• Wednesday , 25 November 2020

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

মধ্যরাতে হামিদা বানু স্বামীকে বললেন, তাঁর বিশ্রাম প্রয়োজন । শরীর টানছে না ।

হুমায়ূন সঙ্গে সঙ্গে যাত্রাবিরতির নির্দেশ দিলেন ।খোলা প্রান্তর । চাঁদে আলোর ফিনকি ফুটেছে । অচেনা ঝাঁকড়া একটা গাছের নিচে চাদর পেতে বসেছেন হামিদা বানু । গাছ থেকে অনেকটা দূরে রাতের খাবারের আয়োজন হচ্ছে । খিচুড়িজাতীয় খাদ্য তৈরি হচ্ছে । রসদ ফুরিয়ে আসছে । খাদ্য তৈরিতেও সাবধানতা ।

ক্লান্ত ঘোড়ার দলকে পানি এবং গম খাওয়ানো হচ্ছে । এদেরকে সুস্থ রাখা অত্যন্ত জরুরি ।

হুমায়ূন একা একা হাঁটছিলেন হঠাৎ হামিদা বানুর খিলখিল হাসির শব্দ শুনে এগিয়ে গেলেন । এই অবস্থায় এত সুন্দর করে কেউ হাসতে পারে না ।

হামিদা বানু স্বামীকে দেখে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসলেন । হুমায়ূন বিস্মিত গলায় বললেন, কী হয়েছে হামিদা ?

হামিদা বললেন, কিছু হয় নি তো ।

তুমি হাসছিলে ।

আপনার এমন কোনো নির্দেশ আছে যে হাসা যাবে না ?

এই অবস্থায় কেউ আনন্দে হাসছে দেখে বিস্মিত হয়েছি । হাসার মতো কোনো কারণ কি ঘটেছে ?

ঘটেছে । আপনি আমার পাশে বসুন, তারপর বলছি কী ঘটেছে । হুমায়ূন হামিদা বানুর পাশে বসলেন । হামিদা বানু গলা নামিয়ে বললেন, আপনার হাত এগিয়ে ‍দিন । হাত ধরে বলব ।

হুমায়ূন হাত এগিয়ে দিলেন । হামিদা বানু স্বামীর হাত ধরতে-ধরতে বললেন, ভাগ্য আপনাকে অতি সাধারণ একজন মানুষের কাতারে নিয়ে এসেছে । এমন সাধারণ যে আমি ইচ্ছা করলেই এখন আপনার হাত ধরতে পারি । এই আনন্দেই হাসছি ।

হুমায়ূন ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন । স্ত্রীর কথার উত্তরে কিছু বললেন না ।

হামিদা বানু বললেন, আপনি একসময় কথায় কথায় শের বলতেন । অনেকদিন আপনার মুখ থেকে শের শুনি না । জোছনা নিয়ে কোনো শের কি আপনার জানা আছে ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

না ।

বিয়ের রাতে আমাকে নিয়ে যে দীর্ঘ কবিতাটি লিখেছিলেন সেটি বলুন শুনি ।

হামিদা! কবিতাটা আমার মনে নেই ।

একটা লাইনও মনে নেই ?

না ।

মনে করার চেষ্টা করুন । আজ রাতে আমি আপনার কাছ থেকে কবিতা শুনবই । যদি মনে না পড়ে নতুন কবিতা লিখবেন । কলমচিকে কাগজ-কলম নিয়ে আসতে বলুন । চাঁদের আলো তীব্র । এই আলোতে লিখতে আপনার অসুবিধা হবে না ।

হামিদা! তোমাকে খুব অস্থির লাগছে । কী হয়েছে বলো তো ?

আপনার মুখ থেকে কবিতা শুনতে ইচ্ছা করছে । এর বেশি কিছু না ।

হুমায়ূন বললেন, আমি কি তোমাকে একটা অনুরোধ করতে পারি ?

হামিদা বানু বললেন, সম্রাট কখনো অনুরোধ করেন না । আদেশ করেন ।

তুমি ভালো করেই জানো আমি রাজ্যহারা সাধারণ একজন । আমি আমার স্ত্রীকে অবশ্যই অনুরোধ করতে পারি ।

কী অনুরোধ বলুন ।

তুমি কান্দাহারে ফিরে যাও । তোমার পরিচিত প্রিয়জনরা সবাই সেখানে আছেন । আমার সঙ্গে পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর কোনো অর্থ হয় না । কখন কোন বিপদ ঘটে ।

হামিদা বানু কঠিন গলায় বললেন, আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাব না । আমার মন বলছে একদিন আপনি রাজত্ব ফিরে পাবেন । দিল্লীর সিংহাসনে বসবেন । তখন আপনার সামনে আমাকে যেতে হবে কুর্নিশ করতে করতে । এই যে আমরা হাত ধরাধরি করে গাছের নিচে বসে আছি এরকম তো হবে না । এই সুযোগ আমি ছাড়ব না । আমি সারাক্ষণ থাকব আপনার পাশে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

কে যেন পেছন দিকে এসেছে । শরীর চাদরে ঢাকা বলে তাকে চেনা যাচ্ছে না ।

হুমায়ূন বললেন, কে ?

আমি বৈরাম খাঁ । আমাদের এক্ষুনি রওনা হতে হবে । রাতের খাবার খাওয়ার সময় পাওয়া যাবেনা । ঘোড়া কি প্রস্তুত ?

জি জাহাঁপনা ।

হুমায়ূন তার স্ত্রীকে হাত ধরে তুললেন। কোমল গলায় বললেন, ক্লান্তভাবটা একটু কি কমেছে ?

হামিদা বানু বললেন, হ্যাঁ কমেছে । আমরা যাচ্ছি কোথায় ?

বৈরাম খাঁ জানে । আমি জানি না ।

হামিদা বানু বললেন, আমি আপনার মুখ থেকে একটা শের না শুনে ঘোড়ায় উঠব না ।

হুমায়ূন বললেন,

‘‘ একজন প্রেমিকের কাছে চন্দ্র হলো তার

প্রেমিকার মুখ ।

আর জোছনা হলো প্রেমিকার দীর্ঘশ্বাস।’’

হামিদা বানু বললেন, বাহ্ সুন্দর শের! আপনাকে একটা কথা বলা হয় নি । আমি সন্তানসম্ভবা । আমার বিশ্রামের দিকে আপনাকে একটু নজর দিতে হবে । দিন-রাত ঘোড়ার পিঠে থাকতে পারব না ।

হতভম্ব হুমায়ূন বললেন, কী বললে ?

হামিদা বানু হাসতে হাসতে বললেন, একবার তো লজ্জার মাথা খেয়ে বলে ফেলেছি, আর বলেতে পারব না ।

হুমায়ূন বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে । জোছনা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে । হুমায়ূন হামিদা বানুর পাশাপাশি যাচ্ছেন। দুজনের কারও মুখেই কোনো কথা নেই । ঘোড়া ক্লান্ত হলেও ছুটছে তীব্র গতিতে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

হামিদার গা গুলাচ্ছে । ঘোড়ার গায়ের ঘামের গন্ধ এখন আর সহ্য হচ্ছে না । তিনি কথাবার্তায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলেন। হুমায়ূনকে বললেন, আমাদের পরিকল্পনাটা কী ? আমরা কি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালিয়ে বেড়াব ?

হুমায়ূন জবাব দিলেন না । হামিদা বানু বললেন, উদ্দেশ্যহীন পালিয়ে বেড়ানো বন্ধকরে আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা করতে হবে….

হামিদা বানুর কথা শেষ হওয়ার আগেই ছোট কামানের গোলার আওয়াজ পাওয়া গেল । তারপর কয়েকবার । হুমায়ূনকে ধাওয়া করা বাহিনীর কামান নিয়ে আসার কথা না। ব্যাপারটা কী?

বৈরাম খাঁ’র নির্দেশে হুমায়ূনের বাহিনী মূল পথ ছেড়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়ল। ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়া ঘোড়ার মতো একটি প্রাণীর পক্ষে যথেষ্ট জটিল । এই কাজটি ঘোড়ারা ভালোমতোই করছে। তারা বিপদ আঁচ করতে পারছে ।

হামিদা বানু বললেন, চমৎকার বুনো ফুলের সুবাস পাচ্ছি । আপনি কি পাচ্ছেন ?

হুমায়ূন বললেন, পাচ্ছি ।

হামিদা বানু বললেন, আমার কী সৌভাগ্য সুন্দর ফুলের ঘ্রাণ পেলাম! আল্লাহপাকের দরবারে হাজার শুকরিয়া।

মীর্জা কামরান লাহোর যাত্রা করবেন। জ্যোতিষী শুভক্ষণ ঠিক করে দিয়েছে । ফজরের নামাজের পরপরই যাত্রা শুরু করতে হবে। পরের শুভক্ষণ মধ্যনিশা । মীর্জা কামরান প্রথম শুভক্ষণ বেছেছেন ।

কান্দাহারের রাজমহিষীরা সবাই যাবেন । কান্দাহারে থাকবেন আসকারি মীর্জা ।

যাত্রা শুরুর আগে মীর্জা কামরান তাঁর মা গুলরুখ বেগমের কাছে গেলেন দোয়া নেওয়ার জন্যে । গুলরুখ বেগম লাহোর যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ।

মীর্জা কামরান মা’র কাছ থেকে বিদায় নিলেন। গুলরুখ বেগম বললেন, আমি মা হিসেবে তোমার মঙ্গল কামনা করছি । যাত্রা শুভ হোক । আমার কিছু প্রশ্ন আছে ।

বলুন কী প্রশ্ন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

তুমি নাকি তোমার বড়ভাই হুমায়ূনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেবে ?

তাকে ধরিয়ে দেবে শের শাহ্’র হাতে ?

কোথায় শুনলেন এমন কথা ?

গুলরুখ বেগম বললেন, দরবারের সব কথাই অন্তঃপুরে আসে । অতীতেও এসেছে, ভবিষ্যতেও আসবে । এখন আমার প্রশ্নের জবাব দাও ।

মীর্জা কামরান বললেন, আমি আপনার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি । তার আগে আমার চারটি প্রশ্ন আছে । আপনাকে দীর্ঘ জবাব দিতে হবে না । দীর্ঘ জবাব শোনার মতো সময় আমার হাতে নেই । শুধু ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ বলবেন । প্রথম প্রশ্ন, রাজ্যহারা হুমায়ূন কি এখন বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ?

হ্যাঁ ।

তার সঙ্গীসাথীরা একে একে সরে পড়ছে । সৈন্যবাহিনীল প্রায় সবাই তাঁকে ত্যাগ করেছে । হ্যাঁ নাকি না ?

হ্যাঁ ।

তৃতীয় প্রশ্ন, রাজ্যহারা হুমায়ূনের কি এখন কোনো ভবিষ্যৎ আছে ?

গুলরুখ বেগম জবাব দিলেন না । মীর্জা কামরান বললেন, আপনি জবাব দেন নি, কাজেই ধরে নিলাম এই প্রশ্নের উত্তরও হ্যাঁ ।

চতুথ্য এবং শেষ প্রশ্ন, আপনি কি চান আপনার মহান স্বামী যে মোঘল রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা টিকে থাকুক ?

হ্যাঁ ।

তাহলে আমি যা করছি তার বিকল্প নেই । আমি লাহোরে শক্তি সংগ্রহ করব ।

তুমি তোমার বড়ভাইয়ের পাশে দাঁড়াবে না ?

মীর্জা কামরান বললেন, অন্যের দুর্ভাগের সঙ্গে আমি নিজেকে জড়াব না ।

এই ভাই তোমার প্রতি যে মমতা দেখিয়েছে তা তুমি বিস্মরণ হয়েছ ?

মমতা দুর্বলের অস্ত্র । আমি দুর্বল না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২২

গুলরুখ বেগম দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এর অর্থ কি এই যে তুমি তোমার ভাইকে শত্রুর হাতে তুলে দেবে?

মীর্জা কামরান চুপ করে রইলেন। গুলরুখ বেগম কঠিন গলায় বললেন, মা হিসেবে তোমার কাছে আমার একটাই অনুরোধ-ভাইকে শের শাহ্’র হাতে তুলে দেওয়ার আগে তুমি নিজ হাতে তাকে হত্যা করবে । তোমার প্রতি সে যে মমতা এবং ভালোবাসা দেখিয়েছে এটা হবে তার পুরষ্কার ।

মেয়েলি কথাবার্তা শোনার সময় আমার নেই মা ।

তোমার ভাই কিন্তু শুনতো ।

শুনে শুনেই তো আজ তাঁর এই অবস্থা । শিয়ালের মতো সে ঘুরে বেড়াচ্ছে । তাঁকে তাড়া করছে শিকারি কুকুর ।

তার মতো শিয়াল হতে পারা মহা সৌভাগ্যের ব্যাপার । আচ্ছা তুমি রওনা হও । তোমাকে দেরি করিয়ে দিলাম ।

হুমায়ূন আছেন সিন্ধুর নাদান দুর্গে । এই দুর্গের প্রধান উছি বেগ দুর্গ হুমায়ূনের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন । তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে দুর্গের বাইরে অবস্থান নিয়েছেন । উছি বেগের উদ্দেশ্য পরিষ্কার না । এটা কি কৌশলে হুমায়ূনকে বন্দির চেষ্টা ? হুমায়ূন দুর্গে বন্দি থাকবেন । শের শাহ্’র কাছে খবর যাবে। বিশাল পুরষ্কারের বিনিময়ে উছি বেগ হুমায়ূনকে তুলে দেবেন শের শাহ্’র হাতে ?

হামিদা বানু দুর্গের একটি কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছেন । এই বিশ্রাম তাঁর জন্যে প্রয়োজন ছিল । এই মুহূর্তে তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন না । তাঁর শরীর খুবই খারাপ করেছে । গায়ে প্রবল জ্বর । সেবা করার কেউ নেই।

বৈরাম খাঁ’র হাতে এখন সৈন্যসংখ্যা মাত্র নয় শ’ । তবে এরা সবাই সুশিক্ষিত। এক শ’ তীরন্দাজ আছে, যাদের নিশানা অব্যর্থ । বৈরাম খাঁ দুর্গপ্রাচীরের বিশেষ বিশেষ জায়গায় তাদের বসিয়ে দিয়েছেন ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২৩

Related Posts

Leave A Comment