অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬ হুমায়ূন আহমেদ

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬

আয়ুব আলি কোন কথা বলছেন না, কারণ কথা বলার মতাে অবস্থা তার নেই। তিনি ঘুমিয়ে পড়ছেন। তার নাক ডাকছে। বাসের ড্রাইভার বলল, ‘সবাই বিসমিল্লাহ বলেন। গাড়ি ছাড়তেছি। সবাই শব্দ করে বলল, ‘বিসমিল্লাহ।’ গাড়ি ছেড়ে দিল। ছােট্ট একটা শিশু কাঁদছে। দুমাস বয়স। সেই তুলনায় গলার শক্তি প্রশংসনীয়। শিশুটির কান্নার আওয়াজ ছাপিয়ে উঠেছে। বাবা এবং মা দুজনেই।

তাকে নিয়ে খুব ব্ৰিত বােধ করছে। এটিই তাদের প্রথম সন্তান। কপালে বড় করে কাজলের ফোটা দেয়া। সেই কাজলে সমস্ত মুখ মাখামাখি হয়ে গেছে। বাচ্চাটির বাবা তাকে কিছুক্ষণ কোলে রেখে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিছুক্ষণ করছে মা। লাভ হচ্ছে না। একজন বলল, ‘ছােট শিশু সঙ্গে থাকা ভালাে। শিশুর উপর আল্লাহপাকের খাস রহমত থাকে। এই শিশুর কারণে ইনশাআল্লাহ কারাে কিছু হবে না। আমরা জায়গামতাে নিরাপদে পৌঁছাব। 

বাবার মুখে আনন্দের আভা দেখা গেল। মার মুখেও নিশ্চয়ই আনন্দের হাসি। বােরকার কারণে সে হাসি দেখা যাচ্ছে না। বাচ্চার কান্না এখন আর কারাে খারাপ লাগছে না, বরং ভাল লাগছে। কাঁদুক সে, কাঁদুক। গলা ফাটিয়ে কাঁদুক। 

একজন জিজ্ঞেস করল, “ছেলে না মেয়ে? বাবা লাজুক গলায় বলল, “মেয়ে? 

কি নাম রেখেছেন মেয়ের ? 

বাবা খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, মুক্তি।’ বলেই অস্বস্তি নিয়ে চারদিকে তাকালেন। সেই অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল যাত্রীদের সবার চোখে-মুখে। 

ভালাে নাম কি ?

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬

‘ভালাে নাম ফারজানা ইয়াসমিন। 

‘মিলিটারী নাম জিজ্ঞেস করলে ভালাে নামটা বলবেন। ডাক নাম বলার প্রয়ােজন নাই। 

বাচ্চাটা কান্না থামিয়েছে। 

বৃদ্ধ ভদ্রলােকের সঙ্গের বােরকা পরা মহিলার কান্না শােনা যাচ্ছে। বৃদ্ধ তাকে এখন আর পাখার হাওয়া করছেন না। গাড়ির ভেতর প্রচুর হাওয়া। বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। মনে হচ্ছে তিনিও ঘুমিয়ে পড়েছেন। আকাশে মেঘ দেখা যাচ্ছে। রােদে তেজ নেই। বাতাস আর্দ্র, বৃষ্টি আসবে বলে মনে হচ্ছে। রাস্তা ভালাে না, গাড়ি খুব ঝাকুনি দিচ্ছে। ঝাকুনিতে অনেকেরই ঘুম পেয়ে যাচ্ছে।

যাত্রীদের প্রায় সবার হাতেই কিছু না কিছু বই। বেশ কয়েকজনের হাতে কোরান শরীফ। অনেকের হাতে প্রচ্ছদে কায়দে আযমের ছবিওয়ালা বই। এ সব বই এখন খুব বিক্রি হচ্ছে। এসব বই হাতে থাকলে একধরনের ভরসা পাওয়া যায়। মনে হয়, বিপদ হয়ত বা কাটবে। প্রচণ্ড গরমে স্যুটে পরা একজন বাসযাত্রী যাচ্ছেন। লাল রঙের টাই, থ্রি পিস স্যুট। কোটের পকেটে লাল গােলাপের কলি। তেকোনা লাল রুমাল। সঙ্গে একটা ব্রিফকেস।’

তিনি ব্রিফকেস কোলে নিয়ে বসেছেন। এক মুহুর্তের জন্যেও হাতছাড়া করছেন না। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতে গেলেন বখশি হাট বাজারের কাছে তাকে নামিয়ে দেয়া যাবে কি-না। তখনাে ব্রিফকেস হাতে ধরা। ভদ্রলােককে খুব নার্ভাস মনে হচ্ছে, খুব ঘামছেন। একটু পর পর রুমাল দিয়ে মুখ মুছছেন, ঘাড় মুছছেন। জানালা দিয়ে ঘন ঘন থুথু ফেরছেন। তার সঙ্গে পানির বােতল আছে। মাঝে মাঝে বােতল থেকে পানি খাচ্ছেন।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬

এই প্রচণ্ড গরমে স্যুট পরে আসার রহস্য হল তিনি শুনছেন মিলিটারীরা ভদ্রলােকদের তেমন কিছু করে না। স্যুট পরা থাকলে খাতির করে। তারপরেও তিনি ঢাকা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের কাছ থেকে চিঠি নিয়ে এসেছেন। চিঠিতে লেখা 

– মােহাম্মদ সিরাজুল করিম, পিতা মৃত বদরুল করিম, গ্রাম বখশি হাট, আমার পরিচিত। সে পাকিস্তানের এজন খাদেম। দেশ ভক্ত এক ব্যক্তি। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় সে জীবন কোরবান করতে সর্বদা প্রস্তুত। আমি তাহার সর্বাঙ্গিণ মঙ্গল কামনা করি। পাকিস্তান জিন্দাবাদ। 

এত কিছু পরেও ভদ্রলােক স্বস্তি পাচ্ছেন না। এক সময় দেখা গেল গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে তিনি বিকট শব্দে বমি করছেন। | ঝাকুনি খেতে খেতে গাড়ি এগুচ্ছে। গাড়ির গতি বেশি না। এত খারাপ রাস্তায় গতি বেশি দেবার প্রশ্ন উঠে না। 

ঢাকা থেকে বেরুবার মুখেই একটা চেকপােস্ট। চেকপােস্টে মিলিশিয়ার কিছু লােকজন। ড্রাইভার গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। যাত্রীরা শক্ত হয়ে বসে আছে। কেউ জানালা দিয়ে তাকাচ্ছে না। গাড়ির ভেতর কোন রকম শব্দ নেই। শুধুমাত্র ঘুমন্ত আয়ুব আলির নাক ডাকার শব্দ আসছে। বােরকা পরা মহিলাও কান্না থামিয়েছেন। 

মিলিশিয়াদের একজন হাত ইশারা করে গাড়ি চালিয়ে যেতে বলল। কেউ এসে গাড়ির ভেতর উঁকি পর্যন্ত দিল না। কি অসীম সৌভাগ্য! গাড়ি চলতে শুরু করেছে। ছােট বাচ্চাটি কাদতে শুরু করেছে। কাদুক। ছােট বাচ্চারা তাে কাঁদবেই।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬

রাস্তা এখন কিছুটা ভালাে । ড্রাইভার গাড়িতে স্পীড দিতে শুরু করেছে। তাকে দ্রুত যেতে হবে। সন্ধ্যার আগে আগে টাঙ্গাইল পৌছতে হবে। মুক্তি কাদছে। হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে। মুক্তি যার নাম, অবরুদ্ধ নগরীতে যার জন্ম, সে তাে কাঁদবেই। কাদাটাই তাে স্বাভাবিক। 

আয়ুব আলি অনিলের কাধে মাথা রেখে ঘুমুচ্ছেন। তার ছােট মেয়েটি অনিলের কোলে, সেও ঘুমুচ্ছে। আয়ুব আলি সাহেবের স্ত্রী বােরকার পর্দা তুলে ফেলে কৌতূহলী হয়ে চারপাশে দেখছেন। তার মুখভর্তি পান। এরা বেশ সুখে আছে বলেই অনিলের মনে হল। 

এই দেশ ছেড়ে সময়মতাে চলে যেতে পারলে অনিলরাও কি সুখে থাকত ? ১৯৬৫ সনে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধ লেগে গেল। তখন অনেকেই চলে গেল। অনিলের ছােট কাকা বরুণ বাগচী তাদের একজন। রূপেশ্বরে তিনি পাকা বাড়ি তুলেছিলেন, দোতলা বাড়ি। বাড়ির পেছনে পুকুর। চুপি চুপি সব বিক্রি করলেন। কেউ কিছুই জানল না। যে কিনল সেও কোন শব্দ করল না।

ছােট কাকার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুব ভালাে ছিল না। টুকটাক ব্যবসা করেই কি করে যেন ধাই করে একদিন তিনি বড়লােক হয়ে গেলেন। আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক কমে গেল। তবু যাওয়া-আসা ছিল। কিন্তু তারা যে সব বিক্রি করে কোলকাতায় চলে যাচ্ছে এই সম্পর্কে কিছুই বলে নি। যে-রাতে যাবে সে-রাতে বরুণ বাগচী একা তাদের বাড়িতে বেড়াতে এল। তেমন শীত না, তবু সারা শরীর চাদরে ঢাকা। সুরেশ বাবু বাংলা ঘরে বসে ছাত্র পড়াচ্ছিলেন, সেখান থেকেই বললেন— ‘কি খবর বরুণ?’

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬

‘তােমার সাথে একটু কথা আছে দাদা। ভেতরে আস। “ছাত্র পড়াচ্ছি তাে। ‘একদিন ছাত্র না পড়লে তেমন ক্ষতি হবে না। জরুরি কথা।’ 

সুরেশ বাগচী অপ্রসন্ন মুখে উঠে এলেন। বরুণ গম্ভীর গলায় বলল, তােমার পুত্র-কন্যাদেরও ডাক। কথাবার্তা সবার সামনেই হােক। এরা ছােট হলেও এদেরও শােনা দরকার। নয়ত বড় হয়ে আমাকে দোষ দিবে। 

‘তাের ব্যাপার তাে কিছুই বুঝতেছি না।’ 

বরুণ বসল খাটে পা তুলে। তার গলার স্বর এমনিতেই ভারী। সে রাতে আরাে বেশি ভারী শােনাল। 

‘তােমরা ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার কথা কিছু ভাবছ?’ 

সুরেশ বাবু অবাক হয়ে বললেন, “শুধু শুধু ইন্ডিয়া চলে যাবার কথা ভাবব কেন ? 

‘অনেকেই তাে যাচ্ছে।’ 

অনেকেই কেন যাচ্ছে তাও তাে বুঝি না। ‘কেন বুঝছ না? বেশিদিন মাস্টারি করলে মানুষের বুদ্ধি লােপ পায় জানি, এতটা পায় তা জানতাম না।’ 

মাস্টারির দোষ দেয়ার প্রয়ােজন নাই। তুই কি বলতে চাস বল।’ বরুণ চাপা গলায় বলল, “এই দেশ আমাদের থাকার জন্য না।’ 

‘কেন না ? তুই তাে ভালােই আছিস। ব্যবসা-বাণিজ্য করছিস। দোতলা দালান দিয়েছিস। 

তা দিয়েছি মনের শান্তির বিনিময়ের দিয়েছি। মনে শান্তি নাই। ‘শান্তি না থাকার মতাে কি হল? ‘দাদা, তুমি বুঝতে পারছ না, এই দেশে আমরা সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন।’ 

সুরেশ বাগচী হাসতে হাসতে বললেন, নিজেকে সেকেন্ড ক্লাস ভাবলেই সেকেন্ড ক্লাস। তুই এ রকম ভাবছিস কেন? আমাকে দেখ। আমি তাে ভাবি না।’ 

‘দাদা, সত্যি করে বল তাে তুমি কোন রকম অনিশ্চয়তা বােধ কর না ? 

না করি না। কেন করব ? 

কি আশ্চর্য কথা! একটা প্রশ্ন করলেই তুমি উল্টা প্রশ্ন করছ। আমি তাে তােমার ছাত্র না।’ 

‘তাের হয়েছে কি সেটা বল। 

‘দাদা, তােমাকে সত্যি কথা বলি, এই দেশে মনটা ছােট করে থাকতে হয়। 

যার মন ছােট, সে যে দেশেই যাক তার মন ছছাটই থাকবে। 

‘খবরের কাগজে দেখেছ আরতীবালা নামের এক মেয়েকে কিছু প্রভাবশালী লােক ধরে নিয়ে গেছে, সাতদিন পর ছেড়েছে ?

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬

‘শুধু হিন্দু মেয়েদের এ রকম হচ্ছে তা তাে না, মুসলমান মেয়েদের বেলায়ও হচ্ছে। হচ্ছে না? এমন যদি হত শুধু হিন্দু মেয়েদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটছে তাহলে ভিন্ন কথা হত। তা ঘটছে না। আরতীবালাকে নিয়ে খবরের কাগজে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। ব্যাপারটা সবার খারাপ লেগেছে বলেই হয়েছে।’ 

‘এটা একটা জঘন্য দেশ দাদা। 

তুই যেখানে যাচ্ছিস সেটা কি খুব উন্নত কিছু ? সেখানে এমন হচ্ছে না? সমস্যা তাে দেশের না, সমস্যা মানুষের। দেশ মন্দ হয় না। মাটি কি কখনাে মন্দ হয় ? 

বরুণ রাগী গলায় বলল, “আমাকে এসব বড় বড় কথা বলবে না দাদা। আমার এসব বড় বড় কথা শুনতে বিরক্তি লাগে।’ 

‘আচ্ছা ঠিক আছে, আর বড় বড় কথা বলব না। তুই একটু সহজ হয়ে বসতাে। তাের মাথা গরম হয়েছে। গা থেকে গরম চাদরটা খােল। লেবুর সরবত খাবি ? অতসী তাের কাকাকে লেবুর সরবত করে দে। 

‘আমি কিছু খাব না। 

তুই কি অকারণে রাগারাগি করার জন্যে এসেছিস ? 

বরুণ কঠিন গলায় বলল, “দাদা, আমি ঠিক করেছি কোলকাতা চলে যাব।’ 

‘কি বললি ? ‘শুনলেতাে কি বললাম। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি কোলকাতা চলে যাব।’ 

সুরেশ বাবু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তুই সিদ্ধান্ত নিয়েছিস। আমি কিছু বললে তাে সিদ্ধান্ত পাল্টাবি না। আমাকে বলা অর্থহীন। 

‘তােমাকে বলছি, কারণ তােমাকে খবরটা জানানাে দরকার।’ ‘আচ্ছা যা, আমি জানলাম।’ 

‘তােমাকে সবাই স্যার স্যার করে, খাতির করে, কাজেই তুমি আছ একটা ঘােরের মধ্যে। আসল সত্য তােমার অজানা। এই দেশের সেনাবাহিনীতে কোন হিন্দু নেয়া হয় না, এটা তুমি জান ?

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬

না, জানতাম না।’ ‘এখন তাে জানলে। এখন বল কি বলবে ?’ 

এরা যে নিচ্ছে না এটা এদেশের মানুষদের বােকামি। দেশের সব সন্তানের সমান অধিকার। অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এক ধরনের ভুল। সেই ভুলের জন্য দেশকে কেন দায়ী করব?’ 

কাকে দায়ী করবে ? যেসব মানুষ এই ভুল করছে তাদের দায়ী করব।’ ‘শুধু দায়ী করবে, আর কিছু না ? 

ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব যেন তারা ভুল বুঝতে পারে।’ ‘ঈশ্বর সঙ্গে সঙ্গে তােমার প্রার্থনা শুনবেন ? 

‘শােন্ বরুণ, আমি বুঝতেই পারছি না কেন তুই এত রেগে আচ্ছিস কেউ কি তােকে কিছু বলেছে? 

না। দাদা, আমি চলে যাচ্ছি।’ ‘সেটা তাে শুনলাম। কবে যাচ্ছিস? 

‘আজই যাচ্ছি। আজ রাত এগারােটায়।’ 

সুরেশ বাগচী দীর্ঘসময় চুপ করে থেকে বললেন, “আজ রাত এগারােটায় তুই চলে যাচ্ছিস আর আমাকে সে-খবর দিতে এখন এসেছিস? বাড়িঘর কি করবি ?’ 

বাড়িঘর বিক্রি করে দিয়েছি।’ কখন বিক্রি করলি ? 

মাস খানিক হল। সব চুপি চুপি করতে হল। জানাজানি হলে সমস্যা হবে। 

‘আমাকেও জানালি না! ‘একজন জানলে সবাই জানবে।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬

সুরেশ বাগচী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এই দেশের কাউকেই তুই বিশ্বাস করিস না। শ্রীরামকৃষ্ণের একটা কথা আছে না? কচ্ছপের মতাে মানুষ। তুই হচ্ছিস সে রকম। কচ্ছপ থাকে জলে কিন্তু ডিম পাড়ে ডাঙ্গায়। তুই থাকিস এক দেশে আর মন পড়ে থাকে অন্য দেশে। কাজেই তাের চলে যাওয়াই ভালাে। তবে তুই যে শেষ সময়ে আমাকে খবরটা দিতে এলি তাতে মনে দুঃখ পেয়েছি।’ ‘তােমাকে আগে বললে লাভটা কি হত?’ 

সুরেশ বাগচী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, কোন লাভ হত না। যাচ্ছিস যা। ঐখানে মন টিকবে না। মানুষ গাছের মতাে। মানুষের শিকড় থাকে। শিকড় ছিড়ে যাওয়া ভয়ংকর ব্যাপার। গাছ ছিড়লে যেমন মারা যায়, মানুষও মারা যায়। গাছের মৃত্যু দেখা যায়। মানুষেরটা দেখা যায় না। তুই দুঃখ পাবি। 

‘দুঃখ তুমিও পাবে দাদা। দুদিন পর বুঝবে কি বােকামি করেছ। হিন্দ মুসলমান দাঙ্গা লাগবে, ঘরে আগুন দিবে। এইটা কখনাে হবে না বরুণ। আমি কোনদিন এদের অবিশ্বাস করি নি। এরাও করবে না। তুই এখন যা, তাের সঙ্গে কথা বলতে ভালাে লাগছে না।” বরুণ তারপরেও চুপ করে খানিকক্ষণ বসে রইল। তাকাল অতসীর দিকে। নিচু গলায় বলল, “অতসী, আমি কি অতসীকে নিয়ে যাব ? 

‘ওকে নিতে চাস কেন ?’ ‘ওর ভালাে বিয়ে দেব। এই দেশে ওর জন্যে ছেলে পাবে না।’ ‘তুই চলে যা বরুণ। এগারােটার সময় যাবি দশটা প্রায় বাজে।’ তুমি আজ বুঝতে পারছ না দাদা। একদিন বুঝবে। মর্মে মর্মে বুঝবে।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬

বরুণ চলে গেল। সুরেশ বাবু বারান্দায় সারা রাত বসে রইলেন। সেই রাতে তিনি উপবাস দিলেন। বিগড়ে গেলে শরীরকে কষ্ট দিয়ে মন ঠিক করতে হয়। সুরেশ বাগচী ঠিক করলেন আগামী দিনও তিনি নিরস্তু উপবাস দেবেন। 

বাসের ঝাকুনিতে অনিলেরও ঘুম পেয়ে গেল। ঘুমের মধ্যেই মনে হল, সে দিন ছােট কাকার সঙ্গে দেশ ছেড়ে চলে গেলে তার এই বিপদ হত না। বাবা বেঁচে থাকতেন। তবে অনিল এও জানে, কোন উপায়ে সে যদি বাবাকে জিজ্ঞেস করতে পারত– বাবা, তােমার কি মনে হচ্ছে দেশ ছেড়ে গেলে তােমার জন্যে ভালাে হত ? থেকে যাওয়াটা বােকামি হয়েছে। তাহলে তিনি জবাব দিতেন— 

অনিল, এই বিপদ কোন ব্যক্তিবিশেষের উপর আসে কি, সারা দেশের উপর এসেছে। আমার মৃত্যু এমন কোন বড় ব্যাপার না বাবা। তাছাড়া তােমার হেড স্যার কি তােমাকে লেখেন নি আমার মৃত্যু সংবাদে রূপেশ্বরের হাজার হাজার মানুষ চোখের জল ফেলেছে। মানুষের ভালবাসায় আমার মৃত্যু। এই দুর্লভ সৌভাগ্য ক’জনের হয় ? 

সবাই এক সঙ্গে হৈ হৈ করে উঠল। বাস প্রচণ্ড একটা ঝাকুনি খেয়ে বাম দিকে খানিকটা হেলে টাল মাটাল অবস্থা এগুচ্ছে। ড্রাইভার প্রাণপণে ব্রেক করতে করতে বলল, ‘হারামির পুত তাের মা’রে আমি…’ 

বাসের একটা টায়ার ফেটে গেছে, দুর্ঘটনা পারত ঘটে নি। ফাকা রাস্তা বলেই সামলােনাে গেছে। হেল্পার বলল, সব নামেন, গাড়ি খালি করেন। যার যার পিসাব করা দরকার পিসাব করেন। 

অনিল নামল। আয়ুব আলি সাহেবের কনিষ্ঠ কন্যাকে কোলে বসানােয় অনিলের পায়ে ঝি ঝি ধরে গেছে। একটু হাঁটাহাঁটি করা দরকার। এত ঝাকুনিতেও আয়ুব আলির নেমে পড়েছে। শুধু মহিলারা গাড়িতে বসা। অনিলের সঙ্গে পাপিয়ার নামার ইচ্ছা ছিল। বাবার ভয়ে নামতে পারে নি। 

 

Read more

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *