বড়োসাহেব এক সপ্তাহ গম্ভীর হয়ে রইল। প্রতি সন্ধ্যায় সাত-আট পেগ হুঁইঙ্কি খেয়ে পুরোপুরি আউট হবার চেষ্টা করতে লাগল। সেটা সম্ভব হল না। এ্যালকোহল তাঁকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারে না। এক সপ্তাহ পর জেনারেল ম্যানেজার হারানোর দুঃখ তার অনেকটা কমে এল। সে শফিককে ডেকে বলল, তুমি জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্ব নিয়ে নাও। আমি দশ দিনের মধ্যে হেড অফিস থেকে অর্ডার আনিয়ে দিচ্ছি। ব্রিটিশগুলি হচ্ছে মহা হারামজাদা। টনি কোম্পানিটার বারটা বাজিয়ে দিয়ে গেছে। তোমার দায়িত্ব হচ্ছে সব ঠিকঠাক করা।দশ দিনের মধ্যে অর্ডার আসার কথা। ছ মাস হয়ে গেল অর্ডারের কোনো খোঁজ নেই। যখনই কোনো রকম ঝামেলা উপস্থিত হয়, বড়োসাহেব শফিককে ডেকে বলে, ব্যাপারটা খুব ঠাণ্ডা মাথায় ট্যাকল কর শফিক, আমি হেড অফিসে টেলেক্স করছি।-কেন তারা তোমাকে এখনো কনফার্ম করছে না। এরা পেয়েছেটা কী? এভাবে কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি চলে, না চলা উচিত?
অফিসে শফিকের অবস্থা একটু অস্বস্তিকর। সিদ্দিক সাহেব হচ্ছেন তার দু বছরের সিনিয়ার। আগে ছিলেন প্রডাকশন ম্যানেজার বছরখানেক আগে তাকে ঢাকা হেড অফিসে ট্রান্সফার করা হয়েছে। তাঁকে ডিঙিয়ে জেনারেল ম্যানেজার হওয়াটা তিনি সুনজরে দেখছেন না। শফিকের বিরুদ্ধে বেশ জোরালো একটি দলও তীর আছে। তাঁর আচার-আচরণে সেটা কখনো বোঝা যায় না। সিদ্দিক সাহেব অত্যন্ত মিষ্টভাষী ভদ্রলোক। সবার সঙ্গেই প্রচুর রসিকতা করেন।শফিক তার ঘরে বসামাত্রই সিদ্দিক সাহেব ঢুকলেন, এবং তাঁর স্বভাবমতো বললেন, তারপর জি. এম. সাহেব, হোয়াট ইজ নিউ? সাহেবকে ঠাণ্ডা করেছেন?
হুঁ। এখন ঠাণ্ডা।আসলে এই কোম্পানিতে একটা পোস্ট ক্রিয়েট করা দরকার, যে পোস্টের কাজই হবে সাহেবকে ঠাণ্ডা রাখা।শফিক কিছু বলল না। সিদ্দিক সাহেব বললেন, আপনার জন্যে একটা দুঃসংবাদ আছে। দুঃসংবাদটা দিতে এলাম।কী দুঃসংবাদ? হিস্টোলিনের একটা নতুন ব্যাচের কাজ শুরু হয়েছে। প্রডাকশন ম্যানেজার জানিয়েছেন, এই ব্যাচটা নষ্ট হয়েছে। প্রায় এক লাখ টাকা নর্দমায় ফেলা হল।সিদ্দিক সাহেব নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগারেট ধরালেন। যেন তাঁর কিছুই যায়-আসে না। শফিক উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, ব্যাচ বাতিল করা হয়ে গেছে?না, এখনো হয়নি। তবে বাতিল করা ছাড়া উপায় নেই। ইমালসিফায়া নেই। কাজ যখন শুরু করা হল, তখন জানা গেল ইমালসিফায়ার নেই।সেকি। আগে জানা যায় নি?
স্টোর বলেছিল আছে। সেই ভরসাতেই শুরু করা হয়েছিল। মাঝপথে বলা হল নেই।শফিক উঠে দাঁড়াল। সিদ্দিক সাহেব বললেন, যাচ্ছেন কোথায়? তেজগাঁয়ে যাই।সেখানে গিয়ে করবেন কী? খোঁজ নিই। কী হচ্ছে। অন্য কোথাও পাওয়া যায়। কিনা দেখি।কোথায় পাবেন? আর পেলেও সেটা ব্যবহার করা যাবে না। কোম্পানির দেওয়া নিজস্ব জিনিস ব্যবহার করতে হবে। রেগুলেশন নাম্বার সিক্সটিন। কাজেই শান্ত হয়ে বসুন। চায়ের অর্ডার দিন। প্রডাকশন ম্যানেজার, স্টোর ইনচার্জ এবং চিফ কেমিষ্টকে ডেকে পাঠান। লিখিত রিপোর্ট দিতে বলুন। হেড অফিসে টেলেক্স পাঠান।শফিক কপালের ঘাম মুছল। হাত বাড়াল টেলিফোনের দিকে। সিদ্দিক সাহেব বললেন, আপনার টেলিফোন করবার দরকার নেই, আমি ইতিমধ্যেই টেলিফোন করেছি। এবং ওরা খুব সম্ভব রওনাও হয়ে গেছে।বড়োসাহেবকে খবর দেওয়া দরকার।
সিদ্দিক সাহেব অলস ভঙ্গিতে বললেন, তা দরকার। তবে এখন খবর না দেওয়াই ভালো। বড়োসাহেব ব্যস্ত আছেন। ডিকটেশন দেবার জন্যে মিস রীতাকে ডেকেছেন।সিদ্দিক সাহেব মুচকি হ্রাসলেন। বড়ো সাহেব মাঝেমধ্যেই ডিকটেশন দেবার জন্যে মিস, রীতাকে ডেকে নেন নিজের কামরায়। তখন দরজা বন্ধ থাকে। এবং কিছুক্ষণ পরপর মিস, রীতার খিলখিল হাসি শোনা যায়।মিস, রীতা গোমেজ এখানকার রিসিপশনিষ্ট! বয়স ত্ৰিশের কাছাকাছি হলেও এখনো চমৎকার শরীরের বাঁধুনি। চেহারায় স্নিগ্ধ ভাব আছে। খুবই আমুদে মেয়ে। বড়োসাহেবের সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে যাবে এ-রকম একটা গুজব অনেক দিন থেকে শোনা যাচ্ছে।
শফিকের দিন শুরু হল খুবই খারাপভাবে। বড়োসাহেবের সঙ্গে কোনো কথা হল না। তিনি জানিয়ে দিলেন, আজ অত্যন্ত ব্যস্ত। অফিসের কোনো ব্যাপারে নাক গলাতে চান না।দুপুরবেল শফিক রাজশাহী থেকে শাশুড়ির একটি চিঠি পেল। তাকেই লেখা।বিলুর একটি ছেলে হইয়াছে গত বুধবারে রাত আটটায়। ছেলে ভালো আছে। কিন্তু বিলুর অবস্থা খুবই খারাপ। তাহাকে রাজশাহী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হইয়াছে। বেশ কয়েক বার রক্ত দেওয়া হইয়াছে। আমি কী করিব কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। জামাই ফরিদপুরে। তাহারও কোনো খোঁজ নাই। বাবা, তুমি কি নীলুকে সঙ্গে নিয়া একবার আসিবো? আমার মন বুলিতেছে, বিলুর দিন ফুরাইয়াছে–,
বিরাট চিঠি। শফিক চিঠি হাতে দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে রইল। নীলুকে আজ রাতের কোচেই পাঠানো দরকার। সঙ্গে কিছু টাকা পয়সাও দিয়ে দেওয়া দরকার। টাকার জোগাড় করা যায় কীভাবে? বন্যার বাসা খুঁজে বের করতে বেশি ঝামেলা হল না। সুন্দর ছিমছাম ওয়ান বেডরুম এ্যাপার্টমেন্ট। বসার ঘরে বেতের সোফা। দেয়ালে জলরঙ ছবি। মুগ্ধ হবার মতো সাজসজ্জা। নীলুমুগ্ধ হয়ে গেল।সুন্দর সাজিয়েছিস বন্যা! আমি সাজাই নি। ও সাজিয়েছে। এসব দিকে আমার ঝোঁক নেই।আর সব গেস্ট কোথায়?
তোকে এবং তোর বরকে ছাড়া আর কাউকে বলি নি। তাও তুই এলি একলা। এটা ভালোই হল। আমার বরের সঙ্গেও আমার ঝগড়া হয়েছে। ও সকালবেলা ঘর ছেড়ে চলে গেছে। এখন আমরা দু জনে মিলে গল্প করব। রাতে ভাত খেয়ে তারপর যাবি।ঝগড়াটা হয়েছে কী নিয়ে? রেগুলার ফিচার। পার্সোনালিটি ক্ল্যাশ। ও চায় আমার বাচ্চাকাচ্চা হোক। চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি ঘরসংসার করি।তুই বাচ্চাকাচ্চা চাস না?এখন চাই না। ও চাইলেই আমাকে বাচ্চা পেটে ধরতে হবে নাকি? পুরুষদের কথামতো সারা জীবন চলব। আমরা? আমাদের কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছা নেই? আমরা বানের জলে ভেসে এসেছি?
তুই এত রেগে যাচ্ছিস কেন? রাগব না কেন? নিশ্চয়ই রাগব। মেয়ে হয়েছি বলে কি আমরা মানুষ না? বাদ দে এসব, তোর কথা বল। বরকে নিয়ে এলি না কেন? ওর কী যেন কাজ পড়েছে। টঙ্গি যেতে হবে।আর তুই বিশ্বাস করে বসে আছিস? তোকে বুঝ দেয়ার জন্যে বলা। কাজটাজ কিছুই না। স্ত্রীদের কারণে কিছু করবে না। এটা হচ্ছে পুরুষদের মটো। ওদের আমি হাড়ে হাড়ে চিনেছি।সমগ্র পুরুষ জাতিটার উপর তুই রেগে আছিস।তা আছি। তুই বোস, চা বানিয়ে আনি। রাতে কী খাবি, বল? রাতে কিছু খাব না। একা একা এতদূর যেতে পারব না।একা যেতে হবে না, আমি পৌঁছে দিয়ে আসব।ভয় করবে না তোর? আমার এত ভয়টয় নেই।খুব সাহস তোর?
হ্যাঁ, খুব এক জন পুরুষ যদি রাত দশটায় হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরতে পারে, তাহলে এক জন মেয়েও পারে।থাক, এত সাহস দেখানোর দরকার নেই।বাসায় ফিরতে ফিরতে নীলুর সন্ধ্যা হয়ে গেল। বন্যা সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, নীলু রাজি হয় নি। বন্যার স্বামী জহুর সাহেব চলে এসেছেন ততক্ষণে। বন্যা তাকেই বলল, তুমি নীলুকে পৌঁছে দাও না। বেচারি একা একা যেতে ভয় পায়। একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে চলে যাওঁ। কী সর্বনাশের কথা! অচেনা পুরুষমানুষের সঙ্গে সে বাসায় ফিরবো? নীলু আঁৎকে উঠে বলেছে, কিছু লাগবে না, আমি চলে যেতে পারব।
ঠিক তো? হুঁ, ঠিক।ভয় পাবি না তো? না।নীলু ভয় পায় নি। তার মতো একা একা অনেক মেয়েই যাচ্ছে। তা ছাড়া মাত্র সন্ধ্যা হয়েছে। বাসার কাছাকাছি এসে মনে হল শফিক খুব রাগ করবে। শুধু শফিক না, তার শাশুড়িও রাগ করবেন। আর শাশুড়ির রাগ মানেই ভূমিকম্প। কী যে অবস্থা হবে, কে জানে! কিন্তু আশ্চর্য, কেউ কিছু বলল না। সন্ধ্যা পার করে বাড়ি ফেরা যেন তেমন কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। শফিক বলল, তোড়াতাড়ি একটু গোছগাছ করে নাও নীলু, নাইট কোচে রাজশাহী যাবে। তোমার বোনের শরীর ভালো না।নীলু আতঙ্কিত স্বরে বলল, মারা গেছে?
না, না। চিঠি পড়ে দেখ। অবস্থা ভালো না, তবে বেঁচে আছেন। তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও, রফিক তোমার সঙ্গে যাবে।টুনি, টুনি? টুনি থাকবে এখানেই। অসুবিধা হবে না। তুমি যাও।বিলুআপা বেঁচে আছে তো? বললাম না, ভালোই আছেন। চিঠিটা পড়ে দেখ, চিঠিতেই সব লেখা আছে। তেমন খারাপ হলে টেলিগ্রামই আসত। আসত না? শফিকের কথা সত্যি না। বিকাল পাঁচটায় বিলুর মৃত্যুসংবাদ নিয়ে টেলিগ্রাম এসেছে। নীলুকে মৃত্যুসংবাদ দেওয়া হবে কি হবে না, এই নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। খবরটা দিতেই চেয়েছিল। তার মতে খবর না দিলে সে বোনের সঙ্গে দেখা হবার আশা নিয়ে যাবে এবং যখন দেখবে বোন বেঁচে নেই, তখন অনেক বড়ো শক পাবে। শফিকের যুক্তি অন্যদের ভালো লাগে নি।
নীলু চলে যাবার পর শফিকের মনে হল, কাজটা ঠিক হল না। তার সঙ্গে যাওয়া উচিত ছিল। সে চলে গেলে বিটা ফার্মাসিটিক্যালস-এর সব কাজ আটকে থাকবে, এই ধারণাটা ঠিক না। কারো জন্যেই কিছু আটকে থাকে না। স্ত্রীর দুঃসময়ে স্বামী পাশে এসে না দাঁড়ানটা দুঃখজনক। যে-কোনো স্ত্রী এইটুকু তার স্বামীর কাছ থেকে আশা করতে পারে, এবং আশা করা উচিত।বাড়ি খালি-খালি লাগছে। বড়ো খারাপ লাগছে বউমার জন্যে। এটা তাঁর কথার কথা নয়, তিনি ঠিকমতো খেতে পারলেন না। আধখাওয়া প্লেট ঠেলে সরিয়ে উঠে পড়লেন। রাতে শোবার সময় হোসেন সাহেবকে বললেন, তোমার ছেলের এমনই রাজকাৰ্য পড়ে গেছে, বৌটার সঙ্গে যেতে পারল না। যত অপদাৰ্থ আমি পেটে ধরেছি! এই অপদার্থগুলির কপালে দুঃখ আছে।হোসেন সাহেব ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, তুমি শফিককে বললে না কেন সঙ্গে যেতে?
কেন আমি বলব? এটা সে নিজে কেন বোঝে না! দুটা পয়সা রোজগার করে সে কী ভেবেছে? সবার মাথা কিনে নিয়েছে? লাটসাহেব হয়ে গেছে? এয়ারপোর্টে সাব্বিরকে রিসিভ করবার জন্যে শারমিন একা এসেছে। রহমান সাহেবের সঙ্গে আসার কথা, শেষ মুহূর্তে তিনি মত বদলানে, তুমি একাই যাও মা। ড্রাইভারকে বলে দাও একটা ফুলের তোড়া নিয়ে আসতে। সাব্বির পছন্দ করবে।ফুলের তোড়া নিয়ে অপেক্ষা করতে শারমিনের লজ্জা করছিল। ফুলটুল নিয়ে আর কেউ আসে নি, সে একাই এসেছে। অনেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখছে। কী ভাবছে, তারা মনে মনে, কে জানে!নটার সময় প্লেন আসার কথা, সেটা এল এগারটায়। কাস্টমাস সেরে বেরুতে বেরুতে সান্বিরের দুটোর মতো বেজে গেল। সাব্বিরের স্বাস্থ্য অনেক ভালো হয়েছে। শীতের দেশ থেকে আসছে বলেই বোধহয় লালচে ভাব গালে।
মাথাভর্তি চুল এলোমেলো হয়ে আছে। তার আচার-আচরণে একটা ছটফট ভাব আছে। শারমিনকে স্বীকার করতেই হল, সাব্বির অত্যন্ত সুপুরুষ। এ রকম সুপুরুষদের পাশে দাঁড়াতে ভালো লাগে।শারমিন হাসিমুখে বলল, এই নিন। আপনার ফুল।ফুল, ফুল কী জন্যে? এত দিন পর দেশে ফিরছেন, তাই।সাব্বির ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে বিরক্ত স্বরে বলল, আমার দেশের বাড়ি থেকে কেউ আসে নি? কাউকে তো দেখছি না। চিঠি দিয়েছি, টেলিগ্রাম করেছি, হোয়াট ইজ দিস?
শারমিন কিছু বলল না। সান্বিরের দেশের বাড়ির কারোর সঙ্গে তার পরিচয় নেই। দেশের বাড়িতে সাবিরের তেমন কেউ নেইও। এক চাচা আছেন, যিনি তাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। বড়ো এক বোন আছেন, জামালপুরে, তার সঙ্গে শারমিনের কয়েক বার দেখা হয়েছে। সে এয়ারপোর্টে আসে নি। এলে দেখা হত।সাব্বির বলল, মা আসেন নি? না। উনি ঢাকায় নেই।কোথায়? জামালপুরে মেয়ের কাছে আছেন।জামালপুরে কবে গেলেন, আমি তো কিছু জানি না।গতমাসে গিয়েছেন।সাব্বির অত্যন্ত বিরক্ত হল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, তুমি দাঁড়াও তো এখানে, আমি খুঁজে দেখি। আছে হয়তো কেউ। এত দিন পর আসছি, কেউ আসবে না?
সাব্বির খুঁজতে গিয়ে আধা ঘণ্টার মত দেরি করল। ফিরে এল মুখ কাল করে। কোথাও কাউকে পাওয়া গেল না। শারমিন বলল, চলুন, যাওয়া যাক।কোথায় যাব? আমাদের বাসায়, আর কোথায়? না, প্রথম যাব ঝিকাতলা। মা কোথায় আছেন খোঁজ নিয়ে আসি।সান্বিরের মাকে পাওয়া গেল না। তার ছোট মামার কাছে জানা গেল, তিনি জামালপুরে। ছোট মামা সান্বিরের প্রসঙ্গে কোনো রকম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন না। সাৰ্বির বলল, আমি আসব, আপনি জানতেন না?
জানতাম।আমি তো আশা করেছিলাম এয়ারপোর্টে আপনাকে দেখব।ছোট মামা মুখ কালো করে বললেন, নিজের যন্ত্রণায় অস্থির। ছোট মেয়ের ডায়রিয়া। মহাখালি নিয়ে গিয়েছিলাম। তুই হাত-মুখ ধুয়ে চা-টা খা।সাব্বির সেসব কিছুই করল না। বিরক্ত মুখে বের হয়ে এল। শারমিন বলল, এবার কি যাবেন আমার সঙ্গে? হুঁ, যাব। তোমাদের ওখানে চা খেয়ে রওনা হব জামালপুর। জামালপুর যাবার সবচে ভালো বুদ্ধি কী? ট্রেনে করে যেতে পারেন। বাই–রোডে যেতে চাইলে আমাদের একটা গাড়ি নিয়ে রওনা হতে পারেন। আজই যেতে হবে?
হুঁ, আজই।আপনি এমন ছটফট করছেন কেন? কিচ্ছু ভালো লাগছে না।কেন? জানি না, কেন।শারমিন খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, বাংলাদেশ কেমন লাগছে? বাংলাদেশ দেখলাম কোথায়? রাস্তাঘাট তো দেখছেন। কত বড়ো বড়ো রাস্তা হয়েছে, দেখেছেন? সাব্বির তার জবাব না দিয়ে মুখ গোমড়া করে বসে রইল। শারমিন বলল, আপনার শরীর ভালো তো? হ্যাঁ, ভালোই।কত দিন থাকবেন? বেশিদিন না। এক সপ্তাহ।হঠাৎ এমন হুঁট করে চলে এলেন যে! আপনার তো কথা ছিল আগস্ট মাসে আসার।এখানে কী যেন একটা ঝামেলা হচ্ছে, সেটা জানার জন্যে এসেছি।কী ঝামেলা?
সাব্বির বিরক্ত স্বরে বলল, দু শ ডলার করে মাকে প্রতি মাসে পাঠাই। তাঁর একার জন্যে যথেষ্ট টাকা, কিন্তু তার পরেও গতমাসে একটা চিঠি পেলাম, যার থেকে ধারণা হয় যে, তার টাকা পয়সার খুব টানাটানি। এর মানে কী? টাকাগুলি যাচ্ছে কোথায়? এটা জানার জন্যে একেবারে আমেরিকা থেকে চলে এলেন? শুধু এটা না। মার শরীর খারাপ। মনে হয়, ঠিকমতো চিকিৎসাও হচ্ছে না। সেটাও দেখব।রহমান সাহেব সাত্ত্বিরকে জড়িয়ে ধরলেন। তাকে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করেন। প্রথম যেদিন দেখেছিলেন, সেদিনই তাঁর তাকে ভাল লেগেছিল।সেই ভালোলাগা পরবর্তী সাত বছরে ক্রমেই বেড়েছে, তাদের প্রথম পরিচয়পর্বটি বেশ নাটকীয়।রহমান সাহেব সবে অফিসে এসে বসেছেন। তাঁর সেক্রেটারি বলল, একটি ছেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জনে, ঘণ্টাখানেক ধরে বসে আছে। কী চায়?
আমাকে বলছে না।রহমান সাহেব ছেলেটিকে আসতে বললেন। নিশ্চয়ই চাকরিপ্রার্থী। প্রতিদিনই বেশ কিছু এ ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়।অত্যন্ত সুদৰ্শন একটি ছেলে ঢুকল। এবং সে কোনো রকম ভণিতা না করে বলল, আমার নাম সাব্বির আহমেদ। আমি এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্ট্যাটিসটিকস-এ এম. এস. সি পাশ করেছি। আপনি কি দয়া করে আমার মার্কশিটটা দেখবেন? কোনো চাকরির ব্যাপার? জ্বি-না, কোনো চাকরির ব্যাপার নয়।ব্যাপারটা কী? আপনি আগে দেখুন, তারপর বলব।রহমান সাহেব দেখলেন। অনার্স এবং এম. এস. সি দুটিতেই প্রথম শ্রেণী।
আপনার তো চাকরি পাওয়ার ব্যাপারে কোনো অসুবিধা হবার কথা নয়।না, আমার কোনো অসুবিধা নেই। আমি অন্য ব্যাপারে এসেছি।বলুন, শুনি।আমি আমেরিকান একটি ইউনিভার্সিটি-ষ্টেট ইউনিভার্সিটি অব আইওয়াতে টিচিং এ্যাসিসটেন্টশিপ পেয়েছি। সেখানে আণ্ডার-গ্রাজুয়েট ক্লাসে পড়াব, সেই টাকায় পি-এইচ. ডি. করব। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে। আমি অত্যন্ত দরিদ্র। আমার আত্মীয়স্বজনরাও দরিদ্র। আমেরিকায় যাবার জন্যে আমার ত্রিশ হাজার টাকার মতো দরকার।আপনি চাচ্ছেন এই টাকাটা আমি আপনাকে দিয়ে সাহায্য করি? ধার হিসেবে চাচ্ছি।এত লোক থাকতে আমার কাছে এসেছেন কেন?
শুধু আপনার কাছে নয়, আরো অনেকের কাছেই গিয়েছি। আমি একুশ জন ইণ্ডাষ্টিয়েলিষ্টের একটি লিষ্ট করেছি। ঠিক করেছি, এদের সবার কাছেই যাব।লিস্টটা দেখতে পারি? নিশ্চয়ই পারেন।সাব্বির লিস্টি বের করে দিল।আইওয়া ষ্টেট ইউনিভার্সিটির চিঠিটি সঙ্গে আছে? হ্যাঁ, আছে। রেজিস্টারের চিঠি।রহমান সাহেব চিঠিটা মন দিয়ে পড়লেন। শান্ত স্বরে বললেন, ওরা আই টুয়েন্টি পাঠিয়েছে? জ্বি, পাঠিয়েছে।ভিসা হয়েছে? হ্যাঁ, হয়েছে।পাসপোর্টটা দেখাতে পারেন? পারি।সাব্বির পাসপোর্ট বের করল। মাল্টিপল এন্টি ভিসা। রহমান সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, টিকেটের টাকা জোগাড় না-করেই ভিসা করেছেন?হ্যাঁ, করেছি। কারণ টাকার ব্যবস্থা হবেই।রহমান সাহেব শান্তস্বরে বললেন, ক্যাশ দেব না চেক কেটে দেব?
ক্যাশ হলে ভালো হয়।তিনি ক্যাশিয়ারকে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকার ব্যবস্থা করতে বললেন। সাব্বির বিন্দুমাত্র উচ্ছ্বাস দেখাল না-যেন এটা তার প্রাপ্য। রহমান সাহেব তাকে বাড়তি কোনো ফেভার করছেন না।আমেরিকা যাবার আগে সে দেখা করতে পর্যন্ত এল না। ছ মাস পর ইউ গ্লস ডলারে সাব্বির টাকাটা শোধ করল। সেই সঙ্গে চমৎকার একটি চিঠিও লিখল:
শ্রদ্ধাস্পদেষু,
বড়লোকদের প্রতি আমার এক ধরনের ঘৃণা আছে। সারা জীবন অত্যন্ত দরিদ্র ছিলাম বলেই হয়তো। এখন বুঝতে পারছি, ধনী সম্প্রদায়ের মধ্যেও ভালোমানুষ আছেন। আপনার অনুগ্রহের কথা আমি মনে রাখব। টাকাটা পাঠানোর আগে আমি আপনাকে লিখি নি, কারণ আমি এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগছিলাম। আশা করি, আপনি আমার মানের অবস্থা বুঝতে পারছেন।
বিনীত
সাব্বির
