• Wednesday , 25 November 2020

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২৮

কাশির রাজপথে আপাদমস্তক বোরকায় ঢাকা এক তরুণী হেঁটে যাচ্ছে । তরুণী হঠাৎ থমকে দাঁড়াল । রাস্তার পাশে বসে থাকা এক বৃদ্ধের সামনে এসে দাঁড়াল । তরুণী বলল, আমি আপনাকে চিনি । আপনার নাম মনে নেই, কিন্তু আমি আপনাকে চিনি ।

বৃদ্ধ বলল, আমি আপনাকে চিনি না । আপনাকে চিনতেও চাচ্ছি না ।

তরুণী বলল, হুমায়ূন-কন্যা আকিকা বেগম এবং তার বান্ধবী অম্বাকে কি আপনি চেনেন ?

আমি কাউকে চিনি না ।

এই দুজনকে আপনি আগুনে নিক্ষেপ করেছিলেন ।

বৃদ্ধ বলল, তুমি উন্মাদিনী । উন্মাদিনীর সঙ্গে আমি কথা বলি না । তরুণী আমাদের পরিচিত । তার নাম আসহারি । সম্রাট হুমায়ূন তাকে ‘আগ্রার বুলবুলি’ উপাধি দিয়েছিলেন । চৌসার যুদ্ধে সে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল । সাঁতরে তীরে উঠেছে । সম্রাট-কন্যার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটনার সে একজন প্রত্যক্ষদর্শী । আসহারি অপেক্ষায় আছে কোনো একদিন সম্রাট হুমায়ূনকে ঘটনাটি জানাবে ।

শের শাহ্ কাজ্ঞীর দুর্গ পরিদর্শনে গিয়েছেন । দুর্গপ্রাচীরের কামানগুলির অবস্থা কী দেখছেন । হঠাৎ একটি গোলাভরা কামান বিস্ফোরিত হলো । শের শাহ্ লুটিয়ে পড়লেন । মৃত্যুর আগে কিছুক্ষণের জন্যে তাঁর জ্ঞান ফিরল । তিনি বিড়বিড় করে বললেন, আমি মারা যাচ্ছি । দিল্লীর সিংহাসন আমি প্রথম পুত্র জালাল খাঁ’র জন্যে নির্ধারণ করেছি । পুত্র জালাল খাঁ সিংহের মতো সাহসী । একমাত্র সে-ই পারবে মোঘলদের হাত থেকে সিংহাসন রক্ষা করতে । আমার মন বলছে হুমায়ূন হারানো সিংহাসন পেতে ফিরে আসবেন ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৮

জালাল খাঁ ইসলাম শাহ্’ নাম নিয়ে দিল্লীর সিংহাসনে বসলেন । ইসলাম শাহ্ কাব্যানুরাগী মানুষ ছিলেন । নিজে শের লিখতে পারতেন না, যারা পারত তাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা সীমা ছিল না । মানুষ হিসেবে তাঁর অন্য গুণাবলিও ছিল । মদ্যপান বা কোনো নেশাজাতীয় বস্তুর প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না ।

শের শাহ্ সম্পূর্ণ হিন্দুস্থানের রাস্তাঘাট বানানোর যে কাজ শুরু করেছিলেন, ইসলাম শাহ্ সেই কাজ শেষ করতে চেয়েছিলেন ।

দিল্লীর মানুষজন ইসলাম শাহকে পছন্দ করত ।

মুণ্ডিত মস্তক শ্মশ্রুবিহীন মীর্জা কামরান দিল্লীর সম্রাট ইসলাম শাহ্’র সামনে বসে আছেন । কামরানকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে । ইসলাম শাহ্ রসিকতা করে বললেন, আপনাদের মহিলারাও কি আপনার মতো মাথার চুল কামিয়ে ফেলে ?

কামরান সঙ্গে সঙ্গে বললেন, না । তারা আপনাদের মতো বিশাল গোঁফ রাখে ।

ইসলাম শাহ্ হাসতে হাসতে বললেন, আপনার রসবোধ দেখে মুগ্ধ হলাম । আপনি চমৎকার শের লেখেন জানতাম । রসিকতা করতে পারেন জানতাম না । আপনার একটি শের শোনান ।

কামরান আবৃত্তি করলেন-

গর্দিশে গরদূনে গরদ না রা দর্গ কর্দ

বর সরে আহলে তমীজা ওয়া নাকি সারা মর্দ কর্দ

(ললাটের এমনই লিখন যে সে শ্রেষ্ঠ জনকে মাটিতে মেশায়

যোগ্যদের মাথার উপর অযোগ্যদের বসায় )

ইসলাম শাহ্ গম্ভীর হয়ে বললেন, আপনি কি আমার প্রতি ইঙ্গিত করছেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৮

কামরান বললেন, না । রসিকতা করলাম । একটু আগে আপনি আমার রসবোধের প্রশংসা করেছেন বলেই শেরের মাধ্যমে রসিকতা । আপনি নিজে খুব ভালো করে জানেন যোগ্যরাই থাকে । অযোগ্যরা ধুলায় মিশে যায় ।

ইসলাম শাহ্ বললেন, আপনি নিজেকে কী ভাবেন ? যোগ্য না অযোগ্য ?

কামরান বললেন, সময় ঠিক করে দেবে আমি যোগ্য না অযোগ্য । তবে হুমায়ূন অযোগ্য তাতে সন্দেহ নাই।

ইসলাম শাহ্ বললেন, কান্দাহার যুদ্ধে আপনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন ।

আমি বিভ্রান্ত ছিলাম । পারস্য-সম্রাট হুমায়ূনকে আমার হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন । পারস্যবাহিনীকে দেকে আমি ভেবেছি তারা হুমায়ূনকে বন্দি করে নিয়ে আসছে ।

কাবুলের যুদ্ধেও আপনি পরাজিত হয়েছেন ।

এখানে আমার হিসাবে কিছু ভুল হয়ে গিয়েছিল । অতীতে দেখেছি যে-কোনো যুদ্ধে জয় লাভের পর হুমায়ূন পানাহারের উৎসব বসান । ‍দিনের পর দিন উৎসব চলতে থাকে । আমি কল্পনাও করি নাই হুমায়ূন তৎক্ষণাৎ কাবুলের দিকে যাত্রা করবেন । আমি দুর্গ গোছানোর সময় পাই নাই ।

ইসলাম শাহ্ বললেন, আমার কাছে কী চান ?

ধার হিসাবে অর্থ চাই । চড়া সুদ দিতে আমি প্রস্তুত । সৈন্য সংগ্রহ করে আমি আবার কাবুল জয় করব । আমি কি অর্থ পেতে পারি?

ইসলাম শাহ্ বললেন, অবশ্যই অর্থ পেতে পারেন । ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ লেগে থাকলে আমার সুবিধা । আপনারা কামড়াকামড়ি করতে থাকবেন, আমি নির্বেঘ্নে সিংহাসনে বসে থাকব ।

মীর্জা কামরান আগ্রহের সঙ্গে বললেন, কী পরিমাণ অর্থ সাহায্য আমি পেতে পারি ?

ইসলাম শাহ্ হাই তুলতে তুলতে বললেন, পাঁচটি তাম্র মুদ্রা দিতে পারি । এতে চলবে ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৮

মীর্জা কামরান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন । ইসলাম শাহ্ বললেন, এতক্ষণ আপনি রসিকতা করছিলেন এখন আমি রসিকতা করলাম ।

কামরান বললেন, আপনি আমাকে কোনো সাহায্য করছেন না ?

ইসলাম শাহ্ বললেন, আপনি যদি সম্পূর্ণ নিজের অর্থে এবং নিজের সামর্থ্যে আবার কাবুল জয় করতে পারেন তবেই আপনি যোগ্য । তখন সাহায্য করব । তার আগে না ।

মীর্জা কামরান হনহন করে দরবার ত্যাগ করলেন । দরবারের অমাত্যরা ফিসফিস করে বলতে লাগলেন, ময়ূর! ময়ূর!

কোনো এক বিচিত্র কারণে কামরানের দরবারে ঢোকা এবং বেরুবার সময় তারা ‘ময়ূর’, ‘ময়ূর’ করেন ।

বৈরাম খাঁ পারস্য সেনাবাহিনীর ওপর যথেষ্ট বিরক্ত । তারা শানশওকত এবং জৌলুস প্রদর্শনে যতটা উৎসাহী যুদ্ধে ততটা না । তাদের হাতের তরবারির ওজন অনেক বেশি । ওজনের কারণে তরবারি চালানোর ক্ষিপ্রতা তাদের নেই । কম ওজনের তরবারি দেওয়া হয়েছিল । ফলাফল আরও খারাপ অনভ্যস্ততার কারণে হালকা তলোয়ার এরা চালাতেই পারে না ।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হস্তীবাহিনীর ভয়ে তারা ভীত । হিন্দুস্থানের যুদ্ধে হস্তীবাহিনী থাকবেই-এই সত্যটা পারস্যবাহিনীর মাথায় এখনো ঢোকে নি ।

হুমায়ূন জানিয়েছেন, পারস্যবাহিনীর এখন আর তাঁর প্রয়োজন নেই । তারা যেন পারস্যে চলে যায় ।

পারস্যবাহিনীর প্রধান বিনয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন, তারা পারস্য ফিরে যেতে আগ্রহিী না । বাকি জীবন তারা হুমায়ূনের সেবা করবে। তারা ফিরে যেতে চাচ্ছে না কেন তাও পরিষ্কার না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৮

হুমায়ূনের রাজকীয় কাফেলা এখন আছে ‘পাঞ্জশীরে’ । জায়গাটা অতীব মনোরম । প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ফলের বাগান । সবুজ মাঠ । ছোট ছোট টিলা । বনের ভেতর দিয়ে পাহাড়ি যে নদী গিয়েছে, তার জল কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ । হুমায়ূনকে বেশির ভাগ সময় দেখা যায় নদীর উপরের বড় পাথরের চাঁইয়ে বসে আছেন । হাতে মীর্জা কামরানের লাইব্রেরির কোনো একটা বই । জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর বই পড়তেই এখন তিনি আগ্রহী । পারস্যে তিনি মানমন্দির দেখে এসেছেন । রাজ্য ফিরে পেলে পারস্যের মতো একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করা তাঁর গোপন বাসনা । আকাশে শুক্র গ্রহ দেখা গেলে ফজরের নামাজের সময় হয় । যখন গ্রহটি আর দেখা যায় না, তখন ফজরের নামাজের সময় শেষ । এই তথ্য তিনি পারস্য মানমন্দির থেকে জেনে এসেছেন । বিষয়টি এখনো পরীক্ষা করা হয় নি ।

হুমায়ূন পাঠে মগ্ন । তার দুটি পা পানি স্পর্শ করে আছে । পানি শীতল । মাঝে মাঝেই তাকে পা পানি থেকে তুলতে হচ্ছে । হুমায়ূনের আনন্দময় সময়ে জওহর আবতাবচি দুঃসংবাদ নিয়ে উপস্থিত হলো ।

মীর্জা কামরান আবার কাবুল দখল করেছেন এবং নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছেন ।

 

হুমায়ূন বই বন্ধ করতে করতে বললেন, আফসোস । বৈরাম খাঁকে ডেকে নিয়ে আসো ।

জওহর ছুটে যেতে পাথরে ধাক্কা খেয়ে পানিতে পড়ে গেল । হুমায়ূন তাকে টেনে তুলতে তুলতে বললেন, কোরান শরিফের একটি আয়াতে বলা হয়েছে ‘হে মানব সম্প্রদায়! তোমাদের বড়ই তাড়াহুড়া।’ জওহর-তাড়াহুড়া কিছু নেই । যা নিয়তিতে নির্ধারিত তা-ই হবে । তাড়াহুড়া করে কিছু হবে না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৮

পাশাপাশি দু’টা পাথর । একটিতে হুমায়ূন বসেছেন, অন্যটিতে বৈরাম খাঁ । বৈরাম খাঁকে অত্যন্ত চিন্তিত দেখাচ্ছে । এত চিন্তিত তাঁকে সচরাচর দেখা যায় না । চিন্তার প্রধান কারণ হামিদা বানু এবং তাঁর শিশুপুত্র আকবর কামরানের হাতে আটক হয়েছেন । এই খবর হুমায়ূন জানেন না । হামিদা বানু এবং আকবর ছিলেন কান্দাহার দুর্গে । কান্দাহার থেকে তারা কেন কাবুলে গেলেন, কখন গেলেন তা বৈরাম খাঁ জানেন না।

হুমায়ূন বললেন, আপনি এত চিন্তিত হবেন না । আমার ভাই আকবরের কোনো ক্ষতি করবে না । এটা তৈমুর বংশের ধারা ।

জাহাঁপনা, বংশের ধারা সমসময় কাজ করে না ।

আমার ভাইদের ক্ষেত্রে করবে ।

বৈরাম খাঁ বললেন, আমি এই মুহূর্তেই রওনা হব । আপনি এখানেই থাকবেন । জায়গাটা আপনার পছন্দ হয়েছে । আপনি বিশ্রাশ করুন । আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন । সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশকে রেখে যাচ্ছি। আপনার নিরাপত্তার জন্যে আপনি নিজেই যথেষ্ট । তারপরেও মীর্জা হিন্দাল থাকবেন  ।

হুমায়ূন বললেন, বৈরাম খাঁ, আমি আপনার সঙ্গে যাব । এখন পর্যন্ত এমন কোনো যুদ্ধ হয় নি যেখানে আমি যুদ্ধ পরিচালনা করি নি ।

বৈরাম খাঁ বললেন, আপনি এখানেই থাকবেন । ভবিষ্যতে অনেক যুদ্ধ হবে । কোনাটাতেই আপনাকে অংশগ্রহন করতে হবে না । যা করতে আপনার পছন্দ আপনি তা-ই করবেন। বই পড়বেন, ছবি আঁকবেন, গান শুনবেন । এখন আপনার অনুমতি পেলে আমি যুদ্ধযাত্রা করি ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৮

সম্রাট হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন ।

মীর্জা কামরানের বিশেষ দূত এসেছে ইসলাম শাহ্’র কাছে । দূতের কাছে পত্রে কামরান লিখেছেন-

হাস্য পরিহাসে পটু

‍দিল্লীর সিংহাসনের মালিক

ইসলাম শাহ্

জনাব,

আপনার সাহায্য এবং মূল্যবান পরামর্শ ছাড়াই

আমি কাবুল দখল করেছি । আগের ভুল এ দফায়

করি নাই । দুর্গ দুর্ভেদ্য । হুমায়ূনের অপদার্থ্য পারস্য-

সৈনিকরা কিছুই করতে পারবে না ।

কাবুল দখল করলে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন

বলেছিলেন। এখন সাহায্য করুন ।

আপনার জন্যে একটি শের পাঠালাম । কাবুল

দুর্গ দখলের পরপর এই শেরটি আপনাতেই আমার

মাথায় আসে-

‘‘রাজ্য হলো এমন এক রুপসী তরুণী

যার ঠোঁটে চুমু খেতে হলে

সুতীক্ষন তরবারির প্রয়োজন হয়।’’

হুমায়ূন এখন কোথায় আছেন আমি জানি ।

আপনার সাহায্য পেলেই তাঁকে শিকল পরিয়ে

আপনার সামনে উপস্থিত করব । আপনি তাঁর সঙ্গে

রঙ্গ-রসিকতা কিংবা কাব্য আলোচনা করতে

পারেন । হুমায়ূন কাব্য আলোচনায় বিশেষ পারদর্শী ।

ইতি

মীর্জা কামরান

ইসলাম শাহ্ মীর্জা কামরানের দূতের হাতে পাঁচটি তাম্রমুদ্রা দিয়ে দিলেন ।

মীর্জা কামরান দুর্গ রক্ষায় নতুন পরিকল্পনা করেছেন । দুর্গের ভেতর শুধু কামানচিদের রাখা হয়েছে । তারা দুর্গপ্রাচীরের চারদিকেই কামান বসিয়েছে ।

কামরানের মূল সৈন্যবাহিনী দুর্গের বাইরে গোপনে অবস্থান করছে । বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং মীর্জা কামরান ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২৯

Related Posts

Leave A Comment