কফি হাউস মাঝে মাঝে কিছু কায়দা করে নােটিস দিয়ে দেয় – আজ বেলা নটা থেকে সাড়ে ন‘টা পর্যন্ত ফ্রী কফি। ব্যবসার নতুন কোন চাল। আজও এরকম কিছু হয়েছে বোধহয়। লিলিয়ান কফির মগ হাতে জায়গা খুঁজছে তখন শুনল হাত।

উঁচিয়ে কে তাকে ডাকছে – হ্যালাে লিলিয়ান, এদিকে এস জায়গা আছে।
লিলিয়ান তাকিয়ে দেখে, তাহের।।
সে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল – তারপর এগিয়ে গেল। তাহের হাসি মুখে বলল, এত তাড়াতাড়ি তােমার দেখা পাব ভাবি নি। তুমি কি এই ইউনিভার্সিটির ছাত্রী?
‘আমি যাচ্ছিলাম পাশ দিয়ে কি মনে করে যে ঢুকেছি। তােমার সাবজেক্ট কি? ‘এনপলজি।‘ ‘দাঁড়িয়ে আছ কেন বােস। বােস।
আয়নাঘর-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলিয়ান বসবে কি–না বুঝতে পারছে না। তার অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে বসা ঠিক হবে না। এই মানুষটির সঙ্গে যােগাযােগের ফল শুভ হবে না। এর কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল। তাছাড়া এই লোক তার সঙ্গে এমন আন্তরিক
ভঙ্গিতে কথা বলবে কেন ? এই অধিকার তাকে কে দিয়েছে ?
‘তুমি কি খাবে? কফি ? কফিতে ক্রীম থাকবে – না ব্লাক কফি। ‘আমি কিছু খাব না।
‘কাপাচিনাে কফি খাবে? প্রচুর ফেনা থাকে, একগাদা মিষ্টি দিয়ে বানানাে হয়। দারুণ মজা। তুমি বােস। আমি নিয়ে আসছি।
তাহের কফি নিয়ে ফিরে এসে দেখে লিলিয়ান শান্ত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বসে আছে। মেয়েটিকে তার খুব অসহায় মনে হল। শুধু অসহায় না, ক্লান্ত বিষন্ন । এই বয়েসী মেয়েরা অনেক হাসিখুশি থাকে।
‘কফি কেমন লাগছে? ‘বেশি মিষ্টি।
‘একেক ধরনের কফির একেক নিয়ম। এই কফি খেতে হয় প্রচুর মিষ্টি দিয়ে। তােমার কি মন খারাপ?”
‘দেখে মনে হচ্ছে খুব মন খারাপ। লিলিয়ান কিছু বলবে না ভেবেও বলে ফেলল, রাতে আমার ঘুম হয় নি।
তাহের হেসে ফেলল। শব্দময় হাসি। আশেপাশের টেবিল থেকে ছাত্রছাত্রীরা তাকাচ্ছে। অনেকের ভুরু কুঁচকে আছে। কোন বিদেশী তাদের দেশের কফি শপে বসে সবাইকে অগ্রাহ্য করে এমন হাসি হাসবে তা বােধহয় এদের পছন্দ নয়।
আয়নাঘর-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
তাহের লিলিয়ানের দিকে ঝুঁকে এসে বলল, শােন লিলিয়ান — মাঝে মাঝে রাতে ঘুম না হওয়াই সুস্থ মানুষের লক্ষণ। শুধুমাত্র পশুদেরই রাতে ঘুমের অসুবিধা হয় না। মানুষের হয়। আমাকে দেখ – আমি বিছানায় শােয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়ি। এ জন্যে নিজেকে পশু পশু লাগে। হা হা হা।
আবারো সেই হাসি। আবারাে লােকজন চোখ ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে। লিলিয়ান বলল, আমি উঠব। কফির জন্যে ধন্যবাদ।
‘আহা বস আর খানিকক্ষণ। “না না।
‘কাল তাে ছুটি। এত তাড়া কিসের? এখান থেকে নব্বই কিলােমিটার দূরে একটা পেট্রোফাইড ফরেস্ট আছে। পুরাে জঙ্গল পাথর হয়ে আছে – আমি। আগামীকাল যাব বলে ভাবছি। দিনে দিনে ফিরে আসা যাবে। তুমি কি আগ্রহী ?
“না আমি আগ্রহী না। আমার বেড়াতে ভাল লাগে না। ‘ঐদিন ইয়েলো স্টোন পার্কে কিন্তু খুব বেড়াচ্ছিলে।। ‘ঐদিন ভাল লেগেছিল। এখন লাগবে না।
লিলিয়ান বের হচ্ছে। তাহের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। তাকে মুখের উপর না বলা হয়েছে তবু কোন বিকার নেই। অদ্ভুত নির্লজ্জ ধরনের ছেলে তাে। সাধারণত আমেরিকান ছেলেগুলি এরকম হয় – আঠার মত লেগে থাকে। এ তাে বিদেশী এক ছেলে। তার মান—অপমান বোধ আরাে খানিকটা থাকা উচিত ছিল না?
আয়নাঘর-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলিয়ান বলল, আর আসতে হবে না। আমি যাচ্ছি।
তাহের বলল, আবার দেখা হবে। ভাল থাক – রাত জেগে জেগে তুমি যে উচ্চ শ্রেণীর মানব সন্তান তা প্রমাণ করতে থাক। হা হা হা। ভাল কথা, তুমি কি আমার টেলিফোন নাম্বার রাখবে। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখলে টেলিফোন করতে পার।
‘আমি অন্যের টেলিফোন নাম্বার রাখি না। ‘অন্যের টেলিফোন নাম্বারই তাে রাখতে হয়। নিজেরটা তো মনেই থাকে। হা।
হা হা।
‘আমি যাচ্ছি। লিলিয়ান দ্রুত করিডােরে চলে এল। সে এম্নিতেই দ্রুত হাঁটে, আজ‘ আরো দ্রুত হাঁটছে। মেমােরিয়েল ইউনিয়নের বাইরে এসে হাঁফ ছাড়ল। পেছনে ফিরে তাকাল। তাহেরকে দেখা যাচ্ছে না। নাছােড়বান্দা হয়ে সে যে পেছনে পেছনে আসে নি – এতেই লিলিয়ান আনন্দিত।
লিলিয়ান তার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরল না। কঁাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হাঁটতে বের হল। আজ সারাদিন সে হাঁটবে। হেঁটে হেঁটে এমন ক্লান্ত হবে যে বিছানায় শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়বে। ঘুমুতে যাবার আগে হট শাওয়ার নেবে। এক গ্লাস আগুন গরম দুধ খাবে। বিছানায় নতুন চাদর বিছিয়ে রাখবে। তার ঘুমের সমস্যা আছে। এক রাত ঘুম
হলে পর পর কয়েক রাত ঘুম হয় না। | বেশিক্ষণ হাঁটতে হল না। অল্প হেঁটেই লিলিয়ান ক্লান্ত হয়ে পড়ল। মলগুলিতে ঘুরতে এখন আর ভাল লাগছে না। ইচ্ছা করছে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়তে। এখন বিছানায় যাওয়াটা হবে বিপদজনক। খানিকক্ষণ ঘুম হবে, কিন্তু রাতটা কাটবে অঘুমাে। লিলিয়ান স্যান্ডউইচ কিনল। পার্কে বসে একা একা খেল। একা একা খাওয়া খুব কষ্টের। খাবার সময় একজন কেউ পাশে থাকা দরকার। যে প্রয়ােজনে–অপ্রয়ােজনে কথা বলবে। হাসবে। লিলিয়ানের এমন কেউ নেই। কোনদিন কি হবে? প্রিয় একজন কি থাকবে পাশে? কে হবে সেই মানুষটি ? চার্চের পাদ্রী মাথায় হলি ওয়াটার ছিটিয়ে, বুকে ক্রশ স্পর্শ করে বলবেন
আয়নাঘর-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
তােমাদের দু‘জনকে আমি স্বামী–স্ত্রী হিসেবে ঘােষণা করলাম। মৃত্যু এসে তােমাদের বিচ্ছিন্ন না করা পর্যন্ত একজন থাকবে অন্যের
পাশে, সুখে দুঃখে, আনন্দে বেদনায়। Till death do you part. লিলিয়ানের চোখে পানি এসে যাচ্ছে। সে পার্কের অপরূপ দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। মন শান্ত হচ্ছে না। সে একধরনের হাহাকার বােধ করছে — মনে হচ্ছে এই অপরূপ দৃশ্য একা দেখার নয়। দুজনে মিলে দেখার।
Read more