মজিদকে আমার একবার তাজমহল দেখানোর ইচ্ছা । শুধু দেখার জন্যে সত্যি সত্যি সে কী করে । বা আসলেই কিছু করে কিনা! দশদিন পর মজিদের সঙ্গে আমার দেখা- সে একবার মাত্র মাথা ঘুরিয়ে তাকাল । তার পরপরই পত্রিকা পড়তে লাগল বছরখানিক আগের বাসি একটা ম্যাগাজিন । একবার জিজ্ঞেস করল না, আমার খবর কী? আমি কেমন । এতদিন কোথায় ছিলাম । আমি বললাম, তোর খবর কী রে মজিদ ? মজিদ এ প্রশ্নের উত্তর দিল না । অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের উত্তর সে দেয় না । তোর আজ টিউশনি নেই ? ঘরে বসে আছিস যে ?
আজ শুক্রবার।
তখন মনে পড়ল ছুটির দিনে যখন হাতে তার কোনো কাজ থাকে না, তখনই সে ম্যাগাজিন জোগাড় করে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ঘুমায়, আবার জেগে উঠে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টায়, কিছুক্ষণ পর আবার ঘুমিয়ে পড়ে । জীবনের কাছে তার যেন কিছুই চাওয়ার বা পাওয়ার নেই । চার পাঁচটা টিউশনি, মাঝেমধ্যে কিছু খুচরা কাজ এবং প্রুফ দেখার কাজেই সে খুশি । বিএ পাস করার পর কিছুদিন সে চাকরির চেষ্টা করেছিল । তারপর- ধুর আমার হবে না এই বলে সব ছেড়েমুড়ে দিল ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৭
আমি একবার বলেছিলাম, সারাজীবন এই করেই কাটাবি নাকি ? সে বলল, অসুবিধা কী ? তুই তো কিছু না করেই কাটাচ্ছিস ।
আমার অবস্থা ভিন্ন । আমার কোনো দায়দায়িত্ব নেই, তাছাড়া আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট করছি, তুই তো কিছু করছিস না ।
মজিদ কিছুই বলল না । আমি ভেবেছিলাম, একবার হয়তো জিজ্ঞেস করবে কিসের এক্সপেরিমেন্ট, তাও করল না । আসলেই তার জীবনে কোনো কৌতুহল নেই । রূপাকে অনেক বলে-কয়ে একবার রাজি করেছিলাম যাতে সে মজিদকে নিয়ে চিড়িয়াখানা থেকে ঘুরে আসে । আমার দেখার ইচ্ছা একটি অসম্ভব রূপবতী এবং বুদ্ধিমতী মেয়েকে পাশে পেয়ে তার মনের ভাব কী হয় । আগের মতোই সে কি নির্লিপ্ত থাকে, না জীবন সম্পর্কে খানিকটা হলেও আগ্রহী হয় । আমার প্রস্তাবে রূপা প্রথমে খুব রাগ করল । চোখ তীক্ষ্ণ করে বলল, তুমি নিজে কখনো আমাকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় গিয়েছ ? চিনি না জানি না একটা ছেলেকে নিয়ে আমি যাব । তুমি আমাকে পেয়েছ কী ?
সে যতই রাগ করে,আমি তত হাসব । আমার হাসি দেখে আরো রাগবে । আমি আরো হাসব । সে হাল ছেড়ে দেবে । এবারো তাই হলো । সে মজিদকে নিয়ে যেতে রাজি হলো । আমি এক ছুটির দিনে মজিদকে বললাম, তুই চিড়িয়াখানা থেকে ঘুরে আয় । পত্রিকায় দেখলাম জিরাফ এসেছে ।
মজিদ বলল, জিরাফ দেখে কী হবে ?
কিছুই হবে না । তবু দেখে আয় ।
ইচ্ছা করছে না ।
আমার এক দূর-সম্পর্কের ফুপাতো বোন-বেচারির চিড়িয়াখানা দেখার শখ। সঙ্গে কোনো পুরুষমানুষ না-থাকায় যেতে পারছে না। আমার আবার জন্ত্ত-জানোয়ার ভালো লাগে না । তুই তাকে নিয়ে যা ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৭
মজিদ বলল, আচ্ছা । আমার ধারণা ছিল রূপাকে দেখেই মজিদ ধাক্কা খাবে । সেরকম কিছুই হলো না । রূপা গাড়ি নিয়ে এসেছিল। মজিদ গম্ভীর মুখে ড্রাইভারের পাশে বসল ।
রূপা হাসিমুখে বলল, আপনি সামনে কেন ? পেছনে আসুন । দুজন গল্প করতে করতে যাই । মজিদ বলল, আচ্ছা ।
মজিদ পেছনে এসে বসল । তার মুখ ভাবলেশহীন । একবার ভালো করে দেখলও না তার পাশে যে বসে আছে সে মানবী না অপ্সরী ।
ফিরে আসার পর জিজ্ঞেস করলাম, কেমন দেখলি ?
ভালােই ।
কথা হয়েছে রূপার সঙ্গে ?
হু ।
কী কথা হলো ?
মনে নেই ।
Read More
