এপিটাফ পর্ব:০৮ হুমায়ূন আহমেদ

এপিটাফ পর্ব:০৮

এইসব আজেবাজে কথা লিখে শুধু শুধু পাতা ভরানো। কোনো মানে হয় না। আসলে আমাদের জীবনটা এরকম যে লেখার মতো কিছু ঘটে না। স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে এসে ভাত খাওয়া, রাতে পড়াশোনা করে ঘুমুতে যাওয়া- ব্যস, এইটুকুতেই সব।আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়ে মেয়েটার উপর আমার খুব ঈর্ষা হলো। কত ভাগ্যবতী মেয়ে! তার ছোট্ট জীবনে কত কিছু ঘটেছে। আর কী সুন্দর করে গুছিয়েই সে সবকিছু লিখে গেছে। আমার যদি এরকম ঘটনার জীবন হতো আমিও সুন্দর করে সব লিখে রাখতাম। আনা ফ্রাঙ্কের মতো চিঠির আকারে ডায়েরি। সে তার কল্পনার বান্ধবীকে উদ্দেশ করে চিঠির মতো লিখেছে। আমি লিখতাম বাবাকে উদ্দেশ করে। মাকে উদ্দেশ করেও লেখা যায়।

তবে মাকে লিখতে ইচ্ছে করে না। মাকে সবসময় আমার নিজেরই একটা অংশ বলে মনে হয়। তাঁর কাছে চিঠি লিখতে ইচ্ছে করে না।আনার মতো ডায়েরি আমি লেখার চেষ্টা করছি অসুখের পর থেকে। প্রথম দিনই বেশ বড় করে লিখলাম। এখন খুব ছোট ছোট করে লিখছি। কারণ হচ্ছে আমি চোখে ঝাঁপসা দেখছি। মাকে চোখের এই ব্যাপারটা বলা হয় নি। এমনিতেই তিনি চিন্তায় চিন্তায় অস্থির। সেই চিন্তা বাড়িয়ে কী হবে! আমি যদি এখন বলি– মা, আমি চোখে ঝাঁপসা দেখতে শুরু করেছি, তাহলে মা কী করবে? তার কিছুই করার নেই। শুধু শুধু অস্থির হবে আর ভয়ঙ্কর কষ্ট পাবে। এমনিতেই বেচারি কষ্টে মরে যাচ্ছে। সেই কষ্ট বাড়িয়ে লাভ কী?

বাবাকে উদ্দেশ করে লেখা প্রথম ডায়েরির লেখাটা এরকম (খুব চেষ্টা করেছি আনা ফ্রাঙ্কের মতো হাসি-খুশিভাবে লিখতে। হয় নি।) বাবা, আজ আমার একটা অসুখ ধরা পড়েছে। অসুখটার নাম মেনিনজিওমা। এরকম অদ্ভুত নাম তুমি নিশ্চয়ই এর আগে শুন নি। কেউই বোধহয় শুনে নি। যাকেই এই নাম বলা হবে সে-ই ভুরু কুঁচকে বলবে, অসুখটা কী? অসুখটা ভয়াবহ। কতটা যে ভয়াবহ তা আমি মাকে দেখে বুঝতে পারি। আমার অসুখ ধরা পড়ার পর থেকে মাকে দেখাচ্ছে অবিকল মরা মানুষের মতো। তোমার মনে আছে, দাদিজানের মৃত্যুর খবর পেয়ে তাকে আমরা দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি পুরনো কালো খাটটায় তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার মুখ হলুদ রঙের একটা চাঁদরে ঢাকা।

সাধারণত মৃতদেহ সাদা চাঁদরে ঢাকা থাকে। দাদিজানকে হলুদ চাঁদরে কেন ঢাকল কে জানে! বোধহয় ঘরে কোনো সাদা চাঁদর ছিল না। আমরা দাদিজানের খাটের পাশে দাঁড়ালাম। কে একজন তার মুখ থেকে চাঁদর সরিয়ে দিল। আমি আঁৎকে উঠলাম। প্রাণহীন মানুষের মুখ এত ভয়ঙ্কর! মায়ের মুখও প্রাণহীন মানুষদের মুখের মতো ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে। তিনি অবশ্যি খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন, যেন আমি কিছু বুঝতে না পারি। যেদিন আমার অসুখটা মা প্রথম জানলেন সেদিন বাসায় ফিরেই ফুলির মাকে বললেন, বুয়া, চা কর। নাতাশাকেও এক কাপ দিও।ফুলির মা হতভম্ব গলায় বলল, আফনের হইছে কী?

কিছু হয় নি। হবে আবার কী? টায়ার্ড।সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত আগ্রহের সঙ্গে বললেন, অনেকদিন টিভি দেখা হয় না। আজ টিভি দেখব। ইন্টারেস্টিং কিছু কি আজ টিভিতে আছে? সে-রাতে অতি কুৎসিত একটা নাটক হলো। একটা ছেলে একটা মেয়েকে ভালোবাসে। তাকে না পেলে সে পাগল হয়ে যাবে। কিন্তু তাকে সে বিয়ে করবে না, কারণ বিয়ে করলে তার ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যাবে। কী যে জগাখিচুড়ি! বড় বড় সব কথা। একটু পর পর কবিতা আবৃত্তি। নায়ক এক একবার কাঁপা কাঁপা গলায় কবিতা শুরু করে আর আমার ইচ্ছা করে দেই কষে একটা চড়।

মা সেই নাটকও চোখ বড় বড় করে দেখল এবং নাটক শেষ হলে বলল, মন্দ না তো। রাতে মা আমার সঙ্গে ঘুমুতে এলো। সে-রাতে খুব গরম পড়েছিল। তার উপর ছিল না ইলেকট্রিসিটি। কিছুতেই আমার ঘুম আসছে না। মা বোধহয় মানসিকভাবে খুব ক্লান্ত ছিল। শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়ল। আমি জেগে আছি। এপাশ-ওপাশ করছি। তখন হঠাৎ মনে হলো– মানুষের যেমন ‘অসুখ’ হয় সেরকম ‘সুখ’ হবার নিয়ম থাকলে খুব ভালো হতো। পৃথিবীতে নানান ধরনের অসুখের মতো নানান ধরনের সুখ থাকত। ছোট সুখ, বড় সুখ। একেক সুখের একেক নাম। কোনো মা’র মেয়ের বড় ধরনের সুখ হলে সেই মা আনন্দে অস্থির হয়ে চারদিকে টেলিফোন করে খবর দিত– আমার মেয়ের না এই সুখ হয়েছে।সত্যি?

হ্যাঁ সত্যি। পরীক্ষায় ধরা পড়েছে। কী যে আনন্দ হচ্ছে ভাই! আনন্দ হবারই কথা। আমি সবসময় দেখেছি আপনি ভাগ্যবতী।মেয়েটার জন্যে দোয়া করবেন আপা।ডায়েরি এইখানেই শেষ।আচ্ছা, আমার কি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? কী দিয়ে শুরু করেছিলাম আর কী বলছি। শুরু করেছিলাম কী দিয়ে? ঐ যে দুপুরে ঘুম ভাঙার পর মনে হলো আজ খুব আনন্দের কিছু ঘটবে। সারাদিন কিছু ঘটল না।খুব আশা ছিল বাবার কাছ থেকে একটা চিঠি নিশ্চয়ই আসবে। অনেকদিন বাবা চিঠি লিখেন না। কে জানে হয়তো তাঁর অসুখ-বিসুখ হয়েছে। অসুখ হলে সেখানে তাঁকে দেখার কেউ নেই। তিনি থাকেন একা, নিজেই বেঁধে খান। শেষ চিঠিতে বাবা তার রান্না করার কথা লিখেছেন। কী সুন্দর করেই না লিখলেন–

ও আমার টিয়া পাখি, আজ দুপুরে রান্না করার সময় তোর কথা মনে পড়ল। কেন বল তো? কারণ আজ একটা দারুণ জিনিস রান্না করেছি। পাহাড়ি একটা মাছ– ওরা বলে দুই মাছ কিংবা চই মাছ। দেখতে এত সুন্দর যেন রূপার একটা পাত। অনেকটা চাঁদা মাছের মতো– চ্যাপ্টা। মুখটা লাল টুকটুক। প্রথমে ভাবলাম ভেজে ফেলি। দেখি, ঘরে মাছ ভাজার মতো তেল নেই। কাজেই তরকারি করা হলো। তরকারি চড়িয়ে দিয়ে মনে হলো– টিয়া পাখি থাকলে এই মাছ আমাকে রান্না করতে দিত না। সে বলত, এত সুন্দর মাছ তুমি কেটেকুটে খেয়ে ফেলবে। পানিতে ছেড়ে দিয়ে আস বাবা।

যাই হোক, মাছটা দেখতে যত সুন্দর খেতে ততই অসুন্দর। বিশ্রি গন্ধ। পচা নাড়িভুড়ি থেকে যে-রকম গন্ধ আসে সেরকম গন্ধ। প্রচণ্ড সর্দিতে নাক বন্ধ থাকলেই শুধু এই মাছ খাওয়া চলে নয়তো না।আমি অল্প একটু খেয়ে বমি করে সব ফেলে দিয়েছি। সারাদিনই শরীরটা কেমন কেমন করেছে। মনে হয় ‘ছই’ কোনো বিষাক্ত মাছ। এই কারণে বোধহয় বাজারে বিক্রি হয় না। আমি নিজে জাল ফেলে ধরেছি। ভালো কথা– আমার একটা জাল আছে। সেই জাল ফেলে আমি নিজেই শঙ্খ নদীতে মাছ ধরি। একবার একটা সাপ ধরেছিলাম।

বিশাল সাপ। মুরং এক ছেলে খুব আগ্রহ করে সাপটা আমার কাছ থেকে নিয়ে গেল। মুরংরা সাপ খায়। মুরং ছেলেটার নাম ‘উলাপ্রু’।সে মাঝে মাঝে এসে আমার কাজকর্ম করে দেয়। একবার তাকে কিছু কাপড় ধুতে দিলাম। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের লুঙ্গি খুলে নেংটো হয়ে কাপড় ধুতে শুরু করল। নিজের লুঙ্গিটা খুলে নিল কারণ কাপড় ধোয়ার সময় লুঙ্গি ভিজে যাবে। এদের লজ্জা-শরম একটু কম। আজ এই পর্যন্তই মা।পরে তোকে লম্বা চিঠি দেব।

ইতি–

তোর বাবা

পুনশ্চ : উলা বলেছে সাপটা নাকি খেতে দারুণ ছিল। পেট ভর্তি ছিল ডিম।

অফিস থেকে ফিরলেন অনেক দেরি করে। ফিরেই আবার বের হয়ে পড়লেন। আমার ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। বুয়া রান্নাঘরে রান্না করছে। আমি একটা বই হাতে শুয়ে আছি। ঘরে আলো আছে কিন্তু পড়তে পারছি না। লেখাগুলি সব ঝাঁপসা। কেউ যদি পড়ে পড়ে শোনাত ভালো লাগত।দরজার কলিংবেল বাজছে।কে এসেছে? বাবা? মনে মনে যা আশা করা হয় তা ঘটে না। উল্টোটা হয়। কাজেই আমি ভাবতে লাগলাম- বাবা আসেন নি। বড় খালু এসে?

সাজ্জাদ বারান্দায় বসে আছে। বারান্দা অন্ধকার। দিলশাদ এখনো ফেরে নি। ফুলির মা চা রেখে গেছে। চা ঠাণ্ডা হচ্ছে। সাজ্জাদ চায়ের প্রতি কোনো আকর্ষণ বোধ করছে না। অল্প সময়ের মধ্যে সে বেশ কয়েকটা সিগারেট খেয়ে ফেলল। সিগারেটের ধোঁয়ায় এখন তার মাথা ঘুরছে। এতদিন পর এসেছে। তার উচিত মেয়ের পাশে বসে থাকা। তার সেই ইচ্ছাও করছে না। দিলশাদের সঙ্গে আগে একটা বোঝাঁপড়া হওয়া দরকার। এমন ভয়াবহ অসুস্থ একটা মেয়ে। চিকিৎসার জন্যে বাইরে চলে যাচ্ছে। আর সে খবরটাও জানবে না? এ কেমন কথা?

ফুলির মা বলল, চাচাজান, সিনান করবেন না? সাজ্জাদ বিরক্ত গলায় বলল, না। দিলশাদ আসবে কখন? জানি না। বলছেন ডাক্তারের ধারে যাবেন। আপনের শইল কি ভালো চাচাজান? আমার শরীর নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।বরফ দিয়া ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি দিমু? আম্মা ফিরিজ কিনছে। নয়া ফিরিজ– লাল কালার। পুরানটা বেইচ্যা দিছে।আচ্ছা ঠিক আছে। দাও, পানি দাও।দাম মিলে নাই। তেরশ টাকা মিলছে।তুমি যাও। আমাকে ঠাণ্ডা পানি এনে দাও।

নয়া ফিরিজটার দাম পড়ছে চাইর হাজার সাতশ। ঠেলাওয়ালা নিছে সত্তর টেকা।তুমি সামনে থেকে যাও তো ফুলির মা। এত বকবক করছ কেন? এমন বকবকানি স্বভাব তত তোমার আগে ছিল না।ফুলির মা চলে গেল। তার আরো অনেক গল্প করার ইচ্ছা ছিল, সাহসে কুলাল। চাচাজানের মেজাজ ভালো নেই। ঘরের ভেতর থেকে নাতাশা ডাকল, বাবা, শুনে যাও তো।সাজ্জাদ মেয়ের ঘরে ঢুকল। মেয়ের দিকে তাকাল না। তাকাতে ইচ্ছা করছে না। নাতাশা বলল, তুমি এত রেগে আছ কেন বাবা?

রাগি নাই।ধমকাধমকি করছ।আরে বক বক করে মাথা ধরিয়ে দিয়েছে।এতদিন পরে এসেছ, বেচারার তোমার সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছা করছে।সাজ্জাদ তিক্ত গলায় বলল, তোর এত বড় অসুখ আমি জানলাম না কেন? আমার জানতে অসুবিধাটা কোথায় ছিল? এই নিয়ে তুমি মার সঙ্গে ঝগড়া করবে? ঝগড়া করব না। আমি শুধু জানতে চাইব। জানার অধিকার আমার নিশ্চয়ই আছে।তুমি তো দেখি আমার সঙ্গেই ঝগড়া শুরু করে দিলে। বাবা, আমার কথা শোন বাথরুমে গিয়ে ভালো করে গোসল কর। তারপর গরম এক কাপ চা খাও।

এরমধ্যে মা এসে পড়বে। ঝগড়া যে এক্ষুনি করতে হবে তা তো না। কয়েকদিন পরেও করতে পারবে। মা খুব কষ্টের মধ্যে আছে বাবা। সারাদিন ছোটাছুটি করে। টাকার জোগাড় হচ্ছে না। এদিকে যাবার সব ঠিকঠাক। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে মা আসবে, আর আসামাত্র তুমি একটা ঝগড়া শুরু করবে, সেটা কি ভালো হবে? আমার ভালো-মন্দ তোকে দেখতে হবে না।যে কদিন আমি বেঁচে থাকব সেই কদিন আমিই দেখব। তুমি না চাইলেও দেখব। বাবা, গোসল করতে যাও। আমি বুয়াকে বলছি চা বানানোর জন্যে। তুমি বাথরুম থেকে বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে চা দেবে। গোসলের পর চায়ে চুমুক দেবার পর দেখবে তোমার রাগ অনেকটা কমে গেছে।

সাজ্জাদ বাথরুমে ঢুকল। গোসল সেরে চা খেয়ে মেয়ের পাশে বসল। নাতাশা খুব আগ্রহ নিয়ে গল্প করে যাচ্ছে। সাজ্জাদ শুনছে। আবার ঠিক শুনছেও না। সে আছে একধরনের ঘোরের মধ্যে, যে ঘোর কখনো কাটবে না। রাত দশটার উপর বাজে। দিলশাদ এখনো ফিরছে না। সাজ্জাদ বলল, তোর মা কি রোজই এমন দেরি করে? এখন প্রায়ই করে। তোমার খিদে লেগেছে, তুমি কি খেয়ে নেবে? তুই কখন খাবি? একটু পরেই খাব। বাবা, তোমার রাগটা কি কিছু কমেছে? সামান্য কমেছে।আরো একটু কমাও।

আচ্ছা যা, কমাব। তোর মা’র এত দেরি করে ফেরার কারণ তো বুঝতে পারছি না। ঢাকার রাস্তাঘাটও তো সুবিধার না।তুমি চিন্তা করো না বাবা, মা এসে পড়বে। তুমি বরং ভাত খেয়ে নাও। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার খুব খিদে পেয়েছে।রাত দশটার পর তো কোথাও কোনো ডাক্তার থাকার কথাও না।আজ মা’র মেজোখালার বাসায় যাবার কথা। ডাক্তারের কাছ থেকে হয়তো সেখানে গেছেন। মেজোখালু সাহেবের আজ মাকে কিছু টাকা দেয়ার কথা।নাতাশা ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মা টাকা চেয়ে চেয়ে ঘুরছে। কী খারাপ যে তাঁর লাগছে কে জানে!

দিলশাদ তার মেজোবোন দিলরুবার বাসায় রাত আটটা থেকে বসে আছে। স্বামী স্ত্রীর দুজনের কেউই ফ্ল্যাটে নেই। উত্তরায় তাদের বাড়ি হচ্ছে, সেই বাড়ি দেখতে গেছে। কাজের মেয়ে বলল, আইস্যা পড়ব। এক্ষণ আসব।কাজের দুটি মানুষ ছাড়া আর কেউ নেই। দিলরুবার একটিই মেয়ে, সে শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করে। ছুটি-ছাটায় আসে। এখন গরমের ছুটি চলছে সে আসে নি। শান্তিনিকেতন থেকে একটা দল যাচ্ছে মালয়েশিয়ায়। সে তাদের সঙ্গে যাবে।দিলরুবাদের ফ্ল্যাট ছবির মতো সুন্দর। হালকা গোলাপির কম্বিনেশন।

কার্পেট গোলাপি, সোফার কাপড় গোলাপি, জানালার পর্দাও গোলাপি। দেয়ালে কিছু পেইন্টিং আছে। মনে হয় অর্ডার দিয়ে আঁকানো, কারণ পেইন্টিং-এও গোলাপি রঙের আধিক্য। গোলাপি রঙটা দিলশাদের অপছন্দ, কিন্তু এই ঘরে রঙটা এত মানিয়েছে। সবচে সুন্দর লাগছে গাঢ় গোলাপি ভেলভেটের সোফাসেট। সমস্যা একটাই- গা এলিয়ে আরাম করে বসতে অস্বস্তি লাগে। মনে হয় ভেলভেট ব্যথা পাবে। দিলশাদ অবশ্যি গা ছেড়েই শুয়ে আছে। এত ক্লান্ত লাগছে, মনে হয় সে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়বে। কাজের মেয়েটি বলল, চা দিব আফা? দিলশাদ বলল, চা না, যদি পার লেবুর সরবত বানিয়ে দাও। ঘরে লেবু আছে?

আছে। আফা সেন্ডেল খুইল্যা বসেন। নতুন কার্পেট কিনছে। কেউ স্যান্ডেল লইয়া উঠলে আম্মা মনে মনে বেজার হয়।দিলশাদ স্যান্ডেল খুলতে খুলতে বলল, এত সুন্দর জিনিস নষ্ট হলে মন খারাপ তো হবেই।একটুকরা মোড়া কাপড়। দাম হইল ত্রিশ হাজার টেকা। শুনলেই বুক কাঁপে।তাহলে তো শুধু স্যান্ডেল খুলে সোফায় উঠলে হবে না, অজু করে উঠতে হবে।কাজের মেয়েটা সরু চোখে দিলশাদকে দেখছে। এই মেয়েটি কি সাজ্জাদের ঘড়ি চুরির খবর দিয়েছিল? যদি সে হয় তাহলে দিলশাদের দিকেও সে লক্ষ রাখবে।

চলে যাবার সময় দিলশাদ কি বলবে– বুয়া, দেখে নাও তোমাদের জিনিস সব ঠিকঠাক আছে কি-না।দিলরুবা বাড়িতে ঢুকল রাত দশটায়। ছোটবোনকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, ওমা, তুই! কখন এসেছিস? নটা থেকে বসে আছি। তুমি একা যে, দুলাভাই কোথায়? আজ ছাদ ঢালাই হচ্ছে। ও থাকবে। রাত একটা-দেড়টার আগে ফিরবে না। আমাকেও থাকতে বলেছিল। ভাগ্যিস থাকি নি। থেকে গেলে তোর সঙ্গে দেখা হতো না। তুই আসবি জানলে ওকেও নিয়ে আসতাম।আজ যে আসব সেটা তো দুলাভাইকে টেলিফোন করে বলেছিলাম।ওর আজকাল কিছু মনে থাকে নাকি? ও যে নিজের নাম মনে রাখে সে-ই যথেষ্ট।কেন?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *