আমি এবং কয়েকটি প্রজাপতি পর্ব:০৭ হুমায়ূন আহমেদ

আমি এবং কয়েকটি প্রজাপতি পর্ব:০৭

আমাকে খুনি বলছেন কেন? আমি খুন করি নি। খুন করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি সামান্য ভয় দেখিয়েছি। আমাদের সমাজে ভয় দেখানো নিষিদ্ধ না। আমরা সবসময় কাউকে না কাউকে ভয় দেখাচ্ছি। আপনি আপনার নিজের কথা চিন্তা করুন। আপনি নিশ্চয়ই আপনার এক জীবনে অনেককে ভয় দেখিয়েছেন। কাউকে না কাউকে নিশ্চয়ই বলেছেন–জানে মেরে ফেলব, বদমাশ কোথাকার! ভূত সেজে কাউকে ভয় দেখান নি? অবশ্যই দেখিয়েছেন। আপনার ভয় দেখানোতে কেউ মারা যায়। নি। আমার ক্ষেত্রে একজন দুর্বল হার্টের কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণে মারা গেছে। এতেই আমি খুনি হয়ে গেলাম?

আপনার হিসাব-নিকাশ তো অদ্ভুত!উনিশ শ’ একাত্তর সনের একটা গল্প বলি। মুক্তিবাহিনী ইন্ডিয়ান আর্মি নিয়ে আমাদের গ্রামে ঢুকেছে। রশীদ মণ্ডল নামের নিতান্তই নিরীহ একজনের সঙ্গে তাদের দেখা। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার কী মনে করে রশীদ মণ্ডলের হাত চেপে ধরে বলল, এই তুই কি রাজাকার? সঙ্গে সঙ্গে হার্টফেল করে রশীদ মণ্ডল মারা গেল। এখন আমরা কি মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারকে খুনি বলব? মানুষ খুন করার দায়ে আদালতে কি তার বিচার হবে?

তবে একটা কথা ঠিক যে, মানুষকে বিচার করা উচিত তার কর্মের পেছনের উদ্দেশ্য দিয়ে। কর্ম দিয়ে নয়। উদ্দেশ্য যদি হয় ভয় দেখিয়ে মজা করা, তাহলে কোনো অপরাধ হবে না। কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয় ভয় দেখিয়ে মেরে ফেলা, তাহলে অবশ্যই অপরাধ হবে।ভয় দেখিয়ে সাথীকে মেরে ফেলব–এরকম উদ্দেশ্য আমার ছিল না। এই ক্ষেত্রে আমি অবশ্যই অপরাধী না, তবে তার ছোটবোনের মৃত্যুর জন্যে আমাকে দায়ী করতে পারেন। কোনো প্রমাণ অবশ্যি নেই। আদালত আমাকে দোষী প্রমাণ করে ফাঁসিতে ঝুলাতে পারবে না। তবে আমি দোষী ঠিকই। দ্বিতীয় মৃত্যুটা অবশ্যই অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

আচ্ছা ভাই, আপনি এত অস্থির হয়ে পড়েছেন কেন? ঠাণ্ডা মাথায় আগে গল্পটা শুনুন। একজন সিজিওফ্রেনিক রোগী খোলামেলাভাবে তার গল্প বলছে। আপনার তো উচিত মন দিয়ে শোনা। আপনি একজন লেখক মানুষ। লেখকরা। গল্প খুঁজে বেড়ায়, সেখানে আপনাকে কোনো খোঁজাখুঁজি করতে হয় নি। আমি নিজেই গল্প নিয়ে উপস্থিত হয়েছি। মানুষ খুব সহজ প্রাণী’–এরকম কেন ভাবছেন? কেন ভাবছেন মানুষের মস্তিষ্ক শূন্য আকাশের মতো নির্মল?

‘সাধু সাধু সাধু’ রবে কাঁপে চারিধার–

সবে বলে, পরিষ্কার অতি পরিষ্কার’!

দুর্বোধ্য যা-কিছু ছিল হয়ে গেল জল,

শূন্য আকাশের মতো অত্যন্ত নির্মল!

কার কবিতা বলুন তো? ঠিক ধরেছেন–রবীন্দ্রনাথের ‘হিং টিং ছট’। কবিতাটা কখন লেখা হয়েছে, কোথায় লেখা হয়েছে, বলতে পারবেন?পারবেন না। কারণ আপনি আমার মতো খুঁটিয়ে পড়েন না। বেশিরভাগ মানুষই পড়ে না। বেশিরভাগ মানুষ জলের উপর উড়াউড়ি করে। জল স্পর্শ করে না। আমি করি। হিং টিং ছট’ কবিতাটা লেখা হয়েছে শান্তিনিকেতনে। প্রচণ্ড গরমের সময় জ্যৈষ্ঠ মাসে। বাইরের উত্তাপ তাঁর কবিতাতেও চলে এসেছে—

গ্রীষ্মতাপে উম্মা বাড়ে ভারি উগ্রমূর্তি

গায়ে কালো মোটা মোটা ছাঁটাছোটা কুর্তি।

দেখেছেন আমি কত মন দিয়ে পড়ি? মন দিয়ে যেমন পড়ি–জীবনটাকে সে-রকম মন দিয়েই দেখার চেষ্টা করি। জীবনের ব্যাখ্যায় আমি ভুল করতে পারি কিন্তু জীবনকে দেখায় কোনো ভুল নেই।আপনারা মানুষের মাথার ভেতরের আলোকিত করিডোরগুলি জানেন, কিন্তু অন্ধকার করিডোরগুলি জানেন না। জানতে চানও না। আমি জানতে চাই।গল্পে ফিরে যাই?

পৃথিবীতে তিন রকম বাড়ি আছে। সাধারণ বাড়ি; যেখানে লোকজন কখনো হাসে, কখনো কাঁদে।

কান্না বাড়ি; যেখানে সবসময় কেউ না কেউ কাদছে।

হাসি বাড়ি; যেখানে কেউ না কেউ সবসময় হাসছে।

সাথীর মৃত্যুর পর আমার বাড়িটা হয়ে গেল কান্না বাড়ি। দুই বোন সবসময় কাঁদছে। আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে তাদের কান্না দেখতে লাগলাম। অনেক কিছু লক্ষ করলাম, যা আগে লক্ষ করি নি। যেমন, দীর্ঘস্থায়ী কান্না যখন চলে তখন এক সময় চোখের পানি শুকিয়ে যায়। শুরু হয় অশ্রুশূন্য কান্না। আবার চোখে পানি আসে ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিটের মাথায়।কী বললেন, সাথীর মৃত্যুর ব্যাপারে আমাকে কেউ সন্দেহ করেছে না-কি?

না তো! সন্দেহ কেন করবে? তাছাড়া আমি তো রূপা এবং তার ছোটবোনকে বলেছি যে আমি জানালা দিয়ে সাথীর মুখে টর্চের আলো ফেলেছি। আমি সত্য গোপন করি নি। তবে পূর্ণ সত্য বলি নি। আমি বলেছি Half truth. অর্ধ সত্য মিথ্যার চেয়েও খারাপ। এটা তো নিশ্চয়ই জানেন।টর্চলাইটের ব্যাপারটা আমি কীভাবে বলেছি শুনুন। আমি রূপাকে বলেছিঝড়-বৃষ্টি যখন হচ্ছিল, তখন আমি বারান্দায় বসা। আকাশে বিজলি চমকাচ্ছে, তাই দেখছি। হঠাৎ শুনলাম তোমার আপা বলছে–কে কে? কথা শুনে মনে। হলো ভয় পেয়েছে। ব্যাপার কী দেখার জন্যে আমি টর্চলাইট নিয়ে গেলাম–জানালা দিয়ে টর্চ ফেললাম। দেখি কিছু না। তিনি তার ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে ঘুমুচ্ছেন। আমি চলে এসেছি। তখন যদি জানতাম এমন ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে গেছে, তাহলে…

দেখলেন সত্যি কথাকে সামান্য এদিক-ওদিক করলে কী হয়? সত্যিকে এদিক-ওদিক করলে বিরাট উলট-পালট হয়ে যায়। মিথ্যার বেলায় তা হয় না।যে কথা বলছিলাম, আমার বাড়িটা হয়ে গেল কান্না বাড়ি। কখনো রূপা কাদছে, কখনো ছোটন কাঁদছে এবং কখনো দেখা যাচ্ছে দু’জনই কাঁদছে। কান্না যখন থামছে তখন হচ্ছে শ্বাসকষ্ট। ইনহেলার হাতে নিয়ে দু’বোন পাশাপাশি বসা। দু’জনই বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছে। একজনের হাতে ইনহেলার। ইনহেলারটা গাজার কল্কের মতো হাতবদল হচ্ছে। অসম্ভব বিরক্তিকর ব্যাপার।এই ধারাবাহিক কান্নাকাটির জন্যে আমার একটা ক্ষতিও হয়ে গেল। কাঁসাকন্যা উধাও হয়ে গেল। তার কথাবার্তা শোনা যায় না। তাকে দেখতে পাওয়া তো আরো দূরের ব্যাপার। কাঁসা-কন্যার গলার শব্দ শোনার জন্যে আমি অনেক চেষ্টা চালালাম। দীর্ঘ সময় ছাদে বই নিয়ে বসে রইলাম। সারাক্ষণ অপেক্ষা করলাম এই বুঝি কাচের চুড়ির টুনটন শব্দ শুনব। কাঁসা-কন্যা বলে উঠবে, এখানে একা একা কী করেন?

কাঁসা-কন্যার সঙ্গে কথা বলার তীব্র বাসনা আমার মধ্যে তৈরি হলো। তাকে আমার অনেক কিছু জিজ্ঞেস করার আছে। তার মধ্যে একটি হলো–সাথীর মৃত্যু সে কীভাবে দেখছে? আমি জানি তাকে জিজ্ঞেস করার অর্থ নিজেকেই জিজ্ঞেস করা। সে জবাব যা দেবে তা আমারই জবাব। সেই জবাবও আমার জানা দরকার। আমি কথা বলতে চাই আমার সাব-কনশাস মনের সঙ্গে। সেটা তো এমনিতে সম্ভব না। অবচেতন মনের সঙ্গে কথা বলার জন্যে আমার অবশ্যই কাঁসা-কন্যাকে প্রয়োজন। এ বাড়ির কান্না বন্ধ না হলে সে হয়তো আসবে না।

আমি কান্না বন্ধ করার ব্যবস্থা করলাম। দু’বোনের যে-কোনো একজনের কান্না বন্ধ হলে অন্যজনেরটা বন্ধ হবে। আমি বেছে নিলাম ছোটনকে। ঠিক করলাম তাকে ছোটখাটো একটা শক দেয়া হবে। তার মন’ নামক বিষয়টাকে নাড়া দেয়া হবে। এমন এক ধরনের নাড়া যার জন্যে সে মোটেই প্রস্তুত না। সে পুরোপুরি হকচকিয়ে যাবে। মাথা যাবে এলোমেলো হয়ে। আমি এক সন্ধ্যায় তাকে ছাদে ডেকে পাঠালাম।সে ছাদে উঠে এলো। তার মুখ বিষণ্ণ। চোখ লাল। বোঝাই যাচ্ছে ছাদে উঠে আসার আগে আগে সে চোখ মুছেছে।আমি কোমল গলায় বললাম, কেমন আছ ছোটন?

ভালো আছি।এটা কি ভালো থাকার নমুনা? চোখে এখনো পানি।ছোটন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, দুলাভাই, আমি ভালো নেই। আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে।আমি গম্ভীর গলায় বললাম, ছোটন, শোন, আমি নিজেও ভালো নেই। আমারও মরে যেতে ইচ্ছা করছে। আমি প্রায়ই ছাদে উঠে আসি, যাতে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে যেতে পারি। আমার সাহস কম বলে কাজটা করতে পারছি না।ছোটন খুবই বিস্মিত হয়ে বলল, আপনার কী হয়েছে? আমি বললাম, আমার কী হয়েছে আমি তোমাকে বলছি, তার আগে। তোমাকে একটা প্রশ্ন করি–তুমি কি জানো আমি ভয়ঙ্কর একজন মানুষ?না তো।আমার যে মাথা খারাপ এটা তুমি জানো না? তোমার আপা তোমাকে কিছু বলে নি?

আপনার মাথা খারাপ এটা বলে নি। আপনি মাঝে মাঝে অদ্ভুত অদ্ভুত কাজ করেন এটা বলেছে।তোমাকে বলে নি সে আমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গিয়েছিল? হ্যাঁ বলেছে।কোনো ভালো মানুষকে নিশ্চয়ই কেউ সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যায় না? আপনি সামান্য একসেনট্রিক। আপা অল্পতেই ভয় পায় বলে আপনাকে নিয়ে গেছে। মানুষ হিসেবে আপনি স্বাভাবিক।ছোটন, তুমি ভুল করছ। মানুষ হিসেবে আমি মোটেই স্বাভাবিক না। আমার মাথায় অনেক এলোমেলো ব্যাপার আছে যা তুমি বা তোমার আপা কেউই জানে না।

[ভাই, লক্ষ করছেন যে আমি সত্যি কথা বলছি। এই সত্যের মাঝে ছোট ছোট মিথ্যা ঢুকাব। সত্য হলো স্বর্ণ আর মিথ্যা হলো খাদ। সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মেশানোয় সত্য হবে কঠিন এবং ঝলমলে। আমি যে ছোটনকে নাড়া দিতে শুরু করেছি–এটা বুঝতে পারছেন? ছোটনের মুখ থেকে কিন্তু কান্না সম্পূর্ণ চলে গেছে। এখন তাকে আমি বড় শকটা দেব।]

ছোটন শোন, কারো শরীরে যদি দগদগে ঘা হয় সে কিন্তু প্রাণপণ চেষ্টা করে ঘা লুকিয়ে রাখতে। মনের অসুখ বিষাক্ত ঘায়ের মতো। মানুষ এই বিষাক্ত ঘা। কাউকে দেখিয়ে বেড়ায় না। লুকিয়ে রাখে।আপনি এত নিশ্চিত হলেন কীভাবে যে আপনার সত্যি সত্যি মনের অসুখ আছে? তোমরা দু’বোন এ বাড়িতে উঠে আসার পর থেকে আমার তীব্র ইচ্ছা হচ্ছে তোমার রূপা আপাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে। তখনি বুঝেছি আমার অসুখটা মারাত্মক পর্যায়ের।আপনি এসব কী বলছেন?

[বড় শকটা দিলাম। এরচে’ও বড় শক আছে। সেটা এখনি দেয়া হবে। প্রথম শকটা সামলানোর আগেই দেয়া হবে। কামারের দোকানে কামারকে লোহার কাজ করতে দেখেছেন? কামার কী করে, আগুনে পুড়িয়ে লোহাকে টকটকে লাল করে। তারপর সেই লোহাকে বাঁকায়। আমিও তাই করছি। বড় শকটা দিয়ে লোহা গনগনে করেছি। এখন আরেকটা শক দিয়ে লোহা বাঁকানো হবে। Ready get set go…]

ছোটন শোন, মন দিয়ে শোন, আমি এখন যা বলব তা শুনলে তুমি আমাকে ভয়ঙ্কর খারাপ ভাববে। তোমার কাছে মনে হবে আমার চেয়ে খারাপ মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেয় নি। তুমি যা ইচ্ছা ভাব। আমাকে আমার কথা বলতেই হবে। যে-কোনো কারণেই হোক তুমি এ বাড়িতে উঠে আসার পর আমার মনে হলো আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।দুলাভাই, আপনি এসব কী বলছেন? কথা বলবে না। প্লিজ! আমি আগে কী বলছি মন দিয়ে শোন, তারপর চিক্কার চেঁচামেচি যা ইচ্ছা কর। যখন মনে হলো তোমাকে ছাড়া বাঁচব না–তখনি মাথায় এলো তাহলে গলা টিপে রূপাকে খুন করে ফেলি। ছোটন, এখন কি বুঝতে পারছ যে আমার মাথা খারাপ?

বুঝতে পারছি। আমি আপনার পায়ে পড়ি, আপনি এইসব কিছুই আপাকে জানাবেন না। আপা জানতে পারলে খুব কষ্ট পাবে। কষ্টেই সে মরে যাবে।বলো আমি কী করব? আমি কি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ব? ছোটন, তুমি আমার কাজটা সহজ করে দাও। আমি রেলিং-এর উপর দাঁড়াচ্ছি। তুমি ধাক্কা দিয়ে আমাকে নিচে ফেলে দাও। আমার পক্ষে নিজে নিজে লাফ দেয়া সম্ভব না। পাগলরা সাহসী হয়। কিন্তু আমি সাহসী না। আমি ভীতু।বলতে বলতে আমি টলোমলো ভঙ্গিতে রেলিং-এ উঠে দাঁড়ালাম। ছোটন। আতঙ্কিত গলায় বলল, দুলাভাই, আপনি নামুন। আপনার পায়ে পড়ি, আপনি। নামুন।

তুমি যদি আমার প্রতি সামান্য দয়া কর তাহলে নামব।

আপনি আগে নামুন। প্লিজ প্লিজ!

আমি নামলাম। নেমেই গম্ভীর গলায় আবৃত্তি করলাম—

প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।

ছোটন ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখের এই অশ্রুর ধরন অন্য।

নিজের অভিনয় প্রতিভায় আমি নিজেই চমকৃত হলাম। মনে হলো শেক্সপিয়রের নাটকে একই সঙ্গে দুটি চরিত্রে অভিনয় করছি, Hamlet এবং Ghost.

Hamlet : Alas poor Ghost.

Ghost : Pity me not, but lend thy serious hearing to what I shall unfold.

Hamlet : Speak, I am boond to hear.

Ghost : So art thou to revenge.

একটি তরুণী মেয়ে যদি হঠাৎ কোনো ছেলেকে এসে বলে আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে না পেলে আমি বাঁচব না। তখন ছেলেটির মানসিক অবস্থা কী হয়? সে আনন্দে আত্মহারা হয়। কিছুক্ষণ সে থাকে On the top of the world. তারপর সে চারদিকে এই গল্প ছড়িয়ে দেয়। পরিচিত অপরিচিত সবাই এই গল্প কয়েকবার শুনে ফেলে। যারা আশেপাশে থাকে না তাদেরকে চিঠি লিখে জানানো হয়–তুমি শুনে খুবই আশ্চর্য হবে, লিলি নামের অত্যন্ত রূপবতী এক তরুণী গত বৃহস্পতিবার বিকাল চারটা পঁচিশ মিনিটে হঠাৎ করে…। যুবকটি এই গল্প যতই ছড়াতে থাকে ততই তার আবেগ কমতে থাকে। ঘটনার নভেলটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। সে তখন অপেক্ষা করতে থাকে কখন অন্য কোনো তরুণী তাকে এসে এ জাতীয় কথা বলবে।

মেয়েদের বেলায় এই ব্যাপারটি একেবারেই ঘটে না। কোনো তরুণীকে যদি কোনো যুবক এসে বলে আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। তখন তরুণী আনন্দে আত্মহারা হয় না, বরং খানিকটা ভীত হয়ে পড়ে। সে এই ঘটনা কাউকেই জানায় না। যে কারণে ঘটনাটা তার নিজের মনের ভেতরে বড় হতে থাকে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে পুরো বিষয়টা মাথা থেকে মুছে ফেলতে। যতই সে চেষ্টা করে ততই এই ঘটনা শিকড় গজিয়ে বসতে থাকে। এক সময় তরুণীটির মনে হয়–আহারে বেচারা! সত্যি বোধহয় সে আমাকে ছাড়া বাঁচবে না। এক সময় সে ‘আহারে বেচারা’কে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। দু’জন এক সঙ্গে রিকশা করে যাচ্ছে। ছেলেটা তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। সে বিরক্ত হয়ে বলল, সবসময় তুমি আমার দিকে তাকিয়ে থাক কেন? লোকে কী ভাববে। ছেলেটা গাঢ় স্বরে বলল, ভাবুক যার যা ইচ্ছা। এই বলে সে আগের মতোই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে লাগল।

ভাই, বলুন তো আমার এনালাইসিস ঠিক আছে না? এনালাইসিসটা অবশ্যই অতি সরলীকরণ দোষে দুষ্ট। তারপরেও মনে হয় ঠিক আছে। যদি এনালাইসিস ঠিক হয় তাহলে অবশ্যই ছোটন মেয়েটি আমাকে নিয়ে নানান চিন্তাভাবনা শুরু করবে। চিন্তাভাবনা পানির মতো। যে পানি খাল দিয়ে প্রবাহিত। কোন দিকে প্রবাহিত হবে তা নির্ভর করবে খালটা কোন দিকে কাটা হবে। খাল অবশ্যই ছোটন নিজেই কাটবে, তবে আমাকে সাহায্য করতে হবে। সাহায্য করা মানে। খাল কাটা নিয়ন্ত্রণ করা। আমি আগ্রহ নিয়েই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নামলাম।পরের দিনের কথা। দু’বোন ঝিম ধরে বারান্দায় বসে আছে। আমি তাদের কাছে গিয়ে ছোটনের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম, তোমরা দু’জন সবসময় দেখি মূর্তির মতো বসে থাক। এটা তো ঠিক না। কাজকর্ম শুরু কর। কোনো কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাক। ছোটন, তোমার কলেজ নেই?

ছোটন মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল, আছে। যাব না।সে সম্ভবত আমার চোখের দিকে তাকাতেই ভয় পাচ্ছিল। আমি বললাম, কলেজ আছে কিন্তু যাবে না তা কেন হবে? ডাক্তারি পড়াটা তো এমন না যে ঘরে বসে পড়ে পুষিয়ে নেবে। তুমি অবশ্যই যাবে। চল, আমি তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসি।রূপা বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলেছ। চল, আমরা দুজন মিলে ওকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে আসি।আমি বললাম, তোমরা দু’বোন সবসময় এক সঙ্গে ট্যাগ হয়ে থাকবে এটা কেমন কথা? তোমার যাবার কোনো দরকার নেই। তুমি থাক। আমি নামিয়ে। দিয়ে আসছি।রূপা বলল, ঠিক আছে এটাই ভালো। তুমিই নামিয়ে দিয়ে আস।ছোটন ভীত গলায় বলল, না আপা, না। আমি যাব না।রূপা বলল, তুই অবশ্যই যাবি।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *