প বলতে হবে না।হুজুগে বাঙ্গালী নিয়ে একটা রসিকতা করতে চাচ্ছিলাম। এই রসিকতা থেকে বুঝা যাবে আপনি আসল পুলিশ অফিসার না-কি ভেজাল। রসিকতা শুনে আপনি যদি শব্দ করে হাসেন তাহলে আপনি ভেজাল। আসল পুলিশ অফিসার কখনো জোকস শুনে হাসে না।গল্প বলুন শুনি।

ওসি সাহেব মুখের চামড়া আরো শক্ত করতে চাচ্ছেন। পারছেন না। গল্প শোনায় লোভ তার মধ্যে কাজ করছে। হুজুগের এই গল্প আমি অনেকের সঙ্গে করেছি। যারা শুনেছে তারা সবাই হো হো করে হোসেছে। শুধু পুলিশ অফিসাররা কেউ হাসেন নি। আমি গল্প শুরু করলাম।

এক ভদ্রলোক মতিঝিলে কাজ করেন। সত্তুর তলায় তাঁর অফিস। একদিন তিনি মন দিয়ে ফাইল দেখছেন তখন হন্তদন্ত হয়ে তার রুমে পিওন ঢুকে উত্তেজিত গলায় বলল, স্যার খবর শুনেছেন আপনার স্ত্রীতে আপনার গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে পালিয়ে গেছেন! ভদ্রলোক চূড়ান্ত অপমানিত বোধ করে জানালা খুলে লাফ দিলেন। লাফ দেবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে হল, আরে আমারতো গাড়িই নাই। ড্রাইভারের প্রসঙ্গ আসছে কেন?

হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী পর্ব:০৩

কংক্রিটের মেঝেতে আছড়ে পড়ার আগ মুহুর্তে মনে হল, আরে আমিতো এখনো বিয়েই করি নি।ওসি সাহেব শব্দ করে হেসে উঠলেন। অনেক কষ্টে হাসি থামালেন।আমি বললাম, ভাই আপনিতো ভেজাল পুলিশ অফিসার।ওসি সাহেব বললেন, আমি বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল পাওয়া অফিসার। এখন পর্যন্ত এক টাকা ঘুস খাই নি।এই জন্যেই তো আপনি ভেজাল।ওসি সাহেব হাতের পেনসিল নামিয়ে হাই তুলতে তুলতে বললেন, একটা কাগজে আপনার নাম ঠিকানা লিখে চলে যান।

ছেড়ে দিচ্ছেন?

হ্যাঁ ছেড়ে দিচ্ছি।

আমি যাব না।

যাবেন না মানে?

আমার সঙ্গে আরো যে দু’জন আছে তাদেরকে না নিয়ে যাব না। আমি একজন রাশিয়ান পরী বিয়ে করতে যাচ্ছি। আমার লোক বল নাই। এরা থাকলে নানান ভাবে সাহায্য করবে। গায়ে হলুদের ব্যাপার আছে। মেয়ের বাড়িতে মাছ পাঠাতে হবে। বিয়েতে আপনি উপস্থিত থাকলে আমি খুবই খুশি হব স্যার।ওসি সাহেব হাতের পেনসিল নামিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।

সন্ধ্যার দিকে আমরা তিনজনই ছাড়া পেলাম। আলম এবং বালক হাজতি কাদের আমার মেসে থাকতে এল। কাদের ঘোষণা করল সে বাকি জীবন আমার সঙ্গে থাকবে। আমার সেবা করবে। গা হাত পা টিপে দিবে।আলম এই জাতীয় কোনো কথা বললেন না। তবে তিনি জানালেন যে মেস বাড়িতে থাকবেন সেখানে তাঁর মুখ দেখানোর অবস্থা নেই। মেসে অনেক টাকা বাকিও পড়েছে, কাজেই…..

 

Read more

হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী পর্ব:০৪ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.