হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২০

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২০

জি আচ্ছা ।

আমার সামনে টেলিফোন দিয়ে জামান সরে গেল ।

এইটুকু ভদ্রতা আছে । অধিকাংশ দোকানেই টেলিফোন করতে দেয় না । টাকা দিয়েও না । যদিও দেয় -রিসিভারের আশেপাশে ঘুরঘুর করে কী কথা হচ্ছে শুনবার জন্যে ।

হ্যালো, কে কথা বলছেন ?

তুমি কি মীরা ?

হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি মীরা । আপনি কে আমি বুঝতে পারছি-আপনি টুটুল ।

আসল জন না । নকল জন ।

ঐদিন খট করে টেলিফোন নামিয়ে রাখালেন কেন ? আমার অসম্ভব কষ্ট হয়েছিল । টেলিফোন নামিয়ে রাখিনি তো! হঠাৎ লাইন কেটে গেল ।

আমিও তাই ভেবেছিলাম । অনেকক্ষণ টেলিফোনের সামনে বসেছিলাম । লাইন কেটে গেলে তাহলে আবার  করলেন না কেন ?

টাকা ছিল না ।

টাকা ছিল না মানে ?

আমি তো বিভিন্ন দোকান-টোকান থেকে টেলিফোন করি দুটা টাকা পকেটে নিয়ে যাই ।  আরেকবার  করতে হলে আরো দু-টাকা লাগবে । বুঝতে পারছ ? এখন আপনার সরে টাকা আছে তে ?

আছে ।

ঐদিন আপনার টেলিফোন পাওয়ার পর বাবাকে সব বললাম । বাবাকে তো চেচেন না । বাবা খুবই রাগী মানুষ । তিনি প্রথমে আমাদের দুজনকে খুব বকা দিলেন  – আপনাকে রাস্তা থেকে তোলার জন্যে এবং পথে নামিয়ে দেবার জন্যে । তারপর ….আচ্ছা, আমার কথা শুনছেন তো?

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২০

 

হ্যাঁ । শুনছি ।

তারপর বাবা গাড়ি বের করে থানায় গেলেন । ফিরে এলেন মন খারাপ করে । মন খারাপ করে ফিরলেন কেন ?

কারণ ওসি সাহেব আপনার সম্পর্কে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলছেন । আপনি নাকি পাগল ধরনের । তার ওপর কবি ।

হ্যাঁ । আপনি যে কবিতার খাতাটা থানায় ফেলে এসেছিলেন বাবা সেইটিও নিয়ে এসেছেন ।

তাই নাকি ?

হ্যাঁ । আমি সবগুলো কবিতা পড়েছি ।

কেমন লাগল ?

ভালো । অসাধারণ !

সবচে’ ভালো লাগল কোনটা ?

বলব ? আমার কিন্ত্ত মুখস্থ । কবিতাটার নাম রাত্রি ।

পরীক্ষা নিচ্ছি । দেখি সত্যি সত্যি তোমার মুখন্থ কিনা । কবিতাটা বল । মীরা সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি করল –

অতন্দ্রিলা,

ঘুমাওনি জানি

তাই চুপিচুপি গাঢ় রাত্রে শুয়ে বলি শোনো,

সৌর তারা-ছাওয়া এই বিছানায় সূক্ষ্মজাল রাত্রির মশারি

কত দীর্ঘ দুজনার গেল সারাদিন,

আলাদা নিঃশ্বাসে-

এতক্ষণে ছায়া-ছায়া পাশে ছুই

কী আশ্চর্য দুজনে পাশে, দুজনা

অতন্দ্রিলা, হঠাৎ কখন শুভ্র বিছানায় পরে জোছনা ।

দেখি তুমি নেই ।

কবিতা সে আবৃত্তি করল চমৎকার । আবৃত্তির শেষে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কী, বলতে পারলাম ?

হ্যাঁ, পারলে । তোমার স্মৃতিশক্তি ভালো । তবে কবিতা সম্পর্কে কোন ধারনা নেই । কেন, এটা কি ভালো কবিতা না ?

অবশ্যই ভালো । তবে আমার লেখা না । আমিয় চক্রবতীর ।

আপনার নোটবইয়ের সব কবিতাই কি অন্যের ?

হ্যাঁ । মাঝে মাঝে কিছু কবিতা পড়ে মনে হয় এগুলি আমারই লেখার কথা ছিল কোনো কারণে লেখা হয়নি । তখন সেটা নোটবুকে টুকে রাখি ।

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২০

 

আপনি খুব কবিতা পড়েন ?

না । একেবারেই না । তবে আমার একজন বান্ধবী আছে । সে খুব পড়ে এবং জোর করে আমাকে কবিতা শোনায় ।

ওর নাম কী ?

ওর নাম রূপা । তবে আমি তাকে মাঝে মাঝে ময়ূরাক্ষী ডাকি । বাহ, কী সুন্দর নাম!

সে কিন্ত্ত এই নাম একবারেই পছন্দ করে না ।

কেন বলুন তো ?

কারণ এই নামে এলিফেন্ট রোডে একটা জুতার দোকান আছে । মীরা খিলখিল করে হেসে উঠল ।

অনেকক্ষণ পর্যন্ত হাসল । মনে হলো মেয়েটা যে পরিবেশে বড় হচ্ছে সেই পরিবেশে কেউ রসিকতা করে না । সবাই গম্ভীর হয়ে থাকে । সামান্য রসিকতা এই কারণেই সে এতক্ষণ ধরে হাসছে ।

হ্যাঁলো, আপনি কিন্ত্ত টেলিফোন রাখবেন না ।

আচ্ছা, রাখব না ।

ঐদিন আপনার সঙ্গে কথা বলার পর থেকে এমন হয়েছে, টেলিফোন বাজার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যাই । মনে হয় আপনি টেলিফোন করেছেন ।

তাই নাকি ?

হ্যাঁ । আরেকটা ব্যাপার বলি-মা আপনার জন্যে খুব চমৎকার একটা পাঞ্জাবি কিনে রেখেছেন ।

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২১

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *