• Saturday , 24 October 2020

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২৫

মরুভূমির তীব্র দাবদাহ । বাতাসের সঙ্গে আগুন ছুটছে এমন অবস্থা । হামিদা বানু খেজুরগাছের নিচে বসে আছেন । খেজুরগাছ ছায়াদায়িনী বৃক্ষ না । রোদে হামিদা বানুর শরীর পুড়ে যাচ্ছে । তাঁর ইচ্ছা করছে হাম্মামখানার শীতল জলে শরীর ডুবিয়ে বসে থাকতে । যেখানে খাওয়ার পানি নেই, সেখানে হাম্মামে স্নানের চিন্তার বিলাসিতার অর্থ হয় না ।

হামিদা বানু নিজের ওপর বিরক্ত হচ্ছেন ।

একটু দূরে হুমায়ূনের লোকজন বালি সরিয়ে মরুকূপের সন্ধান করছে । আজ দিনের মতো পানি আছে । রাতে পানি লাগবে । কোথায় পাওয়া যাবে পানি ?

হুমায়ূন কিছুক্ষণ কূপের বালি সরানো দেখলেন । কূপের বালি এখন ভেজা ভেজা । এর অর্থ হয়তো পানি পাওয়া যাবে । স্ত্রীকে এই আনন্দসংবাদ দেওয়ার জন্য হুমায়ূন হামিদা বানুর কাছে গেলেন । তিনি কিছু বলার আগেই হামিদা বানু বললেন, একদিন আমার খুব বেদানা খেতে ইচ্ছা করছিল । আপনি বেদানার ব্যবস্থা করেছিলেন । আজ আমার দুটা ইচ্ছা । আপনি আমার ইচ্ছা পূরণ করুন ।

হুমায়ূন চিন্তিত গলায় বললেন, কী কী ইচ্ছা ?

হামিদা বানু বললেন, প্রথম ইচ্ছা আমি স্নান করব । কতদিন গায়ে পানি দিই না । শরীর থেকে বিষাক্ত দুর্গন্ধ আসছে  ।দ্বিতীয় ইচ্ছা, আস্ত একটা তরমুজ আমি একা হাম্ হাম্ করে খাব । এই দুটা ইচ্ছা পূরণ করতে না পারলে তৃতীয় ইচ্ছা অবশ্যই পূর্ণ করতে হবে ।

তৃতীয় ইচ্ছাটা কী ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৫

তৃতীয় ইচ্ছা হচ্ছে, আপনি আমার পাশে হাত ধরে বসে থাকবেন । রোদে দাঁড়িয়ে কূপের বালি তোলার তদারকির কিছু নেই ।

হুমায়ূন স্ত্রীর পাশে বসেছেন, তখনই খবল এল যোধপুরের রাজা মালদেব দূত পাঠিয়েছেন । দূত সঙ্গে উপহার নিয়ে এসেছেন । উপহারের মধ্যে আছে ত্রিশ মশক সুপেয় পানি, হুমায়ূনের পছন্দের ফল তরমুজ এবং হামিদা বানুর সেবার জন্য একজন বাঁদি যে সন্তানপ্রসবের জটিল বিষয়টিতেও অভিজ্ঞ ।

হুমায়ূন চার মশক পানি হামিদা বানুর স্নানের জন্যে বরাদ্দ করলেন । তরমুজ আলাদা করা হলো । স্নান শেষে হামিদা বানুকে তরমুজ দেওয়া হবে ।

মালদেবের দূত হুমায়ূনকে কুর্নিশ করে বললেন, রাজা মালদেব তাঁর রাজ্যে আপনাকে নিমন্ত্রণ করছেন । আপনি যতদিন ইচ্ছা মালদেবের আতিথ্য গ্রহণ করবেন । শের শাহ্’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইলে আপনাকে সবরকম সামরিক সাহায্য দেওয়া হবে ।

হুমায়ূনের আনন্দের সীমা রইল না । তিনি মালদেবের দূতকে জানালেন, আজ দিনের মধ্যেই তিনি রওনা হবেন ।

দূত বলল, আপনার আগমনের সুসংবাদ আমি রাজা মালদেবকে জানাতে এক্ষুনি রওনা হবে । আপনার স্ত্রী অসুস্থ । আপনি ধীরেসুস্থে আসুন ।

হুমায়ূন দুতকে উপহার দিলেন রত্নবসানো একটি খঞ্জর ।

হামিদা বানুর সেবার জন্যে যে বাঁদি পাঠানো হয়েছে তার নাম মিশা । রুক্ষ কঠিন চেহারা । চোখে মায়ার লেশমাত্র নেই ।

মালদেবের দূতের প্রস্থানের পরপরই মিশা হামিদা বানুকে বলল, আপনি আপনার স্বামীকে বলুন তিনি যেন কিছুতেই মালদেবের কাছে না যান । সেখানে শের শাহ্’র লোকজন বসে আছেন । আমাদের উচিত এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে অমরকোটের দিকে রওনা দিকে রওনা হওয়া । অমরকোটের রাজার বয়স অল্প এবং তিনি দয়ালু ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৫

হামিদা বানু বললেন, তুমি মালদেবের পাঠানো বাঁদি । তুমি তাকে সাহায্য করবে । আমাদের সাহায্য করতে চাচ্ছ কেন ?

মিশা বলল, আমি রাজপুত নারী । সম্রাট হুমায়ূন রাজপুত রানী কর্ণাবতীর জন্যে কী করেছিলেন সেই গল্প জানি । আমি একজন বীরের পক্ষ নেব নাকি কুচক্রী কাপুরুষ মালদেবের পক্ষ নেব ?

হামিদা বানু বললেন, আমি স্নান করব । তরমুজ খাব । তারপর রওনা হব ।

মিশা বলল, না । আমাদের হাতে সময় নেই ।

হুমায়ূন অমরকোটে এসেছেন শুনে অমরকোটের রাজা নিজে তাঁকে অভ্যর্থনা করতে এগিয়ে এলেন । রাজকীয় পন্থার কুর্নিশ করতে-করতে বললেন, আমার পিতা জীবিত থাকলে তিনি নিজে এসে আপনাকে নিয়ে যেতেন। তিনি গত বছর যুদ্ধে নিহত হয়েছেন ।

হুমায়ূন বললেন, আপনি হোসেনের পুত্র? আপনার পিতার মৃত্যুসংবাদে আমি ব্যথিত হলাম ।

আমি ব্যথিত হচ্ছি আপনার দৈন্যদশা দেখে ।

হুমায়ূন বললেন, আমাকে দেখে কেউ ব্যথিত হলে আমি নিতে পারি । কেউ করুণা দেখালে সেটা নিতে পারি না ।

আপনাকে করুণা করার স্পর্ধা আমার নেই । আমি অতি বিনয়ের সঙ্গে বলছি । আপনার স্ত্রীর সন্তান না হওয়া পর্যন্ত আপনি অমরকোটে থাকবেন । আমার পক্ষে সম্ভব সব সুযোগ-সুবিধা আপনি পাবেন । হুমায়ূন বললেন, আমার প্রতি আপনার এই বদান্যতার কারণ জানতে পারি ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৫

রাজা বললেন, আমি যা করছি আমার বাবা বেঁচে থাকলে তা-ই করতেন । বাহাদুর শাহ্’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় আমার বাবা আপনার সঙ্গে ছিলেন।

হুমায়ূন বললেন, আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ । পরম করুণাময়ের করুণাধারা আপনার ওপর বর্ষিত হোক-এই শুভ কামনা ।

অমরকোটের হাম্মামখানায় হামিদা বানু গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে বসে আছেন । মিশা তার গা ডলে দিচ্ছে।

হাম্মামঘরেই কাটা তরমুজ রাখা আছে । হামিদা বানুর দৃষ্টি সেদিকে যতবার যাচ্ছে ততবারই তার চোখ ভিজে উঠছে । তাঁর পেটের সন্তান খুব নড়াচড়া করছে । অকরুণ এই পৃথিবীতে আসার জন্যে সে ব্যস্ত হয়েছে । তার জন্যে কী অপেক্ষা করছে কে জানে!

১৫ অক্টোবর ১৫৪২ সালে এই অমরকোটেই হামিদা বানু একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন । তার নাম রাখা হয় আকবর । পৃথিবীর ইতহাসে এই আকবর তার স্থান করে নেন ‘আকবর দ্য গ্রেট’ হিসেবে । (আকবরের জন্মের তারিখ নিয়ে বিতর্ক আছে । আবুল ফজলের দেওয়া তারিখের সঙ্গে জওহর আবতাবচির তারিখের অমিল আছে । জওহর আকবরের জন্মের সময় উপস্থিত ছিলেন । তার দেওয়া তারিখ সঠিক হওয়ার কথা। বলা হয়ে থাকে জাদুটোনার হাত থেকে রক্ষার জন্যে আকবরের আসল জন্মক্ষণ গোপন রাখা হয়েছে । হুমায়ূন জাদুটোনায় প্রবল বিশ্বাসী ছিলেন।)

পুত্রসন্তানের জন্মসংবাদ হুমায়ূনকে দেন জওহর আবতাবচি । হুমায়ূন আবতাবচিকে বলেন, তোমার কাছে আমি যে মৃগনাভিটি গচ্ছিত রেখেছি সেটা নিয়ে আসো, আর একটা ছুরি আনো ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৫

জওহর আদেশ পালন করলেন । হুমায়ূন নিজের হাতে মৃগনাভি ভাগ করে তার সঙ্গী আমীরদের হাতে দিয়ে বললেন, আজ আমার চরম দুঃসময় । আমি পুত্রের জন্মের আনন্দ করব, আপনাদের সবাকে উপহার দেব, সে সামথ্য আমার নেই । মৃগনাভির একটি করে টুকরা আপনাদের দিলাম । আপনারা প্রার্থনা করুন যেন আমার পুত্রের যশ মৃগনাভির সৌরভের মতো ছড়িয়ে পড়ে ।

কান্দাহার দুর্গে মীর্জা হিন্দালকে গৃহবন্দি করা হয়েছে । কামরানের হঠাৎ ধারণা হয়েছে তার এই ভাই হুমায়ূনের প্র্রতি অনুগত । সুযোগ পেলেই সে হুমায়ূনের সঙ্গে যোগ দেবে । হিন্দালকে ভয় দেখানোর জন্যে কামরান চারজন সাধারণ প্রজাকে ধরে এনে ঘোষণা করলেন, এরা হুমায়ূনের প্রতি অনরক্ত । শাস্তি হিসেবে এদের চোখ উৎপাটন করা হবে । চোখ উৎপাটনের এই কাজটা করব আমি নিজে ।

তা-ই করা হলো । এই চারজনের বিকট চিৎকার যেন মীর্জা হিন্দাল শুনতে পারেন সেই ব্যবস্থাও করা হলো।

চোখ উৎপাদিত চারজনকে রাখা হলো মীর্জা হিন্দালের আশপাশে ।

কামরান মীর্জা আসকারিকে পাঠালেন হুমায়ূনকে ধরে আনার জন্যে ।

জানুয়ারি মাসের শুরু ।

শিশুপুত্র এবং সঙ্গীদের নিয়ে হুমায়ূন আবার পথে নেমেছেন । খবর পেয়েছেন জালাল খাঁ নিজে তাঁর বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছেন । পথে নামা ছাড়া উপায় কী ? প্রচণ্ড ঠাণ্ডা । শিশুপুত্রকে বুকে জড়িয়ে হামিদা বানু স্বামীর পাশে পাশে যাচ্ছেন । পশ্চিম দিকে থেকে বাতাসের ঝাপ্টা আসছে । ঘোড়া সেদিকেই যাচ্ছে । হামিদা বানু বললেন, আমি জানতে চাই আমি কোথায় যাচ্ছি ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৫

হুমায়ূন জবাব দিলেন না, কারণ তাঁর কাছে জবাব নেই । তিনি নিজেও জানেন না কোথায় যাচ্ছেন ।

হামিদা বানু বললেন, আর কিছুক্ষণ এভাবে চললে আমার ছেলে শীতে জমে যাবে ।

হুমায়ূন যাত্রাবিরতির আদেশ দিলেন । অমরকোটের রাজা উপহার হিসেবে ভেড়ার চামড়া জোড়া দিয়ে তৈরি একটি তাঁবু হামিদা বানুকে দিয়েছেন । প্রচণ্ড শীতেও এই তাঁবুর ভেতরটা উষ্ণ থাকে ।

তাঁবু খাটানো হয়েছে । শিশুপুত্রকে বুকে নিয়ে হামিদা বানু তাঁবুর ভেতর ঢুকছেন । তাঁবুর সামনে আগুন করা হয়েছে । হুমায়ূন আগুনে হাত-পা গরম করার চেষ্টা করছেন । শীতে কাহিল অচেনা একটা পাখি আগুনের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে । মানুষের ভয়ে সে এখন আর ভীত না । হুমায়ুন অনেকখানি সরে পাখিকে জায়গা করে দিলেন । তখনই খবর এল হুমায়ূনের ভাই মীর্জা আসকারি বিশাল বাহিনী নিয়ে হুমায়ূনকে ধরে নিয়ে যেতে আসছেন ।

হুমায়ূন হামিদা বানুকে সঙ্গে নিয়ে সঙ্গীদের নিয়ে পালিয়ে গেলেন । তাঁবুর ভেতর আছে শিশু আকবর এবং ধাই মিশা তাঁবুর বাইরে অপেক্ষা করছে জওহর আবতাবচি । হুমায়ূন জওহর আবতাবচিকে দায়িত্ব দিয়ে গেলেন সে যেন নিজের হাতে শিশু আকবরকে মীর্জা আসকারির হাতে তুলে দেয় এবং শিশুর জীবন ভিক্ষা চায় ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৫

মীর্জা আসকারি তাঁবুর সামনে উপস্থিত । তাঁবুর ভেতর থেকে শিশুর কান্নার আওয়াজ আসছে । তাঁবুর সামনে মাথা নিচু করে জওহর আবতাবচি দাঁড়িয়ে আছে । আসকারি বললেন, তাঁবুর ভেতরে কে ?

জওহর বলল, মহান সম্রাট হুমায়ূনের পুত্র শাহজাদা আকবর ।

হুমায়ূন কোথায় ?

আমি জানি না জনাব ।

কোনদিকে গেছেন এটা নিশ্চয়ই জানো ?

হ্যাঁ জানি, কিন্তু আপনাকে বলব না ।

শিশুকে নিয়ে আসো ।

জনাব আমি নিজের প্রাণের বিনিময়ে এই শিশুর জীবন ভিক্ষা চাচ্ছি ।

তোমাকে বলছি শিশুটিকে নিয়ে আসতে । হুকুম পালন করো ।

জওহর শিশু আকবরকে কোলে করে নিয়ে এল ।

আসকারি শিশুকে নিয়ে কান্দাহার চলে গেলেন ।

কান্দাহার দুর্গে সুন্দর একটি নাটক অভিনীত হলো । আসকারি তাঁর স্ত্রীকে (ইনালা বেগম) ডেকে পাঠিয়ে বললেন, এই শিশুর নাম আকবর  ।তার বাবা-মা তাকে ফেলে পালিয়ে গেছেন । এই শিশুটির সব দায়িত্ব তোমাকে দিলাম । সে যেন বাবা-মা’র অভাব্ কোনোদিন বুঝতে না পারে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৫

ইনাহা বেগম পরম মমতায় শিশু আকবরকে কোলে তুলে নিলেন ।

আচার্য হরিশংকর মেঝেতে উবু হয়ে বসে আছেন । তাঁর বাঁ পায়ের মাংস খুলে খুলে পড়তে শুরু করেছে । তিনি ভীত চোখে একবার তাকাচ্ছেন পায়ের দিকে একবার তাকাচ্ছেন খাটে বসা আকিকা বেগমের দিকে । আজ সে একা এসেছে । তার বান্ধবী অম্বা আসে নি । সে সব দিন আসে না ।

আকিকা বেগম বলল, আপনার কুষ্ঠ হয়েছে ?

না । বাত রোগ । খারাপ বাত রোগে এ রকম হয় ।

বাত রোগ না, আপনার কুষ্ঠ হয়েছে । এর চিকিৎসা আমি জানি ।

কী চিকিৎসা ?

পা আগুনে পুড়ানো । বড় করে আগুন করুন । সেই আগুনে আপনার পা ঢুকিয়ে দিন ।

চুপ ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২৬

Related Posts

Leave A Comment