একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা পর্ব:০৫ হুমায়ূন আহমেদ

একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা

আরেফিন সাহেব চশমা ঠিক করতে করতে ময়ুরের গল্পের শেষ অংশ শুরু করলেন। যদিও আমি খুব ভাল করে জানি— এটা শেষ না। শেষের পরেও থাকবে পরিশিষ্ট। পরিশিষ্টের পরে থাকবে উপসংহার। পুনশ্চের পিঠে পুনশ্চ।নাচ শেষ করে পুরুষ ময়ুর চারদিকে তার স্পার্ম ছড়িয়ে দেয়। এবং সেই স্পার্ম খুঁটে খুঁটে খায় স্ত্রী ময়ূর। এবং এর ফলে ময়ূরী গর্ভবতী হয়। ইন্টারেস্টিং না?আমি বললাম, মোটেই ইন্টারেস্টিং না। ওয়াক থুইং।ওয়াক থুইং মানে? ওয়াক থুইং মানে— ওয়াক থু।তুমি কি সবসময় এমন ফানি ভঙ্গিতে কথা বলো?

চেষ্টা করি। সবসময় পারি না।আমার মনে হয় সবসময় ফানি হবার চেষ্টা করা ঠিক না। এতে তোমার মধ্যে জোকার–ভাব চলে আসবে। তুমি সবাইকে হাসাবার একটা দায়িত্ব বোধ করতে থাকবে। একটা পর্যায়ে তোমার পার্সোনালিটি কলাপস করবে। আমার ধারণা এখনি করেছে।আমি আলোচনার মোড় ঘুরাবার জন্যে বললাম, খালা কি বাসায় নেই?

বাসায় আছে। তাকে কীজন্যে দরকার বলো।এক কাপ চা খেতাম।কফি হলে চলবে? চলবে।এই মুহূর্তে তোমার খালার সঙ্গে দেখা হবে না। অপেক্ষা করতে হবে। তোমার কফি আমি বানিয়ে আনছি। চিনি ক চামচ খাও? আমার কোনো ফিক্সড ব্যাপার নাই। যে যা দেয়। তাই খাই।Again you are trying to be funny. Please dont do that.

আরেফিন সাহেব আমার জন্যে কফি আনতে গেলেন। আমার ধারণা কফি নিয়ে এসেই ময়ুর-বিষয়ক গল্পের পরিশিষ্ট শুরু করবেন। ঠাণ্ডা কফিতে চুমুক দিতে দিতে আমাকে গল্পের পরিশিষ্ট শুনতে হবে। ঠাণ্ড কফি— কারণ পুরুষমানুষ যখন চা বা কফি বানায় তখন সেই চা–কফি সবসময় ঠাণ্ডা হয়, চিনি বেশি হয়। এবং সেই চা বা কফিতে একটা পুরুষপুরুষ গন্ধ থাকে।

আরেফিন সাহেব (তাকে সাহেব বলা ঠিক না, আমার বলা উচিত খালু। আরেফিন খালু। আরেফিন নামটাকে শর্ট করে আরো–খালু বললেও খারাপ হয় না।)। মগ ভর্তি কফি আমার সামনে রাখতে রাখতে বললেন, বাই এনি চান্স আজ সারাদিনে কি তোমার খালার সঙ্গে তোমার কোনো কথা হয়েছে? আমি বললাম, হয়েছে।ঠিক কখন কথা হয়েছ বলো তো?

এগজ্যোক্ট সময় বলতে পারব না। প্রথমবার কথা হয়েছে সন্ধ্যার দিকে। বাংলাদেশে বাস করি তো, সারাক্ষণ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকা আমাদের নিষেধ আছে।দ্বিতীয়বার কখন কথা হল? প্ৰথমবারের ঘণ্টা খানিক পর।তার কথাবার্তা তোমার কাছে কি অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল? না।সে তোমাকে এখানে আসতে বলেছে? জ্বি।কেন আসতে বলেছে সেটা কি ব্যাখ্যা করেছে?

না। শুধু বলেছেন–খুব জরুরি কথা আছে। আমার ধারণা জরুরি কথা টথা কিছু না, নতুন ধরনের কোনো খাবার খাওয়ার নিমন্ত্রণ।কখন আসতে বলেছে? রাত আটটায়।কফি খেতে কেমন হয়েছে? ভালো হয়েছে। খেতে একটু অন্যরকম। তাতে অসুবিধা নেই।কফি কি কড়া হয়েছে?

একটু হয়েছে। আমি কড়া কফি পছন্দ করি।এখানে তুমি একটা ভুল করছ। শীতল পানীয় খেতে হয় কড়া। আর উষ্ণ পানীয় খেতে হয় হালকা করে।আমি কফির মাগো চুমুক দিতে দিতে বললাম, আপনার এখানে আসা আমার জন্যে শিক্ষাসফরের মতো, কত কী যে শিখি।আরেফিন সাহেব শীতল গলায় বললেন, তুমি কি আমাকে রিডিকুল করার চেষ্টা করছি?

জ্বি না।আমি আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি যারা জোকারি করে তারা জোকারির ফাঁকে ফাঁকে অন্যকে রিডিকুল করার চেষ্টাও করে। তুমি কফিটা খাচ্ছ না কেন? ভালো লাগছে না।ভালো না–লাগলেও খেতে হবে।কেন, আপনি বানিয়েছেন বলে? আরেফিন সাহেব শান্ত গলায় বললেন, আমি তোমাকে ভয়াবহ কিছু কথা বলব। কথাগুলি শোনার পূর্বশর্ত হচ্ছে— কফি খেয়ে শেষ করা। কফিতে আমি সামান্য রাম মিশিয়ে দিয়েছি।

এই রাম তোমার নার্ভকে ষ্টেবল রাখতে সাহায্য করবে। আমি যে–কথাগুলি বলব তা শোনার জন্যে নাৰ্ভ স্টেবল থাকা দরকার। আমি যে পাচ পেগী হুইস্কি খেয়েছি। এই কারণে খেয়েছি।পাঁচ পেগ হুইস্কি আপনাকে কিছু করতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে না।আমি খুব শক্ত নার্ভের মানুষ। কতটা শক্ত তা তুমি আন্দাজও করতে পারবে না। যাই হোক কফিটা তাড়াতাড়ি শেষ করো।

কফি খাব না। রাম দেয়া কফি খেয়ে অভ্যাস নেই। আমার গা কেমন যেন করছে। শেষটায় ময়ূরের মতো নাচতে শুরু করলে কেলেঙ্কারি।Young man dont try to be funny. খালু সাহেব। আপনি কী বলতে চাচ্ছেন, বলে ফেলুন। আমার নার্ভ আপনার মতো শক্ত না হলেও খারাপ না। প্লাষ্টিকের নার্ভ। কোনো কিছুতেই এফেক্ট করে না।

তুমি দয়া করে আমাকে খালু সাহেব ডাকবে না। খালু সাহেব শুনতে ভালো লাগে না। আমাকে নাম ধরে ডাকতে পার কোনো সমস্যা নেই। নাম ধরে ডাকতে খারাপ লাগলে আরেফিন সাহেবও বলতে পার।আপনাকে নাম ধরে ডাকলে মালিহা খালা রাগ করবেন।আরেফিন সাহেব অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, তোমার মালিহা খালা রাগ করবেন না। রাগ করার মতো অবস্থা তার না। তিনি মারা গেছেন। She is deadlike a log.

আমি তাকিয়ে আছি। আরেফিন সাহেব বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খালিগ্লাস নিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। গ্লাস ভর্তি করে ফিরে এলেন। গ্লাসে বরফের টুকরো ভাসছে। গোল করে কাটা লেবুর স্নাইস ভাসছে। তিনি চুমুক দিতে দিতে আসছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে যে–জিনিস তিনি খেতে খেতে আসছেন তা অত্যন্ত স্বাদু।

মৃত্যুসংবাদ শুনে চেচিয়ে ওঠেনি। এতে আমি ইমপ্রেসড। মৃত্যু এমন কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার না। মৃত্যুসংবাদ শুনে হাতপা এলিয়ে পড়ে যাওয়াও কোনো কাজের কথা না। বেশিরভাগ মানুষ এরকম করে। যাই হোক এখন আমি পুরো ব্যাপারটা বলব। তুমি মন দিয়ে শোনো।খালার ডেডবডি কি ঘরে আছে?

ঘরে আছে মানে? রীতিমতো সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে। রুচিকর দৃশ্য না বলেই তোমাকে দেখতে বলছি না। তারপরেও দেখতে চাইলে বসার ঘরের জানালা ফাক করে পর্দা সরিয়ে দেখে আসতে পার। দেখতে চাও? না।এক পেগ হুইস্কি খেয়ে দেখবে। এইসব পরিস্থিতিতে হুইস্কি টনিকের মতো কাজ করে।হুইঙ্কি খাব না। কিন্তু সিগারেট খেতে পারি। আপনার কাছে কি সিগারেট আছে?

আরেফিন সাহেব সিগারেট-কেইস এবং লাইটার এনে দিলেন। আমি সিগারেট ধরাতে-ধরাতে বললাম, খুনটা কি আপনি করেছেন? আরেফিন সাহেব গ্রাসে চুমুক দিতে দিতে বললেন, তোমার এইরকম সন্দেহ হচ্ছে? হ্যাঁ।এরকম সন্দেহ হবার কারণ কী? আমি খুব স্বাভাবিক আছি। এই কারণে? ঘরে ডেডবডি রেখে ময়ূরের গল্প করছি। হুইঙ্কি খাচ্ছি। গেস্টকে কফি বানিয়ে খাওয়াচ্ছি… আমাকে খুনি ভাবার পিছনে আমার এইসব কর্মকাণ্ড কি কাজ করছে?

বুঝতে পারছি না। হঠাৎ মনে হয়েছে বলে বললাম।হঠাৎ বলে কিছু নেই। পৃথিবীটা হচ্ছে Cause and effect–পৃথিবী। প্রথমে cause তারপর effect. হুট করে তুমি কাউকে খুনি ভাববে না। সেই ভাবনার পেছনে অবশ্যই cause থাকতে হবে।খালা মারা গেছেন কখন? আমি ডেডবডি ডিটেক্ট করি সন্ধ্যা সাতটা পচিশে। আমার মনে হয় মৃত্যুর আগে তোমার খালা তোমার সঙ্গেই শেষ কথা বলেছে।পুলিশকে খবর দিয়েছেন?

না। সব গুছিয়ে নিয়ে পুলিশকে খবর দেব। নয়তো পুলিশ এসে প্রথমেই তোমার মতো প্রশ্ন করবে–খুন কখন করেছেন? আমি কী বলছি না-বলছি মন দিয়ে শুনবেও না। হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিয়ে যাবে।সব কি গুছিয়ে নিয়েছেন? না। ধাতস্থ হয়ে নিচ্ছি। আমি একা তো গুছাতে পারব না। তোমাকে নিয়ে গুছাতে হবে।আমি বললাম, ও। বলেই স্থির হয়ে গেলাম। স্পষ্ট বুঝতে পারছি বিরাট বড় যন্ত্রণায় পড়তে যাচ্ছি।

ভুল বললাম বিরাট যন্ত্রণাতে তো এমনিতেই আছি। পুলিশ ছায়ারমতো পেছনে আছে। এখন পড়ব আরো গভীর যন্ত্রণায়।আমি বসে আছি জ্ঞানী অধ্যাপকের সামনে। অধ্যাপক সাহেব হালকা নীল রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরে সোফায় পা তুলে বসে আছেন। তাঁর হাতে হুইস্কির গ্লাস। যে বসার ঘরে বসে আছি, তার সাজ–সজাও ইন্টেলেকচুয়েল ধরনের। কার্পেটের উপর শীতল পাটি। শীতল পাটির উপর বেতের সোফা।

বেতের সোফার গদিগুলিতে কাথা–ষ্টিচের কভার। দেয়ালে পেইনটিং ঝুলছে। পিকাসোর ব্ল পিরিয়ডে আঁকা ছবির রিপ্রিন্ট। কাপেটের রঙ বদল হলে পিকাসোও বদলাবেন বলে আমার ধারণা। ঘরে এসি চলছে। আরামদায়ক ঠাণ্ডা। এই বাড়িরই শোবার ঘরে একজন মহিলা সিলিং ফ্যানে ঝুলছেন বিশ্বাস করা কঠিন। অধ্যাপক সাহেব রসিকতা করছেন না তো?

জ্ঞানী মানুষদের রসিকতাগুলিও উঁচুশ্রেণীর হবার কথা। হয়তো দেখা যাবে মালিহা খালা শোবার ঘর থেকে বের হয়ে বলবেনহিমু! কখন এসেছিস। জ্বর–জুর লাগিছিল বলে শুয়েছিলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। তুই আমাকে ডাকলি না কেন? ছোট মাছ দিয়ে একটা টকের তরকারি করেছি। খেয়ে দেখ তো! আরেফিন সাহেব সরু–চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভুরু সামান্য কুঁচকে আছে। চিন্তার ভেতর আছেন বলে মনে হচ্ছে।

হিমু।জ্বি।আমার প্রথম কাজ হচ্ছে তোমার মন থেকে সন্দেহটা দূর করা। তোমার মন যদি লজিক্যাল হত তা হলে গোড়াতেই আমাকে সন্দেহ করতে না। তোমার খালার ওজন দু–মণের কাছাকাছি। দুইমণি আলুর বস্তা সিলিং ফ্যানে ঝুলানো আমার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। এই কাজে অতি অবশ্যই আমার একজন একমপ্লিস লাগবে। একমপ্লিস মানে আশা করি জান। একমপ্লিস মানে হল সাহায্যকারী। এখনো কি তোমার কাছে মনে হচ্ছে তোমার খালার এই গন্ধমাদন পর্বত আমার পক্ষে কপিকল ছাড়া সিলিং ফ্যানে ঝুলানো সম্ভব?

না সম্ভব না।থ্যাংক য়্যু।দ্বিতীয় লজিক হচ্ছে শোবার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আমার পক্ষে নিশ্চয়ই খুন করে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে বাইরে চলে আসা সম্ভব না।জ্বি না। সম্ভব না।তৃতীয় যুক্তিটি মারাত্মক। তোমার খালা একটা সুইসাইড নোট রেখে গেছেন। সো নাইস অব হার। এই সুইসাইড নোটটাই আমাকে রক্ষা করবে।

সুইসাইড নোটটা একটু পড়ে দেখি।নিশ্চয়ই পড়ে দেখবো। As a matter of fact তোমারই আগে পড়া উচিত। কারণ সুইসাইড নোটে তোমার নাম আছে।বলেন কী! আমি কেন? আরেফিন সাহেব পকেট থেকে কাগজ বের করে আমার কাছে দিলেন। এই ভয়াবহ কাগজ নিয়ে ভদ্রলোক এতক্ষণ নির্বিকার ভঙ্গিতে বসেছিলেন তা ভাবাই যায় না।দেখেই চিনলাম খালার হাতের লেখা। এরকম গুটিগুটি অক্ষরের লেখা স্লিপ আমি বেশ কয়েকটা পেয়েছি। এই কাগজটায় বলপয়েন্টে লেখা—

আমার মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়।

আমার প্রিয়জনদের কাছ থেকে আমি

ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কেন এমন ভয়াবহ

সিদ্ধান্ত নিলাম তা হিমু কিছুটা জানে।

ইতি

মালিহা বেগম

আরেফিন সাহেব আমার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, তোমার খালার মৃত্যু সম্পর্কে তুমি কী জানো দয়া করে আমাকে বলে। পুলিশের আগে আমি জানতে চাই। আমাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা দরকার।আমি কিছুই জানি না।তোমার কথা আমি বিশ্বাস করলেও পুলিশ করবে না। কোনো কিছু না–জানলেও একটা কিছু বের করো। পুলিশকে বলতে হবে। আমি কি তোমাকে কোনো সাজেশান দিতে পারি?

দিন।পুলিশকে বলে যে তোমার খালার দাম্পত্যু–জীবন ছিল বিষময়। এটা মিথ্যাও না। আমার সম্পর্ক আদায় কাচকলায় এর চেয়েও খারাপ। তোমার খালা এ পর্যন্ত দুবার আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে।বলেন কী?

একবার। থ্যাংকস গিভিং ডে–তে টার্কি কাটছিল, তখন আমার সঙ্গে কথা কাটাকাটি শুরু হল। তোমার খালা তাঁর টেম্পার লুজ করে ছুরি হাতে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। আমাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। পাঁচটা ষ্টিচ লেগেছে।ও।তুমি যেভাবে ও বললে তাতে মনে হল—আমার কথা বিশ্বাস করলে না। ঘটনা অনেকদূর গড়িয়েছিল। পুলিশি তদন্ত হয়েছে।

আমেরিকান পুলিশের কাছে রেকর্ড আছে। ও।এইবারের ও টা আগের বারের চেয়ে ভালো হয়েছে। দ্বিতীয়বার খুনের চেষ্টা কী ভাবে করে তা তোমাকে বলতাম। দ্বিতীয়বারের চেষ্টাটা ছিল হাস্যকর ছেলেমানুষী চেষ্টা। কিন্তু হাতে সময় নেই। দশটা বাজে পুলিশ চলে আসবে।পুলিশ কি কাঁটায়–কাঁটায় দশটার সময়ই আসার কথা?

আমার কথার জবাব দেবার আগেই কলিং বেল বেজে উঠল।আমি চমকে আরেফিন সাহেবের দিকে তাকালাম। পুলিশ না তো? আরেফিন সাহেব বললেন, পুলিশ না। পুলিশ। কখনো একবার বেল টেপে না। পৃথিবীর সবচে ভ্ৰদ্ৰ পুলিশ হল বৃটেনের পুলিশ। এরাও পরপর তিনবার বেল টেপে। যাও দরজা খোলো। আমার পক্ষে দরজা খোলা সম্ভব না। আমার পা টলছে। পাঁচটা হুইস্কি খাওয়া ঠিক হয়নি। আমার লাস্ট লিমিট হচ্ছে চার।

আমি দরজা খুললাম। মালিহা খালা দাঁড়িয়ে আছেন। দুহাত ভর্তি ব্যাগ। বাজার করে ফিরেছেন বোধ হয়। খালা হাসি মুখে বললেন–তোকে বুদ্ধিমান ছেলে বলে জানতাম। তুই তোর খালু সাহেবের ফাঁদে এভাবে পা দিবি বুঝতেই পারিনি। দরজা ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন। একটু সরে দাঁড়া। আর মুখ থেকে জম্বি ভাবটা দূর কর তো।আরেফিন সাহেব বললেন, কিছু মনে কোরো না হিমু তোমার সঙ্গে একটু প্রাকটিক্যাল জোক করলাম।

তোমাকে দেখিয়ে–দেখিয়ে হুইস্কি বলে যা খাচ্ছি–তাও আসলে হুইঙ্কি না–জাষ্টি প্লেইন ওয়াটার। মানুষের সব কথা এমন চট করে বিশ্বাস করবে না। তবে মালিহা, তোমার এই Nephew কঠিন চিজ, আমার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস-করলেও ভড়কায়নি। টাইট হয়ে বসেছিল। I am impressed. আমার কি উচিত মানুষের সব কথা বিশ্বাস করা? তর্কে যাকে পাওয়া যায় না, তাকে পাওয়া যায় বিশ্বাসে। তর্ক হল আগুনের মত। যে-আগুনের কাছে এলে বিশ্বাস বাম্পের মত উবে যায়।

মালিহা খালার বাসা থেকে বের হলাম মন খারাপ করে। খালা এবং তার স্বামী দুজনে মিলে আমাকে বোকা বানিয়েছে মন খারাপটা সে কারণে না। অন্য কোনো কারণে, যা আমি ধরতে পারছি না। মাথার মধ্যে একই খটকা ঢুকে গেছে। অস্থির বোধ করছি। মনে হচ্ছে কোনো বড় ধরনের সমস্যা আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। মন বসছে না। কোনো কিছুতেই মন বসছে না।অস্থিরতা বিষয়ে আমার বাবা এলাৰ্জিক ছিলেন। পুত্রের প্রতি যে সব উপদেশ রেখে গেছেন তার একটি অস্থিরতা বিষয়ক।

কখনো কোনো অবস্থাতে অস্থির হইবে না। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘূর্ণায়মান। এই ঘূর্ণিতে তুমি কখনো অস্থিরতা পাইবে না। তুমি পৃথিবীর স্বভাব ধারণ করবে। মানুষ বাদ্য যন্ত্রের মত। সেই বাদ্য যন্ত্র নিয়ত সংগীত তৈরি করে। অস্থির বাদ্যযন্ত্র সংগীত সৃষ্টিতে অক্ষম। কাজেই তোমার জন্যে অস্থিরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হইল। আমি জানি ইহা জগতের কঠিনতম কর্মসমূহের একটি। বাবা হিমু, কাউকে কাউকে তো কঠিনতম কর্মগুলি করিতে হইবে?

আমি পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিলাম। পকেটবিহীন পাঞ্জাবিগুলিতে আমি এখন বিরাট-বিরাট পকেট লাগিয়েছি। যখন চলাফেরা করি পকেট ভর্তি জিনিসপত্র নিয়ে চলা ফেরা করি। এই মুহুর্তে আমার পকেটে মোবাইল টেলিফোন ছাড়া আর যে সব জিনিসপত্র আছে তা হচ্ছে-–

১. একটা দেয়াশলাই।

২. সিগারেটের খালি প্যাকেট।

সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। প্যাকেটটা ফেলা হয়নি। পকেটে রেখে দিয়েছি।

৩. একটা মোমবাতি।

বড় সাইজের মোমবাতি। পাচ টাকা করে পিস। মোমবাতিটা খুব কাজে লাগে! রাতে কোনো বাসায় গিয়েছি, লোড শেডিং এর কারণে কারেন্ট চলে গেল। ওমি ম্যাজিসিয়ানদের মত পকেট থেকে মোমবাতি বের করলাম।

৪. এক শিশি আতর।

আতরের নাম মেশকাতে আম্বর। বিছমিল্লাহ হোটেলের মালিক দয়াল খাঁ উপহার হিসেবে আমাকে দিয়েছেন। অতি উৎকট গন্ধ। দয়াল খাঁ বলেছেন–বিশেষ–বিশেষ সময়ে এই গন্ধই অপূর্ব লাগে। বিশেষ সময় বের করার জন্যেই এই আতরটা দরকার।

৫. একটা হ্যান্ডবিল।

পিজি হাসপাতালের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। বোরকা পরা এক মহিলা হাতে হ্যান্ডবিল ধরিয়ে দিলেন। অনেক মানুষের হাতে হ্যান্ডবিল ধরিয়ে দেবার কাজটা বোরখাপরা মহিলারা করেন না। ইনি করছেন দেখে ভাল লেগেছে বলে হ্যান্ডবিল রেখে দিয়েছি। হ্যান্ডবিলে জনৈক দেওয়ান কফিলউদ্দিন জানাচ্ছেন যে তিনি গ্যারান্টি সহকারে ক্যান্সারের চিকিৎসা করেন। হ্যান্ডবিলটা রেখে দিয়েছি। যদি কখনো সুযোগ হয় এই মহান চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলব।

পকেট থেকে দেয়াশলাই বের করে আমি অপেক্ষা করছি। রাস্তা পার হয়ে একজন আমার দিকে আসছেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গি বলে দিচ্ছে তাঁর পকেটে সিগারেট আছে কিন্তু দেয়াশলাই এর অভাবে ধরাতে পারছেন না। খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে নিশিরাতে যারা চলাফেরা করে তাদের বেশির ভাগের সঙ্গেই দেয়াশলাই বা লাইটার থাকে না।ব্রাদার আগুন হবে?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *