আমি এবং কয়েকটি প্রজাপতি শেষ:পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

আমি এবং কয়েকটি প্রজাপতি শেষ:পর্ব

যে মেয়েটির অতি আদরের ছোটবোন দু’ঘণ্টা আগে মারা গেছে সে কি এত স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে? অবশ্যই পারে না। রূপা পারছে কারণ সে তার সমস্ত অস্বাভাবিকতা বড় বোনের মৃত্যুতে দেখিয়ে ফেলেছে। ছোট বোনের মৃত্যু তাকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করছে।তবে এই স্বাভাবিকতা সাময়িক। খুবই সাময়িক। প্রবল শোকের ব্যাপারটা সে এখনো বুঝতে পারছে না, মস্তিষ্ক তাকে বুঝতে দিচ্ছে না। কারণ মস্তিষ্ক মনে করছে রূপা যখনই প্রবল শোকের ব্যাপারটা পুরোপুরি বুঝবে তখনই মস্তিষ্ক নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মস্তিষ্ক চেষ্টা করছে নিজেকে রক্ষা করতে।রূপা আবারো বলল, তুমি কি চা খাবে? চা বানিয়ে আনব?

তোমাকে চা বানিয়ে আনতে হবে না। তুমি বসো তো আমার পাশে।রূপা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, তুমি এমন অসহায়ের মতো মুখ করে বসে আছ, আমার খুব খারাপ লাগছে।আমি বললাম, রূপা, তুমি একটা কাজ কর–ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে থাক। তোমার ঘুম দরকার।রূপা বলল, আমি তোমার পাশে বসে থাকব, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। তুমি হাতটা দাও তো, আমি তোমার হাতটা একটু ধরি।আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। রূপা আমার হাত ধরে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, তুমি এখন আর আমাকে আগের মতো দস্তা-কন্যা বলে ডাক না কেন?

এখন থেকে অবশ্যই দস্তা-কন্যা ডাকবে।আমি বললাম, আচ্ছা।রূপা বলল, আমি ছোটনের গোপন একটা ব্যাপার জানি। গোপন ব্যাপারটা শুনলে তুমি খুবই অবাক হবে।গোপন ব্যাপারটা কী? ছোটন তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম। একবার ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে আলাপ করব। তোমার পরামর্শ নেব।আলাপ কর নি কেন? তুমি যদি আমার বোনটাকে খারাপ ভাব–এই জন্যে আলাপ করি নি। আমি চাই না কেউ আমার বোনকে খারাপ ভাবুক।তাহলে ঠিক আছে।আমি যে তোমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি তা কি তুমি জানো? জানি।কেন ভালোবাসি সেটা জানো?

জানি।তাহলে আমাকে একটু বুঝিয়ে বলো তো কেন ভালোবাসি। আমি নিজে জানি না। আমার জানতে ইচ্ছা করে।আরেক দিন বলি। আজ বাড়িতে এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটল। এই সময়ে ভালোবাসা বাসি নিয়ে কথা বলা ঠিক না।তুমি ঠিকই বলেছ। আচ্ছা শোন, আমার খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে। আমি কাঁদতে পারছি না। কেন বলো তো? বলতে পারছি না।কান্না দেখতে তোমার ভালো লাগে না। এই জন্যে আমি কাঁদছি না। আমি ঠিক করেছি তোমার ভালো লাগে না এমন কোনো কাজ আমি কখনো করব না। ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছি না? হ্যাঁ, খুব ভালো সিদ্ধান্ত।এতক্ষণ ধরে আমরা কথা বলছি, তুমি কিন্তু এখনো একবারও আমাকে দস্তাকন্যা বলে ডাক নি।কেমন আছ দস্তা-কন্যা?

রূপা গাঢ় স্বরে বলল, ভালো আছি। আমি খুব ভালো আছি।অনেক রাতে আমি ছাদে গেলাম। ডাক্তার সাহেব পেথিড্রিন ইনজেকশান দিয়ে রূপাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছেন। সহজে তার ঘুম ভাঙবে না। আমি দীর্ঘ সময় আকাশ দেখতে পারব। টেলিস্কোপ দিয়ে শখের এনোমারের আকাশ দেখা না, খালি চোখে আকাশ দেখা। আকাশে কোনো কোনো নক্ষত্র উজ্জ্বল, কোনো কোনোটি অনুজ্জ্বল। দীর্ঘ সময় এদের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ সবগুলি নক্ষত্রকে সমান ঔজ্জ্বল্যে দেখতে চেষ্টা করে, তখন মস্তিষ্কে কিছু রি-এরেঞ্জমেন্ট হয়। তার ফল খুব ইন্টারেস্টিং। তখন মনে হয় সব নক্ষত্র হঠাৎ নিচে নেমে আসছে কিংবা যে তাকিয়ে আছে সে ভেসে ভেসে নক্ষত্রের দিকে যাচ্ছে।

যখন আকাশের তারাগুলি আমার চোখের দিকে নামতে শুরু করল তখন অবিকল ছোটনের গলায় কেউ একজন বলল, কী দেখছ? আমি বললাম, তারা দেখছি। কাঁসা-কন্যা, কেমন আছ? ভালো আছি। আমি সবসময় ভালো থাকি।তুমি কোথায়? আমি তোমার মাথার পাশে, পা ছড়িয়ে বসে আছি।আমি যদি উঠে বসি তাহলে কি তোমাকে দেখতে পাব? অবশ্যই দেখতে পাবে। তোমার রোগ অনেক বেড়েছে, কাজেই বেশিরভাগ সময়ই তুমি আমাকে দেখতে পাবে। তুমি যদি আমাকে বলো তোমার পাশে শুয়ে তারা দেখতে, তা হলে আমি তাই করব। তুমি তখন আমার গায়ে হাত রেখেও তারা দেখতে পারবে। কিংবা আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার চোখের দিকেও তাকিয়ে থাকতে পার। চোখের মণিতে তারার প্রতিফলন দেখাটাও ইন্টারেস্টিং হবার কথা।

আমার কাছে তো পুরো ব্যাপারটাই ইন্টারেস্টিং লাগছে। কল্পনার মানুষের বাস্তব উপস্থিতি।কাঁসা-কন্যা হাসল।আমি বললাম, হাসছ কেন?কাঁসা-কন্যা বলল, আমি হাসছি, কারণ, তোমার যে অসুখটা হয়েছে সেটা আসলেই মজার অসুখ। এই অসুখে বাস্তব-অবাস্তব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। কখনো তোমার কাছে মনে হবে, আমি বাস্তব, রূপা কল্পনা।আচ্ছা তুমি এখন কার মতো? রূপার মতো না-কি ছোটনের মতো।তুমি আমাকে যার মতো ভাববে, আমি হব তার মতো।কাঁসা-কন্যা, আমার পাশে এসে শুয়ে থাক। আস আমরা এক সঙ্গে তারা দেখি।সে বাধ্য মেয়ের মতো আমার পাশে এসে শুয়ে পড়ল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ঐটাই কি সপ্তর্ষিমণ্ডল? আমি বললাম, হ্যাঁ।সপ্তঋষির নামগুলি জানো?

অবশ্যই জানি–অন্ডু, পুলহ, পুলস্ত্য, অত্রি, অষ্টিরা, বশিষ্ট, মরীচ।অরুন্ধতি নামের একটা তারা আছে না? অরুন্ধতি কোনটা? বশিষ্টের পাশের তারাটি অরুন্ধতি। দেখতে পাচ্ছ? না।চোখ খারাপ হলে অরুন্ধতি দেখা যায় না। আমার মনে হয় তোমার চশমা নিতে হবে।আমাকে চোখের ডাক্তারের কাছে কবে নিয়ে যাবে বলো তো। আমি অরুন্ধতি তারাটা খালি চোখে দেখতে চাই।নিয়ে যাব। খুব শিগগিরই নিয়ে যাব।আমি কাঁসা-কন্যার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। তারাগুলি সত্যি সত্যি তার চোখে দেখা যাচ্ছে। বাহ মজা তো! কাঁসা-কন্যা লজ্জা লজ্জা গলায় বলল, চোখ বড় বড় করে কী দেখছ?

আমি বললাম, তারা দেখছি। তারাগুলি কি সুন্দর তোমার চোখের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।সে আদুরে গলায় বলল, উদ্ভট কথা বলবে না তো।আমি বললাম, তুমি যে ধরনের কথা শুনতে চাও আমি ঠিক সেই ধরনের কথা বলব। ভালোবাসার কথা শুনতে চাও? না।না কেন? আমার লজ্জা করবে।তাহলে কি জ্ঞানের কথা শুনতে চাও? বিজ্ঞানের কথা। সৃষ্টি-তথ্য।বলো শুনি।এক্সপানডিং ইউনিভার্সের তথ্য জানো? আদিতে এই মহাজগৎ বিন্দুতে সীমাবদ্ধ ছিল। হঠাৎ কী যেন হলো। প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। বিন্দু পরিণত হলো মহাজগতে এবং সেই জগত থেমে রইল না, চারদিকে ছড়িয়ে যেতে লাগল।বাহ অদ্ভুত তো! যে নক্ষত্ররাজি যতদূরে সে তত বেশি গতিতে বাইরের দিকে ছুটছে।কোথায় যাচ্ছে?

কোথায় যাচ্ছে আমরা জানি না। তবে একটা জিনিস জানি–সবচে’ দূরবর্তী নক্ষত্ররাজি ছুটছে আলোর গতিতে। তাতে একটা বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।কী সমস্যা? যে বস্তু আলোর গতিতে ছুটে তার কাছে সময় বলে কিছু নেই। ঐসব বস্তু বাস করছে সময় শূন্য জগতে। কাজেই ঐসব বস্তু সম্পর্কে আমরা কোনোদিনই কোনো কিছু জানতে পারব না।আমি গল্প করছি। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে গল্প শুনছে কাঁসা-কন্যা। আহারে, কী আনন্দময় সময়!

মূল গল্প থেকে একটু সরে যাই? তাতে আপনার নিশ্চয়ই সমস্যা হবে না। একটা ভেরিয়েশনও হবে। প্রকৃতি ভেরিয়েশন পছন্দ করে। দেখছেন না সে। কত বিচিত্র ধরনের গাছপালা, জীবজন্তু তৈরি করেছে! সে যেমন পিপড়ার মতো ক্ষুদ্র প্রাণী তৈরি করেছে আবার দশটা হাতির সমান নীলতিমিও তৈরি করেছে।মূল গল্পের বাইরের গল্পটা ইফতেখার মামাকে নিয়ে। মনে হয় তার মধ্যে কিছু একটা হচ্ছে। মানসিক চেইন রিঅ্যাকশান। চেহারা হাবাগোবা টাইপ হয়ে গেছে। মাথা ঝুলে গেছে। থুতনি চলে এসেছে বুকের কাছাকাছি। সাথীর মৃত্যুর ধকল সামলাবার পর তাঁর সঙ্গে এটা আমার দ্বিতীয় দেখা। আমি বললাম, মামা, কেমন আছেন?

তিনি জড়ানো গলায় বললেন, ভালো না।আমি বললাম, ভালো না কেন? কী হয়েছে? তিনি জবাব দিলেন না। তাঁর মাথা আরো ঝুঁকে গেল। থুতনি সত্যি সত্যি বুকের সঙ্গে লেগে গেল। আমি বললাম, হাত অবশ হয়ে গেছে? তিনি হ্যা-সূচক মাথা নাড়লেন।আমি বললাম, বড় কোনো মিথ্যা কথা বলেছেন? তিনি বিড়বিড় করে বললেন, কোনো মিথ্যা কথাই বলি নাই।আমি বললাম, এক কাজ করুন। হজ্ব করে আসুন। হাত ঠিক হয়ে যাবে। টাকা কোনো সমস্যা না। টাকা দিচ্ছি। আজই দেব। চেক লিখে দেব।মামা এইবার মাথা তুললেন। স্পষ্ট গলায় বললেন, তোমার টাকায় হজ্ব করব না।আমি বললাম, কেন করবেন না? আমি খারাপ লোক, আমি খুনি–এই জন্যে?

তিনি স্থির হয়ে রইলেন। হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না।আমি উৎসাহের সঙ্গে বললাম, মামা শুনুন, আমি খারাপ লোক না। আমি পাগল। পাগলদের অপরাধকে অপরাধ বলে ধরা হয় না। তাদের কোনো বিচারও হয় না। শুধু যে ইহকালে হয় না তা-না, পরকালেও হয় না। শেষ বিচারের দিনেও তাদের বিচার হবে না।ইফতেখার মামা এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু তিনি যে আমাকে পরিষ্কার দেখতে পারছেন তা মনে হলো না। আমি বললাম, আপনার হাতটা ঠিক করা দরকার। যে সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মানুষের দু’টা করে আছে তার একটা নষ্ট হলে অন্যটাও নষ্ট হয়ে যায়। একে বলে সিমপ্যাথিটিক রিঅ্যাকশান। মনে করুন আপনার ডান চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুদিন পর দেখবেন আপনার বা চোখের জ্যোতিও কমতে শুরু করেছে।

ইফতেখার মামা বললেন, হজ্বে গেলে আমার এই রোগ সারবে না। কী করলে সারবে সেটা আমি জানি।কী করলে সারবে? তুমি যে মানুষ খুন করেছ এই কথাটা যদি সবাইকে বলি তাহলে রোগ সারবে।তাহলে তো চিকিৎসা সহজ হয়ে গেল। আপনার যাকে বলতে ইচ্ছা বলুন। পরিচিতদের বললে কিছু হবে না। বলতে হবে পুলিশকে। এক কাজ করুন, এখুনি থানায় চলে যান।মামা বিড়বিড় করে বললেন, আমি কাউকে কিছু বলতে পারব না।কেন? জানি না কেন।আমি বলে দেব কেন? আমি বিপদে পড়ি এমন কিছুই আপনি করতে পারবেন না। কারণ আমি একজন সাইকোপ্যাথিক মানুষ। সাইকোপ্যাথিক মানুষরা তাদের চারপাশের মানুষদের এক ধরনের ঘোরের মধ্যে রাখে। তারা এই ঘোর থেকে বের হতে পারে না।মামা বললেন, আমি যাই।চলে যাবেন?

মামা জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি বললাম, আপনি আমার বিষয়ে পুলিশের কাছে কিছু বলতে চাইলে বলতে পারেন। আমি কিছুই মনে করব না। আপনার এই রোগ কিন্তু ছড়িয়ে পড়বে। সর্বাঙ্গ অবশ। জীবন কাটছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে। অবস্থাটা চিন্তা করেছেন? মামা ক্ষীণ গলায় বললেন, আমি পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম কিন্তু কিছু বলতে পারি নি।আপনি কী করেছেন? ওসি সাহেবের সঙ্গে এক কাপ চা খেয়ে চলে এসেছেন? চা খাই নি, চলে এসেছি।মামা, আপনার কিন্তু পুলিশকে ঘটনাটা বলা দরকার ছিল। শুধু যে আপনার রোগমুক্তির জন্যেই দরকার ছিল তা-না। আমি যাতে এই ধরনের অপরাধ আর করতে না পারি তার জন্যেও দরকার ছিল। আমি তো এই ধরনের অপরাধ আরেকটা করতে পারি।

আরেকটা করবে?

করাটাই তো স্বাভাবিক।

করাটা স্বাভাবিক?

আপনার জন্যে স্বাভাবিক না। কিন্তু আমার জন্যে অবশ্যই স্বাভাবিক। একজন সুস্থ মানুষের জগৎ এবং একজন অসুস্থ মানুষের জগৎ এক রকম না। আপনার রিয়েলিটির সঙ্গে আমার রিয়েলিটির কোনো মিল নেই। মামা, আপনি পুলিশের কাছে যান। এখনই চলে যান। ড্রাইভারকে বলুন আপনাকে থানায় নামিয়ে দেবে। আমাদের এলাকাটা কোন থানার আন্ডারে? রমনা থানা? মামা জড়ভরতের মতো এগুচ্ছেন। তার হাঁটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি কাউকে কিছু বলতে পারবেন না। ব্যাধি তাঁকে ক্রমে ক্রমেই গ্রাস করবে। আহা বেচারা!

ভাই, আমার গল্পটা কেমন লাগছে? রূপকথার গল্পের মতো না? রূপকথার গল্পে দুই রানী থাকে–সুয়োরানী ও দুয়োরানী। আমার গল্পেও তো দুই রানী একজন রূপা, আরেকজন কাঁসা।রূপকথার গল্প শেষ হয় কীভাবে? শেষ লাইনটি থাকে এরকম—‘অতঃপর তাহারা সুখে দিন কাটাইতে লাগিল।’ আমিও সুখে দিন কাটাচ্ছি। রূপকথার চেয়েও ভালো আছি।রূপকথায় শেষপর্যন্ত দুই রানী থাকে না। ভালোটা থাকে, খারাপটা চলে যায়। আমি আছি দু’জনকে নিয়েই। সারাদিন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। মাঝে মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি।গাছের গোড়ায় পানির বদলে রক্ত দেয়ার পরীক্ষাটা শুরু করেছি।আরেকটা পরীক্ষা করছি বিড়াল দিয়ে।

কটা বিড়ালকে অন্ধকার ঘরে আটকে রেখেছি যেখানে সামান্যতম আলোও নেই। আমার দেখার ইচ্ছা দীর্ঘদিন অন্ধকারে থাকার কারণে বিড়াল অন্ধ হয়ে যায় কি-না। কেউ কোনো বাধা দিচ্ছে। না। বরং কাঁসা-কন্যার কাছ থেকে উৎসাহ পাচ্ছি। বেশিরভাগ সময় সে আড়ালে আড়ালে থাকে। তবে ডাকলেই চলে আসে।কাঁসা-কন্যার জন্যে আমি একটা নাম খুঁজে বেড়াচ্ছি। আপনার জানা সুন্দর নাম কি আছে? আপাতত একটা নাম ঠিক করে রেখেছি ‘প্লবঙ্গ’। তারার নামে নাম।ধ্রুবতারার কাছাকাছি একটা তারা আছে, যাকে বলা হয় মেরু প্রহরী (Gurdian of the pole)। এই তারা ধ্রুবতারাকে ঘুরে ঘুরে পাহারা দেয় এরকম মনে হয়। পাহারাদার সেই তারার বাংলা নাম প্লবঙ্গ। ইংরেজিতে Kochab.

কাঁসা-কন্যা তো আমাকে পাহারাই দিচ্ছে, কাজেই তার নাম প্লবঙ্গ হতে পারে।তবে যুক্তাক্ষর দিয়ে শুরু নাম আমার পছন্দ না। সব নাম হওয়া উচিত যুক্তাক্ষর বর্জিত। আমি কাঁসা-কন্যার জন্যে ভালো নাম খুঁজছি। আপনার সন্ধানে থাকলে বলবেন।রূপাকে একটা হোমে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। সেখানে সে ভালো আছে। খাওয়া-থাকার কোনো সমস্যা নেই। চিকিৎসা চলছে। মানসিক রোগ তো। জীবাণুঘটিত কোনো ব্যাপার না যে এন্টিবায়োটিক দিয়ে সারিয়ে দেয়া যাবে। সাত দিনের কোর্স। প্রতি আটঘণ্টা পর পর দুশ’ পঞ্চাশ মিলিগ্রাম এন্টিবায়োটিক।কঠিন মানসিক ব্যাধি সারতে সময় লাগে। সবসময় যে সারে তাও না।

রূপা ভালো আছে। বেশ ভালো। সে তার নিজের ঘরে দিনরাত বসে থাকে। ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়। শুধু আমি যখন তাকে দেখতে যাই, সে ঘর থেকে বের হয়। আমার সঙ্গে অনেক গল্প করে। তার শৈশবের গল্প। বাবা, মা, ভাইবোনের গল্প। ইউনিভার্সিটির গল্প। গল্প করতে করতে হঠাৎ থেমে যায়। মুখ করুণ করে বলে আমাকে এখান থেকে কবে নিয়ে যাবে? আমি বলি, খুব শিগগিরই নিয়ে যাব।আজ নিয়ে যাবে? আমাকে বের করে নিয়ে চল। কতদিন ধরে যে এই ঘরটার মধ্যে আছি! বেশিদিন তো হয় নি রূপা। মাত্র দু’বছর হয়েছে। মাত্র সাত শ তিরিশ দিন।আমার কাছে মনে হচ্ছে কয়েক লক্ষ বছর ধরে এইখানে আছি। যেন আমার জন্মই হয়েছে এই ঘরে।এই তো আর অল্প কিছু দিন। আমি তোমার জন্যে চকলেট এনেছি। চকলেট খাও।

তুমি কি এখন চলে যাবে?

না, আরো কিছুক্ষণ থাকব।

আবার কবে আসবে?

আবার কবে আসব সেটা তো তুমি জানো। আমি প্রতিমাসের প্রথম রবিবারে আসি।ভুলে যাবে না তো? না, ভুলব না। আমার স্মৃতিশক্তি খুব ভালো।আমি জানি তোমার স্মৃতিশক্তি ভালো। কেন জানি আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। আমার কিছু মনে থাকে না। তুমি যে প্রতিমাসের প্রথম রবিবারে আস—এটা আমার মনে ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল তুমি ছয়-সাত বছর পর পর একবার আস।

তুমি যদি চাও মাসে দু’বার আসব।

দরকার নেই, তোমার কষ্ট হবে।

রূপা বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমার চলে যাবার সময় হলেই তার শ্বাসকষ্ট হয়। বেচারি বড় কষ্ট পায়।রূপার সঙ্গে দেখা করে আমি গেলাম ইফতেখার মামাকে দেখতে। তিনি একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে আছেন। পুরো শরীর অবশ। শুধু মাথা নাড়তে পারেন। কথা বলতে পারেন। তাঁর সেবার জন্যে একজন সার্বক্ষণিক নার্স আছে। নিউরোলজিস্ট প্রফেসার আবিদ তার চিকিৎসা করছেন। ফিজিওথেরাপিস্টও একজন আছেন। চিকিৎসার যাবতীয় খরচ আমি দিচ্ছি।মামা আমাকে দেখে খুশি হলেন। তাঁর চোখ ঝলমল করে উঠল। আমি বললাম, মামা, ভালো আছেন? মামা বললেন, হু। ভালো আছি। তুমি কেমন আছ বাবা?

আমি জবাব দিলাম না। মামার পাশে বসলাম। আমি যে ভালো আছি এটা মামাকে বলতে ইচ্ছা করছে না।সারাটা দিন আমার নানান কাজকর্মে কাটে। ‘বাংলাদেশের পাখি’ বিষয়ে আমি একটা বই লেখার চেষ্টা করছি। পাখি দেখার জন্যে বায়নোকুলার নিয়ে প্রায়ই আমাকে বনে-জঙ্গলে যেতে হয়। দিনের সময় পাখিদের জন্যে থাকলেও রাতটা আমি রেখে দেই প্রবঙ্গের জন্যে।আমার রাত কাটে প্লবঙ্গের সঙ্গে গল্প করে। কত বিচিত্র বিষয় নিয়েই না। আমরা গল্প করি! মাঝে মাঝে তাকে কবিতা পড়ে শোনাই। সে মুগ্ধ হয়ে শোনে। তার চোখে ছলছল করে অশ্রু। সে চোখ মুছে গাঢ় গলায় বলে, এই কবিতাটা আবার পড় তো!

আমি আবারো পড়ি

If we shall live, we live;

If we shall die, we die;

If we live we shall meet again;

But to night, goodbye.

রাতে ঘুমুতে যাবার আগে আগে রূপার ডায়েরির কয়েকটা পাতা পড়ি। কী গুছিয়েই না সে তার আবেগের কথা লিখেছে–

আজ বুধবার। ওকে দেখলাম বারান্দায় বসে আছে। তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। ও আকাশ খুব ভালোবাসে। দিনে আকাশ দেখে। রাতেও আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে থাকে। ও যখন একা একা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে তখন আমার এত মায়া লাগে। আমার ইচ্ছা করে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলি–তোমার কিসের কষ্ট বলো তো? রাতে হঠাৎ যদি আমার ঘুম ভেঙে যায় আমি উঠে বসি। তাকিয়ে থাকি ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে। আমার মনে হয় আমি আমার বাকি জীবনটা তার মুখের দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দিতে পারব। আমার আর কিছু লাগবে না।রূপার লেখা পড়তে পড়তে আমার চোখ ছলছল করে। আমার মনে হয়–আমাদের জীবনটা তো সুখেই কাটছে।

 

Read more

আজ চিত্রার বিয়ে পর্ব:০১ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *