এই মুহূর্তে যা ঘটছে তা স্বপ্ন না সত্যি তা প্রমাণ হবে ডায়েরির লেখা থেকে। সকালে ঘুম ভেঙে যদি দেখেন ডায়েরিতে কিছু লেখা নেই তাহলে বুঝতে হবে। পুরাে ব্যাপারটা স্বপ্ন। আর যদি দেখেন লেখা আছে তাহলে বুঝতে হবে যা দেখেছেন সবই সত্যি। মিসির আলি খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামলেন। সাপটাকে প্রথমবার দেখে যে ভয় পেয়েছিলেন, সেই ভয়টা এখন আর লাগছে ।
তবে গা ছমছম করছে।
মেঝেতে কোথাও সাপটাকে দেখা গেল না। মিসির আলি টেবিলের কাছে গেলেন। ডায়েরিতে লিখলেন— “আজ সাত তারিখ । আমি আমার মশারির উপর একটা সাপ দেখেছি।” লিখে নাম সই করলেন। ডায়েরি উল্টে এমনভাবে টেবিলে রাখলেন যেন সকালে ঘুম ভাঙতেই চোখে পড়ে ডায়েরিটা উল্টানাে। টেবিলের কাছ থেকে গেলেন দরজার কাছে। দরজা খুলে বাইরে যাবেন। কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়াবেন। ঘরের ভেতর দমবন্ধ লাগছে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
তিনি দরজায় ছিটকিনি না দিয়েই শুয়েছিলেন। পুরনাে আমলের বাড়ি ছিটকিনি জং ধরে আটকে গিয়েছিল। যেহেতু ছিটকিনি লাগানাে নেই, আংটা ধরে টানলেই দরজা খুলে যাবার কথা। কিন্তু আশ্চর্য দরজা খুলতে পারলেন না। প্রাণপণে টেনেও দরজা নাড়ানাে গেল না। মনে হচ্ছে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ । তিনি বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেন। কোনাে লাভ হলাে না। মিসির আলি খাটে এসে উঠলেন। হৈ চৈ চিৎকার করার কোনােই মানে হয় না। পুরাে ব্যাপারটা স্বপ্ন হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কাজেই তার যা করণীয় তা হলাে বিছানায় চলে যাওয়া । ঘুমিয়ে পড়া এবং ঘুম ভাঙার জন্যে অপেক্ষা করা ।
মিসির আলি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। শীত শীত লাগছে। পায়ের কাছে রাখা চাদর বুক পর্যন্ত টেনে দিলেন। একটা হাত রাখলেন কোলবালিশের উপর। তিনি চোখ বন্ধ করে আছেন। মাথার ভেতরে সমুদ্র গর্জনের মতাে শব্দ হচ্ছে। এ রকম শব্দ কেন হচ্ছে কে জানে? প্রচণ্ড ভয় পাবার পরে কি মানুষের শরীর বৃত্তীয় কর্মকাণ্ড খানিকটা এলােমেলাে হয়ে যায় ?
তার ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়। ঘর ভর্তি আলাে। পাখপাখালি চারদিকে কিচকিচ করছে। খাটের পাশে লিলি দাড়িয়ে আছে। তার হাতে চায়ের কাপ। আজ মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছে তার বয়স কিছুতেই সতেরাে আঠারাে বছরের বেশি হবে না। লিলি হাসিমুখে বলল, চাচাজি আপনি দরজার ছিটকিনি না লাগিয়েই ঘুমিয়েছেন ?
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
মিসির আলি উঠে বসতে বসতে বললেন, ছিটকিনি লাগাতে পারি নি।
লিলি বলল, আমি তাে আর সেটা জানি না। এর আগেও দুবার এসে বন্ধ দরজার সামনে দাড়িয়ে থেকে চলে গেছি। এইবার কী মনে করে দরজা ধাক্কা দিলাম। ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। চাচাজি রাতে ঘুম কেমন হয়েছে ?
ভালাে।
নিন চা নিন। আমি বইয়ে পড়েছি আপনি বাসিমুখে দিনের প্রথম চা খান। নাশতা তৈরি আছে। হাত মুখ ধুয়ে নিচে নামলেই নাশতা দিয়ে দেব।
তােমার শরীর এখন ভালাে?
শরীর খুব ভালাে। কাল রাতেও ভালাে ছিল। ওর সঙ্গে রাগারাগি করে বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। ও আপনাকে কী বলেছে ? আমার মাথা খারাপ? আমার চিকিৎসা দরকার ?
এই ধরনেরই কিছু। লিলি হাসতে হাসতে বলল, ওর কোনাে দোষ নেই। রাগারাগির এক পর্যায়ে আমি মাথা খারাপের অভিনয় করেছি। ও আমার অভিনয় ধরতে পারে না। চাচাজি আমার চা কেমন হয়েছে ?
ভালাে হয়েছে। কাল রাতের খাবারটা কেমন ছিল? ভালাে ছিল। আমি খুব তৃপ্তি করে খেয়েছি।
আজ আপনাকে কই মাছের পাতুরি খাওয়াব। পুঁই শাকের পাতা আনতে পাঠিয়েছি। পাওয়া গেলে হয়। এমন জংলা জায়গায় বাস করি । আশে পাশের দুতিন মাইলের মধ্যে হাটবাজার নেই।
মিসির আলি কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন, লিলি একটা কাজ কর তাে— টেবিলের উপর দেখ আমার ডায়েরিটা উল্টো করে রাখা আছে। পাতাটা খুলে দেখ কী লেখা।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলি টেবিলের কাছে গেল। ডায়েরি উল্টো করে রাখা নেই। বইগুলির উপর রাখা। লিলি বলল, চাচাজি টেবিলের উপর কোনাে ডায়েরি উল্টো করে রাখা নেই।
লাল মলাটের বইটি ডায়েরি। সাত তারিখ বের করে দেখ তাে কিছু লেখা আছে কি না।
লিলি অবাক হয়ে বলল, কিছু লেখা নেই। কী লেখা থাকবে ?
মিসির আলি হালকা গলায় বললেন, রেখে দাও। কিছু লেখা থাকবে না। তােমার স্বামীর ঘুম কি ভেঙেছে ?
ওর ঘুম একটার আগে ভাঙবে না। সারা রাতে জেগে তারা দেখেছে। আপনাকে কী কী দেখাবে সব ঠিকঠাক করেছে। আজ আপনাকে কী দেখানাে হবে জানেন ?
না।
শনির বলয়। এইসব দেখে কী হয় কে জানে! আমার খুবই ফালতু লাগে। চাচাজি আমি নিচে যাচ্ছি। হাতমুখ ধুয়ে আপনি নেমে আসুন। আজ আপনি নাশতা খাবেন চুলার পাশে বসে। গরম গরম লুচি ভেজে পাতে তুলে দেব।
তােমার লুচিগুলিও কি স্পেশাল ?
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
অবশ্যই। অর্ধেক ময়দা আর অর্ধেক সুজিদানা মিশিয়ে কাই তৈরি করা হয়। দশ বারাে ঘণ্টা এই কাই ভেজা ন্যাকড়ায় জড়িয়ে রেখে দিতে হয়। লুচির কাই আমি কাল রাতেই তৈরি করে রেখেছি।
ভালাে।
শুধু ভালাে বললে হবে না। আপনি চলে যাবার আগে আমাকে একটা সার্টিফিকেট দিয়ে যাবেন। রান্নার সার্টিফিকেট। সেই সার্টিফিকেট আমি বাঁধিয়ে রাখব।
অবশ্যই দিয়ে যাব। তুমি চাইলে এখনি দিয়ে দিতে পারি।
ওমা এখন কেন দেবেন ? আমি তাে এখনাে আপনার জন্যে রান্নাই করি নি। চাচাজি যাই।।
লিলি চলে যাবার পর মিসির আলি টেবিলের কাছে গেলেন।
Read more