আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ)

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ)
আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ১৩. চারু শিল্প

চারু শিল্প

সেমিটিক মনের অধিকারী আরব। কবিতার মত চারু-শিল্পের সে বস্তুর বিভিন্ন খণ্ড ও অন্তর্নিহিত আদর্শের দিকে নজর দিয়েছে বেশী–সমস্ত খণ্ডকে মিলিয়ে এক সুসমঞ্জস অখণ্ড সৃষ্টিতে তার ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া গেছে কম। তবে বিজ্ঞানে যেমন সে খানিক দূর অগ্রসর হয়ে তার থেমে যায়–ভাস্কর্য শিল্পে, বিশেষ করে চিত্র-শিল্পে তেমন ঘটে নাই।

ভাস্কর্য শিল্পের যে-সব অতুল্য অবদান একদিন বাগদাদের শোভা বর্ধন করত, আজ তার কোন চিহ্নই অবশিষ্ট নাই। মুসলিম ভাস্কর্য-প্রতিভার দুটি অমর সৃষ্টি এখনো বেঁচে আছে? এ দুটি হচ্ছে, দামেস্কের মহান মসজিদ আর বায়তুল মোকাদ্দেসের প্রস্তর গম্বুজ। কিন্তু এ দুটিই আরো আগের জামানার কীর্তি। সেকালের বাগদাদের অদ্ভুত জাকজমকের কথা আমরা জানি; কিন্তু খলীফা আল আমিন ও আল-মামুনের গৃহযুদ্ধ, ১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের অনুষ্ঠিত ধ্বংসলীলা এবং স্বাভাবিক কারণ–সমস্ত মিলে শহরটির এমনি পরিপূর্ণ বিনাশ সাধন করেছে যে, আজ সে প্রাসাদসমূহের অবস্থান-ভূমি পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

আল-মুতাওয়াক্কিলের আগ পর্যন্ত বাগদাদের বাইরের কোন বিধ্বস্ত আব্বাসীয় কীর্তির আনুমানিক তারিখ নির্ণয় কঠিন। মুতাওয়াক্কিল (৮৪৭ ৮৬১) সামাররার বিরাট মসজিদের নির্মাতা। এই জামে মসজিদটি ৭ লক্ষ দিনার খরচ করে তৈরী করা হয়। আকারে মসজিদটি চৌকোণ ছিল; এর জানালার বিচিত্র খিলান পাক-ভারতীয় প্রভাবের কথা মনে করিয়ে দেয়। অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগের যেসব আব্বাসীয় ভগ্ন-কীর্তি রাককায় পাওয়া যায়, তা এবং সামাররায় প্রাপ্ত কীর্তি-চিহ্ন এশিয়ার বিশেষ করে পারসিক ভাস্কর্য-রীতির ঐতিহ্যের পরিচায়ক। উমাইয়া ভাস্কর্য-রীতি কিন্তু বাইজেন্টাইন-সিরিয়ান ঐতিহ্যের সুস্পষ্ট পরিচয় বহন করে।

আমরা আগেই বর্ণনা করেছি যে, একজন খলীফা তার প্রাসাদশীর্ষে একটি বর্শাধারী অশ্বারোহী মূর্তি স্থাপন করেন। এ মূর্তি হয়তো দিক-নির্দেশক যন্ত্রের কাজ করত। আর একজন খলীফা তাইগ্রিস বক্ষে প্রমোদ-বিহারের জন্য সিংহ, ঈগল ও শুশুক মূর্তির বজরা তৈরী করেন; এবং আরো একজন খলীফা তাঁর প্রাসাদের বিরাট পুকুরে সোনা-রূপায় তৈরী আঠারোটি শাখামুক্ত এক গাছ স্থাপন করেন। পুকুরের দুই পারে কিংখাবের পোশাক পরিহিত অশ্বারোহীর মূর্তি ছিল; তারা বর্শা হাতে নিয়ে এমনভাবে নড়াচড়া করত, যেন লড়াইয়ে মেতে আছে।

সামাররার নির্মাতা খলীফা আল-মুতাসীমের প্রাসাদ-দেয়াল নারীমূর্তি এবং শিকারের দৃশ্যে সজ্জিত ছিল। এগুলি হয়তো ছিল কোন খৃস্টান শিল্পীর কাজ। তার পরবর্তী দ্বিতীয় খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিলের আমলে এই অস্থায়ী রাজধানী সামাররা উন্নতির শিখরে আরোহণ করে। আল-মুতাওয়াক্কিল তার প্রাসাদ প্রাচীরের রূপসজ্জার জন্য বাইজেন্টাইন চিত্রকর নিযুক্ত করেন। তারা নানা, চিত্রের মধ্যে পাদ্রীসহ একটি গীর্জার চিত্র সে সজ্জার অন্তর্ভুক্ত করতে দ্বিধাবোধ করেন নাই।

মুসলিম-জগতে চিত্র-বিদ্যাকে জোর করে কাজে লাগানো হয়েছে অনেক দেরীতে। বৌদ্ধ ও খৃস্টান-জগতে চিত্র-বিদ্যা যেমন সম্পূর্ণরূপে ধর্মের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে, মুসলিম-জগতে তেমন কখনো ঘটে নাই। জনৈক আরব ভ্রমণকারী নবম শতাব্দীর শেষভাগে চীনের দরবারে মহানবীর একটি ছবি দেখেন। এর আগের আর কোন ছবির দলীল নাই। তবে এ ছবি হয়তো নেস্টোরীয়ান খৃস্টানদের আঁকা ছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর প্রারম্ভের আগে মুসলিম ধর্মীয় ছবি পূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করে নাই। স্পষ্টই মনে হয়, প্রাচ্যদেশীয় খৃষ্টান গীর্জা বিশেষ করে জ্যাকোবাইট ও নেস্টোরীয়ান খৃস্টানদের নিকট হতেই এ আদর্শ গ্রহণ করা হয়।

আরবরা পারসিক সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত। পারসিকরা অতি প্রাচীনকালেই রং ও রূপ-সজ্জামূলক পরিকল্পনায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করে। তাদের চেষ্টায় ইসলামে ব্যবসায়গত চিত্র-শিল্প যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে। ফেরাউনীয় যুগের মিসরে গালিচা-শিল্পের সূচনা হয়। পারসিকদের হাতে এ শিল্পের অসাধারণ বিকাশ লাভ হয়। কম্বলের উপর সাধারণতঃ শিকার ও বাগানের ছবি আঁকা হত; রং পাকা করার জন্য তারা ফিটকারী ব্যবহার করত। মিসর ও সিরিয়ার হস্তচালিত তাঁতে যে সব কারুকাজ করা রেশমী কাপড় উৎপন্ন হত, ইউরোপে তার কদর এত বেশী ছিল যে, ক্রুসেডার ও পাশ্চাত্যের ঋষি-দরবেশদের মাজার ও পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন ঢাকার জন্য এই কাপড়কেই সর্বাগ্রগণ্য মনে করা হত।

মৃৎ-শিল্প মিসর ও সুসার মতই প্রাচীন। মাটির বাসনের এ শিল্পে সৌন্দর্য বিধানের কাজে মুসলমানেরা যে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করে, তার চেয়ে অধিক দক্ষতা তারা আর কোন শিল্পেই করে নাই। বাসনের গায়ে তারা মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা এবং জ্যামিতিক চিত্র আঁকত–কখনো-বা লিখত উদ্ধৃত কবিতা। চিত্রিত কাশানী টাইল’ পারস্য হতে দামেস্কে আমদানী হয়। দালান কোঠার ভিতর এবং বাইর সাজানোর জন্য এই টাইল ও মোজাইক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত। আরবী বর্ণমালার হরফ অবলম্বন করেও একটি সুন্দর আর্টের সৃষ্টি হয়। বাস্তবিক, ইসলামী চিত্র-শিল্প আরবী হরফ থেকে যথেষ্ট প্রেরণা লাভ করে। এমনকি আরবী হরফ চিত্রণ ধর্মের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। যেসব শহরে ইনামেল করা ও কাঁচে সোনালী রং করার কাজ পূর্ণ বিকাশ লাভ করে, তার মধ্যে এনটিওক, আলেপ্পো, দামেস্ক এবং প্রাচীন ফিনিশীয় শহরের মধ্যে টায়ার ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লুভার, বৃটিশ মিউজিয়াম ও কায়রোর আরব মিউজিয়ামের বহু অমূল্য সংগ্রহের মধ্যে আছে সামাররা ও ফুসতাত হতে আনীত বাসন, পেয়ালা, ফুলদানী, সোরাহী এবং বাতিদানী (বাড়ী ও মসজিদ উভয় স্থানে ব্যবহারের জন্য)। অদ্ভুত উজ্জ্বল রঙে এগুলি চিত্রিত। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন তাতে ফুটে উঠছে রামধনুর পরিবর্তনমান রঙের সুন্দর আভা।

দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় হিজরীতে লিপি-শিল্পের উদ্ভব হয়। এ শিল্পে কোরআনের অনুমোদন ছিল। আর এর উদ্দেশ্যও ছিল আল্লাহর কালামকে রূপ দেওয়া। কাজেই অনতিকাল মধ্যেই এ একটা স্বতন্ত্র মর্যাদা এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ ছিল সম্পূর্ণ ইসলামী আর্ট এবং চিত্র-শিল্পের উপর এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। জীবন্ত কোন সৃষ্টির ছবি আঁকতে পারত না বলে মুসলমানদের সৌন্দর্য-পিপাসা এই খাতে প্রবাহিত হয়।

চিত্রশিল্পীর চেয়ে লিপি-শিল্পী উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী ছিল। রাজা বাদশাহরা পর্যন্ত কোরআন নকল করে সওয়াব হাসিলের চেষ্টা করতেন। সাহিত্য ও ইতিহাস বিষয়ক আরবী গ্রন্থে কতিপয় লিপি-শিল্পীর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু ভাস্কর্য-শিল্পী, চিত্রশিল্পী ও ধাতু-শিল্পীদের সম্পর্কে সেসব গ্রন্থ নিশ্চুপ। লিপি-শিল্পই একমাত্র আরব আর্ট, যার অনুশীলনে ইস্তাম্বুল, কায়রো, বৈরুত এবং দামেস্কে আজো খৃষ্টান ও মুসলমান উভয় শ্রেণীর বহু শিল্পী ব্যাপৃত রয়েছেন। তাদের হাতের কাজ রুচি ও সৌন্দর্যে প্রাচীনকালের যে কোন শ্রেষ্ঠ শিল্পের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর। কোরআনের সঙ্গে যোগ থাকার ফলে কেবল লিপি-শিল্পই নয়, বিচিত্র রং ও চিত্রে বইয়ের অঙ্গ-সজ্জা ও বই বাঁধানোর সংশ্লিষ্ট শিল্পও যথেষ্ট বিকাশ লাভ করে। শেষ জামানার আব্বাসীয়দের অধীনে বই চিত্রিত করার শিল্প হয়, ইহা পঞ্চদশ শতাব্দীতে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করে।

শাস্ত্রকারদের সঙ্গীত সম্পর্কিত আপত্তি দামেস্কে যেমন কার্যকরী হয় নাই, বাগদাদেও তেমনি কার্যকরী হয় নাই। হারুনর রশীদের মার্জিত ও জমকালো দরবার সাহিত্য ও বিজ্ঞানের যেমন পৃষ্ঠপোষকতা করে, কণ্ঠ ও যন্ত্র-সঙ্গীতেরও তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা করে। কার্যতঃ সে দরবার আলা দরজার সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদদের একটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে। গোলাম-বাঁদী, গায়ক-গায়িকাসহ বহু বেতনভোগী ওস্তাদ দরবারের সাহায্যে মান ইজ্জতের সঙ্গে বাস করত। এদেরই অবলম্বন করে বহু অদ্ভুত উপাখ্যান সৃষ্টি হয়ে আরব্য উপন্যাসে স্থান লাভ করে। খলীফার পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত একটি উৎসবে দুই হাজার গায়ক অংশগ্রহণ করে। তার পুত্র আল-আমিন অনুরূপ একটি নৈশ উৎসবের ব্যবস্থা করেন। সে উত্সবে তার প্রাসাদের আমলারা নর-নারী নির্বিশেষে ভোর পর্যন্ত নৃত্য করে।

সে আমলের গায়কদের বৈশিষ্ট্যের নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়, মুখারিকের মধ্যে। মুখারিক হারুনর-রশীদের আশ্রয়ে বাস করত। আদতে সে ছিল এক কশাইয়ের ছেলে। অল্প বয়সে একদা সে পিতার দোকানে বসে ‘গোশত চাই’ চাই ভালো গোশত ইত্যাদি বলে চীৎকার করছিল। তার সুন্দর ও শক্তিমান গলা শুনে একজন গায়িকা তাকে কিনে নেয়। পরবর্তীকালে সে হারুনর রশীদের আয়ত্তে এসে পড়ে। হারুন তাকে আযাদ করে একলক্ষ দিনার উপহার দেন এবং তার নিজ পাশে তাকে স্থান দিয়ে তার ইজ্জত বাড়িয়ে দেন। একদা সন্ধ্যায় সে তাইগ্রিস নদীর বুকে গিয়ে ছেড়ে গান শুরু করে। তখনই দেখা যায় যে, বাগদাদের অলি-গলির চারদিক হতে প্রদীপ হাতে বহু লোক তার গান শোনার জন্য উতলা হয়ে ছুটে আসছে।

মুখারিক ও অন্যান্য বহু গুণী মানুষ সে উন্নতির যুগে খলীফাদের সাথী হিসেবে অমরত্ব অর্জন করেন। কিন্তু এঁরা কেবল গানের ওস্তাদ ছিলেন না, আরো কিছু ছিলেন। এঁদের তীক্ষ্ণ রস-জ্ঞান ও প্রবল স্মরণশক্তি ছিল। এঁরা বহু বাছা বাছা কবিতা ও রসাল উপাখ্যান বলতে পারতেন। এঁরা তল্কালীন জ্ঞান বিজ্ঞানের সঙ্গে সুপরিচিত গায়ক, রচক, কবি এবং পণ্ডিত ছিলেন। গুরুত্বের দিক দিয়ে এরপরই স্থান ছিল বাদকদের। বীণা সবচেয়ে লোক-প্রিয় ছিল। বেহালা (ভায়োল) সাধারণতঃ নিম্নস্তরের বাদকরা বাজাত। তারপর স্থান ছিল গায়িকা বালিকাদের। এরা প্রায়শঃ পরদার আড়ালে থেকে গাইত। এ শ্রেণীর গায়িকা বালিকারা ক্রমে হেরেমের অপরিহার্য সৌন্দর্যের প্রতীকরূপে পরিগণিত হয়। এদের লালন ও শিক্ষা দান এক লাভজনক শিল্প হয়ে দাঁড়ায়। এমন একটি বালিকার জন্য মিসরের গভর্নর ৩০ হাজার দিনার দিতে চেয়ে দূত পাঠান; বাইজেন্টাইন সম্রাটের এক প্রতিনিধি ঐ পরিমাণ অর্থ দিতে চান; খোরাসানের গভর্নর দিতে স্বীকার করেন ৪০ হাজার দিনার। বাদীর মালিক সবাইকে হার মানিয়ে তাকে আযাদী দিয়ে সাদী করেন।

আব্বাসীয়দের সোনার যুগে বহু গ্রীক গ্রন্থ আরবীতে অনূদিত হয়। তাঁর মধ্যে কয়েকটি ছিল সঙ্গীতের তত্ত্বমূলক গ্রন্থ। এইসব গ্রন্থ হতেই আরবরা সঙ্গীত সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব লাভ করে এবং দেহের উপর শব্দ কি ক্রিয়া করে, সে সম্বন্ধে অবহিত হয়। কিন্তু সঙ্গীতের ব্যবহারিক ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণভাবে আরব-আদর্শের উপর নির্ভর করে। এর কাছাকাছি সময়ে আরবরা গ্রীক ভাষা হতে ‘মিউজিকী’ পরে (মিউজিকা–মিউজিক) শব্দটি ধার করে এনে সঙ্গীত বিজ্ঞানের কেবল তত্ত্বমূলক ভাগের জন্য ব্যবহার শুরু করে ব্যবহারিক ভাগের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে পুরোনো আরবী শব্দ ‘গীনা।’ এর আগে গীনা শব্দে নাচ-গান উভয়ই বুঝাত। কিতার’ (গিটার) এবং উরগুন’ (অরগান) যন্ত্রের নাম হিসেবে ও অন্যান্য পারিভাষিক শব্দ এই সময় গ্রীক হতে এসে আরবী ভাষায় স্থান লাভ করে। অরগান’ নিঃসন্দেহ রকমে বাইজেন্টাইনদের নিকট হতে আমদানী করা হয়।

দুর্ভাগ্যক্রমে পারিভাষিক গ্রন্থগুলির বেশীর ভাগই হারিয়ে গেছে। নগম’ ও ইকা প্রভৃতি আরবী সঙ্গীতের উপকরণ কেবল মুখে মুখে শিখানো হত। সে পর্যন্ত এই দুই-ই লোপ পেয়েছে। আরবী সুরে (চ্যান্ট) স্বর-মাধুর্যের (মেলোডী) পরিমাণ কম; কিন্তু এ সুর ছন্দে শক্তিশালী। পুরোনো সঙ্গীত সম্বন্ধে যে কয়খানা বই আছে, তা কোন আধুনিক পাঠক ঠিকমত ব্যাখ্যা করতে পারে না বা ছন্দ ও বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় সেকালের মানে বোঝে না।

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ১৪. জগত-মণি কর্ডোভা

জগত-মণি কর্ডোভা

মুসলিম-সাম্রাজ্যের পূর্বভাগ যখন তার সোনার যুগের সীমান্তে উপনীত, সেই সময় সে সাম্রাজ্যের সুদূর পশ্চিমভাগও স্পেনে অনুরূপ জাঁকজমকের মধ্যে রাজ্য-শাসনে ব্যস্ত। আমাদের পক্ষে স্পেনের এ যুগ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, আমরা যে সভ্যতা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি তার জন্ম হয় প্রাথমিক মধ্যযুগীয় খৃস্টান সংস্কৃতির অন্তঃস্থলে আরব সংস্কৃতির প্রবেশের ফলে; আর সে আরব সংস্কৃতি প্রধানতঃ এই স্পেন হতেই অগ্রসর হয়। নবম এবং একাদশ শতাব্দীর মাঝখানে এই পাশ্চাত্যে মুসলিম-সভ্যতা তার উচ্চতর শিখরে আরোহণ করে। কিন্তু এ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করার আগে আমাদিগকে আমাদের কাহিনী প্রসঙ্গে ৭৫০ অব্দে ফিরে যেতে হবে।

আমরা আগে দেখেছি যে, ৭৫০ সালে আব্বাসীয় বংশ উমাইয়া বংশকে উৎখাত করে। আমরা আরো দেখেছি, বিজয়ী বংশ পরাজিত বংশের যাকে যেখানে পেয়েছে, সেখানেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

অতিঅল্প সংখ্যক লোকই এই নৃশংস হত্যার কবল হতে রেহাই পায়; তার মধ্যে একজন ছিলেন বিশ বছরের একটি যুবক। নাম তার আবদুর রহমান। লম্বা, পাতলা, লালচুল, ঈগলের মত তীক্ষ্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অত্যন্ত সবল স্নায়ু, অসামান্য কর্মক্ষমতা নানাদিক দিয়েই অসাধারণ। ইনিই স্পেনে চলে যান ইনিই লড়াই করে প্রভুত্ব অর্জন করেন, ইনিই প্রাচ্যে নিশ্চিহ্ন উমাইয়া বংশকে স্পেনে ক্ষতায় প্রতিষ্ঠিত রাখেন।

তাঁর পলায়নের কাহিনী রোমাঞ্চকর। তিনি ইউফ্ৰেতীস নদীর পশ্চিম পারে একটি বেদুঈন তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় একদা আব্বাসীয়দের কৃষ্ণ পতাকাবাহী একদল অশ্বারোহী সেখানে আবির্ভূত হয়। তাঁর সঙ্গে তাঁর তেরো বছরের ভাই ছিল। ভাইকে নিয়ে তিনি নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মনে হয়, ভাই তাঁর সাঁতারে দক্ষ ছিল না। পার হতে লোকেরা চীৎকার করে ডাকতে থাকে, ‘ফিরে এস–ফিরে এস। তোমার গায় হাত তুলব না।’ আবদুর রহমানের নিষেধ সত্ত্বেও বালক ফিরে যায়। পারের লোকেরা তাকে তখনি হত্যা করে। আবদুর রহমান সাঁতরিয়ে অপর পারে গিয়ে ওঠেন।

বন্ধুহীন, কপর্দকহীন আবদুর রহমান পায় হেঁটে দক্ষিণ-পশ্চিম পানে চলেন এবং বহু কষ্টের পর ফিলিস্তিনে গিয়ে পৌঁছেন। এখানে একটি বন্ধুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। এখান হতে আবার তিনি পশ্চিম পানে রওয়ানা হলো। এমনিভাবে তিনি গিয়ে পৌঁছেন উত্তর আফ্রিকায়। সেখানকার প্রাদেশিক শাসনকর্তা তাকে হত্যা করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি কোনরকমে বেঁচে যান। আজ এ কওমের কাছে গিয়ে কয়েক দিন থাকেন; কাল আর এক কওমের কাছে যান–পর তৃতীয় এক কওমের কাছে। এমনিভাবে যুবক ঘুরে বেড়াতে থাকেন। আর নতুন বংশে গুপ্তচর তার পেছনে লেগে থাকে। অবশেষে পাঁচ বছর পর তিনি সিউটায় গিয়ে পৌঁছেন। তিনি দামেস্কের দশম খলীফার পৌত্র ছিলেন এই অঞ্চলের বার্বাররা তাঁর মাতুল বংশ ছিল। তারা তাকে আশ্রয় দেয়।

সিওটা বরাবর প্রণালীর ওপারে দামেস্কের নিযুক্ত একদল সিরীয় সৈন্য অবস্থান করছিল। তিনি তাদের কাছে গিয়ে হাজির হন। তারা তাঁকে নেতা বলে স্বীকার করে নেয়। দক্ষিণের শহরগুলি একে একে তাঁর সামনে দুয়ার খুলে দেয়। সমস্ত স্পেন আয়ত্তে আনতে তার আরো কয়েক বছর সময় লাগে; কিন্তু তিনি অবিরাম চেষ্টা করতে থাকেন। বাগদাদের আব্বাসীয় খলীফা স্পেনের জন্য একজন গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠান, যাতে তিনি আবদুর রহমানকে উৎখাত করে সেদেশে আব্বাসীয় শাসন কায়েম করতে পারেন। দুই বছর পর বাগদাদের খলীফা আবদুর রহমানের নিকট হতে একটি উপহার পান? সেই গভর্নরের মস্তক লবন ও কর্পূরে রক্ষিত, কালো পতাকা ও তার নিযুক্তির সনদ দ্বারা আবৃত। দেখে খলীফা ব্যস্তভাবে বলে ওঠেন : আল্লাহর দরগায় শুকরিয়া যে, তিনি আমার আর এমন দুশমনের মাঝখানে সমুদ্র স্থাপন করেছেন। স্বয়ং শার্লেমেন একটি সংঘর্ষে তার দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুর রহমানের শক্তি-পরীক্ষা করেন। সে সংঘর্ষের কাহিনী পাশ্চাত্য সাহিত্যে অমর হয়ে আছে।

শার্লেমেনকে আব্বাসীয় খলীফাদের মিত্র মনে করা হত। তাছাড়া, নতুন আমীর বা সুলতান স্বভাবতঃই তার শত্রু মধ্যে গণ্য ছিলেন। শার্লেমেন ৭৭৮ সালে উত্তর-পূর্ব স্পেনের সীমান্ত পথে একদল সৈন্য পাঠান। তারা সারাগোসা পর্যন্ত এসে পৌঁছে। কিন্তু সারাগোসা আগন্তুক সৈন্যদের সম্মুখে নগর-দ্বার বন্ধ করে দেয়। ঠিক সেই সময়ই নিজ দেশে শার্লেমেনের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে শত্রুদল মাথা তোলে। ফলে শার্লেমেনের সৈন্যদল সারাগোসা হতেই ফিরে যায়। পিরেনীজের পার্বত্য পথে যখন এরা প্রত্যাবর্তন করতে থাকে, তখন বাস্ক এবং অন্যান্য পার্বত্যজাতি পেছন হতে এদের আক্রমণ করে। ফলে এদের বহু সৈন্য ও রসদ বিধ্বস্ত হয়। নিহত নেতাদের মধ্যে একজন ছিলেন, প্রখ্যাতনামা বীর রোলেন্ড। চ্যানসন-ডি-রোলেন্ড’ নামক গ্রন্থে তাঁর সে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এ গ্রন্থখানি কেবল ফরাসী-সাহিত্যের অমূল্য রত্ন নয়–মধ্যযুগের একটি অপূর্ব সুন্দর মহাকাব্য।

৭৮৮ সালে আবদুর রহমানের মৃত্যু হয়। তার দুই বছর আগে মক্কা ও বায়তুল মোকাদ্দেসের প্রতিদ্বন্দ্বী মসজিদ হিসেবে তিনি কর্ডোভায় একটি বিরাট মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর পরবর্তীরা এ মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ ও এর কলেবর বৃদ্ধি করেন। অল্পকাল মধ্যেই এ মসজিদ পাশ্চাত্য-ইসলামের উপাসনালয় হয়ে দাঁড়ায়। এর অসংখ্য উন্নত স্তম্ভ ও বিপুল অঙ্গন দর্শকদের বিস্ময় উৎপাদন করত। ১২৩৬ সালে মসজিদটিকে গীর্জায় পরিণত করা হয়। আজো এ কীর্তি ‘লা-মেজকিটা’ (মসজিদ) নামে বেঁচে আছে। এ মসজিদ ছাড়া, রাজধানীতে এর আগেই গোয়াডেল কুইভার নদীর উপর একটি মস্ত সেতু নির্মিত হয়। পরে এর খিলান সংখ্যা সতেরোতে গিয়ে দাঁড়ায়। গোয়াডেল কুইভার নামটি আরবী নাম ‘ওয়াদী-উল-কবীর’ (বড় নদী) নামের অপভ্রংশ। কিন্তু উমাইয়া প্রভুত্বের প্রতিষ্ঠাতা কেবল প্রজাপুঞ্জের সম্পদ বৃদ্ধি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন; তিনি বিভিন্ন উপায়ে আরব, সিরিয়ান, বার্বার, নুমিডিয়ান, হিস্পনো-আরব এবং গথ প্রভৃতি জাতিকে মিলিয়ে একজাতি গঠনের চেষ্টা করেন, যদিও তার এ চেষ্টার সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল নিতান্ত অল্প। নম হতে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন মুসলিম-স্পেনকে দুটি ‘বশ্ব-সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করে, সে আন্দোলনের সূত্রপাত কার্যতঃ তিনিই করেন।

খলীফা আবদুর রহমানের দরবার সমস্ত ইউরোপের সর্বাপেক্ষা জাকজমকপূর্ণ দরবারসমূহের অন্যতম ছিল। সে দরবারে বাইজেন্টাইন ম্রাট এবং জার্মানী, ইটালী ও ফ্রান্সের রাজাদের তরফ থেকে দূত আনাগোনা করত। তার রাজধানী কর্ডোভার বাসিন্দা ছিল ৫ লক্ষ, মসজিদ ছিল ৭শ’, সরকারী গোসলখানা ছিল ৩শ’। তৎকালীন জগতে বাগদাদ ও কনস্টানটিনোপল ছাড়া এমন আড়ম্বরপূর্ণ নগর আর একটিও ছিল না। ৪শ’ কামরা, হাজার হাজার গোলাম-বাঁদী ও প্রাসাদ রক্ষীদের আবাসস্থানসহ রাজপ্রাসাদ শহরের উত্তর পশ্চিমে সিয়েরা মোরেনার একটি শৈল-বাহুর উপর স্থাপিত ছিল। নীচে প্রবাহিত ছিল গোয়াডাল কুইভার। ৯৩৬ সালে আবদুর রহমান এই শাহী মনজিল নির্মাণ শুরু করেন। একটা কাহিনী প্রচলিত আছে যে, খলীফার একজন উপপত্নী মৃত্যুকালে অগাধ ধন রেখে ওসিয়ত করে যায় যে, খৃস্টানদের দেশে কোন মুসলমান বন্দী থাকলে ঐ টাকায় যেন তাদের মুক্তি-মূল্য দেওয়া হয়। কিন্তু খৃস্টানদের দেশে অমন কোন মুসলিম বন্দী না পাওয়া যাওয়ায় খলীফা আজ জাহরা নাম্নী তার অন্য উপপত্নীর পরামর্শ ও নাম অনুসারে এই প্রাসাদের পত্তন করেন। এ মনজিলের জন্য মার্বেল আনা হয় নুমিডীয়া ও কার্থেজ হতে এবং সোনার মূর্তিসহ স্তম্ভ (খরিদা সূত্রে বা উপহার হিসেবে) আনা হয় কনস্টানটিনোপল হতে। ১০ হাজার শ্রমিক ১৫০০ ভারবাহী পশু সহ বিশ বছর কাল এর নির্মাণ কাজে মোতায়েন থাকে। পরবর্তী খলীফারা এর বিস্তৃতি ও সৌন্দর্য বিধান করেন। ফলে একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শাহী মহল্লা। ১৯১০ সালে এবং তার পরে মাটি খুঁড়ে আজ-জাহরার কতকাংশকে বের করা হয়েছে।

আজ-জাহরা প্রাসাদে যখন খলীফা বসতেন, তখন ৩,৭৫০ জন ব্ল্যাভ’ দেহরক্ষী তাঁকে ঘিরে থাকত। তাঁর একলক্ষ সুশিক্ষিত সৈন্য ছিল। দেহরক্ষীরা তাদের আগে চলত। জার্মান এবং অন্যান্য জাতি স্ল্যাভোনিক জাতিসমূহের মধ্য হতে লোক বন্দী করে এনে আরবদের কাছে বিক্রি করত। কেবল এদেরই স্ন্যাভ বলা হত। পরবর্তীকালে ফিরিঙ্গী, গ্যলিসীয়ান, লম্বার্ড ও অন্যান্য বিদেশীদের মধ্য হতে যত গোলাম খরিদ করা হত, তাদের সবাইকে স্ল্যাভ নাম দেওয়া হয়। এদের সাধারণতঃ অল্প বয়সে খরিদ করে আরবায়িত করা হত। স্পেনের এই ‘জেনিসারী’ বা মামলুকদের সাহায্যে কেবল যে রাজদ্রোহ ও দস্যুতা দমন রাখা হত এমন নয়, প্রাচীন আর অভিজাত সমাজের প্রভাবকেও আয়ত্তে রাখা হত। এ-সময় কৃষি ও বাণিজ্যের যথেষ্ট উন্নতি হয়; রাজকোষ কেঁপে ওঠে। আদায়ী রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৬২ লক্ষ ৪৫ হাজার দিনার; সৈন্যদের বেতন ও জনহিতকর কাজের জন্য এর এক তৃতীয়াংশ ব্যয়ই যথেষ্ট ছিল। বাকী একৃ তৃতীয়াংশ সংরক্ষিত তহবিলে যেত। এর আগে কোন সময়ই কর্ডোভা এত সমৃদ্ধিশালী, আন্দালুসীয়া এমন সম্পদের আকর এবং রাষ্ট্র এত শক্তি-দৃপ্ত ছিল না। একজন লোকের প্রতিভা বলে এ অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়। তিনি ৭৩ বছর বয়স মহাপ্রয়াণ করেন। কথিত আছে, মৃত্যুর আগে তিনি বলেন যে, তাঁর সমস্ত জীবনে মাত্র চৌদ্দদিন সুখে কেটেছিল।

প্রাচ্যে হোক আর পাশ্চাত্যেই হোক, মুসলিম-জগতের সর্বত্র যে কোন বংশের অধীনে রাজপদ অনিশ্চিত ছিল। প্রথম আবদুর রহমানের সময় হতে স্পেনে উমাইয়া বংশ নামতঃ রাজ্যশাসন চালিয়ে যাচ্ছিল। এ বংশের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য শাসনকর্তা তৃতীয় আবদুর রহমান যখন ৯১২ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন গৃহ-বিবাদ, কওমী বিদ্রোহ এবং আমীরদের রাজনৈতিক অযোগ্যতা–সমস্ত মিলে স্পেনের সুসংবদ্ধ রাজ্যের সীমানাকে সংকীর্ণ করতে করতে কর্ডোভা ও তার উপকণ্ঠে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল।

তৃতীয় আবদুর রহমান প্রখ্যাতনামা পূর্ববর্তী আবদুর রহমানের মতই শাসন ভার গ্রহণকালে ২৩ বছরের যুবক ছিলেন এবং তাঁর মতই এঁরও বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা ও সংকল্পের দৃঢ়তা ছিল। একে একে তিনি বিজিত প্রদেশগুলি পুনর্জয় করেন, রাজ্যময় শৃঙ্খলা স্থাপন করেন এবং বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার সঙ্গে শাসন চালাতে থাকেন। তিনি পঞ্চাশ বছরকাল ৯১২-৯৬১ রাজত্ব করেন। সে যুগের হিসেবে এ অত্যন্ত দীর্ঘকাল। স্পেনে তিনিই প্রথম নিজকে খলীফা বলে ঘোষণা করেন। তাঁরই সময় হতে স্পেনে উমাইয়া বংশীয় খিলাফত শুরু হয়। তার এবং তার লাগ পরবর্তী দুইজন খলীফার আমলে পাশ্চাত্যে মুসলিম-শাসন উন্নতির চরম শিখরে উপনীত হয়। এই যুগে–অর্থাৎ মোটামুটি দশম শতাব্দীতে কর্ডোভা সমস্ত ইউরোপের মধ্যে সংস্কৃতির দিক দিয়ে সবচেয়ে উন্নত শহর এবং বাগদাদ ও কন্সটানটিনোপলের সঙ্গে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তিনটি সংস্কৃতিকেন্দ্রের অন্যতম ছিল। কর্ডোভার পরিবার সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ১৩ হাজার, শহরতলী ছিল ২১টি, কুতুবখানা ছিল ৭০টি, বইয়ের দোকান, মসজিদ ও প্রাসাদ ছিল অসংখ্য। স্বভাবতঃই এর খ্যাতি দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর দৃশ্য ভ্রমণকারীদের মনে বিস্ময়-সম্ভ্রমের উদ্রেক করে। শহরে বহু মাইল বিস্তৃত ইটে বাঁধানো পাকা রাস্তা ছিল এবং দুই পাশের বাড়ীর দীপের প্রভায় গলিসমূহ আলোক-উজ্জ্বল হয়ে থাকত। এ সময়ের ৭০০ বছর পর লন্ডনে একটি সরকারী বাতি দেখা যায়নি। আর এর অনেক শতাব্দী পর পর্যন্ত প্যারিসে কোন বৃষ্টির দিনে কেউ সিঁড়ি বেয়ে ঘরে উঠলে তাকে এক হাঁটু কাদা নিয়ে উঠতে হত।”

নর্ডিক জাতীয় বার্বারদের সম্বন্ধে আরবরা যে মনোভাব পোষণ করত, তা টলেডোর সুবিজ্ঞ বিচারক সাইদের কথায় বুঝা যায়। তিনি বলেনঃ যেহেতু সূর্য এদের মাথার উপর সোজাসুজি কিরণপাত করে না, সেই জন্য এদের দেশের আবহাওয়া ঠাণ্ডা আর আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন। সুতরাং, এদের মেজাজও ঠাণ্ডা হয়ে পড়েছে–আর এদের ব্যবহার হয়ে পড়েছে অমার্জিত। এদের দেহ সুল, গায়ের রং পাতলা এবং চুল লম্বা। সূক্ষ্ম রস-জ্ঞান ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির এদের একান্ত অভাব; নির্বুদ্ধিতা ও বোকামি আছে এদের প্রচুর। লিয়ন, ন্যাভার অথবা বার্সেলোনার শাসনকর্তার যখনই একজন সার্জন, রাজমিস্ত্রী, গানের ওস্তাদ অথবা উচ্চশ্রেণীর দরজীর দরকার হত, তখনই তারা কর্ডোভায় তোক পাঠাতেন। এ মুসলিম রাজধানীর যশোঃগাথা সুদূর জার্মানী পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে এবং তথাকার একজন মঠবাসিনী কর্ডোভা সম্পর্কে মুগ্ধ কণ্ঠে বলেন : কর্ডোভা দুনিয়ার মণি।

খলীফাদের শাসনাধীন স্পেন ইউরোপের সমৃদ্ধতম দেশসমূহের অন্যতম ছিল। ঘন বসতির দিক দিয়েও এ দেশ কোন দেশেরই পেছনে ছিল না। রাজধানীতে ১৩ হাজার বস্ত্র-বয়ন শিল্পী ও একটি উন্নত চামড়ার কারখানা ছিল। চামড়া পাকা করা ও চামড়ার উপর উন্নত হরফে লেখার বিদ্যা স্পেন হতেই মরক্কোতে যায় এবং এ উভয় দেশ হতে যায় ফ্রান্সে ও ইংল্যান্ডে। পশম ও রেশমের কাপড় কর্ডোভা ছাড়া মালাগা, আলমেরিয়া ও অন্যান্য কেন্দ্রেও বোনা হত। গুটি পোকার চাষ প্রথমে চীনের একচেটিয়া ছিল। মুসলমানরাই এ-বিদ্যা চীন হতে স্পেনে নিয়ে যায়। স্পেনে গুটি পোকার চাষের বেশ উন্নতি হয়। আলমেরিয়াতে কাঁচ ও পিতলের জিনিস তৈরি হত। ভ্যালেনসিয়ার অন্তর্গত পেটারনা মৃৎশিল্পের কেন্দ্র ছিল। জায়েন ও আলগার্ভে সোনা-রূপার খনির জন্য, কর্ডোভা লোহা ও সীসার খনি এবং মালাগা রুবীর জন্য বিখ্যাত ছিল। দামেস্কের মত টলেড়ো তলোয়ারের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত ছিল। ইস্পাত ও অন্যান্য ধাতুর উপর সোনা-রূপার কাজ ও ফুল তোলার বিদ্যা দামেস্ক হতে স্পেনে আসে। এ শিল্প স্পেন ও বাকী ইউরোপের কোন কোন শহরে বেশ উন্নতি লাভ করে। স্পেনীয় আরবরা পশ্চিম এশিয়ায় প্রচলিত কৃষি-পদ্ধতি আমদানী করে। তারা খাল কাটে, আঙ্গুরের আবাদ করে এবং অন্যান্য ফল-মূলের মধ্যে নতুন প্রচলন করে-ধান, খুবানী, পীচ, ডালিম, কমলালেবু, আখ, কার্পাস ও জাফরান। উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সমতল ভূমি আবহাওয়া ও উর্বরতার দিক দিয়ে উন্নত ছিল; এ-স্থান নানারকম কৃষি-শিল্পের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানকার ভাগ-চাষীরা প্রচুর পরিমাণে গম ও অন্যান্য শস্য এবং বিভিন্ন রকম ফল উৎপাদন করত।

কৃষির এই উন্নতি মুসলিম-স্পেনের এক পরম গৌরব এবং এই দেশের পক্ষে আরবদের একটি অমর অবদান ছিল। কারণ, আজো স্পেনের বাগানগুলিতে মুরীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। জেনারলাইফ স্পেনের একটি অতি বিখ্যাত বাগান। নামটি আরবী জান্নাতুল আরিফ’ (পরিদর্শকের বেহেশত) নামের অপভ্রংশ। এটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ ভাগের কীর্তি এবং আলহামরার বাইরে একটি ইমারত এর বিশ্রামাগার ছিল। সুবিস্তৃত ছায়া, ঝর্ণা এবং মৃদু হাওয়ার জন্য এ বাগান বিখ্যাত ছিল। এর আকার ছিল অনেকটা বৃত্তাকার। কয়েকটি ছোট নদী এর পানি-সেচের উৎস ছিল। নদীগুলি মাঝে মাঝে জল প্রপাত সৃষ্টি করে ফুল, লতা ও গাছের মধ্যে হারিয়ে যেত। আজ সেখানে কেবল কয়েকটি বিরাট আকারের সাইপ্রেস ও মাটল গাছ বিদ্যমান।

মুসলিম-স্পেনের কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্য বাসিন্দাদের ব্যবহারের পর উদ্ধৃত থাকত। সেভিল নদীতীরস্থ এক মস্ত বন্দর ছিল। এখান হতে কার্পাস, জলপাই এবং তেল রফতানী হত এবং এখানে আমদানী হত মিসরের কাপড় ও গোলাম এবং ইউরোপ ও এশিয়া হতে গায়িকা-বালিকা। মালাগা ও জায়েন হতে রফতানী হত জাফরান, ডুমুর, মার্বেল এবং চিনি। আলেকজান্দ্রিয়া ও কনস্টানটিনোপল মারফত, স্পেনের উৎপন্ন দ্রব্য সুদূর ভারত ও মধ্য-এশিয়ার বাজারসমূহে গিয়ে পৌঁছত। দামেস্ক, বাগদাদ এবং মক্কার সঙ্গে এর তেজারতি অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। আধুনিক জগতের নৌ বিদ্যাঘটিত আন্তর্জাতিক শব্দসমূহের মধ্যে এডমিরাল, আরসেনাল, এভারেজ, ক্যাবল, শেলোপ ইত্যাদি আরবী-অদ্ভূত শব্দের অস্তিত্ব হতেই বোঝা যায়, এককালে সমুদ্রের উপর আরব জাতির প্রভুত্ব কত ব্যাপক ছিল।

সরকার রীতিমত ডাক-চলাচলের ব্যবস্থা পরিচালনা করত। রাষ্ট্রের মুদ্রা প্রাচ্য আদর্শে তৈরী হত। দিনার ছিল সোনার আর দেরহেম ছিল রূপার মুদ্রা। উত্তরের খৃস্টান দেশগুলিতে আরব-মুদ্রা চালু ছিল; কারণ, প্রায় চারশ’ বছর পর্যন্ত আরব ও ফরাসী মুদ্রা ছাড়া এদের নিজস্ব কোন মুদ্রা ছিল না।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া রাজধানীতে একটি প্রথম শ্রেণীর কুতুবখানা ছিল। আল হাকাম একজন গ্রন্থ-প্রেমিক ছিলেন। তার প্রতিনিধিরা পাণ্ডুলিপি খরিদ বা নকল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে আলেকজান্দ্রিয়া, দামেস্ক ও বাগদাদের বইয়ের দোকান তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াত। এইরূপে সংগৃহীত বইয়ের সংখ্যা নাকি অবশেষে চার লক্ষে গিয়ে দাঁড়ায়। সে বইয়ের ক্যাটালগ ছিল চুয়াল্লিশ বালাম। আর এইসব বালামের প্রত্যেকটির বিশ পাতা জুড়ে নাম ছিল কেবল কবিতার বইয়ের। মুসলিম খলীফাদের মধ্যে আল-হাকামই বোধহয় সবচেয়ে বড় বিদ্বান ছিলেন। তিনি নিজে লাইব্রেরীর অনেকগুলি বই ব্যবহার করতেন এবং সে সবের মার্জিনে তিনি যে নোট লিখে রাখতেন, পরবর্তী সংগ্রাহকরা তাকে অত্যন্ত মুল্যবান মনে করত। আলইসবাহানী নামক উমাইয়াদের একজন বংশধর ইরাকে বসে আগানী লিখছিলেন। এ গ্রন্থের প্রথম কপি সংগ্রহের জন্য আল হাকাম গ্রন্থকারকে এক হাজার দিনার পাঠিয়ে দেন। এ সময় আন্দালুসীয়ায় সংস্কৃতির সাধারণ মান এত উঁচু স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, সুবিখ্যাত ওলন্দাজ পণ্ডিত ডোজী মুগ্ধকণ্ঠে মন্তব্য করেন : ‘প্রায় প্রত্যেকেই লেখাপড়া জানত। অথচ এ সময় খৃস্টান-ইউরোপে প্রাথমিক লেখাপড়ার সামান্য চল ছিল এবং তাও সীমাবদ্ধ ছিল পাদ্রী-পুরোহিতদের মধ্যে।

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ১৫. পাশ্চাত্য-জগতে আরবের অবদান

পাশ্চাত্য-জগতে আরবের অবদান

মুসলিম-স্পেনের কলেজগুলির ফটকের গায় সাধারণতঃ একটি লিপি উল্কীর্ণ দেখা যেত। সে উল্কীর্ণ লিপিটি এই : মাত্র চারটি বস্তু পৃথিবীর ভার বহন করে : বিজ্ঞের বিদ্যা, মহতের হক-বিচার, সত্যাশ্রয়ীর এবাদাত আর সাহসীর পরাক্রম।

বিশেষ একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার যে, মুসলিম-আদর্শের এই ইউরোপীয় বর্ণনায় বিদ্যার সাধনা সকলের পুরোভাগে স্থান পেয়েছে। আরবের বাহুবল পাশ্চাত্য জগতের মনে গভীর দাগ কাটে। তবে সে দাগ বেশী দিন টিকে নাই। কিন্তু মুসলমানদের বিদ্যা ও জ্ঞান বহুপথে পাশ্চাত্য চিন্তার ভিতর অনুপ্রবিষ্ট হয়। মধ্যযুগের জ্ঞান-সাধনার ইতিহাসে মুসলিম-স্পেন একটি অত্যুজ্জ্বল অধ্যায় যোগ করে। আমরা আগে দেখেছি, অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর আরম্ভ–এ দুইয়ের মধ্যবর্তীকালে আরবী ভাষা-ভাষীরাই পৃথিবীর সর্বত্র সংস্কৃতি ও সভ্যতার আলোকবর্তিকার প্রধান বাহক ছিল। তাদেরই মাধ্যমে প্রাচীন দর্শক ও বিজ্ঞান পুনর্জীবন ও পুষ্টি লাভ করে এবং সম্প্রসারিত হয়। আর এরই ফলে পশ্চিম ইউরোপে রেনেসাঁর জন্মলাভ সম্ভব হয়। মুসলিম-স্পেনের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক চিন্তানায়ক ছিলেন আলী-ইবনে-হাজম (৯৯৪–১০৬৪)। তিনি মুসলিম জগতের সর্বাপেক্ষা বেশীসংখ্যক বইয়ের লেখক এবং দুই বা তিনজন অসাধারণ প্রতিভা সম্পন্ন বিদ্বানের অন্যতম ছিলেন। তার জীবনী লেখকেরা বলেন, তিনি ইতিহাস, ধর্ম-বিজ্ঞান, হাদীস, তর্ক-শাস্ত্র, কবিতা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে ৪০০ বই লিখেন। তাঁর যেসব বই এখন পাওয়া যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হচ্ছে, ধর্মের তুলনামূলক বিচার বিষয়ক গ্রন্থ। এক্ষেত্রে তিনিই জগতে প্রথম গবেষক পণ্ডিত। এই গ্রন্থে তিনি বাইবেলের কাহিনী সংক্রান্ত নানা সমস্যার কথা আলোচনা করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে যে উন্নত শ্রেণীর সমালোচনা উদ্ভব হয়, তার আগে বাইবেলীয় কাহিনীর উক্ত অসামঞ্জস্য সম্বন্ধে আর কেউ কোন শব্দ করেন নাই।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পশ্চিম ইউরোপে উপকথা, গল্প ও নীতি কাহিনী ঘটিত যে সাহিত্য উৎকর্ষ লাভ করতে থাকে, তাতে পূর্ববর্তী আরবী গ্রন্থরাজির প্রভাব ও পরিচয় নিঃসন্দেহ রকমে বর্তমান। এসব আরবী গ্রন্থের ভিত্তি আবার অনেকাংশে ছিল ইন্দোপারসিক। কালীলা ও দিমনার চিত্তাকর্ষক উপকথাগুলি ক্যাস্টাইল-লিয়নের সুবিজ্ঞ এলফনসোর জন্য (১২৫২১২৮২) স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হয়। কিছুকাল পর খৃস্টধর্মে দীক্ষিত একজন ইহুদী ল্যাটিনে এর অনুবাদ করেন। ফারসীতে এর যে অনুবাদ ছিল, ফরাসী ভাষা মারফত তাই লা ফনটেইন’ গ্রন্থের অন্যতম মূল ছিল। কবি নিজে একথা স্বীকার করেছেন। ‘মাকামা’ ছন্দোময় গদ্যে লিখিত গ্রন্থ। এতে শব্দ-বিজ্ঞানের অনেক কৌতূহলোদ্দীপক অলংকার রয়েছে। কোন সুন্দরীর দেহরক্ষী বীরপুরুষের দুঃসাহসী কাজের বর্ণনার মারফত এতে নৈতিক উপদেশ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। মাকামার সঙ্গে স্পেনীয় ভাষার বর্ণনামূলক উপন্যাসগুলির ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য অনস্বীকার্য। কিন্তু আরবী ভাষা তার প্রকাশ-ভঙ্গী দ্বারা যে প্রভাব বিস্তার করে, ইউরোপের মধ্যযুগীয় সাহিত্যে তাই তার শ্রেষ্ঠ অবদান। এ প্রভাব ইউরোপীয় সাহিত্যকে তার চিরাচরিত প্রথার নির্মম সংকীর্ণতা হতে উদ্ধার করে। স্পেনীয় সাহিত্যের ভাব-ঐশ্বর্যের মূলে আছে আরবী-সাহিত্যের আদর্শ। উদাহরণ স্বরূপ, সারভেনটিস লিখিত ‘ডন কুইজটের পরিহাস রসের কথা বলা যায়। গ্রন্থকার একদা আলজিয়ার্সে বন্দী ছিলেন এবং তামাসা করে বলতেন যে, আরবীতে তার বইয়ের একটা মূল কপি আছে। যখনই যেখানে আরবী ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তখনই সেখানে কবিতা রচনার তীব্র আকাভা দেখা গেছে। অসংখ্য কবিতা মুখে মুখে চলত এবং ছোট বড় সবারই প্রশংসা লাভ করত। শব্দের সৌন্দর্য ও শ্রুতি-মাধুর্যের এই যে অনিবার্য আকর্ষণ ও আনন্দ, এ আরবী ভাষাভাষীদের প্রকৃতিগত। স্পেনীয় ভাষাতেও এ বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়। প্রথম উমাইয়া শাসনকর্তা কবি ছিলেন। তাঁর পরবর্তী কতিপয় খলীফারও কবিতা রচনার সুনাম ছিল। বেশীর ভাগ খলীফার দরবারেই রাজ-কবি থাকত এবং ভ্রমণ বা যুদ্ধকালে খলীফারা কবিদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সেভিল সর্বাপেক্ষা অধিকসংখ্যক কবির গর্ব করত। তবে এ কবিতার মশাল অনেক আগে কর্ডোভায় প্রজ্জ্বলিত হয় এবং গ্রানাডা যতকাল মুসলিম-শক্তির অধিষ্ঠান ভূমি ছিল, ততকাল তথায় এ মশাল জ্বলতে থাকে।

ইবনে-জায়দুন (১০০৩–১০৭১) একজন প্রতিষ্ঠাবান কবি ছিলেন। এক আরব অভিজাত বংশে তাঁর জন্ম হয়। তিনি প্রথমে কর্ডোভা রাজ-শক্তির বিশ্বস্ত প্রতিনিধি ছিলেন। পরে তিনি রাজ-অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত হন। জনৈক খলীফার কবি কন্যা ওয়াল্লাদার প্রতি জায়দুনের প্রবল আসক্তিই বোধহয় তার পতনের কারণ ছিল। কয়েক বছর কারাগার ও নির্বাসনে থাকার পর তিনি মুক্তি লাভ করেন এবং উজিরে আজম ও সিপাহসালারের যুক্ত পদে নিযুক্ত হন। তাঁর উপাধি হয় ‘দুই ওজাতের অধিকর্তা-কলমের ওজরত আর তলোয়ারে ওজারত। উক্ত সুন্দরী এবং প্রতিভাশালিনী ওয়াল্লাদাকে মৃত্যু ১০৮৭ অপরূপ সৌন্দর্য ও সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা উভয় দিক দিয়ে গ্রীসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাচীন গীতি-কবি স্যাফফোর সঙ্গে তুলনা করা হয়। কবিতা ও সাধারণ-সাহিত্য উভয়ের প্রতি স্পেনীয় আরব নারীর একটা প্রবল আকর্ষণ ছিল।

সনাতন রীতির আওতা হতে আংশিক মুক্তি লাভ করে স্পেনীয় আরবী কবিতা নব নব প্রকাশ-ভঙ্গী এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি প্রায় আধুনিক মনোভাব গড়ে তোলে। মধ্যযুগীয় দুঃসাহসিক বীরত্ববাদের দৃষ্টিভঙ্গী আগেই। আরবী লোক-গাথা ও প্রেম-গীতির অভিনব ভাব-লালিত্যে আত্মপ্রকাশ করে। কণ্ঠ ও যন্ত্র উভয় প্রকার সঙ্গীতই বরাবর কবিতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রক্ষা করে চলত।

আরবী কবিতা সাধারণভাবে ও এর গীতি কবিতাংশ বিশেষভাবে দেশীয় খৃস্টানদের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে এবং উভয় সংস্কৃতির মিলনে সাহায্য করে। ক্যাস্টাইলের লোক-প্রিয় ভিলানসিকো’ কবিতা আরবী গীতি-কবিতা হতে গড়ে ওঠে। এ কবিতা খৃস্টানদের প্রার্থনার বিশেষ করে বড় দিনের আনন্দ-সঙ্গীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত।

অষ্টম শতাব্দীতে স্পেনীয় সাহিত্যে প্ল্যাটোনিক (নিষ্কাম) প্রেমের যে একটা বিশেষ প্রকাশ-ভঙ্গী বিকাশ লাভ করে, তা আরবী কবিতারই প্রভাবের ফল। দক্ষিণ ফ্রান্সে প্রথম প্রভেনকাল’ কবিদের আবির্ভাব ঘটে একাদশ শতাব্দীতে এবং তারা পুরাদস্তুর নিপূণ কাব্যকারের মত অদ্ভুত এবং অপূর্ব কল্পনা বিনাসের বিচিত্র লীলায় তাঁদের অদম্য প্রেষকে রূপদান করেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে ট্রাবেডুরদের অভ্যুদয় হয় এবং তারা তাদের দক্ষিণ অঞ্চলে সমসাময়িক গজল গায়কদের অনুকরণ করেন। চ্যানসন-ডি-রোল্যান্ড প্রাথমিক যুগের ইউরোপীয় সাহিত্যের মহত্তম কীর্তি। ১০৮০ সালের আগে রচিত এ গ্রন্থ এক নতুন সভ্যতার সূচনা করে। এই সভ্যতাই পশ্চিম ইউরোপের সভ্যতা। এ গ্রন্থের উদ্ভব হয় মুসলিম-স্পেনের সঙ্গে এক সামরিক সংঘর্ষের ফলে।

আমরা দেখেছি, প্রাথমিক শিক্ষা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল। আর সব মুসলিম দেশের মত এখানেও কোরআন এবং আরবী ব্যাকরণ ও কবিতার উপর প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপিত হয়। শিক্ষিত মহলে নারীর যে ইজ্জত ছিল, তাতে প্রমাণিত হয় যে, নারীরা লিখতে পারে না বলে যে প্রবাদ ছিল তা আন্দালুসিয়াতে পালিত হয় নাই। উচ্চশিক্ষার বুনিয়াদ ছিল কোরআনের তফসীর, হাদীস, ফেকা, দর্শন, কাব্য, ইতিহাস, ভূগোল, অভিধান রচনা-রীতি এবং আরবী ব্যাকরণ । প্রধান শহরগুলি অনেকটিতেই উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ছিল। সেসবকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায়। এ শহরগুলির মধ্যে প্রধান ছিল কর্ডোভা, সেভির, মালাগা এবং গ্রানাডা। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম-শাস্ত্র ও আইন-শাস্ত্র ছাড়া জ্যোতিষ, গণিত এবং চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ানো হত। এখানে নিশ্চয়ই হাজার হাজার ছাত্র ছিল এবং এখানকার সনদের দৌলতে রাজ্যের বড় বড় চাকরী পাওয়া যেত। গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য বিষয়ের তালিকায় ছিল ধর্ম শাস্ত্র, আইন শাস্ত্র, চিকিৎসা শাস্ত্র, রসায়ন, দর্শন এবং জ্যোতিষশাস্ত্র ক্যাস্টিলিয়ার এবং অন্যান্য বিদেশী ছাত্র এখানে লেখাপড়া করত।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে কুতুবখানা উন্নতি লাভ করে। কর্ডোভার রাজকীয় কুতুবখানা সর্বাপেক্ষা বড় ও শ্রেষ্ঠ ছিল। অনেকের ব্যক্তিগত সংগ্রহও ছিল। এদের মধ্যে কয়েকজন নারীকেও দেখা যায়। রাজনৈতিক সভা ও থিয়েটার গ্রীস ও রোমের জাতীয় জীবনের এক অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য ছিল। মুসলিম-জগতে এ দুইয়ের একান্ত অভাব হেতু বই-ই তাদের জ্ঞানার্জনের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।

বাগদাদ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছি যে, ইউরোপে কাগজ আমদানী সে মহাদেশের প্রতি ইসলামের মহত্তম অবদানসমূহের অন্যতম ছিল। আন্দালুসিয়াতে এই কাগজ উৎপন্ন হত। আর ওখানে কাগজ উৎপন্ন না হলে আন্দালুসিয়াতে এত বই স্থূপীকৃত করা সম্ভবপর হত না। কাগজ তৈরীর বিদ্যা প্রাচ্য হতে প্রথমে মরক্কোতে যায় এবং দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হতে স্পেনে প্রবেশ করে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি আজো ইংরেজি ‘রীম’ শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে। শব্দটি আসলে ছিল আরবী ‘রিজমা’। স্পেনীয় ভাষায় গিয়ে শব্দটি হয় ‘রেসমা । আর স্পেন হতে ফরাসী ভাষায় গিয়ে শব্দটি হয় রেইম’। তারপর ফরাসী ভাষা হতে ইংরেজিতে বীম’ শব্দের আকারে নব-রূপ গ্রহণ করে। সিসিলীর মুসলিম-প্রভাব ইতালীতে বিস্তৃত হয় এবং স্পষ্টতঃই সেই প্রভাবের ফলে ১২৭০ সালের কাছাকাছি সময়ে ইতালীতে কাগজ তৈরীর শিল্প প্রবর্তিত হয়। কেউ কেউ বলেন, ক্রুসেডাররা ফিরে এসে ফ্রান্সে প্রথম কাগজের কল স্থাপন করে। কিন্তু এ কথা সত্য নয়। আসলে ফ্রান্স প্রথম কাগজের কলের জন্য মুসলিম-স্পেনের নিকট ঋণী। এইসব দেশ হতে কাগজ-শিল্প বাকী ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। আবদুর রহমানের এক সেক্রেটারী নিজ বাড়ীতে বসে চিঠিপত্র লিখতেন। তারপর কপি করার জন্য সেগুলি এক বিশেষ অফিসে পাঠানো হত। এ ছিল এক রকম প্রিন্টিং। এখান হতে পত্রের কপি সরকারের বিভিন্ন দফতরে বিলি হত।

স্পেনে মুসলিম-শক্তি বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই হাজার বালামেরও কম বই রক্ষা পায় এবং সেসব বই দ্বিতীয় ফিলিপ (১৫৫৬-১৫৯৮) ও তার পরবর্তী বিভিন্ন আরব লাইব্রেরী হতে সংগ্রহ করেন। এইসব বই দিয়েই এসকুরিয়াল লাইব্রেরী শুরু হয়। আজো সে লাইব্রেরী মাদ্রিদের অদূরে অবস্থিত আছে। এ লাইব্রেরীর সঙ্গে অন্যান্য বালাম কিভাবে এসে যুক্ত হয়, তার একটা মজার কাহিনী আছে। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মরক্কোর সুলতান রাজধানী হতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তার কুতুবখানাটি এক জাহাজে পাঠিয়ে দেন। জাহাজের ভাড়া পুরোপুরি অগ্রিম না পাওয়ায় জাহাজের কাপ্তান বইগুলি নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দিতে অস্বীকার করে। মার্সাই যাওয়ার পথে জাহাজটি স্পেনীয় জলদুস্যর কবলে পড়ে। নূষ্ঠিত বইগুলি সংখ্যায় তিন হতে চার হাজার–তৃতীয় ফিলিপের হুকুম মোতাবেক এক্ষুরিয়াল লাইব্রেরীতে জমা দেওয়া হয়। এইরূপে এস্কুরিয়াল  লাইব্রেরী আরবী পাণ্ডুলিপির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

ইবনুল খতীব ও ইবনে খালদুন ছিলেন দুই বন্ধু। সাহিত্যিক পারদর্শিতা এবং ঐতিহাসিক প্রজ্ঞার দিক দিয়ে এঁরা দুইজন পাশ্চাত্য-ইসলামের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি ছিলেন। ইবনুল খতীব উজীর ছিলেন। কোন দরবারী ষড়যন্ত্রের ফলে তিনি ১৩৭১ সালে গ্রানাডা হতে পলায়ন করেন। এর তিন বছর পর ব্যক্তিগত কলহের ফলে কাছ নামক স্থানে তাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে গ্রানাডা-হয়তো সমস্ত স্পেনই তার শেষ কৃতী সাহিত্যিক, কবি ও রাজনীতিজ্ঞকে হারায়। কবিতা, ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন, চিকিৎসা প্রভৃতি নানাবিষয়ে তিনি ৬০ খানা বই লেখেন। তার মধ্যে ২০ খানা এখনো পাওয়া যায়। এ সবের মধ্যে গ্রানাডার ইতিহাস আমাদের পক্ষে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বই।

ইবনে খালদুন তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি মুকাদ্দামার জন্য বিখ্যাত। মুকাদ্দামা ইতিহাসের ভূমিকা বিষয়ক বই। দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও আবহাওয়া এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি এ সমস্তই যে ইতিহাসের বিকাশ-ধারাকে প্রভাবিত করে, এ মতবাদ তিনিই প্রথম এ পুস্তকে ব্যক্ত করেন। তিনি জাতীয় জীবনের উন্নতি ও অবনতির আইন খুঁজে বের করতে সাধনা করেছেন। এ হিসেবে তাকে ইতিহাসের প্রকৃত ক্ষেত্র ও প্রাকৃতিক আবিষ্কর্তা বলা চলে। তিনি নিজেও এ দাবী করেছেন। অন্ততঃপক্ষে তাকে সমাজ-বিজ্ঞানের প্রকৃত স্থাপয়িতা বলতেই হবে। ইতিহাসের এমন ব্যাপক ও দার্শনিক ধারণা তার আগে কখনো কোন আরব, এমন কি কোন ইউরোপীয়ানের কল্পনায় আসে নাই। ১৪০৬ সালে ইবনে খালদুনের মৃত্যু হয়। সমস্ত সমালোচক সমবেত কণ্ঠে স্বীকার করেন যে, ইবনে খালদুন ইসলামের সবচেয়ে বড় এবং জগতের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক দার্শনিকদের অন্যতম ছিলেন।

আরবদের ভৌগোলিক গবেষণা পাশ্চাত্যের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে নাই। তবে পৃথিবী যে গোল, তারা এ প্রাচীন ধারণাকে জিইয়ে রাখে। আমরা আগেই বলেছি, হিন্দুদের বিশ্বাস ছিল যে, আমরা পৃথিবীর যে অর্ধাংশকে জানি তার একটা মধ্যবিন্দু বা কেন্দ্র আছে চারদিক হতে এই কেন্দ্র সমদূরে অবস্থিত। ১৯১০ সালে প্রকাশিত একটি ল্যাটিন বইয়ে এই ‘আরিন’ মতবাদ প্রবেশ লাভ করে। এই বই হতে কলম্বাস তাঁর মতবাদ গঠন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, পৃথিবী আকারে নাশপতির মত এবং পূর্ব গোলার্ধের ‘আরিন’–এর ঠিক উল্টা দিকে পশ্চিম গোলার্ধেও একটি আরিন আছে।

গ্রহ-বিজ্ঞান ঘটিত ভূগোল ও গণিতের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য-জ্ঞানভাণ্ডারে কয়েকটি নতুন ধারণা দান করা হয়। দশম শতাব্দীর মধ্য ভাগের পর স্পেনে দস্তুরমত গ্রহ-বিজ্ঞানের অধ্যয়ন শুরু হয় এবং কর্ডোভা, সেভিল ও টলেভোর শাসনকর্তারা জ্ঞানের এশাখাকে যথেষ্ট প্রীতির চোখে দেখতে থাকেন। আন্দালুসীয়ার অধিকাংশ গ্রহ-বিজ্ঞানীই বিশ্বাস করতেন যে, জীবন-মৃত্যুর মাঝখানের বেশীর ভাগ ঘটনার উপরই গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব সক্রিয়। এই নক্ষত্রের প্রভাব সম্পর্কিত গবেষণা হতেই জ্যোতিষশাস্ত্রের উদ্ভব হয়। এই শাস্ত্র অনুশীলনের জন্য অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমার হিসেব মোতাবেক পৃথিবীর সকল স্থানের অবস্থান নির্ণয় করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এইরূপে জ্যোতিষশাস্ত্র হতে গ্রহ-বিজ্ঞানের উদ্ভব হয়। ল্যাটিন-পাশ্চাত্য স্পেনের মারফতই প্রাচ্য পণ্ডিতগণ গ্রহ-বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্র ঘটিত প্রেরণা লাভ করেন। স্পেনে মুসলমানদের গ্রহ-বিজ্ঞানের প্রধান বইগুলি ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয় এবং ব্রয়োদশ শতাব্দীতে দশম এলফনসো যে এলফোনসাইন নির্ঘন্ট তৈরী করেন, তা আরব গ্রহ-বিজ্ঞানের উন্নত সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়। আরবদের নক্ষত্র বিষয়ক গবেষণার ফলে আমরা তাদের নিকট হতে স্ফিরিকাল ও সরল ত্রিকোণমিতির প্রথম অধ্যায় পেয়েছি। কারণ, এলজাবরা ও বিশ্লেষণমূলক জ্যামিতির মত ত্রিকোণমিতিও অনেকাংশে আরবরা উদ্ভাবন করে। একটা সাধারণ আকাশ গোলকে যেসব তারার নাম থাকে, তার দিকে একটু চাইলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে, আরব গ্রহ-বিজ্ঞানীরা আকাশের গায় তাদের সাধনার অমর-চিহ্ন রেখে গেছেন। ইউরোপীয় ভাষায় তারার যে সব নাম আছে, তার অধিকাংশই আরবী ভাষা হতে উদ্ভূত। যেমন–আকরাম (আকরাব–বিছা), অ্যালগেডী (আল-জোদী-ছাগল ছানা), অ্যালটেয়ার (আল-তায়ের–উড়নেওয়ালা), ডেনের (ধানব–লেজ), ফারকাড (ফারকাদ-বাছুর)। এছাড়া অনেক পরিভাষাও আরবী হতে নেওয়া হয়েছে। যথা : এজিমুথ (আস-সুমুত), নাদির (নাজির), জেনিথ (আল-সামত)। এসব থেকেই স্পষ্টই বোঝা যায় যে, ইসলাম খৃস্টান-ইউরোপকে কি অজস্র দানই না করেছে।

আরবী হতে যেসব গণিত-ঘটিত শব্দ ধার নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে নিতান্ত কৌতূহল-উদ্দীপক একটি শব্দ হচ্ছে, সাইফার বা জিরো (শূন্য)। আরবরা শূন্য আবিষ্কার করে নাই বটে, কিন্তু তারা আরব-সংখ্যার সঙ্গে শূন্য’ ইউরোপে আমদানী করে এবং ইউরোপীয়দের এর ব্যবহার শিক্ষা দেয়। এরই ফলে জীবনের দৈনন্দিন ব্যাপারে গণিতের ব্যবহার সম্ভব হয়।

অমুসলিম-ইউরোপে আরবী সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকম ধীরগতিতে বিস্তৃতি লাভ করে। সমস্ত একাদশ, দ্বাদশ এবং এয়োদশ শতাব্দীর কতকাংশ পর্যন্ত খৃস্টান গণিতবিদরা কোমর বেঁধে সেকেলে রোমক সংখ্যা ব্যবহার করতে থাকে; অবশ্য মাঝে মাঝে আপোষ সূত্রে তারা রোমক সংখ্যা ও নতুন আল গোরিজম পাশাপাশি ব্যবহার করত। ইটালীতেই সর্বপ্রথম এই নতুন সংখ্যা ব্যবহারিক জীবনে খাটানো শুরু হয়। পাইসার লিওনার্ডো ফিবোনাকসি মুসলিম ওস্তাদের নিকট শিক্ষালাভ করে উত্তর আফ্রিকায় পরিভ্রমণ করেন। তিনি একখানি বই প্রকাশ করেন। এই বই-ই আরবী সংখ্যা প্রবর্তনে সবচেয়ে বেশী সাহায্যে করে। তারো চেয়ে বড় কথা এই যে, এই বই হতেই ইউরোপীয় গণিত শুরু হয়। পুরাতন সংখ্যার সাহায্য কোন কোন ক্ষেত্রে গণিতের অগ্রগতি অসম্ভব হত । আমরা বর্তমানে যে হিসাব-বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত, তার মূলে ছিল আরবী সংখ্যা ও গুণ্য।

গ্রহ-বিজ্ঞান ও গণিতের মত উদ্ভিদ-বিজ্ঞানেও পাশ্চাত্য মুসলিমরা তাঁদের গবেষণা দ্বারা পৃথিবীর জ্ঞান-ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁরা খেজুর গাছ ও শন প্রভৃতি বৃক্ষ-লতার যৌন-পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করেন। বৃক্ষ-লতাকে তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেন : যথা–যে সব উদ্ভিদ কলম হতে জন্মে, যে সব বীজ হতে জন্মে আর যে সব (তাদের বিবেচনায়) আপনা-আপনি জন্মে। সেভিলের ইবনুল আওয়াম দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে কৃষি সম্বন্ধে একখানি বই লেখেন। এই বইখানি সমগ্র মুসলিম-জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম তো ছিলই, উক্ত বিষয়ে মধ্যযুগীয় শ্রেষ্ঠতম বইসমূহেরও অন্যতম ছিল। কতকটা পূর্ববর্তী গ্রীক ও আরব গবেষণা ও কতকটা স্পেনের মুসলিম কৃষকদের অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে এ বইয়ে ৫৮৫টি উদ্ভিদ এবং পঞ্চাশটির অধিক ফল গাছ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়। গাছে কলম করা, বিভিন্ন রকম জমি ও সারের গুণাগুণ, আঙ্গুর ও অন্যান্য গাছের ব্যারামের লক্ষণ এবং সে ব্যারামের সহজ প্রতিকার ইত্যাদির উপর নতুন আলোকপাত করা হয়।

ইবনুল বায়তার স্পেনের হয়তো সমগ্র মুসলিম-জগতের সবচেয়ে বিখ্যাত উদ্ভিদবিদ ও ঔষধ-মিশ্রণ বিজ্ঞানী ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তার লিখিত সহজ প্রতিকার’ মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠতম গ্রন্থ ছিল।

স্পেনীয় আরব চিকিৎসকদের বেশীর ভাগেরই চিকিৎসা ছিল একটা অতিরিক্ত পেশা। আসল পেশা ছিল অন্যকিছু। ইবনুল খতীব আরো অনেক চিকিৎসকের মত উজীরের পদে সমাসীন ছিলেন। চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কালো মৃত্যু’ ইউরোপকে উৎসন্ন করতে থাকে। খৃষ্টান চিকিত্সকরা এ ব্যারামকে আল্লাহর গজব মনে করে স্তম্ভিত হয়ে যায়। তখন গ্রানাডার এই মুসলিম চিকিৎসক সংক্রমণবাদের বাস্তব দিক বিশ্লেষণ করে একখানি বই লিখেন। বইখানিতে একটি সত্যিকার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় পাওয়া যায়, যথা : ‘কেউ কেউ বলেন, সংক্রমণবাদকে কি করে স্বীকার করতে পারি?’ তাঁদের আমরা বলি : অভিজ্ঞতা, অনুসন্ধান, ইন্দ্রিয়ের সাক্ষ্য এবং নির্ভরযোগ্য দলীল সমস্তই সংক্রমণের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। কাজেই আমাদের যুক্তি নির্ভুল। যখন কেউ নিজ চোখে দেখে যে, ব্যারামীর কাছে গেলেই ব্যারাম হয়, আর দূরে থাকলেই ব্যারাম হয় না এবং কাপড়-চোপড়, বাসন-কোসন ও কানের গয়না মারফত কি রকমে ব্যারাম ছড়িয়ে পড়ে, তখন আর সংক্রমণের অস্তিত্ব সম্বন্ধে তার কোন সন্দেহ থাকে না।

স্পেনে মুসলিম-আধিপত্যের প্রথম কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচ্য সংস্কৃতি উন্নততর স্তর হতে আন্দালুসীয়াতে প্রবাহিত হতে থাকে। স্পেনের জ্ঞানীরা বিদ্যার অন্বেষণে মিসর, সিরিয়া, ইরাক, পারস্য এবং ট্রান্স অকসিয়ানা ও চীন পর্যন্ত চলে যেতেন। কিন্তু একাদশ শতাব্দী হতে শুরু করে পরবর্তী শতাব্দীসমূহে স্রোতের গতি ফিরে যায়। দ্বাদশ শতাব্দীতে এই স্রোত এত কেঁপে ওঠে যে, তা ইউরোপেও গড়িয়ে পড়ে। আরব চিকিৎসা-বিজ্ঞান ইউরোপে প্রচার করার কাজে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা এবং স্পেন–বিশেষ করে টলেডো উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ করে। এই টলেডোতেই ক্রেমোনার জিয়ার্ড এবং মাইকেল স্কট কাজ করতেন। এইভাবে মুসলিম, খৃস্টান ও ইহুদী চিকিৎসাশাস্ত্রের পরস্পর সাক্ষাৎ ঘটে এবং ভবিষ্যৎ মিলনের পথ প্রশস্ত হয়। এই উপায়ে এবং কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থ। মারফত কতকগুলি আরবী পরিভাষা ইউরোপীয় ভাষায় প্রবেশ করে। যথা : জ্বলেপ’–(আরবী জুলাব), ফারসী গুলাব–গোলাব পানি) ঔষধ মিশ্রিত সুগন্ধ পানীয়; সীরাপ’ (আরবী শরাব) সরকারী ফরমূলা মোতাবেক তৈরী চিনির শরবত অনেক সময় ঔষধ মিশ্রিত। সোডা’–মধ্যযুগীয় ল্যাটিনে এর মানে ছিল মাথাধরা; আর সোডানাম’-এর মানে ছিল মাথা-ধরার ঔষধ। আসলে এ শব্দের মূল আরবী হচ্ছে, সুদা’–মাথার তীব্র বেদনা। আরবী হতে যেসব রাসায়নিক শব্দ ল্যাটিন মারফত ইউরোপীয় ভাষায় চলে গেছে, তার মধ্যে ‘অ্যালকোহল’, এলেমবিক’, ‘অ্যালকালী’ এবং অ্যানটিমনী’ উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু দার্শনিক চিন্তার ক্ষেত্রেই স্পেনীয় আরবরা মহত্তম কীর্তি অর্জন করে। গ্রীক-দর্শনকে স্পেনীয় ও প্রাচ্য দেশীয় মুসলিম মনীষীদের হাতে প্রয়োজন মোতাবেক–বিশেষ করে বিশ্বাসও যুক্তি ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের ব্যাপারে রূপান্তরিত করা হয় এবং সেই রূপান্তরিত জ্ঞান পাশ্চাত্যে প্রেরিত হয়। যে দর্শন গ্রীক মনীষীর সাধনায় এবং যে একেশ্বরবাদ-মূলক তত্ত্ব হিব্রু পয়গম্বরদের সাধনার বিকাশ লাভ করে, দুনিয়ার প্রতি প্রাচীন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেই ছিল শ্রেষ্ঠতম অবদান।

পশ্চিম ইউরোপে এইরূপে যে নতুন ভাবধারা প্রথম প্রবেশ করে, তা প্রধানতঃ ছিল দর্শন ও চিকিত্সা ঘটিত এবং এই ভাবধারাই ‘অন্ধকার যুগের অবসান এবং তত্ত্ব-সাধকদের যুগের আগমন সূচনা করে। ইউরোপীয় পণ্ডিত ও দার্শনিকরা আরবদের সংস্পর্শে উজ্জীবিত হয়ে এবং গ্রীক জ্ঞানের নব পরিচয়ে নতুন শক্তি সঞ্চয় করে অল্পকাল মধ্যে নিজেরা স্বাধীনভাবে জ্ঞান-সাধনা শুরু করেন। আজো আমরা তারই ফল ভোগ করছি।

আমরা এখানে মুসলিম স্পেনের কৃতী দার্শনিকদের মাত্র কয়েক জনের নাম করতে পারি। এদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ছিলেন ইবনে তোফায়েল (মৃত্যু ১১৮৫)। হায়য়ী-ইবনে-ইয়াজান’ (জাগ্রত জনের পুত্র জীবন্ত ব্যক্তি) নামক দার্শনিক উপখ্যান তার শ্রেষ্ঠতম কীর্তি। এ গ্রন্থের মূলকথা এই যে, মানুষের ধারণা শক্তি বাইরের কোন সহায়কের আনুকৌল্য ছাড়াও উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং সে যে সর্বশক্তিমানের উপর নির্ভরশীল, ক্রমে ক্রমে তাও সে আবিষ্কার করতে পারে। কাহিনীটি মধ্যযুগীয় সাহিত্যে একটি মনোরম এবং মৌলিক অবদান। কেউ কেউ মনে করেন যে, রবিনসন ক্রুসোর মূল উৎস এই গ্রন্থ। বইটি ১৬৭১ খৃস্টাব্দে ছোট (ইয়াঙ্গার) এডওয়ার্ড পোক’ক কর্তৃক ল্যাটিনে অনূদিত হয়। এরপর ইউরোপের অন্যান্য বহু ভাষায় এর অনুবাদ হয়; যথা–১৬৭২ খৃস্টাব্দে ডাচ ভাষায়, ১৯২০ খৃস্টাব্দে রুশ ভাষায় এবং ১৯৩৪ খৃস্টাব্দে স্পেনীয় ভাষায়।

সুবিখ্যাত মনীষী চিন্তানায়ক ইবনে রুশদ ১১২৬ সালে কর্ডোভা নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্রহ-বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং আরাস্তুর ভাষ্যকার ছিলেন। পাশ্চাত্য-জগতের উপর তিনি যে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেন, সে হিসেবে তাকে মুসলিম জগতের শ্রেষ্ঠতম দার্শনিক বলতে হয়। ইবনে রুশদের বড় অবদান একটি চিকিৎসা-পুস্তক। এতে তিনি বলেন যে, বসন্ত একজনকে একাধিকবার আক্রমণ করে না। তিনি রেটীনার কাজ নির্ভুলভাবে বর্ণনা করেন। ইহুদী ও খৃস্টান জগতে কিন্তু তিনি প্রধানতঃ আরাস্তুর ভাষ্যকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মধ্যযুগের ভাষ্যকার মানে ছিল, সেই ব্যক্তি যিনি পূর্ববর্তী চিন্তাবিদের লেখাকে পটভূমি করে কোন বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক বই লিখতেন। এই নিয়ম অনুসারে ইবনে রুশদ এক সিরিজ বই লেখেন এবং তাতে তিনি আংশিকভাবে আরাস্তুর বইয়ের নাম ব্যবহার করেন এবং তাঁর লেখার ব্যাখ্যা করেন। তিনি এশিয়া বা আফ্রিকার ছিলেন যতখানি, তার চেয়ে বেশি ছিলেন ইউরোপের। পাশ্চাত্য-জগতের চোখে আরাস্তু যেমন ছিলেন ‘প্রকৃত শিক্ষক, ইবনে রুশদ তেমনি ছিলেন প্রকৃত ভাষ্যকার।’ মধ্যযুগীয় ইউরোপের খৃস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ ও পণ্ডিতদের মনে ইবনে রুশদ যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন, এমন আর কোন গ্রন্থকারই করতে পারেন নাই। ইবনে রুশদের বই প্রথমে স্পেনের গোঁড়া মুসলমানদের মনে, পরে তালমুদীদের মনে এবং সর্বশেষে খৃস্টান পাদ্রী-পুরোহিতদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগ হতে মোড়শ শতাব্দীর অবসান কাল পর্যন্ত চিন্তা-জগতে ইবনে রুশদের মতবাদই প্রবল থাকে। ইবনে রুশদ যুক্তিবাদী ছিলেন এবং ধর্মের প্রত্যাদিষ্ট আদেশ-নিষেধ ছাড়া সব বস্তুরই স্বাধীনভাবে যুক্তির সাহায্যে বিচারের অধিকার দাবী করতেন। কিন্তু অনেকে যে মনে করে তিনি স্বাধীন চিন্তা ও কুফরের জনক এবং ধর্মের শত্রু ছিলেন, তা মোটেই সত্য নয়। প্রাথমিক মুসলিম আরাস্তুবাদীরা নিও-প্যাটোনিক ধরনের কতকগুলি বই সহ অনেকগুলি প্রক্ষেপ-দুষ্ট বইকে নিভাজ বলে মনে করেন। ইবনে রুশদের দর্শন সে সব বর্জন করে অকৃত্রিম ও বিজ্ঞানসম্মত আরাস্তুবাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। পাদ্রীদের দ্বারা আপত্তিকর অংশ বাদ দেওয়ার পর তাঁর লেখা প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবইরূপে, নির্বাচিত হয়। এ লেখার যত নিন্দা ও ভুল ব্যাখ্যাই থাক, তবু আধুনিক পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের অভুদয়ের আগ পর্যন্ত ইবনে রুশদের প্রবর্তিত চিন্তাধারাই ইউরোপীয় চিন্তা-জগতে জীবন্ত শক্তিরূপে ক্রিয়া করতে থাকে।

ইবনে রুশদের পর এ যুগের দার্শনিকদের মধ্যে প্রথম স্থানের দাবীদার হচ্ছেন, তাঁর সমসাময়িক কর্ডোভার মনীষী ইবনে মায়মুন। ইনি মোশেহ মায়মুন। বা মায়মুনাইডিস বলেও বিখ্যাত। সমস্ত আরবীয় অগ্রগতির যুগের মধ্যে ইনিই সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত ইহুদী চিকিৎসক ও দার্শনিক ছিলেন। ১১৩৫ সালে ইনি কর্ডোভায় জন্মগ্রহণ করেন; তাঁর পরিবার ১১৬৫ সালে কায়রোতে চলে যায়। কেউ কেউ বলেন যে, স্পেনে ইবনে মায়মুন প্রকাশ্যে নিজকে মুসলমান বলে পরিচয় দিতেন; কিন্তু নিজ গৃহে গোপনে ইহুদী ধর্ম পালন করতেন। ইদানীং গবেষকরা সকলে এ মত সমর্থন করতে পারেন নাই। কায়রোতে তিনি বিশ্ববিশ্রুত সালাহউদ্দীন ও তার পুত্রের সরকারী চিকিৎসক নিযুক্ত হন। ১৯৭৭ সাল হতে তিনি কায়রোর ইহুদী সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মযাজক ছিলেন। এইখানে ১২০৪ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর ওসিয়ৎ মোতাবেক যে পথে একদা হযরত মুসা চলেছিলেন, সেই পথে তার লাশ হাতে বহন করে টাইবেরিয়াসে সমাহিত করা হয়। আজো সেখানে তার অনাড়ম্বর সমাধির পাশে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী সমবেত হয়ে থাকে। কায়রোতে রাব্বী মোশে-বেন-মায়মুনের যে গীর্জা (সিনাগগ আছে, আর সংলগ্ন ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠে দূর দূরান্তর হতে দরিদ্র ইহুদী বিমারীরা এসে ভিড় করে এবং তথায় রাত্রি যাপন করে রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা করে। ইহুদী সমাজে যে তিনি কত বড় শ্রদ্ধার আসন অধিকার করে আসছেন, তা সে সমাজে প্রচলিত এই প্রবাদ বাক্যটিতেই বোঝা যায় : মুসা হতে মুসা পর্যন্ত মুসার মত কেউ ছিল না?

ইবনে মায়মুন গ্রহ-বিজ্ঞানী, ধর্ম-বিজ্ঞানী, চিকিত্সক এবং সর্বোপরি দার্শনিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ত্বক-ছেদন পদ্ধতির উন্নতি বিধান করেন, কোষ্ঠ কাঠিন্যকে হেমোরাইডস ব্যারামের কারণ বলে রায় দেন এবং স্বাস্থ্য বিজ্ঞান সম্বন্ধে উন্নত ধারণা পোষণ করতেন। তাঁর প্রধান দার্শনিক গ্রন্থের নাম ‘দালালাতুল হায়রিন’ (বিভ্রান্তদের পথপ্রদর্শক)। এ পুস্তকে তিনি ইহুদী ধর্ম শাস্ত্রের সঙ্গে মুসলিম আরাস্তুবাদ অথবা ব্যাপক অর্থে বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্তি সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেন। এইদিক হতে অন্ততঃ তিনি বাইবেলের স্বতঃসিদ্ধবাদের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক চিন্তার সাহসী সমর্থক ছিলেন। ফলে তিনি গোঁড়া শাস্ত্রবিদদের রোষ-ভাজন হন। এরা তার বইয়ের নাম দেয়, দালালাহ’ (গোমরাহকরণ)। স্বাধীনভাবে গবেষণা করলেও তাঁর দার্শনিক মতবাদের সঙ্গে ইবনে রুশদের মতবাদের সাদৃশ্য দেখা যায়। ইবনে রুশদের মত তিনিও গ্রীক ভাষায় অজ্ঞ ছিলেন এবং সম্পূর্ণভাবে আরবী অনুবাদের উপর নির্ভর করতেন। সৃষ্টি সম্বন্ধে তিনি অনু-মতবাদ (আল্লাহ সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা) আর নিও প্ল্যাটোনিক ও আরাস্তুর দার্শনিক মতবাদ। একটি ছাড়া ইবনে মায়মুনের সব বই আরবী ভাষায় লিখিত হয় এবং শীঘ্রই সে সব বই হিব্রুতে ও পরে আংশিকভাবে ল্যাটিনে অনূদিত হয়। তাঁর মতবাদের ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ইহুদী ও খৃস্টানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত তাঁর গ্রন্থাবলীই ইন্দী চিন্তাকে জেনটাইলদের নিকট পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম ছিল। আধুনিক সমালোচকেরা তার প্রভাবের পরিচয় বহু জনের মধ্যে দেখতে পান : যেমন–ডমিনিকান, ডান স্কোটাস, শিনোজা, এমন কি ক্যান্ট। এ যুগের মরমীবাদীদের মধ্যে ইবনে আরাবী প্রধান ছিলেন। সমগ্র ইসলামী সুফী-জগতে ইনি সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভাশালী চিন্তাবিদ ছিলেন। ইবনে আরবী সেভিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১২৪০ সালে দামেস্কে তাঁর মৃত্যু হয়। আজো তাঁর মাজার তথায় বিদ্যমান। তার একখানা বইয়ে তিনি হযরত মুহম্মদের (সঃ) নৈশ ভ্রমণ ও আসমানে যাওয়ার কাহিনী নিয়ে আলোচনা করেন। এতে দান্তের মহাকাব্যের পূর্বাভাব মিলে।

এয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত আরব-বিজ্ঞান ও দর্শনের ইউরোপ গমন সমাপ্ত হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই স্রোত টলেডো হতে পিরেনীজ পর্বতের আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে প্রোভেন্স এবং আল্পসের গিরি-পথে লোরেইন, জার্মানী এবং মধ্য-ইউরোপে গিয়ে পৌঁছে এবং সেখান হতে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে ইংল্যান্ডে গিয়ে হাজির হয়। ফ্রান্সে মার্সাই, তুলো, নারবেন এবং মন্টপেলিয়ার আরব চিন্তার কেন্দ্রস্থল ছিল। পূর্ব ফ্রান্সের অন্তর্গত কুনিতে একটি বিখ্যাত মঠ ছিল; এই মঠে কয়েকজন স্পেনীয় পাদ্রী ছিলেন। ফলে দ্বাদশ শতাব্দীতে এই স্থান আরব-জ্ঞান প্রচারের একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানকার পিটার ভেনারেবল নামক মঠাধ্যক্ষ ১১৪১ সালে অন্যান্য বহু পুস্তিকা ছাড়া কোরানের প্রথম ল্যাটিন অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। অবশ্য এসব ইসলামের বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল। দশম শতাব্দীতে লোরেইন বা লোথারিনজীয়াতে আরবী-বিজ্ঞান প্রবেশ লাভ করে। তার ফলে পরবর্তী দুই শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান বৈজ্ঞানিক প্রভাবের কেন্দ্র হিসেবে গণ্য হয়। লোথারিনজীয়ার শহরগুলির মধ্যে লীজ, গোরজ এবং কোলন আরবী জ্ঞানের অঙ্কুর উদগমের জন্য একান্ত উর্বর-ভূমি ছিল। লোরেইন হতে এ জ্ঞানের আলোক জার্মানীর চারদিকে বিচ্ছুরিত হয় এবং লোরেইনবাসী বা লোরেইনে শিক্ষাপ্রাপ্ত লোক দ্বারা নর্মান যুগের ইংল্যান্ডে নীত হয়।

এভাবে স্পেনীয় আরব জ্ঞান-বিজ্ঞান সমস্ত পশ্চিম-ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে । আর এর মাধ্যম হিসেবে স্পেনের ব্রতও সাধিত হয়।

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ১৬. ক্রুস হেলালকে উৎখাত করে

ক্রুস হেলালকে উৎখাত করে

যে অত্যদ্ভূত দ্রুতগতিতে আরবের মরু সন্তানেরা হিজরী প্রথম শতাব্দীর মধ্যে তৎকালীন সভ্য-জগতের অধিকাংশ জয় করে ফেলে, তার সঙ্গে সঙ্গে তুলনীয় যদি কিছু থাকে, তবে তা হযরত মুহম্মদের (সঃ) মৃত্যুর পর তৃতীয় শতকের মধ্য হতে চতুর্থ শতকের মধ্য পর্যন্ত কালের ভিতর আরব-আধিপত্যের দ্রুত অধঃতন। ৮২০ খৃস্টাব্দের কাছাকাছি সময় বাগদাদের খলীফার একক হাতে যে প্রভুত্ব-ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল, তা অন্য কোন জীবিত লোকের হাতে ছিল না। ৯২০ খৃস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে সেই ক্ষমতা তার পরবর্তীদের হাতে এত খর্ব হয়ে পড়ে যে, তার নিজ রাজধানীতেও সে ক্ষমতা বিশেষ অনুভূত হত না। ১২৫৮ সালে বাগদাদ শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এ শহরের সঙ্গে আবার প্রভুত্বও চিরবিদায় গ্রহণ করে এবং সত্যিকার খিলাফতের ইতিহাস খতম হয়ে যায়।

বাইরের কারণের মধ্যে মঙ্গোল বা তাফ্‌তারদের মত বর্বর জাতিসমূহের আক্ৰমণ জাকজমকপূর্ণ হলেও আসলে তা ছিল আরবজাতির শেষ পতনের অন্যতম কারণ। খিলাফতের কেন্দ্রভূমি ও তার পার্শ্ববর্তী স্থানে যে অসংখ্য বংশ ও উপবংশের উত্থান হয়, তাতে রোগের লক্ষণই প্রকাশ পায়; ও গুলিকে রোগের কারণ বলা চলে না। পাশ্চাত্যের রোমক সাম্রাজ্যের মত, রুগ্ন মানুষটি ইতিপূর্বেই তার শেষ শয্যায় শায়িত ছিল–এমন সময় চোর এসে দুয়ার ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে এবং তার রাজকীয় উত্তরাধিকারের ভাগ কেড়ে নিয়ে সরে পড়ে।

খিলাফত খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে। প্রথম যুগের অনেকগুলি বিজয় কেবল নামে বিজয় ছিল। তাছাড়া, শাসন-পদ্ধতি স্থায়িত্বের অনুকূলে ছিল না। প্রায় সর্বত্রই শোষণ ও অতিরিক্ত কর-ভারে প্রজাপুঞ্জ পীড়িত ছিল। আরব অনারব, আরব-মুসলমান, অনারব-মুসলমান, মুসলমান-জিম্মী–এদের মধ্যে বিভেদ রেখা অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। স্বয়ং আরবদের মধ্যেই উত্তর-আরব আর দক্ষিণ-আরবের মধ্যকার প্রাচীন রেষারেষি তেমনি তীব্রভাবে বিদ্যমান ছিল। ইরানের পারসিকতরা, তুবাণের তুর্করা আর হেমিটিক বার্বাররা সেমিটিক আরবদের সঙ্গে কখনো এক অভিন্ন জাতিতে পরিণত হতে পারে নাই। কোনো আত্মবোধই এই বিভিন্ন জন-সংঘকে একত্রে বেঁধে রাখতে পারে নাই। ইরানের সন্তানেরা কখনো তাদের জাতির অতীত গৌরব-মহিমা ভুলতে পারে নাই এবং কখনো এ নতুন শাসন-ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আপনভাবে গ্রহণ করে নাই। সিরিয়ার লোকেরা বহুকাল পর্যন্ত আশান্বিত চোখে চেয়ে ছিল যে, তাদের কোন নেতা আবির্ভূত হয়ে আব্বাসীয়দের অধীনতার বন্ধন হতে তাদের মুক্ত করবে। বার্বাররা সুযোগ মিললে যে কোন ষড়যন্ত্রে যোগ দিত এবং অস্পষ্টভাবে হলেও এর থেকে বুঝতে বাকী থাকত না যে, তারা তাদের কওমী দৃষ্টিভঙ্গী বা আরবদের সঙ্গে তাদের বিভিন্নতা কিছুতেই ভোলে নাই। রাজনীতি ও সমর ক্ষেত্রে যেমন–ধর্মেও তেমনি বিভেদ রেখা ফুটে ওঠে এবং তার ফলে অদ্ভূত হয় শীয়া, কারমাতী, ইসমাইলী, খারেজী ইত্যাদি মাযহাব। এইসব সম্প্রদায়ের কতকগুলি ধর্মীয় দল ছাড়া আরো কিছু ছিল। সাম্রাজ্যের পূর্বপ্রান্ত কতকগুলো ধর্মীয় দল ছাড়া আরো কিছু ছিল। সাম্রাজ্যের পূর্বপ্রান্ত কারমাতীদের আঘাতে টলে ওঠে; ফাতেমীরা অনতিকাল মধ্যে পশ্চিম ভাগ অধিকার করে নেয়। খিলাফত যেমন ভূমধ্যসাগরীয় দেশসমূহের সঙ্গে মধ্য-এশিয়ার দেশসমূহকে মিলিয়ে এক স্থায়ী অখণ্ডরাজ্য গড়ে তুলতে পারে নাই, ইসলামও তেমনি তার বিভিন্ন অনুবর্তীদের এক অখণ্ডজাতির বন্ধনে বেঁধে রাখতে পারল না।

এরপর সামাজিক ও নৈতিক প্রভাবও সাম্রাজ্যের ভাঙ্গনের অনুকূল ছিল । কয়েক শতাব্দীর মধ্যে বিজেতা জাতিসমূহের রক্ত বিজিতদের রক্তের সঙ্গে মিশে পাতলা হয়ে পড়ে; ফলে বিজেতারা তাদের বিশিষ্ট গুণ ও আধিপত্যের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আরব জাতীয়-জীবনের পতনের সঙ্গে আরবদের সহন-শক্তি ও মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। ক্রমে ক্রমে সাম্রাজ্য বিজিতদের সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। শাহীমঞ্জিলে হেরেম ও তার সংশ্লিষ্ট অসংখ্য খোঁজা, বালক-বালিকা গোলাম বাঁদী, গিলমান (এসব নারী-পুরুষ উভয়কে পতনের শেষ পর্যায়ে নিয়ে পৌঁছায়), অগণ্য উপপত্নী ও সতেলা ভাইবোন, তাদের হিংসা ও ষড়যন্ত্র, মদ ও সঙ্গীত প্রধান বিলাসময় জীবন–এই সমস্ত এবং অনুরূপ অন্যান্য শক্তি মিলে পারিবারিক জীবনের প্রাণশক্তি নিঃশেষ করে ফেলে। সিংহাসনের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অন্তহীন কলহ দুর্বল উত্তরাধিকারীদের অবস্থা আরো অনিশ্চিত করে তোলে।

অর্থনৈতিক অবস্থাও সাম্রাজ্য-রক্ষার পক্ষে প্রতিকূল ছিল। কর বসানো ও আঞ্চলিক শাসন শাসক-শ্রেণীর স্বার্থে পরিচালিত হওয়ায় কৃষি ও শিল্প পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে না। শাসকরা যে পরিমাণে ধনী হয়ে ওঠে, জনসাধারণ সেই পরিমাণেই গরীব হয়ে পড়ে। জমিদারীর অধীনে উপ-জমিদারীর সৃষ্টি হয় এবং শেষোক্ত প্রথার মালিকরা প্রজা-সাধারণকে লুট করে খেত। ঘন ঘন রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের ফলে লোক-সংখ্যা কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত-খামার অনাবাদী পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে মেসোপটেমিয়ার নিম্ন অঞ্চলে বন্যা ধ্বংসের তা শুরু করতঃ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ দুর্ভিক্ষ, বহু এলাকা প্লেগ, বসন্ত, ম্যালেরিয়া প্রভৃতি ব্যারামের মড়কে উজাড়-প্রায় হয়ে যেত। আরব ইতিহাসে বিজয়ের প্রথম চার শতাব্দীতে চল্লিশটি ব্যাপক মড়কের বিবরণ পাওয়া যায়। যে সব কারণে প্রাচ্যে এবং সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে মুসলিম-শক্তি ভেঙ্গে পড়ে, মোটামুটি ড্রপ কারণেই স্পেন ও ইউরোপের অন্যান্য অংশে মুসলিম-শক্তির পতন ঘটে। তফাতের মধ্যে এই ছিল যে, এখানে মঙ্গোলদের বদলে খৃষ্টানরা মৃত্যুবাণ হানে।

১০৩১ সালে কর্ডোভার উমাইয়া খিলাফতের পতন হয়। এর ধ্বংসস্তূপ হতে ছোট ঘোট এক ঝাঁক রাজ্যের উদ্ভব হয়। এসব রাজ্য ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি কাটাকাটি করে নিজেদের শক্তি-ক্ষয় করে। বিশটি শহর ও অঞ্চলে এমন বিশটি রাজ্যের উত্থান হয়। গ্রানাডার পরই সেভিলের ছিল গৌরবময় স্থান। কিন্তু শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই সেভিল এক নতুন উদীয়মান শক্তির হাতে পড়ে। এ শক্তি ছিল, মরক্কো হতে আগত এক বার্বার বংশ। এমনিভাবে স্পেনে বাবার প্রভুত্বের সূচনা হয়।

এ বার্বার বংশের নাম ছিল আল-মোরাভাইড। উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা ও স্পেন উভয়ই এদের আয়ত্তে ছিল। বংশের নামটি ছিল এক আরবী শব্দের অপভ্রংশ–মানে যোদ্ধা-দরবেশ দল। এরা প্রথমে এক সামরিক ভ্রাতৃসংঘ ছিল এবং সে সব কওমের পুরুষেরা চোখের নীচে মুখমণ্ডলের বাকী অংশ পরদায় ঢেকে রাখতো, এরা তাদের মধ্য হতে লোক সংগ্রহ করত। তাদের বংশধর ‘তুয়ারেগ’ কওম এখনো অমন পরদা পরে। এই জন্য এদের অন্য নাম হয় ‘পরদা পরনেওয়ালা’। আল-মোরাভাইডদের পর আরো একটি বার্বার বংশের অভ্যুদয় হয়। আরব বংশসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, গ্রানাডার নাসরিদ বংশ। এই বংশেরই মুহম্মদ আল-গালিব বিশ্ববিখ্যাত আলহামরা নির্মাণ করেন।

মুসলিম-শক্তির পতনকালে প্রাচ্য বা পাশ্চত্য জগতে যে সব ছোট ছোট রাজ্যের উত্থান-পতন হয়, তাদের ইতিহাস নিয়ে আমরা আলোচনা করতে চাই না। তবে সে কাহিনীর একটা মোটামুটি ধারণা আমাদের থাকা দরকার। বিশেষ করে ইউরোপে মুসলিম-শক্তির শেষ দিকের ঘটনাবলী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, যখন তারা পরস্পরকে ধ্বংস করতে ভীষণভাবে লিপ্ত, তখন তারা তাদের সংস্কৃতির বিস্তার-সাধনের কথা ভোলে নাই। কোন মানুষের পক্ষে তার জ্ঞান ও শিল্পকে অপরের মধ্যে প্রসারিত করার যে শক্তি, তা-ই তার সভ্যতার গৌরব ও বেঁচে থাকার ক্ষমতার পরিচায়ক।

একাদশ শতাব্দীতে যখন উমাইয়া খেলাফতের পতন হয়, তখনই খৃস্টান শক্তি কর্তৃক স্পেনের পুনর্জয়ের যুগ শুরু হয়। ৭১৮ সালে কোভাডোঙ্গার লড়াইয়ে অসুরিয়ান নেতা পিলায়ে মুসলিম অগ্রগমন রোধ করেন। স্পেনীয় ঐতিহাসিকেরা এই যুদ্ধ-জয়কেই স্পেন পুনর্জয়ের আরম্ভ মনে করে থাকেন। যদি মুসলমানরা অষ্টম শতাব্দীতে পর্বতাকীর্ণ উত্তর অঞ্চলের খৃস্টান-শক্তির শেষ দীপ নিভিয়ে দিত, তবে স্পেনের পরবর্তী ইতিহাস সম্পূর্ণ আলাদাভাবে লিখিত হতে পারত। উত্তরের খৃস্টান দলপতিদের মধ্যে প্রথম ভয়ঙ্কর আত্মকলহ থাকায় পুনর্জয়ের কাজে বাধা সৃষ্টি হতে থাকে; কিন্তু ১২৩০ খৃস্টাব্দে কেস্টাইল ও লিয়ন সংযুক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে মুসলিম শক্তির পতন দ্রুত গতিতে চলে। এয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত গ্রানাডা ছাড়া পুনর্জয় কার্যতঃ শেষ হয়ে যায়। ১০৮৫ সালে টলেডোর, ১২৩৬ সালে কর্ডোভার এবং ১২৪৮ সালে সেভিলের পতন হয়।

এয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের পর দুটি বড় কাজ শুরু হয় : স্পেনকে খৃস্টানীকরণ ও তার ঐক্য বিধান। এককালে, স্পেনের যে অংশে সেমিটিক ও কার্থেজেনীয় সভ্যতার বিকাশ লাভ ঘটেছিল, কেবল সেই অংশে ইসলাম শিকড় গাড়ে। সিসিলীতেও ঐ ব্যাপারই ঘটে। এ ব্যাপারটি তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীনকালে পিউনিক ও পাশ্চাত্য-সভ্যতার মধ্যে যে পর্যায়ের বিভেদ ছিল, ইসলাম ও খৃষ্টান ধর্মের মধ্যের বিভেদ মোটামুটি সেই পর্যায়ে বরাবরই বিদ্যমান ছিল। ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত বহু মুসলমান বিজিত হয়ে বা সন্ধি-সূত্রে খৃষ্টান শাসনাধীনে চলে যায়; কিন্তু তারা অন্যান্য ব্যাপারে তাদের আইন ও ধর্ম রক্ষা করে চলতে থাকে। এইসব মুসলমানকে বলা হত মুদেজার।’ ‘পোষ মানা’ অর্থবোধক একটি আরবী শব্দ হতে এই শব্দটি উদ্ভূত। বহু মুদেজার এই সময় আরবী ভুলে গিয়ে কেবল রোমান্স ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে এবং খৃস্টানদের সঙ্গে অনেকটা এক হয়ে যায়।

স্পেনে অবশেষে ঐক্য-সাধনার কাজ ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে চলতে থাকে। এই সময় খৃস্টান আধিপত্য কেস্টাইল ও আরাগন রাজ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৪৬৯ খৃস্টাব্দে আরাগনের ফার্ডিন্যান্ড ও কেস্টাইলের ইসাবেলার মধ্যে বিয়ে হয় এবং উভয় রাজ্য চিরতরে এক হয়ে যায়। এই মিলন মুসলিম-স্পেনের ধ্বংসের পথ অবারিত করে দেয়। এই ক্রমবর্ধমান বিপদের সম্মুখীন হওয়া নাসরিদ বংশের সাধ্যাতীত ছিল। এ বংশের শেষ সুলতান এক রক্তক্ষয়ী আত্মকলহে লিপ্ত হন এবং তার অবস্থা আরো বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। ১২৩২ হতে ১৪৯২ পর্যন্ত যে একুশজন সুলতান রাজত্ব করেন, তাঁদের মধ্যে ছয়জন দুইবার এবং একজন তিনবার রাজত্ব করেন। যে সময় আমেরিকার ইতিহাসের সূচনা, ঠিক সেই ১৪৯২ সালে এক দীর্ঘ অবরোধের পর খৃস্টান সৈন্যদের হাতে গ্রানাডার পতন ঘটে–স হেলালকে উৎখাত করে। উদার ম্রাট ও ম্রাজ্ঞী ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলা আত্মসমর্পণের শর্ত পালন করলেন না।

১৪৯৯ সালে রানী ইসাবেলার ধর্মগুরু কার্ডিনাল জিমেনেজ-ডি-সিসনারোর নেতৃত্বে জোর করে ধর্মান্তর কর গ্রহণের অভিযান শুরু হয়। কার্ডিনাল প্রথম চেষ্টা করেন ইসলাম বিষয়ক সমস্ত আরবী বই পুড়িয়ে ফেলতে। গ্রানাডার আরবী পাণ্ডুলিপি পোড়ানোর উৎসব শুরু হয়। এরপর প্রতিষ্ঠিত হয় বিধর্মী উচ্ছেদ আদালত (ইনকুইজিশন)! এর কাজ জোরেশোরে চলতে থাকে। গ্রানাডার পতনের পর যেসব মুসলমান স্পেনে রয়ে যায়, তাদের সবাইকে এখন থেকে বলা হয়, ‘মরিসকো’ (স্পেনীয় ভাষায় এর মানে হোট মুর)। রোমকরা পশ্চিম-আফ্রিকাকে বলত, মরেটানিয়া আর বাসিন্দাদের বলত ‘ম-রী’ (মনে হয়, আসলে ফিনিশীয় শব্দ–মানে পাশ্চাত্য)। এই মরী হতে স্পেনীয় মোয়রা এবং ইংরেজি মুর শব্দের উৎপত্তি। বার্বাররাই প্রকৃত মুর ছিল। কিন্তু স্পেন ও উত্তর পশ্চিম আফ্রিকার সমস্ত মুসলমানকেই মুর বলা হয়। ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে পাঁচ লাখ মুসলমান আছে; এদের বলা হয়, মোরো। মেগেলান কর্তৃক ১৫২১ সালে এই দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কৃত হওয়ার পর স্পেনীয়রা তথাকার মুসলমানদের এ নাম দেয়।

মুসলিম স্পেনীয়রা একটি রোমান্স উপভাষায় কথা বলত। কিন্তু ব্যবহার করত আরবী হরফ। বেশীর ভাগের না হলেও অনেক মরিসকোরই পূর্বপুরুষ স্পেনীয় ছিল। কিন্তু এখন সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, তাদের পূর্বপুরুষরা খৃষ্টান ছিল; কাজেই তাদের হয় আবার খৃস্টান হতে হবে, নইলে তার ফল ভোগ করত হবে। মুদেজারদের মরিসকোদের সঙ্গে এক শ্রেণীভুক্ত করা হয়। এদের অনেকে প্রকাশ্যে খৃস্টান ধর্ম স্বীকার করত; কিন্তু গোপনে ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান পালন করত। কেউ কেউ খৃস্টানী মতে বিয়ে করে বাড়ী এসে গোপনে ইসলামী মতে ফের বিয়ে করত। অনেকে বাইরে খৃস্টানী নাম রাখত–আর বাড়ীতে ব্যবহারের জন্য আরবী নাম রাখত। ১৫০১ সালে কেস্টাইলে এক রাজকীয় আদেশে ঘোষণা করা হয় যে, কেস্টাইল আর লিয়নের সব মুসলমানকে হয় খৃস্টান হতে হবে, না হয় স্পেন ছেড়ে চলে যেতে হবে। তবে মনে হয়, এ ঘোষণা অনুযায়ী যথাযথ কাজ হয় নাই। ১৫২৬ সালে আরাগনের মুসলমানদের উপর ঐ একই আদেশ জারী হয়। ১৫৫৬ সালে দ্বিতীয় ফিলিপ এক আইন জারী করেন যে, বাকী মুসলমানদের অনতিবিলম্বে তাদের ভাষা, নামাজ-রোজা, অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং জীবনযাত্রা প্রণালী ত্যাগ করতে হবে। তিনি এমন আদেশ দিয়ে বসেন যে, স্পেনীয় গোসলখানাগুলিও বিধর্মীদের চিহ্ন; কাজেই সেগুলি ভেঙ্গে ফেলতে হবে। গ্রানাডা-অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দেয় (এই দ্বিতীয় বার) এবং পার্শ্ববর্তী পার্বত্য অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পরে। তবে সে বিদ্রোহ দমন করা হয়। ১৬০৯ সালে তৃতীয় ফিলিপ মুসলিম বিতাড়নের শেষ হুকুম-নামায় দস্তখত করেন। এর ফলে স্পেনের সমস্ত মুসলমানকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়। কথিত আছে, প্রায় পাঁচ লক্ষ মুসলমান আফ্রিকা বা অন্য কোন মুসলিম দেশে যাওয়ার জন্য জাহাজে উঠতে বাধ্য হয়। প্রধানতঃ এই মরিসকোদের মধ্য হতেই পরে পয়দা হয় মরক্কোর জল-দস্যুদল। হিসেবে দেখা যায় যে, গ্রানাডার পতন ও সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দশকের মধ্যে প্রায় ত্রিশ লক্ষ মুসলমান হয় নির্বাসিত, না হয় নিহত হয়। স্পেনের মুর-সমস্যার এইভাবে চিরসমাধান ঘটে। আরবী-সভ্যতা যেখানে একবার শিকড় গেড়েছে, সেখানেই চিরস্থায়ী হয়েছে–স্পেন এই সাধারণ নিয়মের স্পষ্ট ব্যতিক্রম। মুররা নির্বাসিত হল। খৃস্টান-স্পেনকে ধার-করা আলো নিয়ে কিছুকাল চাঁদের মত উজ্জ্বল প্রতীয়মান হল। তারপর নেমে এল অন্ধকার। সেই হতে স্পেন অন্ধকারে ঘুরে মরছে।’

স্পেনে ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্থাপত্য-শিল্পের সমস্ত কীর্তি ধ্বংস পেয়েছে। একমাত্র টিকে আছে কর্ডোভার মহান মসজিদ। ৭৮৬ সালে একটি পুরোনো গীর্জার অবস্থান-ভূমিতে এ মসজিদের ভিত্তি স্থাপিত হয়। গীর্জায় আগে এখানে ছিল একটি রোমক মন্দির। চতুষ্কোণ মিনার সম্বলিত এর প্রধান অংশের কাজ ৭৯৩ সালে শেষ হয়। মিনারগুলি আফ্রিকার ভাস্কর্য-রীতি মোতাবেক নির্মিত হয়। আফ্রিকান রীতির মূল ছিল সিরীয়-রীতি। ১১৯টি স্তম্ভ এর ছাদ ধারণ করত। গীর্জার ঘন্টা দিয়ে নৈপতলের বাতি মসজিদের আলো দিত। একটি বাতি ঋড়ে এক হাজার আলো জ্বলত; সর্বাপেক্ষা ক্ষুদ্র ঝড়েও জ্বলত বারোটি। সিরিয়ার উমাইয়া মসজিদ নির্মাণে যেমন বাইজেন্টাইন রাজমিস্ত্রী মোতায়েন করা হয়, এখানেও তেমনি তারা নিযুক্ত হয়। এর স্থাপয়িতা গথদের নিকট হতে লুষ্ঠিত ৮০ হাজার দিনার মসজিদ নির্মাণে ব্যয় করেন। ১০০০ সাল পর্যন্ত মুসলমানেরা এর মেরামত ও সম্প্রসারণ করেন। আজ এ মসজিদ একটি গীর্জা।

ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য-নিরপেক্ষ স্থাপত্য-শিল্পের মধ্যে সেভিলের আলকাজার (আরবী শব্দ) এবং গ্রানাডার আলহামরার ধ্বংসাবশেষ অপূর্ব সুন্দর। এর কারু সজ্জা ছিল বহাল–কিন্তু বিচিত্র ও রমনীয়। সেভিলের আল-কাজারের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন অংশ টলেডোর একজন স্থপতি ১১৯৯-১২০০ সালে জনৈক আল মোয়াহেদী গভর্নরের জন্য তৈরী করেন।

মুসলিম স্পেনে আল-মোরাভাইডদের পর আল-মোয়াহেদীরা দ্বিতীয় বার্বার শাসক বংশ ছিল। আরবীতে একেশ্বরবাদী অর্থবোধক একটি শব্দ হতে এদের ঐ নাম হয় । নিষ্ঠুর রাজা পিটারের জন্য ১৩৫৩ সালে মুদেজার স্থপতিরা মুসলিম স্টাইলে আল-কাজার পুননির্মাণ করে। কিছুদিন আগেও এ ইমারত রাজপ্রাসাদরূপে ব্যবহৃত হত। কর্ডোভা, টলেডো ও অন্যান্য বহু স্পেনীয় শহরে আল-কাজার ছিল; তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত ছিল সেভিলের আল-কাজার এবং একমাত্র এই প্রাসাদটিই এখন পর্যন্ত বেঁচে আছে। টলেডোর আল কাজারটি শেষ গৃহযুদ্ধে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আল-হামরা প্রাসাদে হিস্পনো-মুসলিম রূপসজ্জার চরম উন্নতির পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রানাডার এই অ্যাপলিসটি বিরাট আকারে নির্মিত এবং মোজাইক ও উল্কীর্ণ বচনে ব্যাপকভাবে সজ্জিত হয়। জনৈক নাসরিদ সুলতান ১২৪৮ খৃস্টাব্দে এর পত্তন করেন। চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

পাশ্চাত্য মুসলিম স্থাপত্যে ঘোড়র নালের আকারের খিলান এই স্থাপত্যের স্বাভাবিক লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য নিকট প্রাচ্যে ইসলামের আগেও এ স্থাপত্য রীতির চল ছিল। ঘোড়ার গোলাকার নাল আকারে এ রীতি দামেস্কের উমাইয়া মসজিদে ব্যবহৃত হয়। এই শেষোক্ত রীতি স্পেনে মুরীশ খিলান’ নামে পরিচিত হয়। আরব বিজয়ের আগেও স্পেনে এ রীতি নিঃসন্দেহ রকমে বিদ্যমান ছিল; তবে স্পেনীয়–বিশেষ করে কর্ডোভার মুসলমানরা এর গঠন ও আলংকারিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করে জনসাধারণের মধ্যে এর প্রচলন করে। আরব অধ্যুষিত কর্ডোভার স্থপতিরা ইউরোপের ভাণ্ডারে আরো কতিপয় মৌলিক দান করে। স্থাপত্য বিদ্যার এইসব নব নব বৈশিষ্ট্য মোজারাবদের দ্বারা কর্ডোভা হতে টলেডো এবং উপদ্বীপের উত্তর অঞ্চলের কেন্দ্রে কেন্দ্রে নীত হয়। এখানে মুসলিম ও খৃস্টান রীতির মিলন হতে এক নবতি জন্মলাভ করে। ঘোড়ার নীল আকারে খিলান ও খিলান করা ছাদ এই রীতি র প্রায় অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য ছিল। মুদেজার মিস্ত্রীদের হাতে এই রীতি যথেষ্ট উন্নত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে স্পেনের জাতীয় রীতি হিসেবে গণ্য হয়।

গ্রানাডার পতনের বহুকাল পর পর্যন্ত মুরীয় নর্তক ও গায়কগণ স্পেন ও পর্তুগালের জনসাধারণকে আনন্দ বিতরণ করে। রাইবেরার ইদানিং যে গবেষণা হয়েছে তাতে দেখা যায় যে, কেবল স্পেনের নয়–সমস্ত দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপে ত্রয়োদশ শতাব্দী ও তার পরের সাধারণ সঙ্গীত, সে অঞ্চলের গীতি কবিতা ও ঐতিহাসিক উপন্যাসের মত আন্দালুসীয়া হতে উদ্ভুত এবং তার আগে তা আরবী মারফত পারসিক, বাইজেন্টাইন ও গ্রীক মূল হতে আসে। দর্শন, গণিত ও চিকিৎসাশাস্ত্র যেমন গ্রীস ও রোম হতে যায় বাইজেনটিয়াম, পারস্য এবং বাগদাদে–আবার বাগদাদ হতে যায় স্পেনে এবং স্পেন হতে যায় সমস্ত ইউরোপে, তেমনিভাবে সঙ্গীতের তত্ত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কিত কতিপয় বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে।

স্পেন বাদেও ইউরোপের মধ্যে একমাত্র সিসিলীতে মুসলমানরা শক্তভাবে আসন গেড়ে বসে। ৬৫২ সাল হতে সিসিলীতে মাঝে মাঝে আক্রমণ চলতে থাকে। ৮২৭ সালে এর বিজয় শেষ হয়। এরপর ১৮৯ বছর পর্যন্ত দুর্দান্ত আরব আমীরদের অধীনে সিসিলী আংশিক বা মোল আনা রকমে আরব জগতের একটি প্রদেশ হয়ে থাকে। এর রাজধানী ছিল পালারমা।

উত্তর অঞ্চলে আক্রমণ পরিচালনা ও অস্থায়ী বিজয়ের যেমন স্পেন ঘাঁটি বিশেষ ছিল ইটালী সম্পর্কে সিসিলীয় তেমনি ঘাঁটি ছিল। আমীর দ্বিতীয় ইব্রাহীম তিউনিসিয়া হতে আগত আগলাৰী ছিলেন। তিনি সিসিলীও শাসন করতেন। ৯০২ সালে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি জেহাদ করতে করতে প্রণালী পার হয়ে ইটালীর পায়ের আঙ্গুল কেলাবরিয়া পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেন। ইনিই কিন্তু প্রথম আরব আক্রমণকারী ছিলেন না। পালারমো অধিকার করার অল্পকাল পরেই উত্তর আফ্রিকার অন্য আগলাৰী সেনাপতিরা দক্ষিণ ইটালীর প্রতিদ্বন্দ্বী লর্ডদের কলহে হস্তক্ষেপ করে। তখনো ইটালীর গোড়ালী ও পায়ের আঙ্গুল বাইজেন্টাইনদের অধীনে। ৮৩৮ সালে যখন নেপলস আরব সাহায্যের জন্য আবেদন করে, তখন আরবদের যুদ্ধধ্বনি ভিসুভিয়াসের প্রান্তভূমি পর্যন্ত কাঁপিয়ে তোলে। এর প্রায় চার বছর পর আদ্রিয়াতিকের তীরে অবস্থিত বারী মুসলমানরা অধিকার করে বসে। এরপর প্রায় ত্রিশ বছর পর্যন্ত এই বারী ছিল এক উল্লেখযোগ্য ঘাঁটি। প্রায় এই সময়ই বিজয়ী মুসলমানরা ভেনিসের সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়। ৮৪৬ সালে একদল আরব সৈন্য রোম আক্রমণে উদ্যত হয়। ওসটীয়াতে এই সৈন্যদল অবতরণ করে এবং রোমের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভাঙ্গতে ব্যর্থ হয়ে ভ্যাটিকানের পার্শ্ববর্তী সেন্টপিটার গীর্জা ও প্রাচীরের বাইরের সেন্টপল গীর্জা পুড়িয়ে দেয়। তিন বছর পর একটি মুসলিম নৌ বাহিনী ওসটীয়াতে পৌঁছে; কিন্তু ঝটিকা-বিক্ষুব্ধ সমুদ্র ও ইটালীর নৌ বাহিনীর প্রতিরোধের সামনে বিধ্বস্ত হয়। র‍্যাফেলের একটি চিত্রে এই নৌ যুদ্ধ ও রোমের বিস্ময়করভাবে উদ্ধারের কাহিনী রঙের ভাষায় বর্ণিত আছে। কিন্তু ইটালীর উপর মুসলমানদের প্রভাব এমনি অপ্রতিহত হয় যে, পোপ অষ্টম জন (৮৭২-৮৮২) দুই বছর পর্যন্ত তাদের কর দেওয়া সমীচীন বোধ করেন।

আগলাবীরা ইটালীর উপকূলে অভিযান করেই ক্ষান্ত হয় নাই। ৮৬৯ সালে তারা মালটা দখল করে। দশম শতাব্দীতে ইটালী ও স্পেন হতে আল্পস পর্বতের ভিতর দিয়ে মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত লুণ্ঠন চলতে থাকে। আল্লাস পর্বতমালায় কতকগুলি দুর্গ ও দেয়াল আছে; পর্যটকদের পথনির্দেশ পুস্তকে বর্ণিত তথ্য (টুরিস্ট গাইড) অনুসারে এগুলি আরব আক্রমণের ফল। সুইজারল্যান্ডের ‘গ্যাবী’, ‘আলগ্যাবী প্রভৃতি কতকগুলি স্থানের নাম বোধহয় আরবী হতে উদ্ভূত।

৮৭১ সালে খুস্টানদের দ্বারা বারী’র পুনর্দখল মুসলমানগণ কর্তৃক ইটালী ও মধ্য ইউরোপে আক্রমণ আশঙ্কার সমাপ্তির সূচনা করে। বারীতে সেনাপতিরা এতদূর যায় যে, তারা পালারমোর আমীরের আনুগত্য অস্বীকার করে নিজেদের স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করে। ৮৮০ সালে বাইজেন্টাইন সম্রাট ১ম বেসিল মুসলমানদের নিকট হতে টারানটো কেল্লা পুনর্দখল করেন এবং তার কয়েক বছর পর কালাত্রিয়া হতে অবশিষ্ট আরবগণকে বহিষ্কৃত করেন। আড়াইশ’ বছর আগে সুদূর আরবে যে বিস্তৃতি শুরু হয়েছিল, এইরূপে তার সমাপ্তি ঘটে। যে সব আরব স্তম্ভ’ হতে সিসিলী বা আফ্রিকার আরব নৌ-বাহিনীর আগমন বার্তা ঘোষণা করা হত, আজো তা নেপলস-এর দক্ষিণ অঞ্চলে উপকূল ভাগের সৌন্দর্য বর্ধন করছে। ট্যানক্রেড-দ্য-হটেভিলের পুত্র কাউন্ট রোজার ১০৬০ সালে মেসিনা অধিকার করেন। এইরূপে নর্মানদের দ্বারা সমগ্র সিসিলী দখলের সূচনা হয়। ১০৭১ সালে পালারমো এবং ১০৮৫ সালে সিরাকিউস অধিকৃত হয়। ১০৯১ সালে অধিকার-কার্য সমাপ্ত হয়। ১৯৯০ সালে রোজার মালটা দখল করেন। মূল ভূখণ্ডে আগেই নর্মানদের একটা শক্তিশালী রাজ্য ছিল; এই বার তারা তাদের নব-বিজিত দেশ সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হয়।

সিসিলী দ্বীপ নর্মানদের অধীনে থাকাকালে সেখানে খৃস্টান ও মুসলমানদের কৃষ্টির সংমিশ্রণে এক নতুন তমদ্দুনের উদ্ভব হয়। সিসিলী আগে হতেই প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনে সমৃদ্ধ ছিল। আরব শাসনাধীনে থাকাকালে প্রাচ্য সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারা এখানে প্রবেশ করতে থাকে এবং আগের জামানার গ্রীক ও রোমক সভ্যতার নিদর্শনের সঙ্গে মিশে গিয়ে নর্মানদের আমলে নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করে এবং নর্মান সংস্কৃতি এক সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্যে ফুটে ওঠে। এতকাল পর্যন্ত আরবরা যুদ্ধ-বিগ্রহে এমন গভীরভাবে লিপ্ত ছিল যে, তারা শান্তি কালোপযোগী কোন শিল্পের বিকাশ সাধন করার অবকাশ পায় নাই। এক্ষণে তাদের প্রতিভা আরব শিল্প ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অপূর্ব সাফল্য সম্পদে ফুটে উঠল।

প্রথম রোজার নিজে অশিক্ষিত খৃষ্টান ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর বেশীর ভাগ পদাতিক সৈন্য মুসলমানদের মধ্য হতে সংগ্রহ করেন। তিনি আরব জ্ঞান বিজ্ঞানে উৎসাহ দিতেন, প্রাচ্য দেশীয় দার্শনিক, জ্যোতিষী এবং চিকিৎসক দ্বারা পরিব্রত থাকতেন এবং অখৃস্টানদের আচার অনুষ্ঠানের স্বাধীনতা দিতেন। ফলে মনে হত, পালারমোর দরবার মুখ্যত : প্রাচ্যদেশীয় এবং গৌণতঃ পাশ্চাত্যদেশীয় ছিল। এর একশত বছরেরও পর সিসিলীতে এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা যেত ও দেখা যেত, এ খৃস্টান রাজ্যের কতকগুলি উচ্চতম পদে অধিষ্ঠান করছে মুসলমান কর্মচারী।

ইউরোপ মহাদেশে প্রাপ্ত কাগজে-লিখিত প্রাচীনতম দলীল হচ্ছে গ্রীক ও আরবীতে লেখা একটি হুকুমনামা। সম্ভবতঃ ১৯০৯ সালে প্রথম রোজারের পত্নী এই আদেশ জারী করেন। মনে হয়, এ কাগজ সিসিলীতে উৎপাদিত হয় নাই সিসিলীর আরবরা প্রাচ্য দেশ হতে আমদানী করে।

প্রথম রোজার যে আরব-সিসিলীর মৈত্রীর সূচনা করেন, তার পূর্ণ বিকাশ দেখা যায় তাঁর পুত্র ও উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় রোজার (১১৩০-১১৫৪) এবং দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের মধ্যে। দ্বিতীয় রোজার মুসলমানের মত পোশাক পরতেন। তার সমালোচকরা তাকে বলত “আধা-বিধর্মী রাজা’। তার পোশাকে পূর্ণাঙ্গ আরবী সাজ-সজ্জার বৈশিষ্ট্য ছিল। এমনকি তাঁর পৌত্রের আমলেও একজন ভ্রমণকারী পালারমোর মহিলাগণকে মুসলিম পোশাক পরতে দেখে।

দ্বিতীয় রোজারের দরবারের প্রধান অলঙ্কার ছিলেন আল-ইদরিসী। সমস্ত মধ্যযুগের মধ্যে তাঁর মত কৃতী ভৌগোলিক ও মানচিত্রবিদ আর একজনও ছিলেন না। তার পুরানাম ছিল আরু আবদুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে মুহম্মদ আল ইদরিসী। ১১০০ সালে সিউটার এক স্পেনীয় আরব পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। ১৯৬৬ সালে তিনি পরলোক গমন করেন। দ্বিতীয় রোজারের পৃষ্ঠপোষকতায় পালারমো শহরে থেকে তিনি তার জীবনব্যাপী সাধনা করেন। তাঁর রোজারীয় গ্রন্থে তিনি টলেমী, আল-মাসুদী প্রমুখ ভৌগোলিকদের মতের সংক্ষিপ্ত সার দিয়েই তুষ্ট হন নাই; বরং যে সব লোক তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন দেশে প্রেরিত হয়, তাদের প্রদত্ত মূল বিবরণের উপরই প্রধানতঃ নির্ভর করেন। এই সব তথ্যের তুলনমূলক আলোচনা ও বিশ্লেষণে তিনি দৃষ্টির অসামান্য প্রসারতা প্রদর্শন করেন এবং পৃথিবী যে গোল, তা’ এবং দ্রুপ বহু মৌলিক তত্ত্ব-জ্ঞানের পরিচয় দেন। তিনি নীলনদের উৎপত্তি স্থান নির্দেশ করেন, যদিও ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তীকালে এ তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে বলে মনে করা হয়। এ গ্রন্থ তাঁর এক অমর কীর্তি। এছাড়া তিনি তার নর্মান পৃষ্ঠপোষকের জন্য রূপ দিয়ে মহাশূন্যের একটি ম্যাপ ও পৃথিবীর একটি ম্যাপ তৈরী করেন। সিসিলীর দ্বিতীয় ‘খৃস্টান-সুলতান ছিলেন দ্বিতীয় রোজাবের পৌত্র হোহেনস্টফেনের দ্বিতীয় ফ্রেডারিক। তিনি সিসিলী ও জার্মানী উভয় দেশই শাসন করতেন। ১২২০ সালের পর তিনি পবিত্র রোমক সম্রাজ্যের অধিপতি’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং ব্রিয়েনের ইসাবেলাকে বিয়ে করে বায়তুল মোকাদ্দেসের রাজা হন। সুতরাং, ধর্মের বিষয়াদির বাইরে সম্রাট ফ্রেডারিক খৃস্টজগতের উচ্চতর ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। এই বিয়ের তিন বছর পর তিনি এক ক্রুসেডে বের হন। এর ফলে ইসলামী আদর্শে তিনি আরো প্রভাবান্বিত হন।

ব্যক্তিগত ও সরকারী জীবনে ফ্রেডারিক অর্ধ-প্রাচ্যপন্থী ছিলেন। তিনি হেরেম প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর দরবারে দীর্ঘ দাড়ি ও দোলায়মান পোশাক নিয়ে সিরিয়া ও বাগদাদের দার্শনিকরা বিরাজ করত, প্রাচ্যদেশ হতে নর্তকী বালিকা এসে হাজির হত, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য উভয় অঞ্চল হতে ইহুদীরা আসত। রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্বন্ধ সূত্রে তিনি মুসলিম জগত-বিশেষতঃ মিসরের সুলতানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করে চলতেন। সূর্য কিরণে উটপাখীর আণ্ডা ফুটানোর পন্থা পরীক্ষা করার জন্য তিনি মিসর হতে বিশেষজ্ঞ আনেন। সিরিয়া হতে তিনি দক্ষ বাজপালক এনে উক্ত পাখীকে শিকার শিক্ষা দেওয়ার কাজ পর্যবেক্ষণ করেন এবং বাজের চোখ পরীক্ষা করে বুঝতে চেষ্টা করেন যে, বাজ কেবল গন্ধের সাহায্যে তার খাদ্য খুঁজে বের করতে পারে কিনা। থিওড়ো এনটিওক একজন জোকোবাইট খৃস্টান ছিলেন। তিনি জ্যোতিষশাস্ত্র জানতেন এবং ফ্রেডারিকের দোভাষীর কাজ করতেন। সম্রাটের আদেশে তিনি বাজপাখী দ্বারা শিকার সম্বন্ধীয় বই লেখেন। এই-ই ছিল প্রকৃতির ইতিহাস বিষয়ক প্রথম আধুনিক পুস্তক। থিওডোরের আগে মাইকেল স্কট ফ্রেডারিকের দরবারের জ্যোতিষী ছিলেন। ১২২০ হতে ১২৩৬ সাল পর্যন্ত মুসলিম-স্পেনের জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্বন্ধে তিনি বিশেষজ্ঞ বলে গণ্য হতেন। ম্রাটের জন্য স্কট আরবী হতে ইবনে সিনার ভাষ্য সম্বলিত আরাস্তুর শরীর-তত্ত্ব ও পশু-পাখী তত্ত্ব সম্বন্ধীয় বইয়ের অনুবাদ করে বইখানি সম্রাটের নামে উৎসর্গ করেন। এই অনুসন্ধান শৃহা এবং এই পরীক্ষামূলক নীতি ও গবেষণা ফ্রেডারিকের দরবারের বৈশিষ্ট্য ছিল আর এখান হতেই ইটালীর রেনেসার সূচনা হয়।

অনলাইনে বেস্টসেলিং বই কিনুন

কিন্তু ফ্রেডারিকের একক মহত্তম অবদান ছিল তার নেপলস বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (১২২৪)। সুস্পষ্ট সনদ অনুসারে স্থাপিত এই-ই ছিল ইউরোপের সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে তিনি সংগৃহীত বহু আরবী পাণ্ডুলিপি মওজুদ করেন। আরাস্তু ও ইবনে রুশদের গ্রন্থ তিনি অনুবাদ করান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য করেন। এই অনুবাদের কপি তিনি প্যারিস ও বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করেন। নেপলস বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন টমাস একুইনাস। চতুর্দশ শতাব্দী হতে শুরু করে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত প্যারিস, অক্সফোর্ড প্রভৃতি ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী অধ্যয়নের ব্যবস্থা ছিল; কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা–মুসলিম দেশসমূহের জন্য মিশনারী তৈরী করা।

সিসিলী দুই সাংস্কৃতিক অঞ্চলের মিলনভূমি হিসেবে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় জ্ঞান আদান-প্রদানের এক অপূর্ব মাধ্যমে পরিণত হয়। এর বাসিন্দাদের মধ্যে কতক ছিল জাতিতে গ্রীক, তারা গ্রীক ভাষায় কথাবার্তা বলত; কিছুসংখ্যক ল্যাটিন জানা পণ্ডিত ছিল। এ তিনটি ভাষাই সরকারী কাগজে, রাজকীয় সনদে এবং পালারমোর জনসাধারণের কথা-বার্তায় ব্যবহৃত হত।

সিসিলীর নর্মান রাজারা তাদের পরবর্তীদেরসহ কেবল সিসিলী নয়, দক্ষিণ ইটালীও শাসন করতেন। এইরূপে সিসিলী হতে মুসলিম সংস্কৃতির বিভিন্ন উপকরণ সমগ্র ইটালী ও মধ্য ইউরোপে যাওয়ার জন্য তারা সেতু-বন্ধ স্বরূপ ছিলেন। দশম শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত আল্পস পর্বতের উত্তর অঞ্চলে মুসলিম তমনের স্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। দান্তের পরলোক সম্বন্ধীয় ধারণা কোন নির্দিষ্ট আরবী বই থেকে না নেওয়া হতে পারে, কিন্তু একথা নিশ্চিতই মনে হয় যে, সে ধারণার মূল ছিল প্রাচ্য দেশে, যদিও কবি তা ইউরোপীয় লোক-কাহিনী হতে গ্রহণ করেন। প্রাচ্য দেশ হতে নানা পথে এই অনুপ্রবেশ স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয় ইউরোপের শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞানে। সিসিলী ও ইটালীর দক্ষিণ ভাগ খৃস্টান শাসনে চলে যাওয়ার বহুদিন পরেও মুসলিম কারিগর ও শিল্পীদের আদর ছিল। প্যালেটাইন চ্যাপেলে তাদের মোজাইক ও লিপি-শিল্পই তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। পালারমো রাজপ্রাসাদে মুসলিম শাসকরা যে বিখ্যাত বয়ন-শিল্পাগার স্থাপন করেন, তা হতে উৎপন্ন সূক্ষ্ম কাপড় (আরবী লিপি-শিল্পের অলংকারসহ) ইউরোপীয় রাজপরিবারসমূহের পোশাকের অভাব পূরণ করত। প্রাচ্যে বোনা কাপড়ের চাহিদা এত প্রবল ছিল যে, তার অন্ততঃ এক প্রস্থ না থাকলে কোন ইউরোপীয় ভদ্রলোকই স্বস্তিবোধ করতেন না।

অনলাইনে বেস্টসেলিং বই কিনুন

পঞ্চদশ শতাব্দীতে ভেনিস অত্যন্ত ক্ষিপ্ততার সঙ্গে মুসলিম ফ্যাশন গ্রহণ ও চারদিকে বিস্তার করতে থাকে। এই সময় ইটালীর দফতরিখানায় বাধা এই আরবী চেহারা গ্রহণ করতে শুরু করে। আরব দফতরিদের বাঁধানো বইয়ে পাতার সামনের প্রান্ত রক্ষার জন্য ফ্ল্যাপ থাকত। খৃষ্টানদের বইয়ে এই ফ্ল্যাপসহ আরব বাঁধাইয়ে অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়। সেই সঙ্গে চামড়ার খাপ কারুকার্য খচিত করার বিদ্যাও ইটালীর বিভিন্ন শহরের মুসলিম কারিগরদের নিকট হতে শিক্ষা করা হয়। ভেনিস আরো একটি আরব-শিল্পের কেন্দ্র ছিল পিতলের উপর সোনা, রূপা অথবা লাল তামার কাজ। মুসলিম সংস্কৃতি বিস্তারে স্পেনের পরই সিসিলীর স্থান এবং ক্রুসেডের যুগে তার স্থান ছিল সিরিয়ার উপরে।

মুসলমানদের শেষ চিহ্ন যখন ইউরোপের বুক হতে মুছে যাচ্ছিল, তখন বাগদাদের খিলাফত ষড়যন্ত্র ও রক্তপাতের দরীয়ায় হাবুডুবু খাচ্ছে। এর পরের অবস্থা কি হবে এবং কোন্ পথে সে নতুন অবস্থার আগমন ঘটবে, নবম শতাব্দীতে তুলুনিদ বংশের প্রতিষ্ঠায় তার আংশিক পরিচয় পূর্বাহ্নেই পাওয়া যায়। খিলাফতের বুকের মধ্যে যে তুর্করা বাসা বেঁধে এতকাল নীরব ছিল, এ বংশের প্রতিষ্ঠায় তাদেরই রাজনৈতিক আশা-আকাক্ষা দানা বেঁধে ওঠে। এরপর আরো শক্তিশালী তুর্ক বংশ রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হয়। খিলাফতের ধ্বংসের উপর যে সব রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তার মধ্যে আহমদ ইবনে তুলুন-এর রাজ্য অন্যতম। আহমদ ৮৬৮ সালে ক্ষমতা হস্তগত করেন। এইসব রাজ্য কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সম্বন্ধ সম্পূর্ণ রকমে ছিন্ন করে এবং কেবল নামেমাত্র বাগদাদের খলীফার আনুগত্য স্বীকার করতে থাকে। কোন উচ্চাভিলাসী অধীনস্থ কর্মচারী তার আপন বাহুবলে এবং গোলাম ও অনুচরদের সাহায্যে অমন বিরাট রাজ্যের বুকে কি করে সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারে প্রভুত্ব স্থাপন করতে পারে, আহমদ তার প্রমাণ। কিন্তু যে রাজ্যের উপর তুলুনিদ ও দ্রুপ অন্যান্য বংশ শাসন-ক্ষমতা পরিচালন করত, সে রাজ্যের ভিতর তাদের জাতীয় ভিত্তি ছিল না। তাদের দুর্বলতার মূল ছিল, রাজ্যে তাদের স্বজাতীয় ঐক্যবদ্ধ কোন দলের সমর্থনের অভাব। শাসকরা ছিল অনধিকার প্রবেশকারী। তাদের দেহ রক্ষীরাই ছিল তাদের সৈন্য এবং এ দেহরক্ষীদের তারা বাইরের বিজাতীয়দের মধ্য হতে সংগ্রহ করত। কেবল অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোকই এমন শাসন চালাতে পারে। এদের সবল বাহু দুর্বল হয়ে পড়া মাত্রই চারদিকে ভাঙ্গন শুরু হয়। ইবনে তুলুন যে রাজ্য স্থাপন করেছিলেন, তা রাজ্যের চতুর্থ উত্তরাধিকারী তার পুত্রের আমলে ৯০৫ সালে আব্বাসীয় খলীফাদের হাতে ফিরে যায়।

আর একটি স্বতন্ত্র বংশ দুইশ’ বছরের উপর শাসন পরিচালনা করে এবং ইতিহাসে একটা পাতা যোগ করে। এদের দিকে এখন আমাদের মনোযোগ দিতে হয়। এ ছিল ফাতেমীয় খলীফাদের বংশ-মুসলিম-জগতে একমাত্র উল্লেখযোগ্য শীয়া খিলাফত। বাগদাদের খলীফারা মুসলিম-জগতের যে নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত ছিল, তারই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ৯০৯ সালে তিউনিসে এর প্রতিষ্ঠা হয়। অল্পকাল মধ্যেই এরা মিসর ও সমগ্র উত্তর আফ্রিকার উপর আধিপত্য স্থাপন করে এবং তাদের অধীনে কায়রো শহর নব গৌরব মহিমায় উন্নীত হয়। কিন্তু সাময়িকভাবে অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েও এরা দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে নাই। নীলনদের যে পানি তীর ছাপিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত, তারই উপর বাসিন্দারা তাদের রুটির জন্য নির্ভরশীল ছিল; সুতরাং তাদের আর্থিক অবস্থা ছিল একান্ত অনিশ্চিত। দুর্ভিক্ষ, প্লেগ ও খাজনা আদায়কারীদের অত্যাচার, ষড়যন্ত্র ও অনাচারের সেই পুরানো কাহিনী–সমস্ত মিলে ফাতেমীয়দের দুর্বল করে ফেলে। ক্রুসেডের আমলে ১১৭১ সালে বিশ্ব বিখ্যাত সালাহউদ্দীন এ খিলাফতের অবসান করেন।

রাজনৈতিক দিক হতে ফাতেমীয় বংশ মিসরে এক নতুন যুগের সূচনা করে। ফেরাউনদের পর মিসর এই প্রথম একটা সার্বভৌম এবং জীবন্ত শক্তির অধীশ্বর হয়। একজন পারসিক মিশনারী ১০৪৬–১০৪৯ সালে মিসরে ভ্রমণ করতে আসেন এবং উচ্চ প্রশংসাপূর্ণ একটি বিবরণ রেখে যান। খলীফার প্রসাদে ৩০ হাজার লোক থাকত; তার মধ্যে চাকর ছিল ১২ হাজার, অশ্বারোহী এবং পদাতিক ১০ হাজার। ভ্রমণকারী একদা এক উৎসব উপলক্ষে তরুণ খলীফাকে দেখেন। তিনি একটি খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন। চেহারাটি সুন্দর দাড়ি ছাটা। পরনে কেবল একটি সাদা জামা আর পাগড়ী–তাঁর মাথার উপর প্রসারিত বহু মূল্য রত্ন খচিত ছত্র। রাজধানীতে খলীফার ২০ হাজার বাড়ী ছিল–বেশীর ভাগই ইটে তৈরী ও পাঁচ হতে ছয় তলা। তার দোকানও অনুরূপ সংখ্যক ছিল; প্রত্যেক দোকান মাসে দুই হতে দশ দিনার হারে ভাড়া দেওয়া হত। প্রধান রাস্তাগুলির ছাদ ও ছাদের নীচে বাতি ছিল। দোকানদাররা একদামে জিনিস বিক্রি করত। কোন দোকানদার গ্রাহককে ঠকালে তাকে উটে চড়িয়ে ঘন্টা বাজিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরানো হত আর অপরাধী অনবরত তার অপরাধ স্বীকার করতে থাকত। এমন কি মনিকার ও বাট্টাদারদের দোকানও খোলা রেখে যাওয়া হত। সমস্ত দেশব্যাপী এমন নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি ভ্রমণকারীর নজরে পড়ে যে, তিনি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, আমি এ দেশের ধন-সম্পদের কোন পরিমাণই করতে পারলাম না। আমি আর কোথাও এত সমৃদ্ধির নিদর্শন দেখি নাই।’

ফাতেমীয়রা যখন মিসর ও উত্তর আফ্রিকায় আধিপত্য বিস্তার করে, তখন বাগদাদের পুরানো সাম্রাজ্যে ভাঙ্গন ধরে। সালজুক তুর্করা শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে এবং তুগরীল নমে তাদের একজনকে ১০৩৭ সালে রাজধানীতে শাসনকর্তা নিযুক্ত করে। নতুন নতুন তুর্কী উপজাতীয় কওমের লোক এসে এদের সৈন্যদল পুষ্ট করতে থাকে। সালজুকরা তাদের রাজ্যও চারদিকে বাড়াতে থাকে। আবার পশ্চিম এশিয়া এক সাম্রাজ্যে একীভূত হয় এবং ইসলামের বাহু বলের বিলীয়মান গৌরব ফিরে আসে। ইসলামের বিশ্ব-নেতৃত্বের সগ্রামে মধ্য এশিয়া হতে এক নতুন জাতি এসে রক্তের খেলায় মেতে ওঠে। এই বর্বর অবিশ্বাসীরা কি করে পয়গম্বরের অনুচরদের ঘাড়ে পা রাখে–আবার তাদেরই ধর্ম গ্রহণ করে সে ধর্মের একনিষ্ঠ রক্ষক হয়ে দাঁড়ায়, ইসলামের বিচিত্র ইতিহাস তার কাহিনী নতুন নয়। তাদেরই জ্ঞাতি এয়োদশ শতাব্দীর মঙ্গোলরা এবং তাদের অন্য জ্ঞাতি চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের ওসমানীয় তুর্করা তো এই একই কাজের পুনরাবৃত্তি করে। রাজনৈতিক ইসলামের সর্বাপেক্ষা দুর্দিনে ধর্মীয় ইসলাম তার কতিপয় শ্রেষ্ঠতম বিজয় অর্জন করে।

ইসলামের আসমানে সত্যি তখন ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। ১২১৬ সালে চেঙ্গীজ খ ষাট হাজার দুর্ধর্ষ মঙ্গোল যোদ্ধার এক ভয়াবহ বাহিনী নিয়ে দ্রুতগামী ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে অদ্ভুত ধনুক হাতে চারিদিকে ত্রাস সৃষ্টি আর নিষ্ঠুর ধ্বংসের আগুন জ্বালাতে বের হন। এদের হামলার তাণ্ডবে প্রাচ্য ইসলামের তামদুনিক কেন্দ্রগুলির অস্তিত্ব মুছে যায়; তাদের স্থান রয়ে যায় উষর নির্মম মরুভূমি; অথবা যেখানে ছিল মস্ত বড় বড় ইমারত ও কুতুবখানা, সেখানে পড়ে থাকে বিকট ধ্বংসস্তূপ। তাদের পেছনে লোহিত দাগ রেখে চলে বিশুষ্ক রক্ত প্রবাহ। হিরাটের ১ লক্ষ বাসিন্দার মধ্যে বেঁচে যায় মাত্র ৪০ হাজার। বোখারার সুবিখ্যাত মসজিদগুলিকে বর্বররা তাদের ঘোড়ার আস্তাবলে পরিণত করে। বলখ ও সমরকন্দের বাসিন্দাদের অধিকাংশকে নির্মমভাবে হত্যা করে অবশিষ্টদের বন্দী করে নেয়। খাওয়ারিজমকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। শীঘ্রই বাগদাদের পালা আসে। বোখারা দখল করে নাকি চেঙ্গীজ খ ঘোষণা করেন : আমি আল্লাহর গজব, পাপীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছি। যে লোকদের তিনি পরিচালন করেন, তারা ব্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে চীন হতে আদ্রিয়াতিক পর্যন্ত সমস্ত ভূভাগ ওলোট পালোট করে তোলে। রাশীয়া আংশিকভাবে অধিকৃত হয় এবং তারা মধ্য ইউরোপের পূর্ব শীয়া পর্যন্ত প্রবেশ করে। ১২৪১ সালে চেঙ্গীজ খাঁর পুত্র ও উত্তরাধিকারীর মৃত্যু হয় বলে পশ্চিম ইউরোপ মঙ্গোল হামলাকারীদের হাত হতে বেঁচে যায়। কিন্তু বাগদাদের রেহাই ছিল না।

হালাকু খাঁ ছিলেন চেঙ্গীজ খাঁর অন্যতম পৌত্র। ১২৫৩ সালে এক বিপুল বাহিনীসহ হালাকু খিলাফত ধ্বংসের জন্য মঙ্গোলীয়া হতে নির্গত হন। এমনিভাবে মঙ্গোল যাযাবরদের দ্বিতীয় তরঙ্গ এগিয়ে আসতে থাকে। বাগদাদ সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ হতে যে সব ছোট ছোট রাজ্য মাথা তুলে উঠেছিল, হালাকুর সৈন্য প্রবাহে তাদের সবগুলি ভেসে যায় । ১২৫৮ সালের জানুয়ারী মাসে হালাকুর দুর্বার মঙ্গোল তরঙ্গ বাগদাদের প্রাচীরে প্রাচীরে ভেঙ্গে পড়ে। রাজধানীর দেয়াল সে তরঙ্গের অভিঘাত সইতে পারে না; ভগ্নপথে মঙ্গোল প্রবাহ প্রবেশ করে সমস্ত বাধা-বিঘ্ন ভাসিয়ে নিয়ে যায়। হালাকুর একজন খৃস্টান স্ত্রী ছিল; সেই ভরসায় খলীফার উজীর নেস্টোরীয়ান ধর্মযাজককে সঙ্গে নিয়ে হালাকুর শিবির দুয়ারে পৌঁছে সন্ধির শর্ত জিজ্ঞাসা করে পাঠান। কিন্তু হালাকু তাকে সাক্ষাত দান করতে রাজী হন নাই। কেউ কেউ গিয়ে হুঁশিয়ারীর বাণী উচ্চারণ করে বলেন : বাগদাদ শান্তির শহর। অতীতে এ শহর যারা আক্রমণ কিংবা আব্বাসীয় খিলাফত ধ্বংস করতে এসেছে, তারা নিপাত গিয়েছে। কিন্তু হালাকুর মনে ভয়ের রেখাপাত মাত্র হয় না। কেউ কেউ গিয়ে বলে–খলীফাকে হত্যা করলে সমস্ত বিশ্বে বিপ্লব শুরু হবে; সূর্য তার মুখ লুকাবে, বৃষ্টিপাত থেমে যাবে, গাছ-পালার জন্ম বন্ধ হবে। কিন্তু হালাকুর সাথে জ্যোতিষী ছিল এবং তাঁরা তাঁকে জয়ের পক্ষে নিশ্চয়তার পরামর্শ দেয়। হালাকু অবিচলিত থাকেন। দশই ফেব্রুয়ারী তক তার বর্বর অনুচরেরা শহর ভরে ফেলে। হতভাগ্য খলীফা তার তিনশ’ সভাসদসহ এসে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেন। দশ দিন পর তাঁদের সবাইকে হত্যা করা হয়। শহর আগুন আর লুণ্ঠনের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। খলীফার পরিবারের লোকজনসহ বেশীর ভাগ বাসিন্দাকেই কতল করা হয়। পথের পাশে পাশে লাশ পচে গলে যায়; তার দুর্গন্ধে হালাকু কয়েক দিনের জন্য শহর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। বাগদাদে তাঁর বাস করার ইচ্ছা ছিল বলে অন্যান্য বিজিত শহরের মত বাগদাদকে ধ্বংসতূপে পরিণত করা হয় নাই। নেক্টোরীয়ান যাজক-পতি বিশেষ ভাষার অনুশীলন, অনুগ্রহ পান। কয়েকটি মসজিদ এবং মদ্রাসা বেঁচে যায় বা পুনর্নির্মিত হয়। জুমার নামাজে যার নামে খোতবা পড়া চলে, এমন খলিফার অভাব মুসলিম জগতে এই প্রথম দেখা দেয়।

১২৬০ সালে হালাকু উত্তর সিরিয়া আক্রমণে উদ্যত হন। এখানে তিনি হামা, হারিম ও আলেপ্পো দখল করেন। শেষোক্ত শহরে ৫০ হাজার লোককে হত্যা করা হয়। ইতিমধ্যে তার ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ আসে। কাজেই দামেস্ক বিজয়ের জন্য সৈন্য পাঠিয়ে তিনি পারস্যে ফিরে আসেন। তাঁর ফেলে-আসা সৈন্যরা দামেস্ক অধিকার করে। কিন্তু তারপর ১২৬০ সালে নাজারেথের নিকট তারা বায়বার্সের হাতে বিধ্বস্ত হয়। বায়বার্স আরব জগতের শেষ উল্লেখযোগ্য বংশ মামলুকদের কৃতী সেনাপতি ছিলেন।

হালাকুই প্রথম ইল-খান উপাধি গ্রহণ করেন ১৯৬৫ সালে তাঁর মৃত্যুর অর্ধ শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে হযরত মুহম্মদের (সঃ) ধর্ম আবার এক মহোজ্জ্বল বিজয় লাভ করে : সপ্তম খান ইসলামকে রাষ্ট্রের ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন। যেমন মামলুকদের বেলায়, তেমনি মঙ্গোলদের বেলায় মুসলমানদের বাহুবল যেখানে পরাজয় মানে, ইসলাম সেখানে জয়লাভ করে।

ইতিমধ্যে দূর পশ্চিম প্রান্তে ইসলাম আর এক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়। এ সঙ্কটের ফলে আমাদের সভ্যতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় পৃষ্ঠা যুক্ত হয় এবং ইসলামের এক মহত্তম সেনানী ও বন্ধুর আবির্ভাব ঘটে। এ ছিল ক্রুসেড-আর সালাহউদ্দীনের যুগ।

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ১৭. ক্রুসেড

ক্রুসেড

ইতিহাসের দূর অতীত হতে প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যে ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া লক্ষিত হয়, ক্রুসেড তারই মধ্যযুগীয় অধ্যায়। ট্রোজান ও পার্সীয়ান যুদ্ধগুলি ছিল সূচনা। পশ্চিম ইউরোপের এ যুগে এই সাম্রাজ্য বিস্তার তার আধুনিকতম পরিণতি।

আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে বলা চলে যে, ৬৩২ সাল হতে মুসলিম এশিয়া সিরিয়া, এশিয়া মাইনর, স্পেন ও সিসিলী প্রভৃতি ভূভাগে যে আক্রমণমূলক সংগ্রাম পরিচালনা করে, ক্রুসেড তারই বিরুদ্ধে খৃস্টান ইউরোপের প্রতিক্রিয়া। ক্রুসেডের পরিপোষক আরো কতকগুলি পূর্ববর্তী কারণ ছিল; যেমন : টিউটনিক সম্প্রদায়গুলির যাযাবর জীবন ও সগ্রাম প্রবণতা; ইতিহাসে প্রথম আবির্ভাব কাল হতে এরা ইউরোপের মানচিত্র বদলিয়ে দেয়; ১০০৯ সালে একজন ফাতেমীয় খলীফা কর্তৃক বায়তুল মোকাদ্দেসের গীর্জা ধ্বংস;–এখানে হাজার হাজার ইউরোপীয় তীর্থে যেত এবং ৮০০ সালে এর চাবি বায়তুল মোকাদ্দেসের প্রধান পুরোহিত শার্লেমেনকে আশীর্বাদরূপে পাঠান; আর এশিয়া মাইনরের ভিতর দিয়ে যাওয়া কালে তীর্থযাত্রীদের প্রতি জুলুম। কিন্তু ক্রুসেডের আশু কারণ ছিল, বাইজেন্টাইন সম্রাট আলেকসিয়াস কমনেনাস-এর যুদ্ধ আবেদন। সালজুকদের দ্বারা তার এশিয়াস্থ মর্মরার উপকূল পর্যন্ত আক্রান্ত হয়। তারা কন্সটানটিনোপলের উপর পর্যন্ত হামলা করতে ব্ৰতী হয়। এই অবস্থায় সম্রাট ১০৯৫ সালে পোপ দ্বিতীয় আরবানের নিকট আবেদন করেন। মনে হয়, পোপ এই আবেদনের সুযোগ নিয়ে গ্রীক চার্চ ও রোমক চার্চের মধ্যে ঐক্যবিধানের আশা পোষণ করছিলেন; কারণ, উভয়ের ভিতরকার মতবাদমূলক বিভেদ ইতিপূর্বেই ১০০৯ ও ১০৫৪ সালের মাঝখানে দূরীভূত হয়েছিল।

১০৯৫ সালের ২৬ নভেম্বর পোপ আরবান দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের ক্লারমন্ট নামক স্থানে যে বক্তৃতা দেন, জগতের ইতিহাসে অমন কার্যকরী বক্তৃতা বোধহয় আর কেউ কখনো দেন নাই। তিনি ধার্মিকদের সম্বোধন করে পবিত্র জেরুজালেমের পথে অগ্রসর হয়ে সে স্থানকে পাপিষ্ঠ জাতির হাত হতে উদ্ধার করে নিজেদের অধীনে আনতে আহ্বান জানান। এ যুদ্ধ ঈশ্বর চান–এই ধ্বনি দেশের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ছোট বড় সবাইকে উন্মত্ত করে তোলে। পরবর্তী বছর বসন্তকালে দেড়লক্ষ লোক এ আবেদনে সাড়া দেয় এবং কন্সটানটিনোপলে একত্র হয়। এদের মধ্যে বেশীর ভাগই ছিল ফিরিঙ্গী (ফ্রাঙ্ক) ও নর্মান। এদের সবাই নিজ নিজ পোশাকে ক্রুস চিহ্ন বহন করত; তাই এদের অভিযানের নাম হয় ক্রুসেড। এইরূপে প্রথম ক্রুসেড শুরু হয়।

যারা ক্রুস বহন করে যাত্রা করে, তাদের সবাই যে ধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে অগ্রসর হয়, এমন নয়। বোহেমন্ড-এর মত কতিপয় নেতা নিজেদের জন্য ছোট খাটো রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। পিসা, ভেনিস ও জেনোয়ার সওদাগরগণ ব্যবসায়ের সুযোগ খুঁজতে বের হয়; দুঃসাহসী ও ধর্মোম্মাদগণ নতুন কর্মক্ষেত্রের অনুসন্ধানে গৃহ ত্যাগ করে এবং পাপীরা এই পথে প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। ফ্রান্স, লোরেইন, ইটালী এবং সিসিলীর দারিদ্র-পীড়িত জনসাধারণ ক্রুসেডে যাওয়াকে ত্যাগ স্বীকার মনে না করে বরং লাভজনকই মনে করত।

ক্রুসেডকে সাত হতে নয় সংখ্যায় বিভক্ত করার যে সনাতন নীতি চলে আসছে, তা সন্তোষজনক নয়। মোটের উপর এ ছিল এক অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ; কাজেই এদের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভেদ রেখা টানা কঠিন। তবে একে তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা চলে : প্রথম বিজয়ের যুগ (১১৪৪ সাল পর্যন্ত); দ্বিতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার যুগ এবং সালাহ্উদ্দীনের বিরাট বিজয়; তৃতীয়–ছোট ছোট ঘরোয়া যুদ্ধের যুগ (১২৯১ পর্যন্ত)–এ সময় তারা সিরিয়ার মূলভূমি হতে শেষ ঘাঁটি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। বিজয়ের যুগ সম্পূর্ণরূপে তথাকথিত দ্বিতীয় ক্রুসেডের (১১৪৭–১১৪৯) আগে পড়ে এবং তৃতীয় যুগ মোটামুটি এয়োদশ শতাব্দীর সাথে মিলে যায়। এই শেষোক্ত যুগের একটি ক্রুসেড পরিচালিত হয় কন্সটানটিনোপলের বিরুদ্ধে (১২০২–১২০৪), দুইটি মিসরের বিরুদ্ধে (১২১৮–১২২১), একটি তিউনিসের বিরুদ্ধে (১২৭০)। এ সব অভিযান নিষ্ফল হয়।

প্রথম ক্রুসেডারগণ কন্সটানটিনোপল হতে এশিয়া মাইনরের পথে যাত্রা করে। ম্রাট আলেকসিয়াস অধিকাংশ ক্রুসেডীয় নেতার নিকট হতে তার প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি আগেই নিয়ে রেখেছিলেন। ক্রুসেডারগণ তাদের বিজয় পথে এশিয়া মাইনরের অর্ধভাগের উপর বাইজেন্টাইন প্রভুত্ব পুনঃস্থাপন করে এবং তুর্কদের ইউরোপ আক্রমণ সাড়ে তিনশ’ বছর পিছিয়ে দেয়।

১০৯৪ সালের মধ্যেই ক্রুসেডারগণ ইডেসা, টারসাস, এনটিওক এবং আলেপ্পা অধিকার করে। যে ‘পবিত্র বর্শা’ ক্রুসোপরি যীশুখৃস্টের দেহকে বিদ্ধ করে এবং যা বহু শতাব্দী পর্যন্ত এনটিওকের একটি গীর্জার তলে সমাহিত ছিল, ক্রুসেডারদের দ্বারা সেই বর্শা আবিষ্কৃত হওয়ায় তাদের উৎসাহ শতগুণে বেড়ে যায়। ১০৯৯ সালের ৭ জুন প্রায় বিশ হাজার নিয়মিত সৈন্যসহ চল্লিশ হাজার ক্রুসেডার জেরুজালেমের সম্মুখে গিয়ে হাজির হয়। এখানে মিসরীয় সৈন্য দলের সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। জেরিকোর দেয়াল যেমন ধ্বসে পড়েছিল, জেরুজালেম দেয়ালও তেমনি ধ্বসে পড়বে –এই ভরসায় ক্রুসেডাররা খালি পায় শিঙ্গা ধ্বনি করতে করতে চারপাশ ঘুরে আসে। ১৫ জুলাই আক্রমণকারীরা নগরে প্রবেশ করে এবং নর-নারী ও আবাল-বৃদ্ধ নির্বিশেষে নগরবাসিগণকে কতল করে। শহরের অলিতে-গলিতে ও ভ্রমণ স্থানে স্থূপীকৃতভাবে মানুষের মাথা, হাত ও পায়ের পাতা পড়ে থাকতে দেখা যায়। ক্রুসেডারদের অনেকে তাদের ব্রত সাধিত হয়েছে ভেবে জাহাজে চড়ে দেশে ফিরে যায়।

ফ্রান্সের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী কাউন্ট ছিলেন তোলোর রেমন্ড। তিনি ও বোহোন্ড, বলডুইন, গডফ্রে এবং ট্যানক্রেডের নেতৃত্বে ক্রুসেডাররা সিরিয়া ফিলিস্তিনে তিনটি ছোট ল্যাটিন রাজ্য স্থাপন করে এবং আরো রাজ্য স্থাপনে উদ্যোগী হয়। কিন্তু এসব রাজ্য বেশী দিন টিকে নাই। তাদের কলহ-কোন্দলের বিবরণ আরব ইতিহাসের অঙ্গ নয় ইউরোপীয় ইতিহাসের একটি অধ্যায়। তবে স্থানীয় লোক এবং ইউরোপীয় আগন্তুকদের মধ্যে যে শান্তি ও বন্ধুত্বময় সম্বন্ধ গড়ে ওঠে, তা উল্লেখযোগ্য।

খৃষ্টানরা পবিত্র ভূমিতে এই ধারণা নিয়ে আসে যে, তারা স্থানীয় লোকদের চেয়ে বহু গুণে উন্নত; স্থানীয় লোকেরা প্রতিমা পূজক, তারা হযরত মুহম্মদকে (সঃ) আল্লাহ, জ্ঞানে পূজা করে। প্রথম সাক্ষাতেই তাদের এ ভুল ভেঙ্গে যায়। খৃস্টানরা আরবদের মনে যে ধারণা রেখে আসে, তা একজন আরব ঐতিহাসিকের কথায় পাওয়া যায়? ইউরোপীয় লোকগুলি জন্তু; তবে তাদের সাহস ও লড়াইয়ের ক্ষমতা–এই দুই গুণ আছে; আর কিছুই নাই। স্থানীয় ও আগন্তুকদের মধ্যে যুদ্ধের চেয়ে শান্তির সময় দীর্ঘতর ছিল। এই সময়ে তারা বাধ্য হয়ে পাশাপাশি থাকে; কিন্তু এই বাধ্যতামূলক প্রতিবেশিত্বের ফলে তারা পয়গম্বরকে জানাবার সুযোগ পায়; ফলে তাদের পরস্পরের প্রতি আগের মনোভাব বহুলাংশে বদলে যায়। ক্রমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। ফিরিঙ্গীরা বিশ্বাসভাজন স্থানীয় লোককে ক্ষেত-খামারের কাজে নিযুক্ত করতে থাকে। তারা যে সামন্ততান্ত্রিক প্রথার প্রবর্তন করে, আস্তে আস্ত তা স্থানীয় ভূমি-ব্যবস্থায় স্থান করে নেয়। তারা তাদের সঙ্গে ঘোড়া, বাজ ও কুকুর নিয়ে যায়। অল্পকাল মধ্যেই চুক্তি হয়ে যায় যে, শিকারীদল আক্রমণের বিপদ হতে মুক্ত থাকবে। পথিক ও সওদাগরদের জন্য রক্ষী বদলা–বদলী হত এবং সাধারণতঃ উভয় পক্ষই সত্য রক্ষা করত। ফিরিঙ্গীরা ইউরোপীয় পোশাক ছেড়ে দিয়ে দেশীয় লোকের অধিকতর আরামজনক পোশাক গ্রহণ করে। খাওয়া-খাদ্য ব্যাপারে–বিশেষ করে চিনি ও মসলাযুক্ত খাদ্যের দিকে তাদের নতুন রুচি গড়ে ওঠে। প্রাচ্য ফ্যাশনের বড় বড় কোঠা ও প্রবহমান পানির উৎস-যুক্ত বাড়ীই তারা পছন্দ করতে শুরু করে। কেউ কেউ স্থানীয় লোকের মধ্যে বিয়ে-শাদী করে। এমন ঘরের ছেলে-মেয়েকে বলা হত ‘পুলেইন’-বকরীর বাচ্চা’ অথবা কেবল বাচ্চা। মুসলমান ও ইহুদী উভয়ে ভক্তি করে এমন কোন কোন তীর্থস্থানকে তারা ভক্তি করা আরম্ভ করে। তাদের মধ্যে কলহের অন্ত ছিল না। সে সব কলহে তারা কখনো কখনো বিধর্মীদের সাহায্য চাইত; মুসলমানরাও তাদের দুশমনের বিরুদ্ধে খৃস্টানদের সাহায্য চাইত।

খৃস্টানরা সিরিয়া এবং মিসরের অধিকাংশ স্থান জয় করে নেয়। মুসলিম জগতে ১১২৭ হতে এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। আর তারই ফলে রঙ্গমঞ্চের কেন্দ্রস্থলে আবির্ভূত হন এক অসাধারণ বীর পুরুষ সালাহ্উদ্দীন আল-মালিক আল-নাসির আস সুলতান সালাহউদ্দীন ইউসুফ। সিরিয়ার এক কুর্দ পরিবারে এর জন্ম হয় ১৯৬৯ সালে। ইনি মিসরের উজীরের পদে কাজ করেন। তারপর ইনি মিসর হতে শীয়া মতবাদ উৎসাদনে এবং ফিরিঙ্গীদের বিরুদ্ধে জেহাদে নিজকে উৎসর্গ করেন।

ছয়দিন অবরোধের পর ১১৮৭ সালের ১ জুলাই সালাহ্উদ্দীন টাইবেরিয়াস দখল করেন। এরপর এল সন্নিহিত হিট্টিনের লড়াই। এ লড়াই শুরু হয় শুক্রবারে; সালাহ্উদ্দীনের লড়াই শুরু করার এই-ই ছিল একটি প্রিয় দিন। আর ফিরিঙ্গীদের জন্য এ ছিল এক বিষাদময় দিন। তারা সংখ্যায় প্রায় বিশ হাজার ছিল; পিপাসায় কাতর অবস্থায় তারা প্রায় সকলেই দুশমনের হাতে বন্দী হয়। সম্ভ্রান্ত বন্দীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অভিজাত ছিলেন জেরুজালেমের রাজা গাই-ডি লুসিগনান। বীর সুলতান ক্ষুণ্ণ রাজাকে পরম সমাদরে গ্রহণ করেন; কিন্তু তার সঙ্গী চ্যাটিলনের রেজিনান্ডের জন্য অন্য ব্যবস্থা করা হয়। সমস্ত ল্যাটিন নেতার মধ্যে রেজিনাল্ডই বোধহয় সর্বাপেক্ষা দুঃসাহসী এবং সর্বাপেক্ষা দুর্নীতিপরায়ণ ছিলেন। তিনি সবচেয়ে ভাল আরবী বলতে পারতেন। তিনি কারাক (ল্যাটিনে) ‘ক্রাক’ শহরের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়ে সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে একাধিকবার নিকটবর্তী পথে নিরীহ কাফেলা লুণ্ঠন করেন। তিনি একটি নৌবাহিনী নিয়ে হজযাত্রীদের উপর আক্রমণ দ্বারা হেজাজের পবিত্র উপকূলে উৎপাত করেন। সালাহ্উদ্দীন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি নিজ হাতে এই সন্ধি ভঙ্গকারীকে হত্যা করবেন। এইবার তার প্রতিজ্ঞা পূরণের সুযোগ আসে। আরবের মেহমানদারীর সনাতন রীতি অনুযায়ী কোন লোককে কিছু খেতে দিলে আর তার উপর অস্ত্র ধারণ করা চলে না। সেই সুযোগ নেওয়ার মতলবে রেজিনাল্ড সালাহউদ্দীনের তাঁবু হতে এক গেলাস পানি চেয়ে খান। কিন্তু এ পানি সালাহ্উদ্দিন নিজে খেতে দেন নাই; কাজেই দুইয়ের মধ্যে মেজবান ও মেহবান সম্বন্ধ স্থাপিত হতে পারে নাই। রেজিনাল্ডকে তার বিশ্বাসঘাতকতার জন্য জান দিতে হল। টেম্পলার ও হস্পিটালার নামীয় যোদ্ধাদের সবাইকে প্রকাশ্য স্থানে হত্যা করা হয়।

হিট্টিনের বিজয়ে ফিরিঙ্গীদের কপাল ভাঙ্গে। এক সপ্তাহের অবরোধের পর জেরুজালেম ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর আত্মসমর্পণ করে। আকসা মসজিদে খৃস্টানদের ঘণ্টা-ধ্বনির স্থলে মুয়াজ্জিনের আজান ধ্বনি শুরু হয় এবং প্রস্তর গম্বুজের উপর যে সোনার ক্রুস ছিল, সালাহউদ্দীনের সৈন্যরা তা ছিঁড়ে নামিয়ে আনে।

ল্যাটিন রাজ্যের রাজধানী দখল হওয়ায় সিরিয়া-ফিলিস্তিনের বেশীর ভাগ ফিরিঙ্গী শহরই সালাহ্উদ্দীনের হাতে আসে। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত কয়েকটি অভিযানে তিন বাকী দুর্গগুলি দখল করে নেন। দেশ হতে ফিরিঙ্গীদের সমূলে উচ্ছন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। কয়েকটি ছোট ছোট শহর ও কেল্লাসহ কেবল এনটিয়ক, ত্রিপলী এবং টায়ার তাদের হাতে থাকে।

জেরুজালেমের পতন ইউরোপকে জাগিয়ে তোলে। রাজায় রাজায় কলহ তারা ভুলে যায়। জার্মানীর সম্রাট ফ্রেডারিক বারবারোসা, ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড কোর-ডি-লায়ন এবং ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ অগাস্টাস ক্রুস ধারণ করে তলোয়ার খোলেন। পশ্চিম ইউরোপে এরাই ছিলেন সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী রাজ্যেশ্বর এবং এঁদেরই নিয়ে শুরু হয় তৃতীয় ক্রুসেড (১১৮৯ ১১৯২)। এঁদের সৈন্যসংখ্যা ছিল বিপুল। এ ক্রুসেডের ময়দানে একদিকে সালাহ্উদ্দীন, অন্যদিকে কোর-ডি-লায়ন (সিংহ-হৃদয়)-এই দুই দুর্দোণ্ডপ্রতাপ প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ে প্রাচ্যে-পাশ্চাত্যে কত কাব্য কাহিনীই না রচিত হয়েছে।

ফ্রেডারিক সকলের আগে যাত্রা করেন ও স্থল পথে অগ্রসর হন; কিন্তু পথি মধ্যে সিসিলীর একটি নদী পার হওয়ার সময় ডুবে মারা যান। তাঁর অনুচরদের বেশীর ভাগই দেশে ফিরে যায়। যাওয়ার পথে রিচার্ড সাইপ্রাস অধিকার করেন। পরবর্তীকালে এই সাইপ্রাসই মূল-ভূমি হতে বিতাড়িত ক্রুসেডারদের শেষ আশ্রয় স্থল হয়ে দাঁড়ায়।

ইতিমধ্যে জেরুজালেমের ল্যাটিনরা সাব্যস্ত করে যে, তাদের হৃত রাজ্য উদ্ধার করতে একার চাবিকাঠির কাজ করতে পারে। সুতরাং, তাদের সমস্ত সৈন্য-বল একত্র করে তারা একারের পানে যাত্রা করে। ফ্রেডারিকের বাকী সৈন্য দল ও ফ্রান্সের রাজার কয়েক দল যোদ্ধা এসে এদের সঙ্গে যোগ দেয়। রাজা গুই সালাহ্উদ্দীনের হাতে বন্দী ছিলেন। তিনি আর কোনদিন সুলতানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবেন না এই শর্তে সুলতান তাকে কিছুকাল আগে মুক্তি দেন। সেই গুই এসে একার আক্রমণের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। আক্রান্ত নগর পুনরুদ্ধার করার জন্য পরদিনই সালাহ্উদ্দীন এসে হাজির হন ও দুশমনদের শিবিরের । অপর দিকে তাঁবু গাড়েন। জলে-স্থলে সংগ্রাম চলতে থাকে। রিচার্ডের আগমনে ক্রুসেডাররা উল্লসিত হয়ে ওঠে ও খুশীতে বাজী পোড়ায়। অবরোধকালে বহু চিত্তাকর্ষক ঘটনা ঘটে এবং আরবী ও ল্যাটিন উভয় ভাষাতেই তার মনোরম বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়। সালাহ্উদ্দীন এবং রিচার্ডের মধ্যে উপহার আদান-প্রদানও চলে; তবে উভয়ের মধ্যে সাক্ষাৎ হয় নাই। শহরের দেয়াল হতে প্রত্যেক পাথর খুলে আনার জন্য রিচার্ড প্রচুর পুরস্কার ঘোষণা করেন। ফলে পুরুষ ও নারী অনেকেই অসাধারণ সাহসের পরিচয় দেয়। কেউ কেউ এই অবরোধকে মধ্যযুগের অন্যতম প্রধান সামরিক অভিযান বলে মনে করেন। দীর্ঘ দুই বছর পর্যন্ত অবরোধ চলতে থাকে–১১৮৯ সালের ২৭ আগস্ট হতে ১১৯১ সালের ১২ জুলাই পর্যন্ত। ফিরিঙ্গীদের সুবিধা ছিল, তাদের নৌ-বাহিনী আর অবরোধের আধুনিক যন্ত্রপাতি মুসলমানদের সুবিধা ছিল, তাদের এক নেতৃত্ব। শেষ পর্যন্ত কেল্লার পতন হয়।

দুটি শর্তে কেল্লা আত্মসমর্পণ করে? পয়লা শর্ত–২ লক্ষ দিনারের বদলে কেল্লার সমস্ত সৈন্যকে ছেড়ে দেওয়া হবে; দ্বিতীয় শর্ত-পবিত্র জুস খৃস্টানদের ফেরত দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যেও মুক্তি-মূল্য আদায় না হওয়ায় রিচার্ডের আদেশে সাতাইশ শ’ বন্দীকে হত্যা করা হয়। সালাহউদ্দীন যখন জেরুজালেম জয় করেন, তখন সেখানকার বন্দীদের প্রতি তার যে ব্যবহার, তার সঙ্গে রিচার্ডের এ নিষ্ঠুর ব্যবহারের কি শোচনীয় পার্থক্য! তিনিও বন্দীদের কাছে মুক্তি মূল্য চেয়েছিলেন। কয়েক হাজার গরীব তাদের মুক্তি-মূল্য দিতে অসমর্থ হয়। সালাহ্উদ্দীনের ভাইয়ের সুপারিশে তিনি এদের এক হাজার জনকে ছেড়ে দেন। প্রধান পুরোহিতের অনুরোধে আরো একদলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর সুলতান ভাবেন–ভাই আর পুরোহিত তো তাদের কর্তব্য পালন করলেন, এখন আমাকেও তো কিছু করতে হয়। তখন তিনি নারী ও শিশু-সহ বহু বন্দীকে বিনা মূল্যে আযাদী দিয়ে দেন।

জেরুজালেমের নেতৃত্ব এখন থেকে এস্তুকারে কেন্দ্রীভূত হয় এবং দুই প্রতিদ্বন্দী যোদ্ধাদলের মধ্যে শান্তির জন্য অনবরত প্রস্তাব চলতে থাকে। রিচার্ডের মন রোমাঞ্চকর কল্পনায় পরিপূর্ণ ছিল। তিনি সালাহ্উদ্দীনের ভাইয়ের সঙ্গে তার বোনের বিয়ের প্রস্তাব করলেন–তারপর বিয়ের যৌতুক স্বরূপ নব দম্পতিকে জেরুজালেম উপহার দানের কথা ঘোষণা করলেন। এইভাবে তিনি খৃষ্টান ও মুসলমানদের এ যুদ্ধ পরিসমাপ্তির পথ প্রশস্ত করতে চাইলেন। ১১৯২ সালের ২৯ মে তিনি তার ভাইয়ের ছেলেকে পরিপূর্ণ উৎসবের মধ্যে নাইটের মর্যদায় ভূষিত করেন। অবশেষে ১১৯২ সালের ২ ডিসেম্বর এই শর্তে সন্ধি স্থাপিত হয় যে, উপকূলের শহরগুলি ল্যাটিনদের হাতে থাকবে, আর ভিতরের সমস্ত এলাকা থাকবে মুসলমানদের হাতে এবং পবিত্র শহরের তীর্থযাত্রিগণের উপর কোন রকম জুলুম করা হবে না। সালাহউদ্দীন বেশীদিন এ শান্তি ভোগ করতে পারেন নাই। ১১৯৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী দামেস্কে তার জ্বর হয় এবং এর বারো দিন পর পঞ্চান্ন বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। উমাইয়া মসজিদের পার্শ্বে এক অনাড়ম্বর সমাধি শয্যায় তিনি ঘুমিয়ে আছেন। তিনি কেবল একজন যোদ্ধা ও সুন্নি আদর্শের পৃষ্ঠপোষক হিলেন না; তিনি আরো কিছু ছিলেন। তিনি বিদ্বানদের সাহায্য করেন, ধর্ম-শাস্ত্র অধ্যয়নে উৎসাহ দেন, অসংখ্য বাঁধ নির্মাণ, খাল খনন, মাদ্রাসা ও মসজিদ তৈরী করেন। তার স্থাপত্য কীর্তির মধ্যে কায়রোর কেল্লা আজো টিকে আছে। ১৯৮৩ সালে তিনি এই কেল্লা ও শহরের দেয়াল নির্মাণ শুরু করেন এবং এ কাজে তিনি ছোট ছোট পিরামিডের পাথর ব্যবহার করেন। তাঁর স্বধর্মীদের মধ্যে হারুণ ও বায়বার্স-এর উপরে তার স্থান। ইউরোপের মধ্যে ইংল্যান্ডে তিনি চারণ ও ঔপন্যাসিকদের কল্পনা বিশেষভাবে উদ্দীপ্ত করেন এবং এখনো তাকে আদর্শ নাইট হিসেবে গণ্য করা হয়।

এরপর একশ বছর পর্যন্ত মাঝে মাঝেই লড়াই চলতে থাকে; কিন্তু তার ফলে কোন পক্ষেরই কোন সুনির্দিষ্ট লাভ হয় নাই। ল্যাটিনরা মোটামুটি তাদের অধিকার রক্ষা করে চলে। ইতিমধ্য ফ্রান্সের নবম লুই ও তার বীর যোদ্ধারা ষষ্ঠ ক্রুসেড শুরু করেন। ইতিহাসে এ রাজা সাধু লুই নামে বিখ্যাত। ইনি ১২৪৯ সালে মিসরের অন্তর্গত দিমিয়াত শহর দখল করেন। এরপর তার সৈন্যরা এক জলাভূমির ভিতর দিয়ে কায়রো অভিমুখে মার্চ করতে শুরু করে। তখন নীলনদে পূর্ণ বর্ষা; জলাভূমিতেও বহু আঁকাবাঁকা খাল ছিল। এই অবস্থায় লুইয়ের সৈন্যদলে বিষম মড়ক দেখা দেয়। সৈন্যদের যাতায়াতের পথ একদম বন্ধ করে দেওয়া হয়; সমস্ত সৈন্যদল ধ্বংস হয়ে যায়; রাজা লুই তার অধিকাংশ আমীর রইসসহ বন্দী হন। একমাস কারা? রে থাকার পর উপযুক্ত মুক্তি-মূল্য ও দিমিয়াত ফেরত দেবার শর্তে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ১২৭০ সালে লুই তিউনিসে আর একটি ক্রুসেডীয় বাহিনী নিয়ে অভিযান করেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। ক্রুসেডকারী সমস্ত নেতার মধ্যে তার চরিত্র মহত্তম ছিল।

এই সময় মিসরের মামলুক দাস-বংশে বায়বার্স নামে এক অসম সাহসী যোদ্ধার আবির্ভাব হয়। তিনি ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত শাসক বংশ ক্রুসেডারদের উপর চরম আঘাত হানেন। ১২৬৩ সালে বায়বার্স করক অধিকার করে নাজারেথের গীর্জা ভূমিসাৎ করেন। তাঁর দুর্বার আক্রমণের ফলে সিজারীয়া, জাফফা ও এনটিয়কের পতন ঘটে। এনটিয়কের কেল্লায় ১৬ হাজার সৈন্য ছিল; তাদের হত্যা করা হয় এবং ১ লক্ষ নর-নারী বালক-বৃদ্ধকে বন্দী করে বাজারে গোলাম রূপে বিক্রি করা হয়। লুণ্ঠনের জিনিস ভাগ করার সময় মুদ্রা পেয়ালায় ওজন করা হয়। এ ক্ষয়-ক্ষতির ফলে এনটিয়ক আর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে নাই।

বায়বার্সের উত্তরাধিকারীদের আমলে একার অবরুদ্ধ হয়; বিরানব্বইটি অবরোধ-স্তম্ভ হতে দুর্গ প্রকারের উপর প্রস্তর-বর্ষণ হতে থাকে এবং ১২৯১ সালে এর দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হয়। এর টেম্পলার রক্ষীরা নিহত হয়। মুসলিম বাহিনী সেই বছরই টায়ার, সিডন, বৈরুত এবং আন্তাতাস দখল করে। ক্রুসেডারগণ বিতাড়িত হয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এইরূপে সিরিয়ার ইতিহাসের একটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

ক্রুসেড উপলক্ষে বহু রোমাঞ্চকর ঘটনা সংঘটিত হওয়ায় এর ঐতিহাসিক মূল্য অতিরঞ্জিত হয়েছে। প্রাচ্যের তুলনায় পাশ্চাত্য জগত এর দ্বারা অনেক বেশী উপকৃত হয়; সাহিত্য ও বিজ্ঞানের চেয়ে চারু-কলা, শিল্প ও বাণিজ্য-সভ্যতার বিস্তার ঘটে। এরই সঙ্গে ক্রুসেডাররা সিরিয়ায় রেখে আসে নিরবচ্ছিন্ন ধ্বংসের লীলা এবং সমগ্র নিকট প্রাচ্যময় ছড়িয়ে আসে খৃষ্টান মুসলমানের মধ্যে এক বিষময় বিদ্বেষ। আজো সে বিদ্বেষের চিহ্ন মুছে যায় নাই।

ক্রুসেডের যুগের আগেই প্রাচ্যের মুসলিম তমদ্দুনে ভাটা শুরু হয়। দর্শন, চিকিৎসা, সঙ্গীত ও অন্যান্য অনুশীলনের ক্ষেত্রে জ্ঞানের মশাল তখন নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু হতে শেষ পর্যন্ত সিরিয়া ইসলাম ও পাশ্চাত্য খৃস্টান ধর্মের সাক্ষাৎকেন্দ্র ছিল। কিন্তু অতঃপর প্রধানতঃ প্রাচ্য ইসলামের সাংস্কৃতিক অবনতির জন্যই সিরিয়া আরব প্রভাব বিস্তারের কাজে স্পেন, সিসিলী, উত্তর সিসিলী, উত্তর আফ্রিকা, এমনকি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যেরও পেছনে পড়ে যায়। একথা সত্য যে, ক্রুসেডারদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ মারফত সিরিয়ায় ইসলাম পাশ্চাত্য খৃস্টান ধর্মের উপর প্রভাব বিস্তার করে; আর সেই প্রভাব সমগ্র পাশ্চাত্যের উপর আংশিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাণিজ্য-পথ ধরেও এ প্রভাব পাশ্চাত্যের বুকে অনুপ্রবিষ্ট হয়। তবে সিরিয়া ক্রুসেডারদের উপর যে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করে, তা নগণ্য। অন্যদিকে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ক্রুসেডারদের সাংস্কৃতিক মান আক্রান্ত মুসলমানদের সাংস্কৃতিক মানের চেয়ে নিম্নতর ছিল। ক্রুসেডারদের মধ্যে বহু দেশের বহু রকমের মানুষ এসে এলোমেলোভাবে জমা হয়। তারা দেশের অভ্যন্তরে কেল্লায় কেল্লায় বাস করে ও প্রধানতঃ স্থানীয় কৃষক ও কারিগরদের সংস্রবে আসে; বুদ্ধিজীবীদের সাহচর্যে আসার সুযোগ তারা পায় না। এর উপর ছিল জাতি ও ধর্মগত কুসংস্কার; তার ফলে আক্রমণকারী ও আক্রান্ত জাতিসমূহের মধ্যে ভাবের যথেষ্ট আদান-প্রদান হতে পারে নাই। ফিরিঙ্গীদের পক্ষে সাহিত্য ও বিজ্ঞানে স্থানীয় লোকদের কিছুই শিক্ষা দিবার ছিল না। সমসাময়িক আরব ঐতিহাসিকরা ফিরিঙ্গীদের চিকিৎসা-জ্ঞান সম্বন্ধে হাস্যকর উপাখ্যান লিপিবদ্ধ করে; তারা বিদ্রুপের ভাষায় এ কথাও উল্লেখ করে যে, ‘ফিরিঙ্গীদের আইন-শাস্ত্র অদ্ভুত, তারা দ্বন্দ্বযুদ্ধ ও পানির সাহায্যে অপরাধ নির্ণয় করে।’

দ্বাদশ শতাব্দী হতে সমগ্র ইউরোপে আমরা মুসাফিরখানা ও হাসপাতাল বিশেষ করে কুষ্ঠাশ্ৰম স্থাপিত হচ্ছে দেখতে পাই। স্পষ্টতঃই নিয়মিত হাসপাতাল স্থাপন মুসলিম-প্রাচ্যের প্রভাবেরই ফল। মুসলমানদের প্রত্যক্ষ প্রভাবেই ইউরোপে সরকারী গোসলখানা প্রবর্তিত হয়। এক সময়ে রোমকরা এ প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা এবং খৃস্টানরা বিরোধিতা করত।

সাহিত্য ক্রুসেড ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। পবিত্র মধ্যপাত্র বিষয়ক উপকথায় নিঃসন্দেহ রকমে সিরিয় উপাদান বিদ্যমান আছে। ক্রুসেডারগণ নিশ্চয়ই বিদপাই’ ও আরব উপন্যাসের কাহিনী শুনে তা তাদের দেশে নিয়ে যায়। চসারের ‘স্কোয়ারের কাহিনী’ আসলে আরব্য উপন্যাসের কাহিনী বিশেষ। বোকাশিয়ে মুখে মুখে প্রাচ্য কাহিনী শুনে তা তাঁর ‘ডেকামিরন” নামক গ্রন্থের শামিল করেন। আরবী ও অন্যান্য ইসলামী ভাষা অনুশীলনে উৎসাহ বৃদ্ধিও সেডারদেরই প্রভাবের ফল।

যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যাপারে ক্রুসেডের প্রভাব আরো সুস্পষ্ট। যুদ্ধে ঘোড়া, গায় ভারী জেরা ও বর্মের নীচে তুলার গদী ব্যবহার–এসব ক্রুসেডেরই প্রত্যক্ষ অবদান। সিরিয়ায় ফিরিঙ্গীরা যুদ্ধের বাজনায় মৃদঙ্গ ও দামামা ব্যবহার শুরু করে; আগে তারা কেবল শিঙ্গা ও তুর্য ব্যবহার করত। যুদ্ধের খবর আদান প্রদানের কাজে কবুতর ব্যবহার ক্রুসেডাররা আরবদের নিকট শিক্ষা করে। আরবদের নিকট হতেই তারা বিজয় উৎসবে আলোকসজ্জা ও টুনামেন্ট নামক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানের শিক্ষা গ্রহণ করে। প্রকৃতপক্ষে, শিভালরী প্রতিষ্ঠানের কোন কোন বৈশিষ্ট্য সিরিয়াতেই গড়ে ওঠে। মুসলিম-যোদ্ধাদের সংস্পর্শের ফলেই ইউরোপে সমরাস্ত্র ও অভিনব সামরিক পরিচ্ছেদের ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়।

ক্রুসেডাররা অবরোধ সংক্রান্ত কায়দা-কানুনের অনেক উন্নতি বিধান করে । নানা রকম বিস্ফোরক পদার্থের ব্যবহার তাদের দ্বারা প্রবর্তিত হয়। বারুদ চীন দেশে আবিষ্কৃত হয় বলেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। তবে সেখানে ইহা কেবল আগুন জ্বালানোর কাজেই ব্যবহৃত হতে থাকে। মঙ্গোলরা বারুদ চীন হতে নিয়ে ইউরোপে প্রবর্তন করে। বারুদের সাধারণ ব্যবহার হতে চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেই ইউরোপে আগ্নেয়াস্ত্রের উদ্ভাবন হয়। ইউরোপ ভূখণ্ডে মার্ক নামক একজন গ্রীকের ১৩০০ সালের কাছাকাছি লিখিত একখানি গ্রন্থের পরিশিষ্টে সর্বপ্রথম বারুদ প্রস্তুত-প্রণালীর বর্ণনা পাওয়া যায়; বেকনের বারুদ তৈরীর বর্ণনা প্রক্ষিপ্ত ।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতের চেয়ে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য জগতে ক্রুসেড অধিকতর ফলপ্রসূ হয়। ক্রুসেডের মারফতই পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলিতে নতুন নতুন শস্য ও ফল গাছের আবাদ প্রসার লাভ করে। এ গুলির মধ্যে তিল, জোয়ার, ধান, লেবু, তরমুজ, খুবানী, গন্ধ-পিয়াজ প্রভৃতি অন্যতম। লেমন (লেবু) শব্দের মূল আরবী লেমুন’; শেলট অথবা স্কেলিয়ন (গন্ধ-পিয়াজ) শব্দের মূল মানে ছিল এস্কালনের পিয়াজ। এ শব্দের উদ্ভব স্থান ফিলিস্তিন। বহুকাল পর্যন্ত খুবানীকে দামেস্কের আলুবোখারা বলা হত।

সিরিয়ার বাজার গন্ধদ্রব্য, মসলা, মিঠাই এবং আরব ও ভারতের অন্যান্য উৎপন্ন দ্রব্যে ভরপুর থাকত। প্রাচ্য দেশে অবস্থানকালে ফিরিঙ্গীরা এইসব দ্রব্যের অনুরক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে তাদের এই রুচি ইটালী ও ভূমধ্যসাগরীয় শহরগুলির বাণিজের পৃষ্ঠপোষকতা করে। আরবের ধূপ-ধুনা, দামেস্কের গোলাব, গন্ধ-দ্রব্য বহু রকমের সুগন্ধ তেল এবং পারস্যের আতর সকলের প্রিয় হয়ে ওঠে। ফিটকিরির সঙ্গেও এই সময় পাশ্চাত্য-জগত পরিচিত হয়। দ্বাদশ শতাব্দীতে লবণ ও গোল মরিচ জাতীয় সুগন্ধি মসলা প্রবর্তিত হয়। এই সময় হতে পাশ্চাত্য জগতে মসলাওয়ালা রান্না ছাড়া ভোজনের কোন আয়োজনই পূর্ণ বিবেচিত হত না।

ক্রুসেডাররা তাদের রান্নায় আদা (জিঞ্জার–আরবী শব্দ) খেতে শিখে মিসরে। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ছিল চিনি (সুগার–আরবী শাককর) খাওয়া শিক্ষা। এ যাবতকাল পর্যন্ত ইউরোপীয়রা তাদের খাদ্যবস্তু মিষ্টি করার জন্য মধু ব্যবহার করত। লেবানন ও সিরিয়ার উপকূলবর্তী স্থানে এখনো বালক বালিকাদের আখ চিবাতে দেখা যায়। এইখানেই ক্রুসেডাররা আখের সঙ্গে পরিচিত হয়। তারপর হতেই আখ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় কি গুরুত্ত্বপূর্ণ স্থানই না অধিকার করে আসছে। পাশ্চাত্য জগতে প্রবর্তিত বিলাস-দ্রব্যের মধ্যে চিনিই প্রথম এবং তারা আর কোন কিছু খেয়েই এত মজা পায় না। চিনির সঙ্গে পাশ্চাত্য দেশে যায় শরবত, গোলাব পানি, নানারকম ফুল, সমস্ত রকম মিছরী (ক্যাভী–আরবী শব্দ হতে উদ্ভুত) এবং মিঠাই। মসলীন, দেমাস্ক, আতলাস ও সাটিন প্রভৃতি সূক্ষ্ম বস্ত্র যে আরব-প্রাচ্য হতে আমদানী হয়, এসবের নামেই তার পরিচয় মিলে।

প্রাচ্যের কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যের জন্য ইউরোপীয় বাজারের সৃষ্টি এবং তীর্থযাত্রী ও ক্রুসেডারদের চলাচলের প্রয়োজনের তাগিদে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এত প্রসার লাভ করে যে, রোমক শাসনের পর অমন আর দেখা যায় নাই। সামুদ্রিক বন্দর হিসেবে এবং ঐশ্বর্যের দিক দিয়ে মার্সাই ইটালীর সিটি রিপাবলিকগুলির সঙ্গে পাল্লা দিতে শুরু করে। নতুন পরিস্থিতির আর্থিক তাগিদে মুদ্রার ব্যাপকভাবে উৎপাদন ও দ্রুততর প্রবহনের প্রয়োজন হয়। এ কারণেই এরকম ক্রেডিট নোটের উদ্ভাবন হয়। জেনোয়া ও পিসায় ব্যাঙ্ক স্থাপিত হয় এবং লেভান্টে খোলা হয় তার শাখা। টেম্পলাররা হুণ্ডীর কারবার শুরু করে।

ক্রুসেড উপলক্ষে দ্রুত ও ব্যাপকতর জাহাজ-চলাচলের প্রয়োজন হতে কম্পাসের আবিষ্কার ঘটে। চুম্বক কাটার দিক নির্ণয়ক গুণ সম্বন্ধে বোধহয় প্রথম অবহিত হয় চীন দেশ। কিন্তু মুসলমানরা বহু আগে পারস্য উপসাগর ও দূর প্রাচ্যের সমুদ্রসমূহের মধ্যে বাণিজ্য করত এবং সেই সময়ই তারা জাহাজ চলাচলের ব্যাপারে চুম্বক কাটার যথাযথ প্রয়োেগ শুরু করে। তারপর তারা তাদের এই আবিষ্কার ইউরোপে পাঠিয়ে দেয়।

এই যুগে সামগ্রিকভাবে মুসলিম সাম্রাজ্যে সংকোচন শুরু হয় আর মুসলিম মানসে স্থবিরতা দেখা দেয়। আর ঠিক এসময়ই আকস্মিকভাবে সম্প্রসারিত জগতের প্রতি ইউরোপীয়দের দৃষ্টি প্রসারিত হতে শুরু করে। মুসলমানদের এই সাম্রাজ্যের অবসানের আগে সিরীয়-মিসরীয় মামলুক বংশ তার পুনরুজ্জীবনের জন্য শেষ চেষ্টা করে।

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ১৮. শেষ শাসক বংশ

শেষ শাসক বংশ

মধ্যযুগীয় আরব-জগতের সর্বশেষ বংশ মামলুকরা সবদিক থেকে অসাধারণ ছিল। মুসলিম-ইতিহাসে ছাড়া এমন একটি জাতির উত্থান ও প্রসার কল্পনার অতীত ছিল বলেই মনে হয়। মামলুক শব্দের মানে ‘অধিকৃত।’ মামলুকরা দাস বংশীয় লোক ছিল? বহু গোষ্ঠীর, বহু জাতির বহু গোলাম পরদেশে এসে এক সম্মিলিত সামরিক শাসক-শক্তি গড়ে তোলে। বহু শতাব্দী হতে আরব সমাজ জীবনে যে অনাচার অব্যাহত গতিতে চলে আসছিল, এদের সৃষ্টি তারই অনিবার্য ফল । কিন্তু এরা কীর্তিমান লোক ছিল এবং বিলীয়মান আরব সাম্রাজ্যের ইতিহাসের শেষ অধ্যায়ে স্থান পাওয়ার এরা যথার্থ অধিকারী।

মামলুকরা তাদের সিরীয়-মিসরীয় রাজ্য হতে বাকী ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করে। তারা হালাকু ও তৈমুরের দুর্দান্ত লুণ্ঠনপ্রবণ অনুচরদের অগ্রগমন চিরদিনের তরে রুদ্ধ করে দেয়; নইলে মঙ্গোলরা সমগ্র মিসর ও পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রবাহ-পথ সম্পূর্ণ পাল্টিয়ে দিতে পারত। সিরিয়া ও ইরাকের উপর যে ধ্বংসের প্লাবন নেমে আসে, এদেরই জন্য মিসর সে প্লাবনের হাত হতে বেঁচে যায় এবং আরবের বাইরে সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক স্থায়িত্বের ব্যাপারে যে নিরবচ্ছিন্নতা আর কোন রাজ্য ভোগ করে নাই, মিসর তা-ই ভোগ করে। প্রায় পৌণে তিন শতাব্দী (১২৫০–১৫১৭) পর্যন্ত মামলুকরা সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক অশান্ত একটা এলাকার উপর আধিপত্য করে এবং সব সময়েই নিজেদের গোষ্ঠিগত স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে চলে। সত্য বটে, তারা মোটামুটি রক্তপিপাসু ছিল, তথাপি চিত্র ও স্থাপত্য শিল্পের প্রসারে তাদের অবদান যেকোন সভ্য বংশের পক্ষে গৌরবের কথা হতে পারত। তাদেরই জন্য আজো মুসলিম জগতের মধ্যে সৌন্দর্য নিকেতন হিসেবে কায়রো একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। অবশেষে ১৫১৭ সালে ওসমানীয় বংশের সলীম তাদের উৎখাত করলে আরব খিলাফতের ধ্বংস্তূপ হতে উখিত বংশাবলীর শেষ বংশের দীপ নিভে গেল–আর পথ খোলাসা হয়ে গেল এক অনারব খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য। এরা ওসমানীয় তুর্ক।

মামলুক সুলতানদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং প্রকৃতপক্ষে সে বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বায়বার্স। মিসর-শাসক এই ক্ষুদ্র বংশ বাগদানের খলীফাদের অনুসরণে বিদেশী গোলাম এনে নিজেদের দেহরক্ষী নিযুক্ত করে এবং এর ফলও পরিণামে একই হয়। মনিবের তুলনায় অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন, অধিকতর কর্মঠ গোলামেরা সেনাপতি হয় এবং এরপর তারা দখল করে সুলতানের সিংহাসন। বায়বার্স আসলে এক তুর্ক গোলাম ছিলেন। পদোন্নতি হওয়ার পর সুলতানের দেহরক্ষীদের এক দলের নেতা হন। তারপর সেই পদে কাজ করে শেষ পর্যন্ত মিসরে সর্বোচ্চ পদ অধিকার করেন। অবশ্য ও পদে উন্নীত হতে তাকে অনেক শক্তি প্রয়োগ, অনেক খুন খারাবী করতে হয়; তবে পতনমান আরব সাম্রাজ্যে প্রতিভার সামনে যে পথ খোলা, তিনি তা-ই গ্রহণ করেন। এই মামলুক বংশে উত্তরাধিকারের কোন নীতি ছিল না; অমন নীতি আছে বলে কোন দাবীও ছিল না। সর্বাপেক্ষা যে শক্তিশালী, সে-ই টিকে যেত; কিন্তু প্রায় তিনশ’ বছর ধরেই এই শক্তিশালীরা হয় গোলাম, না হয় গোলামের বংশধর ছিল। বায়বার্স নিজে ছিলেন সম্বা, গায়ের রঙে কালো, গলার আওয়াজে শক্তিমান–সাহসী, কর্মঠ নেতৃত্বের প্রকৃত গুণের অধিকারী।

ফিলিস্তিনে মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি প্রথম যশ অর্জন করেন; কিন্তু তাঁর আসল যশ প্রধানতঃ নির্ভর করে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ের উপর। আমরা আগেই বলেছি, এই সব অভিযানই ফিরিঙ্গী দুশমনদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে নেয়। ইতিমধ্যে তার সেনাপতিরা তার আধিপত্য পশ্চিমে বারবার এলাকা পর্যন্ত এবং দক্ষিণে নুবীয়া’র উপর প্রতিষ্ঠিত করে। এইরূপে এ দুটি ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে মিসরের সুলতানের অধীনে আসে।

সামরিক নেতা ছাড়া বায়বার্সের আরো অনেক কৃতিত্ব ছিল। তিনি কেবল যে সৈন্যদল সংগঠন করেন, নৌবাহিনী পুনর্গঠিত করেন এবং সিরিয়ার দুর্গমালা দৃঢ়তর করেন এমন নয়, উপরন্তু তিনি বহু খাল কাটেন, বন্দরসমূহেরও উন্নতি সাধন করেন এবং কায়রো ও দামেস্কের মধ্যে দ্রুতগামী ঘোড়ার ডাক বসান। ফলে মাত্র চারদিনের মধ্যেই ডাক চলাচল করতে পারত। প্রত্যেক মঞ্জিলে ডাক বদলানোনার জন্য ঘোড়া তৈরী থাকত। সুলতান একই সপ্তাহে উভয় রাজধানীতে পলো খেলতে পারতেন। সাধারণ ডাক ছাড়া মামলুকরা কবুতরের বংশ পরিচয় পাকা খাতায় লেখা থাকত। বায়বার্স জনহিতকর কাজে উৎসাহ দেন, মসজিদের সৌন্দর্য বিধান করেন এবং ধর্মীয় ও দাঁতব্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন। স্থাপত্য শিল্পে তাঁর কীর্তিসমূহের মধ্যে তাঁর নামীয় বিরাট মসজিদ ও মাদ্রাসা উভয়ই বেঁচে আছে। নেপোলিয়ন মসজিদটিকে দুর্গে পরিণত করেন এবং পরবর্তীকালে ইংরেজ সৈন্যরা এতে রসদ-সরবরাহ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। মিসরে সুলতানদের মধ্যে বায়বার্সই প্রথম চার মাজহাবের জন্য চারজন হাকিম নিযুক্ত করেন এবং মিসরীয় হজযাত্রীদের জন্য স্থায়ী এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ধর্মে তাঁর অটল বিশ্বাস ও উৎসাহ এবং জেহাদে তিনি ইসলামের যে গৌরব ফিরিয়ে আনেন, উভয় মিলে তাকে হারুনর রশীদের সমতুল্য করে তোলে। উপকাহিনীতে সালাহ্উদ্দীনের চেয়েও উচ্চতর কীর্তির অধিকারী হিসেবে তাকে বর্ণিত করা হয়। তাঁর জীবনের রোমাঞ্চকর বিচিত্র কাহিনী এবং প্রাক-ইসলামী আনৃতার আখ্যান আর-প্রাচ্যে আজো আরব্য-উপন্যাসের চেয়ে অধিকতর লোকপ্রিয়।

মঙ্গোল ও ইউরোপীয় শক্তিসমূহের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন তাঁর শাসনের এক বৈশিষ্ট্য ছিল। সুলতান হওয়ার পরই তিনি ভষ্ম উপত্যাকার মঙ্গোলদের প্রধান খানের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করেন। আনজু’র চার্লস, সিসিলীর রাজা, আরাগনের জেমস্ ও সেভিলের আলফসো’র সঙ্গে তিনি বাণিজ্যিক সন্ধি-সূত্রে আবদ্ধ হন।

বায়বার্সের রাজত্বের একটি অভিনব দিক ছিল, তার পক্ষ হতে কয়েকজন আব্বাসীয় খলীফা নির্বাচন। এঁরা নামে মাত্র খালীফা ছিলেন–কিন্তু খলীফা পদের ক্ষমতা তাদের কিছুই ছিল না। সুলতানের উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে সত্যিকার সুলতান বলে স্বীকার করে নেওয়া, লোক-চক্ষে তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে প্রতিভাত করা এবং শীয়াদের ষড়যন্ত্র পথে বাধা জন্মানো। কারণ, ফাতেমীয় খলীফাদের আমল হতে মিসরে এদের ষড়যন্ত্রের আর অন্ত ছিল না। শেষ আব্বাসীয় খলীফার এক পিতৃব্য বাগদাদের ধ্বংসানুষ্ঠান হতে রেহাই পেয়েছিলেন। ১২৬১ সালের জুন মাসে বায়বার্স এঁকে দামেস্ক হতে আসতে দাওয়াত করে পাঠান এবং মহাধুমধামে তাকে খলিফা পদে অভিষিক্ত করেন। পেনশনভোগী ভাবী খলীফাকে দামেস্ক হতে রাজকীয় সম্মানের সঙ্গে আনয়ন করা হয়; এমনকি খৃস্টান পুরোহিতগণ বাইবেল ও ইহুদী পুরোহিতগণ তৌরাত উঁচু করে ধরে সঙ্গে আসে এবং আইনজ্ঞ আলিমরা অনুসন্ধান করে ভাবী-খলীফার খান্দান সম্বন্ধে অনুকূল সনদ দেন। প্রতিদানে ক্রীড়ানক খলীফা যথারীতি সুলতানকে মিসর, সিরিয়া, হেজাজ, ইয়ামন ও ইউফ্ৰেতীয় অঞ্চলের উপর শাসন-কর্তৃত্ব দান করেন। এর তিন মাস পর বায়বার্স তাঁর খলীফাকে বাগদাদে গদীনশীন করার উদ্দেশ্যে কায়রো হতে বের হন; কিন্তু দামেস্কে উপস্থিত হয়ে তিনি তাঁর খলীফাকে বাগদাদ অভিযানের ব্যাপারে তার অদৃষ্টের উপর ছেড়ে দেন। বাগদাদের মঙ্গোল গভর্নর হতভাগ্য খলীফাকে মরুভূমিতে আক্রমণ করে। তারপর সে খলীফার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় নাই। কিন্তু একের পর এক এমনি নামকাওয়াস্তে খলীফা আড়াইশ’ বছর পর্যন্ত খলীফার গদীতে বসেন। দেশের মুদ্রায় তাদের নাম থাকত আর মিসর ও সিরিয়ার জুমার খোত্বায় তাঁদের নাম উল্লিখিত হত; এতেই তারা তুষ্ট থাকতেন। ১৫১৭ সালে ওসমানীয় বংশের সুলতান সলীম যখন মামলুকদের হাত হতে মিসর কেড়ে নেন, তখন তিনি এ বংশের শেষ খলীফা আল-মুতাওয়াক্কিলকে সঙ্গে নিয়ে যান।

যে গর্বিত বিজয়-দৃপ্ত শাসকেরা সিরিয়া হতে ফিরিঙ্গী আধিপত্যের নাম নিশানা মুছে ফেলেন এবং সাফল্যের সঙ্গে মঙ্গোল প্লাবনের সম্মুখে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ান, তাঁদেরই অধীনে মিসরের ইতিহাস শুরু হয়। যুগের শেষ ভাগে সামরিক চক্রের শাসন, প্রবল সম্প্রদায়সূহের মধ্যে কলহ, গুরু কর-ভার, ধন-প্রাণের নিরাপত্তার অভাব, ঘন ঘন প্লেগ, দুর্ভিক্ষ ও বিদ্রোহ–সমস্ত মিলে মিসর ও সিরিয়ার সর্বনাশ সাধনের বেশি কিছু বাকী ছিল না। নীলনদের উপত্যকায় কুসংস্কার ও ভোজবাজি বিশেষ রকমে প্রবল ছিল। সঙ্গে সঙ্গে গোঁড়া ধর্ম-মতও জয়লাভ করে। এই অবস্থায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোন উচ্চ-শ্রেণীর সাধনাই সম্ভবপর ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, অষ্টম শতাব্দী হতে আরব জগতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে শীর্ষস্থান অধিকার করে আসছিল, এয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে তা হারিয়ে ফেলে। সর্বত্রই এ দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অনেক যুগব্যাপী কঠোর সাধনা এবং প্রভুত্ব সম্পদ জাত নৈতিক অধঃপতন মনে ক্লান্তির সঞ্চার করেছে।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্য ভাগের পর আরবরা বিজ্ঞানের মাত্র দুটি শাখায় তাদের পূর্ব নেতৃত্ব বজায় রাখতে সমর্থ হয় : গ্রহ-বিজ্ঞান, গণিত (ট্রিগনোমেট্রী বা ত্রিকোণমিতি সহ) এবং চিকিৎসাশাস্ত্র বিশেষ করে চক্ষু-চিকিৎসা বিজ্ঞান। চিকিৎসা জগতে এ যুগে শ্রেষ্ঠ ছিলেন ইবনুল নাফিস। ইনি দামেস্কে অধ্যয়ন, করেন এবং কায়রোর একটি হাসপাতালে দীর্ঘকাল প্রধান চিকিৎসকের কাজ করে ১২৮৯ সালে দামেস্কেই ইন্তিকাল করেন। দেহে রক্ত চলাচল পদ্ধতি আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় পর্তুগীজ পণ্ডিত সার্ভেটাসকে; কিন্তু তাঁর তিনশ’ বছর আগে ইবনুল নাফিস এ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। আমরা এখন যাকে যৌন-সাহিত্য বলি, এ যুগে এই শ্রেণীর প্রচুর পুস্তক লিখিত হয়। আরবী সাহিত্য বরাবরই প্রধানতঃ পুরুষের সাহিত্য; এ সাহিত্যে এমন অজস্র উপাখ্যান, ব্যঙ্গ এবং মন্তব্য আছে, যা আজকে আমাদের কানে অশ্লীল শোনায়।

মামলুকরা প্রায়শঃ খুন-খারাবীতে লিপ্ত থাকত; অথচ সত্যি এ এক অপূর্ব বিস্ময়, তাদের আমলে যে উচ্চাঙ্গের চারুকলা ও স্থাপত্য শিল্প প্রভূত পরিমাণে বিকাশ লাভ করে, টলেমীয় ও ফেরাউনীয় যুগের পর মিসরের ইতিহাসে তার আর তুলনা নাই। এয়োদশ শতাব্দীতে মঙ্গোল আক্রমণে বিতাড়িত হয়ে মসুল, বাগদাদ ও দামেস্ক হতে বহু মুসলমান শিল্পী ও কারিগর মিসরে আশ্রয় গ্রহণ করে। এদের সংস্পর্শে মামলুক স্থাপত্য রীতি সিরীয়-ইরাক আদর্শ নবভাবে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ক্রুসেড শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার উত্তরে পাথর নির্মিত ইমারতের প্রাধান্য লাভের সুযোগ ঘটে এবং গম্বুজ তৈরীর কাজে ইটের বদলে পাথরের ব্যবহার শুরু হয়। হাল্কা গম্বুজ অপূর্ব সাজে সজ্জিত হতে থাকে। সুচিন্তিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন ও বিচিত্র বর্ণে পাথর সাজিয়ে দালান-কোঠার সৌন্দর্য বর্ধন এ যুগের এক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। স্থাপত্য শিল্পে জ্যামিতিক রেখা ও কুফী হরফের আলঙ্কারিক প্রয়োগ এ সময় বিশেষ বিকাশ লাভ করে। (মুসলমানদের সকল যুগেই স্পেন ও পারস্যের তুলনায় মিসর ও. সিরিয়ায় জীব-জন্তুর চিত্র কম ব্যবহৃত হয়েছে।) সুখের বিষয়, মামলুক স্থাপত্য রীতির প্রকৃষ্টতম নমুনা আজো টিকে আছে এবং পণ্ডিত ও ভ্রমণকারী উভয়ের জন্যই সে নমুনা এক পরম আকর্ষণের বস্তু।

চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে মামলুকদের কাহিনী সিরীয়-মিসরীয় ইতিহাসের শোচনীয়তম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে। সুলতানদের কয়েকজন ছিলেন বিশ্বাসঘাতক ও রক্তপিপাসু; কয়েকজন ছিলেন অকর্মন্য–অধঃপতিত, আর বেশির ভাগই ছিলেন অমার্জিত। ১৪১২ হতে ১৪২১ সাল পর্যন্ত সুলতান ছিল মাতাল। তাকে এক সার্কেণীয়ার ব্যবসায়ীর নিকট হতে খরিদ করা হয়েছিল। ইনি কতকগুলি চরম দুর্নীতির কাজ করেন। অন্য এক সুলতান আরবী ভাষা জানতেন না। তিনি তার এক কঠিন ব্যারাম ভাল না করতে পারার জন্য তাঁর দুই জন চিকিৎসকের শিরচ্ছেদ করেন। ১৯৫৩ সালে যিনি রাজত্ব করেন, তিনি লিখতেও জানতেন না–পড়তেও জানতেন না। সরকারী দলীল-পত্রে তার সেক্রেটারী তার নাম লিখে দিত; তিনি তার উপর হাত ঘুরাতেন। তাঁর চরিত্রগত জঘন্য দোষের কথা বলাবলি হত। আব্বাসীয়দের কুখ্যাত গিমান প্রথা মামলুকদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। এক খলিফা কেবল নিরক্ষর ছিলেন না, পাগলও ছিলেন। আর এক খলীফা (যাকে পঞ্চাশ দিনার দামে খরিদ করা হয়েছিল) এক আলকিমিয়াবিদ বাজে ধাতুকে সোনা করে দিতে পারে নাই বলে তার চোখ তুলে এবং জিভ কেটে ফেলেন।

সুলতানদের স্বার্থ-প্রণোদিত নীতির ফলে দেশের আর্থিত অবস্থা নিতান্ত শোচনীয় হয়ে পড়ে। যেমন এক সুলতান পাক-ভারত হতে মসলা আমদানী বন্ধ করে দেন; তারপর বাজারের সমস্ত মসলা নিজে সস্তা দরে কিনে তাঁর প্রজাদের মধ্যেই চড়া দরে বিক্রি করে প্রচুর লাভবান হন। তিনি চিনির একচেটিয়া ব্যবসায় শুরু কনে এবং অতিরিক্ত লাভের আশায় কিছুকাল আখের আবাদ পর্যন্ত বন্ধ করে দেন। তার আমলে মিসর ও পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে এক ভয়াবহ প্লেগ দেখা দেয়। এই ব্যারামের ঔষধের জন্য চিনির প্রচুর চাহিদা হয়। কালো মৃত্যুর মত সর্বগ্রাসী না হলেও এ প্লেগে তিন মাসের মধ্যেই নাকি এক রাজধানীতেই তিন লক্ষ লোক মারা যায়। মানুষের পাপের জন্য এ প্লেগের আবির্ভাব ঘটেছে এই মনে করে তিনি মেয়েদের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেন এবং খৃস্টান ও ইহুদীদের উপর নতুন কর বসিয়ে কাফফারা আদায়ের চেষ্টা করেন।

রাজ-শোষণ কেবল অমুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কর ধার্যের কোন বিধিবদ্ধ নীতি না থাকায় সুলতানরা তাদের অভিযান, জমকালো দরবারের অতিরিক্ত খরচ এবং বড় বড় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ প্রভৃতির জন্য প্রজাপুঞ্জের নিকট হতে জোর-জুলুম করে টাকা আদায় করতেন আর সেই সব সরকারী আমলাদের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করা হত, যারা প্রজাদের শোষণ করে স্ফীত হয়েছে। মরুর লণ্ঠনপরায়ণ বেদুঈনরা মাঝে মাঝে নীল উপত্যাকার কৃষকদের উপর হানা দিয়ে তাদের সর্বস্বান্ত করত। প্লেগের মত মাঝে মাঝে পঙ্গপালের প্রাদুর্ভাব হত। দুর্ভিক্ষের আবির্ভাব প্রায় স্বাভাভিক হয়ে দাঁড়ায় এবং নীলনদে বান কম হওয়ার দরুন প্লেগ ও জলাভাব দেখ দিলে দুর্ভিক্ষ রুদ্র মূর্তি ধারণ করত। হিসেবে দেখা যায়, মামলুকদের যুগে মিসর ও সিরিয়ায় তিন ভাগের দুই ভাগ লোক কমে যায়।

এ যুগের শেষভাগে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যাপার দেশের দারিদ্র্য ও দুঃখ বৃদ্ধির কারণ হয়ে ওঠে। ১৪৯৭ সালে পর্তুগীজ নাবিক ভাস্কোডি-গামা উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে পাক-ভারতে যাওয়ার পথ আবিষ্কার করেন। সিরীয়-মিসর সাম্রাজ্যের পক্ষে এ ছিল এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এরপর হতে কেবল যে লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরে মুসলমানদের জাহাজ পর্তুগীজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় নৌবাহিনী কর্তৃক ঘন ঘন আক্রান্ত হতে থাকে এমন নয়, আস্তে আস্তে পাক-ভারত ও আরবে উৎপন্ন মসলা ও অন্যান্য দ্রব্যের ব্যবসায়ের বেশীর ভাগেরই সিরিয়া ও মিসরে বন্দরে চালান বন্ধ হয়ে যায়। এইরূপে জাতীয় সম্পদের একটা বড় উৎস চিরতরে শুষ্ক হয়ে পড়ে।

মামলুকরা অত্যাচারী ছিল। কিন্তু তাদের চেয়েও এক বড় বর্বর পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সিরিয়ার উপর নিপতিত হয়। ১৩৩৬ সালে ট্রান্স অকশিয়ানাতে তৈমূরলংয়ের জন্ম হয়। তাঁর একজন পূর্বপুরুষ চেঙ্গীজ খার পুত্রের উজীর ছিলেন; কিন্তু তৈমুরলংয়ের পরিবার স্বয়ং চেঙ্গীজের বংশধর বলে দাবী করত। একজন লেখক পি করে বলেন যে, তৈমুর এক রাখালের ছেলে ছিলেন এবং প্রথম বয়সে লুটপাট করে খেতেন। একবার একটি ভেড়া চুরির সময় তিনি পায় আঘাত পেয়ে ন্যাড়া (লং) হন; এই জন্য তার নাম হয় তৈমুর লং। ১৩৮০ সালে তৈমুর তার তাফ্‌তার বাহিনী নিয়ে দিগ্বিজয়ে বের হন এবং আফগানিস্তান, পারস্য, ফারিস ও কুর্দীস্তান দখল করেন। ১৩৯৩ সালে তিনি বাগদাদ অধিকার করেন এবং পর বছর মেসোপটেমিয়া তার পদদলিত হয়। সালাহউদ্দীনের জন্মস্থান তারিতে। তিনি নিহতদের মাথার খুলি দিয়ে এক পিরামিড নির্মাণ করেন। ১৩৯৫ সালে তিনি ভগা নদী অঞ্চল আক্রমণ করেন এবং মস্কো অধিকার করে এক বছর শাসন করেন। তিন বছর পর তিনি উত্তর ভারত লুণ্ঠন করেন এবং দিল্লীর ৮০ হাজার বাসিন্দাকে হত্যা করেন।

১৪০১ সালে তৈমুর দুরন্ত তুফানের মত সিরিয়ার উত্তর ভাগের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনদিন পর্যন্ত আলেপ্পোকে লুণ্ঠনের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। এর ২০ সহস্রাধিক মুসলিম বাসিন্দার মাথা দিয়ে তৈমুর দশ হাত উঁচু ও বিশ হাত পরিধির একটি টিপি তৈরী করেন। টিপিতে মাথাগুলির মুখ বাইরের দিকে ছিল। শহরের স্কুল ও মসজিদের অমূল্য ইমারতসমূহ বিধ্বস্ত করা হয়; আর কখনো এগুলি পুনর্নির্মিত হয় নাই। ক্রমে হামা, হিমস ও বালাবেকের পতন হয়। মিসরীয় সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে দামেস্ক দখল করা হয়। দামেস্কোর কেল্লা মাসেক কাল শহর রক্ষা করে। তৈমুরের বাহিনী শহর লুটপাট করে তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়। তৈমুর নামে মুসলমান ছিলেন। শীয়া মতের দিকে তার সামান্য ঝোঁক ছিল। তিনি আলেমদের ডেকে এক ফতোয়া আদায় করেন যে, তাঁর কাজ শরীয়ত সঙ্গত। উমাইয়া মসজিদের দেয়াল ছাড়া তার আর কিছুই রক্ষা পায় নাই। ইতিমধ্যে তৈমুর বাগদাদে তার কয়েকজন আমলার নিহত হওয়ার সংবাদ শুনে তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দামেস্ক হতে বাগদাদ পানে ধাবিত হন এবং সে শহরের বুকে এ বর্বর বিজেতা মানুষের মাথা দিয়ে একশ’ পঁচিশটি স্তম্ভ তৈয়ার করেন।

পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে তৈমুর এশিয়া মাইনর আক্রমণ করেন এবং ১৪০২ সালের ২১ জুলাই আঙ্কারার ময়দানে ওসমানীয় বাহিনীকে পরাজিত করে সুলতান প্রথম বায়াজীদকে বন্দী করেন। ব্রুসা ও স্মার্না তার অধিকার আসে। মামলুক রাজ্যের সৌভাগ্যক্রমে এর দুই বছর পর চীন বিজয়ের পথে তৈমুরের মৃত্যু হয়। তার বংশধরগণ আত্মকলহে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

ঘোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ওসমানীয় তুর্করা আরব-সাম্রাজ্যের উপর চরম আঘাত হানে। ওসমানীয় তুর্কদের আদি বাসভূমি ছিল মঙ্গোলিয়া; তারা মধ্য এশিয়ায় ইরানী কওমদের সঙ্গে বিয়ে-শাদী করে তাদের সঙ্গে মিশে পড়ে। তারপর এশিয়া মাইনরে এসে তাদের জাতি ভাই সালজুকদের ধীরে ধীরে স্থানচ্যুত করে চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে একটি রাজ্য স্থাপন করে। ১৯৮১ সালে মিসরীয় সুলতানদের পক্ষে ওসমানীয় সমস্যা জটিল হয়ে ওঠে। এশিয়া মাইনর ও সিরিয়ার সীমান্তে উভয়েরই সামান্ত রাজা ছিল। এদের মধ্যে যে যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু হয়, তাতেই এ দুই শক্তির ভিতরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমে বেড়ে চলে এবং অবশেষে ১৫১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি আলেপ্পোর সন্নিকটে উভয় শক্তির মধ্যে রণ-দামামা বেজে ওঠে। মামলুকরা সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। তুর্কী সৈন্যরা কামান, বন্দুক ও অন্যান্য দূর-পাল্লার অস্ত্রে সুসজ্জিত ছিল। মামলুক বাহিনীতে বেদুঈন ও সিরীয় যোদ্ধা ছিল; তারা এসব অস্ত্র ব্যবহারকে অবজ্ঞার চোখে দেখত। কিছুকাল আগ হতেই তুর্করা বারুদ ব্যবহার করে আসছিল; কিন্তু সিরীয় মিসরীয়রা বাবা আদমের আমলের বিশ্বাসই আকড়ে ধরে বসেছিল যে, যুদ্ধে ব্যক্তিগত সাহস ও শৌর্যই জয় পরাজয় নির্ধারণ করে। ওসমানীয় সুলতান সলীম বিজয়ী বেশে আলেপ্পোতে প্রবেশ করেন। তাকে মামলুক জুলুম হতে মুক্তিদাতা হিসেবে অধিবাসী অভ্যর্থনা জানায়। সিরিয়া তুর্কদের হাতে চলে যায়। সিরিয়া হতে তুর্কবাহিনী মিসরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক বছরের মধ্যে মামলুক রাজ্যের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যায়। সুলতান সালাহ্উদ্দীনের সময় হতে কায়রো প্রাচ্য ইসলামের কেন্দ্র এবং আরব সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল; এখন সে কায়রো সামান্য প্রাদেশিক নগরে পরিণত হয়। মক্কা ও মদীনা স্বভাতঃই ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে পড়ে। মিসরের ইমামরা জুমার নামাজের খোতবায় নিম্ন ভাষায় সুলতান সলীমের জন্য দোয়া করেন?

“হে প্রভু! তুমি আমাদের সুলতানকে রক্ষা করো : ইনি সুলতানের পুত্র সুলতান, উভয় মহাদেশ ও উভয় সমুদ্রের শাসক, উভয় বাহিনী উৎখাতকারী, উভয় ইরাক বিজেতা, উভয় পবিত্র শহরের খাদেম বিজয়ী ম্রাট সলীম শাহ্। হে প্রভু! তাঁকে তোমার অমূল্য সাহায্য মঞ্জুর কর। হে দো-জাহানের মালিক! তুমি তাঁকে গৌরবময় বিজয় লাভে সাহায্য কর।”

শেষ ক্রীড়নক খলীফা সত্যিই তাঁর খিলাফত-পদ তুর্ক সুলতানের নিকট হস্তান্তর করেছিলেন কিনা, তার যথেষ্ট প্রমাণ নাই। তবে তিনি সে পদ দিয়ে থাকুন আর না-ই থাকুন, এ কথা নিঃসন্দেহ যে, কন্সটানটিনোপলের তুর্ক ম্রাট ধীরে ধীরে খলীফা-পদের সমস্ত সুযোগ এবং অবশেষে খলীফা উপাধি আত্মস্থ করেন। সলীমের পরবর্তী সুলতানদের কেউ কেউ নিজেদের খলীফা বলে পরিচয় দিলেও এবং অন্যরা তাদের এই নামে সম্বোধন করলেও, তাদের খলীফা শব্দের ব্যবহার কেবল সম্মানসূচক ছিল এবং তাদের রাজ্যের বাইরে তারা খলীফা বলে স্বীকৃত হতেন না। ১৭৭৪ সালে সম্পাদিত রুশ-তুর্ক সন্ধি-পত্ৰই প্রথম জ্ঞাত আন্তঃরাষ্ট্রীয় দলীল, যাতে ওসমানীয় সুলতানকে খলীফা ও মুসলিম-জগতের ধর্মীয় নেতা বলে স্বীকার করা হয়েছে।

কন্সটানটিনোপলের সুলতান-খলীফা ইসলামের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী শাসনকর্তা হয়ে ওঠেন; কেবল বাগদাদের নয়, বাইজেন্টিয়ামের সম্রাটদেরও তিনি উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করেন। মামলুক-শক্তির পতন এবং বসফরাসের উপর ওসমানীয়দের আধিপত্য স্থাপনের ফলে ইসলামী শক্তির কেন্দ্র পশ্চিমে স্থানান্তরিত হয়। ঠিক এই সময়ই আমেরিকা ও উত্তমাশা অন্তরীপ আবিষ্কার এক নবযুগের সূচনা করে। আরব খিলাফতের ইতিহাস এবং আরব সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ হতে মধ্যযুগে যে সব মুসলিম বংশের অভ্যুদয় হয়, তাদের কাহিনীর পরিসমাপ্তি ঘটে। আরব-জগতে ওসমানীয় আধিপত্য শুরু হয়।

আরব জাতির ইতিহাস – ফিলিপ কে. হিট্টি (অনুবাদ : প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ) ১৯. বর্তমান জগতে আরব-ভূমি

বর্তমান জগতে আরব-ভূমি

মধ্যযুগে অন্ধকারের রাজত্ব ছিল বটে, তবু সে যুগে আরব-ভূমির সামনে অন্ধকারের যবনিকা টেনে রাখে নাই কিন্তু আধুনিক যুগ তা করেছে। ১৫১৭ সাল হতে শুরু করে ওসমানীয় আধিপত্যের চারশ’ বছর পর্যন্ত আরব-প্রাচ্য বরাবর রাহু-গ্রস্ত থাকে। ওসমানীয় তুর্করা মুসলিম-জগতের একটি বিপুল শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে। তারা কেবল আরব-ভূমিসমূহ জয় করে নাই, উপরন্তু ককেশাস হতে ভিয়েনার নগর দ্বার পর্যন্ত সমস্ত ভূভাগের উপর তাদের বিজয়-বৈজয়ন্তী উড্ডীন করেছে–তাদের রাজধানী কন্সটানটিনোপল হতে তারা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের উপর আধিপত্য করেছে। এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী পর্যন্ত পশ্চি ইউরোপীয় রাষ্ট্রনায়করা তাদের সমীহ করে চলেছে। ইতিমধ্যে অতীতের গৌরবোজ্জ্বল মদীনা, দামেস্ক, কায়রো বিস্মৃতির অতল তলে ডুবে যায়–অথচ একদা এগুলি পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য ও মহোজ্জ্বল সংস্কৃতি কেন্দ্রস্থল ছিল। এসব এখন কন্সটানটিনোপল হতে প্রেরিত প্রাদেশিক গভর্নরদের বাসস্থান ও সৈন্যদের কেল্লা হয়ে দাঁড়ায়। দামেস্ক ও বাগদাদের দুর্জয় বাহিনী অতীতে চার চার বার এই রাজধানী আক্রমণে উদ্যত হয়। এখন হতে এই শহরের উপর সকলের নজর পড়ে।

সুলতান-খলীফাদের সাম্রাজ্যে আরবদের ছাড়া নানা জাতির, নানা ভাষার, নানা ধর্মের আরো বহু শ্রেণীর লোকের বাস ছিল; একমাত্র তলোয়ারের জোরে এদের একত্রে রাখা হত। পরাজিত জাতিসমূহের সবারই এক ভাগ্য ছিল? অতিরিক্ত কর-ভার অত্যাচারমূলক শাসন। এমন অবস্থার ভিতর আরবী ভাষা ভাষীদের মধ্যে শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞানে যদি কোন সৃজনশীল অবদান সৃষ্টি না হয়ে থাকে, তবে তাতে আশ্চার্যের কিছুই নাই।

আরব-প্রাচ্য বিজেতার পুত্র মহান সুলায়মান (১৫২০–১৫৬৬)-এর আমলে তুর্ক সাম্রাজ্যের মহিমার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে এবং তার অব্যবহিত পরেই এর পতন শুরু হয়। পতনের যুগ দীর্ঘ ও জটিল ছিল। ১৬৮৩ সালে ভিয়েনা দখল করার নিষ্ফল প্রয়াসের পর তুর্ক-শক্তিতে আক্রমণের পালা, খতম হয়ে আত্মরক্ষার পালা শুরু হয়। শান্তির বদলে প্রধানতঃ যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য সাম্রাজ্যের সংগঠন, সাম্রাজ্যের বিপুল বিস্তৃতি, প্রজাপুঞ্জের মধ্যে হাজারো রকমারি, ধর্মীয় সংস্থাকে স্বায়ত্তশাসনের প্রচুর সুবিধা দান, মুসলিম তুর্ক আর মুসলিম আরবের মধ্যে বিভেদ, চূড়ান্ত ক্ষমতা সুলতান-খলীফার হাতে কেন্দ্রীভূতকরণ এবং সিংহাসনের উত্তরাধিকার সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা–সাম্রাজ্যের সংস্থাপনায় এগুলি ছিল অন্তর্নিহিত দুবর্লতা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাশীয়া, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার মত বিভিন্ন শক্তি তুর্ক সাম্রাজ্যের নানা অংশের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি হানতে এবং তুরস্ক সম্বন্ধে বিশেষ নীতি অবলম্বন করতে শুরু করে। এর ফলে সাম্রাজ্যের পতনের স্রোত দ্রুততর হয়ে পড়ে। আরব-জগত এককালে পারস্য হতে স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল; ক্রমে সে বিশাল সাম্রাজ্য সঙ্কুচিত হয়ে আসে। পারস্য ভাষা ও জাতীয়তা এর আগেই তার নিজস্ব আত্মপ্রতিষ্ঠার অধিকার ঘোষণা করে। তুর্করা কন্সটানটিনোপল অধিকার (১৪৫৩) করার আগেই স্পেন কার্যতঃ স্বাধীন হয়ে যায়। উত্তর আফ্রিকা, মিসর, খাস আরব এবং আরব-হেলাল–আটলান্টিক হতে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত এক অখণ্ড অঞ্চল। তাদের আরবী ভাষা ও ইসলামী বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে যেমন আজো তারা করছে। মরক্কো ছাড়া এসব দেশ উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশের আগ পর্যন্ত তুর্ক সাম্রাজ্যের অঙ্গ ছিল। একমাত্র লেবাননই বরাবর তার বাসিন্দাদের মধ্যে খৃষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা করে এসেছে।

আরব দেশসমূহের মধ্যে আলজিরীয়াকে সর্বাগ্রে তুর্ক সাম্রাজ্য হতে খসিয়ে নেওয়া হয়। ১৮৩০ সালে এদেশ ফ্রান্স দখল করে এবং পরে একে ফ্রান্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৮৮১ সালে তিউনিসীয়া ফ্রান্সের কবলে আসে। ১৯১২ সাল পর্যন্ত ইউরোপের তিনটি ল্যাটিন শক্তি ফ্রান্স, স্পেন ও ইটালী মরক্কো হতে লিবীয়া পর্যন্ত সমগ্র ভূভাগে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। সমগ্র উত্তর আফ্রিকা সবার আগে আরব মুসলিম-জগত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাশ্চাত্য প্রভাবের অধীন হয়; এ ভূভাগ মুসলিম-জগতের সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত; এর বাসিন্দাদের মধ্যে অনারবের সংখ্যা প্রচুর ছিল। এই সমস্ত কারণ হেতু এ ভূভাগের বাসিন্দারা জাতীয়তা হারিয়ে স্বতন্ত্র পথে চলে। পশ্চিম এশিয়া এবং মিসরই প্রকৃতপক্ষে ইসলামের হৃদয় এবং কেন্দ্রভূমি। ভূগোলের দিক দিয়ে মিসর আফ্রিকার একাংশ হলেও ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে একে পশ্চিমে এশিয়ার অঙ্গ মনে করা যেতে পারে।

প্রথম মহাযুদ্ধের আগ পর্যন্ত পশ্চিম এশিয়া ও মিসরসহ এই বিশাল ভূখণ্ড নামে বা প্রকৃতপক্ষে তুর্ক-সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ১৮৮২ সাল হতে মিসর ইংরেজদের কবলে ছিল; এই মহাযুদ্ধকালে মিসর তুরস্কের শেষ বন্ধন ছিন্ন করে। এই সুযোগ মক্কার শরীফ হোসেনও তুর্কদের অধীনতা অস্বীকার করে বসেন। তিনি মহানবীর অন্যতম অধঃস্তন পুরুষ ছিলেন। তিনি মক্কাকে কেন্দ্র করে নতুন খিলাফত স্থাপন করে নিজেই খলীফা পদে সমাসীন হবেন–এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে অন্যান্য আরবগণকে বিদ্রোহী হতে উৎসাহ দেন। ১৯২৪ সালে যখন মুস্তফা কামাল তুর্ক-খিলাফতের বিলোপ সাধন করেন, তখন এই আরব রাজা” নিজেকে মুসলমানদের খলীফা ঘোষণা করেন। তুর্ক-সাম্রাজ্য হতে খসে এনে আধুনিক আরব-সাম্রাজ্য স্থাপনের এ ছিল দ্বিতীয় চেষ্টা। এর আগের শতাব্দীর প্রথম তিন দশকের মধ্যে মিসরের রাজ-প্রতিনিধি মুহম্মদ আলী প্রথম এমনি একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ দেড়শ’ বছর টিকে থাকে। দুটি চেষ্টাই উপযুক্ত সময়ের আগে করা হয়। জনসাধারণের রাজনৈতিক চেতনার উপর এর বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত ছিল না। তাছাড়া, এ উভয় চেষ্টা নিকট প্রাচ্যে বৃটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির স্বার্থের বিরোধী ছিল । শেষ পর্যন্ত শরীফ হোসেন নিজ পৈত্রিক রাজ্য হতেও ইবনে সউদ কর্তৃক বিতাড়িত হন। ইবনে সউদ নজ্বদের রক্ষণশীল ওয়াহ্হাবীদের বিজ্ঞ ও সুদক্ষ নেতা ছিলেন। ১৯০০ হতে ১৯২৫ সালের মধ্যে এই সুচতুর মরু-নেতা পারস্য উপসাগর হতে লাহিত সাগর পর্যন্ত সুবিস্তৃত একটি রাজ্য গড়ে তোলেন। মহানবীর পর আরব উপদ্বীপে এত বড় রাজ্য আর কেউ স্থাপন করতে পারে নাই। ১৯৩২ সালে সউদী আরব’ নামে এ রাজ্যের নাম বিঘোষিত হয়। সউদী আরবের লাগ দক্ষিণে ইয়ামন অবস্থিত। ইয়ামনের ধর্মীয় শাসনকর্তা ইমাম ইয়াহীয়া প্রথম মহাযুদ্ধ কালে নিজ দেশকে তুরস্কের অধীনতা হতে মুক্ত করেন। প্রাসাদ-চক্রান্ত ও পারিবারিক ষড়যন্ত্রের ফলে ইমাম ইয়াহীয়া ১৯৪৮ সালে নিহত হন। তার পুত্র সায়েফুল ইসলাম এখন ইয়ামনের সুলতান। এদিকে সউদী আরবের ইবনে সউদও ইন্তিকাল করেন ও তদস্থলে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইবনে সউদ উপাধি গ্রহণ করে পিতার সিংহাসনে আসীন হন। বর্তমানে এই দ্বিতীয় ইবনে সউদ এবং সায়ফুল ইসলামই সমগ্র আরবে সম্পূর্ণ স্বাধীন শাসনকর্তা। উপদ্বীপের বাকী অংশ স্থানীয় শেখ ও সুলতানদের দ্বারা শাসিত হয়। এরা সবাই বৃটেনের সঙ্গে সন্ধি-সূত্রে আবদ্ধ। ইয়ামন এবং অনেকাংশে সউদী আরবও পাশ্চাত্য প্রভাবের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। দুনিয়া জোড়া আধুনিকতায়নের জোয়ার কি জানি কেমনে এদের উপকূল বাদ দিয়ে গেছে। বিগত সিকি শতাব্দী কালের মধ্যে সউদী আরব, কুয়ায়েত এবং বাহরায়েনে যে অপর্যাপ্ত তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়েছে এবং যে দক্ষতা ও সাফল্যের সঙ্গে খনিজ সম্পদ কাজে লাগান হচ্ছে তাতে এই সব স্থানের রাজনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত বেড়ে গেছে; আর সংশ্লিষ্ট দেশগুলিও অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েছে।

প্রথম মহাযুদ্ধের পর সিরিয়া ও লেবাননকে ফ্রান্সের অছি রাজ্যে পরিণত করা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ দুই দেশ ফরাসী গোলামীর জিঞ্জির ভাঙ্গতে পারে নাই। ফিলিস্তিনকে বৃটিশ অছি রাজ্যে পরিণত করা হয় এবং স্থানীয় অধিবাসীদের প্রবল আপত্তি ও প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলির বাধা দান সত্ত্বেও ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনকে নিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টি করা হয়। ট্রান্স-জর্দান বৃটিশ অছি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল; ১৯৪৬ সালে একে স্বাধীন বলে ঘোষণা করা হয়। এ রাজ্যের সুলতান হন শরীফ হোসেনের ছেলে এবং আমীর ফয়সলের বড় ভাই আবদুল্লাহ। আমীর ফয়সল কয়েক দিনের জন্য সিরিয়ার সিংহাসনে বসেন। পরে ফরাসীরা তাকে তাড়িয়ে দেয়; অতঃপর ১৯২১ সালে বৃটিশ-শক্তি তাঁকে নব সৃষ্ট রাষ্ট্র ইরাকের সিংহাসনে বসায়। অছি রাজ্যগুলির মধ্যে লেবাননই প্রথম নিজকে রিপাবলিক বলে ঘোষণা করে। ইরাক সংস্কৃতির দিক দিয়ে সিরিয়ার পেছনে থাকলেও সবার আগে অছি-রাজ্যের বন্ধন কেটে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৯৩০ সালে ইরাকের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় । ইংরেজের সঙ্গে একটা সন্ধি হয়, যেমন এর ছয় বছর পর মিসরও সন্ধি করে। এই সন্ধিসূত্রে ইংরেজকে স্বতন্ত্র সুবিধা দান করা হয়।

এসব দেশের মধ্যে মিসরই সর্বাগ্রে নব-জীবনের চাঞ্চল্য অনুভব করে। সাড়াটা আসে পশ্চিম থেকে উপলক্ষ ছিল ১৭৯৮ সালের নেপোলিয়নের আক্রমণ। ফরাসী বিজেতা ভ্যাটিকান থেকে একটা আরবী প্রেস লুণ্ঠন করেছিলেন; মিসর অভিযানকালে তিনি অন্যান্য উপকরণের মধ্যে এই প্ৰেসখানি সঙ্গে আনেন এবং তাঁর নিজের পণ্ডিতদের সমবায়ে ও সহযোগিতায় একটি সাহিত্য-সংস্থা গঠন করেন। নীলনদের উপত্যকায় উপরোক্ত প্ৰেসখানিই ছিল সর্বপ্রথম মুদ্রা-যন্ত্র। ক্রমে—’বুলাগ ছাপাখানা’ নামে এর যথেষ্ট উন্নতি হয়। আজো এ প্রতিষ্ঠানটি বেঁচে আছে।

নেপোলিয়নের পরে আসেন তধুনিক মিসরের জন্মদাতা মুহম্মদ আলী। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের এই অবিচ্ছিন্ন সাক্ষাতের মধ্যে ভবিষ্যতের বিরাট সম্ভাবনা উপলব্ধি করে তিনি এগিয়ে চলতে সংকল্প করেন। তিনি ইউরোপে বিভিন্ন ছাত্র মিশন পাঠান এবং তাঁর দেশের অফিসার ও বিদ্বান ব্যক্তিদের ট্রেনিং দেওয়ার জন্য ইউরোপীয়–বিশেষ করে ফরাসী মিশন দাওয়াত করে আনেন।

১৮৩১ সালে যখন মুহম্মদ আলী তাঁর আরব-সাম্রাজ্যের স্বপ্ন সফল করার উদ্দেশ্যে সিরিয়া বিজয়ের জন্য অভিযান করেন, তখন তিনি ভূমধ্যসাগরের সমস্ত পূর্ব সীমান্তে পশ্চিম ইউরোপীয় সাংস্কৃতির প্রভাবের প্রবেশ-পথ উন্মুক্ত করে দেন। এই সময়ে প্রটেস্টেন্ট মিশনারীরা প্রধানতঃ আমেরিকান–দলে দলে এসে এসব অঞ্চলে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু করেন। লেবাননের বর্তমান রাজধানী বৈরুতে ১৮৩৪ সালে আমেরিকান প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। সাবেক সিরিয়ায় এই-ই ছিল প্রথম উন্নত-ধরনের প্রেস। তিন বছর পর স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রটেসটেন্ট গীর্জা সংগঠিত হয়। অনেক দিন পর জেসুইট সম্প্রদায়ের খৃস্টান পাদ্রীরাও এই সময় লেবাননে ফিরে আসেন। ১৮৫৩ সালে বৈরুতে তাদের ইমপ্রিমেরী ক্যাথলিক স্থাপিত হয়। দুটি প্রেসই এখনো চালু আছে; সাজসরঞ্জামে এগুলি অতি উন্নতমানের প্রেস। আধুনিক আরবীতে বাইবেলের দুটি অনুবাদ এই ছাপাখানা দুটি হতে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। আরবীতে বহুসংখ্যক ইংরাজী ও ফরাসী গ্রন্থের অনুবাদ হয় এবং সে সব তরজমা লোক-প্রিয় হয়ে ওঠে। আমেরিকান মিশনারীরা অবশেষে ১৮৬৬ সালে সিরীয় প্রটেসৃটেন্ট কলেজ স্থাপন করেন; বর্তমান ‘বৈরুত আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়’ এই কলেজেরই রূপান্তরিত পর্যায়। আট বছর পর শহরের অপর প্রান্তে ‘সেন্ট জোসেফ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে শিক্ষাদান ক্ষেত্রে এই দুটি প্রতিষ্ঠানই নেতৃত্বের স্থান অধিকার করে আছে। ইতিমধ্যে বিশেষ করে লেবাননে স্থানীয় লোকের দ্বারা অসংখ্য স্কুল, ছাপাখানা, খবরের কাগজ, মাসিক কাগজ এবং সাহিত্য ও বিজ্ঞান সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

সমুদ্রতীরবর্তী এই পার্বত্য অঞ্চলকে সুদূর অতীতের ফিনিশীয়, রোমক ও বাইজেন্টাইন আমল হতে পাশ্চাত্য অভিমুখী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ফখরুদ্দীন-আল-মানী (১৫৯০–১৬৩৫) এবং বশীরুল শিহাবী (১৭৮৬ ১৮৪০) লেবাননের দুই কৃতী সন্তান ছিলেন। এদের অধীনে লেবানন ওসমানীয় শাসন হতে অর্ধ স্বাধীনতা লাভ করে। ইটালীয়, ফরাসী ও বৃটিশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে এই সময় লেবাননের ঘনিষ্ঠতর সংযোগ ঘটে। মুহম্মদ আলীর বহু আগে ফখরুদ্দীন ইউরোপীয়–বিশেষ করে ফ্রান্স ও ফ্লোরেন্সের সওদাগরগণকে লেবাননের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্বন্ধ স্থাপন করতে উৎসাহিত করেন এবং টাসূকেনী হতে কৃষি মিশন দাওয়াত করে আনেন। তিনি এবং বশীর উভয়ই তুর্ক সুলতান কর্তৃক স্বদেশ হতে নির্বাসিত হন এবং ইস্তাম্বুলে ইন্তিকাল করেন। ফখরুদ্দীনকে হত্যা করা হয়।

তুর্ক শাসকদের উস্কানীতে দ্রুজ ও ম্যারোনাইটদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ দেখা দেয় এবং সেই অজুহাতে ১৮৬০ সালে তুর্ক কর্তৃপক্ষের আদেশে এক নির্মম নরহত্যার অনুষ্ঠান হয়। তখন ইউরোপীয় শক্তিপুঞ্জ মিলে লেবাননকে স্বায়ত্ত শাসন দিতে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সেই নিশ্চয়তার ফলে একজন খৃস্টান গভর্নর লেবানন শাসন করতে থাকেন। স্বায়ত্তশাসনের এই ব্যবস্থার ফলে পশ্চিম ইউরোপ হতে অবিচ্ছিন্ন প্রবাহে নব নব, ভাব ও সে ভাবের প্রয়োগ-জ্ঞান দেশে আসতে শুরু হয়। পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দারা বেশীর ভাগই খৃস্টান থাকায় তারা নতুন ভাবধারা গ্রহণে অধিকতর উৎসুক ছিল। তাদের পূর্বপুরুষদের মত তাদের সন্তানেরা অনেকে উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে সভ্য জগতের বিভিন্ন অংশে গিয়ে বসবাস শুরু করে। এদের কাছে বিশেষ প্রিয় ছিল আমেরিকা। লেবানন ও সিরিয়ার এই ঔপনিবেশিকেরা আমেরিকা হতে তাদের পুরোনো বাসভূমিতে নব ভাব প্রেরণের জন্য নতুন পথ সৃষ্টি করে। সুতরাং, অল্পকালের মধ্যেই আধুনিকায়ন ও ধর্ম-নিরপেক্ষ ব্যবস্থার রূপায়ণের ব্যাপারে লেবানন তার প্রতিবেশী রাজ্যগুলিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে প্রাচ্যের উপর পাশ্চাত্যের এই অভিঘাত আধুনিক ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা সম্ভাবনাপূর্ণ ব্যাপার। পুরাতন সমাজ ভেঙ্গে তার স্থলে নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে আর সেই দ্রুত ক্রমবিকাশেরই অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে সামাজিক, আর্থিক, ধর্মীয় এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। নতুন জীবন-ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি স্থাপনের জন্য আজও অনেক সমস্যার সমাধান প্রয়োজন।

পাশ্চাত্য জগত হতে যে সব নতুন ভাবধারা প্রাচ্যে আমদানী হয়, তার মধ্যে জাতীয়তা ও রাজনৈতিক গণতন্ত্রই সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী। জাতীয়তার আদর্শকে বরণ করে নেওয়ার ফলেই শুরু হয় স্বাধীনতা-সংগ্রাম এবং ফলে অতীত ও বর্তমানের যোগসূত্র অনেকাংশে ছিন্ন হয়ে যায়।

আরব জাতীয়তার জাগরণের আরম্ভ ছিল সম্পূর্ণ জ্ঞানাত্মক আন্দোলন হিসেবে। যারা এ জাগরণের অগ্রদূত, তারা বেশীরভাগই ছিলেন সিরিয়ার বুদ্ধিজীবী–বিশেষ করে বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত লেবানীজ খৃস্টান। এরা মিসরে বসে আন্দোলন পরিচালনা করতেন। এ আন্দোলনের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ছিল প্রাচীন আরবী সাহিত্যের চর্চা এবং ইসলামী ইতিহাসের গবেষণা। আরব সাম্রাজ্যের অতীত গৌরব-মহিমা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে আরব জাতির অতীত কীর্তি ও অবদান–এসবের সঙ্গে পরিচয়ের ফলে শিক্ষিত মহলের চিত্তে এক গর্বিত চাঞ্চল্যের সঞ্চার হয়। পিছনের দিকে চেয়ে তারা সামনের দিকে চাইতে শিখে। জ্ঞানাত্মক জাগরণের পরেই আসে রাজনৈতিক জাগরণ এবং একটা পুনর্জীবিত ও পুনর্মিলিত আরব-সমাজের জন্য উদগ্র আকা বহুজনের বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অবসাদের স্থানে রাজনৈতিক কর্ম-চাঞ্চল্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

এ আরব জাতীয়তার ভিত্তি-ভূমি ব্যাপক। এর মূলনীতি এই যে, ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত আরব ভাষাভাষী জাতি এক : তারা এক ভাষা এবং এক সাধারণ সংস্কৃতির বন্ধনে আবদ্ধ। এ প্রচেষ্টা এগিয়ে চলে প্যান-ইসলামের পথে নয়–প্যান-আরবত্বের পথে। এ আন্দোলনের অগ্রগমনের পথে জটিল স্থানীয় সমস্যা এসে সামনে দাঁড়ায়; ফলে আন্দোলন মূল পথ হতে সরে আসে। মিসরে এ আন্দোলনের পথে প্রথম বিরাট বাধারূপে এসে উপস্থিত হয়, ১৮৮২ সালে ইংরেজের মিসর অধিকার। অতঃপর বৃটিশ শাসনের বিরোধিতাতেই মিসরের উৎসাহ-উদ্দীপনা নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকে। এই সময় হতেই মিসরীয় জাতীয়তাবাদ প্যান-আরবত্ব হতে ভিন্ন পথে চলতে শুরু করে। মিসরীয় আন্দোলনে আঞ্চলিক এবং স্থানীয় স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। আধুনিক যুগে মিসরবাসী এই প্রথম উপলব্ধি করে যে, সে মিসরীয়। “মিসর মিসরীয়দের জন্য এই হয়ে দাঁড়ায় সগ্রাম-ধ্বনি।

প্রথম মহাযুদ্ধের ফলে আরব-জগত আরো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আরব জাতীয়তাবাদও আরো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সিরিয়াতে এর শক্তি প্রথম নিয়োজিত হয় তুর্কীকরণ নীতির বিরুদ্ধে; সিরিয়ার ঘাড়ে ফরাসী অছি শাসন চাপিয়ে দেওয়া পর এ-শক্তি নিয়োজিত হয় ফরাসী-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। এইরূপে ফিলিস্তিনে স্থানীয় জাতীয়তার শক্তি প্রথম প্রযুক্ত হয় বৃটিশ অছিগিরির বিরুদ্ধে; তারপর প্রযুক্ত হয় ইসরাইলের বিরুদ্ধে। লেবানন প্রথমে অছি-শাসনের পক্ষে ছিল; পরে এর তীব্র বিরোধিতা করে পূর্ণ আজাদী অর্জন করে। লেবানন ও সিরিয়ার বুক হতে অছিবাদের শাসনের শেষ চিহ্ন মুছে ফেলা হয় ১৯৪৩ ও ১৯৪৫-এর মধ্যে। আরব অর্ধচন্দ্রের পূর্ব শৃঙ্গে ১৯২০ সালের দিকে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদিতার বিরুদ্ধে এক ইরাকী জাতীয়তা গড়ে ওঠে। ক্ষুদ্র ট্রান্সজর্দান ইতিপূর্বে কোন কালেই স্বাধীন ছিল না; ইংরেজরা এ জনপদকে ১৯২১ সালে সিরিয়া হতে ছিন্ন করে এনে আমীর আবদুল্লহর অধীন এক স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিণত করে।

এইরূপে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের আরব-অঞ্চলসমূহ দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে স্বতন্ত্র জাতি বা উপজাতি গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এবং ইহুদীবাদের অভ্যুদয় এই বিচ্ছিন্ন অংশসমূহকে আবার একত্র হওয়ায় সাহায্য করে। ফিলিস্তিনে ইহুদীবাদের প্রতিষ্ঠাকে আরবরা সর্বত্রই অন্যায় অনুপ্রবেশ মনে করে আসছে। সাধারণ স্বার্থের তাগিদ এবং ক্রমবর্ধমান সংহতি-বোধ চূড়ান্ত বিকাশ লাভ করেছে আরব-লীগের সংগঠনে। ১৯৪৫ সালে কায়রোতে এই ঐক্য-চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আরব-লীগের বর্তমান সদস্য সংখ্যা দশ; মিসর, ইরাক, সউদী আরব, ইয়ামন, লেবানন, সিরিয়া, জর্দান, লিবীয়া, মরক্কো এবং সুদান। শাসন-ব্যবস্থার দিক দিয়ে এ মধ্যে ইরাক*, জর্দান এবং লিবীয়া নির্বাচনভিত্তিক পার্লামেন্ট সহ নিয়মানুগ রাজতন্ত্র; মিসর, সিরিয়া এবং লেবানন রিপাবৃলিক। এ সমস্ত রাষ্ট্রই এখন জাতিসংঘের সদস্য এবং বেশীর ভাগেরই লন্ডন, নিউইয়র্ক, প্যারিস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীতে কূটনৈতিক প্রতিনিধি আছে।

তৃতীয় একেশ্বরবাদমূলক ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা–ধর্ম ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে পূর্ববর্তী ধর্ম দুটির অবদান ভাগী, প্রতীচ্যের সঙ্গে গ্রীকো-রোমান ঐতিহ্যের অংশীদার, সমগ্র মধ্যযুগব্যাপী মুক্ত-জ্ঞানের মশালধারী, ইউরোপীয় রেনেসাঁর মহানুভব দাতা-আরবী-ভাষী জাতিরা এসবই ছিল। মাঝখানে তারা পেছনে পড়ে গিয়েছিল। এবার তারা জগতের অগ্রগমন-রত গণতান্ত্রিক জাতিসমূহের মধ্যে স্থান গ্রহণ করেছে। আমরা আশান্বিত হৃদয়ে ভাবছি : আবার তাদের অবদানে বিশ্বের প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথ সুগমতর হয়ে উঠেবে।

———

* সম্প্রতি (১৪ জুলাই, ১৯৫৮) এক সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে ইরাকের বাদশাহ্ ফয়সল নিহত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে ইরাকে রাজতন্ত্রের অবসান ঘোষণা করা হয়।

.

পরিশিষ্ট

স্যার ফিলিপ কে. হিট্টির জগদ্বিখ্যাত বই The History of the Arabs. এটি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের কাছে আরব জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য সংক্রান্ত প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে এর মূল্য অপরিসীম। পঞ্চাশের দশকে হিট্টির এই বৃহৎ গ্রন্থের একটি সংক্ষিপ্ত (abridged) সংস্করণ প্রকাশিত হয় নিউইয়র্ক থেকে। ইবরাহীম খাঁ সেই সংক্ষিপ্ত সংস্করণটির বাংলা অনুবাদ করেন। আরব জাতির ইতিহাস শিরোনামে তা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালের জানুয়ারী মাসে। ঢাকস্থ ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকশন্সের সহযোগিতায় ইসলামিক একাডেমীর পক্ষে মুহিউদ্দীন খান, আশ্বিনপুর, নায়েব গাঁ ত্রিপুরা (ঢাকা অফিস ১৫, কোর্ট হাউস স্ট্রীট, ঢাকা) হতে প্রকাশিত এবং মুহম্মদ হোসেন, দি স্টার প্রেস, ২১/১ শেখ সাহেব বাজার লেন ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮ + ২১৫। মূল্য চার টাকা।

হিট্টির ইতিহাস অনেকটা কাব্যিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ভাষায় লিখিত। ইবরাহীম খাঁ অনুবাদে সে মেজাজ অক্ষুণ্ণ রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। আবার এদেশীয় স্বল্পশিক্ষিত মুসলমান পাঠকের বোধগম্যকরণের দিকেও ছিল তার সচেতন দৃষ্টি। ফলে এটি একটি অনবদ্য অনুবাদে পরিণত হয়।

.

জীবনপঞ্জি

নাম : ইবরাহীম খাঁ। ডাকনাম খাজা বা খাজা মিয়া। খাজা ছদ্মনামে তাঁর বেশ কিছু রচনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ নামেই পরিচিতি লাভ করেছিলেন।

জন্ম : ১৮৯৪ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে ‘এক বৃহস্পতিবার বার বেলা’য় বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার ভূয়াপুর থানার অন্তর্গত বিরামদী (বর্তমানে শাবাজনগর) গ্রামে ইবরাহীম খাঁ জন্মগ্রহণ করেন। পিংনা হাইস্কুলের ভর্তি রেজিস্ট্রারে তার জন্ম তারিখ দেখানো হয়েছে ১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৫। বংশ : টাঙ্গাইল শহরের মাইল সাতেক পূর্ব-দক্ষিণে বাসাইল গ্রামে পাঠান বংশের কয়েক গোষ্ঠী খাঁ পরিবার বাস করতেন। এঁরা ইবরাহীম খাঁর পূর্বপুরুষ। তাঁর ছ পুরুষ আগে এ বংশের দুভাই বিরামদীর পাশে ফশলান্দী গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। ইবরাহীম খাঁর পিতা শাবাজ খাঁ থেকে বিরামদী গ্রামে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেন। তিনি ছিলেন গ্রামীণ মধ্যবিত্ত। মাতা রতন খানম। ছয় ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৬ষ্ঠ–(১) আবদুল করীম খ, (২) শাহে বানু, (৩) আবদুস সোবহান খাঁ, (৪) কাজিম উদ্দীন খাঁ, (৫) এবাদত আলী খাঁ, (৬) ইবরাহীম খাঁ ও (৭) লুৎফর রহমান খাঁ।

শিক্ষা : বাড়িতে বড় ভাইয়ের কাছে বাংলা, মুনশির কাছে আরবি পড়ায় ইবরাহীম খাঁর হাতেখড়ি। ফশলান্দীর পাঠশালা থেকে নিম্ন প্রাইমারী এবং লোকের পাড়া পাঠশালা থেকে উচ্চ প্রাইমারি পাস। ১৯০৬ সালে হেমনগর হাইস্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাসের পর ১৯০৭ সালে পিংনা হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে ঐ স্কুল হতে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেন ১৯১২ সালে। তিনি ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ হতে ১৯১৪ সালে দ্বিতীয় বিভাগে আই. এ. এবং ১৯১৬ সালে কলিকাতার সেন্ট পলস্ কলেজ হতে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ বি. এ. পাস করেন। ১৯১৭ সালে আইনের প্রিলিমিনারী, ১৯১৮ সালে ল-ইন্টার, ১৯১৯ সালে ইংরেজি সাহিত্যে প্রাইভেট এম. এ. এবং ১৯২৩ সালে আইন পাস করেন।

সংসার : ১৯১৭ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের বড় বাশালিয়া গ্রামের রঈছ মমতাজউদ্দীন খাঁ ওরফে নয়ামিয়ার কনিষ্ঠা কন্যা আনজুমান নেছার সঙ্গে ইবরাহীম খাঁর বিয়ে হয়। তাদের প্রথম সন্তান শামসুজ্জামান খাঁ দুলামিয়া আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ. পড়ার সময় মারা যান। দ্বিতীয় পুত্র মরহুম আসাদুজ্জামান খাঁ সুজা মিয়া বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ-এর শ্বশুর। একমাত্র কন্যা বেগম খালেদা হাবিব সমাজসেবী এবং শিক্ষাবিদ। কাকলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। তৃতীয় পুত্র আমিনুজ্জামান খা (আমিন) ভূয়াপুর থানা (উপজেলা) পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন, বর্তমানে বিলেতে বসবাসরত। ১৯৭৬ সালের ১১ নভেম্বর ইবরাহীম খাঁর স্ত্রী মারা যান।

কর্ম : ১৯১৯ সালের ২৮ নভেম্বর ইবরাহীম খাঁ করটিয়া হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে যোগ দেন। ১৯২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে শিক্ষকতা ত্যাগ করে তিনি ময়মনসিংহ শহরে ওকালতি ব্যবসা শুরু করেন। ১৯২৫ সাল অবধি ওকালতি ব্যবসায় থাকার পর ১৯২৬ সালের ২ জানুয়ারি পুনরায় হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষকপদে যোগ দেন এবং আটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চাঁদ মিয়ার সৌজন্যে সা’দত কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেন। ১৯২৬ সালের জুলাই মাসে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর প্রিন্সিপাল হন এবং একটানা ২২ বছর ঐ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আসাম ও অবিভক্ত বাংলায় সা’দত কলেজ মুসলমান প্রতিষ্ঠিত প্রথম কলেজ এবং ইবরাহীম খাঁ ছিলেন প্রথম মুসলমান প্রিন্সিপাল। ১৯৪৭ সালের ৪ নভেম্বর সরকারের আমন্ত্রণে তিনি পূর্ববাংলা মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করেন এবং ১৯৫৩ সালের ১৪ জুলাই অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৮ সালে ভূয়াপুর কলেজ (বর্তমানে ইবরাহীম খাঁ মহাবিদ্যালয়) এবং পরবর্তীকালে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের সহযোগিতায় বাংলা কলেজ (বর্তমানে ঢাকায় মীরপুরস্থ সরকারি বাংলা কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ; সাধারণ সম্পাদক ইবরাহীম খাঁ এবং অধ্যক্ষ প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক শিক্ষক সমিতিরি সভাপতি ছিলেন ইবরাহীম খাঁ। তিনি ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায়, পাকিস্তান গণপরিষদে এবং ১৯৬২ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হন। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ তারিখে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে তিনি দলীয় রাজনীতি হতে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি পাকিস্তান কৃষি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে, কলিকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে এবং বাংলা একাডেমীর প্রথম দুই কার্যনির্বাহী পরিষদে নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। তিনি আন্তপার্লামেন্টারী মত বিনিময় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ও চীন সফর করেন। তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন।

পুরস্কার ও সম্বর্ধনা : ১৯৩৮ সালে ইবরাহীম খাঁ ‘খানবাহাদুর’ উপাধি পান, পরাধীন দেশে এই খেতাব তিনি গ্রহণ করেন নি এবং ১৯৪৩ সালে তা বর্জন করেন। ১৯৪৪ সালের ১৯ মার্চ পূর্ববঙ্গ সাহিত্য সংসদ তাঁকে বিশেষ সম্বর্ধনা প্রদান করে। নাট্যসাহিত্যে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান ১৯৬৩ সালে। ১৯৬৩ সালেই তিনি সরকারি খেতাব তমঘায়ে কায়েদে আজম লাভ করেন এবং ১৯৭১ সালে দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তা বর্জন করেন। ১৯৭৫ সালের ৩১ মে বাংলা একাডেমীতে বাংলাদেশ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের আয়োজনে জাতীয় সম্বর্ধনা লাভ করেন তিনি। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক প্রদান করেন। কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশ তার গণসম্বর্ধনার আয়োজন করে ১৯৭৭-এর ১৫ মে। মৃত্যু : ২৯ মার্চ, ১৯৭৮ সকাল সাড়ে দশটায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ। পরদিন ভূয়াপুর কলেজ প্রাঙ্গণে তার স্ত্রীর কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *