Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হিমু মামা শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

আলতাফ হোসেন বললেন, আপনি অনুমতি দিলে কানে ধরে টেনে তুলি। একটাকে কানে ধরে তুললে অন্যটাও ভয় পেয়ে উঠে পড়বে।অন্যটা মানে। টগরের স্যারও পানিতে? উনি কাল রাত এগারোটার দিকে চলে গিয়েছিলেন। এখন আবার এসেছেন।পানিতে নেমেছে? আমি যতক্ষণ ছিলাম ততক্ষণ পানিতে নামেনি। এখন ফাঁক পেয়ে নেমে গেছে বলে আমার ধারণা। ভাইজান এখন আপনি বলেন-শুভ্ৰকে কান ধরে টেনে তুলব?না।না কেন?

তাকে পানিতে নামার অনুমতি আমিই দিয়েছিলাম। কাজটা সে করছে অনুমতি নিয়ে। এখন তাকে কান ধরে তোলা যায় না।তাহলে আমরা করব কী? একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কথা বলা দরকার। সাইকিয়াট্রিস্ট আসুক। সে কথা বলে বুঝিয়ে-সুজিয়ে শুভ্ৰকে চৌবাচ্চ থেকে তুলুক। নীলুর কানের অবস্থা কী? অবস্থা ভালো। এখন ব্যথা করছে না।তার কানে এই ঘটনা ঘটল কীভাবে?

ভাইজান আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার ক্ষীণ সন্দেহ জিন ভূতের একটা ব্যাপার থাকতে পারে। জগতে অনেক রহস্যময় ব্যাপার তো ঘটে।আমার সঙ্গে ফালতু কথা বলবে না।ফালতু কথা কোনটা বললাম? ঘটনা যা ঘটছে তার এক্সপ্লেনেশন কী? এখন সামনে থেকে যাও। আজ আমার মৌনব্ৰত আর তুমি ক্রমাগত কথা বলাচ্ছ।আলতাফ হোসেন বারান্দায় বসলেন আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সুলতানা তার বিশেষ চটপটি নিয়ে উপস্থিত হলেন। হাসিমুখে বললেন খেয়ে দেখ তো কেমন হয়েছে।

কোনো কথাবার্তা ছাড়াই আলতাফ সাহেব এক চামচ চটপটি মুখে দিলেন। সুলতানা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। সিরিয়াস কোনো ব্যাপার হবে বোঝা যাচ্ছে। আলতাফ হোসেন চটপটির বাটি ছুড়ে মারবেন। এমন সম্ভাবনাও আছে। এই ভেবে আগে থেকেই সস্তা ধরনের বাটি দেয়া হয়েছে।আলতাফ হোসেন প্রথম চামচের পর দ্বিতীয় চামচ মুখে দিলেন। তারপর তৃতীয় চামচ। সুলতানা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন কেমন হয়েছে?

ভালো।সত্যি ভালো? সত্যি ভালো নাতো কি মিথ্যা ভালো? সুলতানা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছেন। টগরের বাবা বাটি প্রায় শেষ করে এনেছেন। শেষ পর্যন্ত একটা আইটেম তাহলে হিট করেছে। এই আইটেমের একটা সুন্দর নাম দেয়া দরকার। একে চটপটি অবশ্যই বলা যাবে না।শুভ্র হিমু সেজেছে বলেই এই চটপটি তৈরি হয়েছে। হিমু নামের সঙ্গে মিল রেখে এর একটা নাম দিতে হয়। এই জিনিস আরেক দফা রাধতে হবে। সুলতানা দ্বিতীয় দফা রান্না চাপিয়ে খাদ্যটার নাম দিয়ে দিলেন। এর নাম হিমুপটি।

দুপুরে লেখা টগরের ডায়েরি।হিমুপটি মা আজ যে চটপটি বানিয়েছে তার নাম হিমুপটি। এই চটপটি খেতে মিষ্টি। তবে কেউ ইচ্ছা করলে মিষ্টির সঙ্গে টক দিতে পারে। হিমুপটি খেতে ভালো হয়েছে। বড়রা সবাই খেয়েছে। আমি এখনো খাই নি। মনে হয় খাব না। হিমু মামা আজ থেকে ছোট মামাকে আমি হিমু মামা ডাকছি। কারণ তিনি তো এখন প্রায় হিমু হয়েই গেছেন। বাকি আছে শুধু গর্ত করে জোছনা দেখা। ছাদে মাটি তোলা আছে। পূর্ণিমার সময় গর্ত করে ছোট মামা। ঢুকে যাবেন। ছোট মামার সঙ্গে আমিও গর্তে ঢুকব। মনে হয় রকিব স্যারও ঢুকবেন।

রকিব স্যার এখনো হিমু মামার সঙ্গে পানিতে বসে আছেন। মনে হয় তিনি খুব মজা পাচ্ছেন। রকিব স্যারের জন্য আমি কলঘরে যেতে পারছি না। কারণ আমাকে দেখলেই তিনি ইংরেজি ট্রানস্লেশন ধরছেন।বাবা রকিব স্যারের ওপর খুব রাগ করছেন। একটু পর পর বলছেন, গাধাটা এখনো পানিতে? শুভ্রের মাথা না হয় খারাপ হয়ে গেছে। গাধাটার মাথা খারাপ হল কেন?

স্যারকে গাধা বলা ঠিক না। স্যারদের সম্মান করতে হয়।টেলিফোন আজ টেলিফোনে আমি অনেক মজা করেছি। টেলিফোনে মজা করলে পাপ হয় কি না। আমি জানি না। মজাতে সবাই আনন্দ পায়। আনন্দ পাওয়া ভালো। কাজেই পাপ কেন হবে? টিভি অফিস থেকে এক ভদ্রলোক টেলিফোন করেছিলেন। প্রথমেই তিনি বললেন, তুমি কে?আমি বললাম, আমার নাম টগর।তুমি কোন ক্লাসে পড়? সিক্সথ গ্রেডে পড়ি। শোনা খোকা তোমাদের বাসায় কে নাকি অনেক দিন হল পানিতে বাস করে। সত্যি নাকি?

জি।কত দিন হল? পাঁচ বছর।বল কি? সত্যি? জি।কেন পানিতে বাস করছে? উনি মাছ হয়ে গেছেন তো এই জন্য! মাছদের পানিতে থাকতে হয়।মাছ হয়ে গেছেন মানে কী? অর্ধেকটা মাছ অর্ধেকটা মানুষ। মাছ মানব।খোকা শোন, মাছ হয়ে গেছে বলতে কী মিন করছে? দেখতে মাছের মতো হয়ে গেছে? আপনাকে কী বললাম! মাছ মানব। অর্ধেকটা মাছ অর্ধেকটা মানুষ। আমি এখন তাকে ডাকি মাছ মামা।

আমি ফটোগ্রাফার নিয়ে আসছি ছবি তুলব।ফটোগ্রাফার নিয়ে এলো লাভ হবে না।কারণ মাছ মামাকে বড় একটা পানির ড্রামে ভরে নিয়ে গেছে।কোথায় নিয়ে গেছে? রাজশাহী। উনার বাড়ি রাজশাহীতে। সেখানে তাদের বড় পুকুর আছে। মাছ মামাকে পুকুরে ছেড়ে দেবে।কখন নিয়ে গেছে? আজ সকালে। আমারও যাবার কথা ছিল। আগামীকাল আমার ইংরেজি পরীক্ষা এই জন্য যেতে পারিনি।রাজশাহীর যে বাড়িতে তোমার মামাকে পাঠানো হয়েছে তার ঠিকানা জান?জানি। বলব?

একটু দাড়াও কলামটা বের করি।আমি ভদ্রলোককে ঠিকানা বললাম। ছোট মামার বাড়ির ঠিকানা বললাম। আমার ধারণা টেলিভিশনের এই ভদ্রলোক ক্যামেরা-ট্যামেরা নিয়ে রাজশাহী চলে যাবেন।সাইকিয়াট্রিস্ট আজ রাতে আমাদের বাসায় সাইকিয়াট্রিস্ট আসবেন। হিমু মামার চিকিৎসা করে তাঁকে পানি থেকে তুলবেন। সাইকিয়াট্রিস্ট হল পাগলের ডাক্তার। সাইকিয়াট্রিস্টের নামের বানান আমি জানি। ডিকশনারি দেখে শিখেছি–Psychitrist.

টপিক- টগরদের বাড়িতে সাইকিয়াট্রিস্ট রাত নটা। টগরদের বাড়িতে সাইকিয়াট্রিস্ট এসেছে। ভদ্রলোকের নাম এম শামসুল হক। নামের শেষে পিএইচডি আছে।টগর দূর থেকে এই পিএইচডিওয়ালাকে দেখেছে। তাকে দেখেই মনে হচ্ছে তিনি জ্ঞানী। জ্ঞান তার কথাবার্তা এবং চেহারায় ঝরে পড়ছে। ভদ্ৰলোকের হাসির মধ্যেও জ্ঞান-জ্ঞান ভাব আছে।

মাথা সামান্য নিচু করে হাসেন। হাসির সময় চশমার ফাক দিয়ে তাকান। যার দিকে তাকিয়ে হাসেন তার বুক সামান্য হলেও ধক করে ওঠে। সে হাসি দেখে মনে করে, তার সব গোপন কথা এই ভদ্ৰলোক জেনে ফেলেছেন। অন্তত টগরের সে রকমই মনে হচ্ছে।ভদ্ৰলোক তার দিকে তাকিয়ে তার বিখ্যাত হাসি হেসে বললেন, তোমার নাম কী খোকা?

টগর।তুমি ট্যারা নাকি? টগর সঙ্গে সঙ্গে চোখ ঠিক করে বলল, হ্যাঁ।ট্যারা হওয়া সে এখন মোটামুটি শিখেছে। বাড়িতে নতুন কাউকে দেখলেই ট্যারা হয়ে তার দিকে তাকায়। সাইকিয়াট্রিস্টের দিকে তাকানো বোধ হয় ঠিক হয়নি। সে সামনে থেকে সরে গেল, তবে বেশি দূরে গেল না। আশপাশেই থাকল। ভদ্রলোক কোন পদ্ধতিতে ছোট মামার মাথা থেকে হিমু ভূত দূর করেন তা ভালোমতো দেখার আগ্রহ টগরের প্রবল। ভদ্রলোকের কাণ্ডকারখানা পছন্দ হলে সে নিজেও বড় হয়ে সাইকিয়াট্রিস্ট হবে।

চৌধুরী আজমল হোসেন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে আলাদা বসেছেন। ঘরে আর কেউ নেই। জানালার পর্দার ওপাশে টগার দাঁড়িয়ে। এখান থেকে দুজনকে দেখা যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কথাবার্তা তেমন শোনা যাচ্ছে না।সাইকিয়াট্রিস্ট বললেন, শুভ্ৰ নামের রোগীটির যে মনোবিকার ঘটেছে, সেটা চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু না। একে বলে ডিলিউশান। তার ধারণা হয়েছে, সে হিমু নামক ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে।ডিলিউশান কেন হয়েছে?

ডিলিউশান তৈরির নানা কারণ থাকতে পারে। রোগীর সঙ্গে ভালোমতো কথা না বলে তা বলা যাবে না। তবে আমরা সবাই কিছু না কিছু ডিলিউশন নিয়ে বাস করি। বিরাট বড় মিথ্যাবাদীর মনেও ডিলিউশন তৈরি হয় যে সে মিথ্যাবাদী না, সত্যবাদী। যা বলছে সবই সত্যি বলছে।এই জিনিস দূর করার উপায় কী?

শরীরের রোগের চিকিৎসা ডাক্তাররা ওষুধপত্র দিয়ে করেন। শরীরের রোগের নির্দিষ্ট ওষুধ আছে। সেখানে মনের রোগ নির্দিষ্ট কোনো বিষয় না। একেক জনের জন্য এই রোগ একেক রকম। চিকিৎসার ধরনও সেই জন্যই নানা রকম। যে ডিলিউশানে ভুগছে, প্রথমে তার বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। যে সাইকিয়াট্রিস্ট এই কাজটা পারবেন, তিনিই শুধু রোগীর চিকিৎসা করতে পারবেন।আপনি সেই বিশ্বাস অর্জন কীভাবে করবেন?

শুভ্ৰ নামধারী যে ডিলিউশানে ভুগছে আমি তা স্বীকার করে নেব। সে যখন বলবে, আমি হিমু। আমি সঙ্গে সঙ্গে বলব। অবশ্যই তুমি হিমু। ভালো কথা, আপনি আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন তো হিমু জিনিসটা কী? আমিও ঠিকমতো জানি না জিনিসটা কী।অসুবিধা নেই, আমি জেনে নেব। তারপর অগ্রসর হব সেই পথে।চলুন, আপনাকে নিয়ে যাই।না, আপনারা কেউ যাবেন না। আমি একা তার সঙ্গে কথা বলব।

আজমল হোসেন বললেন, শুভ্রর কাছে যাওয়ার আগে আরেকটা ছোট্ট কথা বলি। শুভ্ৰ পানিতে নামার পর থেকে এ বাড়িতে কিছু ভৌতিক ঘটনা ঘটছে, তার কি কোনো ব্যাখ্যা আপনার কাছে আছে? অবশ্যই আছে। কেউ যখন ডিলিউশানে আক্রান্ত হয় তখন তার ছায়া আশপাশের সবার ওপর খানিকটা হলেও পড়ে। যেকোনো একটা ভৌতিক ঘটনার কথা বলুন, আমি তার ব্যাখ্যা দেই।

আজমল হোসেন বললেন, আমার নিজের কথাই বলি। আমি দুপুরবেলা এক স্লাইস রুটি আর একটা কলা খাই। আমাকে এই ঘরে খাবার দিয়ে গেছে। আমি ঘরেই আছি। ঘর থেকে বের হইনি। হঠাৎ দেখি কলা-রুটি কোনোটাই নেই। উধাও। কলার খোসাটা শুধু পড়ে আছে।সাইকিয়াট্রিস্ট বললেন, কলা এবং রুটি আপনি নিজেই খেয়ে ফেলেছেন। বাসার ঝামেলায় আপনার মন ছিল বিক্ষিপ্ত।

কখন খেয়েছেন সেটা ভুলে গেছেন। সাইকিয়াট্রিস্টের ভাষায় একে বলে সাময়িক এমনেশিয়া।আমি নিজেই খেয়েছি? অবশ্যই। যদি ভাত-মাছ খেতেন। হাতে ঝোল লেগে থাকত। সেখান থেকে বুঝতে পারতেন। আপনি নিজেই খাবারটা খেয়েছেন। যেহেতু খাবারটা ছিল শুকনা, হাতে কিছু লেগে ছিল না।আপনার ধারণা আমি নিজে খেয়ে তুলে গেছি?

ব্যাখ্যা তো দিলাম। ব্যাখ্যা কি বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না? আপনি যা বলছেন তা হতে পারে। শুভ্ৰকে পানি থেকে তুলতে আপনার কতক্ষণ লাগবে।আধঘণ্টার বেশি লাগার তো কথা না। অবস্থাটা দেখি। আপনারা কেউ আমার সঙ্গে যাবেন না। প্লিজ। কেউ যেন উঁকিঝুঁকিও না দেয়।

সাইকিয়াট্রিস্ট এম শামসুল হক পিএইচডি কলঘরে ঢুকে একটা ধাক্কার মতো খেলেন। তিনি ভেবেছিলেন অল্পবয়সী একটা ছেলে চৌবাচ্চার পানিতে গলা ড়ুবিয়ে বসে থাকবে। অথচ দেখা যাচ্ছে থলথলে মোটাসোটা এক বৃদ্ধ বসে আছে। বৃদ্ধের মাথার সব চুল সাদা।সাইকিয়াট্রিস্ট বললেন, কেমন আছেন?

জি জনাব, ভালো আছি।কতক্ষণ আছেন। পানিতে? অনেকক্ষণ তো হয়ে গেল।আপনার নামটা কি আমি জানতে পারি? রকিবউদ্দিন ভূইয়া।সাইকিয়াট্রিস্টের ভুরু কুঁচকে গেল। তিনি শুনেছেন পেশেন্টের নাম শুভ্ৰ। এখন পেশেন্ট বলছে তার নাম রকিবউদ্দিন ভূইয়া। এ রকম অবশ্য হয়। ডিলিউশনের পেশেন্ট নিজের নাম নিয়েও বিভ্রান্ত হয়। একেক সময় নিজেকে একেক রকম কল্পনা করে।

সাইকিয়াট্রিস্ট বললেন, হিমু বলে কাউকে চিনেন? হিমু নাম শুনেছেন? আগে কোনো দিন শুনি নাই। পানিতে নামার পরে শুনেছি।সাইকিয়াট্রিস্ট মনে মনে হাসলেন। রোগ কতদূর অগ্রসর হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। পানিতে নেমেই সে হিমুর সন্ধান পেয়েছে। সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধুর মতো গলায় বললেন, হিমু সম্পর্কে কিছু বলুন শুনি।রকিবউদ্দিন বললেন, পানিতে নামেন তারপর বলব। দুইজন দুই জায়গায় থেকে কীসের কথা? পানিতে নামতে বলছেন?

হুঁ। নেমে দেখেন আরাম লাগবে। শরীর হালকা হয়ে যাবে। শরীরের ভিতরই বাস করে মন। যেহেতু শরীর হালকা সেই কারণে মনও হবে হালকা।এইসব কি আপনার কথা? জি না। হিমুর কথা। হিমুর আরো অনেক কথা জানি। পানিতে নামেন বলব। শুভ্ৰ থাকলে সে গুছিয়ে বলতে পারত। সে কিছুক্ষণ আগে উঠে গেল।সাইকিয়াট্রিস্ট আবারো মনে মনে হাসলেন। ডিলিউশানের গতি-প্রকৃতি ধরা পড়ছে। এখন এই লোক শুভ্রের নাম নিচ্ছে। শুভ্ৰ উঠে গেছে, সে বসে আছে। সাইকিয়াট্রিস্ট রোগীকে প্যাচে ফেলাবার ভঙ্গিতে বললেন। শুভ্র? শুভ্ৰ কে?

সে হিমু।শুভ্ৰ, হিমু আর আপনি একই মানুষ, না? চট করে জবাব দেবেন না। ভেবেচিন্তে বলুন।জি না। এক মানুষ হব কেন? আমি যদি বলি আপনি শুভ্র আবার আপনিই হিমু। পানির এক রূপ বরফ, আরেক রূপ বাম্প। আপনি সাপ আবার আপনিই ওঝা।আপনি বললে তো হবে না। আমি কী, সেটা আমি জানি।

না, আপনি জানেন না। যাই হোক বুঝিয়ে বলছি।বুঝিয়ে বলার আগে পানিতে নামেন। তারপর যত ইচ্ছা বুঝান।নামছি। নামছি।আজমল হোসেন ইজিচেয়ারে বি॥ম ধরে বসে আছেন। তাকে খুবই চিন্তিত মনে হচ্ছে। তিনি খবর পেয়েছেন। শুভ্ৰ পানি থেকে উঠেছে। নিজের ঘরে বসে চা খাচ্ছে। তবে সাইকিয়াট্রিস্ট নেমে পড়েছে পানিতে। সে পানিতেই আছে।

পরিশিষ্ট

[টগরের লেখা ডায়েরির অংশ]

আমাদের বাড়িতে যে ভৌতিক উপদ্রব হয়েছিল তার রহস্য ভেদ হয়েছে। সব করেছে নীলু। সে মার কাছে স্বীকার করেছে সে নিজেই ষ্ট্যাপলার দিয়ে তার কান ফুটো করেছে। তাকে নিয়ে গতকাল রাতে বিচারসভা বসেছিল। বড় চাচা তাকে বলেছেন, মা নীলু, তোমাকে আমি অত্যন্ত স্নেহ করি। তুমি যদি তোমার সব অপরাধ স্বীকার করে তাহলে আমার স্নেহের পরিমাণ আরো বাড়বে। তুমি অনেক দিন থেকে একটা ওয়াকম্যান চাচ্ছিলে, আমি নিজে সেই ওয়াকম্যান কিনে দেব। মা, এখন বলো তুমি কি তোমার দাদিয়ার পান-ছেঁচনি লুকিয়ে রেখেছিলে?

নীলু সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ্যাঁ। [সে এটা বলল, বড় চাচার বেশি স্নেহ পাওয়ার জন্য এবং ওয়াকম্যানটা পাওয়ার জন্য।]

বড় চাচা বললেন, তুমি যে অপরাধ স্বীকার করেছ এতে আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি। মা, এখন বলো তুমি নিজেই কি তোমার অঙ্ক বই লুকিয়ে রেখে বলেছ বই খুঁজে পাচ্ছ না? হ্যাঁ।কেন এই কাজটা করলে? আমি জানি না, বড় চাচা।আর কখনো এ ধরনের কাজ করবে? না? আমার ঘর থেকে কলা এবং পাউরুটি তুমিই তো সরিয়েছিলে। তাই না, মা? হ্যাঁ, আমি।তোমার সত্যবাদিতায় আমি মুগ্ধ হয়েছি। ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলো। আমি এক্ষুনি তোমাকে ওয়াকম্যান কিনে দেব।থ্যাঙ্ক য়্যু, বড় চাচা।

নীলু তার ওয়াকম্যান পেয়েছে। আমাকে হাত দিতে দেয় না। এমন পাজি মেয়ে।ছোট মামা হিমু হওয়া কিছু দিনের জন্য বাদ রেখেছে। কারণ সামনেই তার পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ হলেই সে হিমু হওয়ার সেকেন্ড পার্টে যাবে। সেকেন্ড পার্টে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে সেই গর্তে ঢুকে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে হবে। সমস্ত শরীর থাকবে গর্তের ভেতর। গর্তের ওপর শুধু মাথাটা বের হয়ে থাকবে। ছোট মামা বলেছে জোছনা দেখার সময় আমি তার সঙ্গে থাকতে পারি।

আমি একবার ভেবেছিলাম বড় হয়ে সাইকিয়াট্রিস্ট হব। এখন ঠিক করেছি সাইকিয়াট্রিস্ট হব না। কারণ সাইকিয়াট্রিস্ট হলে সবাই আমাকে গাধার বাচ্চা গাধা বলে গালি দিবে।আমাদের বাসায় যে সাইকিয়াট্রিস্ট এসেছিলেন তাকে আমাদের বাসার সবাই গাধার বাচ্চা বলে গালি দিয়েছে। কারণ তিনি এসেছিলেন ছোট মামার চিকিৎসা করতে।

তার বদলে তিনি পানিতে ড়ুবে রকিব স্যারের চিকিৎসা করেছেন। তিনি সব মিলিয়ে তিন ঘণ্টা পানিতে ছিলেন। তিন ঘণ্টা পর স্যারকে নিয়ে পানি থেকে উঠলেন। পানি থেকে উঠে ভেজা কাপড়ে বড় চাচার ঘরে ঢুকে বললেন, রোগ অত্যন্ত কঠিন পর্যায়ে আছে। তবে অনেকটা সামলে ফেলেছি, আর দশটা সেশন পার করলেই উনি বুঝতে পারবেন উনি আসলে রকিবউদ্দিন ভূঁইয়া না, ওনার আসল নাম শুভ্ৰ।

বড় হয়ে আমি কী হব সেটা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তা হচ্ছে। ছোট মামাকে জিজ্ঞেস করে ঠিক করে ফেলতে হবে। আমাদের স্কুলের সবাই ঠিক করে ফেলেছে বড় হয়ে কে কী হবে। শুধু আমিই এখনো ঠিক করতে পারিনি। ছোট মামার সঙ্গে যখন হিমু হওয়ার ট্রেনিং নেব তখন ঠিক করে ফেলব।আসল কথা লিখতে ভুলে গেছি, আমি এখন ট্যারা হতে পারি। অনেকক্ষণ থাকতেও পারি। স্কুলে এখন সবাই আমাকে ডাকে ট্যারা টগর!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *