Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হিমু মামা পর্ব –৫ হুমায়ূন আহমেদ

বড় চাচা যেমন চিন্তিত, নীলুও তেমনি চিন্তিত। পেপার স্ট্যাপলারটা তার হাতে আসার পর থেকে হাত নিশপিশ করছে কানের লতিতে ঘ্যাচাং করে একটা চাপ দিতে। কিছুক্ষণ আগে সে ইয়েস-নো লটারি করেছে। একটা কাগজে সে লিখেছে ইয়েস, আরেকটা কাগজে লিখেছে নো। সে চোখ বন্ধ করে বিসমিল্লাহ বলে একটা কাগজ তুলেছে। যেটা উঠবে, সে তা-ই করবে। কাগজে উঠেছে, নো। কাজটা তার করা ঠিক না।

কিন্তু মন থেকে দূর করতে পারছে না। নীলু ঠিক করল সে একটা ফাইনাল লটারি করবে। ফাইনাল লটারিতে পঞ্চাশটা কাগজে লেখা হবে ইয়েস, পঞ্চাশটায় লেখা হবে নো। সেখান থেকে সে একটা কাগজ তুলবে। সেই লটারিতে যা উঠবে তা-ই সে করবে। না উঠলে না। হ্যাঁ উঠলে হ্যাঁ।

টগর তার গোপন জায়গায় বসে আছে। আজ অনেক কিছু ঘটে গেছে তার বিবরণ লেখা হয়নি। ‘পাপ-পুণ্য খাতা’য় পাপ-পুণ্যের হিসাব লিখে রাখতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে না লিখলে পরে ভুলে যেতে পারে। কাঁধের ফেরেশতারা এই জন্য পাপ-পুণ্যের বিবরণ সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেলেন। মোটেও দেরি করেন না। টগর লিখল :

পাপ নং ২১৪

বড় চাচার সঙ্গে দুবার মিথ্যা কথা বলেছি। একবার অর্ধেক মিথ্যা। আরেকবার পুরো মিথ্যা। তিনি যখন বলেছেন, টগর, তুমি কি আমার দুপুরের খাবার খেয়েছ? তখন আমি বলেছি, না। এতে অর্ধেক মিথ্যা বলা হয়েছে।

পুণ্য নং ২১৪

আমি রান্নাঘর থেকে কিছু চাল এনে উঠানে ছিটিয়ে দিয়েছি। কয়েকটা কাক এসে সেই চাল খেয়েছে। এতে আমার পুণ্য হয়েছে। পশুপাখির প্রতি মমতা দেখালে পুণ্য হয়।

পাপ নং ২১৫

আমি বড় চাচার দুপুরের খাবার গোপনে খেয়ে ফেলেছি। এতে পাপ হয়েছে। পাপ বেশি হয়েছে নাকি কম হয়েছে তা বুঝতে পারছি না।

পুণ্য নং ২১৫

বড় চাচার খাবার তাকে না বলে খেয়ে ফেলায় যে পাপ হয়েছে, খাবার খাওয়াতে পুণ্য হয়েছে। ছোটরা ফলমূল খেলে তাদের শরীর ভালো থাকে। শরীর ভালো রাখা পুণ্যের কাজ।

‘পাপ-পুণ্য খাতা’ বন্ধ করে টগর অন্য খাতা খুলল। এই খাতায় পুরো দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা লেখা থাকে। দিন এখনো শেষ হয়নি, তবে ঘটনাগুলো অতি দ্রুত ঘটছে। সঙ্গে সঙ্গে লিখে না রাখলে অবশ্যই তালগোল পাকিয়ে যাবে।

হিমু মামা

হিমু মামা এখনো চৌবাচ্চায়। তিনি এখন পর্যন্ত তেইশ ঘণ্টা পার করেছেন। চব্বিশ ঘণ্টা পার হওয়ার পর তিনি চৌবাচ্চার পানিতে লবণ মেশাবেন। সমুদ্রের পানিতে যতটা লবণ থাকে তার চেয়েও বেশি লবণ দেওয়া হবে। তাতে পানির ঘনত্ব বেড়ে যাবে। তখন ভেসে থাকতে সুবিধা হবে।

ড্রাইভার ইদারিসকে ৯২০ কেজি লবণ কিনতে পাঠানো হয়েছে। হিমু মামা হিসাব করে বের করেছেন, চৌবাচ্চায় ৯২০ কিউবিক ফিট পানি আছে। প্রতি কিউবিক ফিট পানির জন্য এক কেজি করে লবণ। কিউবিক ফিটের হিসাবটা আমি ছোট মামার কাছ থেকে জেনেছি। এক ফুট দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার একটা কিউবে যতটা পানি থাকে তাকে বলে এক কিউবিক ফিট।

বড় চাচা

বড় চাচা আজ খুব চিন্তার মধ্যে পড়েছেন। কারণ, কে যেন তার দুপুরের খাবার খেয়ে ফেলেছে। কে খেয়েছে এটা বের করার তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন। এখনো বের করতে পারেননি। তার ধারণা, কোনো বিড়াল এসে খেয়েছে। তবে বিড়াল কলা খায় না। বিড়ালের আঙুল নেই বলে সে কলার খোসাও ছাড়াতে পারে না। ঘটনা আসলে কী হয়েছে তা জানার জন্য তিনি প্ৰত্যেক ঘরের টেবিলে কলা এবং এক স্নাইস করে রুটি রেখেছেন। আমাদের সবার দায়িত্ব লক্ষ রাখা, কী হয়। তিনি নিজেও কিছুক্ষণ পর পর সব ঘরে গিয়ে দেখছেন, কী হয়।

সফুরা বুয়ার ধারণা, আমাদের এই বাড়িতে জিনের আসর হয়েছে। সব কাণ্ডকারখানা জিন করছে। তাদের গ্রামের বাড়িতেও নাকি মাঝে মাঝে এ রকম জিনের আসর হয়। সেই জিন অতি দুষ্ট। তারা ক্ষেত থেকে মাটির চাক্কা তুলে মানুষের ওপর ছুড়ে মারে।নীলুর ধারণা এটা কোনো জিন না। এসবের পেছনে আছে Playful ‘poltergiest’ অর্থাৎ মজার ভূত।নীলু একটা মুভিতে দেখেছে, বাড়িতে এ রকম ভূতের উপদ্রব হয়। তখন Ghost Buster এনে ভূত তাড়াতে হয়।

দাদিয়ার ধারণা, এই বাড়িতে খারাপ বাতাস লেগেছে। খারাপ বাতাস কী তা আমি এখনো জানি না। একসময় দাদিয়াকে জিজ্ঞেস করে জানব।টগর লেখা শেষ করে কিছুক্ষণ ট্যারা হওয়া প্র্যাকটিস করল। ট্যারা হওয়ার প্র্যাকটিস করার জন্য সে একটা আয়না রেখেছে। ছোট মামা বলেছেন, ট্যারা হওয়ার প্র্যাকটিস আয়না দেখে করতে হয়। টগরের ধারণা, সে এখন ট্যারা হতে পারে, তবে বেশিক্ষণ পারে না। ছোট মামা অনেকক্ষণ ট্যারা হয়ে থাকতে পারেন।

টগর তার গোপন আস্তানা থেকে নেমেই শুনল, রকিবউদ্দিন স্যার এসেছেন। স্টাডিরুমে বসে আছেন। রকিবউদ্দিন স্যারের এ সময় আসার কথা না। তিনি আসেন সন্ধ্যার পর, তাও সব দিন না। সপ্তাহে চার দিন। মাঝে মাঝে স্যার টাকা ধার করার জন্য অসময়ে আসেন। আজো মনে হয় এই জন্যই এসেছেন। তবে স্যার আজ টাকা পাবেন না, কারণ মা বাড়িতে নেই। স্যারকে টাকা ধার দেন শুধু মা।

মা টাকা ধার দেন বলেই হয়তো মায়ের বানানো ভয়ঙ্কর খাবারগুলো স্যার খুব আগ্রহ নিয়ে খান এবং বলেন, অসাধারণ হয়েছে! শাহি খানা।রকিবউদ্দিন ভূইয়া টগরকে দেখে ভুরু কুঁচকে বললেন, কেমন আছ টগর? টগর, বলল, স্যার, ভালো আছি। মা বাড়িতে নেই। স্যার।তোমার মায়ের কাছে আসিনি। অন্য একটা কাজে এসেছি। তোমার মামা কোথায়? তার সঙ্গে কিছু কথা ছিল।স্যার, ছোট মামা পানিতে।বলো কী, এখনো পানিতে! জ্বর আসে নাই?

না। ছোট মামা বরং অনেক ভালো আছেন।তোমার মামার সঙ্গে গতকাল জলচিকিৎসা নিয়ে কথা বলে ভালো লেগেছে। ভাবলাম, আজ যেহেতু হাতে কোনো কাজ নাই, বিষয়টা নিয়ে ভালোমতো আলাপ করি। আমার বাতের ব্যথাও বেড়েছে।স্যার, আপনি কি জলচিকিৎসা করবেন? মামার সঙ্গে পানিতে নামবেন? আরে না। কী বলো তুমি! আমি পানিতে নামব কেন? আমার তো ভীমরতি হয়নি।

পানিতে এখন লবণ দেয়া হয়েছে। লবণ-পানিতে নামলে চিকিৎসা ভালো হবে স্যার।রকিবউদ্দিন আগ্রহ নিয়ে বললেন, লবণ কেন দেয়া হয়েছে? পানির ঘনত্ব যেন সমুদ্রের পানির ঘনত্বের মতো হয় সে জন্য। এতে শরীর ভেসে থাকবে।হুঁ, আর্কিমিডিসের সূত্র। ভালো কথা, চৌবাচ্চার পানি কি ঠাণ্ডা? মনে হয় না। পানি ঠাণ্ডা হলে মামা এতক্ষণ থাকতে পারতেন না।তা ঠিক বলেছে। আমি একটা কথা অবিশ্যি ভাবছি।কী কথা স্যার?

ধরো, আমি যদি ঘণ্টাখানেক জলচিকিৎসা করি, মানে, আমি যেখানে থাকি সেখানে চৌবাচ্চা নাই। জলচিকিৎসার জন্য চৌবাচ্চাটা জরুরি। তাই না? অবশ্যই জরুরি। কোনো অসুবিধা নাই স্যার। জলচিকিৎসা করেন।খালি গায়ে নামতে হয় কি না, তুমি জানো? স্যার, আমি জানি না। জলচিকিৎসা তো আমি কখনো করিনি।বলো দেখি, জলচিকিৎসার ইংরেজি কী? জানি না। স্যার।

Water treatment. একটা কাগজে পঞ্চাশবার লেখো Water treatment। আমি যাই, তোমার ছোট মামার সঙ্গে কথা বলে দেখি। চৌবাচ্চায় দুজনের জায়গা হবে? হবে স্যার।গুড, ভেরি গুড।চৌধুরী আজমল হোসেনের দীর্ঘদিনের রুটিন এলোমেলো হয়ে গেছে। উপাস দিবসের দুপুরের কলা-পাউরুটি উধাও হওয়ার পর তিনি নিয়ম ভঙ্গ করে ভারপেট ভাত-মাছ-মাংস খেয়েছেন। দিবানিদ্রার অভ্যাস তার কোনোকালেও ছিল না। আজ বিছানায় শুয়ে লম্বা ঘুম দিলেন।

সন্ধ্যাবেলায় স্বপ্ন দেখে ঘুম ভািঙল। সেই স্বপ্নও বিচিত্র স্বপ্ন। তিনি চৌবাচ্চায় গলা পর্যন্ত পানিতে ড়ুবিয়ে বসে আছেন। তার সমস্ত শরীর মাছের, শুধু মাথাটা মানুষের। পত্রিকার লোকজন তার ছবি তুলছে। ইন্টারভিউ নিচ্ছে। টিভি ক্যামেরার ক্রুও চলে এসেছে। দাড়িওয়ালা এক উপস্থাপক, দেখতে খানিকটা যুবক বয়সের রবীন্দ্রনাথের মতো, তাকে প্রশ্ন করছে। তিনি আবার আগ্রহের সঙ্গে সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন।আপনার খাদ্য কী?

মানুষ যা খায় আমিও তা-ই খাই। ভাত-মাছ, ফলমূল।কত দিন হলো আপনি পানিতে আছেন? পাঁচ বছর।আপনার শরীর কি আগেই মাছের মতো ছিল, নাকি পরে শরীরে আঁশ গজিয়েছে?সঠিক বলতে পারছি না।মৎস্যজীবন কি আপনার ভালো লাগছে? জি, ভালো লাগছে, তবে ছোট জায়গা তো! আমাকে বড় কোনো পুকুরে বা নদীতে ছেড়ে দিলে আমি আরো ভালো থাকব বলে আমার ধারণা।আপনি কি দর্শকদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?

অবশ্যই বলব। কেন বলব না! দয়া করে ইংরেজি এবং বাংলা, দুই ভাষাতেই কথা বলুন। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়বে। সেখানে আপনি যদি বাংলায় কথা কম বলে ইংরেজি বেশি বলেন, তাহলে ভালো হয়। আরেকটা কথা, আপনি যখন কথা বলবেন তখন আপনার লেজটা নাড়াবেন, লেজ দিয়ে পানিতে বাড়ি দেবেন। তাহলে দৃশ্যটা দৃষ্টিনন্দন হবে। তবে বেশি শব্দ করবেন না। তাহলে আপনার কথা শোনা যাবে না। আপনি কি রেডি?

জি রেডি।লাইটস, ক্যামেরা রোলিং অ্যাকশান! অ্যাকশানে তিনি লেজ দিয়ে পানিতে প্ৰচণ্ড বাড়ি দিলেন।এই শব্দে তার নিজের ঘুম ভেঙে গেল।শব্দের উৎস লেজের বাড়ি না, টগর দাড়াম করে দরজা খুলে ঢুকেছে। সে খুবই উত্তেজিত। উত্তেজনায় সে সামান্য তোতলাচ্ছে।

বড় চাচা, চলে গেছে! কী চলে গেছে? কলা।কী বলছি, কিছুই বুঝতে পারছি না। গুছিয়ে বলো।তিনটা টেবিলে আপনি প্লেটে করে কলা-পাউরুটি রেখেছিলেন। পাউরুটি ঠিকই আছে। শুধু কলা নেই। তিনটা প্লেটে শুধু পাউরুটি পড়ে আছে। বড় চাচা, এটা কি কোনো ভৌতিক কাও? আজমল হোসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আজ কী বার? বুধবার।আজ তোমার টিচার আসার কথা না?

স্যার এসেছেন।যাও পড়তে বসে। ভৌতিক ঘটনার অনুসন্ধান তোমাকে করতে হবে না। আমি দেখছি, ব্যাপারটা কী। তুমি নীলুকে নিয়ে পড়তে বসো। মা বাড়িতে নেই, এই সুযোগে তোমরা সারা দিন ছোটাছুটি, হৈচৈ করেছ। এখন স্যারের কাছে পড়তে বসবে।জি আচ্ছা। চেয়ার-টেবিল কি কলঘরে নিয়ে যেতে বলব? তার মানে কী? চেয়ার-টেবিল কলঘরে নিতে হবে কেন? স্যার তো চৌবাচ্চায় বসে আছেন।

বড় চাচা হতভম্ব হয়ে বললেন, চৌবাচ্চায় বসে আছেন মানে!উনি দুপুরে এসেছেন। তখন থেকেই চৌবাচ্চায় আছেন। ছোট মামার সঙ্গে গল্প করছেন। পান খাচ্ছেন। বড় চাচা, চেয়ার-টেবিল কি কলঘরে নিতে বলব? টেবিল না নিয়ে শুধু চেয়ার নিলেও হয়।আজমল হোসেন গম্ভীর গলায় বললেন, তোমাদের আজ পড়তে বসতে হবে না। সামনে থেকে যাও। তোমার মাকে টেলিফোন করে এক্ষুনি বাড়িতে আসতে বলো।এখানে যে ভূতের উপদ্রব্ব, সেটা কি মাকে বলব?

তাকে বলবে যে বড় চাচা তোমাকে এক্ষুনি আসতে বলেছে। তোমার বাবা কোথায়? তাকে তো আমি দুপুরেই টেলিফোন করে আসতে বললাম।বাবা এসেছিল। আপনি ঘুমুছিলেন বলে আপনাকে আর জাগাইনি।ঠিক আছে, তুমি যাও।টিভি দেখতে পারি বড় চাচা? যা ইচ্ছা করো। আমার সামনে থেকে যাও। সফুরাকে বলে আমাকে চা দিয়ে যেতে।টগর ঘর থেকে বের হতেই নীলু চুকাল। বড় চাচার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে দাদিয়া ডাকে। এক্ষুণি যেতে বলেছে।

চৌধুরী আজমল হোসেন চিন্তিত মুখে মায়ের ঘরের দিকে রওনা হলেন। কোনো একটা সমস্যা বাড়িতে অবশ্যই হচ্ছে। সমস্যার শুরুটা কোথায়? চৌবাচ্চায়? রকিবউদ্দিন ভূইয়ার মতো সিরিয়াস টাইপ একজন হেডমাষ্টার কেন চৌবাচ্চায় গলা ড়ুবিয়ে বসে থাকবে? হারানো কলা তিনটা এখন কোথায়? চৌবাচ্চার পানিতে? পান-ছেঁচনি তো সেখানেই পাওয়া গিয়েছিল।

টগরের দাদিয়া পা ছড়িয়ে খাটে হেলান দিয়ে বসেছেন। তার হাতে পান-ছোঁচনি। তিনি আগ্রহের সঙ্গে পান ছেচে যাচ্ছেন। তঁর মুখ হাসি হাসি। যেন মজার কোনো একটা ঘটনা কিছুক্ষণ আগে ঘটেছে। সেই স্মৃতি তার মাথায়। তাঁর হাসিখুশি অবস্থান বিপজ্জনক। এর মানে তিনি কারো ওপর রেগে আছেন। চরম রাগ।আজমল হোসেন মায়ের পাশে বসতে বসতে বললেন, আজ। আপনার শরীর কেমন?

ফাতেমা বেগম পান ছেচা বন্ধ করে কঠিন গলায় বললেন, তুই পাইছস কী? মানুষ মারতে চাস? মানুষ কেন মারব? শুভ্ৰ যে পানিতে ড়ুব দিয়া আছে, তারে তুলনের ব্যবস্থা নিছস? তুই এই বাড়ির ‘পরধান’। তুই দেখবি না? এমন ভালো একটা ছেলে। যেমন লেখাপড়ায়, তেমন আদব-কায়দায়। হে পইড়া আছে পানিতে।তোলার ব্যবস্থা করছি।

ব্যবস্থা আবার কী? এক্ষণ যা। হাতে ধইরা টান দিয়া তোল।মা শুনেন, হাত ধরে টান দিয়ে যদি তুলি তাহলে আবারো কোনো একদিন সে পানিতে থাকতে চলে যাবে কিংবা এই ধরনের উদ্ভট কিছু কাণ্ড করবে। পানি থেকে তোলার আগে তাকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে যে, ব্যাপারটা হাস্যকর পাগলামি ছাড়া কিছু না। তার মাথা থেকে হিমুর ভূত দূর করতে হবে।কী ভূত?

হিমুর তৃত।তারে কি ভূতে ভর করছে? মুনশি—মওলানা ডাইক্যা আন। ভূতের চিকিৎসা করব মুনশি-মওলানা।সেই ভূত না মা, অন্য ধরনের ভূত। আপনি বুঝবেন না।আমি বুঝব না কী জন্যে? না বুঝলে বুঝাইয়া দে। তাঁরা বুঝদার মানুষ। ভূত-পেতনি এই বাড়িতে যে আছর করছে, এইটা সত্য। আমার পান-ছোঁচনি নিয়া গেল। আবার ফিরত পাইলাম। মাগরেবের নামাজের ওয়াক্তে দেখি আমার চাদরের নিচে তিনটা সাগর কলা।আপনার চাদরের নিচে তিনটা কলা?

এইগুলা কিছু না। এইগুলা ভূতের মজাক। মানুষ যেমন মজাক করে, ভূত-পেরতও করে। আইজ রাখছে কলা, কাইল রাখব। অন্য কিছু।ভূত বলে কিছু নাই মা। এই যন্ত্রণাগুলো মানুষই করছে। কে করছে, কী জন্য করছে। আমি সেটা বের করে ফেলব।ভূত-পেত-জিন-পরী এইগুলা নাই? না, মা।দুই পাতা বই পইড়া বিরাট লায়েক হইছস? কত আচানক ঘটনা চাইরিদিকে ঘটে, সব আপনা-আপনি ঘটে?

সব আচানক ঘটনারই ব্যাখ্যা আছে। এমন কিছু এই পৃথিবীতে ঘটে না, যার ব্যাখ্যা নাই।বাপরে বাপ, তুই তো বিরাট জ্ঞানী হইছস! আজমল হোসেন মায়ের ঠাট্টার একটা জবাব দিতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই নীলুর বিকট চিৎকার শোনা গেল। সে এক চিৎকারে বাড়িঘর কাঁপিয়ে ছুটে এসে দাদিয়ার ঘরে ঢুকল। তার বাম কান দিয়ে ফোটা ফোটা রক্ত পড়ছে।

বাম কানে একটা স্ট্র্যাপলারের পিন লাগানো। ষ্ট্যাপলারের পিন শক্ত হয়ে কানের লতিতে লেগে আছে।আজমল হোসেন কঠিন গলায় বললেন, কে করেছে এই কাজ? কে কানে ষ্ট্যাপলার মেরেছে, টগরি? নিশ্চয়ই টগরের কাজ।নীলু। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, না।তাহলে করেছেটা কে? আমি চুপচাপ বসে গল্পের বই পড়ছিলাম, হঠাৎ দেখি কাণে স্ট্যাপলার।আশপাশে কেউ ছিল না?

না, বড় চাচা।নীলুর দাদিয়া বললেন, আলাপ-আলোচনা পরে কর। আগে এই জিনিস কান থাইক্যা বাইর কর। এইটা যে জিন-ভূতের কাজ, তুই বুঝস না? অত বোকা।আজ শুক্রবার।টগরের বড় চাচার মৌন দিবস। টগরের জন্য বিরক্ত দিবস। কারণ বাড়ির প্রধান ব্যক্তি যদি গভীর মুখে কথা বন্ধ করে বসে থাকেন তখন অন্যদের কথা কম বলতে হয়।

টগর যদি একটু উচু গলায় কথা বলে আমনি মা এসে বলবেন, চুপ। চুপ।।শুক্রবার ছুটির দিন। কার্টুন চ্যানেলে কার্টুন দেখা যায়। সেই কার্টুনও দেখতে হয় লো ভল্যুমে। ছুটির দিন হৈচৈ শব্দ ছাড়া কার্টন দেখে কোনো মজা আছে।তবে আজ ভিন্ন কিছু হতে পারে। টগরের ছোট মামা এখনো চৌবাচ্চায়। এমন বিরাট ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে কি বড় চাচা তার মৌন দিবস পালন করতে পারবেন। তা মনে হয় না।

শুভ্রর ঘটনাও চারদিকে ছড়িয়ে গেছে। আত্মীয়স্বজনরা দেখতে আসছেন। তাদের সঙ্গে ছোট বাচ্চাকাচ্চা যারা আসছে তারা কাছে যেতে ভয় পাচ্ছে। টগরের দায়িত্ব বাচ্চাকাচ্চাদের ভয় ভাঙিয়ে কাছে নিয়ে যাওয়া। বড়রা আগ্ৰহ নিয়ে অনেক প্রশ্ন-ট্রশ্নও করছেন। কিছু কিছু প্রশ্নের জবাব টগর দিচ্ছে। যেমন শুভ্রের দূর সম্পর্কের এক খালা বললেন, পানিতে ছয়-সাত দিন পড়ে থাকলে লাভ কী?

এই প্রশ্নের উত্তরে টগর বলেছে, এটা হিমুদের সাধনা। এই সাধনা করলে হিমুরা পাওয়ার পায়।পাওয়ার পায় মানে কী? টিভিতে দেখেন না। সুপারম্যানদের পাওয়ার আছে। এই রকম পাওয়ার।আকাশে উড়তে পারবে? পারতেও পারে। আত্মীয়স্বজন যারা দেখতে আসছেন তাদের বেশির ভাগই এত বড় ঘটনা নিয়ে ঠাট্টা—তামাশা করছেন। কেউ কেউ আজেবাজে রসিকতাও করছেন। যেমন এক ভদ্রলোক বললেন, তা হিমু বাবাজী পিসাব-পায়খানা কোথায় করছে? চৌবাচ্চাতেই। পানির রঙও মনে হল পাঞ্জাবির রঙের মতো হলুদ!

সুলতানা বাবার বাড়ি থেকে চলে এসেছেন। তার রাগ পড়ে গেছে। এখন তিনি রান্নাঘরে। আত্মীয়স্বজন আসছে নতুন ধরনের কোনো আইটেম রান্না করলে তারা আগ্রহ করে খাবেন। তিনি বানাচ্ছেন মিষ্টি চটপটি। চটপটির সব আইটেম থাকবে সঙ্গে তেঁতুলের রসের বদলে টেবিল চামচে।কয়েক চামচ মধু দিয়ে দেবেন। তেঁতুলের পানি আলাদা দেয়া থাকবে। যারা মধুর সঙ্গে তেঁতুল মেশাতে চান তারা তেঁতুল মেশাবেন।

টগরের বাবা আলতাফ সাহেবকে একটু পর পর টেলিফোন ধরতে হচ্ছে। পরিচিত অপরিচিত লোকজন টেলিফোন করে হিমু হবার বিষয়ে জানতে চাচ্ছে। তিনি সবার সঙ্গেই শুরুতে ভদ্র ব্যবহার করছেন। যেমন পত্রিকা অফিস থেকে একটা টেলিফোন এলো–

আমি দ্বিতীয় আলো পত্রিকা থেকে বলছি।বলুন।এটা কি শুভ্ৰদের বাড়ি? জি।আমরা খবর পেয়েছি শুভ্র গত এক বছর ধরে পানিভর্তি চৌবাচ্চায় বাস করছে।ঘটনা কি সত্যি? আংশিক সত্যি। আজ তৃতীয় দিন সে পানিতে আছে।আমরা খবর পেয়েছি তিনি যে চৌবাচ্চায় বাস করছেন সেই চৌবাচ্চার পানি ছাড়া আর কোনো খাদ্য গ্ৰহণ করছেন না।এই সব উদ্ভট খবর কোথে কে পাচ্ছেন?

আমরা তো নিউজ কালেকশন সিক্রেট আপনাকে বলব না। আমরা সত্য খবর ছাপাতে চাই। আপনি এ ব্যাপারে আমাকে সাহয্য করুন।আমি আমার সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করছি। পুরো ব্যাপারটা ছেলেমানুষি খেলা ছাড়া আর কিছুই না।আপনার সবাই মিলে কেন এই খেলাটা দেখছেন জানতে পারি।

একটা শিশুকে তিন দিন ধরে পানিতে চুবিয়ে রেখেছেন।শিশুকে পানিতে চুবোব কী জন্য? তাহলে কাকে চুবিয়েছেন।চুপ! কী আশ্চর্য গালাগালি করছেন নাকি? থাপ্পড় খাবি।আপনি কি বলেছেন থাপ্পড় খাবি? হ্যাঁ বলেছি। থাপ্লড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দেব। বদমাশ।বদমাশ তো আপনি। চারদিকে হৈচৈ ফেলা দেখার জন্য অবুঝ এক শিশুকে তিন দিন ধরে পানিতে ড়ুবিয়ে রেখেছেন।

আলতাফ সাহেব ঝটি করে টেলিফোন নামিয়ে রেখেছেন। কিছুক্ষণ পর আবার টেলিফোন ধরতে হয়েছে। এবার অপরিচিত। কেউ না। পরিচিতজন। টেলিফোন করেছেন নিউইয়র্ক থেকে। আলতাফ সাহেবের বন্ধু। নিউইয়র্কের বাংলাদেশ মিশনে কাজ করেন।হ্যালো আলতাফ। আমি নিউইয়র্ক থেকে মারুফ।কেমন আছ মারুফ।আমি তো ভালোই আছি তোমার খবর বল। তোমার এক আত্মীয় নাকি উভচর মানবে পরিণত হয়েছে।কী মানব?

উভচর মানব। এমফিবিয়ান ম্যান। বেশির ভাগ সময় সে পানিতে বাস করছে। শুকনায় পাঁচ-দশ মিনিটের বেশি থাকতে পারে না। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।খবরটা সত্যি না।আমি তো ইন্টারনেটে খবরটা দেখলাম।কীসে দেখেছ? ইন্টারনেটে।যে বাড়িতে এমন প্রবল ঝামেলা হচ্ছে সে বাড়ির কর্তব্যক্তি মৌনব্ৰত পালন করতে পারেন না। টগরের বড় চাচা সকাল এগারোটা দশ মিনিটে মৌনব্ৰত ভঙ্গ করে ছোট ভাইকে ডেকে পাঠালেন। গম্ভীর মুখে বললেন, কী করা যায় বল তো।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *