তুমি কেমন আছ? ‘ভাল। ‘গলা শুনে তাে ভাল মনে হচ্ছে না। অসুখ–বিসুখ করেছে নাকি?” “না ঘুম পাচ্ছে।

এখনি ঘুম পাচ্ছে কেন? রাত তাে বেশি হয় নি। ক‘টা বাজে তােমাদের এখানে?
‘দশটা। দশটা তাে তেমন রাত না। তুমি ঘুমে কথা বলতে পারছ না। ব্যাপার কি ? “আমি ঘুমের ওষুধ খেয়েছি।
‘কয়েক রাত ধরে আমার ঘুম হচ্ছে না। আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি। “ও আচ্ছা। লিলিয়ান জড়ান স্বরে বলল, তােমাকে একটা জরুরী কথা জিজ্ঞেস করি। খুব জুরুরী। আচ্ছা, তােমাদের গ্রামের বাড়িটা বিশাল না?”
‘হা বিশাল। হঠাৎ এই প্রসঙ্গ কেন?
কারণ আছে। এখন বল তােমাদের বাড়ির বাইরের দিকে ছাদ পর্যন্ত লােহার প্যাচানাে সিঁড়ি আছে না?”
‘না নেই। ‘আগে এক সময় ছিল। এখন নেই। ‘কখনাে ছিল না। কোন কালেও ছিল না। সিড়ির কথা এল কেন?” ‘এখন কথা বলতে পারব না – খুব ঘুম পাচ্ছে। ‘হ্যালাে লিলিয়ান – হ্যালাে।।
আয়নাঘর-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলিয়ান টেলিফোন নামিয়ে রেখে সােফার উপর ঘুমিয়ে পড়ল। আবার ঘুম ভাঙল টেলিফোনের শব্দে। লিলিয়ান জড়ানাে গলায় বলল, হ্যালাে !
“মিসেস লিলিয়ান ?? ‘ইয়েস।
‘ইউনাইটেড ট্রাভেল এজেন্সি থেকে বলছি – আপনি ভিয়েনার বুকিং চেয়েছিলেন। আগামী কাল বুকিং পাওয়া গেছে। লন্ডন ফ্রাংকফোর্ট হয়ে ভিয়েনা। লন্ডনে একরাত থাকতে হবে।
কোথায় থাকব ? এয়ারপাের্ট হােটেল। এয়ারপাের্টের কাছেই। ‘আচ্ছা, এই হােটেলে কি প্যাচানাে লােহার সিঁড়ি আছে?” ‘ম্যাডাম আপনি কি বলছেন বুঝতে পারছি না। | লিলিয়ান টেলিফোন রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে সেই প্যাচানাে সিড়ি আবার দেখল। সে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। অতি দ্রুত নামছে। সিড়ি কাঁপছে – মনে হচ্ছে পড়ে যাবে। লিলিয়ান ঘুমের মধ্যেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
তাহেরের নার্ভ শক্ত।
শুধু শক্ত না, বেশ শক্ত। চরম বিপদেও তার মাথা ঠাণ্ডা থাকে। ভিয়েনায় সে কোন বিপদের মধ্যে নেই। সুখেই আছে বলা চলে। সেমিনার চলছে। পেপার পড়া হচ্ছে, তবে আড্ডা হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। প্রতি সন্ধ্যায় ককটেল পার্টি। হৈচৈ, নাচানাচি। তাহের এই হৈচৈ–এ নিজেকে মেশাতে পারছে না। মনে হচ্ছে তার ইস্পাতের নার্ভেও মরিচা ধরে গেছে। গত রাতে এক ফোটা ঘুম হয় নি। এরকম অদ্ভুত ঘটনা তাহেরের জীবনে খুব বেশি ঘটে নি। বিছানায় যাবার আগেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। তার অনিদ্রার কারণ লিলিয়ান। লিলিয়ানের সমস্যাটা সে ঠিক ধরতে পারছে ।
আয়নাঘর-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
টেলিফোনে প্যাচানাে সিঁড়ির কথা কেন জিজ্ঞেস করল? তাহেরকে এত আগ্রহ করে সে কেনইবা বিয়ে করল ? আমেরিকান মেয়েগুলির কাছে বিয়ে এবং ডিভাের্স দুই–ই ডালভাত। চব্বিশ ঘণ্টার পরিচয়ে তারা বিয়ে করে ফেলে, আবার এক সপ্তাহ পর ছাড়াছাড়ি। দুজন দুদিকে গিয়ে অন্য দু‘জনকে খুঁজে নেয়। কিন্তু লিলিয়ান এ রকম মেয়ে নয়। সে কেন তাহােরের মত আধা–বাউণ্ডেল একজনের জন্যে এতটা ভালবাসা জমিয়ে রাখবে?
লিলিয়ান কোন একটি ব্যাপারে কষ্ট পাচ্ছে। সেই কষ্টের প্রকৃতি তাহের জানে না। জানার চেষ্টা করা কি উচিত? স্বামী–স্ত্রীর ভেতরও কিছু গােপন ব্যাপার থাকা প্রয়ােজন বলে তাহের মনে করে। অবশ্যি ভিয়েনায় পা দেয়ার পর থেকে তাহেরের মনে হচ্ছে, সে ভুল করছে। তার উচিত ছিল লিলিয়ানের গােপন কষ্টের ব্যাপারগুলি জানা।
লিলিয়ানকে টেলিফোনে ধরার সব চেষ্টা বিফল হল। সারাদিনে তাহের ছ‘বার চেষ্টা করল। রিং হয়, কেউ টেলিফোন ধরে না। লিলিয়ান কি ঘর তালাবন্ধ করে কোথাও গেছে? না–কি স্ট্রোক হয়ে ঘরে মরে পড়ে আছে? তাহের খুব অস্থির বােধ করতে লাগল। সেমিনারে একেবারেই মন বসছে না। ইচ্ছা করছে ব্যাগ গুছিয়ে প্লেনে উঠে বসতে। রাতদুপুরে বাড়িতে পৌছে আমেরিকানদের মত চেঁচিয়ে বলতে – “Honey I am home.”
আয়নাঘর-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
সেমিনারে ‘Cataract Solvent‘–এর উপর বিরক্তিকর এক বক্তৃতা হচ্ছে। বক্তা মাঝে মাঝে হাসাবার চেষ্টা করছেন পারছেন না।
বক্তৃতার মাঝখানে তাহেরের কাছে স্লিপ এল, আমেরিকা থেকে জরুরী কল। তাহের টেলিফোন ধরবার জন্যে প্রায় ছুটে গেল। যিনি পেপার পড়ছিলেন তিনি পড়া বন্ধ করে কড়া চোখে তাকিয়ে রইলেন।
টেলিফোন করেছে লিলিয়ান। তাহের বলল, কেমন আছ লিলিয়ান ? ‘ভাল আছি।
কোন বিশেষ কারণে টেলিফোন করেছ, না এম্নি? ‘এম্নি করেছি। আমি কি তােমাকে বিরক্ত করলাম?”
‘মােটেও বিরক্ত কর নি, বরং খুব আনন্দিত করেছ। আমি তােমাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করছিলাম। ঐদিন হঠাৎ টেলিফোন রেখে দিলে ...‘।
‘খুব ঘুম পাচ্ছিল, শরীর ভাল লাগছিল না। ‘প্যাচানাে সিঁড়ির কথা জিজ্ঞেস করছিলে কেন?”
ও কিছু না। বাদ দাও। ‘লিলিয়ান, এখন তােমার শরীর কেমন?
শরীর ভাল। তুমি আমাকে নিয়ে মােটেও চিন্তা করবে না। তুমি ঠিকমত তােমার সেমিনার কর। কোর্স ওয়ার্ক কবে থেকে শুরু হচ্ছে?”
আয়নাঘর-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
তাহের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে খুব নরম গলায় বলল, লিলিয়ান, তুমি কি আমার একটা প্রশ্নের জবাব দেবে?
‘অবশ্যই দেব?’
‘আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, তুমি এক ধরনের ক্রাইসিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছ। ক্রাইসিসের কারণটা কি আমি জানতে পারি ?
‘বেশ, জানাতে না চাইলে জানাতে হবে না। এমন কিছু কি আছে যা তুমি আমাকে বলতে চাও?
‘হঁ্যা।
তাহলে বল।” ‘I love you.’
অন্য সময় হলে তাহের হাে–হাে করে হেসে ফেলত। আজ পারল না। তার অসম্ভব মন খারাপ হয়ে গেল। টেলিফোন নামিয়ে রেখে সে দুটা কাজ করল। প্রথম কাজ, কোর্স কো–অর্ডিনেটরকে বলল, আমার একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
Read more
