একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা পর্ব:০৭ হুমায়ূন আহমেদ

একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা

আমি হাজত বাসের প্রস্তুতি নিয়ে বড় বাথরুম সারলাম। রাস্তার পাশে ইটালিয়ান সেলুন থেকে তিন টাকা দিয়ে মাথা নেড়া করলাম। নাপিত আবার মাথা নেড়ার পর কিছুক্ষণ মাথা মালিশ করে দিল। যে উৎসাহের সঙ্গে নাপিত মাথা মালিশ করল তাতে মনে হল–মাথা মালিশ করে সে খুবই মজা পেয়েছে।মেসে ফিরে দেখি পুলিশ এসে গেছে। একজন সাব ইন্সপেক্টর ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে আমার ঘরের সামনে পায়চারি করছেন। তিনি আমাকে দেখেই প্রায় হুঙ্কার দিলেন। ভুল ইংরেজিতে বললেন–You name Himu?

আমি বললাম, ইয়েস স্যার। I name Himu. তিনি দ্বিতীয়বার হুংকার দিলেন— এবারের হুংকার খাটি বাংলা ভাষায়, চল থানায় চল।আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, স্যার চলুন।থানায় ওসি সাহেব আমার পূর্ব পরিচিত। নাম রকিব উদ্দিন, চাঁদপুরে বাড়ি। বছর দুই আগে তিনি কিছুদিন আমাকে হাজতে রেখেছিলেন। অত্যন্ত উগ্রমেজাজের মানুষ, তবে শেষের দিকে তাঁর সঙ্গে আমার খুবই খাতির হয়ে গিয়েছিল। সেই খাতির এখন কাজ করার কথা না। পুলিশ বড়ই বিস্মরণ প্রিয়। তারা অতীত মনে রাখে না।

রকিবউদ্দিন সাহেব মনে রাখবেন সেই আশা আমি করিনি। দেখা গেল। ভদ্রলোকের মনে আছে। আমার দিকে কিছুক্ষণ বিরক্ত চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, বসুন। আমি বসলাম। যে সেকেন্ড অফিসার আমাকে ধরে নিয়ে এসেছেন রকিব উদ্দিন সাহেব তার দিকে তাকিয়ে আগের চেয়েও বিরক্ত গলায় বললেন, হ্যাণ্ডকাফ লাগিয়েছেন কেন? হ্যান্ডকাফ লাগানোর দরকার ছিল না। খুলে দিন।আমার হ্যান্ডকাফ খুলে দেয়া হল। ওসি সাহেব চা দিতে বললেন।চা দেয়া হল।

সিগারেটের প্যাকেট এবং দেয়াশলাই আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি সিগারেট ধরালাম।রকিবউদ্দিন এবার আমার দিকে ঝুকে এসে বললেন, আজই মাথা কামিয়েছেন? আমি বললাম, জ্বি।মাথা কামিয়েছেন কেন? পুলিশের লোকজন সত্যি কথা কখনই গ্ৰহণ করতে পারে না। উদ্ভট মিথ্যা তারা খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করে। মাথা কেন কামিয়েছি। এই সত্য বলে লাভ হবে না, নানান ভাবে পেঁচাবে। মাথা কামানো নিয়ে ঘন্টা খানিক কথা বলতে হবে তারচে মিথ্যা বলাই ভাল।

আমি বললাম, আজ একটি বিশেষ দিন। বৌদ্ধ পূর্ণিমা। এই পূর্ণিমায় মহামতি সিদ্ধাৰ্থ মস্তক মুন্ডন করে গৃহত্যাগ করেন। তাকে স্মরণ করে এই কাজটা করেছি। এখন স্যার বলেন। আপনি কেমন আছেন? ওসি সাহেব বিরস গলায় বললেন, ভাল আছি।আমাকে কেন আনিয়েছেন জানতে পারি কি স্যার? হ্যাঁ জানতে পারেন। কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করব? মুসলেম মিয়া সম্পর্কে? কোন মুসলেম মিয়া?

খবরের কাগজে যার নিউজ ছাপা হয়েছে। নাঙ্গু বাবা।ওসি সাহেব আগ্রহের সঙ্গে বললেন, মুসলেম মিয়াকে চেনেন না-কি? জি চিনি।রকিবউদ্দিন সাহেব বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, বলেন কী? তার গলার আগ্রহ থেকেই বোঝা যাচ্ছে নাঙ্গু বাবা ইতিমধ্যেই প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তাকে নিয়ে গল্প গুজব ছড়াচ্ছে। আমি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললাম, সামান্য পরিচয় আছে।কোথায় পরিচয়?

আমি রাতে বিরাতে হাঁটি তো। সেখানেই দেখা।লোকটার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা তো প্ৰচণ্ড।তাই না-কি? হ্যা প্রচন্ড। অন্তর্ভেদি দৃষ্টি। যখন তাকায় তখন মনে হয়— মনের ভেতর যা আছে সব পড়ে ফেলেছে। তারপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসে। ঠান্ডা টাইপ হাসি। এরকম হাসি আমি কাউকে হাসতে দেখিনি।সে কি এই হাজতেই আছে?

না। উনি আছেন ধানমণ্ডি থানায়।ওসি সাহেব আমার দিকে আরো খানিকটা ঝুকে এসে গলা নামিয়ে ফিলফিস করে বললেন, খুবই স্ট্রেঞ্জ একটা ঘটনা। আপনাকে না বলেও পারছি না। ধানমন্ডি থানায় ওসি সাহেবের এক শালী।–মেনস্ট্রেশন টাইমে তার প্রচণ্ড ব্যথা হয়। মাঝে মধ্যে অজ্ঞানও হয়ে যায়। তার ব্যথা উঠেছে ওসি সাহেব কি মনে করে মুসলেম সাহেবকে ঘটনাটা বললেন। শুনেই মুসলেম সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই মেয়ের ব্যথা চলে গেল।

ও।এই ভাবে ও বললেন কেন? বিশ্বাস হচ্ছে না। ধানমন্ডি থানার ওসি সাহেব নিজের মুখে ঘটনাটা আমাকে বলেছেন।আমরা কি মুসলেম মিয়াকে নিয়েই কথা বলব? অবশ্যই না। আসুন যে জন্যে ডেকেছি। এটা শেষ করি তারপর আপনাকে নিয়ে মুসলেম সাহেবের কাছে যাব। আপনার সঙ্গে পরিচয় কেমন?

খুবই খারাপ ধরনের পরিচয়। আমাকে দুচোখে দেখতে পারে না। একবার দাঁত–টাত বের করে কামড়াতে এসেছিল।তা হলে থাক। এই ধরনের মানুষ অবশ্যি খুব সামান্যতেই ভায়োলেন্ট হন। এদের ঘাটাতে নেই। আচ্ছা এখন আসল কাজে আসি। তার আগে আর এককাপ চ খেয়ে নেবেন।জ্বি না।কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দেবেন। মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না। অনুমানে কিছু বলবেন না। প্রশ্নের উত্তর যদি জানা না থাকে বলবেন জানি না।জ্বি আচ্ছা।হাদিকে চেনেন?

একজনকে চিনি। হাদিউজ্জামান খান তক্ষকের মত মুখ। লম্বা।তার চেহারার বর্ণনা দিতে তো আপনাকে বলিনি। তাকে চেনেন কি না জানতে চেয়েছি।চিনি।তার সঙ্গে শেষ দেখা করে হয়েছে? গত পরশু।কী কথা হয়েছে? কোনো কথা হয়নি।তাকে চেনেন। অথচ কথা হয়নি কেন? মালিহা খালার বাড়িতে উনি ফ্যান নামাতে গেছেন। কাজে ব্যস্ত ছিলেন বলে কথা হয়নি।ফ্যান কি একা একা নামাচ্ছিল না। সঙ্গে কেউ ছিল? একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রী ছিল।ইলেকট্রিক মিস্ত্রীর নাম?

নাম জানি না। ইলেকট্রিক মিস্ত্রী বা কল সারাই মিস্ত্রী, কিংবা টেলিফোনের মিস্ত্রী–এদের নাম সাধারণত জিজ্ঞেস করা হয় না।যে ইলেকট্রিক মিস্ত্রীকে হাদিউজামানের সঙ্গে দেখেছিলেন তাকে দেখলে চিনতে পারবেন? হ্যাঁ পারব।তা হলে একটু হাজতে আসুন–আইডেনটিফাই করবেন? ইলেকট্রিক মিস্ত্রী ভয়ংকর কিছু কি করেছে? সে একা করেনি দুজনে মিলে করেছে। আচমকা খুন একজন করে। কিন্তু ক্যালকুলেটিভ মার্ডারের বেলায় একমপ্লিশ লাগে। খুন করেছে হাদিউজ্জামান, ইলেকট্রিক মিস্ত্রী সালাম হল তার একমপ্লিশ।।খুন কে হয়েছে?

মালিহা বেগম। আপনার খালা হন সম্ভবত।আমি অবাক হয়ে রকিবউদ্দিন সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার এক আত্মীয় খুন হয়েছে এই খবরটা ওসি সাহেব আমাকে এখন দিচ্ছেন। খুন-টুনের ব্যাপারগুলি পুলিশের কাছে এতই গুরুত্বহীন? ওসি সাহেব বললেন, আপনার খালার খুন হবার খবর আপনি পাননি?

জ্বি না।কাগজে উঠেছে তো। কাগজ পড়েননি? খুন খারাবির নিউজগুলি আমি পড়ি না। এখন মনে হচ্ছে পড়া দরকার। আমার খালু, আরেফিন সাহেব উনি কোথায়?…… উনাকেও খুন করার চেষ্টা হয়েছে। উনি হাসপাতালে আছেন। ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন।ও আচ্ছা।ওসি সাহেব বললেন, চলুন তো আমার সঙ্গে সালামকে আইডেনটিফাই করবেন।হাদি সাহেবও কি হাজতে আছেন?

হ্যাঁ। আছে। তবে জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না। যে ডলা খেয়েছে। তার খবর হয়ে গেছে।হাজাতের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় দুজনেই পড়ে আছে। মুখ ফুলে এমন হয়েছে যে অতি পরিচিত জনেরও এদেরকে চেনার কথা না। ইলেকট্রিক মিস্ত্রী ছেলেটা পড়ে আছে খালি গায়ে।

তার বুক হাপরের মত ওঠানামা করছে। আমি আমার জীবনে কারো বুক এ ভাবে ওঠানামা করতে দেখিনি। একেকবার বুক ফুলে উঠছে আর মনে হচ্ছে ছেলেটার হৃদপিন্ড পােজর ফুড়ে বের হয়ে আসবে।ওসি সাহেব বললেন, চিনতে পারছেন? আমি বললাম, না।হাদিকেও চিনতে পারছেন না? জ্বি না। যে মার মেরেছেন— মুখ যে ভাবে ফুলেছে আমি কেন পাখি এসেও চিনবে না।পাখি কে?

পাখি তাঁর মেয়ে। বারো তারিখ মেয়েটার জন্মদিন। আমার দাওয়াত আছে। কোনো কাজ না থাকলে সেদিন আপনিও চলুন।ওসি সাহেব রাগী গলায় বললেন— আপনার খালা খুন হয়ে গেছেন আর আপনার মাথায় ঘুরছে— জন্মদিনের দাওয়াত? আপনার ফালতু কথা বলার অভ্যাসটা দূর করুন। থানায় এসে একটা বাড়তি কথা বলবেন না।জ্বি আচ্ছা। আমি কি হাদি সাহেবের সঙ্গে দুটা কথা বলব?

বলুন।আমি অনেকক্ষণ হাদি সাহেব, হাদি সাহেব বলে ডাকলাম। কেউ জবাব দিল না। অজ্ঞান মানুষ প্রশ্নের জবাব দেয় না। তবে ইলেকট্রিক মিস্ত্রী উঠে বসে আমার দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করে কী যেন বলল। তার ঠোঁট কেটে দুফাক হয়ে গেছে, দাঁত ভেঙেছে। সে হাত তুলে আমাকে সালামও দিল। মনে হয় আমাকেও পুলিশের কেউ ভেবেছে।আমি ওসি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি নিশ্চিত যে এরাই খুন করেছে?

ওসি সাহেব বললেন, অবশ্যই। কিছু–কিছু খুনের মিমাংসা অতি দ্রুত হয়ে যায়, আবার কিছু কিছু খুনের মিমাংসাই হয় না। এই ক্ষেত্রে খুনের মিমাংসা দ্রুত হয়ে গেল।হাদি সাহেব স্বীকার করেছেন যে খুনটা উনি করেছেন? সে করে নাই। তবে সালাম করেছে। তাকে রাজসাক্ষি করে দেব। ওসি সাহেব সালামের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি রে তুই খুন করেছিস? সালাম হ্যাঁ–সুচক মাথা নাড়ল। তার কাটা ঠোঁটের কোণায় সামান্য হাসিও দেখা গেল। যেন খুন করে সে আনন্দিত।

আমরা হাজত থেকে বের হয়ে এলাম। ওসি সাহেব বললেন, এ্যামেচার মাের্ডারার। হাদি আপনার খালার ঢাকার বিষয় সম্পত্তির লোভে খুনটা করেছে। ক্যালকুলেশনস ছিল পুওর। ভজঘট করে ফেলেছে। বড় ক্রাইমের ক্রিমিন্যাল সব সময় ধরা পড়ে যায়। ক্রাইমে সে কিছু–না-কিছু খুঁত রেখে যায়। নিজের কিছু চিহ্ন রাখে। একমাত্র পুলিশই পারে কোনো রকম খুঁত ছাড়া ক্রাইম করতে। কারণ তারা খুঁতগুলি জানে।স্যার আপনার কথা শুনে ভাল লাগছে।

ভাল লাগার মত কী কথা বললাম। ভাল লাগার মত আমি কিছুই বলিনি। আপনি আপনার স্বভাবমত আমাকে নিয়ে ফান করার চেষ্টা করছেন। দয়া করে করবেন না।জি আচ্ছ। আমি কি চলে যাব, না থাকব? তদন্তের স্বার্থে আমার উচিত আপনাকে থানায় আটকে রাখা। কিন্তু আমার উপর নির্দেশ আছে আপনাকে ছেড়ে দেয়ার।নির্দেশটা কে দিয়েছেন? জুঁই-এর বাবা? হ্যা স্যারের নির্দেশ।জুঁই-এর এখনো কোনো খবর পাওয়া যায়নি? আমি জানি না।আমি কি টেলিফোনে একটু খোঁজ নিয়ে দেখব?

রকিবউদ্দিন সাহেব কিছুক্ষণ ভাবলেন তারপর টেলিফোন সেটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি আমার মোবাইলে টেলিফোন করলাম। সঙ্গে সঙ্গেই জুঁই-এর বাবার গলা শোনা গেল। তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বললেন, হ্যালো হ্যালো। কে বলছেন?স্যার আমি হিমু।ও তুমি।জুঁই-এর কি কোনো খবর পাওয়া গেছে? না।টেলিফোন করেনি? না।আধ্যাত্মিক লাইনে চেষ্টা চালালে কেমন হয়। স্যার? তার মানে?

খুবই উচ্চশ্রেণীর এক সাধক ধানমন্ডি থানা হাজতে আছেন। তার নাম মুসলেম মিয়া। তবে এই নামে কেউ তাকে ডাকে না। এতে বেয়াদবী হয় এই জন্যেই। কেউ–কেউ তাকে ডাকেন নাঙ্গু বাবা, কারণ তিনি নগ্ন থাকেন। আবার কেউ–কেউ ডাকেন। বেলী বাবা। কারণ উনি সব সময় বেলী ফুলের মালা গলায় দিয়ে থাকেন। অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন স্যারশীত কালে যখন বেলী ফুলের সিজন না, তখনো তাঁর গলায় টাটকা বেলী ফুলের মালা দেখা যায়। বাবার কাছে একবার গিয়ে দেখলে হত।আমি কি করব না করব তা আমি ঠিক করব। তোমাকে ভাবতে হবে না।জি আচ্ছা।তুমি কোথেকে কথা বলছ?

থানা থেকে। আমার এক খালা খুন হয়েছেন। পুলিশ এই জন্যে আমাকে ধরে নিয়ে এসেছে। তবে ওসি সাহেব বলেছেন, ছেড়ে দেবেন।তুমি আর কিছু বলবে না-কি অর্থহীন বক বক করবে? যদি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা না–থাকে তাহলে টেলিফোনটা রাখা। আমি এই টেলিফোনের লাইনটা সব সময় খোলা রাখতে চাই।জি আচ্ছা স্যার।আমি টেলিফোন নামিয়ে রাখলাম। ওসি সাহেবের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে পথে নামলাম।আজ সারাদিনে কোথায়–কোথায় যাব ঠিক করা দরকার।

মালিহা খালার বাড়িতে যাব না। মৃত মানুষকে দেখতে যাওয়া অর্থহীন। এখানে দেখাটা হয় একতরফা। একজন দেখে–অন্যজন তাকিয়ে থাকে, দেখে না।আরেফিন খালু সাহেবকে অবশ্যই দেখতে যাব। জীবন–মৃত্যুর মাঝখানে যারা থাকে তাদের দেখতে বড় ভাল লাগে। এরা তখন অদ্ভুতঅদ্ভুত কথা বলে। একজনকে পেয়েছিলাম যে বারবারই বিস্মিত হয়ে বলছিল–বেহেশত দেখতে পাইতেছি। আচানক বিষয় বেহেশত দেখতেছি।

ও আল্লা একটা বাগান। বাগানটা পানির মধ্যে। কী সুন্দর টলটিলা পানি। পানির মধ্যে এইটা কী আচানক বাগান। ঘর বাড়ি আছে— পানির রং বদলাইতেছে–ও আল্লা, বাগানের গাছগুলান হাসে। গাছ মানুষের মত হাসে। গাছগুলা আবার এক জায়গা থাইক্যা আরেক জায়গায় যায়… এইটা কি পানির মধ্যে পাখি উড়তাছে!!…

হাদি সাহেবের কন্যা পাখির সঙ্গেও দেখা করা দরকার। বেচারীর জন্মদিন যেন ভেস্তে না যায়। সার্কাস পাটিরও খোেজ নেয়া দরকার। কারো কাছে যদি হাতির বাচ্চা থাকে তা হলে একদিনের জন্যে ভাড়া করতে চাই। কে জানে একদিনের ভাড়া কত?

আজ আকাশ মেঘমেদুর। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। এক পশলা বৃষ্টি মনে হয় হয়েছে। পিচ ঢালা রাজপথ বৃষ্টির পানিতে ভেজা। রূপার পাতের মত চক চক করছে। রাস্তাগুলিতে নদী–নদী ভাব চলে এসেছে।আরেফিন খালু সাহেবকে রাখা হয়েছে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে।তাঁর নাকে মুখে নল। বিছানার পাশে স্যালাইনের বোতল ঝুলছে। মাথায়, হাতে ব্যান্ডেজ। একটা চোখ বের হয়ে আছে। সেই চোখের পাতা নামানো। ভাল করে দেখার আগেই পুরুষ টাইপ এক মহিলা নার্স— বের হন, বের হন বলে সবাইকে বের করে দিল। খালু সাহেবের আত্মীয়–স্বজনে হাসপাতাল গিজগিজ করছে।

হাসপাতালের ডাক্তার ছাড়াও বাইরের ডাক্তারাও এসেছেন। মেডিক্যাল বোর্ড বসেছে। ডাক্তারদের আলাপ আলোচনায় যা জানা গেল তার সারমর্ম হল–রোগী ডীপ কোমায় চলে গেছে। কোনো মিরাকল না–ঘটলে বাঁচবে না। আরেফিন খালুর আত্মীয়স্বজনদের আলোচনায় জানা গেল ডীপ কোমায় যাবার আগে ডাক্তার, নার্স এবং তাঁর দূর সম্পর্কের এক ভাই-এর কাছে হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিয়ে গেছেন।

তিনি ঘুমুচ্ছিলেন বসার ঘরের ড্রয়িং রুমে। তাঁর স্ত্রী দরজা বন্ধ করে ঘুমুচ্ছিলেন শোবার ঘরে। তিনি নিজে অনেক রাত জেগে মদ্যপান করছিলেন বলে শেষ রাতের দিকে তাঁর গাঢ় ঘুম হয়। হঠাৎ ধ্বস্তাধস্তি এবং চিৎকারের শব্দ তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। তিনি চমকে উঠে বসেন এবং দেখেন তাঁর বাড়ির কেয়ারটেকারের সঙ্গে তার স্ত্রী ধস্তাধস্তি করছেন। তাঁর স্ত্রীর শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তিনি স্ত্রীকে রক্ষার জন্যে ছুটে যান। তারপর কী হয় তা তার মনে নেই।

ইনটেনসিভ কেয়ার ঘরের সামনে একজন পুলিশও দেখলাম ঘোরাঘুরি করছে। চশমা পরা গুরুগম্ভীর একজনকে দেখা গেল। চৈত্রমাসের এই গরমেও তার গায়ে উলের কোট। শুনলাম। তিনি ম্যাজিস্ট্রেট। ডেথ বেড় ষ্টেটমেন্ট নিতে এসেছেন। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবকে অত্যন্ত বিরক্ত মনে হল। তিনি তার মতই আরেক গুরু গম্ভীর মানুষকে ভুরু টুরু কুঁচকে হাত পা নেড়ে কী সব বলছেন।

আমি কাছে গিয়ে শুনি.ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বলছেনআমি তো সারাদিন এখানে বসে থাকব না। রোগীর যদি জ্ঞান ফেরে আমাকে খবর দিলে আমি চলে আসব। আর ধরেন ইন কেইস যদি জ্ঞান না ফেরে— ডাক্তারের কাছে রোগী যে কথা বলেছে সেটাকেই স্টেটমেন্ট হিসেবে নেয়া হবে। রোগী ডাক্তারকে কী বলেছে তা একটা কাগজে লিখে সই করে দিতে বলুন।

যাকে এই কথা বলা হল তিনি মহাবিরক্ত হয়ে বললেন, আমি বলব কেন? আপনি বলুন। এটা আপনার জুরিসডিকশান।ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, আমার জুরিসডিকশান হবে কেন? আচ্ছা ফাইন, আপনার জুরিসডিকশান না। আপনি চিৎকার করছেন কেন? Why you are raising your voice. ভয়েস আমি রেইজ করছি না আপনি করছেন?

আপনি শুধু যে ভয়েস রেইজ করছেন তা না, আপনি মুখ দিয়ে থুথুও ছিটাচ্ছেন।দুজনের কথা কাটাকাটি শুনতে অনেকেই জুটে গেল। সবাই মজা পাচ্ছে। আমিও পাচ্ছি, অপেক্ষা করছি ঝগড়াটা কোথায় থামে সেটা দেখার জন্যে। ঝগড়া থামতে হলে একজনকে পরাজয় স্বীকার করতে হবে। পরাজয়টা কে স্বীকার করে সেটাই দেখার ইচ্ছ। আমার ধারণা ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব পরাজয় স্বীকার করবেন। চিৎকার উনিই বেশি করছেন। দম ফুরিয়ে যাবার কথা।

পেছন থেকে আমার পাঞ্জাবি ধরে কে যেন টানল। আমি ফিরে দেখি চন্দ্র চাচী। অনেক দূরের লতায় পাতায় চাচী। বিবাহ এবং মৃত্যু এই দুই বিশেষ দিনে লতা–পাতা আত্মীয়দের দেখা যায়। সামাজিক মেলামেশা হয়। আন্তরিক আলাপ আলোচনা হয়।চন্দ্রা চাচী বিস্মিত হয়ে বললেন–তুই এখানে কেন? আরেফিন সাহেব তোর কে হয়?

আমি বললাম, আরেফিন সাহেব আমার কেউ হন না তার স্ত্রী আমার খালা হন।ও আচ্ছা। আমি জানতামই না। কী রকম দুঃখের ব্যাপার দেখেছিস। দিনে দুপুরে জোড়া খুন।জোড়াখুন বলতে পার না— একজন তো এখনো ঝুলছে।চাচী দুঃখিত গলায় বললেন–একটা মানুষ মারা যাচ্ছে আর তুই তার সম্পর্কে এমন ডিসরেসপেক্ট নিয়ে কথা বলছিস। এটা ঠিক না। স্বভাবটা বদলা হিমু।আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, জ্বি আচ্ছা বদলাব।কেমন যেন মেকানিক্যাল হয়ে যাচ্ছে। রোবট টাইপ। মানুষের মৃত্যু, রোগ ব্যাধি এই সব কিছুই আর কাউকে স্পর্শ করছে না। ঠিক বলছি না?

অবশ্যই ঠিক বলেছেন।চন্দ্ৰা চাচী হাত ব্যাগ থেকে পান বের করে মুখে দিতে দিতে চট করে প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন— আমার ছোট মেয়ে ঝুমুর বিয়ে দিয়েছি। সেনাকুঞ্জে অনুষ্ঠান করেছি— গেস্ট ছিল একহাজার।বল কী? তাও তো সবাইকে বলতে পারিনি। তোকে অবশ্যই কার্ড পাঠাতাম। তুই কোথায় থাকিস জানি না।বিয়ে ভাল হয়েছে কি না বল। ছেলে কেমন হীরের টুকরা না গোবরের টুকরা?

চন্দ্ৰা চাচী চোখ মুখ শক্ত করে বললেন— ছেলে গোবরের টুকরা হবে কেন? এই সব কী ধরনের কথা? ছেলে কেমিক্যাল ইনজিনিয়ারিং–এ পি, এইচ. ডি. করেছে। আমেরিকায় থাকে। ছেলের আপনি চাচা ষ্টেট মিনিস্টার।বলো কি? মিনিস্টারের ভাতিজা?

ছেলের ফ্যামিলি খুবই পলিটিক্যাল। এবং খানদানী পলিটিক্স করে। এখনকার কাদা ছোড়াছড়ি পলিটিক্স না। ছেলের বড় দাদা বৃটিশ আমলের এম. এল.এ ছিলেন।আশ্চর্য তো।চন্দ্র চাচী আনন্দিত গলায় বললেন, ঝুমুর বিয়েতে মন্ত্রীই এসেছিল চারজন। বাংলাদেশের অনেক ইম্পটেন্ট কবি সাহিত্যিকেরা এসেছিলেন। শো বিজনেসের অনেকেই ছিল। ফিল্মের দুই নায়িকা এসেছিল। তারপর টিভির নায়িকারাও ছিল।

অটোগ্রাফের জন্যে এমন হুড়াহুড়ি শুরু হল। সব ভিডিও করা আছে। বাসায় আসিস দেখাব।আচ্ছা যাব একদিন।আজই চল না। টোটাল চার ঘন্টা ভিডিও ছিল কেটে কুটে দুঘন্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে আবার বাইরে থেকে মিউজিক পাঞ্চ করা হয়েছে বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই জায়গামত বসানো হয়েছে। মিউজিকটা সামান্য sad হয়েছে। তবে তুই দেখে খুবই মজা পাবি।

শুনেই আমার মজা লাগছে। বিয়ের দিন ঝুমুকে কী সুন্দর যে লাগছিল। না দেখলে বিশ্বাস করবি না। এর কারণও আছে— ঝুমুরের মেকাপ দেয়ার জন্যে আমি ফিল্ম লাইন থেকে মেকাপম্যান নিয়ে এসেছি। দীপক কুমার শুর, দুবার মেকাপে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া মেকাপম্যান। সে তিনঘন্টা লাগিয়ে মেকাপ দিয়েছে। ফিল্ম লাইনের মেকাপম্যানরা মুখের কাটা ভাঙতে পারে। ঝুমুরের থুতনী সামান্য উঁচু ছিল না? এটা এমন করেছে… দাবিয়ে দিয়েছে?

হুঁ। আয়নায় ঝুমু নিজেকে দেখে চিনতে পারেনি।দাঁতের কী করেছে? চন্দ্রা চাচী বিস্মিত হয়ে তাকালেন। আমি বললাম, ঝুমুর সামনে কোদাল সাইজের যে দুটা দাঁত ছিল তার কী করা হয়েছে? সেগুলিও কি দাবিয়ে দেয়া হয়েছে? চন্দ্ৰা চাচী থমথমে গলায় বললেন, ঝুমুর কোদাল সাইজ দাঁত?আমি হাই চাপতে–চাপতে বললাম, ভুলে গেছ না-কি, ঝুমুকে স্কুলের বন্ধুরা মিকি মাউস বলে ক্ষেপাত। সে বাসায় ফিরে কাঁদত। ঐ দাঁত দুটার কি হল? ফিল্ম লাইনে মেকাপ দিয়ে বড় দাঁত ছোট করার ব্যবস্থা-কি কিছু আছে?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *