থাকার কোনােই কারণ নেই। তবে সাপ দেখা গেছে। আমি নিজেই দেখেছি। আমি সাপ চিনি না। যেটাকে দেখেছি তার ফণা আছে। কাজেই বিষ থাকার কথা।
বলেন কী ?
আপনার খাটটা ঠিক ঘরের মাঝখানে দিতে বলেছি। খাটের নিচে জ্বলন্ত হারিকেন থাকবে। সাপ কার্বলিক এসিডের চেয়েও বেশি ভয় পায় আলাে। মশা নেই, তবু মশারি খাটিয়ে ঘুমাবেন। বাথরুমে যাবার প্রয়ােজন হলে ভালােমতাে মেঝে দেখে তারপর নামবেন। আপনার কি ভয় লাগছে?
সামান্য লাগছে। সাপ আমার পছন্দের প্রাণী না।
আমার নিজেরও না। আমি এই পৃথিবীতে একটা জিনিসই ভয় পাই। তার নাম সাপ। মানুষ নানান রকম দুঃস্বপ্ন দেখে আমি একটা দুঃস্বপ্নই দেখি আমি সাপের সঙ্গে শুয়ে আছি। বেশ স্বাভাবিকভাবেই শুয়ে আছি। স্বপ্নটা দেখার সময় ভয় লাগে না। স্বপ্নটা যখন ভেঙে যায় তখন প্রচণ্ড ভয় লাগে। গা ঘিনঘিন করতে থাকে। বারবার গােসল করি তারপরেও মনে হয় সাপের স্পর্শ শরীরে লেগে আছে। আপনার সঙ্গে এই বিষয়টা নিয়ে পরে কথা বলব।
আচ্ছা।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি দোতলা পর্যন্ত আপনাকে এগিয়ে দিতে পারছি না। ইচ্ছা থাকলেও সম্ভব না। হুইল চেয়ার দোতলায় ওঠাবার কোনাে ব্যবস্থা নেই। বরকত আপনাকে নতুন ঘর দেখিয়ে দেবে।
এত বড় বাড়িতে আপনারা তিন জন মাত্র মানুষ!
আমরা ছয় জন ছিলাম। এখন তিন জন। জার্নি করে এসেছেন আপনি ক্লান্ত । শুয়ে পড়ুন। কাল আপনার সঙ্গে কথা হবে। আমার উচিত ছিল ঘর পর্যন্ত আপনাকে এগিয়ে দেয়া সেটা সম্ভব না। বরকত এগিয়ে দেবে।
কোনাে অসুবিধা নেই।
বরকতের অদ্রিা রােগ আছে। সে কুকুরগুলির সঙ্গে সারারাত জেগে থাকে। আপনার যদি কোনাে কিছুর প্রয়ােজন হয় সিঁড়ির কাছে এসে ওকে ডাকলেই হবে।
থ্যাংক ব্যু।
নতুন জায়গায় ঘুম যদি না আসে তার জন্যে আপনার ঘরে ফ্রিজিয়াম জাতীয় কিছু ট্যাবলেট দিতে বলেছি। লিলি নিশ্চয়ই দিয়েছে। রাত জেগে যদি বই পড়তে চান তার ব্যবস্থাও করেছি। The Other Mind বইটাও আপনার বিছানার কাছে আছে। বইটা কি পড়েছেন ?
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
না । পাঁচ জন সিরিয়াল কিলারের মানসিকতা ব্যাখ্যা করে বইটা লেখা হয়েছে। আমি নিজে খুবই আগ্রহ করে বইটা পড়েছি। আপনার অনেক বেশি ভালাে লাগবে বলে আমার ধারণা।
বরকত এক গাদা জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়েছে। ফ্লাক্স আছে, চায়ের কাপ আছে, পানির বােতল আছে। মিসির আলির চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। ফ্লাক্স ভর্তি চা থাকলেও তিনি যে রাত জাগবেন এবং চা খাবেন তা মনে হচ্ছে না। বরকত পাশে পাশে হাঁটছে। মনে হচ্ছে তার হাঁটতে খুবই কষ্ট হচ্ছে।
নতুন যে ঘরে মিসির আলিকে থাকতে দেয়া হয়েছে সে ঘরটাও প্রায় আগেরটার মতই বড় । তবে আসবাবপত্র নেই। ঘরের মাঝখানে কাল রঙের খাট। খাটের পাশেই ছােট্ট টেবিল। টেবিলে হারিকেন আছে, একটা কেরােসিনের টেবিল ল্যাম্প আছে, দেয়াশলাই এবং মােমবাতিও রাখা আছে। ঘুমের অষুধ রাখা হয়েছে, এক ধরনের নয়— বেশ কয়েক ধরনের। The Other Mind বইটি রাখা হয়েছে বিছানায় বালিশের উপর।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
শােবার আগে বই পড়া মিসির আলির অনেক দিনের অভ্যাস। পড়ার বই তিনি সঙ্গে এনেছেন। বাইরে বেড়াতে গেলে হালকা ধরনের বইপত্র পড়তেই ভালাে লাগে। সাইকোলজির কঠিন বই না। কিন্তু এ বাড়ির কর্তা যে–কোনাে কারণেই হােক চাচ্ছে যেন তিনি The Other Mind বইটি পড়েন। আজ পড়া যাবে না, কারণ ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। | মিসির আলি দরজার ছিটকিনি লাগাতে গেলেন। জং ধরে ছিটকিনি আটকে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও ছিটকিনি লাগাতে পারলেন না।
লাভের মধ্যে লাভ এই হলাে যে ঘুম কেটে গেল। মিসির আলি ডায়েরি বের করলেন কয়েক পৃষ্ঠা লিখবেন। এতে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হবে। তারপর বই নিয়ে বসবেন। সাইকলজির কঠিন বই না, জেরােম কে জেরােমের এক নায়ে তিনজন। | টেবিলে যদিও দু’টা বাতি তারপরেও এই আলাে লেখার জন্যে যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। মিসির আলি লিখে আরাম পাচ্ছেন না। এক সময় তার মনে হলাে শুধু যে আলাের অভাবেই তিনি লিখে আরাম পাচ্ছেন না, তা না। যে বিষয় নিয়ে লিখছেন সেই বিষয়টি লিখতেও ভালাে লাগছে না। মনের ভেতরে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
এখন রাত একটা কুড়ি। আমার অনেকদিনের অভ্যাস ঘুমুতে যাবার আগে হয় কিছুক্ষণ লিখি, নয় বই পড়ি। লাল মলাটের এই ডায়েরিটা আমি কিনেছিলাম নির্জন সমুদ্রবাসের অভিজ্ঞতা লেখার জন্যে। সমুদ্রবাস এই মুহূর্তে করতে না পারলেও নির্জনবাস ঠিকই করছি। যাদের বাড়িতে আমি আছি তারা আমাকে খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছে কিন্তু আমি কেন যেন ঠিক স্বস্তি পাচ্ছি না । আমার শুধুই মনে হচ্ছে কোথাও একটা সমস্যা আছে। আমি সমস্যা ধরতে পারছি না। সমস্যার নিয়ম হলাে— সমস্যাটা যদি এমন হয় যে খুবই স্পষ্ট তাহলে সেই সমস্যা ধরা যায় না। ধরতে সময় লাগে।
এরা খুব আগ্রহ করে আমাকে এই বাড়িতে এনেছে। আগ্রহের পেছনের কারণটা কী? আমাকে আকাশের তারা দেখানের জন্যে, কিংবা ভালাে ভালাে খাবার রান্না করে খাওয়াবার জন্যে নিশ্চয়ই আনে নি। আমি অতি বিখ্যাত কোনাে ব্যক্তি না যে এ বাড়িতে কিছুদিন থেকে গেলে এদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।
এরা বলতে পারবে আমাদের সঙ্গে মিসির আলি কিছুদিন ছিলেন। তিনি আমাদের অতি বন্ধু মানুষ। প্রায়ই আসেন। আগামী সামারে আবার আসবেন। এই দেখুন মিসির আলির সঙ্গে আমাদের ছবি।
সুলতান বা তার স্ত্রী আমার কাছ থেকে ঠিক কি চাচ্ছে তা এখনাে ধরতে পারছি না বলে আমার অস্বস্তিটা কাটছে না। তারা কোনাে বিপদে আছে বলে আমার মনে হয় না। বিপদে থাকলে প্রথম রাতেই বিপদের কথা জানতে পারতাম। এদের আচার আচরণে সামান্য অস্বাভাবিকতা আছে এটা থাকবেই। একটা বিশাল পাঁচিল ঘেরা বাড়িতে দিনের পর দিন যদি তিনটি মানুষ বাস করে তাহলে তাদের চরিত্রে পরিবেশের প্রভাব প্রবলভাবে পড়বে। পরিবারের প্রধান মানুষটি হুইল চেয়ারে জীবন যাপন করছেন।
Read more
