নীলু বাসায় ফিরল সন্ধ্যার পর।তার জন্যে বড় ধরনের একটা চমক অপেক্ষা করছিল। নীলুর মা রোকেয়া দুপুরে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। তাঁর সঙ্গে বাবলু, বিলুর ছেলে। নীলু আনন্দের উচ্ছাসে কেঁদেটোদে একটা কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলল। প্রায় সাড়ে তিন বছর পর মার সঙ্গে নীলুর দেখা।রোকেয়া নিজেও কাঁদছিলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে চেষ্টা করছিলেন মেয়েকে সামলাবার। টুনী এবং বাবলুদূরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দৃশ্যটি দেখছে। টুনী কখনো তার মাকে কাঁপতে দেখে নি। তার বিস্ময়ের কোনো সীমা ছিল না। বড়ো মানুষরাও তাহলে এমন করে কাঁদে? নীলু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, রাজশাহী থেকে ঢাকা কত আর দূর মা? তোমার আসতে সাড়ে তিন বছর লাগল?
রোকেয়া মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলেন। কিছুই বললেন না।তোমার নাতনীকে দেখেছি মা? হুঁ। বড়ো সুন্দর মেয়ে হয়েছে। তোর ননদের মতো রূপসী হবে।শাহানা কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে খুব লজ্জা পেল। তোমার কান্না থামাও তো ভাবী। তোমার কান্না দেখে আমার নিজেরও চোখে পানি এসে যাচ্ছে।নীলু বাবলুকে কোলে নিয়ে আবার খানিকক্ষণ কাঁদল।এই বুঝি বাবলু? রোকেয়া বললেন, কোল থেকে নামিয়ে দে। কেউ কোলে নিলেই কাঁদে। নীলু নামাল না। শাহানা বলল, এই ছেলেটা কিন্তু ভারি অদ্ভুত। কোনো কথা বলে না। দুপুরবেলা এসেছে, এখন পর্যন্ত কোনো কথা বলে নি। মাঐমা, ও কি রাজশাহীতেও এ-রকম?
হ্যাঁ গো মা। কথাবার্তা যা বলে, আমার সঙ্গেই বলে। তাও কানে কানে।নীলু হাত-মুখ ধুতে গেল। তার এত আনন্দ লাগছে আজি! মনে হচ্ছে পৃথিবীর মতো সুখের জায়গা আর কিছুই নেই। অসংখ্য দুঃখের মধ্যেও এখানে হঠাৎ হঠাৎ এমন সব সুখের ব্যাপার ঘটে যায় যে সব দুঃখ চাপা পড়ে যায়। বাথরুমে দরজা বন্ধ করে নীলু আবার খানিকক্ষণ কাঁদল।রোকেয়াকে এ বাড়ির সবাই বেশ পছন্দ করেন। মনোয়ারা নিজেও করেন। অন্য যে কেউ এ বাড়িতে কিছু দিনের জন্যে থাকতে এলেও তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন, শুধু এই একটি ক্ষেত্রে করেন না। এর মূল কারণ হচ্ছে রোকেয়ার স্বভাব। তিনি কথা বলেন কম। গভীর আগ্রহে অন্যের কথা শোনেন। নিজের কোনো মতামত কখনোই জাহির করেন না। যখন কিছু বলেন, এত আন্তরিকতার সঙ্গে বলেন যে, শুনতে বড়ো ভালো লাগে।
মনোয়ারা দুপুর থেকে তাঁর সঙ্গে সুখ-দুঃখের অনেক কথা বলেছেন। তার মধ্যে একটা বড়ো অংশ ছিল নীলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ।এই দেখেন না বেয়ান সাহেব, আমার ঘাড়ে মেয়ে দিয়ে সেই সকালে চলে যায় অফিসে, ফেরে সন্ধ্যা পার করে। ঘরে একটা কাজের মানুষ নেই। আমি একা মানুষ। বয়স তো হয়েছে আমার, না কি বলেন? কাজের লোক রাখেন না কেন? হাগারের পাগায়ের এক জন কাউকে ধরে আনলেই রাখব নাকি? একটাকে রেখেছিলাম—বেশ কাজের। তারপর এক দিন দেখি নাকি ঝেড়ে সেই হাত তার শার্টে মুছে যেন কিছুই হয় নি এ-রকমভাবে টেবিলে ভাত বাড়তে গেল। এক চড় দিয়ে হারামজাদাকে বিদেয় করেছি।বিদেয় করলেন কেন? ভালোমতো বুঝিয়ে দিলেই হত।
আমার এত সময় নেই বেয়ান সাহেব যে, বসে বসে তাকে শেখাব। যে শেখে না নয় বছরে, সে শেখে না। নব্বুই বছরে। আর ঝামেলা কি একটা? শাহানার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, জানেন তো? জ্বি জানি।হুটহাট করে ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে লোকজন আসছে। ওদের তো আর টেস্ট বিসকিট দিয়ে চা দেওয়া যায় না, কি বলেন? না, তা দেবেন কীভাবে? কিন্তু দিতে হয়। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায়। সেই দিন শাহানার এক খালাশাশুড়ি এসেছিলেন। একটা মানুষ নেই ঘরে। চা দিতে গিয়ে দেখি চায়ের পাতা নেই। চিন্তা করেন অবস্থা।শাহানার বিয়েটা কবে?
জুলাই মাসের দশ তারিখে মোটামুটিভাবে ঠিক করা হয়েছে। ছেলের ছোট চাচা থাকেন। হাওয়াই। উনি জুলাই মাস ছাড়া আসতে পারবেন না। আর এটা হচ্ছে ওদের বংশের প্রথম কাজ। ওরা সবাইকে নিয়ে করতে চায়।তা তো চাইবেই।বিরাট খরচের ব্যাপার, বুঝতেই পারছেন। এদিকে হাত একেবারে খালি। কীভাবে কি হবে, কে জানে? মনে হলেই বুক শুকিয়ে-আসে। ভেবেছিলাম এর মধ্যে রফিকের একটা কিছু হবে, কিছুই হচ্ছে না।ইনশাআল্লাহ হবে শিগগির।আর হয়েছে। মহা অপদার্থ। ওর কিছুই হবে না।
বাবলু তার অদ্ভুত স্বভাবের জন্যে খুব অল্প সময়েই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। হোসেন সাহেবের মতে বাবলুর মতো গভীর ছেলে তিনি এর আগে দেখেন নি। কোনো কথা নেই, কানাকাটি নেই, ঝামেলা নেই। গভীর আগ্রহে সব কিছু দেখছে। সবই অবশ্যি দূর দূর থেকে। মনোয়ারার ধারণা-ছেলেটা হাবা টাইপ। বুদ্ধিসুদ্ধি নেই। কিন্তু কথাটা সম্ভবত ঠিক নয়। ছেলেটির বুদ্ধি ভালো। শুধু ভালো নয়, বেশ ভালো।
টুনী তার সঙ্গে ভাব করার খুব চেষ্টা করছে। বাবলু আছে তার সঙ্গে, কিন্তু খুব একটা ভাব হয়েছে বলে মনে হয় না। টুনী রান্নাবাটি খেলার সময় বাবলু একটু দূরে বসে থাকে। তাকিয়ে থাকে গভীর মনযোগে। খেলাতে তার অংশগ্রহণ বলতে এইটুকুই। টুনীর সঙ্গে তার কথাবার্তার নমুনা এ রকম–
টুনী: রান্নাবাটি খেলবে?
বাবলুঃ (নিশ্চুপ)
টুনী: আমি হচ্ছি মা। তুমি কী হবে?
বাবলুঃ (মৃদু হাসি)
টুনী: বাবা হবে?
বাবলু মাথা নাড়ল। তার অর্থ কি ঠিক বোঝা গেল না। হ্যাঁ হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।
টুনী: আচ্ছা, তুমি বাবা। এখন অফিসে যাও। সন্ধ্যার সময় অফিস থেকে আসবে।
বাবলু নড়ল না।
টুনী: কি, অফিসে যাবে না?
বাবলুঃ মাথা নাড়ল। কিন্তু এবারও বোঝা গেল না সে হ্যাঁ বলছে কি না বলছে।
অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এ বাড়িতে যে একটিমাত্র লোকের সঙ্গে তার কিছু কথাবার্তা হয়, সে শফিক। সে ঘুরেফিরে শফিকের কাছে আসে এবং অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে শফিকের পাশে কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে যায়। এই অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই দু-একটা কথাবার্তা হয়।যেমন, গত রবিবারের কথা ধরা যাক। শফিক শুয়ে ছিল বিছানায়, বাবলু পর্দার আড়াল থেকে কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ করল। তারপর গটগট করে ঘরে ঢুকে পা বুলিয়ে খাটে বসে রইল। শফিক বলল, কী খবর তোমার বাবলুসাহেব? ভালো আছ?
বাবলু হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ল। সে ভালোই আছে। শফিক বলল, হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা দাও তো। বাবলু দিল। শফিক সিগারেট ধরিয়ে বলল, তুমি একটা খাবে নাকি বাবলু? বাবলুমাথা নাড়ল-সে খাবে না। শফিক বলল, তুমি সিগারেট খাও না? না।কেন।ভালো লাগে না।এমনভাবে বলা, যেন আগে অভ্যাস ছিল। ভালো না-লাগায় বর্তমানে ছেড়ে দিয়েছে, তবে খুব পীড়াপীড়ি করলে সে একটা সিগারেট টেনে দেখতে পারে।বাবলুসাহেব, তুমি ছড়া বা কবিতা, এসব কিছু জান? হুঁ।শোনাও একটা ছড়া। ছড়া শুনতে ইচ্ছা করছে।বাবলু উঠে দাঁড়াল। সম্ভবত ছড়া শোনাবার তার তেমন আগ্রহ নেই। ঘর থেকে বের হয়ে গেল নিঃশব্দে। পর মুহুর্তেই পর্দার ওপাশ থেকে বাবলুর ছড়া শোনা গেল–
হইয়ার বাড়ি গেছিলাম
দুধ ভাত দিছিল
দুই ভাত খাইছিলাম
অদ্ভুত ছড়া! স্বরচিত হবারই সম্ভাবনা। শফিক হাসিমুখে বলল, খুব চমৎকার ছড়া। এস, ভেতরে এস। বাবলু ভেতরে ঢুকল না। শফিককে অবাক করে দিয়ে একই ছড়া দ্বিতীয় বার পর্দার আড়াল থেকে বলল। শফিক হেসে ফেলল। বড়ো মজার ছেলে তো!রোকেয়া রাতে ঘুমান শাহানার সঙ্গে। তিনি, বাবলু ও শাহানা। শাহানার খাটটি ছোট। তিন জনে চাপাচাপি হয়। রোজ রাতেই রোকেয়া বলেন, তোমাকে তো মা বড়ো কষ্ট দিচ্ছি।
শাহানা লজ্জিত স্বরে বলে, কী যে আপনি বলেন মাত্রমা, আপনাকে আমরা উল্টো কষ্ট দিচ্ছি। আমার কোনোই কষ্ট হচ্ছে না। আপনি থাকায় কত রকম গল্পটল্প করতে পাচ্ছি।এই কথাটা খুবই সত্যি। শাহানা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থেকে গল্প করে। রোকেয়ার চোখ একেক সময় ঘুমে বন্ধ হয়ে আসে, কিন্তু ঘুমুতে পারেন না। শাহানা ডেকে তোলে, মাঐমা ঘুমাচ্ছেন নাকি? না গো মা, জেগেই আছি।বীণার কথা কি আপনাকে বলেছি? বীণা কে? আমাদের বাড়িওয়ালা রশিদ সাহেবের মেয়ে। তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর ঘরের মেয়ে। প্রথম স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন বিয়ের এক মাসের মধ্যে। খুব রূপসী ছিলেন। আমরা অবশ্যি দেখি নি, শুধু শুনেছি। মাঐমা ঘুমিয়ে পড়েছেন?
না।তাহলে বীণার কাণ্ডটা শোনেন। কাউকে বলবেন না। আবার।না, বলব না।আমার কি মনে হয় জানেন মাঐমা? আমার মনে হয়, আনিস ভাইয়ের সঙ্গে ওর কিছু একটা সম্পর্ক আছে।আনিস ভাই কে? আহা, ঐদিন না বললাম। আপনাকে-আমাদের চিলেকোঠায় থাকেন! ম্যাজিশিয়ান।ও হ্যাঁ, বলেছ।আপনার সঙ্গে দেখাও তো হয়েছে। ঐ যে, হলুদ রঙের স্যুয়েটার পরা একটি ছেলে এসে আপনাকে পা ছুঁয়ে সালাম করল।হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে।বুঝলেন মাত্রমা, আমার মনে হয় আনিস ভাইয়ের প্রতি বীণার একটা ইয়ে আছে। কীভাবে বুঝলাম জানেন? না, কীভাবে বুঝলে? ব্যাপারটা খুবই গোপন। আমি হঠাৎ টের পেয়ে ফেলেছি। আপনি কাউকে বলবেন না।না মা, আমি আর কাকে বলব?
শাহানা খাটে উঠে বসল। আশেপাশে কেউ নেই, তবু সে গল্প করতে লাগল ফিসফিস করে। রোকেয়া লক্ষ করেছেন, মেয়েটা প্রায়ই আনিস ছেলেটির প্রসঙ্গ নিয়ে আসছে। তার গল্পের এক পর্যায়ে ম্যাজিশিয়ান আনিসের কথা থাকবেই। প্রতি রাতেই ভাবেন, সকালবেলা নীলুকে জিজ্ঞেস করবেন। একটি মেয়ে-যার কয়েক দিনের মধ্যেই বিয়ে হচ্ছে, সে রোজ রাতে অন্য একটি ছেলের গল্প। এত আগ্রহ করে করবে। কেন? মাঐমা ঘুমিয়ে পড়েছেন? না।বীণা মেয়েটার ঘটনাটা কেমন লাগল? তিনি কিছু বললেন না। হাই তুললেন।মাঐমা, কাল আমি আনিস ভাইয়ের কাছে আপনাকে নিয়ে যাব।আচ্ছা। এখন ঘুমাও মা। রাত অনেক হয়েছে।শাহানা এক ছুটির দিনের দুপুরবেলা তাঁকে আনিসের ঘরে নিয়ে গেল। হাসতে হাসতে বলল, আনিস ভাই, মাঐমাকে একটা ম্যাজিক দেখান তো। গোলাপেরটা না। ওটা দেখতে দেখতে চোখ পচে গেছে।
আনিস খুব উৎসাহের সঙ্গে ব্লেডের একটা খেলা দেখাল। এই খেলাটা শাহানাও এর আগে দেখে নি। হাত দিয়ে সে শূন্য থেকে একটার পর একটা চকচকে ব্লেড বের করতে লাগল। সেসব ব্লেড সে টপাটপ গিলে ফেলতে লাগল। রোকেয়া আঁৎকে উঠলেন। এ কি কাণ্ড! শাহানা তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, সত্যি সত্যি খাচ্ছে না। মাঐমা। ব্লেড কেউ খেতে পারে?রোকেয়া ভেবে পেলেন না, যে-ব্লেড়গুলি মুখে পুরেছে, সেগুলি গোল কোথায়? সেই রহস্য কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেদ হল। আনিস গিলে ফেলা ব্লেডগুলি একটার পর একটা মুখ থেকে বের করে সামনের টেবিল প্রায় ভর্তি করে ফেলল। রোকেয়ার বিস্ময়ের সীমা রইল না। করে কী-করে এসব! চোখের ধান্ধা নাকি? এই বাচ্চা ছেলে তাঁর মতো বুড়ো মানুষের চোখে ধান্ধা লাগাবে কীভাবে?
শাহানা রোকেয়ার বিস্মিত মুখভঙ্গি খুব উপভোগ করছে। যেন এই চম ৎকার ম্যাজিকের কিছু কৃতিত্ব তার। এসব তো ভালো লক্ষণ নয়। নীলুর সঙ্গে কথা বলা দরকার। এত চমৎকার একটি মেয়ের জীবনে সামান্যতম সমস্যাও আসা উচিত নয়। তবে নীলু খুব চালাক মেয়ে। কিছু একটা হলে নিশ্চয়ই তার চোখে পড়বে। কিছু নয় হয়তো। কিন্তু এমন মুগ্ধ চোখে মেয়েটি তাকিয়ে ছিল আনিসের দিকে। এই দৃষ্টি ভুল হবার কথা নয়।আনিস ছেলেটিকে তাঁর বেশ লাগল। ভদ্র এবং লাজুক। এ-রকম একটা লাজুক ছেলে ম্যাজিশিয়ান হবে কিভাবে? ম্যাজিক দেখানো কি লাজুক ছেলের কাজ? পড়াশোনা ছেড়ে তার ম্যাজিশিয়ান হবার এমন অদ্ভুত শাখাই-বা কেন হল? মাথার উপর বুদ্ধি দেওয়ার কেউ নেই। বুদ্ধি দেওয়ার কেউ থাকলে কি এ-রকম হয়?
মা-বাবা বেঁচে থাকলে এই ছেলে নিশ্চয়ই এসব নিয়ে মেতে উঠতে পারত না। রোকেয়ার বড়ো মায়া লাগল।তিনি এক সপ্তাহ থাকবেন বলে এসেছিলেন। প্রায় দু সপ্তাহ কেটে গেল। যেতে ইচ্ছা করছে না। জামাইয়ের বাড়িতে এত দীর্ঘ দিন থাকাও যায় না। কিন্তু থাকতে তাঁর খারাপ লাগছে না। ভালোই লাগছে। যার জন্যে আসা, সেই নীলুর সঙ্গে কথা বলার তেমন কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। অথচ নীলুর সঙ্গে তাঁর কিছু জরুরি কথা বলা দরকার। নীলু অফিস থেকে ফেরে ক্লান্ত হয়ে। ফিরেই সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। তাকে একা পাওয়াই মুশকিল, কারণ শাহানা তাঁর সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকে। কথাগুলি শাহানার সুমিল্লখুনশ্চয়ই বলা যায়, কিন্তু তাঁর বড়ো লজ্জা লাগে। কিন্তু না বলেই-বা উপায় কী?
রাজশাহী ফিরে যাবার দু দিন আগে তিনি নীলুকে সঙ্গে নিয়ে ছাদে হাঁটতে গেলেন। নীলু বলল, কিছু বলতে চাও নাকি মা? হ্যাঁ।টাকা পয়সা দরকার? না, সেসব কিছু না।নিজের মেয়ের কাছেও তিনি ইতস্তত করতে লাগলেন। বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েরা বোধহয় পুরোপুরি নিজের মেয়ে থাকে না। এদের কাছে সহজ হওয়া চুপ করে আছ কেন মা, বল।বাবলুকে তোর কাছে রাখবি? ওকে নিয়ে বড়ো কস্টে পড়েছি।নীলু চুপ করে রইল।তারা ছেলেটাকে সহ্যই করতে পারে না। এইটুকু বাচ্চা, অথচ দুলাভাই কোনো রকম খোঁজ খবর করে না? না।দেকতেও আসে না?
গত মাসের আগের মাসে এক বার ঘণ্টাখানিকের জন্যে এসেছিল।ছেলেকে নিয়ে কী করবে না-করবে, কিছুই বলে নি? না।কেমন মানুষ বল তো মা? দু জন বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। ছাদে ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। আনিসের ঘর থেকে ঝনঝন শব্দ হচ্ছে, কোনো ম্যাজিকের প্রাকটিস বোধহয়। রোকেয়া মৃদুস্বরে বললেন, বাবলু একটা কাঁচের জগ ভেঙে ফেলেছিল, সেই অপরাধের শাস্তি কি হয়েছিল শোন।এসব শুনতে চাই না, মা।তুই জামাইকে বলে দেখ, যদি রাখতে রাজি হয়। শান্তিতে মরতে পারি।এখনই মরার কথা আসছে কেন? বাঁচব না বেশি দিন।বুঝলে কী করে?
এসব বোঝা যায়। তোর বাবাও বুঝতে পেরেছিলেন।নীলু ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বাবলু কি পারবে তোমাকে ছেড়ে থাকতে? পারবে। ও শক্ত ছেলে। তুই একটু বলে দেখ জামাইকে। নাকি আমি বলব? তোমার বলতে হবে না। যা বলার। আমিই বলব। রাজি হতে চাইবে না হয়তো। কে চায় একটা বাড়তি ঝামেলা কাঁধে নিতে!নীলু জবাব দিল না। রোকেয়া বললেন, তুই চাকরি করিস, এটা বোধহয় তোর শাশুড়ি পছন্দ করে না।
নীলু সে কথারও কোনো জবাব দিল না। সে বাবলুর ব্যাপারটি কী করে বলবে, তাই ভাবছিল। রোকেয়া বললেন, চল নিচে যাই। তোর শাশুড়ি বোধহয় খুঁজছেন।তুমি যাও মা। আমি থাকি এখানে কিছুক্ষণ। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।রোকেয়া নিচে নেমে গেলেন। তার কিছুক্ষণ পরই চায়ের কাপ হাতে শাহানা তাকে খুঁজতে এল। সে অবাক হয়ে দেখল, নীলু কাঁদছে।কী হয়েছে ভাবী? কিছু হয় নি।তোমার জন্যে চা এনেছি।চা খাব না, শাহানা।একটু খাও ভাবী, আমি নিজে বানিয়েছি।বলতে বলতে সেও কেঁদে ফেলল। কাউকে কাঁদতে দেখলেই তার কান্না পেয়ে যায়। নীলু অবাক হয়ে বলল, তোমার আবার কী হল?
শাহানা ফোঁপাতে লাগল। কিছু বলল না।বাবলুকে রেখে রোকেয়া রাজশাহী চলে গেলেন। মনে করা হয়েছিল বাবলু। খুব কান্নাকাটি করবে, সে তেমন কিছুই করল না। রোকেয়া যখন বললেন, যাই বাবলু? বাবলু ঘাড় কাত করল। যেন যাবার অনুমতি দিচ্ছে।কাঁদবে না তো? বাবলু মাথা নাড়ল। সে কাঁদবে না।রহমান সাহেব দীর্ঘদিন পর উত্তেজনা অনুভব করছেন।মেয়ের বিয়েতে তিনি বড়ো রকমের একটা হৈচৈ করতে চান। সব ধরনের সামাজিকতা, উৎসব অনুষ্ঠান। তিনি মনেপ্ৰাণে অপছন্দ করতেন। এখনো করেন, কিন্তু শারমিনের বিয়ের অনুষ্ঠানের কথা মনে হলেই মনে হয় ঢাকা শহরের সবাইকে আনন্দ অনুষ্ঠানে ডাকা যায় না?
