আয়নাঘর-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর-হুমায়ূন আহমেদ

খেতে রসােগােল্লার মত লাগছেতাহের বিরক্তমুখে বলল, ভাজা মাছ খেয়াে না লিলিয়ানমাছটা পচা বলে ভেজে ফেলেছে। 

আয়নাঘর

খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে পানটাই আরাম করে খাওয়া গেলমৌরী দিয়ে সুন্দর করে বানানােলিলিয়ান দুটা পান মুখে দিলসে বিস্মিত হয়ে বলল, খাওয়াদাওয়া শেষ হলে তােমরা ভেজিটেবল খাও কেন তাতাে বুঝলাম না। 

তাহের বলল, এটা ভেজিটেবল নাএর নাম পানখাবার পর খেতে হয়কুৎ করে গিলে ফেললে হবে নাক্রমাগত চিবিয়ে যাবেগিলতে পারবে না। 

কতক্ষণ চিবাবাে?আধঘন্টা তাে বটেই। 

তাতে লাভ কি?মুখের একটা একসারসাইজ হয়এইটুকুই লাভ। 

ঠাট্টা করছ?মােটেই ঠাট্টা করছি না। তুমি কি ভেবেছ? আমার কাজ শুধু ঠাট্টা করা ?জিনিসটা খেতে আমার ভাল লাগছে” 

ভাল লাগলে খাওআমাদের গ্রামের নতুন বউদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্যের একটি হচ্ছে পান খেয়ে ঠোট লাল করা। 

আয়নাঘর-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি তাে নতুন বউ না। 

অবশ্যই নতুন বৌছেলেমেয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমাদের দেশের বউদের নতুন বউ ধরা হয়। 

কোন মহিলার দশ বছরেও যদি ছেলেমেয়ে না হয় তাহলে কি তাকে নতুন বউ ধরা হবে

নাতখন তাকে বলা হবে বাজমেয়েমানুষঅমঙ্গলজনক একটি ব্যাপারসেই মেয়েকে কোন উৎসবে ডাকা হবে নাসকাল বেলা কেউ তার মুখ দেখতে চাইবে না। 

তােমাদের নিয়মকানুন ভারী অদ্ভুত। 

অদ্ভুত তাে বটেইআরাে অদ্ভুত কথা শুনবে? আমাদের দেশে স্বামীস্ত্রী একসঙ্গে পাশাপাশি বসে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকাবে না। 

তাকালে কি হয়? তাকালে তাদের যে সন্তান হবে সে হবে চরিত্রহীন। 

আবার তুমি তামাশা করছকি জন্যে করছ তাও বুঝতে পারছিতুমি আমার সঙ্গে জোছনা দেখতে চাচ্ছ না। 

জোছনা দেখতে অসুবিধা নেইচঁাদের দিকে না তাকালেই হলছাদে সত্যি সত্যি বসবে আমার সঙ্গে? | হুঁ বসবতবে ছাদে নাবারান্দায়তােমার বিখ্যাত চঁাদ বারান্দা থেকেও দেখা যায়চাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি যদি মুগ্ধ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি কিছু মনে করাে নাঘুমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা নিরানব্বই দশমিক নয় ভাগ। 

ইস্কান্দর আলির মেজো ছেলে বারান্দা ঝাট দিচ্ছেতাহের তাকে বারান্দায় চাদর পাততে বলেছেএই ছেলেই খাবার নিয়ে এসেছেবাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে এনেছেতার বুদ্ধি কোন পর্যায়ের তাহের এখনাে ধরতে পারছে নাসে টর্চ কিনে এনেছে, কিন্তু ব্যাটারি আনে নি। 

আয়নাঘর-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

তােমার নাম কি ? ছালামছালাম না সালাম?ছালামছালাম আলিছালাম তােমাকে টর্চের ব্যাটারি আনতে যেতে হবে, পারবে না

দোকান কি অনেক দূর ?” 

দূর হলে থাক, সকালে এনে দিওছাইকেল আছেসাইকেল থাকলে সাইকেলে করে নিয়ে এস। 

তারা ঘুমুতে গেল রাত দুটায়তাহের বলল, হারিকেন জ্বালানাে থাকুকলিলিয়ান বলল, হারিকেন জ্বালানাে থাকলে ঘরে চঁাদের আলাে আসবে নাতাহের বলল, তােমার ভেতর এত কাব্যভাব আছে তা কিন্তু আমার জানা ছিল না। 

জানা থাকলে কি করতে, আমাকে বিয়ে করতে না?. তাহের হাসলহাসতে হাসতে বলল, চা খেতে ইচ্ছা করছেআমার সমস্যা হচ্ছে ঘুমের প্রথম ধাক্কাটা কেটে গেলে ঘুম আসে নাআমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি, বাকি রাতটা তুমি আরাম করে ঘুমুবে, আর আমাকে জেগে থেকে তােমার বিখ্যাত জোছনা দেখতে হবে। 

চা সত্যি খেতে চাও? আমার কাছে টিব্যাগ আছে, সুগার কিউব আছেশুধু দুধ নেই। 

পানি গরম করবে কিভাবে?কাগজ জ্বালিয়ে পানি গরম করবকাগজ পাবে কোথায়? তুমি ডার্টি জোকসএর যে বইটি এনেছ, সেটা পুড়িয়ে ফেলববানাব চা?মন্দ নাপারলে বানাও‘তুমি চুপচাপ বিছানায় বসে থাকআমি চা বানিয়ে আনছিআমি তােমার পাশে বসি। 

আয়নাঘর-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

লিলিয়ান চায়ের পানি গরম করছেপাশে বসে আছে তাহেরতার ঘুম কেটে গেছে বলে মনে হচ্ছে নাসে খানিকক্ষণ পরপর হাই তুলছেলিলিয়ান বলল, তুমি মহিলা সম্পর্কে আরাে কিছু বল। 

কোন মহিলা ?আয়নাঘরে যিনি মারা গিয়েছিলেন। 

আমি কিছুই জানি নাখুব রূপবতী ছিলেন, এইটুক জানিজাঙ্গির মুনশি বেনারস থেকে একজন আর্টিস্ট এনে তার কিছু ছবি আঁকিয়েছিলেনসেইসব ছবি দেখলে তার সম্পর্কে আন্দাজ পেতেতবে ছবিও নেইউনার মৃত্যুর পর জাঙ্গির মুনশি তার স্ত্রীর সব ছবি পুড়িয়ে ফেলেন। 

লিলিয়ান কোমল গলায় বলল, উনাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। 

তাহের চা খাচ্ছে। কাচের গ্লাসে চা দেয়া হয়েছেগ্লাস গরম হয়ে গেছে চা খাওয়া যাচ্ছে নাতাহের চায়ের গ্লাসে ফু দিতে দিতে বলল, আমার মার ধারণা উনি একবার তিতলী বেগমকে দেখেছিলেন। 

উনি দেখবেন কিভাবে?মাধারণা, দেখেছেনগভীর রাতে আয়নাঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন হঠাৎ 

আয়নাঘর-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

শুনেন আয়নাঘরের ভেতর থেকে ঝুনঝুন চুড়ির শব্দআয়নাঘর তালাবন্ধচুড়ির শব্দ কিভাবে আসবে? মা খুব অবাক হলেনউনার সাহসের সীমা ছিল নাচাবি নিয়ে আয়নাঘর খুললেনমােমবাতি হাতে একা একা আয়নাঘরে ঢুকলেন। 

তারপর

তারপরের ব্যাপার পরিষ্কার জানা যায় নামা কিছু একটা দেখেছিলেনকি দেখেছিলেন কিছুই ভেঙে বলেন নি

 

Read more

আয়নাঘর-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *