মেয়ের এনগেজমেন্ট উপলক্ষে শায়লা অফিস থেকে চার দিনের ছুটি নিয়েছেন। অফিস থেকে ছুটি তিনি এর আগেও নিয়েছেন, কিন্তু এবারে ছুটির দরখাস্ত লিখতে যে আনন্দ পেয়েছেন সে আনন্দ কখনো পান নি।ডিরেক্টর সাহেব বললেন, বিয়ে দেবার মতো বড় মেয়ে আপনার আছে তাই তো জানতাম না। আপনাকে দেখেই কলেজ্জের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী মনে হয়। ছেলে কি করে? শায়লা গভীর আনন্দের সঙ্গে বললেন, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।ডিরেক্টর সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ভালো ছেলে পেয়েছেন তো! প্রেমের নিয়ে নাকি?
জ্বি না। আমার মেয়েরা প্রেম করা টাইপ না। ঘরোয়া ধরনের মেয়ে।ছেলের বাবা কি করেন? চার্টার্ড একাউন্টটেণ্ড ছিলেন। এখন রিটায়ার করেছেন। ছেলের দাদাকে আপনি হয়তো চিনবেন। সাবিহউল্লাহ খান। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের আমলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন।বাহা বড় গাছে দড়ি বেঁধেছেন। ভেরি গুড।স্যার আমি খুবই খুশি হলো যদি মেয়ের এনগেজমেন্টের দিন উপস্থিত থাকেন। আমার তো তেমন কেউ নেই। ছেলে পক্ষ হলো জাহাজ আর আমরা কাগজের নৌকা।যাব, আমি অবশ্যই যাব। বিয়ে হচ্ছে কবে?
সেপ্টেম্বরের সাত তারিখে। ছেলের আত্মীয়স্বতন বেশির ভাগই থাকে দেশের বাইরে। বড় ছেলের বিয়ে আত্মীয়স্বজন সবাই আসবে। এই জন্যেই সময় নিচ্ছে।ভালো সংবাদ খুবই ভালো সংবাদ।শায়লা চার দিনের ছুটি নিয়েছেন এই খবর শুনে চিত্রা হাসতে হাসতে বলল, চার দিন তুমি ঘরে বসে থেকে কী করবে? তোমার কাজ কী?শায়লা অবাক হয়ে বললেন, কি বলিস তুই! আমার কোনো কাজ নেই? না নেই। ওরা আসলে চা-টা খেয়ে চলে যাবে। তার জন্যে চার দিন ছুটি নিলে? চায়ের সঙ্গে নাশতা কি তৈরি করলে সেটা চিন্তা করার জন্যে দুদিন আর নাশতা বানানোর জন্যে দুদিন?
শায়লা বিরক্ত হয়ে বললেন, তুই বোকার মতো কথা বলবি না। মাথার গায়ে আমার কুত্তা পাগলের মতো অবস্থা। নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাব কিনা সেটা পর্যন্ত বুঝতে পারছি না। পুরো সপ্তাহটাই ছুটি নেয়া উচিত ছিল।প্রিজ্ঞা বল তো–এত কি তোমার কাজ।শায়লা মেয়ের সামনে থেকে উঠে গেলেন। মেয়েকে না বলার মতো সময় তার নেই। এনগেজমেন্টের দিন পরার জন্যে শাড়ি কিনতে হবে। একসেট হালকা পানা বানিয়ে দেবেন। পাবার-দাবার কিছু মনে করা হবে। কিছু বাইরে থেকে কেনা হবে। এটাও ঠিক করতে হবে। এদিকে চিত্রার উত্তরার খালা টেলিফোন করে তুলেছেন একজন কাজির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। অনেক সময় এ রকম হয় এনগেজমেন্টের পর বর পক্ষের কোনো মুরব্বি বলে বসেন–বিয়ে পড়ানো হয়ে যাক। তখন তাদের মুখের ওপর না করা যায় না।
এনগেজমেন্টের দিন কে কি দেয়া হবে বা দেয়া হবে না সেটা নিয়েও আলোচনার দরকার। ছেলে তাঁকে সালাম করলে তখন একটা আংটি তো তাকে পলাতে হলে। পনেরো টাকা দামের সস্তার আংটি কিনলে চলবে না। ওদের সম্মানের দিকে লক্ষ্য রেখে আংটি কিনতে হবে। বড় গাছে নৌকা বাঁধার সুবিধা যেমন আছে অসুবিধাও আছে। নৌকা যত ছোট অসুবিধা তত বেশি।এদিকে কাকতালীয় ভাবে একটা ব্যাপার ঘটে গেছে। গত মাসে টিভি থেকে চিত্রা গান গাওয়ার প্রোগ্রাম পেয়েছিল। সেই গান রেকর্ড করা হয়েছে। প্রচার হয়নি। গানটা প্রচার হবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছটায়।
এরচে ভালো সংবাদ আর কি হতে পারে? বরপক্ষের আসার কথা চারটায়। ওনা নিশ্চয় সময়মতো আসবে না। আসতে আসতে পাঁচটা বাজবে। কথাবার্তা বলা, নাশতা খাওয়া, এতে ছটা বেড়ে যাবে। তখন হঠাৎ শায়লা চমকে উঠে বলবেন, আশ্চর্য ভুলেই তো গেছি আজি টিভিতে চিত্রার প্রোগ্রাম আছে। এই তোরা কেউ টিভিটা ছাড় না।বাসার টিভিটা খারাপ। মাঝে মাঝে র চলে যায়। টিভি ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট হয়ে যায়। উত্তরার বড় আপার টিভিটা এনে লাখতে হবে। তবে মেয়ের গান নিয়ে আদিখ্যাতা করা যাবে না। গানের মাঝখানে শায়লা উঠে যাবেন নিজের জন্যে চা বানিয়ে আনতে। চা নিয়ে ঢুকবেন গান শেষ হবার পর এবং বললেন, গান শেয় হয়ে গেল নাকি? যেন টিভিতে গান গাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
গানের অনুষ্ঠানের পর খুব স্বাভাবিক ভাবেই গান প্রসঙ্গে কিছুক্ষণ কথা হবে। তখন শায়লা বলবেন— ক্যাসেট কোম্পানিগুলি গানের ক্যাসেট বের করতে চায়। আমি রাজি না। মেয়ে তো একেবারেই রাজি না। তার কাছে গান হলো খুবই পার্সোনাল ব্যাপার। নিজের আনন্দের জন্যে গান করা। ক্যাসটে গান বের করা মানে মানুষের ঘরে ঘরে তার গলার স্বর পৌঁছে দেয়া–এটা নাকি চিত্রার ভালো লাগে না। আমি অবশ্যি এসব কিছু ভাবি না। তারপরেও কেন জানি ক্যাসেট বের করা আমার ভালো লাগে না।চিত্রার কিছু বান্ধবীকে খবর দেয়া দরকার। যে কোনো উৎসবে মেয়েরা সেজেগুজে কলকল করতে থাকলেই উৎসবটা জমে। তবে খেয়াল রাখতে হবে কোনো মেয়েকেই যেন চিত্রার চেয়ে সুন্দরী না দেখায়। তখন সবার চোখ গিয়ে পড়বে ঐ মেয়ের দিকে।কোনো একটা পার্লার থেকে চিত্রার চুলও সেট করে আনতে হবে।
খুব সিম্পল ধরনের সেটিং। জবরজং দেখালে চলবে না, আবার ঘরে বসে হাত খোঁপা করে ফেলেছে এরকম মনে হলেও চলবে না।কত সমস্যা। শালা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তবে এই দীর্ঘ নিঃশ্বাসে আনন্দ মিশে রইল।রহমান সাহেবকে অফিসে আজ একটু অস্থির দেখাচ্ছে। এগারটা বাজে নি এর মধ্যে তিনবার চা খেয়েছেন, দুবার জর্দা দিয়ে পান গেয়েছেন। চার খিলি পান আনিয়ে গেছেন। ইচ্ছা হলে খাবেন।অফিসে কারো সঙ্গে তাঁর তেমন সদ্ভাব নেই। তবে অফিসের বেয়ারা রতনকে তিনি খুবই পছন্দ করেন। সে যখন চা বা পান নিয়ে আসে তার সঙ্গে তিনি সংসানের কিছু টুকিটাকি কথা বলেন। আজ রাতে তিনি বড় মেয়ের সঙ্গে চাইনিজ হোটেলে খেতে যাবেন এই কথা রতনকে বলেছেন। গলা নিচু করে প্রায় ফিসফিস করে বলেছেন–
হোটেলের পাওনা আমার খুবই অপছন্দ। বড় মেয়েটা একটা শখ করেছে এই জন্যে যাওয়া। ছেলেমেয়েদের শখের দিকটা বাবা মাকে দেখতে হয়।রতন বেশির ভাগ সময়ই আলাপ-আলোচনায় অংশ নেয় না। তবে এমন ভাবে কথা শুনে যে মনে হয় খুব আগ্রহ নিয়ে কথা শুনছে। রহমান সাহেব ঠিক করেছেন অফিস ছুটির পর রতনকে কাল রাতে মাছের ব্যাপারটা বলবেন। কি ভাবে মাছটা তাকে বলল, আজ আমাদের খাবার দেয়া হয় নি। সে অবিশ্বাস করবে না, অন্য কাউকে বলে বেড়াবে না। অফিস ছুটির পরও রহমান সাহেব বেশ কিছুক্ষণ থাকেন। ফাঁকা অফিসে কিছুক্ষণ একা বসে থাকতে তার ভালো লাগে। তখন রতন তার জন্যে লেবু চা নিয়ে আসে।
এই চায়ের দাম রতন কখনোই তাকে দিতে দেয় না। রহমান সাহেবের ইচ্ছা করছে মেয়ের এনগেজমেন্টে রতনকে দাওয়াত করতে। শায়লা তো বলেছে অফিসের কোনো কলিগকে বলতে ইচ্ছা করলে তিনি বলতে পারেন। তবে যদি প্রকাশ হয়ে পড়ে তা এখন পিওন তাহলে সমস্যা হতে পারে। রতন যদি ভালোমতো সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে যায় তাহলে তাকে পিওন মনে হবে না। রতনকে তিনি দাওয়াতের কথা কিছু বলেন নি শুধু বলে রেখেছেন— বৃহস্পতিবারটা খালি রেখ। এক জায়গায় যেতে হতে পারে। রতন ঘাড় কাত করেছে। কোথায় যেতে হবে, কি ব্যাপার কিছুই জিজ্ঞেস করে নি।
লাঞ্চের মিনিট দশেক আগে রহমান সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। অফিসের বড় সাহেবের সঙ্গে তা বলা দরকার। লাবার সময় বড় সাহেব বাসায় লান্ত করতে যান। বেশির ভাগ সময়ই দেবেন না।এই অফিসে সবাই বড় সাহেবের ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকে। তবে তিনি ভয় পান না। তিনি যথাসময়ে অফিসে আসেন, মন লাগিয়ে কাজ করেন, যথা সময়েরও পরে অফিস থেকে বাড়িতে যান। গত পাঁচ বছরে একদিনের জন্যেও দুটি নেন নি। তার টেবিলে কোনো পেন্ডিং ফাইল নেই। তার ভয় পাওয়ার কি আছে? তবে বড় সাহেবের চেহারা রাগী রাগী, গলার স্বরও রাগী। তিনি বড় সাহেবকে এমন কিছু বলতে যাচ্ছেন না যে বড় সাহেব রাগ করবেন এবং রাগী স্বর বের করবেন।
বড় সাহেব টেলিফোনে কথা বলছিলেন। পর্দা সরিয়ে এই দৃশ্য দেখে রহমান সাহেব ঠিক করতে পারলেন না, ঘরে ঢুকবেন নাকি ঢুকবেন না। কেউ টেলিফোনে কথা বললে হুট করে ঘরে ঢুকে পড়া ঠিক না। টেলিফোনে লোকজন অন্তরঙ্গ কথা বলে। বড় সাহেব হাতের ইশারায় রহমান সাহেবকে ঘরে ঢুকতে বললেন এবং ইশারা করলেন চেয়ারে বসার অন্যে। এটা একটা বিশেষ ভদ্রতা। বড় সাহেবের চেয়ে অনেক নিচের অফিসার সেকশনাল ইনচার্জ পরিমল বাবু এই ভদ্রতা করেন না। তার ঘরে কলে তিনি বসতে বলেন না। কেউ বসে পড়লে বিরক্ত হয়ে তাকান। বড় সাহেব টেলিফোন কানে রেগেই রাহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি ব্যাপার?
রহমান সাহেব বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, স্যার আপনার কথা শেষ হোক তারপর বলি? এক সঙ্গে দুইজনের কথা শোনা মুশকিল।বড় সাহেবের ভুরু কুঁচকে গেল। মুখের মধ্যে রাগ রাগ ভাল চলে এল। রাগ করার মতো কোনো কথা রহমান সাহেব বলেছেন কি না বুঝতে পারলেন না। বড় সাহেব টলিফোন রিসিভার নামিয়ে রেখে শুকনা মুখে বললেন, টেলিফোন নামালাম, এখন বলুন কি ব্যাপার।রহমান সাহেব বললেন, একটা চাকরির ব্যাপারে এসেছি স্যার। বড় সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, কি চাকরি?
একটা ছেলে স্যার। খুবই বিপদগ্রস্ত। অতি ভালো ছেলে। মেট্রিকে একটি ডিভিশন পেয়েছে, অংকে লেটার ছিল। ইন্টারমিডিয়েট রেজাল্ট সামান্য খারাপ হয়েছে, দশ নম্বরের জন্যে ফার্স্ট ডিভিশন পায় নাই।বড় সাহেব কথার মাঝখানেই বললেন, হোল্ডে সেকেন্ড। আমরা কি চাকরির জন্য কোনো বিজ্ঞাপন দিয়েছি।জ্বি না স্যার।তাহলে আমাকে চাকরির কথা বলছেন কেন? স্যার ছেলেটা আমাকেই চাকরির কথা বলেছে। আমি চাকরি কোথায় পাব? আপনারা বড় মানুষ, আপনাদের এত যোগাযোগ। যে কোনো চাকরি পেলেই চলবে–পিওন, দারোয়ান, টি বয়… নাম কি ছেলের? নামটা স্যার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। মনে পড়লেই আপনাকে জানাব।যে ছেলের চাকরির জন্যে সুপারিশ করছেন তার নামই মনে নেই। ছেলে কি আপনার আত্মীয়?
জি না ভাড়াটের চাচাতো ভাই। স্যার ছেলেটা খুবই কষ্টে আছে একটু দেখবেন। ক্লাস টু-থ্রি পর্যন্ত ছেলেমেয়েকে সে প্রাইভেট পড়াতে পারবে।বড় সাহেন কিছু বললেন না। বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। রহমান সাহেব উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, নামটা মনে পড়লেই আপনাকে জানিয়ে দিব। ইনশাল্লাহ আজ দিনের মধ্যেই জানাব।ইমার্জেন্সি কিছু নেই। আজ দিনেই যে জানাতে হবে তা না।রহমান সাহেব নিজের সিটে ফিনের ড্রয়ারটা খুলতেই নাম মনে পড়ল—মজনু। লাইলী মজনুর মজনু। তিনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উপরে উঠে গেলেন। বড় সাহেবও লাঞ্চের জন্যে বের হচ্ছিলেন। তাকে নামটা জানিয়ে দিলেন। নামটা মনে পড়ছে স্যার। মজনু। লাইলী মজনুর মজনু। বড় সাহেব কিছু বললেন না। তবে তাকে দেখে মনে হলে তিনি রহমান সাহেবের কথাবার্তায় একধরনের মজা পাচ্ছেন।
অফিস দুটির পর রতন রং চা নিয়ে এল। রহমান সাহেব বললেন, আজ একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে। মেয়ে বাইরে খেতে নিয়ে যাবে, লন্ড্রি থেকে কাপড় আনতে হবে। গতকালের মতো ঝড় বৃষ্টি না হলেই হয়। বেচারী আশা করে আছে আমাকে নিয়ে যাবে— ঝড় বৃষ্টি হলে তো যেতে পারবে না। যাদের গাড়ি আছে তাদের অবশ্য কোনো সমস্যা নেই। ঝড় বৃষ্টি হলেই বরং তাদের সুবিধা। বৃষ্টি দেখতে দেখতে গাড়ি করে যাওয়া। কথা ঠিক বলেছি না রতন? জ্বি।তোমাকে কোনো একদিন একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নলব। মাছের বিষয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কলা। আজই বলতাম, কিন্তু আমার আবার সকাল সকাল বাড়িতে ফেরা দরকার। কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে এটা আমি চাই না। আমি সবার জন্যে অপেক্ষা করব, কিন্তু আমার জন্যে কেউ যেন অপেক্ষা না করে। এটা ভালো বুদ্ধি না?
জ্বি।তোমাকে যে ঘটনাটা বলব এটা গতকাল রাত আনুমানিক এগারোটার সময় ঘটেছে। আমার স্ত্রী চৌবাচ্চায় গোল্ডফিশ পুষে। সেই গোল্ডফিশ নিয়ে একটা ঘটনা। কাল পরশু যে কোনো একদিন বলব। আমি যদি ভুলে যাই তুমি মনে করিয়ে দিও।জ্বি আচ্ছা।আর বৃহস্পতিবারটা ফ্রি রেখ। তোমার এক জায়গাত দাওয়াত। দাওয়াতটা ক্যানসেলও হয়ে যেতে পারে। ক্যানসেল হলে মনে কষ্ট নিও না।জ্বি আচ্ছা।সন্ধ্যার আগেই রহমান সাহেব লাড়ি ফিরলেন। চিত্রা বাড়িতে নেই, মার সঙ্গে শাড়ি কিনতে গিয়েছে। বিকেলে গিয়েছে এখনো ফিরে নি। রহমান সাহেব ধোপার দোকান থেকে পাঞ্জাবি ইস্ত্রী করে আনলেন। মেয়ে বাড়ি ফেরার আগেই তৈরি হয়ে থাকবেন যেন তাঁর কারণে দেরি না হয়।মীরা বলল, বাবা তুমি এমন সেজে তে বসে আছ কেন? দেখে মনে হচ্ছে বিয়ে বাড়িতে যায়।
রহমান সাহেব বাব দিলেন না। মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। রাতে বাইরে খেতে যাওয়ার কথা মীনাকে বলতে পারতেন। বললেন না, কারণ মীরা খেতে যাচ্ছে না। শুধু তিনি আর চিত্রা। এতে মীরা মনে কষ্ট পেতে পারে। অল্পবয়েসী মেয়েরা খুব সহজেই কষ্ট পায়।মীরা বলল, যত দিন যাচ্ছে তুমি যে ততই বদলে যায় এটা কি জান! মাঝে মাঝে তোমাকে দেখে মনে হয় তুমি আমাদের চিনতে পারছ না। মনে হয় তুমি এ বাড়ির কেউ না। তুমি একটা ফার্নিচার। আপার বিয়ে নিয়ে এত হৈচৈ, তুমি কিন্তু নির্বিকার। উত্তেজনায় মা রাতে ঘুমুতে পারছে না। তাকে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমুতে হচ্ছে। আর তুমি দিব্যি নিজের মতো আছ। যে ছেলের সঙ্গে আপার বিয়ে হচ্ছে তুমি তার নাম পর্যন্ত জান না।নাম জানব না কেন? নাম জানি।বল নাম বল।
রহমান সাহেব বিপদে পড়ে গেলেন। তিনি নাম মনে করতে পারছেন না। তাঁর মনে ক্ষীণ সন্দেহ হলো— নামটা তাকে বলাই হয় নি। নাম মনে করার চেষ্টা করতেই একটা নাম তার মনে পড়ল লাইলী মজনুর, মজনু। কিন্তু মজনু ছেলেটার নাম না।কি চুপ করে আছ কেন? নাম বল।ভুলে গেছি। আমার কিছু একটা হয়েছে। নাম মনে করতে পারি না। ঐ দিন অফিসে বড় সাহেবের সঙ্গে কথা বলছি— বড়সাহেব নাম জানতে চাইলেন। আর তো দেখি নাম মনে পড়ে না। কিছুক্ষণ পরে মনে পড়েছে।তোমার ধারণা আপার বরের নাম তোমার কিছুক্ষণ পরে মনে পড়বে? হুঁ।মনে পড়লে তো ভালোই। আমাকে জানিও। আর যদি মনে না পড়ে সেটাও আমাকে জানিও। মা তোমাকে ধরবে।আমাকে ধরবে কেন?
এতক্ষণ যে আমি তোমাকে ধরলাম–সবই মার কথা। মা বলেই রেখেছে আজ তোমাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবে তুমি কিছু জান কিনা।রহমান সাহেব চিন্তিত গলায় বললেন, ছেলের নাম বল। মনে করে রাখি।ছেলের নাম আহসান খান। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। ছেলের বাবা জামালউদ্দিন খান। চাটার্ড একাউন্টেন্ট। এখন উনার নানান ব্যবসা আছে। আলফা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উনি মালিক। ছেলের দাদা সাবিহউল্লাহ খান সোহরাওয়ার্দির আমলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। মনে থাকবে? একটা কাগজে লিখে দে। এত কিছু কি ভাবে মনে থাকবে? সেটাই ভালো। লিখে দিচ্ছি। তুমি বসে বসে মুখস্ত কর। আজ তোমার মহাবিপদ। মা তোমার ওপর খুব রেগে আছে।কেন?
কেনা তা যথাসময়ে জানলে এবং আমি মার সঙ্গে একমত। তোমার ওপর রাগ করার কারণ মার আছে।রাত নটা বেজে গেছে চিত্রা তার মাকে নিয়ে এখনো ফেরে নি। রহমান সাহেবের ক্ষিধেয় নাড়ি খুলে যাচ্ছে। তিনি একটু চিন্তিত বোধ করছেন। আরো দেরি করলে তো রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাবে। তার সময় কাটছে না। ক্ষুধার্ত অবস্থায় কোনো কিছুই ভালো লাগে না। খবরের কাগজ পড়ার চেষ্টা করলেন। খবরের কাগজ পড়তে তার সব সময়ই ভালো লাগে। সকালবেলা যে কাগজ পড়েন, সন্ধ্যাবেলাও সেই একই কাগজ পড়তে পারেন। সকালবেলায় তিনি কি পড়েছেন, সন্ধ্যাবেলায় তা তার পরিষ্কার মনে থাকে না। মীরা কাগজে সে সব তথ্য দিয়ে গেছে, সেগুলি তিনি ভালো মতো মুখস্থ করে রেখেছেন। শায়লা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে তাকে আটকাতে পারবেনা।
মীরা যে তাকে ঝামেলা থেকে বাঁচানোর জন্যে এত কিছু করবে তিনি ভাবতেই পারেন নি।তার কাছে মনে হচ্ছে এ রকম একটা মেয়ে থাকা যে কোনো বাবার জন্যেই ভাগ্যের ব্যাপার।চিত্রা ফিরল রাত সাড়ে নটায়। ফিরেই সাবান তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। শায়লা বললেন, ভাত খেয়ে গোসলে যা। তোর গোসল তে এক ঘন্টার মামলা। এদিকে ক্ষিধায় মারা যাচ্ছি।চিত্রা বলল, গা ঘিন ঘিন করছে। গোসল না করে খেতে পারব না।শায়লা রহমান সাহেবের কাছে গিয়ে বললেন, তুমি সেজেগুজে বসে আছ কেন? কোথাও যাচ্ছ? রহমান সাহেব ভীত গলায় বললেন, না।তোমার কোনো বোনের বাসা থেকে ঘুরে আস না কেন? বোনের বাসায় চলে যাও।কেন?
Read more
