আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) – খিলাফত

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) - খিলাফত
আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ০৭. খিলাফত

খিলাফত

একটা তরুণ অমার্জিত জাতি প্রথমে আপন যৌব-শক্তির প্রচণ্ড অভিঘাতে কোন প্রাচীন সভ্যতাকে পরাজিত করেছে–তারপর সেই বিজিত সভ্যতার সাংস্কৃতিক স্থানন্দের মায়ার কাছে নিজেরা পরাজয় মেনেছে–এমন ঘটনা ইতিহাসের আলোচনার এক পরম চিত্তাকর্ষক বিষয়বস্তু। এক্ষণে আরবদের জীবন-কাহিনীতে এমন ঘটনারই আলোচনা এসে পড়ছে।

আরবরা যখন উর্বর হেলাল, পারস্য ও সিরিয়া অধিকার করল, তখন তার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দখলে এল পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার লীলাভূমিসমূহ। চিত্র শিল্প, স্থাপত্য শিল্প, দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজ্য-শাসন এসব বিষয়ে আদিম আরবেদের শিক্ষা দিবার ছিল না কিছুই; শিক্ষা করিবার ছিল সবই-আর কি রাক্ষুসে ক্ষুধাই না ছিল এদের পেটে লুকিয়ে। এদের কৌতূহল ছিল সুতীক্ষ, এদের অন্তর্নিহিত সম্ভাব্যতা ছিল বিপুল। এই বিস্ময়কর-সম্পদ তারা নিয়ে তাদের পরাজিত জাতিদের সহযোগে এক্ষণে তাদের প্রাচীন সাংস্কৃতিক-উত্তরাধিকারকে আত্মস্থ করে তা ঢেলে নবরূপে উপস্থাপিত করতে শুরু করল। টিসিফন, দামেস্ক, বায়তুল-মোকাদ্দেস এবং আলেকজান্দ্রিয়াতে তারা স্থাপত্য-শিল্পী, শ্রম-শিল্পী, জহুরী এবং শিল্প-দ্রব্য উৎপাদকদের কাজ দেখে মুগ্ধ হল এবং সেসবের অনুকরণ করতে লাগল। প্রাচীন সংস্কৃতির এইসব কেন্দ্রে তারা এল–তারা দেখল এবং তারা পরাভূত হল।

আমরা বর্তমানে যাকে আরব-সভ্যতা বলি, তা মৌলিক-গঠন বা জাতিগত বৈশিষ্ট্য–এর কোন দিক দিয়ে আরবীয় ছিল না। খাঁটি আরবীয় অবদান ছিল ভাষাগত এবং কতকাংশ ধর্মগত। খিলাফত-জামানার শুরু হতে শেষ পর্যন্ত সিরিয়া, পারস্য ও মিসরের বাসিন্দা ও অন্যান্যরা (যেমন নব দীক্ষিতেরা অথবা খৃস্টান ও ইহুদীরা) সভ্যতার পতাকা বহনকারীদের মধ্যে সর্বাগ্রগামী ছিল–যেমন, বিজিত গ্রীকরা ছিল বিজেতা রোমকদের অধীনে। আরব-ইসলামী সভ্যতার মূলে ছিল গ্রীক প্রভাবপুষ্ট আরামেইক ও ইরানী সভ্যতা। এ-সভ্যতা বিকাশ লাভ করেছিল খলীফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বিস্তার লাভ করেছিল আরবী ভাষার মাধ্যমে। অন্য কথায়, “উর্বর হেলাল-অঞ্চল’ যে সেমিটিক সভ্যতা আসিরিয়া-ব্যাবিলোনীয়, ফিনিশীয়, আরামীয় ও ইহুদীদের দ্বারা উদ্ভূত ও বিকশিত হয়েছিল, আরব-সভ্যতা তারই অনিবার্য পরিণতি। এ-সভ্যতায় পশ্চিম এশিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় সভ্যতা তার চরম উৎকর্ষ লাভ করে।

মুসলিম-আরব কি শ্রেণীর মানুষ পয়দা করেছিল, আমরা তার দুটি স্পষ্ট ছবি পাই প্রথম দুই খলীফা–আবুবকর (রাঃ) (৬৩২-৬৩৪) এবং ওমরের (রাঃ) (৬৩৪৬৪৪) মধ্যে। আবুবকরই প্রকৃতপক্ষে আরব জয় করেন ও আরবে শান্তি স্থাপন করেন। অথচ তিনি প্রাচীনকালের কওমী সর্দারের মত অনাড়ম্বর সরল জীবনযাপন করতেন। তিনি তাঁর পত্নী বিবি হাবীবার সঙ্গে আল-সুনহ নামক স্থানে একটি ছোট বাড়ীতে বাস করতেন এবং এই স্থান হতে তার শাসন কালের প্রথম ছয়মাস তিনি রোজ রাজধানী মদীনায় আসতেন। এসময় তিনি রাজকোষ হতে কোন বেতন বা ভাতা নিতেন না। (আর আসলে এ সময়ে রাষ্ট্রের তেমন কোন আয়ও ছিল না)। মহানবীর মসজিদের আঙ্গিনায় বসে তিনি যাবতীয় সরকারী কার্য সমাপন করতেন।

তাঁর পরবর্তী খলীফা ওমর (রাঃ) ছিলেন এক প্রতিভাবান অসাধারণ কর্মী পুরুষ। তিনি লম্বা জওয়ান ছিলেন এবং তাঁর দেহে প্রচুর শক্তি ছিল। তিনিও জাকজমক-শূন্য সরল জীবনযাপন করতেন এবং খলীফা হওয়ার পর অন্ততঃ কিছুকাল পর্যন্ত তেজারতী দ্বারা নিজ পরিবার পালন করেন। তিনি জীবন-ভর বেদুঈন শেখের মত একান্ত আড়ম্বরহীনভাবে চলেছেন। মুসলিম ঐতিহাসিকদের বিবেচনায় প্রাথমিক-যুগে হযরত মুহম্মদের (সঃ) পরই ওমরের স্থান। মুসলমান লেখকগণ তার ধর্মপ্রাণতা, তার সুবিচার এবং তার অনাড়ম্বর জীবনযাপন প্রণালীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাঁরা মনে করেন, খলীফার যেসব গুণ থাকা দরকার, ওমরের মধ্যে তার সব ছিল। ঐতিহাসিকেরা আরো বলেন, তাঁর মাত্র একটি জামা ও একটি আলখিল্লা ছিল এবং তাতে তালির অভাব ছিল না। তিনি খেজুরপাতার বিছানায় শয়ন করতেন এবং তাঁর একমাত্র ধ্যান ছিল–ধর্মের পবিত্রতা সংরক্ষণ, হক-বিচার কায়েম করা এবং ইসলাম ও আরব-জাতির উন্নতিবিধান। ওমরের কঠোর চরিত্র সম্বন্ধীয় উপাখ্যানে আরবী-সাহিত্য ভরপুর। তিনি তাঁর নিজ পুত্রকে সুরাপান ও ব্যভিচারের জন্য দোররা মেরে মেরেই ফেলেছিলেন। একদা এক বেদুঈন কোন জালিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে তাঁর কাছে আসে। তিনি রাগের মাথায় বেদুঈনকে কয়েকটি দোরা মারেন। এরপরই তাঁর অনুতাপ হয়; তিনি বেদুঈনকে ডেকে তার পিঠে সেই কয়েকটি দোরর মারতে বলেন। বেদুঈন অস্বীকার করে। তখন তিনি আপনা আপনি এই বলতে বলতে চলে যান :

‘হে আল-খাত্তাবের পুত্র! তুমি নগণ্য ছিলে, আল্লাহ তোমাকে ইজ্জত দিয়েছেন; তুমি পথ-ভ্রান্ত ছিলে, আল্লাহ্ তোমাকে পথ দেখিয়েছেন; তুমি দুর্বল ছিলে, আল্লাহ, তোমাকে সবল করেছেন। এরপর আল্লাহ্ তোমাকে তোমার জাতির ঘাড়ের উপর শাসক নিযুক্ত করেছেন তাদেরই একজন তোমার কাছে এল সাহায্য চাইতে–আর তুমি তাকে করলে বেত্রাঘাত। আল্লাহর কাছে যখন হাজির হবে, তখন তোমার এ অন্যায়ের কি কৈফিয়ত দিবে।

এ-কথা লক্ষণীয় যে, ওমর নিহত হন পারস্য-দেশীয় এক খৃস্টান গোলামের ছুরিকাঘাতে।

ওমরের পরবর্তী খলীফা ওসমান (রাঃ) বারো বছর শাসন করেন এবং এক বিদ্রোহ-কলে মুসলমানদের হাতে নিহত হন। আলী (রাঃ) (৬৫৬৬৬১) পরবর্তী খলীফা। প্রায় সমস্ত মুসলিম-জগতই তাঁকে স্বীকার করে নেয়; তথাপি একটি বিরুদ্ধ দল শীঘ্র জেগে ওঠে। ফলে রু হয় সেই বংশগত লড়াই, যা পরবর্তীকালে মাঝেমাঝেই মুসলিম-সাম্রাজ্যকে তোলপাড় করেছে এবং কখনো কখনো তার ভিত্তিমূলকে পর্যন্ত কাঁপিয়ে তুলেছে। পাঁচ বছর পর এক বিষাক্ত চুরির আঘাতে হযরত আলী (রাঃ) নিহত হন।

এখানে একটি সাধারণ ভুল সম্বন্ধে আমাদের সাবধান হতে হবে : অনেকেই মনে করেন খিলাফত একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। রোম সাম্রাজ্যের এবং ক্যাথলিক চার্চের অধিনায়কের সঙ্গে খলীফাকে এক মনে করা ভুল। খলীফা আমীরুল মুমেনীন : মুমিনদের আদেশদাতা। এ হিসেবে তাঁর পদের সামরিক গুরুত্ব যথেষ্ট। ইমাম হিসেবে তিনি জামাতের ইমামতি ও জুমার নামাজে খোত্বা দিতে পারতেন এবং অনেক সময় বাস্তবিকই খোতবা দিতেন। কিন্তু এ কাজ নিতান্ত নগণ্য মুসলমানকে দিয়েও চলতে পারে। মহানবীর খলীফা হওয়া মানে ছিল, মুসলিম রাষ্ট্রের নায়ক পদে ব্রত হওয়া। গয়গম্বর হিসেবে কারো পক্ষে মুহম্মদের (সঃ) স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কথাই ওঠে না। খলীফার সঙ্গে ধর্মের শুধু এইটুকু সম্বন্ধ ছিল যে, তিনি ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ও অভিভাবক ছিলেন। যেকোন ইউরোপীয় সম্রাটের মত খলীফা ধর্মকে বিধর্মীয় আক্রমণ হতে রক্ষা করতেন, ধৰ্ম-বিরোধী মত দমন করতেন, কাফিরদের সঙ্গে লড়াই করতেন এবং দারুল ইসলামের সীমা বর্ধন করতেন এবং এসব কর্তব্য সম্পাদন করতে তিনি তার ঐহিক বাহুবল প্রয়োগ করতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধের আগে ইউরাপে এমন কোন ধারণা বদ্ধমূল হয় নাই যে, মুসলিম-খলীফা খৃস্টান-পোপের মত সমগ্র জগতের মুসলমানদের উপর এক ধর্মীয় আধিপত্যের অধিকারী। সুচতুর দ্বিতীয় আবদুল হামিদ খৃস্টান-শক্তিপুঞ্জের চোখে তার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ঐ ধারণার সাহায্যে গ্রহণ করেছিলেন। কারণ, এই সময় খৃস্টান-শক্তিবর্গ এশিয়া ও আফ্রিকার বেশির ভাগ মুসলিম-রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিগত শতাব্দীর শেষ ভাগে প্যান-ইসলামীজম নামে একটি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। এ-আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের মাধ্যমে খৃস্টান-শক্তিকে বাধা দেওয়া। তুরস্ককে এই আন্দোলনের কেন্দ্র করে খিলাফতের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

আলীর হাত হতে যিনি খিলাফত কেড়ে নেন, তিনি ছিলেন আলীরই এক দূরসম্পৰ্কীয় চাচাতো ভাই : ধূর্ত মুয়াবীয়া সিরিয়ার শাসনকর্তা। তার আমল হতে ইসলামের সার্বভৌম ক্ষমতায় এক নব-নীতির প্রবর্তন হয়? খিলাফত বংশগত হয়ে পড়ে। নির্বাচন-প্রথা বিলুপ্ত হয়। আমাদের আলোচ্য যুগে তিনটি বংশের কথা আসবে। উমাইয়া বংশ : ৬৬১ সালে দামেস্কে মুয়াবীয়া–এর শাসন-আমলের পত্তন করেন; বাগদাদের আব্বাসীয় বংশ (৭৫০-১২৫৮) এবং কায়রোর ফাতেমীয় বংশ (৯০৯–১১৭১)। উমাইয়া খলীফাদের এক সুবিখ্যাত শাখা স্পেনে কর্দোভা নগরকে রাজধানী করে ৯২৯ হতে ১০৩১ পর্যন্ত স্পেন শাসন করেন। এই খলীফাদের মধ্যে একমাত্র ফাতেমীয় খলীফারা আলীর বংশধর বলে দাবী করতেন। বংশগত উত্তরাধিকারের নীতি রাজনৈতিক ব্যাপারে খানিকটা স্থায়িত্ব আনয়ন করেছিল। বাস্তবিক পক্ষে কিন্তু রক্তাক্ত আত্মকলহ ইসলামকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে নাই, এমন কোন দীর্ঘযুগ ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন-কোন সময় খলীফা নামে সাম্রাজ্যের অধিপতি হলেও কার্যতঃ নিজ রাজধানীতেও তাঁর ষোলআনা কর্তৃত্ব থাকত না।

মুয়াবীয়ার অভ্যুদয় উপলক্ষে এই সময় ইসলামের রাজনীতিতে আর এক নতুন সুর বেজে ওঠে। পরবর্তী যুগে মুসলিম-জগতে বহুবার এইসব ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

ইরাকের অধিবাসীরা আলীর পুত্র ইমাম হাসানকে খলীফা বলে ঘোষণা করল। তারা বলু-হাসান আলীর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং মহানবীর কন্যা ফাতিমার গর্ভজাত। সুতরাং, যুক্তি অনুসারে তিনিই খিলাফতের অধিকারী।

মুয়াবীয়া অসাধারণ শাসন-কুশলী ব্যক্তি ছিলেন। বিশৃঙ্খলতার ভিতর হতে তিনি একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে তোলেন। মুসলিম যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাসে তারই ছিল প্রথম সুশিক্ষিত এবং সুশৃঙ্খল সৈন্যবাহিনী। মুসলিম ঐতিহাসিকরা আরো বলেন যে, ইসলামের তিনিই প্রথম রেজেন্ত্রী দত্তর স্থাপন করেন এবং তিনিই প্রথম পোস্টঅফিস স্থাপন করেন। তাঁর এই প্রতিষ্ঠান অনতিকাল মধ্যে বিকাশ লাভ করে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশকে সুসংবদ্ধ করে।

মুয়াবীয়ার মধ্যে রাজনৈতিক জ্ঞান যে পরিমাণে বিকাশ লাভ করেছিল, তেমন বোধহয় কোন খলীফার মধ্যে বিকাশ লাভ করে নাই। আরব জীবনী লেখকদের বিবেচনায় তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ ছিল ‘হিম’। হিমকে বুদ্ধির কলা কৌশল বলে অনুবাদ করা যেতে পারে। হিল্ম সেই অসাধারণ শক্তি যার বলে মানুষ কেবল তখনি বল প্রয়োগ করে যখন বল প্রয়োগ ছাড়া আর কোন পথই খোলা থাকে না; অন্যান্য সর্বপ্রকার অবস্থায় শান্তিপূর্ণ পথ অবলম্বন করে। মুয়াবীয়া পরম বিচক্ষণতার সঙ্গে মোলায়েম ব্যবহার দ্বারা শত্রুকে আপন করতে চেষ্টা করতেন। তিনি তাঁর ক্রোধ দমন করে চলতেন কোন অবস্থাতেই তিনি আত্মসংযম হারাতেন না; ফলে যে কোন পরিস্থিতিতে তার কর্তৃত্ব বহাল থাকত। তিনি বলেছেনঃ ‘যেখানে আমার চাবুক যথেষ্ট, সেখানে আমি তলোয়ার ধরি না; যেখানে আমার জিভ যথেষ্ট, সেখানে আমি চাবুক হাতে নেই না। আর একটি চুলও যদি আমাকে আমার দেশের ভাইয়ের সঙ্গে বেঁধে রাখে, তবে আমি তা ছিড়ি না। যখন তারা টানে আমি ঢিলা দেই, আর যদি তারা ঢিলা দেয়, আমি টানি।’ কথিত আছে, তিনি ইমাম হাসানকে তাঁর খিলাফত দাবী পরিত্যাগ উপলক্ষে এই মর্মে পত্র লেখেন : ‘আমি স্বীকার করি, রক্তের সম্বন্ধ হিসেবে এ মহান পদের জন্য আপনার দাবীই অগ্রগণ্য। এ পদের গুরুদায়িত্ব পালনে আপনি শ্রেষ্ঠতম ক্ষমতার অধিকারী–এ বিষয়ে নিশ্চিত হলে আমি অসঙ্কোচে আপনার হাতে বয়েত হতাম। এখন তা হলে ঠিক করুন, আপনি কি করবেন।’ এই পত্রের সঙ্গে মুয়াবীয়ার দস্তখত-সহ একখণ্ড সাদা কাগজ ছিল–ইমাম হাসানের পূরণের জন্য। প্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম হাসান এ-পত্র পেয়ে স্বভাবতঃই মুগ্ধ হলেন।

পরবর্তী খলীফাদের মত মুয়াবীয়া বাইজেন্টাইনদের সঙ্গে বাহুবল পরীক্ষা করেন এবং দুই দুইবার তাঁর সবল বাহু কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত প্রসারিত হয়। যখন তিনি সিরিয়ার গভর্নর, তখন মুসলিম নৌ-বাহিনী এশিয়া মাইনরের নিকটস্থ লিসীয়ার উপকূলের অদূরে বাইজেন্টাইন নৌ-বাহিনীর সঙ্গে এক রক্তাক্ত সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে জয়লাভ করে। ইসলামের ইতিহাসে এই-ই প্রথম উল্লেখযোগ্য নৌ-বিজয়। কনস্টান্টিনোপল তুর্কদের আগ পর্যন্ত দুর্ভেদ্যই রয়ে যায়। এশিয়া মাইনরেও আরবরা কখনো স্থায়ী প্রভুত্ব বিস্তার করতে পারে নাই, কিংবা হেলেস্পন্ট পার হতে পারে নাই। তাদের প্রদান শক্তি নিয়োজিত হয়, পূর্ব ও পশ্চিম দিকে। মুয়াবীয়ার আমলে আবার তারা অভিযান পথে বের হয়।

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ০৮. স্পেন বিজয়

স্পেন বিজয়

সিরিয়া, ইরাক, পারস্য ও মিসর অধিকার ইসলামের বিজয়-ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় সূচনা করে। এরপর কিছুকাল আত্মকলহে কেটে যায়। তারপর শুরু হয় দ্বিতীয় অধ্যায়।

দুর্নিবার ঘূর্ণিবার্তার মত এক প্রচণ্ড অভিযান মহানবীর পতাকাকে অক্সাস নদীর ওপার বহন করে নিয়ে যায়। এই অক্সাসই ছিল পারস্যভাষী ও তুর্কীভাষী দেশসমূহের মধ্যে সনাতন সীমারেখা। ক্রমে ইসলামের বিজয়-কেতন বহির্মঙ্গোলীয়া পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে। বোখারা, তাশক, সমরকন্দ,–সমস্ত মুসলিম বাহিনীর সম্মুখে আত্মসমর্পণ করে। মধ্য-এশিয়ায় মুসলিম আধিপত্য এমন দৃঢ়ভাবে সংস্থাপিত হয় যে, চীন জাতিও হস্তক্ষেপ করতে বিরত হয়। আর একটি পূর্ব-গামী বাহিনী দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয় এবং যাকে এখন আমরা বলি বেলুচিস্তান, তারই ভিতর দিয়ে গিয়ে ৭১২ সালে সিন্ধু দেশ অধিকার করে। দক্ষিণ পাঞ্জাবস্থিত মুলতানে তখন এক সুবিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির ছিল। মুসলিম বিজয় ক্রমে এই মুলতান পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে এবং ভারতের সীমান্ত প্রদেশসমূহে ইসলাম চিরতরে শিকড় গেড়ে বসে। (এইসব বিজয় মাত্র কয়েক বছর আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাস্তব রূপ গ্রহণ করেছে। এখানে ইসলাম এক নব সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসে–বৌদ্ধ সংস্কৃতি।

উত্তর কেন্দ্রীয় সীমান্তে আরব বিজয়-তরঙ্গ কনস্টান্টিনোপলের দুর্গ-মূলে প্রহত হয়ে ফিরে আসে। তবে এই যুগে আরবরা যে কনস্টান্টিনোপল বছর-কাল পর্যন্ত (৭১৬’র আগস্ট হতে ৭১৭’র সেপ্টেম্বর) অবরোধ করে রাখে, তা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। গোল্ডেন হর্নের মুখে একটি বিরাট শিকল টানিয়ে আরব নৌ-বাহিনীর প্রবেশপথ রুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।

কিন্তু পশ্চিমদিকের অভিযানেই মুসলমানেরা সবচেয়ে বিস্ময়কর বিজয় লাভ করে। তারা আগেই উত্তর আফ্রিকায় প্রাচীন কার্থেজের সীমা পর্যন্ত তাদের অধিকার বিস্তার করেছিল। তখন উত্তর আফ্রিকার একাংশের বাসিন্দা ছিল বার্বার জাতি। এরা শ্বেতাঙ্গ জাতিদের এক হেমিটিক শাখা ছিল। ইতিহাস-পূর্ব যুগে। হয়তো এরা সিমাইটদের সঙ্গে একই মূল জাতি হতে উদ্ভূত হয়েছিল। উপকূল ভাগের বেশীর ভাগ বার্বাররাই খৃস্টানধর্ম গ্রহণ করেছিল। টার্টুলিয়ান, সেন্টসাইপ্রিয়ান, সর্বোপরি সেন্ট অগস্টাইন–এরা প্রাথমিক খৃস্টান পুরোহিত সমাজে দিপাল ছিলেন এবং এঁদের প্রত্যেকেই এই বার্বারদের মধ্য হতে উদ্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু উপকূল হতে ভিতরের অংশের বাসিন্দারা রোমক বা বাইজেন্টাইন সভ্যতা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হয় নাই। আসলে উত্তর আফ্রিকার এ যাযাবর এবং অর্ধ-যাযাবর জাতি-সমূহের মনোবৃত্তির কাছে রোমক ও বাইজেন্টাইন সভ্যতা কখনো আপন বলে অনুভূত হয় নাই। ইসলামের একজন মহাশক্তিশালী সেনাপতি মুসা-ইবনে নুসাইয়ার এই বার্বারদের মধ্য দিয়ে তার বিজয়-রথ চালিয়ে যান।

বার্বাররা তখন সভ্যতার যে স্তরে অবস্থিত, সে স্তরের লোকের কাছে ইসলামের এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল। কাজেই সেমিটিক আরবরা সহজেই তাদের হেমিটিক জ্ঞাতি ভাইদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ পেতে বসল। ইসলাম আবার এক মহাআশ্চর্যজনক সাফল্য লাভ করল? অর্ধসভ্য যাযাবর জাতিদের ভাষায় ছিল তারা আরবী, আর ধর্মে ছিল তারা ইসলাম। বিজেতাদের রক্ত নতুন রক্তের সহযোগে উজ্জীবিত হয়ে উঠল। আরবী ভাষা নিজ বিজয়ের জন্য পেল এক বিরাট ক্ষেত্র আর উদীয়মান ইসলাম তার বিশ্ব-প্রভুত্ব স্থাপনের আরোহণ পথে পেল, পা রাখার নতুন স্থান।

আরবরা যে দ্রুতগতিতে এবং যেমন সম্পূর্ণভাবে স্পেন অধিকার করে, তা মধ্যযুগীয় সামরিক ইতিহাসে এক অতুলনীয় স্থান অধিকার করে আছে। ৭১০ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক অভিযান শুরু হয়। ৪ শত পদাতিক ও ১ শত অশ্বারোহী এই অভিযানে অংশগ্রহণ করে। এরা জাতিতে সবাই বার্বার এবং মুসার সৈন্যদল-ভুক্ত ছিল। মুসা উমাইয়া খলীফাদের অধীনে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর ছিলেন। আক্রমণকারী সৈন্যদল তারিফা নামক ক্ষুদ্র উপদ্বীপে অবতরণ করে। তারিফাঁকে ইউরোপের সর্বদক্ষিণ ডগা বলা যেতে পারে।

মুসা ৬৯৯ খৃস্টাব্দ হতে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর ছিলেন। কার্থেজের পশ্চিম অঞ্চলের সমস্ত ভূ-ভাগ হতে তিনি বাইজেন্টাইনদের চিরতরে বিতাড়িত করেন। এবং ক্রমে তার বিজয় অভিযান আটলান্টিকের উপকূলভাগে গিয়ে পৌঁছে। এইরূপে তিনি ইউরোপে মুসলিম অভিযান-পথ খোলাসা করেন। মুসার প্রাথমিক স্পেনীয় অভিযান সাফল্যমণ্ডিত হয়। স্পেনের তত্ত্বালীন ভিসিয়োগথ রাজাদের মধ্যে বংশগত দ্বন্দ্ব জেগে ওঠে। এ উভয় কারণে উৎসাহিত হয়ে এবং রাজ্য জয়ের চেয়ে লুণ্ঠন আশায় অধিকতর প্রলুব্ধ বোধ করে ৭১১ খৃস্টাব্দে মুসা তারিককে ৭ হাজার সৈন্য-সহ স্পেন বিজয়ে প্রেরণ করেন। তারিক জাতিতে বাবার এবং মুসার আজাদী দেওয়া লোক ছিলেন তার সৈন্যদের অধিকাংশই বার্বার জাতীয় ছিল। তারিক এক পাহাড়ের উপর অবতরণ করেন। এই পাহাড় জিব্রাইটার (জবল-আল-তারিক-অর্থাৎ তারিক পাহাড়) নামে তারিককে অমর করে রেখেছে। এখানে প্রণালীটি পাশে মাত্র তের মাইল। কথিত আছে, সিউটার গভর্নর কাউন্ট জুলীয়ান তারিকের নৌ-বহরের রসদ-পত্র জোগান।

পথে আরো কিছু সৈন তারিকের সঙ্গে যোগ দেয়। এইরূপে বর্ধিত বার হাজার সৈন্য নিয়ে ৭১১ খৃস্টাব্দের ১৯ জুলাই তারিক সালাদো নদীর মুখে রাজা রডারিকের সম্মুখীন হন। রডারিক উইটিজার পুত্রকে তাড়িয়ে দিয়ে নিজে সিংহাসনে বসেন। রডারিকের সৈন্য সংখ্যা ২৫ হাজার হওয়া সত্ত্বেও তারা ভীষণভাবে পরাজিত হয়। রডারিকের ভাগ্যে অতঃপর কি ঘটে, তা আজো প্রহেলিকা হয়ে আছে। স্পেনীয় ও আরব ঐতিহাসিকেরা কেবল এইটুকু বলেই তুষ্ট যে, রডারিক উধাও হয়ে গেলেন।

এই চূড়ান্ত বিজয়ের পর মুসলমানেরা স্পেনময় কেবল যেন বেড়িয়ে বেড়িয়ে এগিয়ে গেল। কোথাও উল্লেখযোগ্য লড়াই আর কিছুই হল না। কেবল যেসব শহরে ভিসিয়োগহ্ নাইটদের প্রভুত্ব ছিল, সেখানে তারা যথেষ্ট বাধা দিল। তারিক সৈন্যদলের প্রধান অংশ-সহ ইসিজার পথে রাজধানী টলেডোর দিকে অগ্রসর হলেন; বাকী সৈন্যগণকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে বিভিন্ন শহরের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। দক্ষিণে সেভিল শহর দুর্গ দ্বারা সুরক্ষিত ছিল; সে শহর আরব সৈন্যরা এড়িয়ে গেল। এক দল আর্কিদোনা অবরোধ করল; আর্কিদোনা বিনা লড়াইয়ে আত্মসমর্পণ করল। আর একদল আল-ভীরা দখল করল। তৃতীয় দলে অশ্বারোহী ছিল। এ দল মুসলমানদের ভবিষ্যৎ রাজধানী কর্ডোভা অবরোধ করে বসল। দুই মাস পর্যন্ত অবরোধ চল্ল। কথিত আছে, এরপর এক বিশ্বাসঘাতক রাখাল দুর্গের ভগ্ন প্রাচীর দেখিয়ে দেয় এবং তার ফলে কর্ডোভার পতন হয়। মালাগা কোন বাধাই দিল না। ইসিজায় হল এ অভিযানের সবচেয়ে ভীষণ লড়াই এবং পরিণামে আরবরাই জয়লাভ করল। কয়েকজন ইহুদীর বিশ্বাসঘাতকতায় রাজধানী টলেডোর পতন হল। এইরূপে তারিক ৭১১ খৃস্টাব্দের বসন্তকালে একটা অতর্কিত আক্রমণের নেতা হিসেবে শুরু করে গ্রীষ্মকালের শেষ ভাগ পর্যন্ত অর্ধ স্পেনের অধীশ্বর হয়ে বসলেন। একটা সমগ্র রাজ্যকে তিনি ধ্বংস করে ফেলেন।

মুসা তার ক্ষুদ্র সহকারীর এই অপ্রত্যাশিত ও বিস্ময়কর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে ১০ হাজার সৈন্যসহ ৭১২ সালের জুন মাসে স্পেন অভিমুখে ধাবিত হলেন। এ সৈন্যদের সবাই ছিল আরব ও সিরিয়া হতে সংগৃহীত। তিনি সেই সব শহর ও দুর্গ বিজয়ের জন্য বেছে নিলেন যেগুলি তারিক এড়িয়ে গিয়েছিলেন । মেডিনা, সিডোনীয়া ও কারমোনা। সেভিলে ছিল স্পেনের সবচেয়ে বড় শহর এর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং এককালের রোমক রাজধানী। মুসা সেভিল অবরোধ করলেন। ৭১৩ সালের জুন পর্যন্ত অবরোধ চল্প। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন সংগ্রাম করতে হল মেরিডা জয় করতে। এক বছর অবরোধের পর ৭১৩ সালের ১ জুন মেরিডা অধিকৃত হয়।

টলেডো শহরে বা তার নিকটবর্তী কোন স্থানে মুসা ও তারিকের মধ্যে সাক্ষাৎ ঘটে। কথিত হয়, তারিকের বিজয় অভিযানের প্রথম দিকে মুসা তাকে আর অগ্রসর হতে নিষেধ করেন; কিন্তু তারিক সে আদেশ মান্য করেন নাই। সেই অপরাধে মুসা এই সাক্ষাৎকালে তারিককে বেত্রাঘাত করে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন। কিন্তু বিজয় অভিযান রুদ্ধ হল না। অল্পকাল মধ্যেই উত্তরে সারাগোসা পর্যন্ত ইসলামী ঝাণ্ডা উড্ডীন হল এবং মুসলমান সৈন্যরা আরাগন, লিয়ন, অরিয়াস এবং গ্যালিসিয়ার উচ্চ ভূমিতে প্রবেশ করল। সেই বছরেরই শরৎকালে খলীফা ওলীদ মুসাকে সুদূর দামেস্কে ডেকে পাঠালেন–সেই একই অপরাধে, যে অপরাধে মুসা নিজ অধীনস্থ তারিককে শাস্তি দিয়েছিলেন ও তার মনীবের বিনা আদেশে স্বাধীনভাবে কাজ করার অপরাধে।

মুসা তার দ্বিতীয় পুত্র আবদুল আজীজকে নব-বিজিত রাজ্যের শাসন-ভার দিয়ে ধীরে ধীরে স্থলপথে দামেস্কের পানে চল্লেন। তাঁর সঙ্গে চল্প তার অফিসার মণ্ডলী, চারশত ভিসিগথ বংশীয় শাহ্জাদা–তাদের মাথায় রাজমুকুট, তাদের কোমরে সোনার কোমরবন্দ-অগণ্য গোলাম ও যুদ্ধবন্দী এবং অফুরন্ত লুষ্ঠিত ধন-রত্ন। আরব ঐতিহাসিকেরা উত্তর আফ্রিকার পশ্চিম হতে পূর্ব পর্যন্ত এই বিজয়-শোভাযাত্রার কথা অতি আনন্দের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের বর্ণনা পাঠককে প্রাচীনকালে বিজয়ী রোমক বীরদের বিজয় কুচকাওয়াজের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই বিরাট শোভাযাত্রা দামেস্কে পৌঁছার আগেই তার খবর দামেস্কে গিয়ে পৌঁছল। খলীফা ওলীদ তখন রোগশয্যায় শায়িত। তাঁর ভাই সোলায়মান তার উত্তরাধিকারী। মুসা টাইবেরিয়াসে উপস্থিত হয়ে সোলায়মানের আদেশ পেলেন : রাজধানীতে দেরীতে প্রবেশের প্রতীক্ষায় ঐখানে অপেক্ষা করুন। ভাবী খলীফা ভেবেছিলেন, ওলীদ শীঘ্রই ওপরে চলে যাবেন; তখন তার সিংহাসন-আরোহণের উৎসবের মধ্যে শোভাযাত্রা রাজধানীতে প্রবেশ করবে।

রত্ন-ঝলমল পোশাক পরিহিত ভিসিয়োগ-বংশীয় শাহ্জাদাদের সঙ্গে নিয়ে মুসা ৭১৫ খৃস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে দামেস্কে প্রবেশ করলেন। মনে হল, ওলীদ খুশীর সঙ্গেই তার বিজয়ী সেনাপতিকে গ্রহণ করলেন। মহান উমাইয়া মসজিদে যে বিপুল সম্ভ্রম ও ধূমধামের সঙ্গে অভ্যর্থনার উৎসব সম্পন্ন হল, তা বিজয়ী ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল গৌরব-স্তম্ভ। এই প্রথম ইউরোপীয় শাহজাদা ও হাজার হাজার ইউরোপীয় বন্দীকে আমীরুল মুমিনিনের সম্মুখে বশ্যতা স্বীকারের শপথ গ্রহণ করতে দেখা গেল।

মুসা খলীফাকে অন্যান্য মূল্যবান জিনিসের মধ্যে একটি অপূর্ব কারুকার্য খচিত টেবিল নজর দিলেন। প্রাচীন কাহিনী বলে, বাদশাহ্ সোলায়মান জ্বীন মিস্ত্রী দ্বারা এই টেবিল নির্মাণ করিয়েছিলেন। কাহিনীতে আরো পাওয়া যায় যে, রোমকরা বায়তুল মোকাদ্দেস হতে এই টেবিল তাদের নিজ রাজধানীতে চালান দেয় এবং পরবর্তীকালে সেখানে হতে গথরা এ টেবিল নিয়ে যায়। প্রত্যেক গহ্ রাজা তার পূর্ববর্তী রাজার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বহু মূল্য রত্নরাজিতে এ টেবিল সুশোভিত করতেন। রাজধানীর প্রধান গীর্জায় এই অমূল্য টেবিল রক্ষিত ছিল, বোধহয় কোন পুরোহিতের নিয়ে পলায়নের সময় তারিক তার নিকট হতে উদ্ধার করেন। টলেডোতে যখন মুসার সঙ্গে তারিকের সাক্ষাৎ হয়, তখন মুসা তারিককে বেত মারার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলটিও কেড়ে নেন। কিন্তু তারিক নাকি চুপে চুপে একটি পায়া সরিয়ে ফলেন এবং এখন খলীফার সামনে নাটকীয়ভাবে হারান পায়াটি উপস্থিত করেন : টেবিলটি যে আসলে তিনিই সগ্রহ করেন, তারই প্রমাণ স্বরূপ।

অনেক করিৎকর্মা আরব সেনাপতির ভাগ্যে যা ঘটেছে, মুসার ভাগ্যেরও তা-ই ঘটল। ওলীদের পরবর্তী খলীফা তাঁকে অপদস্থ করলেন। রোদে হয়রান হয়ে ভেঙ্গে না পড়া পর্যন্ত তাঁকে খোলা আকাশতলে দাঁড়িয়ে রাখা হল। তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হল; তাঁকে সর্ব ক্ষমতা হতে বঞ্চিত করা হল। তার সম্বন্ধে আমরা যে শেষ সংবাদ পাই তা এই যে, হেজাজের এক দূর পল্লীতে এই বৃদ্ধ আফ্রিকা-স্পেন বিজয়ী বীর ভিক্ষা করে জীবনযাপন করেছেন।

স্পেন এখন খেলাফতী-সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে পড়ল। এর আরবী নাম দেওয়া হল, আল-আন্দালুস। ভ্যাণ্ডাল শব্দের সঙ্গে আন্দালুসের ব্যুৎপত্তিগত যোগ আছে। আরবদের স্পেন অধিকারের আগে ভ্যাণ্ডালরা স্পেন অধিকার করেছিল। মুসার পরবর্তী শাসকদের জন্য স্পেনের উত্তর এবং পূর্বভাগে অল্প স্থানই দখলের বাকী ছিল; বিদ্রোহ দমনও বেশি করতে হয় নাই। মধ্যযুগীয় ইউরোপে স্পেন ছিল সুন্দরতম ও বৃহত্তম অঞ্চল সমূহের অন্যতম। মাত্র সাত বছর সময়ের মধ্যে এই অঞ্চলের বিজয় পরিপূর্ণ হল। বিজেতারা অতঃপর কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত স্পেনের ভাগ্যবিধাতা হয়ে রইল।

এ বিস্ময়কর বিজয়মালাকে আপাতদৃষ্টিতে অপূর্ব বলেই মনে হয়। তবে, এর কারণ নির্ধারণ কঠিন নয় এবং উপরে যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা থেকেই এর কারণ অনুমান করা চলে। ভিসিয়োগথরা (পশ্চিমী গহ্) খৃস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমভাগে বর্বর টিউটন জাতি হিসেবে স্পেনে প্রবেশ করে। এদের এবং স্পেনীয়-রোমক বাসিন্দাদের মধ্যে বিভেদ-রেখা কোনক্রমেই মুছে ফেলা সম্ভব হয় নাই। সুয়েভী ও ভ্যাঙালরা জার্মানী হতে এসে গধূদের আগে স্পেনে প্রবেশ করে। তাদের উচ্ছেদ করতে ভিসিয়োগধূদের বহুকাল পর্যন্ত সংগ্রাম করতে হয়েছে। ভিসিয়োগা একচ্ছত্র এবং কখনো কখনো স্বেচ্ছাচারী রাজারূপে শাসন কাজ চালিয়েছে। তারা বরাবর আরিয়ান সম্প্রদায়ভুক্ত খৃস্টানধর্ম পালন করে চলেছে। অবশেষে ৫৮৭ খৃস্টাব্দে রিকার্ড নামক তাদের একজন ক্যাথলিক সম্প্রদায়ভুক্ত খৃস্টানধর্ম গ্রহণ করেন। দেশের বাসিন্দারা সবাই ক্যাথলিক ধর্মপন্থী ছিল। ক্যাথলিক ধর্মপন্থী হিসেবে তারা বরাবর অন্য ধর্ম পন্থীদের শাসনকে ঘৃণার চোখে দেখত। বাসিন্দাদের মধ্যে বহুসংখ্যক গোলাম ও ভূমি-দাস ছিল। তারা তাদের এ দুর্ভাগ্যের কলঙ্ক-তিলক ললাটে নিয়ে স্বভাতঃই তুষ্ট ছিল না। এই দাস শ্ৰেণী যদি আক্রমণকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে তাদের সাফল্য বিধান করে থাকে, তবে তাতে আশ্চর্যের কিছুই নাই। তারপর বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল বেশ কিছুসংখ্যক ইহুদী। গথ রাজারা এদের উপর জুলুম করে করে এদের সহানুভূতি হারিয়েছিল। এদের জোর করে খৃস্টান করার চেষ্টা চরমে পৌঁছল তখন, যখন ৬১২ সালে রাজা হুকুম জারী করে বসলেন যে, হয় ইহুদীদের খৃস্টান হতে হবে, না হয় তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং তারা নির্বাসিত হবে। এই জন্যই আমরা দেখতে পাই যে, মুসলিম বিজেতারা তাদের স্পেনীয় অভিযানকালে কয়েকটি বিজিত শহর ইহুদীদের হাতে ন্যস্ত করে নিজেরা বাকী অঞ্চল অধিকারে ব্যাপৃত হয়েছেন।

আমাদের আরো মনে রাখতে হবে যে, রাজা ও তাঁর গহ্-বংশীয় আমীর রইসদের মধ্যে রাজনৈতিক মতানৈক্য এবং আত্মকলহ রাষ্ট্রের শক্তি খর্ব করে রেখেছিল। ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে গথীয় আমীরেরা বড় বড় ভূখণ্ডের অধীশ্বর হয়ে উঠেছিল। মুসলিম আক্রমণের পূর্ব-মুহূর্তে এই আমীরদের একজন জোর করে দেশের সিংহাসন দখল করে বসেছিলেন। কাজেই সিংহাসনচ্যুত রাজার জ্ঞাতিরা অসঙ্কোচে নতুন রাজার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল । উইটিজার সিংহাসনচ্যুত পুত্র অচিলা অকপটে বিশ্বাস করে আসছিলেন যে, আরবরা তারই পক্ষ হয়ে লড়াই করেছে। এলেডো অধিকারকালে উক্ত শহরে তার যে ব্যক্তিগত জমিদারী ছিল, তিনি তা-ই ফেরত পেয়ে তুষ্ট রইলেন এবং এখানে মহাধুমধামে জীবনযাপন করতে লাগলেন। তার পিতৃব্য বিশপ ওপাসকে রাজধানীতে তাঁর স্বপদে বহাল করা হল। সিউটার গভর্নর জুলীয়ান সম্বন্ধে কথিত হয় যে, তিনি আরব নৌ-বাহিনীকে নৌবহর সরবরাহ করেছিলেন। স্পেন বিজয়ে তিনিও অভিনয় করেন; তবে তাঁর অভিনয়ের গুরুত্ব স্পষ্টতঃই অতিরঞ্জিত হয়েছে। ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে যে কয়টি শেষ বাধা ছিল, সারাগোসার পতনে তার একটি দূর হল; কিন্তু পিরেনীজ পর্বত রয়ে গেল। কোন কোন আরব ঐতিহাসিক বলেন যে, মুসা পিরেনীজ অতিক্রম করেছিলন। তিনি নাকি এমন আশাও করেছিলেন সে, ফিরিঙ্গীদের দেশ অতিক্রম করে কনস্টান্টিনোপলের পথে তিনি দামেস্কে খলীফার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবেন। আদতে কিন্তু তিনি কখনো পিরেনীজ পার হন নাই। ইউরোপের ভূগোল সম্বন্ধে আরব আক্রমণকারীদের জ্ঞান স্পষ্ট থাকার কথা নয়। কাজেই ফিরিঙ্গীদের দেশ জয় করে দামেস্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কল্পনা যতই উদ্ভট হোক না কেন, অমন কল্পনা সত্যি তাদের মাথায় প্রবেশ করে থাকতে পারে। মুসার পরবর্তীদের মধ্যে তৃতীয় জন আল-হার ইবনে আব্দুর রহমান আল থাকাফী ৭১৭ কি ৭১৮ সালে প্রথম পিরেনীজ অতিক্রম করেন।

ফ্রান্সের মঠ ও গীর্জার ঐশ্বর্যে প্রলুব্ধ হয়ে এবং মেরোভিনৃজীয়ান দরবারের প্রধান অফিসারদের সঙ্গে একুইটেইন-এর ডিউকদের আত্মকলহের সুযোগে আল-হারু মাঝে মাঝে ফ্রান্সের বুকে অতর্কিত আক্রমণ চালাতে শুরু করেন। তার উত্তরাধিকারী আস্ সামাহ ইবনে মালিক আল-খাওয়ালানী এই আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকেন। ৭২০ সালে আস-সামাহ্ সেটিমেনীয়া দখল করেন। সেপটিমেনীয়া ভূতপূর্ব ভিসিয়োগথ রাজ্যের একটি সামন্ত প্রদেশ ছিল। অতঃপর তিনি নারবোন অধিকার করে তাকে এক বিশাল কেল্লায় পরিণত করেন এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র এখানে রক্ষিত হয়। কিন্তু পরবর্তী বছর তুলতে তার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তুর্ল একুইটেনের ডিউক ইউডিসের রাজধানী ছিল; তার প্রবল প্রতিরোধে মুসলিম বাহিনী পরাভূত হয়। এই সগ্রামে আস-সামাহ্ শহীদ হন। এইরূপে একজন জার্মান রাজপুত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক উল্লেখযোগ্য বিজয় লাভ করেন। পিরেনীজের ওপারে মুসলমানদের পরবর্তী অভিযান সফল হয় নাই।

আস-সামাহ্’র পর আব্দুর-রহমান ইবনে আবদুল্লাহ আল-গাফিকী স্পেনের শাসনকর্তা হন। তিনি উত্তর অঞ্চলে সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ অভিযান করেন। ৭৩২ খৃস্টাব্দের বসন্তকালের প্রথম ভাগে আব্দুর রহমান পশ্চিম পিরেনীজের পথে অগ্রসর হন। গারোন নদীর তীরে তিনি ডিউক ইউসিকে পরাজিত করেন–বোর্দো আক্রমণ করে এর গীর্জাসমূহে আগুন লাগিয়ে দেন এবং পয়টিয়ারস্ হয়ে ট্ররস-এর প্রান্তভূমিতে গিয়ে হাজির হন। গলুদের ধর্ম পুরুষ সেন্ট মার্টিনের মাজার হিসেবে টুস গলদের একপ্রকার ধর্মীয় রাজধানী ছিল। এখানে উৎসর্গীকৃত ঐশ্বর্যরাশিই নিঃসন্দেহ রকমে আক্রমণকারীর পক্ষে প্রধান আকর্ষণ ছিল।

এখানে টুস এবং পয়টিয়াস-এর মাঝখানে ক্লেইন ও ভিয়েন-এর সঙ্গমস্থলে চার্লস মার্টেল আবদুর রহমানের সম্মুখীন হলেন। চার্লস মেরোভিজীয়ান দরবারের প্রাসাদ মেয়র ছিলেন। ইউডিস তার সাহায্য চেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে চার্লস মার্টেল’ (হাতুড়ীওয়ালা) উপাধি লাভ করেন। এই উপাধি হতেই বোঝা যায় যে, চার্লস অসম সাহসী যোদ্ধা ছিলেন। তিনি এর আগে অনেক শত্রু দমন করেন। ইউডি ইতিপূর্বে একুইটেইনে স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন; চার্লস তাকে উত্তরাঞ্চলে ফিরিঙ্গীদের প্রভুত্বকে নামতঃ স্বীকার করতে বাধ্য করেন। চার্লস হেরিস্টলের পেপিনের জারজ সন্তান ছিলেন। নামে না হলেও কার্যতঃ তিনি রাজ-শক্তি পরিচালনা করতেন।

চার্লসের ফিরিঙ্গী সৈন্যদলের বেশীরভাগই ছিল পদাতিক। তাদের গায়ে ছিল নেকড়ে বাঘের চামড়া আর জটাযুক্ত বারী মাথা হতে কাঁধের উপর দিয়ে নিচের দিকে ঝুলে পড়েছিল। দীর্ঘ সাতদিন পর্যন্ত আবদুর রহমানের অধীনে আরব-বাহিনী আর চার্লসের অধীনে ফিরিঙ্গী সৈন্যদল সামনা সামনি দাঁড়িয়ে রইল। ছোট ছোট হাতাহাড়ি লড়াই চলতে লাগল। অবশেষে ৭৩২ সালের অক্টোবর মাসের এক শনিবার আরব নেতা অগ্রণী হয়ে আক্রমণ করলেন। ময়দান যখন যোদ্ধাদের হুঙ্কারে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল, তখন ফিরিঙ্গী যোদ্ধারা এক ফাঁপা চতুষ্কোণ তৈরি করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্ভেদ্য দেয়ালের মত (একজন ইউরোপীয় ঐতিহাসিকের ভাষায় এক অনমনীয় বরফখণ্ডের মত) দাঁড়িয়ে গেল। শত্রুদের অশ্বারোহী সৈন্যরা সে দেয়ালে প্রহত হয়ে ফিরে যেতে লাগল। ফিরিঙ্গী সৈন্য স্ব-স্থান হতে বিচ্যুত না হয়ে আক্রমণকারীদিগকে কেটে টুকরা টুকরা করতে লাগল। আবদুর রহমান নিজেও তাদের হাতে নিহত হলেন। অবশেষে রাত্রির অন্ধকার নেমে এল। শত্রুরা নিজ নিজ শিবিরে ফিরে গেল।

রাত্রি প্রভাতে শত্রু-শিবিরের নিস্তব্ধতা দেখে চার্লস সন্দেহ করলেন যে, শক্ররা কোথাও চুপচাপ ওঁত পেতে বসে আছে। তিনি খোঁজ নিতে গুপ্তচর পাঠিয়ে দিলেন। দেখা গেল, রাত্রির অন্ধকারে আরবরা নিরবে শিবির ত্যাগ করে উধাও হয়ে গেছে। চার্লস জয় লাভ করলেন। পরবর্তীকালের কাহিনী প্রিয় লোকেরা পয়টিয়ার্স বা টুস-এর এই যুদ্ধকে নানা গল্প-গুজবে সজ্জিত করে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বহুগুণে অতিরঞ্জিত করেছে। খৃস্টানদের পক্ষে এ ছিল তাদের চির-শকদের সামরিক-ভাগ্যে ভাটার শুরু। গিবন ও তার পরবর্তী ঐতিহাসিকেরা বলেন যে, এই দিন আরবদের জয়লাভ ঘটলে আজ লণ্ডন ও প্যারিসে গীর্জার স্থলে দেখা যেত মসজিদ, আকত্সফোর্ড ও অন্যান্য জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে বাইবেলের বদলে ব্যাখ্যাত হত কোরআন। কতিপয় আধুনিক ঐতিহাসিকের মতে টুসের যুদ্ধ এক চরম ভাগ্যনিয়ন্ত্রক ঘটনা।

প্রকৃতপক্ষে, টুসের লড়াই কোন কিছুই চূড়ান্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করে নাই। আরব-বার্বার তরঙ্গ প্রায় হাজার মাইল দূরস্থ ব্রিাটার হতে যাত্রা শুরু করে এখন এক স্বাভাবিক নিশ্চল অবস্থায় এসে পৌঁছেছিল। এ তরঙ্গ তার গতি হারিয়ে ফেলেছিল; এর শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। বার্বার-আরবের মধ্যে জাতিগত বিদ্বেষ, আভ্যন্তরীণ গোলযোগ এবং পরস্পর হিংসা আবদুল রহমানের সৈন্যদলকে দুর্বল করতে শুরু করেছিল। আরবদের মধ্যেও মনোভাব ও উদ্দেশ্যের ঐক্য ছিল না। একথা সত্য যে, এই দিকে মুসলমানের আক্রমণ রুদ্ধ হল, কিন্তু অন্যান্য দিকে তাদের আক্রমণ চলতেই লাগল। উদাহরণস্বরূপ, ৭৩৪ সালে তারা এভিগ্নন অধিকার করল; এর নয় বছর পর তারা লিয়ন্স লুণ্ঠন করল এবং ৭৫৯ সাল পর্যন্ত তারা নারূবন নিজ দখলেই রাখল। টুরূসের এই পরাজয় যদিও আরবদের গতিরোধের বাস্তবিক কারণ ছিল না, তথাপি বিজয়ী মুসলিম বাহিনীর আগমনের শেষ সীমারেখা এই পরাজয় দ্বারা নির্ধারিত হল।

৭৩২ খৃস্টাব্দে মহানবীর মৃত্যুর প্রথম শতক। তাঁর অনুগামীরা এখন এক বিপুল সাম্রাজ্যের বিজেতা। এ সাম্রাজ্য বিস্কে উপসাগর হতে সিন্ধু ও চীনের সীমান্ত পর্যন্ত এবং আরল সাগর হতে নীলনদের উপরাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দামেস্ক ছিল এই মহান সাম্রাজ্যের রাজধানী। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল উমাইয়াদের সুরম্য প্রাসাদ। এইখানে দাঁড়ালে নজরে পড়ত শস্য-শ্যামলা সমতলভূমির অপূর্ব বিথার; তার দক্ষিণ সীমা ছিল বরফের পাগড়ী পরিহিত মাউন্ট হারুমন। উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবীয়াই এ প্রাসাদের নির্মাতা ছিলেন। এর সন্নিকটে অবস্থিত ছিল উমাইয়া মসজিদ। খলীফা ওলীদ নতুন করে এ মসজিদকে সুসজ্জিত করেন এবং ভাস্কর্য-শিল্পের সেই অপূর্ব মণিতে পরিণত করেন, যা আজো সৌন্দর্য-পিয়াসীদের আকর্ষণ করে। দর্শন দেওয়ার কামরায় অত্যন্ত দামী কারুকার্যখচিত গালিচায় ঢাকা একটি চতুষ্কোণ চৌকি থাকত। এই-ই ছিল খলীফার সিংহাসন। উৎসব উপলক্ষে দোলায়মান ঝলমল পোশাকে তিনি এই সিংহাসনের উপর আসন করে বসতেন। তার দক্ষিণে তার পিতৃবংশীয়রা নিজ নিজ বয়স অনুযায়ী দাঁড়িয়ে থাকতেন; তাঁর বাম পাশে দাঁড়াতেন তাঁর মাতৃবংশীয়রা। দরবারী, কবি ও দরখাস্তকারীরা দাঁড়াতেন পেছনে। অধিকতর আনুষ্ঠানিক উৎসব সম্পাদিত হত উমাইয়া মসজিদে। উমাইয়া মসজিদ আজো পৃথিবীর মহত্তম উপাসনালয়ের অন্যতম। এমনি একটি উৎসবেই খলীফা ওলীদ নিশ্চয়ই স্পেন বিজয়ী মুসা ও তারিককে তাদের বন্দী ও ঐশ্বর্য-সহ অভ্যর্থনা করেছিলেন। ইসলামের আগমন তার শেষ সীমায় এবং ইসলামের প্রথম শাসক-বংশের গৌরব-মহিমা উচ্চতম শিখরে পৌঁছেছিল।

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ০৯. সামাজিক ও তামদুনিক জীবনের আরম্ভ

সামাজিক ও তামদুনিক জীবনের আরম্ভ

আমরা আমাদের কাহিনীর প্রথম বড় অধ্যায়ের শেষাংশে এসে পৌঁছেছি। ইসলামের বিজয় অভিযান ক্ষান্ত হয়েছে। একথা সত্য যে, সাম্রাজ্যের ভিতর সাম্রাজ্যের মৃত্যুর পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত অশান্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ চলেছে, তথাপি এখন হতে আমাদের কাহিনীর প্রধান বক্তব্য বিষয় হবে যুদ্ধ-বিগ্রহ, জয়-বিজয় ছাড়া অন্য বস্তু ও মুসলিম-সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ভাবের অগ্রগমন, তমদ্দুনের বিকাশ; সাহিত্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, চারু-শিল্প এবং ভাস্কর্যশিল্পের অভ্যুদয়–আর তলোয়ারের বিজয় যখন খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে ভেঙ্গে পড়ে, তখন বিভিন্ন তমদ্দুনের ব্যাখ্যার মারফত কেমন করে মানুষ তার আধ্যাত্মিক বিজয়ের ক্ষেত্রে চলে যায়, তারই প্রাণদায়িনী বিবরণ।

এ একটি আশ্চর্যের বিষয় যে, খৃস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে দামেস্কের সাধারণ জীবন যাত্রা যেমন ছিল, তা সে শহরের বর্তমান জীবন-যাত্রার চেয়ে বিশেষ ভিন্ন ছিল না। আজকের মত তখনো দামেস্কের সংকীর্ণ রাজপথে দেখা যেত, ফিলা পাজামা, লাল সরু-ঠোঁট জুতা ও বিরাট পাগড়ী পরিহিত পথিকের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে চলেছে মরুভূমির রোদ-পোড়া বেদুঈন–পরনে তার ঢিলা আল-খেল্লা, মাথায় ইকালবদ্ধ রুমাল। মাঝে মাঝে পথে দেখা যায় ইউরোপীয় পোশাক পরিহিত কোন একজন ইন্জী (ফিরিঙ্গী)–আজো ইউরোপীয়রা সবাই ঐ নামেই পরিচিত। এখানে সেখানে মাঝে মাঝে দেখা যায়, দামেস্কের অভিজাত-ঘোড়ার পিঠে সওয়ার’ গায় সাদা রেশমী আবা’, কোমরে ঝুলানো তলোয়ার কিংবা নেজা। শহরে ওরাই ধনীকশ্রেণী। বোরখায় সম্পূর্ণ রকমে ঢাকা দুই-চারটি রমনী রাস্তা পার হয়; অন্যরা চুপে তাদের বাড়ীর পরদাওয়ালা জানালার ফাঁকে ফাঁকে বাজার ও হাওয়া-খাওয়ার ময়দানের দিকে চেয়ে থাকে। রাস্তায় মানুষের হল্লার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শরবত আর হালুয়া বিক্রেতারা প্রাণপণে চীৎকার করে। আবাদী জমির ও মরুভূমির উৎপন্ন শস্য পিঠে বয়ে চলেছে গাধা উটের বহর। শহরের হাওয়া গন্ধ-ভারাক্রান্ত। দুনিয়ায় যত রকম সুগন্ধ আছে, সব ঐ হাওয়ার বুকে বাসা বেঁধেছে।

 

 

অন্যান্য শহরের মত দামেস্কেও আরবরা নিজ নিজ কওমের আনুগত্য মোতাবেক স্বতন্ত্র মহল্লায় বাস করত। দামেস্ক, হি, আলেপ্পো ও অন্যান্য। শহরে এই মহল্লাগুলির পার্থক্য আজো সুস্পষ্ট। প্রত্যেক বাড়ীর ফটক পার হলেই সম্মুখে ছিল উঠান। সাধারণতঃ, এসব উঠানের মাঝখানে পানির বড় চৌবাচ্চা থাকত আর চৌবাচ্চার মাঝখানে থাকত ফোয়ারা । ফোয়ারার মুখ হতে হীরক চূর্ণের মত পানির কণা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত। চৌবাচ্চার ধারে হয়তো থাকত একটা কমলালেবুর গাছ। উঠানের চারপাশ ঘিরে ঘরের কামরা সাজানো থাকত। বড় বড় বাড়ীতে এবাদতখানাও থাকত। উমাইয়াদের এ এক অবিনশ্বর গৌরব যে, তাঁরা দামেস্কে পানি সরবরাহের যে ব্যবস্থা করেছিলেন, তার চেয়ে ভাল ব্যবস্থা তকালে সমগ্র প্রাচ্যের আর কোথাও ছিল না। আর সে ব্যবস্থা আজো চালু আছে।

সাম্রাজ্যর সর্বত্র বাসিন্দারা চারটি সামাজিক ভাগে বিভক্ত ছিল। শাসক-শ্ৰেণীর মুসলমানরাই স্বভাবতঃ উচ্চতম শ্রেণীর ছিলেন। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন খলীফার পরিবার ও বিজেতা আরব অভিজাত-গোষ্ঠী। কোথায় এদের সংখ্যা কত ছিল বলা কঠিন। তবে হিস ও দামেস্কে এদের সংখ্যা ছিল ২০ হতে ৪৫ হাজার।

আরব-মুসলমানদের পরবর্তী স্তর-ভুক্ত ছিল নবদীক্ষিত মুসলমানগণ। নীতি হিসেবে এরা ইসলামের সর্বপ্রকার নাগরিক অধিকারের অধিকারী ছিল। উমাইয়া আমলের প্রায় আগা-গোড়াই জমির মালিকরা ধর্মনির্বিশেষে খাজনা দিত। তথাপি সরকারী আয় কমে যাওয়ার একটা নিঃসন্দেহ কারণ ছিল, ইসলামে নব দীক্ষা।

এই নব-দীক্ষিত মুসলমানরাই মুসলিম সমাজের নিম্নতম স্তর-ভুক্ত ছিল। তাদের এ সামাজিক মর্যাদাহীনতার জন্য তারা হামেশাই বিক্ষুব্ধ থাকত। আর এই জন্যই আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই যে, বার বার তারা ইরাকে শীয়া দল ও ইরানে খারেজী দলে যোগদান করেছে এবং তার ফলে ঘটেছে অন্তহীন আত্মকলহ ও রক্তপাত। এদের কেউ কেউ উত্তাপে বালি হয়ে সূর্যের চেয়ে দুঃসহ ছিল। তাদের ধর্মোৎসাহ অনেক সময় ধর্মোন্মাদনায় পরিণত হয়ে অমুসলমানদের উপর অত্যাচারের কারণ হত। প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পরমত-অসহিষ্ণু ছিল, তাদের মধ্যে ইহুদী খৃস্টান ধর্ম হতে ইসলামে দীক্ষিতের দলই বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল।

মুসলমান সমাজে স্বভাবতঃ এরাই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় এবং চারুশিল্পের অনুশীলনে প্রথম আকৃষ্ট হয়; কারণ, এদেরই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল দীর্ঘতম। এরা মুসলমান আরবদের তুলনায় যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় শ্রেষ্ঠতর স্থান দখল করতে লাগল, তখন তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হল। বিজেতা আরবদের সঙ্গে বিয়ে-শাদী করে তারা আরব রক্তে মিশ্রণ আমদানী করল এবং পরিণামে বিভিন্ন জাতির সংমিশ্রণে আরব রক্তের পূর্ব বৈশিষ্ট্য আর বজায় রইল না।

তৃতীয় সমাজিক শ্রেণী গঠিত ছিল, সয়ে-নেওয়া-সম্প্রদায়সমূহের দ্বারা যারা প্রত্যাদেশ-প্রাপ্ত ধর্মে বিশ্বাসী ছিল–তথাকথিত ‘জিম্মী’ দল-খৃস্টান, ইহুদী, সেবীয়ান। এদের সঙ্গে মুসলমানরা চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। এই সয়ে-নেওয়া ধর্মের অনুসরণকারীগণকে নিরস্ত্র করে মুসলিম-আশ্রয়ে রক্ষা করা হত এবং এর বিনিময়ে তাদের একটা কর দিতে হত। হযরত মুহম্মদই (সঃ) এ নীতির প্রথম প্রবর্তন করেন। এর এক কারণ ছিল, বাইবেলের প্রতি মহানবীর শ্রদ্ধা এবং অন্য কারণ ছিল, কোন কোন খৃস্টান কওমের অভিজাত-সুলভ আত্মীয়তা।

 

 

জিম্মীরা তাদের এই সমাজ-স্তরে ভূমি-কর ও মাথাপিছু কর হতে অনেকাংশে মুক্ত ছিল। কোন মামলায় মুসলমান বিজড়িত না থাকলে দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন-ঘটিত ব্যাপারে তারা কার্যতঃ তাদের ধর্মগুরুর অধীনেই বাস করত। মুসলিম-কানুন এত পবিত্র যে, তাদের প্রতি প্রযুক্ত হতে পারত না। এই আইন-বিধির মৌলিক বংশ তুর্ক-সাম্রাজ্যে জারী ছিল এবং সিরীয় ও ফিলিস্তিনের অছি-জামানাতেও তা মরে যায় নাই, দেখা গেছে।

সমাজের নিম্নতম-স্তরে ছিল গোলাম। অতি প্রাচীনকাল হতে সেমিটিক সমাজে দাস প্রথার চল ছিল। ইসলাম এ প্রথাকে বর্জন করে নাই। ওল্ড টেস্টামেন্ট দাস-প্রথাকে আইনসঙ্গত প্রতিষ্ঠান বলেছে; তবে এ গ্রন্থ দাসদের ভাগ্যকে অনেকখানি উন্নত করেছিল। ধর্মীয় আইন এক মুসলমানের পক্ষে অন্য মুসলমানকে গোলাম করা হারাম করেছে। আর বাইরের কোন গোলাম ইসলাম কবুল করলে তাকে আযাদ করার প্রেরণা দিয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যুদ্ধবন্দীদের মধ্য হতে গোলাম সগ্রহ করা হত। এ যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে নারী এবং শিশুও থাকত। অবশ্য মুক্তি-মূল্য দিয়ে এদের আযাদ করে নেওয়া চলত। বাজারে খরিদ করে, কখনো বা অতর্কিত আক্রমণ দ্বারাও গোলাম সংগৃহীত হত। অল্পকাল মধ্যে দাস-ব্যবসায় মুসলিম-জগতের সর্বত্র জেঁকে উঠল এবং খুব লাভজনক তেজারতিতে পরিণত হল। পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকার কতক গোলাম কৃষ্ণকায় ছিল; চীন-তুর্কীস্তানের গোলাম পীতকায় ছিল, নিকট প্রাচ্য কিংবা পূর্ব এবং দক্ষিণ ইউরোপের গোলাম ছিল শ্বেতকায়। স্পেনীয় গোলামদের প্রত্যেকের দাম ছিল হাজার দিনার; তুর্কী গোলামদের প্রত্যেকের দাম ছিল ছয়শ’ দিনার। ইসলামী বিধান মোতাবেক বাদীর গর্ভে গোলাম বা অন্য কারো কিংবা স্বয়ং মনিবের ঔরসজাত সন্তান (যেখানে মনিব সন্তানকে নিজ ঔরসজাত বলে অস্বীকার করত) গোলামরূপেই জন্মগ্রহণ করত। কিন্তু আযাদ নারীর গর্ভে গোলামের ঔরসজাত সন্তান আযাদরূপে ভূমিষ্ঠ হত।

বিস্তীর্ণ বিজয়ের ফলে গোলাম দ্বারা মুসলিম-সাম্রাজ্য কি ভয়াবহরূপে প্লবিত হয়েছিল, পরবর্তী অতিরঞ্জিত হিসেব হতে তার খানিকটা ধারণা পাওয়া যায় : মুসা উত্তর আফ্রিকা হতে ৩ লক্ষ বন্দী নিয়ে আসেন; এর ৬০ হাজার বন্দী তিনি খলীফাকে পাঠিয়ে দেন এবং স্পেনের গথ অভিজাতদের ঘর হতে ৩০ হাজার কুমারীকে বন্দী করেন –তুর্কীস্তানের একজন মুসলিম সেনাপতি একা ১ লক্ষ লোককে বন্দী করেন।

মনিব বাদীকে রক্ষিতা হিসেবে রাখতে পারত, কিন্তু বিয়ে করতে পারত না। এমন মিলনের সন্তানেরা মনিবের সন্তান বলে গণ্য হত; সুতরাং তারা আযাদ হিসেবে জন্মগ্রহণ করত। কিন্তু এতে রক্ষিতার সম্মান কেবল সন্তানের জননী’ পর্যন্তই উন্নীত হত–তাকে মনিব-স্বামী বিক্রি বা দান করতে পারত না এবং স্বামীর মৃত্যুর পর সে আযাদী লাভ করত। ক্রমাগত আন্তঃবিবাহের ফলে আরবজাতির সঙ্গে অনারবৃদের এই যে মিশ্রণ ঘটছিল, এ প্রক্রিয়ায় দাস-ব্যবসায় নিঃসন্দেহরূপে প্রচুর সাহায্য করেছিল।

আমরা আগে বলেছি যে, মরুভূমি হতে আগত আক্রমণকারীরা তাদের সঙ্গে বিজিত দেশে কোন জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য কিংবা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আনে নাই। উমাইয়াদের জামানা আইয়ামে-জাহেলিয়াতের সন্নিকট ছিল বলে–আর এ জামানায় অসংখ্য যুদ্ধবিগ্রহে মুসলমানরা এত ব্যস্ত ছিল এবং মুসলিম জগতের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থা এমন অনিশ্চিত ছিল যে, সে প্রাথমিক যুগে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশের কোন প্রশ্নই উঠতে পারে নাই। কিন্তু বীজ এই সময়েই বপন করা হয়েছিল এবং পরবর্তী বংশের আমলে বাগদাদে বৃক্ষ ফল-ফুলে পূর্ণ বিকাশ লাভ করেছিল। তার মূল নিঃসন্দেহ রকমে পূর্ববর্তী জামানার গ্রীক, সিরিয়া ও পারস্য সংস্কৃতির মধ্যে নিবদ্ধ ছিল। উমাইয়া জামানা মোটের উপর ডিমে তা দেওয়ার জামানা ছিল।

 

 

পারসিক, সিরিয়ান, কাপৃত, বার্বার এবং অন্যান্যদের ইসলাম কবুল এবং আরব রমনীর পানি গ্রহণের ফলে প্রাথমিক যুগে আরব ও অনারবের মধ্যে যে বিভেদ-দেয়াল গড়ে তোলা হয়েছিল, তার ক্রমে ধসে পড়ল। মুসলমানের মধ্যে কে কোন্ জাতি হতে উদ্ভূত, সে প্রশ্ন পেছনে পড়ে গেল। গোড়ায় জাতিতে যে যা-ই থাক না কেন, হযরত মুহম্মদের (সঃ) অনুসরণ করলেই সে আরব জাতি বলে গণ্য হয়ে যেত। অতঃপর কোন মানুষ আদতে সে যে জাতির অন্তর্গতই থাক না কেন, ইসলাম গ্রহণ কলেই এবং আরবী ভাষায় কথাবার্তা বল্লে ও লিখলেই সে আরব হয়ে যেতে পারত। আরব সভ্যতার ইতিহাসের এক বিশিষ্ট লক্ষণ। আরবী ভাষা-ভাষী মানুষ এতকাল ছিল কেবল আরব, এখন সে হয়ে পড়ল আন্তর্জাতিক। কাজেই যখন আমরা বলি আরব চিকিৎসা শাস্ত্র’, ‘আরব দর্শন’, অথবা আরব গণিত, তাতে এ বুঝায় না যে, ঐ আরব চিকিৎসা শাস্ত্র বা দর্শন বা গণিত কেবল আরবদের উপদ্বীপের বাসিন্দাদের সাধনার ফল। তাতে এই বুঝায় যে, ঐ সব জ্ঞান-বিজ্ঞান সংক্রান্ত গ্রন্থগুলি আরবী ভাষায় লিখিত এর লেখকেরা প্রধানতঃ খেলাফতী আমলে আবির্ভূত হয়েছিলেন; সে লেখকেরা ছিলেন পারসিক, সিরিয়াবাসী, মিসরবাসী, আরববাসী, খৃষ্টান, ইহুদী বা মুসলিম এবং তারা তাদের উপকরণের কতকাংশ সগ্রহ করেছিলেন গ্রীক, আরামিয়ান, ইন্দো-পারসিক অথবা অন্য উৎসমূল হতে।

আরবী ভাষা ও ব্যাকরণের বিজ্ঞান-সম্মত অধ্যয়ন শুরু হয় পারস্যের সীমান্ত ভূমিতে এবং প্রধানতঃ বিদেশী নও-মুসলিমরাই এ অধ্যয়ন চালিয়ে যান। নও মুসলিমদের অনেকে কোরআন অধ্যয়ন করতে সরকারী পদে স্থান পেতে এবং বিজেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতেই স্বভাবতই আগ্রহান্বিত ছিল। প্রধানতঃ, এই প্রয়োজন মিটানোর জন্যই উপরোক্ত অধ্যয়নের প্রথম তাগিদ আসে। কথিত আছে, আরবীর আদি ব্যাকরণ রচিত হয় এক খলীফার এই ফরমান অনুসারে যে, শব্দ প্রকারণের তিন ভাগ–বিশেষ্য, ক্রিয়া এবং অব্যয়। আসলে কিন্তু আরবী ব্যাকরণের বিকাশ ঘটে দীর্ঘকালব্যাপী, ধীর গতিতে এবং তার উপর গ্রীক তর্ক-শাস্ত্রের প্রভাব সুস্পষ্ট।

কোরআন অধ্যয়ন এবং তার তফসীরের প্রয়োজন হতে উদ্ভূত হয় শব্দ-তত্ত্ব, অভিধান রচনা এবং মুসলমানদের সেই একান্ত নিজস্ব সাহিত্য-সাধনা হাদীস বিজ্ঞান। হাদীসের শব্দগত মানে বর্ণিত বস্তু, আখ্যান; পরিভাষা হিসেবে এর মানে হচ্ছে, মহানবী বা তার কোন সাহাবীর কোন কাজ বা কথার বিবরণ। কোরআন এবং হাদীসের ভিত্তির উপরই রচিত হয় ধর্ম-তত্ত্ব ও আইন-কানুন। বর্তমান যুগে বিধান-তত্ত্ব (জুরি প্রডেন্স) বলতে যা বুঝায়, ইসলামে আইন তার উপর তত নির্ভরশীল নয়, যত নির্ভরশীল ধর্মের উপর। তালমুড এবং অন্যান্য সূত্রে রোমক আইন নিঃসন্দেহ রকমে উমাইয়াদের আইন প্রণয়নের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল; তবে সে প্রভাবের পরিমাণ নির্ণীত হয় নাই।

অমরা এই যুগে আরব-বিজ্ঞানের আরম্ভ দেখতে পাই। একজন ইহুদী আলেকজান্দ্রিয়ার জনৈক খৃস্টান পাদ্রীর গ্রীক ভাষায় লিখিত একখানি বইয়ের অনুবাদ করেন। আরবী ভাষার চিকিৎসা সম্বন্ধে এই-ই প্রথম পুস্তক চিকিৎসা শাস্ত্রের মত আল-কিমিয়াও পরবর্তীকালে আরব অবদানে বিশেষ পরিপুরি লাভ করে এবং আল-কিমিয়া সংক্রান্ত সাধনাও এই প্রাথমিক যুগেই শুরু হয়।

দামেস্কের দরবারে কবিতা ও সঙ্গীত বিশেষ উন্নতি লাভ করে। অবশ্য সমাজের রক্ষণশীলেরা সঙ্গীতের সমর্থক ছিল না; তারা মনে করত, সুরা পান ও জুয়া খেলার মত গানের আনন্দ-উৎসবকে মহানবী হারাম করে গেছেন। কাব্য রচনার ক্ষেত্রেই উমাইয়াদের আমলে সাংস্কৃতিক প্রগতি সবচেয়ে বেশি সাফল্য লাভ করে। উমাইয়াদের আগের আমল ছিল কঠোর বিজয়ের আমল। আরবরা কবির জাতি হওয়া সত্ত্বেও এ যুগে সে জাতির মধ্যে কোন কবির আবির্ভাব হয় নাই। দুনিয়াদার উমাইয়াদের ক্ষমতাসীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুরার দেবী, গানের দেবী এবং কবিতা দেবীদের সঙ্গে পুরাতন সম্বন্ধ পুনঃস্থাপিত হল। আরবী ভাষায় এই প্রথম প্রেমের কবি পুরোপুরি আত্মপ্রকাশ করল।

মুসলিম আরবদের বেলায় চারু-শিল্প সবচেয়ে বেশি উন্নতি লাভ করে তাদের ধর্মীয় দালান-কোঠা নির্মাণে। মুসলিম স্থপতিবিদ বা তাদের নিযুক্ত লোকেরা দালান-ইমারত নির্মাণের এক নব-পদ্ধতির উদ্ভাবন করে। তাদের নির্মিত দালান-কোঠা একাধারে সরল ও মহিমান্বিত ছিল। পুরাতন নমুনার উপরই এ পদ্ধতির বুনিয়াদ ছিল; কিন্তু তথাপি এ পদ্ধতিতে তাদের নব ধর্মের অন্তর্বাণী যেন মূর্ত হয়ে ওঠে। এই জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং জাতির সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপিত হওয়ার ফলে যে ইসলামী-সভ্যতার বিকাশ ঘটে, তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস মিলে মুসলমানের মসজিদে। ইসলাম এবং তার প্রতিবেশীদের মধ্যে যে তামন্দুনিক আদান-প্রদান হয়েছে, মসজিদ ছাড়া তার স্পষ্টতর নিদর্শন বোধহয় আর কোথাও নাই।

ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে হযরত মুহম্মদের (সঃ) মদীনাস্থ সাদাসিধা মসজিদটিই জামে মসজিদের মূল আদর্শ ছিল। এ মসজিদটি ছিল একটি ছাদহীন খোলা অঙ্গন; তার চারদিকে ছিল রোদে-পোড়া ইটের দেয়াল। রোদ হতে আত্মরক্ষার জন্য মহানবী পরে সংলগ্ন দালান হতে একটি সমতল ছাদ বাড়িয়ে এনে সমস্ত অঙ্গন ঢেকে দেন। এ ছাদ তৈরি ছিল খেজুর পাতা আর কাদায় এবং স্থাপিত ছিল খেজুর গাছের খামের উপর। খেজুর গাছের একটা খণ্ড মাটিতে পুঁতে মেহরাব তৈরি করা হয়; মহানবী তারই উপর দাঁড়িয়ে উপস্থিত সকলকে খোবা দিতেন। পরে খেজুর গাছের এ-খণ্ড তুলে ফেলে সেখানে সিরিয়ার গীর্জার অনুকরণে তিন ধাপ যুক্ত একটি কাঠের মঞ্চ স্থাপিত হয়। সুতরাং জামে মসজিদের জন্য সাধারণভাবে যা দরকার এখানে আমরা তার একটা মোটামুটি পরিচয় পাই–একটি অঙ্গন, মুসুল্লীদের শীতাতপ হতে রক্ষার জন্য খানিকটা ছাদ এবং একটি খোত্বা-মঞ্চ।

পরবর্তীকালে আরবরা পশ্চিত এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং অত্যন্ত উন্নত ভাস্কর্য-শিল্পের পরিচায়ক অগণ্য ভগ্ন ও অভগ্ন দালান-কোঠার অধিকারী হয়। কেবল তা-ই নয়, বিজিত জাতিরা যুগ-যুগান্তর হতে যে জীবন্ত শিল্প-জ্ঞান উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছিল, আরবরা তার নিয়ন্ত্রণভার পায়। মুসলমানদের ধর্মীয় প্রয়োজনে এই জ্ঞান প্রযুক্ত হয় এবং তারই ফলে কালক্রমে বিকাশ লাভ করে সেই সুন্দর শিল্প, যাকে কেউ বলে সারাসেনী, কেউ বলে আরবী, কেউ বা বলে মুসলিম আর্ট। মুহম্মদী আর্ট’ শব্দ ব্যবহারে মুসলমানদের আপত্তি আছে। খৃস্টানরা খৃস্টের উপাসনা করে বলে খৃষ্টান; মুসলমানরা হযরত মুহম্মদের (সঃ) উপাসনা করে না; কাজেই তারা মুহম্মদী’ নয়।

বায়তুল মোকাদ্দেস বাইবেলের বহু ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তাছাড়া, হযরত মুহম্মদের (সঃ) মেরাজে যাওয়ার কালে এ স্থান ছিল তার এক মঞ্জিল। এ উভয় কারণে সেই প্রাথমিক যুগেই বায়তুল মোকাদ্দেস মুসলমানদের চোখে পবিত্র হয়ে ওঠে। পৌত্তলিক, ইহুদী, খৃস্টান এবং মুসলিম ঐতিহ্যে পবিত্র এক ভূখণ্ডের উপর ৬৯১ সালে পাথরের গম্বুজ নির্মিত হয়। কথিত আছে, ঐ স্থানেই ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র ইসমাইলকে কোরবান করতে চেয়েছিলেন। এই গম্বুজ নির্মাণে সম্পূর্ণ নতুন স্থাপত্য-রীতি অনুসৃত হয় এবং খৃস্টানদের প্রধান গীর্জার চেয়ে সুন্দর করার জন্য এ প্রস্তর-গম্বুজকে এমন অভাবনীয় সুন্দর কারুকার্যে খচিত করা হয় যে, আজ পর্যন্তও তার চেয়ে সুন্দর অমন কিছু আর কোথাও নির্মিত হয়েছে বলে মনে হয় না।

 

 

দামেস্কের জামে মসজিদের দিকে চাইলে আরো স্পষ্টভাবে বুঝা যায়, কিভাবে আরব-সভ্যতার বিকাশ ঘটে। ৭০৫ সালে খলীফা ওলীদ দামেস্কের খৃস্টান গীর্জার স্থান নিয়ে নেন। এ স্থানে আদি যুগে ছিল জুপিটারের মন্দির, খৃস্টানরা এ স্থানকে উৎসর্গ করে সেন্ট জনের নামে। এখানেই খলীফা উমাইয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। খৃষ্টানদের গীর্জার কতটুকু মসজিদ নির্মাণকালে সংরক্ষিত হয়েছিল, তা বলা কঠিন। প্রাচীন গীর্জার বুরুজের উপর দক্ষিণের দুটি মিনার স্থাপিত; কিন্তু উত্তরের মিনার ওলীদ নিজে তৈরী করেছিলেন। এই মিনার আলোক-স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহৃত হত এবং এরই অনুকরণে সিরিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে বহু মিনার নির্মিত হয়। যে সকল খুঁটি মুসলিম মিনার আজো টিকে আছে, তার মধ্যে এইটিই সবচেয়ে প্রাচীন। এই মসজিদ নির্মাণে ওলীদ পারসিক, গ্রীক এবং ভারতীয় কারিগর মোতায়েন করেন। ইদানীং যে প্রাচীন দলিল-পত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কিছু কিছু মাল-মসলা ও কারিগর মিসর হতেও আনীত হয়েছিল। উপরে যা বর্ণিত হল এবং পরে যা বর্ণিত হবে, তা থেকে স্পষ্টই প্রমাণিত হবে যে, আরবরা দুনিয়াকে যুদ্ধ-বিদ্যায় তাদের যথেষ্ট পারদর্শিতা অর্জনেরও ক্ষমতা ছিল।

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ১০. গৌরবের যুগে বাগদাদ

গৌরবের যুগে বাগদাদ

আরবগণ সৌন্দর্যচর্চা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলনে যেমন আত্মনিয়োগ করে, অনাচারেও তারা তেমনি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগের কিঞ্চিৎ আগে একজন বাদীর গর্ভজাত খলীফা উমাইয়া সিংহাসনে আরোহণ করেন। অত্যন্ত অশুভ লক্ষণ। তাঁর পরবর্তী দুই খলীফাও বাদীর গর্ভজাত ছিলেন–আর এরাই ছিলেন উমাইয়া বংশের শেষ খলীফা। খোঁজা-প্রথা ইতিমধ্যেই পূর্ণ বিকাশ-লাভ করে এবং এই খোঁজাদের সাহায্যেই হেরেম প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব সম্ভব হয়। অপরিমিত ঐশ্বর্য ও গোলাম-বাঁদীর ছড়াছড়ি হেতু বিলাস-সম্ভোগ চরমে ওঠে। শাসকগোষ্ঠীতে খাঁটি আরব-রক্ত কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের সর্বত্র নৈতিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে।

এই অবধাঃগতি উমাইয়া বংশকে অনেকখানি দুর্বল করে ফেলে। উত্তর ও দক্ষিণ আরবের কওমদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আত্মকলহ উমাইয়াদের দুর্বলতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। প্রাক-ইসলামী যুগেও এমন গোষ্ঠীগত বিভেদ-প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। এখন সেই ব্যাধি চরমে গিয়ে ওঠে এবং অনন্ত বিবাদ-বিসম্বাদ সৃষ্টি করতে থাকে। সিন্ধুনদের তীরে তীরে, সিসিলীর উপকূলে উপকূলে এবং সাহারার সীমান্তে সীমান্তে এই প্রাচীন কলহ আত্মপ্রকাশ করে। এর ফলে দুটি রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয় : কাইস্ ও ইয়ামন। লেবানন ও ফিলিস্তিনে আধুনিক যুগ পর্যন্তও এ কলহ জীবন্ত ছিল। কারণ, অষ্টাদশ শতাব্দীতেও এ দুই দলের মধ্যে দস্তুরমত লড়াই হয়েছে।

বংশের মধ্যে কার পর কে খলীফার সিংহাসনে বসবে, তার কোন সুনির্দিষ্ট নীতি না থাকায় অনিশ্চয়তা উমাইয়া বংশকে আরো দুর্বল করে তোলে। মুয়াবীয়া তার পুত্রকে সিংহাসনের জন্য নির্বাচন করেছিলেন। আরবের সনাতন রীতি ছিল যে, সমাজের বয়োঃজ্যেষ্ঠই উত্তরাধিকারী হবে; কিন্তু এ-সত্ত্বেও শাসক পিতা স্বভাবতই তাঁর পুত্রকে সিংহাসন দিতে লালায়িত হতেন। ফলে দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে উঠত।

এ আমলের ইতিহাসে ‘জনসাধারণ বা জাতির উল্লেখ কমই মিলে। অথচ এই জনসাধারণ বা জাতির আনুগত্যই সিংহাসন লাভের একমাত্র দাবী হয়ে দাঁড়ায়। এই আনুগত্য প্রকাশ করা হত নেতাদের মারফত। জনসাধারণ শক্তির চূড়ান্ত উত্স হওয়া সত্ত্বেও এ আমলে তারা মাঝে মাঝে উচ্ছঙখল গণ-বিক্ষোভ দ্বারা গোলযোগের সৃষ্টি করত। তাদের ইচ্ছাকে শাসন-শক্তির নিকট কার্যকরী করার দিন তখনো দূরে ছিল।

উমাইয়াদের জাতি-ভাই আব্বাসীয়রা ৭৪৭ সালে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আব্বাসীয়রা মহাবীর অন্যতম পিতৃব্য আল আব্বাসের বংশধর। এই সময় আব্বাসীয়দের বিদ্রোহ সাফল্যমণ্ডিত হয় এবং উমাইয়া খান্দান ধ্বংস হয়ে যায়। জনৈক আব্বাসীয় সেনাপতি ক্ষমতাচ্যুত উমাইয়া পরিবারের আশি জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে এক ভোজে দাওয়াত করেন এবং ভোজের সময় তাদের প্রত্যেককে কেটে টুকরা করে তাদের মৃত ও অর্ধমৃত দেহের উপর চামড়ার চাদর বিছিয়ে ভোজন করেন। প্রথম আব্বাসীয় খলীফা নিজকে আস্-সাফফা (রক্তপাতকারী) বলে পরিচয় দিতেন এবং পরে এ-ই তাঁর উপনাম হয়। আস্-সাফফার এই কাজের ফল দূরগামী ছিল। নতুন রাজবংশ তাদের নীতি কাজে পরিণত করার জন্য জোর-জুলুমের উপর নির্ভর করতে শুরু করে। এ জামানার জল্লাদৃরা একটি চামড়াকে তাদের গালিচা হিসেবে ব্যবহার করত। ইসলামের ইতিহাসে এই প্রথম সেই চামড়া খলীফার সিংহাসনের পাশে তার অনুবদ্ধ হিসেবে স্থান লাভ করল। আব্বাসীয় খলীফারা কোনদিনই উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের উপর শাসন-পরিচালনা করে নাই; কিন্তু তারা পরবর্তী পাঁচশ’ বছর পর্যন্ত মুসলিম-জগতের পূর্বাংশ শাসন করেছে। তাদের বংশের সপ্তত্রিংশ খলীফা ১২৫৮ সালে মোগলদের হাতে নিহত হন। প্রকৃতপক্ষে আব্বাসীয়দের-আমলকেই ইসলামী সভ্যতার সোনার যুগ বলা যায়। বাগদাদ আব্বাসীয় খলীফাদের সৃষ্টি। এই বংশের দ্বিতীয় খলীফা তাইগ্রিস নদীর পশ্চিম পারে এর পত্তন করেন। এইখানে প্রাচীনযুগের কয়েকটি মহাশক্তিশালী সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। খলীফা তাঁর রাজধানীর জন্য এই স্থান নির্বাচন কালে বলেনঃ “এখানে সুন্দর একটা সেনানিবাস হবে। তাছাড়া, এই তাইগ্রিস নদীর সাহায্যে আমরা সুদূর চীন পর্যন্ত বহু দেশের সংগে সংযোগ স্থাপন করতে পারব। সমুদ্রের ঐশ্বর্য যা পাওয়া যাবে, নিয়ে আসতে পারব। মেসোপটেমীয়া, আর্মেনিয়া এবং তাদের সন্নিহিত স্থান হতে খাদ্যদ্রব্য আমদানী করতে পারব। এর উপর, কাছেই আছে ইউফ্রেতিস। এর মধ্য দিয়ে সিরিয়া, আর-রাকা এবং তৎসলগ্ন স্থান হতে বহু জিনিস আমরা আনতে পারব। এ নির্বাচন বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক ছিল। এক লক্ষ কারিগর ও ওস্তাগর চার বছর ক্রমান্বয়ে কাজ করে চলে। এমনিভাবে জেগে ওঠে এ স্বপ্নের শহর।

শহরটি গোলাকার ছিল। এইজন্য এর আর এক নাম ‘গোল শহর। শহরের চারপাশে ছিল পর পর দু’টি পাকা দেয়াল। তারপরে ছিল একটি গভীর পরিখা–তার পরে ছিল ইটের আরো একটি দেয়াল–৯০ ফিট উঁচু। এই শেষ দেয়াল কেন্দ্রস্থানকে ঘিরে রাখত। দেয়ালের চারপাশে চারটি ফটক ছিল এবং সেই ফটকের ভিতর দিয়ে চারটি রাজ-পথ নির্গত হয়ে সাম্রাজ্যের চারকোণ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এইসব দেয়াল-বৃত্তের মাঝখানে অবস্থিত ছিল খলীফার প্রাসাদ। প্রাসাদের এক নাম ছিল সোনার দরজা–অন্য নাম ছিল সবুজ গম্বুজ। প্রাসাদের কাছেই ছিল বিশাল মসজিদ। দরবার-মহলের গম্বুজটি উচ্চতায় ছিল একশ’ ত্রিশ ফিট। এই গম্বুজ অনুসারেই প্রাসাদের অন্যতম নাম হয়। পরবর্তীকালের একটি উপ-কথায় পাওয়া যায় যে, এই গম্বুজের চূড়ায় দাঁড়ানো ছিল নেজা হাতে একজন অশ্বারোহী এবং বিপদের সময় নেজাটি সেই দিকে মুখ করে থাকত, যে দিক হতে দুশমনের আগমন সম্ভাবনা থাকতো। কিন্তু একজন আরব ভৌগোলিক বলেন যে, নেজাটি, বরাবর একই দিকে প্রসারিত ছিল। তাই বলে এই একই দিক হতে সর্বদা দুশমনের আগমণের আশঙ্কা আছে, মুসলমানেরা এমন আজগুবী কথা বিশ্বাস করার মতো বোকা ছিল না।

নতুন রাজধানীর এই অবস্থানের ফলে প্রাচ্য-দেশসমূহ হতে নব নব ভাবের আগমন পথ খুলে যায়। আরবের জীবনবাদ ইরানী প্রভাবের নিকট নতি স্বীকার করে। খলীফা আর আরবের শেখের মত রইলেন না; তিনি ইরানী বাদশাহর মত স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেন। ক্রমে ইরানী উপাধি ইরানী শরাব, ইরানী পত্নী ও উপপত্নী, ইরানী সঙ্গীত ও ভাবধারা প্রধান্য বিস্তার করে। তাদের প্রভাবে আদিম আরব-জীবনের রুক্ষতা দূর হয় এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান অনুশীলনের এক নব যুগের দুয়ার খুলে যায়। কেবল দুই বিষয়ে আরবরা তাদের বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে সমর্থ হয় : ইসলামী রাষ্ট্রের ধর্ম এবং আরবী সরকারী-ভাষা রয়ে যায়।

নবম শতাব্দীর শুরুতে দুইজন বিশ্ববিখ্যাত সম্রাট ইতিহাসের দিগন্তে দেখা দেন! পাশ্চাত্যে শার্লেমেন আর প্রাচ্যে খলীফা হারুনর-রশীদ। এ দুইয়ের মধ্যে হারুন নিঃসন্দেহ রকমে অধিকতর শক্তিশালী ও উন্নততর সংস্কৃতির অধিকারী ছিলেন। স্বকীয় স্বার্থের খাতিরে এঁরা দুই জন বন্ধুত্ব-সূত্রে আবদ্ধ হন। শার্লেমেন হারুনের বন্ধুত্ব কামনা করেন এইজন্য, যাতে হারুন শার্লেমেনের শত্রু বাইজেন্টাইনদের সাহায্য না করেন। আবার হারুন শার্লেমেনের বন্ধুত্ব কামনা করেন এইজন্য, যাতে শার্লেমেন হারুনের বিপজ্জনক দুমশন স্পেনের উমাইয়াদের সাহায্য না করেন। কারণ, ইতিমধ্যে উমাইয়াদের এক শাখা স্পেনে এক মহাশক্তিশালী ও সমৃদ্ধ রাজ্য গড়ে তোলেন। পাশ্চাত্য লেখকদের মতে–এই দুই সম্রাট তাদের বন্ধুত্বের পরিচয় হিসেবে নিজেদের মধ্যে দূত ও উপহার আদান-প্রদান করেন। এ আমলের একজন ফিরিঙ্গী লেখককে কেউ কেউ । শার্লেমেনের সেক্রেটারীরূপে বর্ণনা করেছেন। ইনি বলেন যে, পাশ্চাত্যের মহান সম্রাটের দূত পারস্যের রাজা হারুনের নিকট হতে বহু দামী সওগাতসহ ফিরে এলেন। এ সওগাতের মধ্যে ছিল কাপড়-চোপড়, গন্ধ-দ্রব্য ও একটি হাতী। এ বিবরণে আরও পাওয়া যায় যে, এ সওগাতের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কাজ করা ঘড়ি ছিল। হারুন তার প্রদত্ত উপহারগুলির মধ্যে একটি অদ্ভুত বাদ্যযন্ত্র দিয়ে ছিলেন বলে যে কাহিনী প্রচলিত আছে, তা বহু মনোরম কাহিনীর মত সম্পূর্ণ অলীক। মূল বিবরণে ‘ক্লেপসিড্রা’ শব্দটির ভুল অনুবাদ হতে এ কাহিনীর উদ্ভব। শব্দটির আসল মানে হচ্ছে, পানির সাহায্যে সময় পরিমাপ করার একটি কৌশল। স্বভাবতঃ ঘড়িটি সম্পর্কেই এ শব্দ প্রযুক্ত হয়েছিল। হারুন বায়তুল মোকাদ্দেসের বড় গীর্জার চাবি শার্লেমেনের নিকট পাঠিয়েছিলেন বলে যে কাহিনী শুনা যায়, তা-ও ভিত্তিহীন। এইসব উপহার ও দূত বিনিময় নাকি হয় ৭৯৭ সাল হতে ৮০৬ সালের মধ্যে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এ সম্বন্ধে মুসলিম লেখকেরা একদম চুপ। অন্য বহু দূত ও উপহার বিনিময়ের কথা তারা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এ সম্বন্ধে একটি হরফও তারা উচ্চারণ করেন নাই।

হারুনের আমলে (৭৮৬-৮০৯) বাগদাদের বয়স পঞ্চাশেররা কম ছিল; অথচ এই স্বল্পপরিসর সময়ের মধ্যে বাগদাদ একদম শূন্য হতে মহা ঐশ্বর্যশালী ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে। সে যুগে এই-ই ছিল বাইজানটিয়ামের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। সাম্রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী বাগদাদেরও ঐশ্বর্য-মহিমা বেড়ে চলে। বাগদাদ হয়ে ওঠে এ দুনিয়ার অতুল্য নগরী।

হেরেম, খোঁজাদের আবাস, অন্যান্য আমলাদের ইমারতসহ খলীফার প্রাসাদ ‘গোল শহরের তিনভাগের একভাগ জুড়ে ছিল। প্রাসাদের মধ্যে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ছিল, তার মোলাকাত মহল। প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ গালিচা, পরদা, সোফা ইত্যাদিতে সুসজ্জিত থাকত এ মহলটি। খলীফার বেগম ছিলেন জোবায়দা আগের সম্বন্ধে চাচাতো বোন। পরবর্তী যুগের লোকেরা খলীফার জীবনকে যে গৌরব-মহিমায় মণ্ডিত করেছে, বেগম জোবায়দা তার আংশিক অধিকারিণী। মণি-মাণিক্য খচিত সোনা-রূপার বাসনপত্র ছাড়া অন্য বাসন জোবায়দার টেবিলে স্থান পেত না। তিনিই প্রথম তার জুতা বহুমূল্য মণি-মাণিক্যে খচিত করেন। কথিত আছে, হজ্ব করতে যাওয়া উপলক্ষে তিনি ত্রিশ লক্ষ দিনার ব্যয় করেন। এই অর্থের আংশিক ব্যয়ে বিশ মাইল দূরের এক নদী হতে খাল কেটে মক্কা শরীফে পানি আনা হয়।

সৌন্দর্যে জোবায়দার প্রতিদ্বন্দ্বিণী ছিলেন হারুনের সতেলা বোন উলাইয়া । উলাইয়ার কপালে সামান্য একটু দাগ ছিল। সেই দাগ ঢাকার জন্য উলাইয়া একটি জড়োয়া ফিতা ব্যবহার শুরু করেন। অল্পকাল মধ্যেই ফ্যাশন জগতে ‘আলা-উলাইয়া নামে এই ফিতার ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে।

খলিফার অভিষেক উৎসব, বিয়ে-শাদী, হজে গমন ও বিদেশী দূতদের অভ্যর্থনা ইত্যাদি বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে রাজকীয় ঐশ্বর্য ও ধূমধামের পূর্ণ আয়োজন হত। ৮২৫ সালে খলীফা মামুনের সঙ্গে তাঁর উজীর কন্যা আঠারো বছর বয়স্কা বুরানের বিয়ে হয়। এই বিয়ে উপলক্ষে এমন বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়িত হয় যে, তা সমসাময়িক আরবী সাহিত্যে অপরিমিত ব্যয়ের এক অবিস্মরণীয় কীর্তি হিসেবে স্থান পেয়েছে। নব-দম্পতি মণিমুক্তা খচিত এক সোনার পাটির উপর দাঁড়ান; একটি খাঞ্চা হতে অতুল্য আকারের এক হাজার মতি তাঁদের উপর ছিটিয়ে দেওয়া হয়। একটি বিরাট আকারের মোমবাতি রাতকে দিন করে রাখে। মেশকের বড় বড় গোলা-প্রত্যেক গোলার সঙ্গে আটকানো একটি টিকেট, সেই টিকেটে লেখা একটি জমিদারী, একটি গোলাম, কিংবা অনুরূপ মূল্যবান কোন বস্তুর নাম–আর সেই গোলা উপস্থিত শাহ্জাদা ও আমীর-রইসদের উপর বর্ষণ করা হয়। ৯১৭ সালে খলিফা মুক্তাদীর তার প্রাসাদে মহাধুমধামে সপ্তম কন্স্ট্যানটাইনের দূতগণকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করেন। যুদ্ধবন্দীর মুক্তি-মূল্য নির্ধারণ করার জন্য এ দূতগণ এসেছিলেন বলে মনে হয়। অভ্যর্থনার জন্য খলীফার পক্ষ হতে যেসব লোক সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, তার মধ্যে ছিল ১ লক্ষ ৬০ হাজার অশ্বারোহী ও পদাতিক, ৭ হাজার সাদা ও কালা খোঁজা এবং ৭ শ’ উচ্চপদস্থ আমলা। প্যারেডের সঙ্গে চলেছিল এক শ’ সিংহ আর খলীফার প্রাসাদে ঝুলেছিল ৩৮ হাজার পর্দা (তার মধ্যে ১২ হাজার ৫ শ পর্দা ছিল জরির কারুকার্য খচিত), আর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল ২২ হাজার গালিচা। দূতেরা, এমন চমৎকৃত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁরা প্রথমে প্রাসাদ অধ্যক্ষের কামরাকে, তারপর উজীরের কামরাকে খলীফার মোলকাত মহল বলে মনে করেছিলেন। তারা বিশেষ করে বিস্মিত হন দরাত-মহল দেখে। এই মহলে ৫ লক্ষ ড্রাম (প্রায় ২৯ মণ) ওজনের সোনা ও রূপায় তৈরী একটি গাছ ছিল। তার শাখায় শাখায় বসান ছিল সোনার তৈরী কৃত্রিম গায়ক পাখী। বাগানে গিয়ে তারা অবাক হয়ে দেখেন যে, কৃত্রিম উপায়ে কতকগুলি খেজুর গাছকে ছোট করা হয়েছে এবং তাতে থোকায় থোকায় ধরে আছে দুষ্প্রাপ্য জাতের খেজুর।

মুসলমান রাজা-বাদৃশাহদের মধ্যে হারুন অত্যন্ত বিলাসী ছিলেন। তার ও তাঁর পরবর্তী খলীফাদের অফুরন্ত বদান্যতার আকষর্ণ চুম্বকের আকর্ষণের মত রাজধানীতে কবি, বিদূষক, গায়ক, বাদক, নর্তক, লড়াইর মোরগ ও কুকুরের শিক্ষাদাতা এবং অন্যান্য নানা রকমের আনন্দ পরিবেশকরা এসে হাজির হত। কবি আবু-নুয়াস আর রশীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তাঁর অনেক নৈশ অভিসারের শরীক ছিলেন। তিনি এই গৌরবময় যুগের দরবারী জীবনের যে বিচিত্র বর্ণনা দিয়ে গিয়েছেন, তা অবিস্মরণীয়। আল-আগানীর গ্রন্থ এই গৌরবময় যুগের কাহিনীতে পরিপূর্ণ এবং সে কাহিনী হতে মূল সত্য উদ্ধার করা কঠিন নয়। এই কাহিনীর এক কাহিনীতে আমরা শুনতে পাই যে, হারুনর রশীদের পুত্র খলীফা আল-আমীন একদা অপরাহ্নে তার দরবারে বসে তার পিতৃব্য গায়ক ইব্রাহীমকে আবু-নুয়াসের কয়েকটি কবিতা আবৃত্তির জন্য তিন লক্ষ দিনার উপহার দেন। ইব্রাহীম খলীফার নিকট হতে ইতিপূর্বে যে ভাতা পেয়েছিলেন, এ দান তাঁর সঙ্গে যোগ করে মোট পরিমাণ দাঁড়ায়, দুই কোটি দেরহাম। কয়েকটি জিলার খাজনাতেই এ অর্থের সংকুলান হয়ে যেত। আল-আমীন তাইগ্রীস নদীতে মজলিস করার জন্য অনেকগুলি বজরা তৈয়ার করেছিলেন। এসব বজরার আকার নানারকম জীব-জন্তুর মত ছিল। একটি বজরা দেখিতে ছিল শুকোরের মত, একটি ছিল সিংহের মত, আর একটি ছিল ঈগল পাখীর মত। এর একটি তৈয়ার করতে খরচ হয় ৩০ লক্ষ দেরহাম। এই বিবরণে আমরা দেখতে পাই সারা রাত্রিব্যাপী অনুষ্ঠিত কোন একটি নাচের বিবরণ। খলীফা আল-আমীন নিজে হাজির থেকে এ নাচ পরিচালনা করেন অনেক সুন্দরী তরুণী এ নাচের উৎসবে যোগ দেয় এবং মৃদু গানের তালে তালে নাচে। উপস্থিতদের সকলেই গানে শরীক হয়। অন্য একজন গ্রন্থকার বলেন যে, আর-রশীদের ভাই ইব্রাহীম একদিন আর-রশীদকে দাওয়াত করেন। খলীফার সামনে মাছের যে পেয়ালা দেওয়া হয়, দেখা যায় সে পেয়ালায় মাছের টুকরা নেহায়েত ছোট ছোট। কারণ জিজ্ঞাসা করায় ইব্রাহীম বলেন যে, এগুলি কেবল মাছের জিভ এবং ঐ এক পেয়ালার ১৫০টি জিভ সগ্রহ করতে তার খরচ হয়েছে এক হাজার দেরহামের উপর। বর্ণনাকারীদের স্বাভাবিক অতিরঞ্জন বাদ দিলেও বাগদাদ দরবারের জাঁকজমক আমাদের গভীর বিস্ময়ের উদ্রেক করে।

বাগদাদের বহু মাইল-ব্যাপী জেটির ধারে যুদ্ধ-জাহাজ ও প্রমোদতরী সহ শত শত জলযান বাঁধা থাকত। তাদের মধ্যে চীনের জাঙ্কও দেখা যেত। আর ভেড়ার চামড়া ফুলিয়ে তৈরী ভেলাও দেখা যেত। শহরের বিভিন্ন বাজারে আসত-চীন হতে মাটির বাসন, রেশম ও কস্তুরী; ভারত হতে মসলা, খনিজ-দ্রব্য এবং রং; মালয় দ্বীপপুঞ্জ হতে লাল-পাথর ও কাপড়-চোপড়; মধ্য এশিয়ার তুর্কি-ভূমি হতে দাস-দাসী; স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও রাশীয়া হতে মধু, মোম এবং শেতাঙ্গ দাস-দাসী; পূর্ব-আফ্রিকা হতে হাতীর দাঁত, সোনা চূর্ণ এবং কৃষ্ণাঙ্গ দাস-দাসী। চীনা মালপত্র বিক্রির জন্য একটি খাস বাজার ছিল। সাম্রাজ্যের অন্তর্গত অঞ্চলসমূহ হতে জল-স্থল উভয় পথে আসত তাদের নিজস্ব উৎপন্ন দ্রব্য। মিসর হতে ধান, গম, যব এবং পট্টবস্ত্র; সিরিয়া হতে কাঁচ, ধাতব-দ্রব্য ও ফল; আরব হতে কিংখাব, মতি ও অস্ত্র-শস্ত্র এবং পারস্য হতে রেশম, আতর এবং শাক-সঞ্জী।

বাগদাদ ও অন্যান্য রানী কেন্দ্র হতে আরব সওদাগরেরা কাপড়-চোপড় জওয়াহিরাত, ধাতব আয়না, কাঁচের গুটিকা এবং মসলা নিয়ে দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং আফ্রিকায় চলে যেত। রাশীয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও জার্মানীর মত সুদূর উত্তরে ইদানীং যেসব আরব-মুদ্রার গুপ্তভাণ্ডার পাওয়া গিয়েছে, তা থেকে এ যুগের এবং এর পরবর্তী যুগের মুসলমানদের দুনিয়া-জোড়া সওদাগরীর পরিচয় পাওয়া যায়। আরব্য উপন্যাসে বণিক সিন্দাবাদের কাহিনীটি একান্ত সুপরিচিত। এই কাহিনীতে যে সব দুঃসাহসী কাজের বর্ণনা আছে, আরব বণিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতাই যে তার বুনিয়াদ, এ কথা অনেক কাল হতে বহুজনে স্বীকার করে আসছেন।

বাগদাদের সমাজে সওদাগরদের একটা বিশিষ্ট স্থান ছিল। আজকের মত তখনো আলাদা আলাদা জিনিসের ব্যবসায়ীদের আলাদা আলাদা বাজার ছিল। গলী জীবনের একটানা সুর ভঙ্গ করে মাঝে মাঝে চলতো বিয়ে অথবা ত্বক ছেদনের উৎসবের শোভাযাত্রা। চিকিৎসক, উকিল, শিক্ষক, লেখক, এবং অনুরূপ শ্রেণীর অন্যান্যরা সমাজে উচ্চ স্থান দখল করতে শুরু করেন। একজন জীবনী লেখক জনৈক বুদ্ধিজীবীর দৈনিক কাৰ্যসূচীর একটা বর্ণনা রেখে গেছেন। তা দেখে মনে হয়, তৎকালীন বাজারে বুদ্ধিজীবীদের বেশ দাম ছিল। আমরা দেখতে পাই যে, এই বিদ্বান মানুষটি রোজ ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে যান, তারপর সরকারী গোসলখানায় প্রবেশ করেন। সেখানে চাকরেরা তার উপর পানি ঢেলে দেয়। গোসলখানা হতে বের হয়ে তিনি আরামের পোশাক পড়েন, একটু শরবত পান করেন, একটা বিস্কুট মুখে দেন এবং বিছানায় গড়ান; হয়তো ঘুমিয়ে পড়েন। এই দিবা-নিদ্রা অন্তে তিনি নিজ দেহকে সুবাসিত করার জন্য গন্ধদ্রব্য পোড়ান এবং মধ্যাহ্নের খানা হাজির করার হুকুম দেন। সে খানায় সাধারণতঃ থাকে রুয়া, মুরগীর বাচ্চা ও রুটি। এরপর তিনি ফের ন্দ্রিা যান। ঘুম ভাঙ্গলে উঠে পান করেন চার বোতল পুরোনো শরাব এবং সঙ্গে কখনো কখনো সিরিয়া দেশের দুই চারটে ছেব নাশপতি খান।

বিলাস-ঐশ্বর্যময় জীবন এ যুগকে ইতিহাস ও উপন্যাসের নিকট প্রিয় করে তোলে। কিন্তু এ যুগকে দুনিয়ার ইতিহাসে অমর করে রেখেছে এক জ্ঞানাত্মক জাগরণ। এ জাগরণ কেবল ইসলামের ইতিহাসে নয়–চিন্তা ও সংস্কৃতির সমগ্র ইতিহাসের মধ্যে এ ছিল এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এ জাগরণের প্রধান হেতু ছিল বিদেশী প্রভাব : কতকটা ইন্দো-পারসিক এবং সিরীয়, কিন্তু প্রধানতঃ হেলেনিক। এ নব-জীবনের সাধনার এক বিশিষ্ট লক্ষণ ছিল ফারসী, সংস্কৃত, সিরিয়াক এবং গ্রীস হতে আরবী ভাষায় অনুবাদ। আরবরা অতিসামান্য নিজস্ব সাহিত্য, বিজ্ঞান বা দর্শন নিয়ে তাদের নতুন জাতীয় জীবনে যাত্রা শুরু করে; কিন্তু তারা মরুভূমি হতে নিয়ে আসে জ্ঞানাত্মক কৌতূহলের এক সুতীক্ষ্ণ বোধশক্তি ও বহু অন্তর্নিহিত বিশিষ্ট গুণ এবং অল্পকাল মধ্যেই তারা বিজিত কিংবা লড়াইর ময়দানে পরিচিত পুরোনো ও উন্নততর সংস্কৃতিবান জাতিসমূহের উত্তরাধিকারী হয়ে বসে। সিরিয়া সভ্যতা পরবর্তী গ্রীক সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। আরবের মুসলমানরা সিরিয়ায় গিয়ে এই গ্রীক প্রভাবিত সিরীয় সভ্যতা গ্রহণ করে। তেমনি ইরাকে গিয়ে তারা ইরান প্রভাবিত ইরাকী সভ্যতা গ্রহণ করে। বাগদাদ নগর স্থাপনের মাত্র পঁচাত্তর বছরের মধ্যে আরবী পাঠক-জগত আপন আয়ত্তে এনে নেয় আরাস্তুর প্রধান প্রধান দর্শন-গ্রন্থ, বড় বড় নিও প্ল্যাটনিক ভাষ্যকারদের গ্রন্থ, গ্যালেনের অধিকাংশ চিকিৎসা গ্রন্থ এবং পারসিক ও ভারতীয় বৈজ্ঞানিক গ্রন্থাবলী।–যার বিকাশ সাধন করতে গ্রীকদের বহু শতাব্দী কেটে গিয়েছিল, আরবরা কয়েক দশকের মধ্যেই তা আত্মস্থ করে নেয়। ইসলামের মূল প্রকৃতিতে ছিল মরুর প্রভাব ও আরব জাতীয়তার পরিচয়-চিহ্ন। গ্রীক ও পারস্য সভ্যতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আত্মস্থ করার ফলে ইসলাম তার আদি প্রকৃতির অধিকাংশ হারিয়ে ফেলে; কিন্তু এই পথে ইসলাম মধ্যযুগীয় সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। এই মধ্যযুগীয় সভ্যতা তৎকালে দক্ষিণ ইউরোপ ও নিকট-প্রাচ্যের মধ্যে যোগসূত্র ছিল। মনে রাখতে হবে, এ সভ্যতার খোরাক জোগাত একটি মাত্র স্রোতধারা। এ স্রোতধারা প্রাচীন মিসর, ব্যাবিলনীয়া, ফিনিশীয়া এবং জুড়ীয়া হতে উৎপন্ন হয়ে চলে গিয়েছিল গ্রীসে এবং এই সময়ে হেলেনিজম-এর রূপ গ্রহণ করে প্রায় ফিরে আসছিল। আমরা পরে দেখতে পাব, কিরূপে স্পেন ও সিসিলীতে এই স্রোতধারা ইউরোপীয় রেনেসাঁর সূচনা করে এবং আরবরা কিরূপে স্পেন ও সিসিলীর ভিতর দিয়ে একে ফের ইউরোপে পাঠিয়ে দেয়।

প্রাথমিক যুগেই আরবের মুসলমানেরা পাক-ভারত হতে প্রচুর প্রেরণা লাভ করে। জ্ঞান, ধর্ম, সাহিত্য ও গণিতেই এ প্রেরণা বিশেষ কার্যকরী হয়। ৭৭৩ সালে একজন পাক-ভারতীয় ভ্রমণকারী বাগদাদে আসেন এবং গ্রহ বিজ্ঞান বিষয়ক একখানি গ্রন্থ খলীফার নিকট উপস্থাপিত করেন। খলীফার আদেশে আল-ফাজারী গ্রন্থখানি আরবীতে অনুবাদ করেন। অবশ্য মরুভূমিতে বাস করার কালেই গ্রহ-নক্ষত্র আরবদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে; কিন্তু এই সময়ের পূর্বপর্যন্ত তাদের মধ্যে ওসবের কোন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হয় নাই। নামাযের কিবলা কোন্ দিকে হবে, তা ঠিকমত নির্ণয়ের জন্য ইসলাম গ্রহ-বিজ্ঞান অধ্যয়নে উৎসাহ দান করে। সুবিখ্যাত আল খাওয়ারিজমী ৮৫০ সালে ইন্তিকাল করেন। তিনি আল-ফাজারীর গ্রন্থকে ভিত্তি করে গ্রহ-বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর বহুবিশ্রুত নির্ঘণ্টগ্রন্থ প্রণয়ন করেন গ্রীক এবং পাক-ভারতীয় গ্রহ-বিজ্ঞানের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধান ও তাঁর নিজস্ব অবদানে উক্ত বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেন। ইউরোপীয়রা যে সংখ্যাকে বলে আরবীয় আর আরবরা পাক-ভারতীয়, সে সংখ্যাও মুসলিম জগতে প্রবেশ করে ঐ একই পাক-ভারতীয় ভ্রমণকারীর নীত একটি গণিত গ্রন্থ মারফত। পরবর্তীকালে নবম শতাব্দীতে আরব গণিত-বিজ্ঞান–পাক-ভারতীয়দের আরো একটি অবদানে সমৃদ্ধ হয়। গাণিতিক জগতের এ অবদান হচ্ছে, দশমিক রীতি।

আরবদের ‘উর্বর হেলাল’ বিজয়কালে তাদের হাতের কাছে গ্রীসের জ্ঞানাত্মক উত্তরাধিকারই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান ভাণ্ডার। সুতরাং, আরব-জীবনে সমস্ত বৈদেশিক প্রভাবের মধ্যে হেলেনিজমই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব হয়ে দাঁড়ায়।

আল-মামুনের আমলে এই গ্রীক প্রভাব তার চরম সীমায় গিয়ে পৌঁছে। আল-মামুনের চরিত্রে যুক্তিপ্রবণতার ঝোঁক ছিল। ধর্ম-শাস্ত্রের কথার সঙ্গে যে যুক্তির মিল থাকতে হবে, তাঁর এই মতের সমর্থনের জন্য তিনি গ্রীক-দর্শনের আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন। ৮৩০ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘জ্ঞান-নিকেতন স্থাপন করেন। এ প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার, তত্ত্বমূলক আলোচনার কেন্দ্র ও অনুবাদ সংঘের সমাবেশ ছিল। খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধে আলেকজান্দ্রিয়ায় যে যাদুঘর স্থাপিত হয়, তারপর জ্ঞান-নিকেতনের মত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আর একটিও স্থাপিত হয় নাই। এই সময়ের আগ পর্যন্ত খৃষ্টান, মুসলমান ও নও মুসলিমরা নিজ নিজ মরজী মোতাবেক বিক্ষিপ্তভাবে কিছু বই অনুবাদ করে আসছিলেন। আল-মামুনের সময় হতে শুরু করে তার কাছাকাছি পরবর্তীদের কাল পর্যন্ত অনুবাদের কাজ প্রধানতঃ জ্ঞান-নিকেতনকে কেন্দ্র করেই চলতে থাকে। আব্বাসীয় অনুবাদ-যুগ-৭৫০ সাল হতে প্রায় একশ’ বছর পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল। অনুবাদকদের বেশির ভাগেরই মাতৃভাষা ছিল আরামেইক (সিরিয়াক)। সেই জন্য অনেক গ্রীক গ্রন্থ প্রথমে আরামেইক ভাষায় অনূদিত হয়–তারপর অনূদিত হয় আরবী ভাষায়। যীশুখৃস্ট আরামেইজ ভাষায় কথাবার্তা বলতেন।

আরবীতে যারা অনুবাদ করতেন, তাঁরা সাহিত্য ও ধর্ম গ্রন্থের খোঁজ-খবর নেন নাই । গ্রীক নাটক, গ্রীক কবিতা এবং গ্রীক ইতিহাস–এসবের সঙ্গে আরব মনের কোন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্থাপিত হয় নাই। এ ক্ষেত্রে পারস্যের প্রভাবই সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ছিল। আফলাতুন ও আরাস্তুর দ্বারা উদ্ভাবিত এবং পরবর্তী নিও-প্ল্যাটোনিস্টদের দ্বারা ব্যাখ্যাত গ্রীক দর্শন নিয়েই মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান আবিষ্কারের যাত্রা শুরু করে!

আরবরা হুনাইন ইবনে-ইসহাককে (৮০৯-৮৭৩) বলে অনুবাদকদের শেখ। ইনি সে জামানার সবচেয়ে বড় পণ্ডিত এবং চরিত্রে সবচেয়ে মহান ছিলেন। হুনাইন হীরাবাসী একজন নেস্টোরীয়ান খৃস্টান ছিলেন। যৌবনকালে ইনি এক ডাক্তারের দোকানে কম্পাউন্ডারের চাকরী গ্রহণ করেন। একদিন তার মনিব শ্লেষের সঙ্গে বলেন, হীরার বাসিন্দাদের চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ নাই; তুমি বরং বাজারে গিয়ে টাকা ভাঙ্গানোর পেশা শুরু কর। বালক মনিবের এই তিরস্কারের প্রতিবাদস্বরূপ সাশ্রু-নয়নে চাকরী ছেড়ে আসেন ও গ্রীক ভাষা শিক্ষার জন্য সংকল্প করেন। কথিত আছে, হুনাইন গ্যালেন, হিপোক্রাটস্ এবং ডায়োস্ কোরাড়ীসের বই অনুবাদ করেন। এ ছাড়া, আল্লাতুলেন রিপাবলিক’ এবং আরাস্তুর ক্যাটিগরী ফিজিক্স ও ম্যাগনা মরালীয়া’রও অনুবাদ করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল, গ্যালেনের প্রায় সমস্ত বৈজ্ঞানিক গ্রন্থেরই আরবীতে অনুবাদ। গ্যালেনের দেহ-বিজ্ঞান বিষয়ক সাতখানি বইয়ের মূল গ্রীক গ্রন্থ হারিয়ে গেছে; সৌভাগ্যক্রমে তা আরবী অনুবাদে রক্ষিত হয়েছে। হুনাইন গ্রীক সেপটুয়াজিন্ট হতে আরবীতে ওল্ড টেস্টামেন্টের যে অনুবাদ করেন, তা এখন আর পাওয়া যায় না।

হুনাইন যে সুদক্ষ অনুবাদক ছিলেন, তার সমর্থনমূলক প্রমাণ আছে। তিনি এবং অন্যান্য অনুবাদকেরা মাসে ৫ শত দিনার (১২ শত ডলার বা ৪ হাজার টাকার মত) পেতেন। উপরন্তু আল-মামুন তাঁর অনূদিত গ্রন্থ ওজন করে তাকে সেই পরিমাণ সোনা দিতেন। কিন্তু কেবল অনুবাদক হিসেবে তাঁর গৌরব ছিল; তিনি তাঁর গৌরবের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেন তখন, যখন খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিল তাকে ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিযুক্ত করেন। একবার খলীফা তাঁর জনৈক দুশমনের জন্য হুনাইনকে একটা গোপন বিষয় তৈরি করে দিতে বলেন। হুনাইন অস্বীকার করেন। ফলে খলীফা তাঁকে এক বছর জেলে আটক রাখেন। খলীফার সামনে এনে মৃত্যুর ভয় দেখালে তিনি উত্তর দেন : মানুষের পক্ষে যা হিতকর, আমি কেবল তাই শিখেছি–অন্য কিছু শিখি নাই। খলীফা বলেন : ‘আমি কেবল তোমার সততা পরীক্ষা করছিলাম। এখন বল, কি জন্য তুমি মারাত্মক বিষ তৈরি করতে অস্বীকার করলে?’ হুনাইন উত্তরে বলেন : দুই বস্তু আমাকে এ কাজ করতে বাধা দেয় । এক-আমার ধর্ম, অন্য–আমার পেশা। আমার ধর্ম বলে যে, আমাদের শত্রুরও আমাদের উপকার করা উচিত; বন্ধুর উপকার তো আরো বেশি করা কর্তব্য। আর আমার এ চিকিৎসা পেশার প্রবর্তনই হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য তাদের রোগ আরোগ্যের কাজেই এর, কর্তব্য সীমাবদ্ধ। তাছাড়া, প্রত্যেক চিকিৎসকই প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ যে, সে কখনো কাউকে মারাত্মক বিষ দিবে না।

চিকিত্সাশাস্ত্রের একজন আধুনিক ফরাসী ঐতিহাসিকই বলেন যে, হুনাইন নবম শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ ছিলেন।

তরজমার জামানা খতম হয়ে আসার আগে আরাস্তুর প্রচলিত প্রায় সমস্ত গ্রন্থই আরবী পাঠকদের আয়ত্তে আসে। তার নামে প্রচলিত এই সব বইয়ের । অনেকগুলি অবশ্য মেকী ছিল। এইসব যখন ঘটে, তখন ইউরোপ গ্রীক চিন্তা ও বিজ্ঞান সম্বন্ধে প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। কারণ, যখন আর-রশীদ আর আল-মামুন গ্রীক ও পারসিক দর্শন নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত, সেই সময় তাঁদের পাশ্চাত্য সমসাময়িক শার্লেমেন ও তার লর্ডরা নাকি তাদের নাম দস্তখত শিখতে খেটে মরছিলেন। ইসলামে মানব-প্রতিমূলক অধ্যয়নের অঙ্গ হিসেবে শীঘ্রই আরাস্তুর তর্ক-শাস্ত্র বিষয়ক অর্গানন এবং পফিরীর ইসাগোণ’ আরবী-ব্যাকরণের পাশে স্থান গ্রহণ করে। আরবী অনুবাদে আরাস্তুর অলঙ্কার ও কাব্য শাস্ত্র তাঁর অরগাননের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আজ পর্যন্তও এই রীতিই চলে আসছে। নিও প্ল্যাটোনিক ভাষ্যকারদের মতে আফলাতুন ও আরাস্তুর বাণী যে মূলতঃ এক, মুসলমানরা সে অভিমত গ্রহণ করে। নিও-প্ল্যাটোনিজমের প্রভাব বিশেষ করে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে সুফী মতবাদের মধ্যে। আমরা পরে দেখতে পারব যে, আরব পণ্ডিতদের–বিশেষ করে আবু আলী সীনা ও ইবনে রুশদের মারফত আরাস্তুর ও আফলাতুনের মতবাদ ল্যাটিনে প্রবেশ লাভ করে এবং ইউরোপের মধ্যযুগীয় সূক্ষ্ম চিন্তা-ধারার উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।

আব্বাসীয় আমলের এই দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অনুবাদ-যুগের পর আসে মৌলিক অবদানের যুগ। আমরা এর পরের এক অধ্যায়ে সে সম্বন্ধে আলোচনা করব। প্রাক-ইসলামী যুগে আরবী ছিল কবিতার ভাষা–হযরত মুহম্মদের (সঃ) পর প্রধানতঃ প্রত্যাদেশ ও ধর্মের ভাষা; দশম শতাব্দীতে একান্ত বিস্ময়কররূপে সেই ভাষা বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও দার্শনিক ভাব-প্রকাশের মোলায়েম মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে কূটনীতি ও সৌজন্যের ভাষা হিসেবে আরবী মধ্য এশিয়া হতে সমস্ত উত্তর আফ্রিকার মধ্য দিয়ে স্পেন পর্যন্ত নিজকে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই সময় হতে আজ পর্যন্ত ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর, তিউনিসিয়া, আলজিরিয়া ও মরক্কোর বাসিন্দারা আরবী ভাষায় তাদের মহত্তম চিন্তা প্রকাশ করে আসছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *